সমাপ্তির_ওপাড়ে #জাবিন_ফোরকান #পর্বসংখ্যা৪৭ (শেষাংশ)

0
2

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৭ (শেষাংশ)

“স্যার, আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন।”

টেবিলের উপর ছড়ানো বিশাল আর্ট পেপারের ড্রয়িং থেকে মুখ তুলে তাকালো মিসির। অ্যাসিস্টেন্ট মেয়েটিকে বললো,

“হুম। জানি। ভেতরে পাঠিয়ে দাও।”

মেয়েটি মাথা নেড়ে চলে গেলো। মিসির যথারীতি নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। লম্বা আর্কিটেকচারাল স্কেলগুলো ব্যবহার করে সে নতুন একটা ডিজাইন করছে। কিছুক্ষণ বাদে তার নাকে পরিচিত সুবাসটি এসে ঠেকলো। মুখ তুলে তাকাতে হলোনা বোঝার জন্য, কে এসেছে ভেতরে।

প্রবেশ করলো আরওয়া। লেমন ইয়েলো বর্ণের একটা জারদৌসি কাজ করা সালোয়ার কামিজ পরনে। ওড়না দুলছে কাঁধের একপাশে। খোলা লম্বা চুলগুলো চেহারার দুপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। ধীরে ধীরে হেঁটে এসে সে মিসিরের পাশে দাঁড়ালো। কোনো বিরক্তি সৃষ্টি করলোনা। তার উপস্থিতি স্পষ্টত টের পেলেও কেন যেন সরাসরি প্রতিক্রিয়া করার ইচ্ছা আজ মিসিরের হলোনা। টেবিলের উপর ঝুঁকে রইলো সে, এক হাতে পেন্সিল এবং অন্য হাতে স্কেল। ডিজাইনটা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে গড়ে তুলছে সে। পাশেই রমণীর উপস্থিতি এবং তার শরীর থেকে ভেসে আসা সুমিষ্ট সুবাসটুকু মিসিরকে ভাসিয়ে নিলো স্মৃতির পাতায় বহু বছর পেছনে।

জায়দান তখন বুয়েটের শিক্ষার্থী। অপরদিকে মিসির একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচারের শিক্ষার্থী। পড়াশোনা সম্পর্কিত ব্যস্ততা এবং অন্যান্য কারণে সেই সময়টায় দুই বন্ধুর যোগাযোগ খানিকটা কমই হতো। তাছাড়া মিসির তখন নিজের বাবা মার সাথে যেখানে থাকতো, সেখান থেকে আরেফিন বাড়ি বেশ অনেক দূরত্বে ছিল। এমনি একটা সময়ে মিসিরের জীবনে আগমন ঘটে আরওয়া।

লাভ ইন ফার্স্ট সাইট বলে কিছু হয় নাকি, তা মিসির আজও জানেনা। তবে সেদিন রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে গান গাওয়ার সময় যে মেয়েটার সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল, তার মুখচ্ছবি সে ভুলতে পারেনি। মিসির আগে কখনো কোনো মেয়ের প্রতি এমন অনুভূতি অনুভব করেনি। মেয়েমানুষকে সম্মান করা বাদে যে ভালোও বাসা যায়, সেই ধারণাটা তার জন্য ছিল নতুন। জায়দানের সঙ্গে নিয়ম করে সপ্তাহে একবার দুবার দেখা হলেও লজ্জায় বলতে পারেনি সে কোনোদিন। তাছাড়া যে বন্ধুটা অনুভূতি বুঝতে হিমশিম খায়, তাকে এসব বলে লাভের লাভ কি হতো তাই ভেবে মিসির কুল পায়নি কোনোদিন।

আরওয়া মিসিরদের এলাকায় থাকতো। পাশাপাশি বিল্ডিং ছিল। কাছের একটা বেসরকারি কলেজে পড়াশোনা করত। কলেজ কাছাকাছি হওয়ার জন্যই নিজের বাড়ির বদলে এখানে চাচার বাসায় থাকতো। তার বড় চাচাতো ভাই ছিল আবার মিসিরের এলাকার ভাই ব্রাদার টাইপ বন্ধু। সেই সুবাদে আরওয়ার চাচার বাসায় হরহামেশাই যাতায়াত হতো তার। তখন আড়াল থেকে দেখতো, কিভাবে পর্দার ওপাশে সরে যাচ্ছে কাজল টানা অপূর্ব সুন্দর একজোড়া চোখ।

দিনকে দিন ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর পরিমাণ বাড়তে থাকে। কখনো রাস্তার মোড়ের ফুচকার স্টলে, কখনো বা বিল্ডিংয়ের ছাদে, কখনো আবার ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে একই রিকশায় তুলে নেয়ার মতন সহস্র মুহূর্ত আজও মিসিরের মনের মণিকোঠায় বন্দী। আরওয়া তখন তাকে ভাইয়া বলে ডাকতো। সেই ভাইয়া ডাকটা শুরুতে আদুরে লাগলেও পরে অসহনীয় হয়ে ওঠে। একদিন আইসক্রিম খেতে খেতে রেললাইনের ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে মিসির বলেই ফেলেছিল,

“আমাকে ভাইয়া বলে ডেকো না, প্লীজ।”

“তবে কি ডাকবো ভাইয়া?”

“মিসির। শুধু মিসির।”

সেই দিনটা কোনোদিন ভোলা সম্ভব না। কারণ ওই দিনের পরেই আমূল বদলে গিয়েছিল মিসির এবং আরওয়ার সম্পর্ক। মিসিরকে এতটাই ভরসা করা হতো, যে আরওয়ার চাচা প্রায়শঃই কলেজে পাঠানোর রাস্তায় মিসিরকে নিয়ে যেতে বলতেন। অত্যন্ত সাগ্রহে সেসব করতো মিসির। কারণ আরওয়ার সঙ্গে বেশি সময় কাটানো যেতো। মেয়েটাও কোনোদিন বারণ করেনি। বরং যখন রাস্তায় খুব বেশি ভিড় দেখত, মিসিরের হাতটাই শক্ত করে আঁকড়ে ধরত। অদ্ভুত জ্বালা ধরত মিসিরের বুকে। রাতের পর রাতের ঘুম তার হারাম হলো এক রমণীর স্বপ্নে। কিন্তু আরওয়ার বয়স তখন সতেরো। অপেক্ষা করল মিসির, নিদারুণ এক অপেক্ষা।

অবশেষে আরওয়ার এইচ এস সি রেজাল্টের দিন দুর্দান্ত ফলাফলের জন্য রীতিমত গোটা এলাকায় মিষ্টি বিলানো হলো। সেদিনের সেই সুখকর দিনটায় যখন বাসার সবাই উদযাপনে ব্যস্ত ছিল সকলে, তখন আরওয়ার হাতটা ধরে ছাদে নিয়ে গিয়েছিল মিসির। তার লতানো কব্জিতে প্রিয় রং বেরংয়ের কাঁচের চুড়ি গলিয়ে দিয়ে মিসির অত্যন্ত আবেগী কন্ঠে বলেছিল,

“ভালোবাসি, সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা।”

আরওয়া সেদিন কিছু বলেনি। শুধু লাল টকটকে গালে মুচকি হেসেছিল। ওই হাসিই বুঝি মিসিরকে সবকিছু জানিয়ে দিয়েছিল। পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তার সমস্ত অন্তর।

মিসিরের স্বপ্ন ভেঙেছিল ঠিক পরেরদিনই। হুট করেই আরওয়ার সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। চাচার বাসায় বাহানা নিয়ে গেলে বলা হতো, বাসায় নেই টাইপ কথা। এদিকে আরওয়ার চাচাতো ভাই, সেও কেমন মিসিরকে দেখলে তীক্ষ্ণ নজর দেয়া শুরু করলো। মিসির বুঝলোনা, সে দোষটা কি করেছে। অবশেষে একদিন আরওয়া এলো তার কাছে। ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে রাস্তার ধারে তাকে এক গলিতে ডেকে নিয়ে আরওয়া জানায়,

“আমাকে মাফ করবে। কিন্তু তোমাকে আমি একজন ভাইয়ের নজর ছাড়া অন্য কোনো নজরে দেখিনি মিসির। আমি তোমাকে ভালোবাসি ঠিক, কিন্তু একজন ভাইয়ের মতন ভালোবাসি।”

মিসির আজও জানেনা সেদিন ঠিক কেমন অনুভূতি সে অনুভব করেছিল। সত্যিটা পরবর্তীতে সামনে আসে তার। আরওয়া আরো এক বছর আগে থেকেই নিজের চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল! পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। আজ লজ্জা হয় সেসব কথা মনে করলে। অথচ মিসির আরওয়ার দুহাত ধরে কেঁদে অত্যন্ত আকুল হয়ে বলেছিল,

“প্লীজ আরওয়া, আমাকে দূরে সরিয়ে দিওনা। আমি আজীবন শুধু তোমার বন্ধু হয়েই থেকে যাব নাহয়। আমাকে শুধু তোমার একটুখানি কাছে থাকতে দিও?”

আরওয়া তাকে কাছে থাকতে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কেমনভাবে কাছে থাকা, তা মিসির ভাবলে নিজেকে নিজের ধিক্কার জানাতে ইচ্ছা হয়। ইডেনে ভর্তি হয়েছিল আরওয়া। একেকটা ফোনকলেই পাগলের মতন ছুটে যেত। কখনো আরওয়াকে সাবধানে দিয়ে আসত। কখনো বা নিজের ক্লাস বাদ দিয়ে হলেও তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসত। মাঝে মধ্যেই আবদার আসতো,

“মিসির। তুমি তো আর্কিটেকচার পড়ছ, জ্যামিতি ড্রয়িং ভালো পারো। আমাকে একটু এটা করে দেবে প্লীজ?”

“আমি না আজ একটা শার্ট কিনেছি। কিন্তু নিজের হাতে ওকে দিতে লজ্জা করছে। তুমি তো ওর বন্ধু। একটু দিয়ে দেবে প্লীজ? আর হ্যাঁ, দেয়ার পর বলবে, যেন এই নিয়ে বাসায় আমার রুমে এসে কোনো অসভ্যতামি না করে।”

“ওর খুব গেমিং পছন্দ। আমার তো ছেলেদের যন্ত্রপাতি সম্পর্কে বিশেষ ধারণা নেই। কালকে বার্থডে গিফট দেবো। চলো না মিসির, আমাকে কোনো ভালো শপে নিয়ে চলো।”

“সারাদিন এত মাইগ্রেনের ব্যথা ছিল! অ্যাসাইনমেন্টটা করা হয়নি। একটু করে দিতে পারবে মিসির?”

মিসিরের মুখ থেকে কোনোদিন না বোধক শব্দ বের হয়নি। কোনোদিন না। সে চাতক পাখির মতন এমন এক আশায় ছিল, যা কখনো পূরণ হওয়ার ছিলোনা। সে সারাটা জীবন, বছর বছর ধরে বিশ্বাস করে গিয়েছিল, একটা দিন আরওয়া তাকে বুঝবে। কোনো একদিন হয়ত আরওয়া তাকে ভালোবাসবে। চাচাতো ভাইয়ের সাথে ব্রেকআপও হয়ে গিয়েছিল আরওয়ার। মিসির অস্বীকার করতে পারবেনা। সে বেশ খুশীই হয়েছিল। আরওয়া যখন তার বুকে এসে কেঁদেকেটে একসা, তখন না পারতে মিসির কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল,

“এবার আমাকে ভালোবাসবে, নীলাঞ্জনা?”

সেদিন প্রথমবারের মতন আরওয়ার হাতের চড় হজম করেছিল মিসির। বিনা বাক্যে। ঠিকই ছিল আরওয়া। অমন মুহূর্তে কোন মেয়েই বা এমন আহাম্মকি কথা শুনতে চাইবে?

এরপরও কখনো আরওয়াকে ছেড়ে যেতে পারেনি মিসির। আরওয়ার যখন ঢাকা ভার্সিটির একটা ছেলের সঙ্গে দ্বিতীয় প্রণয় হলো, তখনো সে ছায়ার মতন অনুসরণ করে গিয়েছে আরওয়াকে। ছেলেটা তো মনেই করে ফেলেছিল, মিসির বোধ হয় আরওয়ার বড় ভাই হয়। শুরুর দিকের প্রত্যেক ডেটে মিসির থাকতো। নতুন প্রেম গভীর হলে ধীরে ধীরে মিসিরের দায়িত্ব কমে আসে। ওই এটা সেটা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, অ্যাসাইনমেন্ট, ড্রয়িং করে দেয়া, নিরাপদে ভার্সিটি পৌঁছে দেয়া নিয়ে আসা ইত্যাদি ইত্যাদি। মিসির যখন অত্যন্ত আবেগ নিয়ে আরওয়াকে জিজ্ঞেস করত,

“নীলাঞ্জনা, তোমার কি মনে হয়? আমাকে এক বিন্দু ভালোবাসা যায়?”

আরওয়া জবাব দিত হাসিমুখেই,

“তোমাকে তো আমি ভালোবাসি। বন্ধুর মতন।”

“আমি তোমার পুরুষের মতন ভালোবাসার কারণ হতে চাই।”

“সে জন্য তোমাকে অন্য কোনো মেয়ে দেখতে হবে যে!”

আরওয়া সত্যিই সিরিয়াস ছিল। নিজের কয়েকজন বান্ধবীর কথাও সে মিসিরকে বলেছে। বুয়েটে মিসিরের একজন ক্লাসমেটও ছিল, খুব সুন্দর একটা চিঠি এবং মিসিরের প্রিয় ডেইজি ফুল দিয়ে ভালোবাসার আবদার করেছিল। মিসির ফিরিয়ে দিয়েছে। আরওয়াকেও বলেছিল বিষয়টা, মেয়েটা রাগ হয়ে বলেছিল,

“তুমি এমনটা করলে কেনো? আপুটা তোমাকে কত্ত পছন্দ করে!”

সেদিন শুধু ফাঁপা হেসেছিল মিসির। নিজের ভালোবাসা বিলিয়ে দেয়া মেয়েটাকে দেখছিল প্রাণভরে। তার প্রিয় ফুল যে ডেইজি, কথাটা ওই কখনো কথা না বলা মেয়েটা জানলেও আরওয়া জানতো না। আজও জানেনা।

“মিসির?”

মোলায়েম কণ্ঠের ডাকটা কানে যেতেই স্মৃতির দুয়ার বন্ধ করে বাস্তবে ফিরে এলো মিসির। একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে টেবিল থেকে মুখ সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মুখোমুখি হলো আরওয়ার। না চাইতেও অবাধ্য নয়নজোড়া আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলো রমণীকে। গেঁথে ফেললো তার নারীসুলভ চিত্র অন্তরমাঝে।

“বসো আরওয়া। চা কফি দিতে বলি।”

মিসির বলতেই মাথা নাড়লো আরওয়া।

“উঁহু। আমি শুধু তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। একটা কথা বলার ছিল।”

“বলো তবে। শুনছি।”

“ধন্যবাদ।”

মিসিরের ভ্রু উঁচু হলো। হাতের স্কেল টেবিলে রেখে দিয়ে সে শুধালো,

“ধন্যবাদ কিসের জন্য?”

“তুমি যদি সাহস না দিতে, তাহলে হয়ত বা আমি আমার পরিবারের বিপক্ষে নিজের জন্য দাঁড়াতে পারতাম না। আর না পারতাম, জায়দান আরেফিনের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙতে।”

মৃদু হাসলো মিসির। নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে মাথা একবার একাত আরেকবার ওকাত করে বললো,

“ওয়েল, আমি ঠিক সম্পর্ক ভাঙার পক্ষপাতী নই। আমি শুধু বলেছি, ইউ শুড স্ট্যান্ড আপ ফর ইওরসেল্ফ। ব্যাপারটা পরিবারের বিপক্ষে যাওয়া কিংবা জায়দানের সঙ্গে সম্পর্কের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলোনা। ব্যাপারটা তোমার আত্মমর্যাদার ছিলো। তোমাকে পুতুলের মতন নিজ নিজ স্বার্থে সকলে ব্যবহার করছিলো। সেটাই বোঝাতে চেয়েছি। এনিওয়ে, থ্যাংক্স ফর দ্যা থ্যাংক্স।”

মীরা দীর্ঘ সময়ের জন্য মিসিরের মুখের দিকে চেয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ করে বলে উঠল,

“অতীতের সবকিছুর জন্যও তোমার থ্যাংক্স প্রাপ্য।”

জমে গেলো মিসির। দৃশ্যমানভাবে মৃদু কম্পন খেলে গেলো তার সমস্ত শরীরে। আরওয়ার চোখে চোখে তাকাতে পারলোনা সে। রমণী শুধালো,

“হাউ অ্যাবাউট আই টেইক ইউ টু লাঞ্চ টুডে?”

“শ..শিওর…”

অস্ফুটে স্বরে উচ্চারণ করলো মিসির। আরওয়া হঠাৎ করেই তার অত্যন্ত সন্নিকটে এসে দাঁড়ালো। আলতো করে নিজের ডান হাতটা রাখলো ঠিক মিসিরের বুকের উপর। না চাইতেও শিউরে উঠল মিসির।

“তোমার শরীর আজও আমার ছোঁয়ায় ঠিক একইভাবে প্রতিক্রিয়া করে।”

মৃদু গলায় বললো আরওয়া। মিসিরের হৃদপিন্ড জোরালোভাবে স্পন্দিত হয়ে চলেছে। বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে সে। আরওয়া মুখ তুলে তার নয়নে নয়ন মিলিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আজ তোমাকে ভালোবাসতে বলবেনা মিসির?”

ক্রিং ক্রিং।

মৃদু রিংটোনের আওয়াজে ভরে উঠলো গোটা কক্ষ। নিজের সম্মোহন থেকে বেরিয়ে আসলো মিসির। চটজলদি পকেটে হাত ভরলো। ফোনটা বের করে নিলো। কলার আইডিতে ভাসছে সাবিনের নাম। গলা খাঁকারি দিয়ে মিসির বললো,

“অ্যাহেম! এক্সকিউজ মি…হ্যালো সাবিন, বলো…”

দূরে সরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে লাগলো মিসির। আরওয়া নিজের স্থানে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে দেখে গেলো তাকে। জানালা গলে আসা সূর্যের সোনালী আলোয় রাঙা মিসিরের অবয়ব লাগছে বড্ড অপরূপ!

***
ঘড়ির কাঁটা ঠিক নয়ের ঘরে। আমি জানি, এক্ষুণি ভেতরে ঢুকবে সে। গোলাপী রঙের একটা কার্ডিগান এবং ঢোলা জামা পরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। হাতে মুনফ্লাওয়ারের বুকে। চুলগুলো পাতলা বেণী করে দুপাশে ঝুলিয়ে রেখেছি। ঠোঁটজুড়ে আমার বিরাট হাসি।

আমার ধারণা মিলেও গেলো। রাত ঠিক নয়টা বাজতেই বাসার দরজা খুলে গেলো। পিং পিং করে শব্দ হলো। অতঃপর ভেতরে পা রাখলো জায়দান। বাহুতে খুলে নেয়া কোট ঝুলছে, একটি হাতে একটা ব্রিফকেস যাতে খুব সম্ভবত ল্যাপটপ এবং স্টুডেন্টদের টেস্ট শিট আছে। খানিকটা পরিশ্রান্ত চেহারা। মাথা তুলে আমাকে দেখেই দরজায়ই থমকে গেলো সে। অত্যন্ত সুখের হাসি মেখে দেখলাম, আমার হাতে ফুল, জায়দানের অন্য হাতে আমার প্রিয় পেস্ট্রি শপের পেস্ট্রি।

“ওয়েল, স্বর্গের অপ্সরী আমার সংসারে নেমে এলো আজ? স্বর্গে ভালো লাগছেনা বুঝি, ম্যাডাম?”

খিলখিল করে হাসলাম। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম স্বামীর দিকে। জায়দান ততক্ষণে দরজা লক করে সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়িয়েছে, আমি তক্ষুণি তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুখ তুলে বললাম,

“অপ্সরী এক পুরুষের টানে স্বর্গ ছেড়ে সংসারে এসেছে। সে যে মানুষের প্রেমে পরে গিয়েছে!”

জায়দান পাশের শু ক্যাবিনেটের উপর নিজের জিনিসপত্রগুলো রেখে দুহাতে আমার কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে নিলো।

“এত ভালোবাসা আমি কোথায় রাখি আজ?”

“এইযে। ঠিক এখানে। তোমার বুকের বাম পাশে।”

“জায়গাটা খুব বেশি বড় নয়। এত ভালোবাসা ধরবে?”

“সকলের হৃদয় বড় হয় শুনেছি, তোমারটা এত ছোট কেন?”

“আমারটা ছোটই। শুধুমাত্র তুমি থাকলেই যে সবটা পরিপূর্ণ হয়ে যায়।”

লাজমাখা হেসে জায়দানের বুকে চাপড় দিয়ে তারপর ফুলের বুকেটা ঠেসে দিলাম।

“ওয়েলকাম হোম, মাই লাভ।”

ফুলের বুকে হাতে নিয়ে তাতে নাক ঠেকিয়ে বুঝি সুঘ্রাণ টানলো জায়দান। পরমুহুর্তে বললো,

“আজীবন দেখে এসেছি ছেলেরা মেয়েদের ফুল দেয়। আমার সংসারে দেখছি গোটাটাই উল্টো।”

“অবশ্যই। কারণ…”

জায়দানের গলা জড়িয়ে ধরে বললাম,

“ইউ আর মাই মুনফ্লাওয়ার।”

আমার মুখে বাক্যটি শুনে জায়দান নিজের অতি দূর্লভ হাসিটুকু হাসলো। আমার উপহার দেয়া ফুলের বুকেটা নিজের বুকে ধরে অন্য হাতে আমায় আরো কাছে টেনে মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,

“এতকিছু থাকতে মুনফ্লাওয়ারই কেন?”

রহস্যময় হাসলাম আমি। দুহাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে আদরমাখা কন্ঠে বললাম,

“মুনফ্লাওয়ার শুধুমাত্র রাতে ফোটে। যখন কেউ তার সৌন্দর্য্য দেখার সুযোগ পায়না। অথচ সে ফোটে, আপন মায়া ছড়িয়ে দেয় জগৎ জুড়ে। প্রভাতের সাথে তার অস্তিত্বও মিলিয়ে যায়। অথচ সে ছিলো, আছে এবং থেকে যাবে আজীবন, সৌন্দর্য্য লুকিয়ে শুধুমাত্র মায়া বিলিয়ে গোপনে। ঠিক তোমার মতন জায়দান।”

নির্বাক চেয়ে আমায় দেখে গেলো জায়দান, শুনে গেলো প্রতিটা শব্দ মন্ত্রের মতন। ফুলের বুকেতে চেপে বসলো তার লম্বাটে আঙুল, অতি যত্নে। ঝুঁকে আমার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে সে আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলল,

“তোমার মতন কারণে অকারণে ফুল উপহার দেয়া স্ত্রী প্রত্যেক স্বামীর হোক, মাই ওয়াইফ।”

হাসলাম আমি। জায়দানের ঘাড় চেপে তাকে নিচে নামিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করলাম,

“তোমার দোয়া কবুল হোক। আমাদের ভবিষ্যত ছেলেও এমন কোনো স্ত্রী পাক।”

থমকে গেলো জায়দান। স্পষ্টত দেখলাম তার ঠোঁট থেকে সূক্ষ্ম সেই হাসিটুকু সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গিয়েছে। ভালোবাসার মুহূর্তে সমাপ্তি টেনে সে সহসাই আমাকে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়াল। বাদামী চোখজোড়া লুকিয়ে গেলো আমার দৃষ্টি। কাটকাট গলায় বললো,

“তোমার জন্য পেস্ট্রি এনেছি। ফ্রেশ থাকতেই খেয়ে নাও। আমি বাইরের পোশাকটা বদলে আসি।”

ফুলের বুকেটা নিজের বুকে ধরে রেখেই জায়দান জুতা খুলে স্লিপার পায়ে গলিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে এগোলো। আমি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলাম তাকে। তারপর পিছন থেকে ডেকে উঠলাম,

“আমাদের সন্তানের কথা আসলেই তুমি আমায় এড়িয়ে যাও কেন, জায়দান?”

থামলোনা জায়দান। সোজা হেঁটে বেডরুমে ঢুকে গেলো। আমি পিছু পিছু গেলাম। ঢুকতেই দেখলাম ফুলগুলো বুকে থেকে খুলে অত্যন্ত যত্নে সে সাজিয়ে রাখছে নিজের বইভর্তি শেলফের ফুলদানিতে। আমার দিকে না তো তাকালো, না কোনো প্রতিক্রিয়া করলো। নীরবে কাজ শেষ করে ক্লোজেট থেকে তোয়ালে বের করে এরপর বাথরুমের দিকে এগোলো। আমি দ্রুত গিয়ে পিছন থেকে তার কব্জি পাকড়াও করলাম। আমার কন্ঠ সামান্য কাঁপলো,

“প্লীজ জায়দান। এভাবে সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট না দিয়ে একটুখানি বুঝিয়ে বলো? আমি কথা দিচ্ছি, আমি সবটুকু বুঝবো। শুধু এটুকু বলো, তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে?”

জায়দান নিজেকে ছাড়িয়ে নিলোনা, নড়লোও না। অথচ নির্বাক থাকলো। আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে তার দৃষ্টি খুঁজে জিজ্ঞেস করলাম,

“মাই লাভ? বলবেনা আমায়?”

জায়দান নিজের চোখ বুঁজে নিলো। বুঝি শক্তি সঞ্চয় করলো কথাটা বলার জন্য। অতঃপর যখন চোখ খুলে সে আমার দিকে তাকালো, তখন তার বাদামী চোখে আমি আর নমনীয়তা খুঁজে পেলাম না। বিনা দ্বিধায় সে এক বাক্যে বললো,

“আমি কখনো বাবা হতে চাইনা, সাবিন।”

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here