#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#পর্বসংখ্যা৪৮
#জাবিন_ফোরকান
নিস্তব্ধ পরিবেশ। শুধু হলদেটে ল্যাম্পশেড জ্বলছে রুমের ভেতরে। জায়দান বারান্দায় আরামকেদারায় আধশোয়া হয়ে আছে। চশমাটা খুলে হাতের তর্জনীতে ঝুলিয়ে রেখেছে। জ্বলজ্বলে বাদামী দৃষ্টি আবদ্ধ দূর আকাশে।
এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি এবং চা নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম আমি। ছোট টেবিলের উপর রেখে চুপটি করে বসলাম এক কোণায়। জায়দান এক পলক কফির দিকে চেয়ে বললো,
“কফি খেতে ইচ্ছা করছেনা।”
“তবে চা নাও?”
জায়দান নীরবে মাথা নেড়ে আবারো সুদূরে চেয়ে রইলো। চাঁদের অর্ধেক অংশ দ্যুতি ছড়াচ্ছে আকাশজুড়ে, বাকিটা মেঘের আড়ালে। খুব শীঘ্রই অমাবস্যা এসে জগৎকে ঢেকে ফেলবে আঁধারে। দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকলাম আমরা। কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই। নিজের চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে আমি কাপটা টেবিলে রেখে অবশেষে মুখ খুললাম।
“তুমি কেন বাবা হতে চাওনা, জায়দান?”
আমার প্রশ্নটা বুঝি স্বামীর প্রত্যাশিত ছিলো। কোনপ্রকার হেলদোল হলোনা তাই তার মাঝে। ওই একইভাবে নির্বিকার চেয়ে চাঁদ দেখতে দেখতে সে পাল্টা আমায় শুধালো,
“তোমার কাছে পিতৃত্ব কি?”
দ্বিধায় পড়ে গেলাম। পিতৃত্ব? এমন কঠিন গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আগে ভাবার প্রয়োজন পড়েনি। ড্যাডের কথা মনে পড়ে গেলো আমার। সঙ্গে সঙ্গে মনটা কেমন চুপসে এলো।
“একজন আদর্শ পিতা বলতে তুমি কি বোঝ?”
জায়দানের দ্বিতীয় প্রশ্ন আমাকে আরো ভাবুক করে তুললো। ড্যাড, আমার বাবা তাকদীর হুসেইন। তিনি কি একজন আদর্শ পিতা ছিলেন? আদর্শ পিতার মাপকাঠি আসলে কি? তিনি আমায় সব দিয়েছেন, তবুও আমি এমন উশৃঙ্খল হয়েছিলাম কিভাবে? দেনাপাওনার হিসাবটা কোথাও গিয়ে যেন মিলছে না। আমায় নিশ্চুপ দেখে জায়দান বুঝি সামান্য হাসলো। খেয়াল করতে পারলাম না, এর আগেই তার চোখেমুখে নির্বিকারতা ফিরে এলো।
“না তোমার ড্যাড একজন আদর্শ পিতা ছিলেন, না তো আমার আব্বু। সেক্ষেত্রে, আমরা দুজনই অজ্ঞ। অন্ধের শহরে আয়না বেঁচবে কিভাবে?”
“সব পিতাকেই কি আদর্শ হতে হয়?”
আমার প্রশ্নে কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা জায়দান। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বারান্দার রেলিং ধরে বাইরের দিকে ঝুঁকে ঠান্ডা বাতাস গায়ে মাখলাম। বলতে লাগলাম,
“কত শত পিতা এই সমাজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যারা সন্তানদের সবটা দিতে চাইলেও দিতে পারেননা। কেউ অর্থাভাবে, কেউ দায়িত্বের বোঝার কারণে। তারা কি আদর্শ পিতা নয়?”
ঘুরে দাঁড়ালাম, জায়দানের মুখটা খানিক ভাবুক দেখাচ্ছে এবার। এগিয়ে গেলাম কাছে পায়ে পায়ে।
“পিতৃত্ব কোনো মাপকাঠি দিয়ে মেপে হয়না জায়দান। এটা স্রেফ, হয়ে যায়। এইযে যেমন আমি। আমিও জানিনা মাতৃত্বের ভার বইতে পারবো কিনা। অথচ যখন আমাদের কোলে একটি সন্তান আসবে, দেখবে কেউ কিছু শিখিয়ে না দিলেও আমরা বুঝে নেবো। এটা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত ক্ষমতা। অনেক মানুষ হাজার শিখেও পারেনা। আবার অনেকে কিছু না জেনেও পেরে যায়।”
“আমি তাহলে ঐ না পারাদের দলে।”
ভ্রু কুঁচকে গেল আমার।
“কি বললে তুমি?”
জায়দান এবার সরাসরি তাকালো আমার দিকে।
“আমাদের এই সমাজের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা কি জানো? জন্ম দিলেই বাবা মা হওয়া যায় এই বিশ্বাস।”
স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম স্বামীর দিকে।
“শুধুমাত্র জন্ম দিয়েই যারা সন্তানদের প্রাইভেট প্রপার্টি মনে করে, তারা আর যাই হোক পিতা মাতা হতে পারেনা। একটা সন্তানের দায়িত্ব কত বিশাল তার ধারণা করাও কষ্টকর। একটি জীবনকে দুজন মিলে পৃথিবীতে আনা হয়, অতঃপর সামাজিক অনুশাসনের নামে তাকে খাঁচায় বন্দী করে ফেলা হয়। সন্তান আর দোকান থেকে কিনে আনা পাখির মাঝে পার্থক্য কি? কোনো পার্থক্য নেই।”
“তুমি নিশ্চয়ই তোমার সন্তানের সঙ্গে তেমন করবেনা জায়দান, তাইনা? তুমি যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছ, যে ভয়ানক সময়টা পার করে এসেছ সেটা তোমার অভিজ্ঞতা। আর তুমি অবশ্যই নিজের সন্তানকে সেই সবকিছু থেকে আগলে রাখবে।”
“যে সত্তা থেকে আমরা সর্বদা পালাতে চাই, একটা না একটা সময়ে গিয়ে আমরা সেই সত্তাতেই পরিণত হই।”
নির্বাক হয়ে রইলাম। শব্দ মেলাতে পারছিনা আর। জায়দান নির্লিপ্ত চেয়ে দেখলো আমায়। হাতের চশমাটা চোখে দিতে দিতে বললো,
“আমি যত যত্ন নিয়েই আমার সন্তানকে মানুষ করিনা কেন, জীবনের কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে তার সেসব যত্ন শৃঙ্খল মনে হবেনা তার গ্যারান্টি কি? সে ভরসার আশ্রয়ের বদলে যদি আমায় শাসক হিসাবে দেখে? যদি আমি না বুঝে কোনো জুলুম করে ফেলি তার উপর? আমার সন্তানের বদদোয়ায় আমি ধ্বংস হয়ে যাব, মাই ওয়াইফ!”
বুকটা কেমন চুপসে এলো। আর্দ্র অসহায়ত্ব চারিদিকে। জায়দানের ভয়টা অমূলক নয়। তার যুক্তিকে খন্ডন করার মতন পাল্টা যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিনা আমি। একটি হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে কপাল ডলতে ডলতে বললাম,
“সমাজের সবাই যদি তোমার মতন করে পিতৃত্বকে বিশাল দায়িত্ব হিসাবে ভাবতো, তাহলে অনেক সন্তানের জীবনটাই হয়ত আরো অনেক সহজ হয়ে যেত।”
“আমি ঝুঁকি নিতে চাইনা। যা কিছুর মধ্য দিয়ে আমি গিয়েছি, তার ছিটেফোঁটাও যদি অজান্তে আমার সন্তানের উপর এসে পড়ে, আমার সেখানেই মৃত্যু হবে।”
আরামকেদারা ছেড়ে উঠে পড়তে যাচ্ছিল জায়দান। অথচ আমি দিলাম না। এগিয়ে গিয়ে ধপাস করে তার কোলে উঠে বসলাম। আরামকেদারা দুলে উঠলো। ভারসাম্য রক্ষায় এক হাত টেবিলে এবং অন্য হাত আমার কোমরে রাখলো জায়দান। তার বুকে দুহাত চেপে ঝুঁকে কাছে সরলাম আমি। বরাবর তাকালাম ওই নয়নমাঝে।
“জায়দান। ধরো তুমি একা একা বিদেশ যেতে ভয় পেলে। তোমার লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে পড়া হলোনা। টরেন্টো থেকে পি এইচ ডি নেয়া হলোনা। তবে আজ তুমি কোথায় থাকতে?”
জায়দানকে খানিকটা দ্বিধান্বিত দেখালো। দুহাতই এবার আমার কোমরের দুপাশে রাখলো সে। তার উরুর উভয় পাশে হাঁটু রেখে বসে আছি আমি।
“তবে বুয়েট থেকে বেরিয়ে হয়ত আব্বুর কোম্পানিতে ঢুকে যেতাম। নয়ত অন্য কোথাও জব করতাম। তখন অবশ্য প্রফেসর হওয়া হতো না।”
“প্রফেসর না হয়ে তুমি খুশি থাকতে?”
“না। থাকতাম না। এটা আমার পছন্দের পেশা।”
মুচকি হাসলাম আমি।
“দেয়ার ইউ গো।”
সামান্য ভ্রু তুললো জায়দান।
“মানে?”
“এই দেখো জায়দান। তুমি যদি বিদেশে না যেতে, পি এইচ ডি না করতে তাহলে প্রফেসর পেশার প্রতি তোমার এত টান হতো না। তুমি তোমার আব্বুর কোম্পানিতেই থাকতে। তোমার চিন্তার বাইরের গন্ডিটা আর পার হওয়া হতো না। তুমি বলছ, তুমি খুশি থাকতে না। অথচ যদি তুমি উচ্চশিক্ষা অর্জন না করতে, কথাটা বলতে না। কারণ, তোমার ধারণায়ই থাকতো না এর অনুভূতি কেমন হয়। তুমি একবার এই জীবনের স্বাদ নিয়ে ফেলেছ বিধায় তুমি তুলনা করতে পারছো। তোমার অভিজ্ঞতা হয়েছে।”
জায়দান নীরবে চেয়ে রইলো আমার দিকে। দুহাত তুলে নিজের হাতের আজলায় তার মুখটা তুলে গভীর দৃষ্টি ফেলে বললাম,
“তুমি যে বাবা হতে ভয় পাচ্ছো, এই ব্যাপারটাও ঠিক তেমনি। তুমি জানোনা পিতৃত্ব কেমন হয়। শুধু অন্যদের দেখেছ। তোমার সামনে পিতার উদাহরণ হিসাবে যারা ছিল, তারা প্রত্যেকেই আদর্শ থেকে যোজন যোজন দূরের। এটাই তোমার মস্তিষ্কে পিতৃত্ব সম্পর্কে একটা নেগেটিভ ধারণা সৃষ্টি করেছে। তোমার মনে চাপ ফেলছে। অথচ যদি তুমি নিজে অভিজ্ঞতা নাও, তোমার আর সেই অভিযোগ থাকবেনা।”
জায়দানের ঠোঁটজোড়া সামান্য ফাঁক হলো। হয়ত সে প্রতিবাদ করতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষমেষ করলোনা। আমার কথাগুলো তার ভেতর ঢুকছে বুঝতে পেরে ঝুঁকে এসে ফাঁকা ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলাম আলতো করে। বেশ কতক শুষ্ক চুমু খেয়ে ব্যক্ত করলাম,
“তুমি যদি একা একা বিদেশ যাওয়ার সাহস না করতে, যদি হাড়খাটুনি খেটে পি এইচ ডি না করতে, যদি নিজেকে এতটা সুপুরুষ হিসাবে গড়ে না তুলতে, তবে তুমি কোনোদিন প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেনা। আজ তোমায় সকল মানুষ তোমার নামে চেনে। ড. জায়দান আরেফিন হিসাবে চেনে, জাফর আরেফিনের ছেলে হিসাবে নয়। আরেফিন নামটা ছাপিয়ে গিয়ে তুমি নিজের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করেছ। তুমি সাহস দেখিয়েছ, চেষ্টা করেছ বলেই সফল হয়েছ। যদি এই হবে, সেই হবে ভেবে ঘরের কোণায় বসে থাকতে, কিংবা বাবার কোম্পানির সহজ পথটা অনুসরণ করতে তবে এসব হতো বলো?”
একটি ঢোক গিললো জায়দান।
“পজিটিভ নেগেটিভ দুটোই হতে পারে মাই লাভ। তুমি হয়ত ভাবছো, সন্তানের সঙ্গে অবিচার করে ফেলবে। কিন্তু এর উল্টোটাও হতে পারে বলো? হয়ত দেখা গেলো, তোমার অতীত অভিজ্ঞতা তোমায় এক আদর্শ পিতায় পরিণত করলো? যা তুমি পাওনি, তার সবটা তুমি তোমার সন্তানকে দেবে। ভালোবাসা, যত্ন, বিশ্বাস, আশ্রয় সবকিছু। এরপরও সেই সন্তান তোমার প্রতি রুষ্ট হবে কি করে? মানুষ যদি ঝুঁকি না নিতো চাঁদে পৌঁছাতে পারতোনা, প্রযুক্তি আবিষ্কার হতনা, আকাশে প্লেন চলতো না, সাগরে সাবমেরিন চলতোনা। ঠিক তেমনভাবেই হয়ত যুদ্ধ হতো না, বো*মাবাজি হত না, দেশে দেশে মানুষ হ*ত্যা হতনা। পজিটিভ এ নেগেটিভ, দুটোই আছে। তুমি কোনটা বেছে নেবে, সেটা একান্তই তোমার উপর নির্ভরশীল।”
আমার মুখটা তুলে নিজের কাছে টেনে কপালে কপাল ঠেকালো জায়দান। চোখ বুঁজে তার অস্তিত্ব অনুভব করলাম। তার দুহাত আমার কোমর ছাপিয়ে উঠে এলো পিঠে। স্পর্শ করলো আমায় দারুণভাবে। গভীর কন্ঠে সে বললো,
“তোমার খুব মা হওয়ার ইচ্ছা?”
মোলায়েম হাসলাম আমি। জায়দানের নাকে নিজের নাক ঘষে আদুরে গলায় জবাব দিলাম,
“যতটা না নিজের মা হওয়ার ইচ্ছা তার চাইতেও বেশি তোমায় বাবা হিসাবে দেখার ইচ্ছা।”
অতি ক্ষীণ হাসলো জায়দান। মন্থর শব্দটি স্পষ্ট ভেসে এলো আমার কানে। আরামকেদারায় দুলছি উভয়ে একইসাথে। একে অপরের সাথে লেপ্টে। আমার কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁয়ে জায়দান ফিসফিস করে বলল,
“বড্ড গুছিয়ে কথা বলতে শিখেছ তুমি। এতটাই, যে আমাকে পর্যন্ত প্রভাবিত করে ফেলছ।”
“উম, তাই বুঝি? সবটা তোমার থেকেই তো শিখেছি!”
“ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল।”
“নো, ইন্টেলেকচুয়াল ব্ল্যাকমেইল।”
এবার আরেকটু জোরে শব্দ করে হাসলো জায়দান। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে আমায় দেখতে দেখতে বললো,
“সে ব্ল্যাকমেইল যখন করেই ফেলেছ তখন আর পিছিয়ে আসা যায়?”
“উঁহু। যায়না। বলো তাহলে। তুমি নিজের উপর বিশ্বাস রাখবে। কখনো নিজের পিতৃত্বের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না।”
একটি নিঃশ্বাস ফেলে মাথা দোলালো জায়দান।
“ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করবো।”
“চেষ্টা করবে না শুধু। তুমি পারবে। তুমি না জানলেও আমি জানি তুমি পারবেই!”
আমার কপালে ছড়িয়ে থাকা চুল অতি যত্নে কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে জায়দান বললো,
“এত ভালোবাসো আমায়?”
“খুব বেশি।”
“সবসময় পাশে থাকবে আমার?”
“পরকাল পর্যন্ত।”
আমার উত্তর শুনতেই জায়দানের চেহারায় অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি ভর করল। আর কোনো কথা না বলে মাথা তুলে আমার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো সে। দীর্ঘ সময় ধরে আলতোভাবে চুমু খেতে লাগলো আমায়। অতি ভালোবাসার আবেশে আমার চোখজোড়া বুঁজে এলো। দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলাম তাকে। প্রশস্ত পিঠজুড়ে বয়ে গেলো আমার স্পর্শ। বিপরীতে আমার পরনের কার্ডিগানের ভেতরে হাত প্রবেশ করিয়ে কোমরের ত্বকে স্পর্শ বোলাতে লাগলো জায়দান। স্নেহের মাঝে ধীরে ধীরে যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলতে লাগলাম। আমার দুহাত জায়দানের পিঠ ছাপিয়ে উঠে এলো বুকে। ছুঁয়ে দিলাম তার ত্বক। কেমন যেন গরম লাগলো, হালকা উত্তাপ। উত্তেজনার কারণে কি?
সামান্য একটু সরে এসে ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে তাকালাম আমি।
“তোমার শরীর এমন গরম কেন? জ্বর এসেছে?”
খানিকটা বিরক্ত হয়ে জায়দান বললো,
“না। এই উত্তাপের কারণ তুমি।”
পরক্ষণেই পুনরায় আমার ঠোঁট দখল করে ফেললো সে। মুচকি হাসলাম, স্নেহের বিনিময়ের মাঝে ফিসফিস করে শুধালাম,
“এই উত্তাপ কমবে কিভাবে?”
“তোমায় মন ভরে আদর করলে।”
ভীষণ লজ্জা লাগলো। মুখটা লালচে হয়ে উঠল। জায়দানের শরীরের উত্তাপ আমার গায়েও ঠেকলো। আমার ঠোঁট ছেড়ে ক্রমশ গলা এবং কাঁধে নেমে এলো প্রিয়তমের আদরের ছোঁয়া। ধীরে ধীরে খুলে গেলো আমার চুলের বাঁধন। শীতল বাতাসও আমাদের মাঝের তপ্ততাকে রুখতে পারলোনা। ক্ষণে ক্ষণে দুলে উঠলো আরামকেদারা, অথচ কেউই মুহূর্ত ভাঙতে আগ্রহী নই। একটা সময়ে আমি না পারতে আবেশিত গলায় বললাম,
“জায়দান…ভেতরে যাই…”
“হুশ…লেট মি লাভ ইউ লাইক আই ওয়ান্ট মাই ওয়াইফ।”
আমার হাতটি নিজের খোলা বুকে চেপে নিজের ভালোবাসার বিনিময় জারি রাখলো জায়দান। চোখ বুঁজে অনুভব করে গেলাম আমি তার হৃদস্পন্দন। আমার হাতের অনামিকায় জ্বলজ্বল করতে লাগলো স্বামীর দেয়া আংটি, আমাদের বাঁধনের প্রতীক, সারাটা সময়জুড়ে।
***
সময়টা পড়ন্ত বিকাল। ভার্সিটি থেকে হেঁটে হেঁটে বাসার দিকে এগোচ্ছে মীরা। আজ সব লোকাল বাসগুলো ভর্তি। কোথায় যেন কিসের এক ধর্মঘট, যানবাহনেও স্বল্পতা। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অধৈর্য্য হয়ে সে হাঁটা পথ ধরেছে।
ক্যাফেতে আজ সাবিন আছে। ওদিকে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষমেষ মেয়েটার অনুরোধেই বাদ দিয়েছে। সাবিন বলেছে সারাদিন ক্লাস করে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে যখন, বাসায় গিয়ে আগে বিশ্রাম নিক। আজ সে একাই সামলে নেবে। প্রায় রাতেই জায়দান বাইক নিয়ে এসে সাবিনকে বাসায় নিয়ে যায়। বিধায় খুব বেশি চিন্তা নেই। মীরা দ্রুত হাঁটতে লাগলো। পরনের হাঁটু অবধি লম্বা ফ্রক এবং মাথায় বাঁধা হিজাবের খোলা অংশ বায়ুতে দুলছে। বেশ ক্ষুধাও লেগেছে। পথে কিছু একটা কিনে নেবে কিনা ভাবলো।
ঠিক তখনি একটা রিকশা এসে থামলো মীরার পাশে। সে খেয়ালই করলোনা যতক্ষণ না রিকশা থেকে পরিচিত কণ্ঠের ডাকটা ভেসে আসে,
“গাড়ি পাওনি কোনো?”
জমে গেলো মীরা। ঝট করে মাথা তুলে তাকালো সামনে। রিকশার আসনে বসে আছে আয়দান। পরিপাটি একটা ফ্লানেলের শার্ট এবং টাখনুর উপরে তুলে রাখা ডার্ক জিন্স পরনে। মাথায় একটা সানক্যাপ, বাদামী চোখের দৃষ্টি উজ্জ্বল। কতদিন বাদে ছেলেটাকে আবার দেখেছে? মীরা হিসাব মেলাতে পারলোনা। তার আগেই আয়দান বললো,
“আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে বাসার সামনে নামিয়ে দেবো।”
“না। আমি চলে যেতে পারব।”
ইতস্তত করলো মীরা। পুনরায় হাঁটতে শুরু করলো। আয়দান আবারো বললো,
“আমার সঙ্গে যেতে অসুবিধা? অবিশ্বাস হচ্ছে? বেশ, এক কাজ করি। তুমি এই রিকশায় চলে যাও। মামা, ওকে মতিপাড়ার দুই নাম্বার গলির ভেতরে নিয়ে যাবেন।”
বলতে বলতে আয়দান সত্যিই নেমে যাচ্ছিল, তবে মীরা দিলোনা। দ্রুত এগিয়ে এসে জানালো,
“তোমার নামতে হবেনা।”
আয়দানকে নামতে না দিয়ে মীরা পা উঁচু করে রিকশায় উঠে বসলো। মোটর রিকশা হওয়ায় সিট বেশ বড়। আয়দান দুজনের মাঝে ইঞ্চি কয়েক দূরত্ব রেখে সরে বসলো। বিষয়টা কেন যেন বেশ ভালো লাগলো মীরার।
রিকশা চলতে শুরু করতেই বাতাস ঝাঁপটা দিয়ে গেলো। নিঃশব্দে এগোতে লাগলো বাহন। উভয়ই বাক্যহীন। আড়চোখে আয়দানকে খেয়াল করতে লাগলো মীরা। ভিন্ন দিকে চেয়ে আছে সে। একদমই সাধারণ ঘরের কোনো ছেলে মনে হচ্ছে। আগে পোশাকে, ব্যবহারে যে অদ্ভুত আধুনিকতা এবং চাকচিক্য থাকতো, সেটা অনেকটা কমে এসেছে। যার দরুণ তাকে বেশ বাস্তব লাগছে। মীরা কথা বলবেনা বলবেনা ভেবেও শেষমেষ জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার গাড়ি ফেলে রিকশা নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?”
মৃদু হাসলো আয়দান, যেন প্রশ্নটি প্রত্যাশিত ছিল।
“মতিপাড়ার ওদিকেই দুটো টিউশন আছে। ওদেরকে পড়াতে যাচ্ছি। গাড়ি নিয়ে টিউশন করতে গেলে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগবে না? তাছাড়া, গাড়িটা আমার নয়, আব্বুর।”
“তুমি টিউশন পড়াও? কবে থেকে?”
অবিশ্বাসের সীমা ছাড়িয়ে গেলো মীরার। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো পুরুষটির দিকে। আয়দান একগাল হেসে জবাব দিলো,
“এইতো। এই মাস থেকেই। কতকাল আর বাপের হোটেলে বসে খাবো? নিজের কিছু একটা করা দরকার তাইনা? হোক সে দুটো পয়সা, নিজের উপার্জন বলতে পারব। শিক্ষকতার চাইতে মহান পেশা তো আর হয়না।”
আগের আয়দান হলে এই কথাটি বলার আগে সে লজ্জায় মরে যেত। অথচ এই আয়দানের মাঝে তেমন কোনো সংকোচ নেই। মীরা আদতেই বিশ্বাস করতে অপারগ। মানুষ এতটাও পরিবর্তনশীল হয়?
সারাটা রাস্তা আর কথা হলোনা দুজনের মাঝে। রিকশা গলির মুখে এসে থামলো। আয়দান নিজের পকেট থেকে ভাড়া মিটিয়ে মীরার সঙ্গে এগোলো। এই বান্দা যে তাকে একেবারে বাড়ির গেট অবধি পৌঁছে দিয়েই তবেই ক্ষান্ত হবে বুঝতে বেগ পোহাতে হলোনা মীরার। দুজন এক হাত দুরত্ব মাঝে রেখে পাশাপাশি হেঁটে চললো। গোধূলীর আলোয় উদ্ভাসিত চারপাশ। এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
“কিছুক্ষণ বাদেই মাগরিবের আজান দেবে। টিউশনে গেলে নামাজ পড়বে কখন? আমি তোমায় দেরী করিয়ে দিচ্ছি।”
মীরা কেন বললো নিজেও জানেনা। তার কথায় আয়দানের ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি ফুটলো।
“আমি আর আমার দুজন স্টুডেন্ট একসাথেই মাগরিবের নামাজ পড়ি ওদের বাসায়। আমি ইমামতি করি তখন। আন্টি বেশ খুশীই। আমার বদৌলতে তার দুই ছেলে কয়েক ওয়াক্ত হলেও নামাজ পড়তে শিখছে।”
দীর্ঘ একটা প্রশ্বাস টানলো মীরা। জানেনা কেন হৃদয়ে উথাল পাথাল ঢেউ উঠলো তার। নিজেকে নিয়ন্ত্রনে বুকে হাত চাপলো সে। অন্য হাতে ব্যাগ চেপে বলে বসলো,
“তুমি ভীষণ বদলে গিয়েছ আয়দান, সত্যিই বদলে গিয়েছ।”
“হয়ত। শুধু বদলায়নি তোমার প্রতি আমার অনুভূতিটুকু।”
থামলো উভয়ে। মীরা টানা টানা চোখ মেলে দেখলো সুউচ্চ পুরুষটিকে।
“আমি তাঁর কাছে কোনোদিন তোমায় চাইনি, নিজের হেদায়াত চেয়েছি, যেন বাবার আগে তিনবার ‘মা’ শব্দ আসার মর্ম বুঝতে পারি।”
নিষ্পলক চেয়ে রইলো মীরা। আয়দানের চেহারায় গোধূলীর গাঢ় কমলাভ আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। অপরূপ এক নৈসর্গিক আহ্বান প্রকাশ পাচ্ছে যেন সুউচ্চ পুরুষটির অবয়ব ঘিরে।
“যদি ভুল করেও কোনোদিন তোমায় পেয়ে যাই, তবে তুমি আমার সঙ্গিনী হবেনা।”
মীরা ভ্রু তুলে শুধালো,
“তবে কি আমি?”
মৃদু হাসলো আয়দান,
“তুমি আমার আল্লাহর দেখানো নূরের পথ। যে পথ আমায় ইহজগতের মায়া ভুলিয়ে পরজগতের মায়ায় ফেলেছে।”
বুকের ভেতর ঠিক কেমন অনুভূতি হলো মীরা জানেনা। আয়দান মাথা ঘুরিয়ে স্থির তাকালো তার দিকে। বাদামী দৃষ্টিতে দেখা মিললো সুগভীর বিশুদ্ধ আবেগের। ভরাট গলায় কনিষ্ঠ আরেফিন পুত্র বললো,
“যেখানে সবাই ইশকের আশায় বিভোর, সেখানে আমি এক গারামে অনড়। হয়ত তুমি শাস্তি হতে চেয়েছিলে, পরিবর্তে আমার সুখময় যন্ত্রণা হয়ে গেলে। তুমি আমার গারাম মীরা, যে গারামের জ্বলনে আমি আমৃত্যু জ্বলতে প্রস্তুত।”
বাকরুদ্ধ চেয়ে অন্তরমাঝে ভীষণ ঘূর্ণিপাক অনুভব করা ছাড়া মীরা আর কিছুই করতে পারলোনা।
***
জায়দানের গতকাল সত্যিই জ্বর হয়েছিল। আমার হাজার বারণ সত্ত্বেও জরুরী কাজ আছে বলে সে ঠিকই ভার্সিটিতে চলে গিয়েছে। জ্বরটা অতিরিক্ত নয়। তাই খানিকটা দুশ্চিন্তামুক্ত থাকলেও বিষয়টাকে আমি একদম ছেড়ে দিচ্ছিনা। ক্যাফে থেকে বাসায় ফিরেই তাই ঝটপট চিকেন স্যুপ এবং ব্রেড বেক করে রাখলাম। দুপুরের কিছু খাবার আছে, সেগুলো গরম করে নেয়া যাবে। কিছুক্ষণ আগেই জায়দানকে টেক্সট করেছি। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যাবে সে।
হেঁটে প্যান্ট্রি রুমে এলাম। মেডিসিনের ক্যাবিনেট থেকে বেছে বেছে জ্বরের ওষুধ খুঁজতে লাগলাম। নাগাল না পাওয়ায় শেষমেষ টুল এনে সেটার উপর দাঁড়িয়ে সব হাতাহাতি করতে লাগলাম। অসংখ্য বক্স, অসংখ্য জিনিস। এত ওষুধ বাসায় রাখার মানে হয়? ভাবতে ভাবতে যখন আমি সবকিছু ঘাঁটছি, তখনি বেখেয়ালে হাত লেগে হুড়মুড় করে ওষুধের কৌটাগুলো সব গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। লাফিয়ে নামলাম।
“ইশ! কাজ হয়েছে!”
ঝুঁকে ওষুধের কৌটোগুলো তুলতে গিয়েই জিনিসটা নজরে এলো। একটা মোটা খামের মতন। ওষুধের মাঝে খাম কি করছে বুঝতে না পেরে হাতে নিলাম। খামটা খোলাই। বিশেষ ব্যবস্থায় আটকানো নেই। ভ্রু কুঁচকে সেটা ঝাঁকাতেই ভেতর থেকে বেশ কয়েক পাতা ভাঁজ করা কাগজ আমার হাতের তালুতে এসে পড়ল। বিস্ময় চরমে উঠলো আমার। চিঠি নাকি? এই যুগে ঘরের ভেতর মেডিসিনের সঙ্গে চিঠি? অবাক ভাবটা চেপে ভাঁজ খুলতে লাগলাম। শুরুতেই আমার চোখ পড়ল একেবারে শেষের দিকের একটি লাইনে। যা আমার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
॥ শুধু একটাই স্বার্থপর অনুরোধ থাকবে। তোমার কবরের স্থানটা যেন আমার কবরের পাশেই হয় ॥
বুকটা থেমে গেলো। সমস্ত পৃথিবীটা বুঝি চক্কর দিয়ে উঠল চোখের সামনেই। গোটা গোটা হাতের অক্ষর, অভূতপূর্ব লেখনশৈলী, অতি যত্নে লিখিত প্রতিটি বর্ণ। আমার খুব চেনা। খুব!
এটা জায়দানের চিঠি। এবং খামের পিছনে জ্বলজ্বলে অক্ষরে লিখিত প্রাপক….
“টু মাই বিলাভড ওয়াইফ, হোয়েন ইউ ফাইনালি ফাইন্ড ইট…”
_________চলবে_________
[ ♥️নোট: আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এখানে কিছু বিষয় সম্পর্কে বলব না। স্পয়লার দেয়ার পর অনেকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন গারাম মানে কি। এর উত্তর আমি দেব না। গুগল দেখুন, চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করুন। উত্তরটা খুঁজে নিয়ে বুঝে নিন। এখানেই পড়ার আনন্দ। আর অনেকদিন যাবৎ পেইজে অ্যাকটিভিটি নেই বিধায় এই পোস্ট সামনে গেলে রিয়েক্ট কমেন্ট করার চেষ্টা করবেন, আমার রিচ ফেরত আনতে সুবিধা হবে। ভালোবাসা। 💕
শেষে সারপ্রাইজ মোবারক!👉🏻👈🏻 ]

