সমাপ্তির_ওপাড়ে #জাবিন_ফোরকান #পর্বসংখ্যা৪৯

0
2

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৯

॥ মাই ডিয়ার ওয়াইফ,

আমি জানিনা এই চিঠি তোমার হাতে আমার মৃত্যুর আগে পৌঁছাবে নাকি পরে। সেটা আমি ভাগ্যের হাতেই ছেড়ে দিয়েছি।

আমি এমন একটা মানুষ, যার বুকে হাজারো কথা সাজানো থাকলেও কন্ঠ বেয়ে বেরোতে পারে খুব কম শব্দরা। আমি তোমাকে যা বলতে চাই, তা কোনোদিন তোমার সামনে দাঁড়িয়ে বীরপুরুষের মতন শিরদাঁড়া টানটান করে চোখে চোখ রেখে বলা সম্ভব না। তাই আমি কাপুরুষের পথ বেছে নিয়েছি। এই চিঠি।

আমি যখন লিখছি, তখন তুমি আমার কোলেই মাথা রেখে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছো। এইতো, মাত্র দুদিন হলো আমাদের ছোট্ট সংসারটার বয়স। অথচ আমার মনে হয় যেন কতকাল ধরে আমি তোমার মাঝেই আমার নীড় খুঁজে নিয়েছি। আমার উরুতে মাথা রেখে তুমি ঘুমাচ্ছ। তোমার চুলে আমার বাম হাতের আঙ্গুল খেলে যাচ্ছে। কি মসৃণ! তোমার শরীরে লেপ্টে থাকা আপন আপন গন্ধটা আমার নাকে এসে ঠেকছে। ইচ্ছা হচ্ছে তোমার বুকে মুখ ডুবিয়ে চোখ বুঁজে শান্তি অনুভব করি। করব, কিছুক্ষণ পরেই। আগে চিঠিটা শেষ করে নেই।

যে কথাগুলো তোমাকে কখনো বলা হয়নি সেগুলো দিয়েই শুরু করি? তোমায় আমি প্রথম দেখেছিলাম শহীদ মিনারে। একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল সেদিন। হাজারো মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছিল ভাষা শহীদদের। আমি সবে বাংলাদেশে ফিরেছি। মিসির আবদার করলো, শহীদ মিনারে ফুল দেবে। গেলাম আমি। এত ভীড় যে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মেঝে জুড়ে আলপনা দেয়া হয়েছিল, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। তখনি আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গেলো এক রমণী এবং তার বন্ধুর দল। রমণীর পরনে ছিল একটা হাঁটু অবধি লম্বা কালো কুর্তি আর কালো জিন্স। আধুনিক এবং বাঙালিয়ানার মিশেলে বেশভূষা। তবে আমায় আকৃষ্ট করেছিল তার ঘন কালো লম্বা চুলের গোছা। নাকের ডগায় জ্বলজ্বল করছিল ছোট্ট একটি নথ। হাতে একগোছা সাদা গোলাপ। তেমন আহামরি কিছুই ছিলোনা। তবে কেন তাকিয়েছিলাম নিজেও জানিনা। বিশ্বাস করো, আমি কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে এমন করে তাকাইনি। সংকোচ বোধ করে অবশ্য দ্রুতই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।

সেই রমণীকে একই স্থানে দ্বিতীয়বার দেখেছিলাম ফিরে আসার সময়ে। ফুল দেয়ার পর যখন বেরিয়ে মিসির আর আমি গাড়ির দিকে হাঁটছিলাম, তখন মাঝ রাস্তায় হট্টগোল। এগিয়ে গিয়ে দেখেছিলাম একটা ঝামেলা বেঁধেছে। কোনো এক নেতার নাতি এক মেয়ের সঙ্গে অসভ্যতামি করছিল। এমন একটা দিনে! ভাবা যায়? অথচ কোনো প্রতিবাদ ছিলোনা। নেতা, ক্ষমতা, পুরুষ মানুষের বিপক্ষে গলাবাজি করবে এমন নষ্ট মাথা কারো নয়। অথচ একজনের মাথা নষ্ট ছিল। সেই রমণী। আমার স্পষ্ট মনে আছে। ছেলেটার বুক বরাবর লাথি দিয়ে গাড়ির বনেটে ফেলেছিল সে। কলার টেনে ধরে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে অকথ্য গালাগাল করেছিল।

“তুই আমার নানারে চিনস মাইয়া? তোরে এক্কেবারে ভইরা দিমু বেডি!”

ক্ষমতাধর নেতার ছেলের হুমকির বিপরীতে রমণী পাল্টা হেসে বলেছিল,

“ভরতে আসিস। শুধু তোর কেন? তোর নানার পিছনটাও লাল বানিয়ে ছেড়ে দেব, কুত্তার নাতি শুয়োর!”

আমার আশেপাশের সব মুরুব্বী গোছের মানুষগুলো বলাবলি করছিল, একটা বেয়াদব মেয়ে। ছেলেদের স্বভাব গালিবাজি করা, তাই বলে একটা মেয়েও তাল মিলিয়ে একই কাজ করবে? আশ্চর্য!

অথচ আমি ওই রমণীর বেয়াদবি দেখছিলাম প্রাণভরে যতক্ষণ না মিসির আমায় টেনে নিয়ে আসে।

স্মৃতিটুকু স্মৃতি হয়েই ছিল। অতঃপর আমার আব্বু ডেকে পাঠালেন আমায়। আমাকে নিজের জামাই বানাতে ইচ্ছুক আব্বুর ব্যবসায়িক বন্ধু, তাকদীর হুসেইন। মানা করার কোনো কারণ ছিলোনা। নিজের ইচ্ছা, মর্জি বলতে যে কিছু হয়, তাও জানতাম না। বিয়ের বয়স তো হয়েছিল। আব্বুর কথাই শিরোধার্য। রাজী হয়ে গেলাম। বিশ্বাস করো, যেদিন জানতে পেরেছিলাম আমার স্ত্রী হবে তুমি, সেদিন আমিও বেশ অবাক হয়েছিলাম। সেই বেয়াদব রমণীর সঙ্গেই আমার জীবন বাঁধা পরে যাচ্ছে, বিষয়টা খুব একটা খারাপ লাগছিল না। তখন বুঝতে পারিনি, আমার সমস্ত সত্তাটাই উলোট পালট হয়ে যাবে সামনে।

আমি স্বামী হিসাবে কেমন ছিলাম জানিনা। সেটা তুমিই ভালো বলতে পারবে। অস্বীকার করব না। শুরুতে সবটা আমি দায়িত্ব হিসাবেই করতাম। তুমি আমার স্ত্রী ছিলে, স্ত্রীর সঙ্গে এমন করতে হয়, তাকে এভাবে আগলে রাখতে হয়, ওভাবে তার যত্ন নিতে হয়, এমন পুঁথিগত ধারণা থেকেই আমি তোমার সঙ্গে চলতাম। তবে আমি বেশ মজা পেতাম। তুমি রান্না জানতে না। ক্লান্ত হয়ে সোফায় ঘুমিয়ে থাকতে। আমায় অপছন্দ করা সত্ত্বেও আমি বাসায় ফিরলেই আমার পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করতে বিড়ালছানার মতন। রাতে আমি স্টাডিরুমে থাকলে কম্বল গায়ে জড়িয়ে ভূত সেজে ভয় দেখাতে চাইতে। কখনো বা কাতুকুতু দিয়ে আমায় হাসানোর চেষ্টা করতে। তখন আমি অনুভূতি বুঝতাম না বিধায় তোমাকে উপলব্ধি করাতে পারিনি, তোমার ছোট ছোট সেই আবেদনগুলো আমার কতটা ভালো লাগতো! তুমি সোফায় ঘুমিয়ে গেলে আমি তোমায় কোলে তুলে বেডরুমে নিয়ে আসতাম। বুকে ধরে বসে থাকতাম যতক্ষণ সম্ভব হতো। তুমি ভয় দেখানোর চেষ্টা করলে প্রতিক্রিয়া করতাম না, কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার পর ঠিকই মুহূর্তটুকু বারংবার মনে করতাম। খুব মজা লাগতো ভেতরে ভেতরে। আমার মনে হতো যেন একটা বাচ্চাকে মানুষ করছি আমি। আমাকে ঘিরেই যার গোটা পৃথিবী ঘুরপাক খায়। অথচ এটা যে ভালো লাগার অনুভূতি, সেটা বোঝার সামর্থ্য আমার তখন ছিলোনা।

ঠিক কবে যে তুমি আমার দায়িত্ব থেকে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়ে গেলে আমি নিজেও টের পাইনি। সকলে বলতো তুমি উশৃঙ্খল, তুমি বেয়াদব, তুমি বড়লোক বাবার দেয়া অতিরিক্ত স্বাধীনতায় বিগড়ে গিয়েছ। অথচ আমার এই বিগড়ানো তুমিটাকেই ভালো লাগতো। এখনো লাগে। তোমাকে আগেই বলেছি, আমার তোমার বেয়াদবিটাই সবথেকে বেশি পছন্দ! আমি যেমন করে একটা বাচ্চাকে মানুষ করছিলাম, তেমন করে বাচ্চাটাও বুঝি আমায় আগলে রাখছিল। তথাকথিত ভদ্রতা দেখিয়ে যে অধিকার আমি হাসিল করতে পারিনি, তুমি সেই অধিকারগুলোই জোর খাটিয়ে বেয়াদবি করে ছিনিয়ে আনতে লাগলে। তুমি আমায় নিজের জীবনের বটবৃক্ষের ছায়া ভাবতে ভাবতে কবে যে আমার জীবনের বটবৃক্ষে পরিণত হয়ে গেলে, তা নিজেও জানো না বোধ হয়। তোমার মতন করে কেউ কোনোদিন আমাকে আগলে রাখেনি, মাই ওয়াইফ। কেউ কোনোদিন ভাবেনি, আমার আম্মু আমার ছোট ভাইকে এত ভালোবাসা দেখালে আমার কষ্ট হয়। কেউ বুঝতে চায়নি, আমারও হয়ত খারাপ লাগা কাজ করতে পারে। আমি নিজেকে অনুভূতিহীন করে ফেলেছিলাম এসব থেকে বাঁচতে। অথচ তুমি এসে আমার জন্য লড়াই শুরু করলে। আমার হক আদায়ের জন্য উঠে পড়ে লাগলে। আমার নিজের আব্বু আম্মুকেও আপন মনে হয়নি কোনোদিন। অথচ দেখ, তোমার কাছে গেলেই আমি আপন আপন গন্ধটা টের পাই! আমার জীবনে যদি পরিবার বলে কিছু থেকেই থাকে, সেটা একমাত্র তুমিই ছিলে, আছে এবং আজীবন থাকবে।

স্বামী স্ত্রীর হালাল সম্পর্কের মাঝে নাকি আল্লাহর বরকত থাকে। সেই কারণেই হোক কিংবা তোমার চরিত্রের কারণে, আমি তোমাতে আসক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ছিলে আমার সবথেকে প্রিয় অভ্যাস। যে অভ্যাস ত্যাগে আগে ধ্বংস হতে হতো আমায়। তাই কোনোদিন তোমায় ত্যাগ করতে পারিনি। অথচ প্রতিনিয়ত দেখতাম, কিভাবে নামমাত্র সংসারের যাঁতাকলে পিষে যাচ্ছ তুমি। সেদিন তোমার মুক্তির জন্য আহাজারি আমি সইতে পারিনি। এমন এক মেরুদণ্ডহীন কাপুরুষ ছিলাম, না তোমায় বুকে চেপে শান্তনা দিতে পেরেছি, না মাথা উঁচু করে তোমার জন্য লড়াই করতে পেরেছি। তুমি আমার সবকিছু হলে হবে কি? আমি তোমার কিছু ছিলাম না। যাকে তুমি বটবৃক্ষ মনে করেছিলে, সেই তোমার সুখের পথে বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। এই জটিলতা তুমি ডিজার্ভ করোনা। আমি এক শৃঙ্খলিত পুরুষ ছিলাম, যাকে শাসন করত তার মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। স্বামী হওয়ার আগে আমি একজন ছেলে হতে চেয়েছিলাম। এমন পুরুষ তোমার যোগ্য নয়। তাই তোমায় মুক্তি দেই। সেই অমোঘ মুক্তি, যা তুমি শুরু থেকে চেয়ে এসেছিলে।

অথচ, সেটাও শেষমেষ পারিনি। তুমি আমার নিকোটিন, যে নিকোটিনের আসক্তি আমায় দাস বানিয়ে ফেলেছিল। মুক্তি দেয়ার বেলায়ও তাই একটা খুঁত রেখে দিলাম। ইচ্ছা করে, জেনে বুঝে। তোমাকে আমি আইনিভাবে ডিভোর্স দিলেও ধর্মীয়ভাবে তালাক দিলাম না। তুমি প্রশ্ন করনি। আমিও গোপন রেখেছি। কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর হাতড়ালে নিজেও খুঁজে পাইনা। আমি কি আশা করেছিলাম ভবিষ্যতে আমরা আবারো মুখোমুখি হবো? সে আশা করে থাকলে কি একটা গোটা বছর তোমায় না দেখে দূরে থাকতে পারতাম? জানা নেই আমার। তখনকার জায়দান কি ভাবছিল সেটা এখনকার জায়দানের কাছেও রহস্য।

অনেক কথা ঘুরিয়ে ফেলছি। লিখতে পারছিনা ঠিকমত। হাত কাঁপছে। আজকাল এমনটা সবসময়ই হয়। কিন্তু এই চিঠিটা আমার আজকেই শেষ করতে হবে। জানিনা, কালকের সূর্যের আলো আমার আর দেখা হবে কিনা!

এতকিছু লিখার কারণ ছিল তোমাকে বোঝানো, যে তুমি আমার কাছে কোনোকালেই অপ্রয়োজনীয় কিংবা ফেলনা ছিলে না। আমার অনুভূতি বুঝতে না পারা মস্তিষ্ক এবং হৃদয় কোনোটাই সেকালে উপলব্ধি করেনি আমার জীবনে তোমার বিচরণ কতখানি। তোমার সঙ্গে নতুনভাবে দেখা হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেকে খুঁজে পেয়েছি আমি। হাজারো উপলব্ধি হানা দিয়েছে তখন। আমাকে বুঝিয়েছে, আমি তোমার মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম। হ্যাঁ, মায়া। ঠিক যেমন তুমি বলেছিলে তুমি আমার মায়া কাটাতে পারছনা, তেমন করেই আমি কোনোদিন তোমার মায়া কাটাতে পারিনি সাবিন। আমার সবটা জুড়েই তুমি। এই উপলব্ধি হতে আমার অর্ধেকটা জীবন পার হয়ে গেলো।

তারা এটাকে ভালোবাসা বলে। আমি জানিনা, এই ভালোবাসা শব্দটা ঠিক কতটুকু অর্থ বহন করে। আজকাল তো হরহামেশাই হুটহাট একেকজন বলে বসে ‘ভালোবাসি’। অথচ মানুষটাকে সম্পূর্ণ ভুলে নতুনভাবে এগোতে কারো দুই দিনও প্রয়োজন হয়না। আমি বিশ্বাস করি, তোমার প্রতি আমার যে অনুভূতি, সেটা বিশ্লেষণ করার জন্য এই পৃথিবীতে আদতে কোনো শব্দ আবিষ্কার হয়নি। এজন্যই আমার ব্যথাটা সবথেকে বেশি। কারণ, এমন কিছু ফেলে রেখে আমার যেতে ইচ্ছা হচ্ছেনা সাবিন! কিন্তু, আমাকে যেতে হবে। এবার আমাকে সত্যিই তোমায় ছেড়ে বহু দূরে চলে যেতে হবে, মাই ওয়াইফ।

তুমি মাত্রই নড়েচড়ে উঠলে। এইযে, আমি আবারও তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই একদম শিশুটি হয়ে আমার বাম হাতটা জড়িয়ে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলে। এইযে আমি ঝুঁকছি, তোমার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে আদরের চুমু খাচ্ছি। তোমার গাল দুটো ভীষণ নরম, মুখ ডুবিয়ে বসে আছি। ইচ্ছা হচ্ছেনা ছেড়ে দেই। কবরে আমি এসব কিভাবে পাবো?

আমি জেনেছিলাম আম্মুর স্ট্রোকের ঠিক দুদিন আগে। মনে আছে তোমার? কিভাবে আমার পা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেছিলে? আমার ভেতরের সবকিছু দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। নিজেকে জগতের সবথেকে নিষ্ঠুর প্রাণী মনে হচ্ছিল। ভীষণ হৃদয়হীন হয়ে আমি তোমায় অন্তিমবারের মতন দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম। তোমার জীবনে পুনরায় ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম। কারণ, তুমি এই জায়দানকে ডিজার্ভ করোনা। এই ভগ্ন পুরুষ, যার আয়ু খুব দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে।

আমি ‘অ্যাপলাস্টিক অ্যানেমিয়া’ নামক রোগে আক্রান্ত। সহজ ভাষায় সবাই সেটাকে বোন ম্যারো ফেইলিয়র হিসাবে চেনে। যখন এই চিঠি লিখছি, তখন আমি সেকেন্ড স্টেজে প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ, আমার হাতে সময় খুব কম। আমার কোনো ডোনার নেই। আব্বু, আম্মু, আয়দান, কেউই জানেনা। মিসিরটাও জানেনা। একবার আমার ব্লি*ডিং বন্ধ হচ্ছেনা দেখে প্রশ্ন করেছিল, বুঝতে দেইনি। আমি কারো অনুদান নিয়ে বাঁচতে চাইনা। বিশেষ করে সেই মানুষগুলোর, যাদের আমি পরিবার বলে বিবেচনা করিনা। হয়ত তুমিও জানতে না আমার মৃত্যুর আগ অবধি। অথচ, হেয়ার আই অ্যাম, রাইটিং দিস লেটার টু ইউ। তোমার সঙ্গে আমি বহু অন্যায় করেছি। সেখানে আর একটা অন্যায় যুক্ত করতে চাচ্ছিনা।

আমি খুব স্বার্থপর মাই ওয়াইফ। সবকিছু জানা সত্ত্বেও নতুনভাবে তোমাকে নিজের জীবনে জড়িয়েছি। সেদিন হাসপাতালের সামনে তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে ভেবেছিলাম, ভবিষ্যতে আগত যন্ত্রণা থেকে তোমায় বাঁচিয়ে নিলাম। আমায় ভুলে থাকলে তুমি খুশি থাকবে। আমি ছাড়া জীবনে চলতে শিখলে আমার চলে যাওয়ায় তোমার খুব বেশি কষ্ট হবেনা। একদিন দুদিন কাঁদতে পারো, পরে সব ঠিক হয়ে যেতো। অথচ দেখো, আমি স্বার্থপরের মতন পাশার দান উল্টে বসে আছি। তুমি যখন কি*ডন্যাপড হলে, তখন আমি দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলেছিলাম। দাউদাউ বহ্নিশিখার মাঝে সেদিন তোমায় দেখে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি। বহু বছর আগে একটা কথা শুনেছিলাম। মানুষ নাকি সবথেকে বেশি বাঁচতে চায় ঠিক মৃত্যুর আগে। আমিও লোভী হয়ে গিয়েছিলাম। একটাবার তোমার সঙ্গে সংসার না করতে পারার আফসোস আমায় মরার আগেই মেরে ফেলতো। তাই স্বার্থপরের মতন একটা কাজ করে বসলাম। তোমাকে আমার জীবনে আবারো টেনে আনলাম। যা কিছু আমি তোমায় কোনোদিন দিতে পারিনি, তার সবটা দেয়ার ওয়াদা করলাম নিজের কাছে। পরিণতি, আমাদের এই নতুন সংসার। আমি জানি, একদিন সবকিছু ছেড়ে তোমায় কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে আমি চলে যাব। সেই দিনটা শীঘ্রই আসন্ন। তবুও নিজেকে আর রুখতে পারলাম না। ঐযে বললাম? বড্ড স্বার্থপর কিনা আমি!

আমি এখন যা লিখছি, তা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়বে সাবিন। বসুন্ধরা সিটির এই অ্যাপার্টমেন্টটা তোমার, আমি তোমার নামে কিনেছি। আমার যাবতীয় সকল সম্পদ আমি তোমার নামে করে যাব। দলিল, কাগজপত্র তুমি ক্লজেটের নিচে যে সিন্দুক আছে, যেটাকে তুমি আমার কনফিডেন্সিয়াল পেপার রাখার জায়গা ভাব, সেখানেই আছে। চাবি আমার ওয়ালেটে পেয়ে যাবে। যাওয়ার আগে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো, যেন ড্যাডের সকল সম্পদ তুমি ফিরে পাও। তুমিই সেসবের দাবীদার। তবে তা না হলেও তোমার ভবিষ্যতে সমস্যা হবেনা। আমি যথেষ্ট রেখে যাচ্ছি। একটা অনুরোধ করি? আমাদের যে তালাক হয়নি, এই তথ্যটা গোপনই রেখো। সমাজ ভাবে আমরা ডিভোর্সড। তাই ভাবতে দাও। আমি চলে যাওয়ার পরে যদি কখনো মনে হয়, জীবনে কাউকে দরকার, তাহলে নির্দ্বিধায় নতুন জীবন সাজিয়ে নিও, কেমন? জীবনটা অনেক দীর্ঘ, একাকী পথ চলা বড্ড কঠিন। আমি চাইনা তুমি সেই পথে যাও। নতুন কাউকে নিয়ে ঘর বেঁধ। তবে, যেহেতু আমি স্বার্থপর, তাই আমার শুধু একটাই স্বার্থপর অনুরোধ থাকবে। তোমার কবরের স্থানটা যেন আমার কবরের পাশেই হয়। আমার শুধু তোমার কবরের অধিকারটুকু চাই, মাই বিলাভড ওয়াইফ।

এবার সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে। লিখতে গিয়ে কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। তোমাকে কোল থেকে তুলে বুকে ঠেকালাম একমাত্র। তুমি একদম লেপ্টে গেলে আমার বুকে। খুব আদর লাগছে আমার। তোমার মুখে অসংখ্য চুমু দিলাম। ঘুমের ঘোরে হাসছো তুমি। বোধ হয় ভাবছো, কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখছ। আমি এরপর থেকে সত্যিই তোমার জীবনের স্বপ্ন হয়ে যাব। বিষয়টা ঠিক কেমন অনুভব করাচ্ছে আমায়, জানিনা। শুধু এটুকু জানি, আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে চাইনা। আমি তোমার সঙ্গে আরও হাজার বছর বাঁচতে চাই! তোমার সঙ্গে আমার কত মুহূর্ত গড়া বাকি! কত কথা বলা বাকি! কত রাত কাটানো বাকি! আমার থামা উচিত। তোমার কথা ভাবলেই আমি আবেগী হয়ে যাই। আমায় ভুল বুঝো না মেয়ে। চলে গেলেও তোমার অন্তরজুড়ে আমি আজীবন বেঁচে থাকব তা তো জানি। ওটুকুই বা কম কিসে? তোমার কষ্ট হবে। এটাই আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলছে। এখনো ভাবছি, চিঠিটা না দিয়ে ছিঁড়ে ফেলব কিনা! তুমি সইতে পারবে? যদি না পারো? আমার স্বার্থপরতা দেখে আমায় গালাগাল করবে? আঘাত করবে? নিজেকে কষ্ট দেবে? কিচ্ছু চাইনা আমি, তেমন কিচ্ছু চাইনা।

মাই ওয়াইফ, তোমার কাছে আমি শুধু সুখ চাই। হোক সেটা ক্ষণস্থায়ী। আমার হাতের অবশিষ্ট দিনগুলো আমি শুধু তোমার সঙ্গে বাঁচতে চাই। আমায় অসংখ্য স্মৃতি উপহার দিও কেমন? তোমার হাসি, তোমার আলিঙ্গন, তোমার অস্তিত্ব, তোমার রান্না, তোমার মজা, তোমার খেলা, তোমার ক্যাফে, তোমার ব্যবসা, তোমার আদর, তোমার মায়া, তোমার সবকিছু! সবকিছুর স্মৃতি চাই আমি। অন্তিম কিছু স্মৃতির কাঙাল আমি। চলো না, আমরা একটুখানি সুন্দর করে বাঁচি আর কয়েকটা দিন?

যখন তুমি সব জানতে পারবে, তখন আমায় কিছু জিজ্ঞেস করো না, কেমন? শুধু কাছে এসে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরো প্লীজ! তোমার আর্তনাদ আমি সইতে পারবনা। নিঃশব্দে মুখ গুঁজে থেকো আমার বুকের মাঝে। আমি তোমায় সামলে নেবো, সবসময়ের মতন।

শরীর কাঁপছে। ইদানিং মাঝে মাঝেই কাঁপে। এবার তবে বিদায় নেই? আমার বুকে আরেকটু শক্তভাবে জড়িয়ে ধরেছি তোমায়। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছ, চেয়ে আছি আমি দীর্ঘক্ষণ। চোখ দুটো ঝাপসা লাগছে কেন বুঝতে পারছিনা, চশমা তো চোখেই আছে!

বিদায় আমার পৃথিবী। বিদায় আমার ভুলভাল ভালোবাসা। কারো কাছে এতদিন যেমন মাথা নিচু করোনি, এবারও করোনা। লড়ে যেও তুমি আজীবন। বেয়াদব সাবিন হয়েই থেকো। তোমার অসংখ্য ভুলকে ভালোবাসি আমি, তোমার প্রত্যেকটা দোষকে ভালোবাসি আমি। মাই ইম্পার্ফেক্ট লাভ, ইউ আর দ্যা বেস্ট থিং দ্যাট হ্যাপেন্ড টু মি ইন দিস লাইফ। দ্বিতীয় জন্ম বলে কিছু নেই, তেমনটা আমি বিশ্বাস করিনা। তবে আল্লাহর কাছে একটা আবদার থাকবে, আখিরাতে যেন তোমায় পাই। এক অনন্ত জীবনের আশায় নাহয় বরণ করলাম মৃত্যুকে, ক্ষতি কি তাতে?

পৃথিবীর ভাষায়ই শেষে বলে যাই,

আই লাভ ইউ মাই সোলমেট, ফর এটারনিটি, অ্যান্ড মোর টু কাম। মাই ফ্যামিলি, মাই ডেস্টিনি, মাই লাইফ, ইউ আর দ্যা ওয়ান হু মেইড মি রিয়ালাইজ হোয়াট ইট ফিলস টু বি অ্যালাইভ।

তোমার সঙ্গে অনেক বছর বাঁচা হলোনা ঠিকই, কিন্তু তোমার জন্য আমার বাঁচতে শেখা হলো।

আমি মানুষ হয়ে হয়ত থাকবো না। থাকবো তোমার রাতের আকাশের তারা হয়ে। থাকবো তোমার চুলের ঘ্রাণে মিশে। থাকবো তোমার বুকের ভেতরের হৃদযন্ত্রের স্পন্দনে। থাকবো তোমার চলার পথের ধূলোয় ছড়িয়ে। থাকবো তোমার পড়ন্ত বিকালের ঠান্ডা বাতাস হয়ে। থাকবো তোমার দীর্ঘ রাত্রির নীরবতা হয়ে। আমি থাকবো বউ, আমি কোথাও যাচ্ছিনা, থাকবো তোমার সমস্ত অস্তিত্বে মিশে, প্রতিটি কদমে কদমে, প্রতি নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে।

ইতি,
তোমার হার্ট অ্যাটাক ওরফে আরেফিন টাওয়ার॥

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

[ এই পর্বটা শুধু এই চিঠির জন্যই আলাদাভাবে উৎসর্গ করলাম। আজ বিশেষভাবে কিছু মন্তব্য আশা করছি। গত পর্বের রিপ্লাই এখনো করা হয়নি বলে দুঃখিত। ভালোবাসা। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here