নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ৪৬.

0
1

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৪৬.

অগ্নিলাকে ফুলের গয়নায় সাজিয়ে স্টেজে বসানো হয়েছে। অবশ্য স্টেজ,সাজ এসবে বারন ছিলাে ওর। কিন্তু ওর বাবার মতে এগুলো একেবারে যেটুক না করলেই নয়। মেহেরুনসহ বাকিসবও অনেক জোড়াজুড়ি করেছে। তাই একপ্রকার মানতে বাধ্য হয়েছে অগ্নিলা। আশপাশ তাকিয়ে পুরো পরিবারের আমেজ দেখে নিলো ও। বাবা একপাশে দাড়িয়ে বাকিসব আত্মীয়স্বজনেদর সাথে হাসিমুখে কথা বলছে, মা সমাজ নিজেরা বসেবসে আড্ডা দিচ্ছে, সমবয়সীদের মধ্যকার মেহেরুন, শায়েরী, অনু, ওর কিছু ভাইবোন এরা স্টেজেই বসে। সবাই ঠাট্টামজা আর ছবি তুলতে ব্যস্ত। আর এককোনে ফুলে মোড়ানো পিলারটায় হেলান দিয়ে বুকে হাত গুজে দাড়িয়ে শারাফ। ওর দৃষ্টি বরাবর তাকলো অগ্নিলা। সেখানে স্নিগ্ধতা। ফোনে কথা বলছিলো ও। আর শারাফ একদৃষ্টিতে ওরদিকে তাকিয়ে আছে। অগ্নিলা ঘাড় নেড়ে নিশব্দে হাসলো। স্নিগ্ধতা আসার পর শারাফ অন্য কোনো দিকে তাকিয়েছে কিনা, সন্দেহ আছে ওর। মিসেস নাহিদ এবার স্টেজের দিকে এগিয়ে আসলেন। মেহেরুনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

– মেহেরুন? এবার শুরু করো? ছেলের গায়ের হলুদ তো এসেই গেছে। বেলাও হয়েছে অনেক।

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝালো মেহেরুন। আশেপাশের সবাইও নড়েচড়ে বসলো। অগ্নিলা ডাক লাগালো স্নিগ্ধতাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে একটা মিষ্টি হাসিতে আসছি বললো স্নিগ্ধতা। তারপর কল রেখে স্টেজে এসে বসলো ওউ। একেএকে অগ্নিলাকে হলুদ ছোয়ালো সকলে। আত্মীয়স্বজনদের মাঝের এক যুবক অগ্নিলাকে হলুদ ছোয়ানোর পরিবর্তে পাশে বসা স্নিগ্ধতাকে বললো,

– তোমার গায়ে হলুদ তো সবাই ছোয়ালো নীলাপু। তোমার ননদীনি মানে আমাদের এই সুন্দরী বেয়াইনকে হলুদ লাগানোর অনুমতি আছে কিনা বলো?

অপ্রস্তুত হয়ে গেলো স্নিগ্ধতা। অগ্নিলা একপলক উঁকি দিয়ে শারাফের দিকে তাকালো। শারাফ তখনো সেখানেই বুকে হাত গুজে দাড়িয়ে। তবে সোজা হয়ে দাড়িয়েছে। ভাবখানা এমন, দেখি জল কতোদুর গরায়। উপস্থিত বাকিসবও পরিস্থিতির পরিনয় দেখতে উৎসুক। শারাফের দিক তাকিয়ে কেবলই ঠোঁট টিপে হাসছে প্রত্যেকে। অগ্নিলা ছেলেটাকে চোখ মেরে বললো,

– চেইক করে দেখতে পারিস। বেয়াইনই তো!

ছেলেটা বড়সর একটা হাসি দিয়ে হলুদ হাতে নিলো। তারপর হাত বাড়ালো স্নিগ্ধতার দিকে। বসে থেকে মাথা কিছুটা পিছিয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। আর ছেলেটার হাত ধরে ফেললো কেউ। শারাফ। ছেলেটা ওর চাওনি দেখে ফোকলা একটা হাসি দিয়ে বললো,

– ক্ কোনো সমস্যা ভাইয়া?

– তোমার মেহুপুর একমাত্র দেবর আমি। ভাইয়া-ভাবীর বিয়ের এ তিনবছরে কোনোদিন তো এই বেয়াইকে হলুদ লাগালে না ছোটভাই। আর আজকে একদিনের পরিচয়ে নীলাম্যাডামের ননদীনিকে হলুদ লাগাতে চলে এলে?

– ইয়ে, মানে, ভাইয়া…

শারাফ ওর হাতের হলুদটাই অগ্নিলার গালে ছোয়ালো। তারপর পকেট থেকে একটা ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড অগ্নিলার আঁচলে রেখে বললো,

– অল দ্যা বেষ্ট মিস হটি। আমি তোমার বন্ধু-ই রইলাম। আর তুমি? অন্য কারো সঙ্গে বাধো ঘর।

শব্দ করে হেসে দিলো অগ্নিলা। শারাফও প্রতিত্তরে হাসলো। মুগ্ধচোখে ওদের বন্ধুত্ব দেখে নিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ওই ছেলেটার হাত ধরেই ছিলো। ও কিছু বলতে যাবে, শারাফ বললো,

– আর তুমি, চলো আগে আমরা বেয়াই-বেয়াই রঙ্গোলি খেলি। বেয়াই-বেয়াইন হলুদপর্ব পরে দেখা যাবে।

শেষ কথাটা স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে বললো শারাফ। ছেলেটাকে টেনে সরিয়ে আনলো স্টেজের সামনে থেকে। স্নিগ্ধতা খোলা চুলের আড়ালে চাওনি লুকোলো। আর অনু ওর কাধে ধাক্কা লাগিয়ে বললো,

– নতুন বউকেও এতোটা লজ্জায় দেখছি না। অথচ তুই? লজ্জায় তো শেষ হয়ে যাচ্ছিস দেখছি।

– হয়েছে থাম।

– অবশ্য গুনটা তোরও না। শারাফ স্যারের। এভাবেও প্রেমনিবেদন করা যায়। ওয়াহ!

– তুই থামবি?

– থামবো কেনো? ভাগ্যিস তুই জোরাজুরি করে আমাকে নিয়ে আসলি। না হলে সাইফ ভাইয়ার বিয়ে মিস করার চেয়ে তোর আর শারাফ স্যারের প্রেম মিস করার আফসোসটা আমার বেশি হতো রে। থ্যাংকিউ ইয়ার!

কটমটে চোখে ওকে চোখ রাঙালো স্নিগ্ধতা। তারপর মেহেরুনের কথায় হলুদ ছোয়ালো অগ্নিলাকে। এরপর সবাই মিলে বসে গেলো মেহেদী দিতে। শারাফ দুরেই ছিলো। কোথথেকে আবির এসে ওর সামনে দাড়িয়ে গিয়ে বললো,

– ওওও! এইজন্যই তুই আমাকে ধীরেসুস্থে আসতে বলেছিস। আমার চাকরির পরীক্ষা বা পড়া শেষ করা বিষয় না! নতুন কাউকে পেয়ে গেছো তো তুমি! আচ্ছা ভালো থাক, সুখে থাক! আমি চললাম। গেলাম আমি। নাই থাকলাম নীলার বিয়েতে। গেলাম!

নাকমুখ ফুলিয়ে একদমে কথাগুলো বললো আবির। শারাফ পাশের ছেলেটার কাধ থেকে হাত সরালো এবারে। স্নিগ্ধতাকে হলুদ লাগাতে যাওয়া সে-ই ছেলেটাকে সেইযে বগলদাবা করে এনে দাড় করিয়ে রেখেছে, আর ছাড়েনি। আর সেটা দেখেই নাটক জুড়েছে আবির। শারাফ এবারে ওর কাধে ভর করে স্নিগ্ধতার দিকে তাকালো। বললো,

– আমার স্নিগ্ধতাকে হলুদ লাগানো উচিত ছিলো আবির।

– ব্যাটা তুই আমাকে একবারো জিজ্ঞেস করলি না কখন আসলাম, কিছু খেয়েছি কিনা, স্বার্থপরের মতো বলছিস স্নিগ্ধতাকে হলুদ লাগানো উচিত ছিলো। তুই কি সত্যিই আমার বন্ধু?

– ওর অভিমান হয়েছে রে। পুরো চারমিনিট হয়ে গেছে ও আমার দিকে তাকায়নি।

চারমিনিট তাকায়নি বলে প্রেমিকার অভিমান হয়েছে। কথাটা শুনেই আবির ঝারা মেরে কাধ থেকে হাত সরিয়ে দিলো শারাফের। একটু বেসামাল হয়ে দুপা সরে গিয়েছে শারাফ। কমবেশি সবাই ওর দিকে তাকালেও কেবল স্নিগ্ধতা তাকায়নি। মুসকান বাটিতে করে মিষ্টি খাচ্ছিলো আর এদিকওদিক হাটছিলো। শারাফকে ওমন টালমাটাল হতে দেখে ও দৌড়ে এগোলো। ওর পান্জাবীতে টান লাগিয়ে বললো,

– কি হয়েছে শারাফ ভাইয়া?

হাটু গেরে মুসকানের সামনে বসলো শারাফ। শিশুর মতো কাদোকাদো চাওনিতে স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে বললো,

– অসুখ হয়েছে রে মুসু। হার্টের অসুখ।

– হার্টের অসুখ? একটু আগেও তো ভালো ছিলে। হঠাৎ অসুখ কেনো করলো তোমার?

– উম…অসুখ কেনো হলো? মিষ্টি অসুখ তো, যখনতখন হয়। এইযে তুই মিষ্টি খাচ্ছিস, জানিস? সুইট ইজ ডেন্জারাস ফর হার্ট।

– কিন্তু তুমি তো মিষ্টি খাওনি। তোমার কি হলো তাহলে?

– কজ ফর মি, মোস্ট ডেঞ্জারাস থিং ইজ সুইট-হাফ অফ মাই সুইটহার্ট।

– সুইটহার্ট?

আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো মুসকান। শারাফ বসে থেকে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বললো,

– হুউউউম…সুইটহার্ট।

– কে সুইটহার্ট শারাফ ভাইয়া? কে অসুখ বাধালো তোমার?

ওকে কোলের মাঝে দুহাতে জড়িয়ে নিলো শারাফ। তারপর ওর কাধে থুতনি ঠেকিয়ে, স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠলো,

Do nain sitaare, hai chand sa mukhda
Kya kehna uska…Afreen!
Daawat mein jaise, wo shahi tukda
Uske jaisi na koi nazneen!!

স্নিগ্ধতা অগ্নিলার হাতে মেহেদী দিচ্ছিলো। গানের সুর পেয়ে চোখ তুলে তাকালো ও। অগ্নিলার ভাইয়েরা শারাফের সাথে এসে দাড়িয়ে গেছে ততক্ষণে। শারাফ উঠে দাড়িয়ে, মুসকানের সাথে গাইলো,

Shaahi joda pehan ke
Aayi jo ban thann ke
Wahi toh meri Sweetheart hai…
Sharmaaye si bagal mein
Jo baithi hai dulhan ke
Wahi toh meri Sweetheart hai(x2)

মুসকান শারাফের সাথে অপটু হাতেপায়ে নাচছে। ওদের সাথে গান-সুর আর নাচে মেতে উঠলো বাকিসকলেও। শায়েরী, আর মেহেরুন মিলে অগ্নিলার পাশ থেকে টেনে নিয়ে আসলো স্নিগ্ধতাকে। সবার মাঝে শারাফ ওর আশেপাশে থাকলেও ওকে পাত্তা দেয়নি স্নিগ্ধতা। একপর্যায়ে শারাফই ওর সামনে আগলে দাড়ালো। ঘাড় কিঞ্চিত বাকিয়ে রেখে গাইলো,

Kaise main kahun shukriya
Uska mujhpe ehsaan hai
Naacheezon ki basti mein wo
Jo banke aayi mehmaan hai.(x2)
Lagta hai shaadi ghar
Uske aane se jaise
Chalke aayi hai khushkismati…

স্নিগ্ধতা পা বাড়াচ্ছিলো। কিন্তু মুসকান এসে আঁচল ধরেছে ওর। হাসিটা লুকোলো স্নিগ্ধতা। তারপর সুরের সাথে হাতে তালির শব্দ তুললো অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। শারাফ হাসলো। নিজেও তালি বাজিয়ে ওর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে গাইলো,

Saari mehfil ki woh jaan bani hai
Kya kehna uska.. Afreen!
Muflis ke dil ka, armaan bani hai
Uske jaisi na koi nazneen…

স্নিগ্ধতা হেসে দিলো এবারে। ছুটে এসে অগ্নিলাকেও নিয়ে গেলো সবার মাঝে। সবার মুখে তখনো গান, ‘Shaahi joda pehenke’ আর গায়ে-মুখে-হাতে হলুদ। ছেলেরা একসাথে আর মেয়েরা আলাদা। স্নিগ্ধতা মেহেরুনের সাথে নাচছিলো। তবে ওর গায়ে হলুদ লাগেনি একফোটাও। মেহেরুন নাচতে নাচতেই শায়েরীকে ইশারা করলো, ওকে হলুদ লাগানোর জন্য। স্নিগ্ধতা যখন নাচে, হাসিতে ব্যস্ত, শায়েরী-মেহেরুন দুজনে একসাথে হলুদমাখা হাত বাড়িয়ে দিলো ওর দিকে। কিন্তু স্নিগ্ধতা টের পেয়ে যায়। তৎক্ষনাৎ উবু হয়ে শাড়ির কুচি ধরে ছুট লাগায় ও। ভীড় থেকে বেরিয়ে স্নিগ্ধতা দৌড়াচ্ছে, আর ওর পেছনে অনু, শায়েরী, মেহেরুন। ছুটতে ছুটতে আচমকাই স্নিগ্ধতার ডানহাতের কবজি আবদ্ধ হয় কারো হাতে৷ একপাশের রঙ্গনগাছটার কাছে গতি থামাতে বাধ্য হয় স্নিগ্ধতা। আর ওর সাথে শারাফকে থেমে যায় পেছনের অনু, শায়েরী, মেহেরুন। শারাফ স্নিগ্ধতার বেশ অনেকটাই কাছে। বড়বড় চোখে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। শারাফ আলতোকরে ওর ডানগালে হলুদ ছুইয়ে বললো,

– ছুটেচলা স্বভাব ছেড়ে দাও স্নিগ্ধতা। তুমি আমাতে আটকেছো।

স্নিগ্ধতা চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলো। কি হলো ওর, চোখ খুলে ঝড়ের গতিতে পিছিয়ে গেলো পরমুহূর্তেই। পেছন ফিরলো চলে আসবে বলে। শারাফ বললো,

– যে স্নিগ্ধতায় স্নাত হবো বলে তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো অপেক্ষায় আছি, সে স্নিগ্ধতার রঙ তো আমিও ডিসার্ভ করি স্নিগ্ধতা। রাঙাবে না আমায়?

স্নিগ্ধতা এবারো থামলো। পেছন ফিরে চোখ তুলে ও দেখে নিলো শারাফকে। ভেতরের লাজরাঙা স্নিগ্ধতাকে দমিয়ে দিয়ে, দৃঢ়পদে এগোতে লাগলো ও শারাফের দিকে। আর ওকে এগোতে দেখে কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের রেশ শারাফের চেহারায়। কিয়দাংশের সে বিস্ময় কাটিয়ে ওঠার আগেই স্নিগ্ধতা একদম কাছে চলে এসেছে ওর। অকস্মাৎ পা উচিয়ে শারাফের গালে নিজের গাল স্পর্শ করায়। শারাফ পাথরের মূর্তির মতো থেমে রইলো। হৃদস্পন্দনের দ্রুততা সুবিধের লাগছে না ওর। স্নিগ্ধতা নেমে দাড়ালো। অশ্রুভরা দৃষ্টিজোড়া স্থির করলো সামনের স্থিরমানবের দিকে। ঠোঁটের কোনে এক দুর্বোধ্য হাসি ফুটিয়ে বললো,

– স্নিগ্ধতার রঙ কেবল তুমিই ডিসার্ভ করো শারাফ। একমাত্র তুমি।

শারাফ জবাব দিতে পারলো না। ডানেবামে দেখে কয়েকপা পিছিয়ে গেলো স্নিগ্ধতা। তারপর আরেকপলক শারাফকে দেখে নিয়ে, কপালের সামনে চলে আসা চুলগুলোকে কানে গুজে দিয়ে চলে আসলো ওখান থেকে। স্তব্ধ হয়ে ওর চলে যাওয়া দেখলো শারাফ। স্নিগ্ধতা চোখের আড়াল। শারাফ নিজের গাল ছুইয়ে বুঝলো, ওর গালেও হলুদ দিয়ে গেছে স্নিগ্ধতা। শারাফের প্রেমসিক্ত চেহারায় হাসি ছড়াতে যাচ্ছিলো। কিন্তু আগেই আওয়াজ এলো,

– ভুল কিছু বলেনি কিন্তু স্নিগ্ধতা। সত্যিই তো! যে শারাফ কিনা ওকে পাওয়ার জন্য নিজেকে, অন্যকে, এমনকি স্বয়ং স্নিগ্ধতাকেও আঘাত করতে পিছপা হয়না, স্নিগ্ধতার রঙ তো শুধু সেই ডিসার্ভ করে। সো কনগ্রাটস মাইন্ডগেইমার ইয়াকীন শারাফ। স্নিগ্ধতা আপনার!

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here