#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা
৬.
-বিয়ে মানে লাভ না হলেও, লাভ মানে প্রেম থেকে বিয়ে অবদি তো যেতেই পারো শারাফ। বাসায় বলে দিলেই পারো, আমাকে পছন্দ বলে কাউকে পছন্দ হচ্ছে না তোমার। এতো লজ্জার কি আছে বলো?
দরজায় দাড়ানো কালো শাড়ি পরিহিত মেয়েটার কথায় হাসলো শারাফ। মেহেরুন গিয়ে মেয়েটার মাথার সামনের কিছু চুল টান দিয়ে বললো,
-এসেই শুরু করেছিস?
ওর কথাকে মেয়েটা বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিলো না। চুলে হাত বুলিয়ে মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখে ঠিকঠাকমতো ঠেলে দিলো। শারাফ উঠে দাঁড়ালো। প্যান্টের পকেটে দু হাত গুজে মুচকি হেসে বললো,
-তোমারই কমতি ছিলো। স্বপ্নীলে ওয়েলকাম মিস হটি।
মেহেরুন পেছন ফিরলো। কোমড়ে দুহাত গুজে দাড়িয়ে বললো,
-ফ্লার্টিং শুরু দুজনের তাইনা? একটা কথা বলোতো দেবরজি? আমার বোনকে দেখলেই খালি তোমার ফ্লার্টিং স্কিলটার কথা মনে পরে? আর অন্য মেয়েদের দেখলে শারাফ থেকে শরিফ হয়ে যাও। এমন কেনো তুমি?
উপস্থিত সবাই হেসে ফেললো। শারাফ অবাককন্ঠে বললো,
-ওমা! আমি কখন তোমার বোনের সাথে ফ্লার্ট করলাম?
-যে নামে ডাকলে, ফ্লার্টিং না বলে আর কি বলবো ওটাকে?
শারাফ স্বাভাবিকভাবে বললো,
-ভুল কি বললাম? বেয়াইনসাহেবের আকিকা করা নাম অগ্নিলা। আগুনের মতোই তার তোপ। তার রুপের অনলে চর অগোচরে কতোজন জ্বলছে কে জানে! একে হটি বলে ডাকা কি পাপ হবে ভাবী?
মেহেরুন দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। স্বপ্নীলে প্রত্যেকে শারাফ আর অগ্নিলার এমন ঠাট্টামজার সম্পর্কের সাথে পরিচিত। তাই স্বাভাবিকভাবেই নেয় সবাই ওদের কথাগুলো। যদিও অগ্নিলাকে নিয়ে শারাফের বাবার দৃষ্টিভঙ্গি শুরুর দিকে আলাদা ছিলো, শারাফ স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, অগ্নিলা কেবলই ওর বান্দবী। আর সে বন্ধুত্বের হাত ধরেই শারাফের ভাই শাওন আর অগ্নিলার বোন মেহেরুনের শুভ পরিনয়। এর বাইরে কিছুই নেই। অগ্নিলা এগিয়ে আসলো এবার। শারাফকে বললো,
-এতোদিন পর দেশে ফিরলে, একবার কল করে জানালেও না শারাফ?
-দেখতে চেয়েছিলাম আমার প্রতি তোমার টান কতো নিউটনের। না জানালেও ছুটে চলে আসো কিনা। তাই আর জানাইনি। কিন্তু তোমার তো সীমাহীন টান দেখছি। এ টানের সংযোজক সরলরেখা কি ছোটবাবা?
হেসে হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়লো অগ্নিলা। শারাফও হাসলো। সোফায় বসার জন্য ইশারা করে বললো,
-এসেছো এটাই ঢের! তারপর বলো ম্যাডাম! কেমন আছো?
-তোমার ম্যাডাম কিন্তু আসলেই ম্যাডাম হয়ে গেছে শারাফ। সাইকোলজি থেকে ওরও তো বিএসসি শেষ। এখন তুমি ছুটছো বাস্তবধর্মী রিসার্চের পেছনে আর অগ্নিলা আমাদের ভার্সিটিতে লেকচারার হিসেবে জয়েন করছে। এবার তুমিই বলো, জীবনযুদ্ধে কে এগিয়ে গেলো শারাফ?
প্রফেসর নাহিদ গলার টাই টানতে টানতে ভেতরে ঢুকলেন। কথাটা বলে নিজেও এসে বসলেন সোফায়। শারাফ খুশি নিয়ে বললো,
-কনগ্রাটস্ অগ্নিলা! সাইকোলজিতে আমাদের আরেকটা ঘাটি গড়া হয়ে গেলো! কি বলো ছোটবাবা?
অগ্নিলা মুচকি হাসলো। যেটা চোখ এড়ালো না শারাফের। নিজের ঠোটের হাসিটা কমে আসলো ওর। এই হাসিটা কেনো যেনো ওর অস্বাভাবিক লাগছে। প্রশ্ন ছুটলো, এতোদ্রুত, থেসিস না করেই অগ্নিলা ভার্সিটিতে জয়েন করলো কেনো? এই হাসিটার মাঝে উদ্দেশ্যমুলক কিছুর আভাস কেনো পাচ্ছে ও?
•
শরতের সকালটা আজকে বেশ ঝলোমলো। আগের রাতের অল্পবিস্তর বৃষ্টি সব জীর্ণতা যেনো ধুয়ে নিয়ে গেছে অতি সন্তর্পনে। লাল রঙের একটা থ্রিপিস পরে ভার্সিটির জন্য রেডি হয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। আজকে প্রদর্শনী আছে ওর। কাধের ডানপাশ দিয়ে অনেকগুলো চুল সামনে দিয়ে, জরজেটের কারুকাজকরা হলুদ ওড়নাটা বা হাতের উপর ছড়িয়ে দিলো পুরোটা। এরপর আয়নার সামনে দাড়িয়ে নাকে সরু একটা রিং পরলো। এককানে পাথরের ছোট দুল পরে, আরেককানে পরতে যাবে, এরমাঝেই কলিংবেলের আওয়াজ শুনতে পেলো স্নিগ্ধতা। পাশেররুম থেকে সাইফ ডাক লাগিয়ে বললো,
-টুকি? দেখতো কে এসেছে? আমি ওয়াশরুমে!
স্নিগ্ধতা দুল পরতে পরতে বেরিয়ে এলো নিজের ঘর থেকে। দরজা খুলতে খুলতে গলা উচিয়ে সাইফকে শোনাতে বললো,
-হ্যাঁ হ্যাঁ! ওয়াশরুমেই থাকো তুমি এখনো! বেরিও না! আমারও আর ভার্সিটি যেতে হবে না আজ! প্রদর্শনী শুর্…
দরজা খুলে সামনে দাড়ানো ব্যক্তিকে দেখে থেমে গেলো স্নিগ্ধতা। আর ওকে দেখে নিস্প্রান দৃষ্টিতে প্রান খুজে পেলো আরাফাত। আগেররাতে সাইফ কল রিসিভ করেনি ওর।তাই বাসায়ই চলে এসেছে সামনাসামনি কথা বলবে বলে। স্নিগ্ধতাকে দেখে নিলো আরাফাত। সাজ ব্যতিরেকে কেবল পরিপাটি পোশাকেই মেয়েটার চেহারার স্নিগ্ধতা কয়েকসহস্রগুনে বেড়ে গেছে যেনো। কান থেকে হাত নামলো স্নিগ্ধতা। স্বাভাবিক রইলো। যেনো ও জানতো, আরাফাত আজ আসবে ওদের বাসায়। দরজা থেকে সরে দাড়িয়ে বললো,
-ভেতরে আসুন।
আরাফাত অবাক হলো। স্নিগ্ধতা ওর আচমকা আগমনে বিব্রত হয়নি এটা মানতে সময় চাইলো ওর মস্তিষ্ক। বললো,
-স্নিগ্ধ্…
-কে এসেছে রে টুকি?
মাথায় তোয়ালে চালাতে চালাতে ড্রয়িংরুমে আসলো সাইফ। ওর পরনে ইউনিফর্ম। তবে অগোছালোভাবে। আরাফাতকে দেখেই খুশি হয়ে গেলো ও। ভেজা তোয়ালেটা সোফায় রেখে, হেসে এগোতে যাচ্ছিলো ও আরাফাতের দিকে। স্নিগ্ধতা মাঝে এসে তোয়ালে হাতে নিলো। ভাইয়ের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললো,
-অনুগ্রহপুর্বক ইউনিফর্মটা ঠিক করে এসে তারপর না হয় বন্ধুর সাথে কথা বলা শুরু করুন ইন্সপেক্টর ?
দুহাত কাধের ওপর তুলে সাইফ বললো,
-ওপস্! সরি সরি! ভুল হয়ে গিয়েছে।
এরপর আরাফাতের দিকে তাকিয়ে বললো,
-দেখেছিস আরাফাত? কেমন করে একজন আমজনতা হয়ে পুলিশকে চোখ রাঙায়?
আরাফাত কিঞ্চিৎ হেসে বললো,
-আর পুলিশও তা দেখে ভয় পেয়ে যায়।
হেসে দিলো সাইফ। রুমের দিকে পা বাড়িয়ে বললো,
-বস! আই’ল বি রাইট ব্যাক!
সাইফ চোখের আড়াল। আরাফাত স্নিগ্ধতার দিকে ফিরে কিছু বলে ওঠার আগেই ও বললো,
-ভাইয়াকে সবটা বলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ বাসায় এসেছেন?
-না স্নিগ্ধতা। তোমার ভাইয়ার কাছে তোমাকে চাইতে এসেছি।
স্নিগ্ধতা সোফার কুশন খুলে কিছু কাগজ বের করে দিলে আরাফাতকে। ওগুলো হাতে নিলো না আরাফাত। ওপরের পেইজটাতে চোখ বুলাতেই দেখতে পেলো, ওটা এইচআইভি টেস্ট রিপোর্ট। রেজাল্ট, পজিটিভ৷ পেইজের উপরে পেশেন্ট নেইমে স্পষ্টভাবে লেখা, স্নিগ্ধতা এহমাদ। স্নিগ্ধতা বললো,
-আরো প্রমান চাই আপনার?
রিপোর্টটা দেখে আরাফাতের চারপাশ আবছা লাগছিলো। মনের কোনে কোথাও যেটুকো আশা ছিলো, স্নিগ্ধতা মিথ্যে বলছে, কোনো এইডস নেই ওর, ও সম্পুর্ন সুস্থ্য, সে আশাদীপ নিজহাতে নিভিয়ে দিলো স্নিগ্ধতা। সত্যিই স্নিগ্ধতা অসুস্থ্য। মারনরোগ গ্রাস করছে পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধরুপকে। আরাফাত কোনোমতে গলা ঠিক করে বললো,
-এরপরও আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবে না স্নিগ্ধতা।
-তারমানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে কোনো দ্বিধা নেই আপনার?
-তোমার দ্বিধায় বাচা-মরা কোনোটাতেই দ্বিধা নেই আমার স্নিগ্ধতা। সবটা জেনেও আমি তোমাকেই বিয়ে করতে চাই।
-আর আপনার পরিবার?
কথাটা শুনে আরাফাত দৃষ্টি সরালো সেকেন্ডদুইয়ের জন্য। আবারো স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে বললো,
-আর কারো কথা জানিনা স্নিগ্ধতা। কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। তোমাকে আপন করা ছাড়া অন্য কোনো গতি দেখছি না নিজের। বাবা মা সবসময় আমার ইচ্ছাকে মুল্যায়ন করেছে। এবারেও…
-কিন্তু আমি তো আপনাকে ভালোবাসিনি মিস্টার আরাফাত। আমার অনুভূতিকে মুল্যায়ন করার কথা ভেবেছেন একবারো?
আরাফাত বিমুঢ়। স্নিগ্ধতা নম্রভাবে বললো,
-মানলাম আপনি নিজেকে উদার প্রমান করতে, নিজের প্রেমকে খাটি প্রমান করতে মৃত্যুমুখীকে আপন করতে অনড় রইলেন। কিন্তু আমি তো কখনো আপনার এই উদারতা চাইনি। আর যে কেউ হোক না কেনো, আমি তো কখনো আপনার নিস্বার্থ ভালোবাসার দাবীদার হতে চাইনি। আপনি মানুষটা এতোবেশী ভালোবাসলেই যে আপনাকে স্বামী বলে বরন করে নিতে আমি বাধ্য, এমনটাও তো কোথাও লেখা নেই মিস্টার আরাফাত।
-এসব তোমার মনের কথা না স্নিগ্ধতা। তুমি কেবল নিজের সাথে আমাকে জড়াবে না বলে এসব বলছো।
-এসবই আমার মনের কথা মিস্টার আরাফাত। আমি আপনাকে ভালোবাসিনা। তবে হ্যাঁ, এটাও একটা কারন। এমন মৃত্যুরোগ নিয়ে এ মুহুর্তে নিজের সাথে কাউকেই জড়াতে দেবো না আমি। আপনি ভালোমতোই জানেন, ভাইয়া আপনার প্রস্তাবকে মানা করবে না। আর না আমি ভাইয়াকে মানা করে কষ্ট দিতে চাইবো। তারপরও যদি আপনি ভাইয়াকে আমার বিষয়ে কিছু বলেন, বিশ্বাস করুন, তাকে কষ্ট দিয়ে হলেও, এ বিয়েতে রাজি হবো না আমি। শুধুমাত্র অন্যের মন রাখতে, কাউকে ভালো না বেসেও তার সাথে বিয়েতে রাজি হয়ে নিজেকে অপমান করতে পারবো না আমি মিস্টার আরাফাত। শুধুশুধু জেদ করে কেনো আমাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবেন না প্লিজ।
পুরোটা শুনে দুহাত মুঠো করে নিলো আরাফাত। সাইফকে স্নিগ্ধতার অসুখের কথা বললে, কোনোদিনও স্নিগ্ধতা ক্ষমা করবে না ওকে। আর না বলে স্নিগ্ধতাকে আপন করতে চাইলে, মানা করে দেবে স্নিগ্ধতা নিজেই। দুটো পরিস্থিতির কোনোটাই চাইনা ওর। তার চেয়ে অপেক্ষা শ্রেয়! নিজেকে বুঝিয়ে আরাফাত ধীর গলায় বললো,
-দোয়া করি, যতোটা কষ্ট আমি তোমাকে না পেয়ে পেলাম, ততোটাই সুখ যেনো তুমি তোমার অনুভূতিকে খুজে পেয়ে পাও। কিন্তু মনে রেখো, আমার মতো করে কেউ তোমাকে চাইবে না স্নিগ্ধতা। স্নিগ্ধতার বাহার ওই চাঁদের গায়ে চন্দ্রকলঙ্ক থাকতে পারে, কিন্তু আমার চাওয়ায় কোনো খুঁত নেই। আর তাই তুমি যেখানেই থাকো না কেনো, আজীবন এভাবেই চেয়ে যাবো তোমাকে। আসছি।
আরাফাত চলে গেলে। মৃদ্যু হাসলো স্নিগ্ধতা। একটা কথা ঠিকই বলেছে আরাফাত। স্নিগ্ধতার বাহার, চাঁদের গায়েও চন্দ্রকলঙ্ক থাকে। আবার ভুলও বলেছে অনত্র্য। এমন কোনো চাওয়া নেই, যেখানে খুত নেই। যদি সব চাওয়াগুলো সত্যিই নিখাদ হতো, সবার চাওয়াই পুর্ণতা পেতো। যেটা প্রকৃতির অস্বাভাবিক নিয়ম। আর ও তো স্বাভাবিক নিয়মে বিশ্বাসী। যেখানে ❝নন্দিত চন্দ্রকলঙ্কের❞ কোনো স্থান নেই। প্রকাশ পাওয়া চন্দ্রকলঙ্ক কখনো নন্দিত হয়না। তা কেবলই নিন্দার জোয়ারে ডোবে। তা কেবলই নিন্দিত!
#চলবে…
[ শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

