#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
১২.
ভার্সিটির ক্লাস পিরিয়ড শেষ। সাইডব্যাগ আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে কেবিন থেকে বেরোলো অগ্নিলা। স্বপ্নীলে যাবে আজ ও। মুসকানের জন্মদিন আছে বলে মেহেরুন বারবার করে যেতে বলেছে ওকে। তাছাড়া ওখানে গেলে প্রফেসর নাহিদ আর শারাফের সাথে বসে জরিপের কাগজপত্র কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগও হয়ে যাবে। মুলত এটাই স্বপ্নীলে যাওয়ার মুল উদ্দেশ্য ওর। টিচার্স কেবিনের করিডর পেরিয়ে মাঠের সরু রাস্তায় আসলো অগ্নিলা। তখনই পিছুডাক আসলো,
-মিস অগ্নিলা?
অগ্নিলা পেছন ফিরলো। কালো রঙের শার্ট পরিহিত যুবকটি তার পরিচিত। এগিয়ে এসে সৌজন্যে হেসে বললো,
-বাবাহ! আমার নাম মনে আছে আপনার ইন্সপেক্টর এহমাদ?
সাইফ মৃদ্যু হাসলো। তারপর আশপাশ তাকিয়ে দেখে নিলো একপলক। সবাই বেরিয়ে যেতে ব্যস্ত। ঠোটের হাসিটা বহাল রেখে বললো,
-আপনিও তো আমার নাম মনে রেখেছেন।
-সেদিন আপনি কিন্তু আপনার কার্ড দিয়েছিলেন। মনে রাখাটা অস্বাভাবিক কিছু কি?
-না। তবে আপনার নাম আমার মনে থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয় বৈকি। আপনি কোনো কার্ড দেননি ঠিকই, তবে আমার বোনকে যে বা যারা হেল্প করে, তাকে বা তাদেরকে ভোলার প্রশ্নই ওঠে না।
অগ্নিলা হাসলো। হাতের ফাইলগুলো বুকে আঁকড়ে ধরে হাটা লাগিয়ে বললো,
-হুম। লজিক আছে। তারপর? কেমন আছেন বলুন? স্নিগ্ধতাকে নিতে এসেছেন বুঝি?
-হুম।
-যাই বলুন ইন্সপেক্টর এহমাদ, আপনার পুলিশিবিদ্যা দেখা না হলেও, যুক্তিবিদ্যাটা দেখে নিলাম। এন্ড আই ফিল, ইউ আর টেন অন টেন ইন ইট!
সাইফ ওর পাশেই হাটছিলো। পুলিশিবিদ্যা কথাটা শুনে ওর হাসিটা ধাতস্থ হয়ে আসলো অনেকটাই। বললো,
-বিষয়টা যখন টুকিকে ঘিরে, যুক্তি, পুলিশি কোনোবিদ্যাই প্রাধান্য পায় না আমার কাছে মিস অগ্নিলা। ইটস অল আবাউট হার।
-হুম। সেদিনই বুঝেছি, বোনকে খুববেশি ভালোবাসেন আপনি।
…
-তো সেই আদরের বোনকে রিসিভ করতে এসে, তার ফাইন আর্টস বিল্ডিংয়ের পরিবর্তে হঠাৎ এদিক সাইকেলজি ডিপার্টমেন্টে? বিশেষ কোনো কারন?
সাইফের মুখের দিকে উঁকি দিয়ে কথাটা বললো অগ্নিলা। সাইফের পায়ের গতি কমে আসছিলো। কমতে দিলো না ও। সামনে তাকিয়ে আগে হাসি প্রসারিত করে নিলো। তারপর অগ্নিলার দিকে তাকিয়ে বললো,
-একচুয়ালি সেদিন টুকিকে আপনি হেল্প করলেন। ও অসুস্থ্য হয়ে পরায় সেভাবে কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করা হয়নি আপনার কাছে। টুকি টেক্সট করেছে ওর বেরোতে আরো কিছুক্ষন সময় লাগবে। তাই ভাবলাম আপনাকে ধন্যবাদটা জানিয়েই যাই আজ।
নাকটা আঙুলে ডলে হাসি লুকোনোর চেষ্টা করলো অগ্নিলা। বললো,
-আপনি কিন্তু খুব ভালোমতোই জানেন, আপনার কৃতজ্ঞতার জন্য সেদিন প্রোটেস্ট করিনি আমি। আর আমিও কিন্তু এটা খুব ভালোমতোই জানি মিস্টার এহমাদ, শুধুমাত্র কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপনের জন্য আমার সাথে কথা বলতে আসেননি আপনি।
সাইফ দাঁড়িয়ে গেলো। ওর মুখের সে হাসিটা আর নেই। তবে অগ্নিলা অমন হাসিমুখেও দাড়িয়ে গেলো। বললো,
-এতো লুকোচুরির কিছু নেই ইন্সপেক্টর এহমাদ। ইউ ক্যান ডিরেক্টকি সে হোয়াটএভার ইউ ওয়ান্ট টু!
সাইফ দাড়িয়ে থেকে ডানহাতে কপালটা ডলা দিলো। জোরপুর্বক হেসে বললো,
-ধন্য আপনার সাইকোলজিক্যাল অবসার্ভেশন।
প্রতিত্তরে কাধ উচিয়ে কেবল হাসলো অগ্নিলা। সাইফ এবার স্বরে শীতলতা এনে বললো,
-সেদিন টুকিকে যখন চঞ্চল হ্যারাজ করছিলো, তখন ওর সাথে সবুজও ছিলো। চঞ্চলের সাথে সবুজকেও চড় মেরেছিলেন আপনি মিস অগ্নিলা।
-হ্যাঁ।
-যেখানে পুরো ক্যাম্পাস সবুজ-চঞ্চল শিরোনামে উত্তেজিত হয়ে আছে, ভার্সিটির ছাত্রহ*ত্যার বিরোধমিছিলে শামিল, আপনি তার কোথাও উপস্থিত ছিলেন না।
-এরকম আরো অনেক শিক্ষক-ছাত্রছাত্রী আছে যারা এসবে উপস্থিত ছিলো না।
-সবুজ যেদিন খু*ন হয়, সেদিন আপনি বাসায় ছিলেন না। কোথায় ছিলেন?
-জ্বি। এক শুভাকাঙ্ক্ষীর বাসায় ছিলাম।
-আজকে আপনার ক্যাম্পাসে আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েই প্রশ্নগুলো করলাম। কাল কিন্তু ইন্সপেক্টর সাইফ এহমাদ আপনাকে প্রশ্নতাক করবে মিস অগ্নিলা।
অগ্নিলা শব্দ করে হেসে দিতে যাচ্ছিলো। পরপরই সাইফের দিকে তাকিয়ে, নিজেকে সংযত করে উত্তর দিলো,
-ইটস্ টোটালি ওকে মিস্টার এহমাদ। আপনি আপনার রুপ বদলাতে পারেন। আমি কিন্তু আমার উত্তরগুলোকে পাল্টাবো না। প্রচুর পরিমানে নারীবাদী হওয়ায়, আমার সামনে কোনো মেয়ের হ্যারাজমেন্ট মানতে পারিনা আমি। তাই দুটোকেই চড় লাগিয়েছিলাম ওইদিন। রইলো বাকি বাসায় না থাকা, ইচ্ছে করলে গাছতলাতেও রাতকাবার করে দেওয়ার সাহস আছে আমার। এমনটা অনেক আগে থেকেই করে আসছি আমি। নতুন না। আর আমি বিশ্বাস করি, মানুষ তার কর্মফল ইহজনমেই পেয়ে যায়। অবশ্যই সবুজের এমন ভয়ানক মৃ*ত্যুও ওর কোনো ভয়ানক অন্যায়ের ফল হবে হয়তো। এজন্য নিজেকে এই হ*ত্যাকান্ড বিরোধী বলে মানতে পারিনি। তাই কোনো মিছিলে এটেন্ড করিনি।
-আর আপনার পেন্সিল হিলের ক্ষুড়ে লেগে থাকা রক্তের দাগ?
থমকে গেলো অগ্নিলা। নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে বা পায়ের হিলে রক্তের দাগ লেগে আছে। চোখ তুলে সাইফের দিকে তাকিয়ে বললো,
-রাস্তার এক কুকুরের জখম হওয়া লেজে পা দিয়েছিলাম।
-কামড়ায়নি আপনাকে?
-আমার আগে কয়েকজনকে কামড়েছিলো। আমাকে না। তাই শুধু আমার জুতোর আঘাতটাই পেয়েছে। আমাকে কামড়ালে তো…এনিওয়েজ, এটা ইরেলিভেন্ট। আপনার ইনভেস্টিগেশনে সবকরমের সাহায্য করবো আমি। ডোন্ট ওয়ারি। কাল কখন যেতে হবে পুলিশস্টেশন জানিয়ে দেবেন, পৌছে যাবো। কথা বলে ভালো লাগলো। আসছি।
সাইফ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সামনের রহস্যময়ীর দিকে। অগ্নিলা সুন্দর একটা হাসি দিয়ে চলে গেলো। একটা ছোট শ্বাস ফেললো সাইফ। দুর থেকে ওদের দুজনকে একসাথে দেখলো অনু স্নিগ্ধতা দুজনেই। অনু স্নিগ্ধতার কাধে গুতো মেরে বললো,
-প্রথমবার ক্যাম্পাসে কোনো মেয়ের সাথে এতোক্ষন কথা বলতে দেখলাম সাইফ ভাইয়াকে। তোর ভাইয়ের চেহারাটা দেখ! এতোক্ষন দুজন কথা বলছিলো, ঠিকই ছিলো। অগ্নিলা ম্যাম চলে যেতেই ভাইয়ার চেহারাটা কেমন পানসে পানসে লাগছে না?
অনুর দিকে অবুঝের মতো তাকালো স্নিগ্ধতা। ইশারায় কিছু একটা বুঝালো অনু। কি বুঝে হেসে দিলো স্নিগ্ধতাও। সাইফ পেছন ফিরে দেখলো স্নিগ্ধতা হাসছে। কাধে ড্রয়িং ইনস্ট্রুমেন্ট ক্যারিয়ার আর হাতে ক্যানভাস। স্নিগ্ধতার ওই হাসিটুকোতেই বাকিসবকিছু ভুলে গেলো ও। এগিয়ে এসে বললো,
-কি ব্যাপার? টুকির চাঁদমুখে এতোসুন্দর হাসির কারন কি? হুম?
স্নিগ্ধতা হাসি থামালো। ভাইয়ের বাম বুকপকেটের দিকটা আলতো করে ঝেড়ে দিতে দিতে বললো,
-অগ্নিলা ম্যাম।
কিছু না বুঝে থেমে রইলো সাইফ। পরপরই ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি টানলো। বোনকে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে এলো ভার্সিটি থেকে।
•
ছোট্ট ড্রয়িংরুম। টিভিতে টম এন্ড জেরি চলছে। স্নিগ্ধতা ফ্লোরে বসেবসে চিপস খাচ্ছে, টিভি দেখে হাসছে। আর সাইফ সোফায় বসে ওর চুলে তেল দিয়ে দিচ্ছে, ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। টিভির দিকে তাকিয়েই, মাঝেমধ্যে চিপস উচুতে ভাইয়ের মুখ অবদি তুলে দিচ্ছে স্নিগ্ধতা। সাইফও মুখ এগিয়ে খেয়ে নিচ্ছে চিপস। হঠাৎই স্নিগ্ধতা নড়েচড়ে বলে উঠলো,
-ভাইয়া দেখো, জেরির ডবল রোল!
-এইরে! এবার তো মনে হয় টম আরো বেশি কনফিউজড হয়ে যাবে!
-এমনিতেও তো টম কনফিউজডই থাকে। অবশ্য এমনটাই হওয়া উচিত! বেচারা কিউটপিউট জেরিকে একটু খাবার নিতে দিলে কি হয়? তাই তো এতো ঝামেলা হতো না!
সাইফ উল্টোস্বরে বললো,
-টম কেনো নিয়মের বাইরে যাবে? ওকে তো বাসার লোক পাহাড়াদাড় করে রেখেছে। এখন ওউ যদি জেরিকে চুরি করতে হেল্প করে, ওর দায়িত্বপালন তো আর হবে না।
-হেল্প না করলো, এটলিস্ট বাধা না দিক?
সাইফ নড়েচড়ে বসলো। বোনের দিকে ফিরে বললো,
-তো এখন তুই কি চাচ্ছিস, যে আইনের রক্ষক, সে আইনের ভক্ষক হয়ে যাক। এই টাইপ?
স্নিগ্ধতা নিজেও ভাইয়ের দিকে ফিরলো। বাবু হয়ে বসে বললো,
-তা কখন বললাম? আমি তো কেবল চাইলাম আইনের রক্ষক যখন নিজের দায়িত্বপালনে অসমর্থ থাকে, তখন অন্যকেউ যদি তার দায়িত্বটা পালন করে দিতে চায়, তাকে বাধা না দিক। বিড়াল তো ইঁদুরের পেট ভরিয়ে জীবসেবার মহৎ কাজটা করতে পারবে না। তো ওকে ওর খাবার জুগিয়ে নেওয়াতে বাধা কেনো দিচ্ছে? লাইক টম?
সাইফের কপালে ভাজ পরলো। শব্দ করে হেসে দিলো স্নিগ্ধতা। বললো,
-এটুকোতেই গুগলি খেলে? এই ভ্যাবলা সাইফ এহমাদকে কেউ কিন্তু বিয়ে করবে না ভাইয়া!
‘তবে রে!’ বলে সাইফ স্নিগ্ধতার কান আস্তে করে টেনে দিলো। স্নিগ্ধতা তখনও হাসছে। দুভাইবোনের খুনশুটি চললো কিছুক্ষন। একসময় সাইফ বললো,
-জানিস টুকি? তোর হাসিতে জাদু আছে। তুই হাসলে সামনের মানুষটাও তৃপ্তিতে হাসতে শিখে যায়। আমার বোনের বরটা অনেক কপাল করে পৃথিবীতে এসেছে।
-ফিলস্ স্যাড ফর ইওর বউ! আজ তুমি একটা খারুজ পুলিশ বলে ভাবিকে কোনোভাবে সৌভাগ্যবতী বলতে পারছি না। আহারে!
সাইফ আবারো হাসলো। স্নিগ্ধতা খালি চিপসের প্যাকেট হাতে উঠে দাড়ালো এবার। পিঠজুড়ে থাকা খোলা চুলগুলো ঘাড়ের সামনে দিয়ে বললো,
-খুব তো আমার বরের নাম নিলে। এবার বলো, এই তেলো চুলে, বেনী খুলে গেলে তোমার বোনকে দেখে কারো মনে বাকবাকুম পাখি ডেকে ওঠার সম্ভবনা কতো পার্সেন্ট? কেউ পছন্দ করবে এমনবেশীকে? হুম?
দরজায় নক পরলো তৎক্ষনাৎ। খোলা দরজার দিকে তাকাতেই চেহারায় থাকা হাসিটা নুইয়ে গেলো স্নিগ্ধতার। আরাফাত দরজায় দাড়িয়ে। যার চাওনিতে স্পষ্টভাবে বলা, ‘আমি তোমায় সর্বাবস্থায় ভালোবাসি স্নিগ্ধতা। সর্বাবস্থায়!’
#চলবে…

