নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা ১১.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা

১১.

-কিরে স্নিগ্ধতা? বললি না? লুকিয়ে লুকিয়ে শারাফ স্যারকে দেখে আঁকিয়েছিস ছবিটা?

আলিশার পাশে বসা মেয়েটার কথায় স্নিগ্ধতা কিছুই বললো না। কেবল মাথা নিচু করে রইলো। এক্ষেত্রে বলার কিছু নেইই ওর। এখনো অবদি যেসব ও ছবি আঁকিয়েছে, কোনোদিনও তার জন্য এতোটা অপ্রস্তুত হতে হয়নি ওকে। ওর ড্রয়িংটা নিয়ে ক্লাসজুড়ে কানাঘুষা চলছে। পরিকল্পনামাফিক স্নিগ্ধতাকে ছোট করতে পেরে বাকা হাসলো আলিশা। স্নিগ্ধতার আঁকানোর হাত এতোটাই নিখুত যে, মোটামুটি সবার কাছেই ছবিটার ব্যক্তি আর শারাফকে মিলসম্পন্ন বলে মনে হয়েছে। আর এ নিয়ে আলোচনা হোক, এমনটাই চেয়েছিলো ও।

শারাফ হাতের কাগজগুলো টেবিলে রেখে পেছনের বেঞ্চের দিকে এগোলো। অগ্নিলা, আবির মুচকি হেসে নিজেদেরমতো পেপার্স ঠিক করা আর মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পরলো। নিজের বিষয়গুলো নিজেই সামলাতে পছন্দ করে শারাফ। এগিয়ে গিয়ে ক্যানভাসটা হাতে নিলো ও। মনোযোগ সহকারে দেখে নিলো ছবিটা। ওর সেই কানে হাত দিয়ে সরি বলার ভঙ্গিমা। এমনকি হাতের কাটাদাগ অবদিও বাদ যায়নি ছবিতে। নিশ্চিত হলো, এটা ওরই ছবি। ক্যানভাসটা নিয়ে স্নিগ্ধতার দিকে বাড়িয়ে দিলো। চোখ তুলে তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফের শান্ত সৌজন্যমুখ। ছবিতে আঁকা বাচ্চামোর চেহারাটাই ওই সৌজন্য হাসিতে বাস্তব পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে গিয়েছে অতি সুন্দরভাবে। শারাফ বললো,

-আই উইশ এটা আমি হতাম। আমার প্রানপ্রিয় বন্ধুরা এমন কানধরা আমাকে দেখে ইজিলি মজা নিতে পারতো। বাট সরি টু সে, এমন ভঙ্গিতে ওনার সামনে বসেবসে নিজের ড্রয়িং করানোর ইচ্ছা, সময় কোনোটাই আমার নেই।

স্নিগ্ধতার চোখমুখে কিঞ্চিৎ অনুরাগ। চুপচাপ হাত বাড়িয়ে ক্যানভাসটা নিলো ও। আলিশা হাইবেঞ্চে দুহাত রেখে তালুতে মুখ গুজে বললো,

-তারমানে স্নিগ্ধতাই লুকিয়ে লুকিয়ে এঁকেছে তোমাকে। বি কেয়ারফুল শারাফ। ওর নজরে থাকা মানে কিন্তু বেশ ডেন্জারাস বিষয়। একজন তো খু*নই হলো, আরেকজনকে সেই খু*নের দায়েই ফাঁসতে হলো। এ মেয়ে তার পুলিশ ভাইয়ের ক্ষমতা ভালোমতোই জাহির করতে জানে জানোতো।

ওর কথায় গায়ে আগুন ধরে গেছে যেনো অনুর। মুখ খোলার জন্য উদ্যত হতেই শারাফ ধীরস্থির গলায় বললো,

-উনি অন্যকে নজরে এনে ক্ষমতা জাহির করছেন নাকি অন্যের নজর থেকে বাচতে ক্ষমতা জাহির করছেন, সেটা আপনি কেনো জাহির করছেন বুঝলামনা। নাকি কোথাও থেকে নজর সরানোর বিদ্যা শিখেছেন বলে আপনিই আপনার ও*ঝাবিদ্যা জাহির করতে চাইছেন ক্লাসে? কোনটা?

পুরো ক্লাস শব্দ করে হেসে দিলো। অতি সুক্ষ্মভাবে কারনসমেত অপমান করায় আলিশা বলতে পারলো না কিছুই। কেবল দাতে দাত চেপে গেলো। অনু আস্তেধীরে স্নিগ্ধতাকে বললো,

-ঠিক হয়েছে! একদম ঠিক জবাবটা দিয়েছে। সবসময় কি করে তোকে অপমান করা যায়, সেই ধান্দায় থাকে না ও? পুরো ক্লাসের সামনে আজকে উচিত শিক্ষাটা দিলো স্যার। অবশ্য লজ্জা হয়েছে কিনা এ নিয়ে এখনো সন্দেহ আছে আমার।

স্নিগ্ধতা চুপ। সামনে থাকা ড্রয়িংয়ের উল্টোপিঠ দেখছে ও। শারাফ আবারো বললো,

-আর আমি আপনাদের লেকচারার না হলেও, সিনিয়র হই। তাই আমার কাছে আপনার বলা নাম আর তুমি সম্বোধনটা গ্রহনযোগ্য হবে কিনা এদিকটা ভেবে কথা বলবেন, এমনটা আশা করেছিলাম আমি। এনিওয়েজ! যদি আপনাদের অফটপিক আলোচনা শেষ হয়ে থাকে, আমরা আমাদের সার্ভে কন্টিনিউ করতে চাই। মে উই?

শারাফ ইশারা করলো অগ্নিলাকে। ও সহ বাকিসবাই মিলে জরিপের প্রশ্নোত্তর পর্বের কাগজগুলো হাতেহাতে দিয়ে দিলো শিক্ষার্থীদের। স্নিগ্ধতা নিচদিক তাকিয়ে। একফাকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো শারাফ। আকাশটা উজ্জ্বল। তবে ওর কথায় কারো মনে তো মেঘ জমেছে, কেউ তো সে মেঘের খামে অভিমানী ডাকপিয়ন পুষেছে, তা বুঝলো। এ নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই ওর।

ক্লাস শেষে তড়িৎগতিতে বেরিয়ে আসলো স্নিগ্ধতা। অনু ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত ছিলো। স্নিগ্ধতার হাতে সেই ড্রয়িংটা মোড়ানো। এটার সাথে কি করবে, ভেবে পাচ্ছে না ও। এতোকিছু হবে জানলে, কিছুতেই এটা আঁকাতো না। অবশ্য আঁকানোর সময় কি এতোসবকিছু চিন্তাভাবনা করে আঁকানো যায়? দ্রুত পা চালিয়ে চলে আসলো মুক্তমঞ্চে। এদিকে ফাইন আর্টসের কেউই নেই আপাতত। আগমনী নাটক মঞ্চায়নের জন্য রিহার্সেল করছে নাট্যকলার দু তিনজন শিক্ষার্থীরা। স্নিগ্ধতা সামনের সিড়িতে বসে গেলো। হাতের মোড়ানো ড্রয়িংটা পাশে রাখলো। হাত ঘেমে উঠেছে, অস্থির লাগছে ওর। আজব অনুভুতি হচ্ছে। শারাফ ওর আঁকানো ড্রয়িংটা অস্বীকার করলো বলে খারাপ লাগছে, নাকি রাগ লাগছে বুঝে উঠতে পারছে না ও। হঠাৎই মঞ্চ থেকে ডাক লাগালো এক মেয়ে। চমকে তাকালো স্নিগ্ধতা। মেয়েটা জোরেসোরে বললো,

-একটু এদিকে আসবে প্লিজ?

নিজের দিকে আঙুল তুলে স্নিগ্ধতা জিজ্ঞাসা করলো ওকেই ডেকেছে কিনা। মেয়েটা সায় দিলো। একটা ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো স্নিগ্ধতা। তারপর কাগজটা হাতে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগোলো মঞ্চের দিকে। শর্ট ফতুয়া, ধুতি পরা মেয়েটা বললো,

-পরিচয় দাও নিজের।

নাম, সাব্জেক্ট, ব্যাচ বলে নিজের পরিচয় দিলো স্নিগ্ধতা। মেয়েটা আপাদমস্তক দেখে নিলো ওকে। তারপর হেসে দিয়ে বললো,

-চিল! আমরাও সেইম ব্যাচ। র্্যাগট্যাগ দেবোনা তোমাকে। শুধু একটা ছোটখাটো হেল্প করো।

-আমি তোমাদের কি হেল্প করতে পারি?

-বলছি। একচুয়ালি নাটকের বেশিরভাগ কাস্টদেরই রিহার্স করা শেষ। ওরা সবেই বেরিয়ে গেছে। এখন আমাদের বাকি কাস্টদের যেটুকো রিহার্স বাকি, তার একাংশে আরেকজনকে লাগবে। এখন যেহেতু কেউই নেই, তোমাকেই একটু ডায়লগটা বলতে হবে।

-আমি কিভাবে…

-ডোন্ট প্যানিক প্লিজ! তেমন কিছুইনা। জাস্ট দাড়িয়ে থাকবে আর দেখেদেখে দুলাইন ডায়লগ বলবে। কম্প্লিট প্লটে ওইটুকো ডায়লগ আর চরিত্র ছাড়া বাকিরা পারফর্ম করতে চাইছে না। আর আমরা নিজেরা সাইডএক্ট করতে গেলে জিনিসটা বিগড়ে যাবে পুরোটাই। তাই তুমি শুধু স্ক্রিপ্ট দেখেদেখে লাইনদুটো বলে দেবে এটুকোই। পারবে না?

ক্লাসে অহেতুক ঝামেলার পর, এখানে পার্টিসিপেট করে একটু মজা করাই যায়। তাছাড়া সাইফের আসা এখনো দেরি। এসব ভেবে আর মানা করতে ইচ্ছে করলো না স্নিগ্ধতার। মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেলো ও। ওকে স্ক্রিপ্ট বুঝিয়ে জায়গামতো দাঁড়িয়ে গেলো ওরা তিনজন। ডায়লগের কাগজটা হাতে নিয়ে দুবার পড়লো স্নিগ্ধতা। ওরা রিহার্স করতো শুরু করলো। স্নিগ্ধতা সবে দেখেদেখে নিজের ডায়লগটা বলবে, তখনই দেখতে পেলো মঞ্চের ওপারে ঠিক সোজাসুজি শারাফ দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। ঘামে ভেজা ওর শার্টটার বগল। শারাফের সাথে চোখাচোখি হওয়ার আগেই চোখ বন্ধ করে নিলো স্নিগ্ধতা। কিন্তু হায়! বন্ধ চোখেও সেই একই বিম্ব আঁকা। সেটাও অতি সন্নিকটে। স্নিগ্ধতা চোখ বন্ধ রেখে বললো,

-বন্ধ চক্ষুজোড়ার পল্লবে যতোবার তোমারে আঁকিয়াছি, তুমি যেথায়, তাহা হইতে বহুগুন নিকটে তোমারে আঁকিয়াছি।

দ্বিতীয়বার ডায়লগের সময় হতে স্নিগ্ধতা বললো,

-চক্ষু বন্ধ করিয়া যতোবার তোমারে দেখিয়াছি, তুমি যাহা, তাহা হইতে বহুগুন স্নিগ্ধতম তোমারে দেখিয়াছি।

শেষ করে চোখ মেললো স্নিগ্ধতা। তৎক্ষণাৎ বিস্ময়ে বড়বড় হয়ে গেলো ওর চোখ। ঠিক দুপা সামনে শারাফ প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে দাড়িয়ে। ঘাড় কাত করে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। ওকে চোখ মেলতে দেখে বললো,

-আর ইউ শিওর?

কেমন যেনো অজানা অভিমানে চোখ ভরে উঠলো স্নিগ্ধতার। ধরা গলায় কোনোমতে বললো,

-উহুম। ভুল বলেছি। যে স্নিগ্ধতার রঙ চেনেনা, তাকে স্নিগ্ধতম বলা বারণ। স্নিগ্ধতার চোখে তার চিত্রায়ন নিষিদ্ধ!

শারাফ একপা বাড়িয়ে স্নিগ্ধতার ঘাড়ের দিকে ঝুকলো। বড়বড় চোখে ওর দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফের ঘাড়ের বাম দিকটা ওর কাধের একদম পাশেই। কলারের ভাজটায় কোনোভাবে লেগে যাওয়া কলমের ছোট্ট আঁচড়টা অবদি দেখতে পারছে ও। শারাফ ওর কানের দিকে মুখ এগোতেই অপ্রস্তুত অবস্থা এড়োতে স্নিগ্ধতা কিঞ্চিৎ বাকিয়ে নিলো মাথা। ঠোঁট কামড়ে হেসে মুখ আরো এগোলো শারাফ। স্নিগ্ধতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,

-নিজের নিষেধাজ্ঞা নিজেই অমান্য করেছেন আপনি। আমার কি দোষ?

কথা শেষ করেই স্নিগ্ধতার পেছনে হাতে থাকা মোড়ানো ড্রয়িংটা নিয়ে সরে দাড়ালো শারাফ। পুরোই হচকিয়ে গেছে স্নিগ্ধতা। এতোক্ষণে ওর বিশ্বাস হলো, বাস্তবিকই শারাফ এসেছে। আগের জায়গায় তাকিয়ে খুজলো শারাফকে। না সেখানে নেই সে। শারাফ ওর চোখে চোখ রেখে বললো,

-কাউকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে এভাবে তার ড্রয়িং করাটা, নট ফেয়ার মিস।

আটকে রইলো স্নিগ্ধতা। নাট্যকলার বাকি তিনজন মুচকি হেসে মঞ্চ থেকে নেমে ব্যাগ গোছাতে লাগলো নিজেদের। কথাগুলো ডায়লগের ছিলো সেটা বাকিরা বুঝলেও শারাফ কিভাবে নিয়েছে তা বুঝতে বাকি রইলো না স্নিগ্ধতার। হাতের স্ক্রিপ্টের কাগজটা তুলে ধরে বললো,

-এ্ এগুলো…

-জানি জানি। আমাকে ইন্ডিকেট করেই বলেছেন। তবুও! যেটা উচিত না, সেটা তো আমি বলবোই! মোরওভার, নিজের রঙগুলোকেও এতোবেশি পার্ফেক্ট ভাবতে নেই, যা দিয়ে অন্যকারো মুগ্ধতা জাজ করা যায়। টোটালি নট ফেয়ার!

-দেখুন…

-ইটস্ ওকে। আই’ল মেক ইট ফেয়ার এনাফ! আপাতত এটা আমি নিয়ে যাচ্ছি। পরেরবার আঁকানোর প্রয়োজনবোধ করলে আমাকে জানাবেন কেমন? আপনার সাথে আইমিন আপনার কোনো শিল্পে জড়িত থাকার সৌভাগ্যকে কি করে অস্বীকার করি বলুন?

ওর কথায় থমকে রইলো স্নিগ্ধতা। একটু থেমে শারাফ আবারো ঝুকলো ওর দিকে। শীতলস্বরে বললো,

-ওই চাওনিকে আমাতে আটকাতে, নিজেকে কিংবা বাকি সবকিছুকে থামিয়ে দিতে আমি কিন্তু বিন্দুমাত্র পিছপা হবো না মিস স্নিগ্ধতা। আমিও দেখতে চাই, এই বন্ধ চোখজোড়া কতোটা কাছের আমাকে আঁকায়। এই স্নিগ্ধতা ঠিক কতোটুকো স্নিগ্ধসিক্ত আমাকে দেখতে পায়। আর তা দেখার জন্য অনেকটা অধীর আমি। ট্রাস্ট মি!

কথা শেষ করে একহাত প্যান্টের পকেটে পুরলো শারাফ। স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়েই পেছোতে লাগলো যেদিক থেকে এসেছিলো, সেদিকে। একদৃষ্টিতে ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। ওর জীবনে জরিয়ে যাওয়া চরিত্রগুলো কেবল পেছনে ফেলে চলে যেতে জানে। ও তাদেরকে কেবল সরিয়ে দিতে জানে। এই প্রথমবার কেউ ওকে সম্মুখে রেখে পেছোচ্ছে। নাকি এগোচ্ছে? কে জানে!

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here