নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ৩৫.

0
1

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৩৫.

রাত দশটা। সাইফ পকেটে দুহাত গুজে ব্যালকনিতে দাড়িয়ে। ওর মনমস্তিষ্কে অস্থিরতা। স্নিগ্ধতা নবীনবরন শেষে হবার সাথেসাথে ওকে নিয়ে আসতে বলেছিলো ভার্সিটি থেকে। কিন্তু অগ্নিলার সাথে ছিলো বলে আধঘন্টার মতো দেরি করে ফেলে সাইফ। কিন্তু এই আধঘন্টার মধ্যে স্নিগ্ধতার ওপর এতো ভয়ানক আঘাত আসতে পারে, কল্পনাতেও ছিলো না ওর। মোহিনী যখন স্নিগ্ধতার সাথে কথা বলছিলো, ঠিক সেসময়ই অগ্নিলার সাথে ওখানে পৌছেছিলো ও। কিন্তু বেশ কয়েককদম পেছনে থাকায় বোনের ওপর আসা ভয়াবহ বিপদকে সামাল দেওয়ার অবস্থানে ছিলো না। সঠিক সময়ে শারাফ এসে সামলে নেয় স্নিগ্ধতাকে। মোহিনীর চুপ হয়ে যাওয়া, আলিশার ক্ষিপ্ততা, শারাফের নিরব প্রতিবাদ আর সবশেষে স্নিগ্ধতাকে ভালোবাসি বলা, সবশেষে স্নিগ্ধতার জ্ঞান হারিয়ে শারাফের হাতে পরা, পুরো ঘটনাটা কিছুটা দুরে দাড়িয়ে দেখেছে ও। অগ্নিলার বাধায় এতোটা সময় চুপ থাকলেও বোনকে জ্ঞান হারাতে দেখে নিজেকে সংবরন করতে ব্যর্থ হয় সাইফ। উন্মাদের মতো এগিয়ে শারাফের বাহুডোর থেকে আগলে নেয় স্নিগ্ধতাকে। শারাফ বাধা দেয়নি। সাইফ স্নিগ্ধতার গালে আলতো চড় মেরে বললো,

– টুকি? এই টুকি? চোখ খোল। টুকি?

অগ্নিলা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এগিয়ে দিলো ওর দিকে। সাইফ স্নিগ্ধতাকে ঘাসের ওপর বসে একহাতে জরিয়ে নিলো। তারপর তালুতে পানি নিয়ে ছিটিয়ে দিলো ওর চোখেমুখে। কিয়দক্ষণ পরেই জ্ঞান ফেরে স্নিগ্ধতার। চোখ মেলে ভাইকে দেখে কেদে দিলো ও। সাইফের শার্ট মুঠো করে নিয়ে বললো,

– তুমি এসেছো ভাইয়া? দেরি কেনো করলে? দেরি কেনো করলে তুমি? ওরা…

শেষ না করে বাচ্চাদের মতো কাদতে লাগলো স্নিগ্ধতা। সাইফ শক্তকরে ওকে বুকে আগলে নিলো নিজের। কি হলো ওর, নিজেও কেদে দিলে এবারে। বিস্ময়ে ওর কান্না দেখতে লাগলো প্রত্যেকে। অগ্নিলা অবাক হলো না। বোনের প্রতি সাইফের যেমন ভালোবাসা, স্নিগ্ধতাকে এমন আহ্লাদী মানায়। সাইফ বললো,

– আমাকে ক্ষমা করে দে বোন। সত্যিই অনেক দেরি করে ফেলেছি। যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে আজ আগলে রাখতে পারিনি তোকে। ক্ষমা করে দে আমাকে।

স্নিগ্ধতা ভাইয়ের বুকে মুখ গুজে ফোঁপাচ্ছিলো। ওর লালচে চোখমুখ দেখে শারাফ হাটুগেরে বসলো। হাত বাড়িয়ে স্নিগ্ধতার চুলে আঙুল চালিয়ে গুছিয়ে দিলো চুলগুলো। ওর স্পর্শ বুঝে আরো শক্তমুঠো করে সাইফের শার্ট ধরলো স্নিগ্ধতা। ওর শরীর কাপছে। শারাফ বললো,

– রিল্যাক্স। কিছু হয়নি।

কান্না থামিয়ে জোরেজোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো স্নিগ্ধতা। শারাফ সাইফের দিকে তাকিয়ে বললো,

– আপনার বোনকে পুরোপুরিভাবে আগলে নেওয়ার দায়িত্ব আমি নিতে চাই মিস্টার এহমাদ। আমি স্নিগ্ধতাকে ভালোবাসি।

বিস্ফোরিত চোখে তাকালো স্নিগ্ধতা। বাকিসবার চেহারাতেও বিস্ময়। এমন পরিস্থিতিতে শারাফ এই কথাটা বলবে, সেটা কেউই আশা করেনি। মুহিব হাত মুঠো করে নিলো নিজের। অনুকে ধীর গলায় ‘আসছি’ বলে চলে গেলো সেখান থেকে। নাইম আর অনু রয়ে গেলো। সাইফকে নিরত্তর দেখে উঠে দাড়ালো শারাফ। বললো,

– স্নিগ্ধতাও আমাকে ভালোবাসে মিস্টার এহমাদ। বাকিটা আপনার বিবেচনায় ছাড়লাম। আসছি।

স্পষ্টভাবে নিজের কথাগুলো বলে শারাফ চলে যায়। কেবল ওই কানে, মোহিনী-আলিশার ওপর আসা ক্ষোভকে সালাম দিয়ে ওই মুহুর্তে সাইফে এসব বলা ওর জন্য কতোটা কঠিন ছিলো। তাইতো ওটুক সময়ে ওর নিজেকে সামলানোর পরিণয় পুরোটা প্রত্যক্ষ করে স্বপ্নীল। স্নিগ্ধতাকে নিয়ে বাসায় ফেরে সাইফ। আগে স্নিগ্ধতাকে পাঠায় ফ্রেশ হতে, তারপর নিজহাতে নুডুলস বানিয়ে খাওয়াতে লাগলো ওকে। স্নিগ্ধতা শাড়ি পাল্টে ধুতি, ফতুয়া পরেছে। এরমাঝে একবারো চোখ মেলায়নি ভাইয়ের সাথে। কেবল ইতস্তত করতে লাগলো। সাইফ খাওয়ানোতে ব্যস্ত থেকে বললো,

– রেস্ট দরকার তোর টুকি। এতোকিছু ভেবে মাথাটাকে ব্যস্ত রাখতে বলিনি।

– ত্ তুমিও খাও?

– শারাফ যা বলে গেলো, তা সত্যি?

হুট করে এমন প্রশ্ন শুনে স্নিগ্ধতা বিশম খেলো। সাইফ পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো ওকে। ধরফরিয়ে গ্লাসটা হাতে নিয়ে কয়েকঢোকে ওটা শেষ করলো স্নিগ্ধতা। সাইফ আবারো ওর মুখের সামনে নুডুলস তুলে ধরে বললো,

– ভালোবাসিস শারাফকে?

দুদন্ড এদিকওদিক তাকিয়ে দৃষ্টিচুরি করলো স্নিগ্ধতা। তখনই বিছানায় থাকা সাইফের ফোনটা বেজে উঠলো। স্নিগ্ধতা তাকিয়ে দেখে, সেখানে আরাফাত লেখা। সাইফ একপলক ফোনের দিকে তাকিয়ে, আরেকপলক বোনের দিকে তাকালো। স্নিগ্ধতা শীতলস্বরে বললো,

– উনি ঠিকই বলেছেন ভাইয়া। আমি সত্যিই ওনাকে ভালোবাসি।

চোখ বন্ধ করে একটা বড় শ্বাস নিলো সাইফ। আরাফাতের কল কেটে, ঠোটে বড়সড় একটা হাসি ফুটিয়ে বললো,

– ডোন্ট ওয়ারী। তোর লাইফে সেই আসবে, যাকে তুই চাস। আমার কেবল তোর সুখ চাই। আর কিছুনা। শারাফ অনেকভালো একটা ছেলে। তোর পছন্দে খুঁত নেই কোনো। ভালো থাকবি ওর সাথে।

ছলছল চোখে খাবার মুখে তুললো স্নিগ্ধতা। সাইফের চোখজোড়াও চিকচিক করছে। স্নিগ্ধতা টের পেলো, ওর ভাইয়ের মনে যন্ত্রণা হানা দিচ্ছে। সাইফ বললো,

– ও কি? চোখে জল কেনো? এখনি এতো খুশি হোস না। কোন ভাইকে দেখেছিস বোনকে এতো ইজিলি ছাড়তে? আমিও এতো সহজে তোকে ছাড়ছি না। আগে নীলাকে এ বাসায় আনি, তারপর তোকে বিদেয় করবো। এর আগে না! সে ইয়াকীন শারাফ যতোই আকুতিমিনতি করুক না কেনো!

স্নিগ্ধতা চোখের জল ছেড়ে দিলো। সাইফ জরিয়ে ধরলো ওকে। স্নিগ্ধতার অগোচরে চোখের দুফোটা জল মুছলো। তারপর খাওয়ানো শেষ করে চলে আসলো ও ঘর থেকে। নিজের রুমের ব্যালকনিতে দাড়াতেই বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো সাইফের। শারাফ-স্নিগ্ধতা একে ওপরকে ভালোবাসে, তাতে ওর কোনো সন্দেহ নেই। অনেক আগেই এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো ওর কাছে। আজ কেবল মৌখিক স্বীকারোক্তি পেলো, এই যা। ওর অনুধাবনই সঠিক। স্নিগ্ধতা কাউকে ভালোবেসেছে। এমন কাউকে ভালোবেসেছে যে ওকেও অনেকবেশি ভালোবাসে, আগলে রাখে। একটা ভাইয়ের কাছে এটাই তো সর্বোচ্চ সুখ! এরচেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে? কিন্তু সাইফ সে সর্বোচ্চসুখী ভাইটা হতে পারলো না। বন্ধু পরিচয়টা ওর ভাই পরিচয়ের সব সুখকে ফিকে করে দিলো। দুহাতে ব্যালকনির রেলিং মুঠো করে ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো সাইফ। অস্ফুটস্বরে বললো,

– আমাকে ক্ষমা করে দিস আরাফাত। আ’ম সরি।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে হতবাক শারাফ। টেবিলে সব খাবার সাজান তবে স্বপ্নীলের একটা মেয়েও নেই ডাইনিংয়ে নেই আজ। সেজান সাহেব আর নাহিদ সাহেব নিজেদের মতো করে খাচ্ছেন। শারাফ জানে, ওনারা এতোবেশি গা ছাড়া ভাবে আছেন মানেই এদিকটায় ওর হাত আছে আর ওকেই সমাধান করতে হবে। শারাফ মনে করার চেষ্টা করলো কি ঘটেছে স্বপ্নীলে। আগেররাতে বাসায় ফিরে ও যে রাগটা দেখিয়েছে, সেটার কথা মনে পরতেই চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো ও। বললো,

– মা খায়নি বাবা?

– তোর মার জন্য মেহেরুন রুমেই খাবার পাঠিয়েছিলো।

– বাকি সবাই কোথায়?

– মেহেরুনের ঘরে। সকাল থেকেই দেখছি স্বপ্নীলের নারীসমাজ গুজুরগুজুরে নেমেছে। সামলে শারাফ।

নাহিদ সাহেবের কথায় হতাশ হয়ে মাথা নাড়লো শারাফ। এতোবেশি বাড়াবড়ি না করলেও পারতো। অতঃপর সিড়ি বেয়ে উঠে চলে এলো মেহেরুনের ঘরের দিকে। দরজা থেকে দেখলো মেহেরুন একধ্যানে মেঝের দিক তাকিয়ে আছে। পাশে মিসেস নাহিদও আছেন। শায়েরী এককোনের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মোবাইলে মগ্ন। রুমের এককোনে থাকা দোলনাটায় পাঁচসাতটা চকলেট কোলে করে মুসকান বসে। শারাফ শুকনো ঢোক গিলে দরজায় নক করলো। চোখ তুলে তাকালো বাকিসব। শারাফ ভেতরে ঢুকে, একহাতে নিজের কান ধরে, মিইয়ে যাওয়া গলায় বললো,

– সরি?

শায়েরী আর মিসেস নাহিদ একসাথে ওরদিক এগিয়ে পথ আগলে দাড়ালো। মিসেস নাহিদ বললেন,

– নট এক্সেপ্টেড। নাও গেট আউট।

শারাফ কান ধরে রেখেই মেহেরুনের দিকে উকি দিলো। মেহেরুন ওর আধোআধো চাওনির ভাষা বুঝলো। সেগুলো বলছে, ‘কিছু বলো মেহুভাবী? এরা আমায় তোমার রুম থেকে বের করে দিচ্ছে।’ ওকে আরো অনেকগুলো কথা শুনিয়ে দিলো শায়েরী। শারাফ এই প্রথমবার শায়েরীর কথায় প্রতিবাদ করলো না। ও বেশ জানে, ওর সরি বলাতেই মেহেরুনের রাগ গায়েব। আপাতত শো অফ চলছে। তবুও কাদোকাদো চাওনি স্থির রাখলো ও। আর এটাই সত্যি। মেহেরুনের রাগ মিটিছে অনেক আগেই। এবারে এগিয়ে আসলো ও। বুকে হাত গুজে শারাফকে বললো,

– গিল্টিফিল করছো?

– প্রচুর ভাবী! এই দেখোনা? কান ধরেছি তো!

– ওকে ফাইন। আমার একমাত্র প্রশ্নের ঠিকঠাকমতো জবাব দিলে ক্ষমা করবো। রাজি?

– আরেহ কবুল! তুমি শুধু বলো কি জানতে চাও!

শারাফের কথা শুনে মেহেরুন ঠোঁট টিপে হাসি আটকালো। সিরিয়াস ভঙিমায় বললো,

– ওকে। কি নাম তার?

শারাফ ভ্রুকুচকালো। বললো,

– নাম? কার নাম?

– তোমার ওয়ালেটে থাকা শালুক ফুলের।

চকিত হলো শারাফ। কাল বাসায় ফিরে রাগের মাথায় চেইন্জ করা হয়নি ওর। দ্রুতগতিতে পরে থাকা জ্যাকেট, প্যান্টের পকেটে হাত পুরলো ও। আর ওয়ালেট না পেয়ে হতাশ চোখে তাকালো মেহেরুনের দিকে। মেহেরুন শারাফের সামনে ওর ওয়ালেটটা তুলে ধরলো। সেখানে আলপনা দিতে বসা স্নিগ্ধতার ঘাড় ঘোরানো ছবি। যেটা অতিযত্নে তুলে রেখেছে শারাফ। পাশ থেকে মুসকান চকলেটমাখা মুখে বললো,

– তোমার রুমের মেঝে থেকে মানিব্যাগটা আমি কুড়িয়ে দিচ্ছিলাম শারাফ ভাইয়া। কিন্তু তার আগেই মেহুভাবী নিয়ে নিয়েছে। আর আমাকে চকলেটও দিয়েছে দেখো!

– তোমার শারাফ ভাইয়ার ওয়ালেট ছোড়ার ঘটনা এইবারই প্রথম ছিলো মুসু। সুযোগ হাতছাড়া করি কি করে বলো? রাগ থেকে যদি দারুন কিছু হয়, তবে রাগই ভালো। কি বলো দেবরজি?

ভ্রু নাচিয়ে কথাগুলো বলে হেসে দিলো মেহেরুন। সবাই মিলে হাসতে লাগলো আর শারাফ কোমড়ে হাত দিয়ে দাড়িয়ে রইলো। লোকে ঠিকই বলে, রাগ সবসময় হিতের বিপরীত ঘটায়। মেহেরুন হাসি থামিয়ে বললো,

– বলবে না ওর নাম শারাফ? আমি বলবো?

– মানে? তুমি চেনো ওকে?

– তুমি যেই ডোবায় ডুবেডুবে জল খাচ্ছে, সে ডোবার খবর নেবোনা, তা কি করে হয় বলো? তোমার সে জলধিতে ফোটা শালুক ফুলের নাম স্নিগ্ধতা এহমাদ। নীলার ননদ। রাইট?

শারাফ শায়েরীর দিকে তাকালো। ওর বুঝতে বাকি নেই শায়েরীর সেদিন সাইকেল থেকে পরে যাওয়ার ঘটনা থেকে স্নিগ্ধতাকে চেনে ও। আর বাকিটা অগ্নিলাকে জিজ্ঞেস করেছে। কপাল দুআঙুলে চেপে ধরলো শারাফ। একটা ক্ষুদ্রশ্বাস ফেলে বললো,

– এবার? কি চাই?

– বিয়েএএএএএ!

তিনজনে মিলে চেচিয়ে উঠলো একসাথে। পুরো স্বপ্নীল নড়েচড়ে উঠলো যেনো। শারাফ কানে হাত গুজে চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। ওর অদৃশ্য সত্ত্বা যেনো ওকে জানান দিলো, এই তিনপ্রকার তান্ডবের থেকে রেহায় পেতে, তোর সত্যিই স্বপ্নীলে স্নিগ্ধতাকে প্রয়োজন বস! শি ইজ ইওর ইমারজেন্সি!

শুভ্রতায় মোড়ানো স্নিগ্ধতার ঘরটায় রোদ এসেছে। সকালটার সতেজতা যেনো আসেই রাতের নিকষতাকে সরিয়ে দিতে। ক্লাস নেই স্নিগ্ধতার আজ। সাইফ বেরিয়েছে সকালেই। যাবার আগে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে নক করে গেছে ওর দরজায়। আড়মোড়া ছেড়ে স্নিগ্ধতা বিছানা ছেড়ে নামলো। আজও ওর বারান্দার রেলিংয়ে সাদা কবুতরদুটো লেজ মেলে বসেছে। নিশব্দে এগোলো ও। গুনগুনিয়ে গাইলো, ‘ও সে মানে, না মানা…’ তারপর তুলিদানী থেকে একটা বড়সড় তুলি নিলো একটা। ওটাকে কালো জলরঙে চুবিয়ে গাইলো, ‘আঁখি ফেরাইলে বলে…’ এটুকো গেয়ে স্নিগ্ধতা তুলির রঙ ছিটিয়ে দিলো পাখিদুটোকে লক্ষ্য করে। ডানা ঝাপটে উড়ে গেলো পাখিদুটো। ওদের ডানায় রঙ লেগেছে। স্নিগ্ধতা সাদা কবুতরের ডানায় কালো রঙটার দিকে নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ওর হৃদয়ে সুর বাজছে, ‘না, না, না…’

মৃদ্যু বাতাসে পাশের ক্যানভাসের পাতা উড়ে উঠলো। একমুহূর্তের জন্য স্নিগ্ধতার মনে হলো, নির্দাগ ক্যানভাস, হরেকরকম রঙ ওকে ডাকছে। ওর উদ্দেশ্যপুরনে না। নিজেদের সাজানোর উদ্দেশ্যে। স্নিগ্ধতা আঁকানো শুরু করলো। খুটিয়ে খুটিয়ে, আদরে আদরে প্রতিটা আঁচড় দিলো ক্যানভাসে। প্রায় ঘন্টাদুই পর থামলো ওর হাত। নিস্পলক চাওনিতে ক্যানভাসটার দিকে তাকালো ও। এই চেহারাটাকে এতো যত্নে নিজের ক্যানভাসে এটে দেবে, কোনোদিনও ভাবেনি ও। অথচ আজ তাই হয়েছে। কেনো? এই চেহারা ওর মনজুড়ে আঁকা হয়ে গেছে বলে? ইয়াকীন শারাফ নামটা ওর সর্বত্র জুড়ে গেছে বলে? কই ও তো কখনো চায়নি এমনটা। তাহলে কি করে হলো? উচু টুলটায় বসে, হাটুতে কনুই ঠেকিয়ে, সে হাত কপালে ঠেকালো স্নিগ্ধতা। ওর নিজের আঁকানো সবরকমের ছবি ওর জন্য একেকটা ভালোবাসা। কিন্তু আজ এই ছবিটায় ভালোবাসা শব্দটা জুড়তে ওর অস্থিরতা বাড়ছে। এক পর্যায়ে উঠে ক্যানভাসের পাতাই উল্টে ফেললো ও। দরজায় নক পরলো তখনই। আয়নায় তাকালো স্নিগ্ধতা। রঙ দিয়ে কপাল, হাত একাকার অবস্থা। এ সময় কারোর আসার কথা না। তাই কৌতুহলী হয়ে বিছানা থেকে ওড়না নিয়ে, গিয়ে খুলে দিলো দরজা। কিন্তু দরজার ওপারের মানুষটাকে দেখে থমকে গেলো ও। ওকে দেখে ছলছল চোখে তাকিয়ে, ঠোঁটে হাসি টানলো সে মানুষটা। বললো,

– নিজেকে এইচআইভি পজিটিভ বলার মতো মিথ্যে বলে হলেও, তোমার থেকে আমাকে দুর করার কারন ঠিক কোনটা স্নিগ্ধতা? আমাকে ভালোবাসোনা বলে? নাকি অন্য কাউকে ভালোবাসো বলে? কোনটা বলোতো?

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here