#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৪৮.
হসপিটালের বেডে লালচে রোদ পরছে। জানালা দিয়ে আসতে চাওয়া সরাসরি রোদটাকে পর্দা আটকে দিয়েছে। নার্স এসে পর্দা সরিয়ে দিতেই চমকে চোখ খুলে ফেললো ডক্টর নাজমুল। অস্থির শ্বাসপ্রশ্বাস তার। তার সাথে ঘটা ঘটনা যাতে লোক জানাজানি না হয়, সেজন্য সাইফ প্রথমদিন আর হাসপাতালে নেয়নি তাকে। কিন্তু তার শারীরিক যন্ত্রনা ক্রমশই অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছিলো। শরীরের সূচালো ছিদ্র আর ঘা-পোড়ার ইনফেকশন সহ্য করা যাচ্ছিলো না আর। শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে দফায় দফায় রক্ত-পুঁজ ঝরতে দেখে ঘৃনা ধরে গেছে তার নিজেরই। এখন আর লোক জানাজানি হওয়ারও কিছু বাকি নেই। তাই উপায়ন্তর না দেখে গতদিন তার স্ত্রী তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে। বেডে শোয়া অবস্থায় ডাক্তারের ভীতগ্রস্ত মুখ দেখে নার্স বিরক্তি বাড়লো। ঔষধের বক্স থেকে সূচ বের করে তাতে ঔষধ তুলতে তুলতে বিরবিরিয়ে বললো,
– ঢং! পেশেন্টের সাথে শয়তানী করার সময় জানে ভয় করেনি। এখন পিপড়া চলার আওয়াজ পেলেও লাফিয়ে ওঠে।
ডাক্তার জবাব দিলোনা। ব্যথাতুর শরীরটা কোনোমতে টেনেটুনে আধশোয়া হয়ে বসলো সে। নার্স তেমন বিরক্তিভর মুখ করেই তার হাতে ইনজেকশন পুশ করলো। ঘৃনাভরে বললো,
– এইভাবে বিকল করে দেওয়ার চেয়ে মেরে ফেললেই পারতো। চ্যাহ্!
জেদে ডাক্তারের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসছিলো। তবে ব্যথার জন্য হয়ে উঠলো না। সেদিন টের না পেলেও, ওই দুই অবয়ব কি নিখুঁত অত্যাচার চালিয়েছে, ধারণা হয়ে গেছে তার। সাইফ বলেছিলো, তাকে যখন পৌছে দেয়, তার শরীরে নেশাজাতীয় দ্রব্যের উপস্থিতি ছিলো। সেদিন ডাক্তার কেবল নেশালো চোখে তার নিজের সর্বনাশ দেখেছে। কিছু বলতে পারেনি। দরজায় কড়াঘাত পরতেই হুশে ফিরলো নাজমুল৷ চোখ তুলে তাকাতেই দেখে সাইফ দরজায় দাড়িয়ে। ডাক্তার কিঞ্চিৎ বিস্ময়ে বললো,
– ইন্সপেক্টর? আপনি?
– দুর্ভাগ্য আমার! আপনি খবর না দিলেও আপনার মতো জঘন্য মানসিকতার একজন কেমন আছে, কোথায় আছে, বেচে আছে কিনা সেই খোজ আমাকে নিতে হচ্ছে!
ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো সাইফ৷ নার্স কিছু বলতে যাবে, আইডি দেখিয়ে ওকে থামিয়ে দিলো ও। এগিয়ে এসে টুলে বসে, ডাক্তারের শরীরে আপাদমস্তক চোখ বুলালো। শান্ত গলায় বললো,
– হসপিটালে এডমিট হলেন যে? বাসায় ট্রিটমেন্ট করাতে কোনো সমস্যা হচ্ছিলো?
ডাক্তার ইতস্তত করতে করতে বললো,
– অবস্থা তো দেখছেনই ইন্সপেক্টর। আমার মিসেস সেভাবে…
– বাসা থেকে বেরিয়েছেন, আমাকে একটাবার জানাতে পারতেন।
ডাক্তার থামলো। সাইফ আঙুল দেখছিলো নিজের। চোখ তুলে আবারো ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললো,
– সেদিন ওরা শুধু যন্ত্রণা দিয়ে আপনার বডিটা বাসায় পার্সেল করেছে তারমানে তো এই না যে আপনার মৃত্যুঝুকি নেই৷ আপনার সাথে অঘটন ঘটার আগে আমার কাছে একটা কল এসেছিলো। এন্ড ফর দ্যাট, আপনার সেইফটির দায়টা এ মুহুর্তে আমাকে নিতে হচ্ছে। আপনার বাসায় আমার দুজন সিভিল ড্রেসআপের কনস্টেবল ছিলো। ওরা টুয়েন্টি ফোর সেভেন নজর রাখছিলো আপনাকে। হসপিটালাইজড হওয়ার খবর ওদের কাছ থেকেই শুনতে হলো আমাকে।
ডাক্তার চুপসে আছে৷ সাইফ উঠে দাড়িয়ে নিজের শার্টটা টান মারলো। বললো,
– যাইহোক, আপনাদের কলোনীর মেইনগেইটের সিসিক্যামে ওই ভ্যানওয়ালাকে দেখা গেছে। ওয়ান্টেড শিরোনামে পত্রিকায় ছবি ছেপেছে তার। আশা রাখছি যে বা যারাই আপনার সাথে এমন অত্যাচার চালিয়েছে তারা দ্রুতই ধরা পরবে। আর আমি এখানেও দুজনকে রেখে যাচ্ছি৷ যত্ম নেবেন নিজের। আপনার জাস্টিফিকেশানের দরকার পরবে। আসছি।
সাইফ বেরিয়ে এলো। আরো একবার যেনো কেইসটাতে আশার আলো দেখছে ও। ডক্টর নাজমুলের সাথে যা ঘটেছে, তাতে কিছু আসে যায় না ওর। কিন্তু এসবের মাঝে অপরাধী যে ভুলটা ছেড়েছে, ওরকাছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সকালে হলুদপর্বের জন্য বেরোতে পারেনি ও। স্নিগ্ধতা অগ্নিলাদের বাড়ির জন্য বেরোনোর সাথেসাথে ওউ বেরিয়েছে। অতিদ্রুত গাড়ি চালিয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় পৌছায় সাইফ। কিন্তু বাসার সামনের গাড়ি দেখে টের পেলো, ওর আগেই স্নিগ্ধতারা বাসায় পৌছেছে। ড্রয়িংরুমে বয়স্কাদের সাথে বসে ছিলো স্নিগ্ধতা। সাইফকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো ও। বললো,
– তোমার আজকেও বেরোনোর ছিলো?
– কি করবো বল, হঠাৎকরে এমন…
স্নিগ্ধতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাইয়ের দিকে এগোলো। তারপর মিষ্টিস্বরে বললো,
– কাল তোমার বিয়ে ভাইয়া। এমন না হয়, কালও তোমার বেরোনো লাগে। নীলাভাবী…
– নীলা সবটা জানে।
কথা বাড়ালো না স্নিগ্ধতা। সাইফ উকিঝুকি দিয়ে কাউকে খুজলো। বোনকে বললো,
– আরাফাত?
– তোর আসারই অপেক্ষায় ছিলাম। এসেছিস, আমি আসি তাহলে।
স্নিগ্ধতা দুরে দাড়ানো আরাফাতের দিকে একদন্ডের জন্য তাকিয়ে আবারো ভাইয়ের দিকে ফিরলো। সাইফ বললো,
– আসি মানে? তুই থাকছিস তো!
আরাফাত তাচ্ছিল্যে হাসলো। বললো,
– আমার থাকা! কাল তোর বিয়েতেও আমি থাকতে পারবো না।
সাইফের বিস্ফোরিত চাওনি। চমকানো চোখে ওর দিকে তাকালো স্নিগ্ধতাও। সাইফ বললো,
– কি বলছিস কি তুই? মজা করছিস?
আরাফাত এগিয়ে সাইফের হাত ধরলো। দুরুত্ব বজায় রেখে সরে দাড়ালো স্নিগ্ধতা। আরাফাত মুচকি হেসে বললো,
– সিরিয়াসলি। আর তুই আমাকে জোর করিস না প্লিজ৷ সত্যিই ইমার্জেন্সি। নাহলে তোর বিয়ের ভোজ মিস দিতাম না আমি। দোয়া করি, তোর বৈবাহিক জীবন সুখের হোক।
সাইফ বোনের দিকে তাকালো একপলক। স্নিগ্ধতার কথাতেই অগ্নিলাদের বাসায় পাঠিয়েছিলো ও আরাফাতকে। তাহলে সেখানে কি কিছু ঘটেছে যাতে আরাফাত বিয়েতে থাকতে চাইছে না? আরাফাত দু ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে অবস্থা পরখ করলো হয়তো। তারপর বললো,
– তুই ওর দিকে কেনো তাকাচ্ছিস সাইফ? আমার সত্যিই কাজ পরে গেছে। আর স্নিগ্ধতা? আমার না থাকা নিয়ে নিজেকে দোষারোপ করো না কেমন? তোমাকে গিল্টিনেসে মানায় না। কেবল প্রশংসায় মানায়।
আরাফাতের শেষের কথায় স্নিগ্ধতার প্রতি প্রেমের স্পষ্ট প্রকাশ। সাইফকে ‘একটু আসছি’ বলে নিজের ঘরে চলে গেলো স্নিগ্ধতা। সাইফ বোনের চলে দেখে হতাশার শ্বাস ফেললো। কিন্তু ঠোটের আস্বস্তের হাসিটা বহাল রেখেছিলো আরাফাত। বেশ কিছুক্ষণ সাইফের সাথে কথা বলে বেরিয়ে গেলো ওউ।
•
অতঃপর সেই কাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত। সাইফ-অগ্নিলার বিয়ে। ফুল সাজানো গাড়ি এসে চৌধুরী হাইজের সামনে দাড়ালো। বধুবেশে অগ্নিলা তখন রুমের জানালায় দাড়ানো। এতোক্ষন মেয়েরা সব ওর কাছেই ছিলো। বর এসেছে শুনেই বেরিয়ে গিয়েছে সবগুলো। জানালা দিয়ে বাইরের আলো-ফুল-হাসিমুখ গুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলো অগ্নিলা। তাদের সবার মাঝে সবচেয়ে নজরকাড়া, শেরওয়ানি পরিহিত সাইফ, ওর হবু বর। সাইফের পর গাড়ি থেকে নামলো স্নিগ্ধতা আর অনু। অগ্নিলার বাবা অতি সৌজন্যের সাথে সাইফ-স্নিগ্ধতা আর ওদের সাথের বয়স্কদের স্বাগতম জানালেন। সাইফ এগোতে গিয়ে একদফা উপরতলার দিকে তাকালো। অগ্নিলার সাথে চোখাচোখি হয়ে যায় ওর। সাদাকালো শাড়ি, মোটা কালোফ্রেমের চশমাধারী মেয়েটার পরনে বর্তমানে উজ্জ্বল লাল বেনারসি। গায়ে গয়না। ওকে দেখতে গিয়ে গতি কমে আসছিলো সাইফের। পাশ থেকে অনু ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
– আর কিছুসময় পর পুরো মানুষটাই আপনার সাইফ ভাইয়া। আগ্রহ কিছু তো অবশিষ্ট রাখুন।
মুচকি হেসে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো সাইফ। পা বাড়ালো অগ্নিলার বাবার সাথে। মেহেরুন আর ওর ভাইবোনেরা সাদরে নিয়ে গেলো সাইফকে। গেইটিং নিয়ে অগ্নিলার বারন আছে। কোনোরকম ঝামেলা চায়না ও বিয়েতে। তাই সোজা স্টেজের দিকে নিয়ে গেছে সবাই সাইফকে। অনুও শায়েরীর সাথে এগিয়েছে। স্নিগ্ধতা হেসে ওপরতলার অগ্নিলার দিকে তাকালো। কিন্তু পরপরই চেহারার হাসিটা কমে আসলো ওর। এতোটা দুর থেকেও ও স্পষ্ট দেখতে পেলো, অগ্নিলার চিকচিক করছে। স্নিগ্ধতার চোখমুখ উদাসীন হবার আগেই কেউ বলে উঠলো,
– চাঁদের দিকে ওভাবে তাকিও না চন্দ্রমুখী। তুমি তাকালে সে লজ্জা পেয়ে মেঘের আড়াল হবে। চারপাশ আধারে ঢেকে যাবে।
পাশ ফিরলো স্নিগ্ধতা। ওর পাশে শারাফ দাড়িয়ে। পরনে কালো পান্জাবী, সাদা পায়জামা, গুটানো বড়হাতা। শারাফ পেছনে দুহাত রেখে, আকাশের দিকে তাকিয়ে। স্নিগ্ধতা ওর দিকেই তাকিয়ে রইলো। বিয়ের অনুষ্ঠানে কালো কে পরে? তারপরও সবার মাঝে এ লোকটাকে বরাবরের মতোই আকর্ষক লাগছে যেনো। শারাফ আড়চোখে ওর দিকে তাকালো একবার। তবে স্নিগ্ধতার হেলদোল নেই। ওরদিক পুরোপুরিভাবে ঘুরে কিছুটা ঝুকে দাড়ালো শারাফ। স্নিগ্ধতার চোখের নিচদিক ছুইয়ে একটুখানি কাজল লাগালো কনিষ্ঠাঙ্গুলে। তারপর ওর কানের পেছনে ঘাড়ে আঙ্গুল ছোঁয়ালো। শিহরনে চোখ বন্ধ করে নিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ওর বন্ধ চোখজোড়া তাকিয়ে দেখলো কিছুক্ষন। তারপর সোজা হয়ে দাড়িয়ে বললো,
– শারাফের ব্যক্তিগত চাঁদে কারো নজর না লাগুক।
স্নিগ্ধতা চোখ মেললো। মৃদ্যুস্বরে বললো,
– চাঁদের গায়ের কালো দাগই তো তার কলঙ্ক শারাফ। নজর লাগার কি আছে?
শারাফ আরেকবার আপাদমস্তক দেখে নিলো স্নিগ্ধতাকে। গাড়ি থেকে নামার পর থেকেই এই উজ্জ্বল অবয়বে দৃষ্টি আটকেছে ওর। কবজি অবদি বড়হাতা ব্লাউজ, সাদা শাড়ি, খোলা চুলে হীরের মতো সাজপাথর, হাতে রুপালীরঙা চুড়ি, কপালজুড়ে পরে থাকা টিকলি, নাকে ছোট্ট একটা রিং। স্নিগ্ধতার ঠোঁট আজ লিপস্টিকের ছোয়া পেয়েছে। আর চোখ কাজলের। দৃষ্টির এমন শান্তি ছেড়ে অন্যকোনোদিক তাকানোর কথা মনেই হয়নি ওর। শারাফ ওর মুগ্ধ চাওনি বহাল রেখে বললো,
– সে কলঙ্কসমেতই চাঁদ অপরুপা। তাইতো নজর লাগার ভয়টা বেশি।
স্নিগ্ধতা আর জবাব দিলো না। সামনে উকি দিয়ে দেখলো, সবাই এগিয়েছে। শারাফ সরে দাড়ালো। হাত বাড়িয়ে পথ দেখিয়ে দিলো স্নিগ্ধতাকে। স্নিগ্ধতা পা বাড়ালো। ওর পেছনে এগোলো শারাফও। খুব বেশি সময় না নিয়ে স্টেজের দু পাশে বসানো হয় সাইফ-অগ্নিলাকে। স্নিগ্ধতা গিয়ে সাইফের পাশে বসলো। অগ্নিলার পাশে ইতিমধ্যে মেহেরুন, ওর কাজিনরা, শায়েরী, মিসেস নাহিদ, শারাফের মা বসে। মাঝখানে ফুলের ঝালর। যাবতীয় নিয়মকানুন মেনে তিন কবুলে বিয়ে শেষ হয় সাইফ অগ্নিলার। কবুল বলার পর শক্ত হয়ে বসে রইলো অগ্নিলা। সামনে তাকিয়ে দেখে, ফুলের ঝালরের ওপাশে সাইফের হাসিমাখা মুখ। এদিকে ওর চোখ দিয়ে অঝরে অশ্রু ঝরছে। মেহেরুন সরে আসলো ওখান থেকে। ওর মা দুরে দাঁড়িয়ে কাদছে। বাকিসব শান্তনা দিচ্ছে অগ্নিলাকে। স্নিগ্ধতা দেখলো কোনোরকম শব্দ করে কান্না নেই অগ্নিলার। ঘুরে এসে ওর পাশে বসলো ও। কাধে হাত রেখে বললো,
– তুমি আমাদের শূণ্য পরিবারকে সম্পুর্ণ করছো নীলাভাবী। আমাদের সুখ দিয়ে তুমি কাদছো? এটা মানা যায়?
জলভরা চোখে একপলক ওর দিকে তাকালো অগ্নিলা। তবে কান্না থামলো না ওর। টুপটাপ আবারো জল গরালো চোখ দিয়ে। সাইফ হাটুতেই ঝালর পেরিয়ে এপাশে চকে আসলো। কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো সবাই। সাইফ কোনোদিক পরোয়া না করে, সবার সামনেই দুহাতে গাল ধরলো অগ্নিলার। ওর কপালে ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে বললো,
– কান্না থামাও নীলা৷ মিস অগ্নিলাকে কান্না মানাতো না। আর মিসেস সাইফ এহমাদের জন্য কান্না নিষিদ্ধ!
সবটা কিছুক্ষণের জন্য থমকে রইলো যেনো। অগ্নিলা অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে রইলো সাইফের দিকে। সাইফ মাথার পাগড়ি হাতে নিলো। অগ্নিলার হাত ধরে স্বাভাবিকভাবে নেমে আসলো স্টেজ থেকে। অগ্নিলার মা বাবা মেহেরুন একসাথেই দাড়িয়ে ছিলো। সাইফ ওদের সামনে দাড়িয়ে গিয়ে বললো,
– অনুমতি দিন মিস্টার চৌধুরী। আমাদের এগোনো উচিত।
মেহেরুন মাকে ছেড়ে, নাক টেনে কান্না কমালো। তারপর সাইফের সামনে দাড়িয়ে বললো,
– নীলার বাবা মানে আপনারও বাবা মিস্টার এহমাদ।
– সে হিসেবে আমিও আপনার জন্য কেবলই সাইফ। দোয়া রাখবেন আপু।
সাইফের জবাব শুনে খুশি হয়ে গেলো মেহেরুন। সবকিছু যেভাবে ঘটেছে, আলাদাকরে কথা হওয়ার সুযোগই হয়নি ওদের। তবে ওর আপু ডাকটা বেশ ভালো লেগেছে মেহেরুনের। সাইফ ওকে জবাব দিয়ে অগ্নিলার বাবার দিকে তাকালো আবারো। বললো,
– অনুমতি দিন বাবা৷ এগোই আমরা।
মিস্টার চৌধুরী জড়িয়ে ধরলেন মেয়ে আর মেয়েজামাইকে। অগ্নিলার চোখে তখনও সাইফকে নিয়ে বিস্ময়। ও আর কাদছে না। কেবল সাইফকেই দেখে যাচ্ছে। বাবাকে এবার ছেড়ে মায়েরদিক এগোলো অগ্নিলা। মিসেস চৌধুরী মেয়ের বুকে পরে হুহু করে কেদে দিলেন। সাইফ টের পেলো, অগ্নিলা আরেকদফায় কাদতে চলেছে। এরইমাঝে শারাফ এসে অগ্নিলার হাত ধরে গাড়ি অবদি নিয়ে এসে আবারো সাইফের হাতে গুজে দিলো। ফ্যালফ্যাল করে ওরদিক তাকিয়ে রইলো অগ্নিলা। ওর ভাইদের মধ্যেকার একজন গাড়ির দরজা খুলে দিলো। তারপর সবগুলো অগ্নিলার সামনে দাড়িয়ে গেলো। শারাফসহ সবগুলো হাত নেড়ে, অগ্নিলাকে তাড়িয়ে দেওয়ার মতো দেখিয়ে একসুরে গেয়ে উঠলো,
” তুই যা! চলি যা! আইর আর ভালা লাগে না!
তোর এত্তো বেশি ঢং, আই আর লইতাম হারিয়েন না!”
দু দুবারকরে একই লাইন গাইলো অগ্নিলার সবগুলো ভাই৷ শব্দ করে হেসে দিলো অগ্নিলাসহ বাকিসব। কিছুটা পাশ থেকে শারাফের বরিশালের সুর শুনে হাসছিলো স্নিগ্ধতাও। অগ্নিলা নাকের ডগা একটু ডলে বললো,
– আমার বরিশাইল্লা গোষ্ঠীতে দেখছি ভালোমতোই ঘাটি গেড়েছো শারাফ।
শারাফ বিশ্বজয়ের হাসি দিলো একটা। অতঃপর গাড়িতে তুলে দিলো অগ্নিলাকে। সাইফ আরেকবার সবার কাছ থেকে বিদায় নিলো। গাড়ির পাশে শায়েরী আর অনুর সাথে দাড়িয়ে ছিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ হেলেদুলে ওর পাশে গিয়ে দাড়ালো। একটু নিচু হয়ে স্নিগ্ধতার কান বরাবর মুখ নিয়ে বললো,
– বি রেডি ম্যাম। এরপর কিন্তু আপনার দিলওয়ালে নিজের দুলহানিয়া নেবার ব্যবস্থা করবে।
স্নিগ্ধতা ওকে শুধু একটা আড় চাওনি উপহার দিলো। সাইফ শারাফকে ‘আসছি’ টাইপ ইশারা করে গাড়িতে বসলো। নম্রভদ্র ছেলের মতো স্নিগ্ধতার যাওয়ার জায়গা করে দিলো শারাফ৷ স্নিগ্ধ এক হাসিতে গাড়িতে উঠলো স্নিগ্ধতা৷ চৌধুরী হাউজ থেকে পুরো বরপক্ষের সাথে কনেও হাসিমুখে বিদায় নিলো।
#চলবে…

