#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৬৭.
অল্পসময়ের ব্যবধানেই দেয়ালের আগুন নিভে গেছে। সবরকমের ছবি, কাগজ পুরে ছাই হয়ে মেঝেতে পরে আছে। মৃদ্যু আলোর বদ্ধ ঘরটা কবরসম মনে হচ্ছে সাইফের। আলো অক্সিজেনের অভাবে না। বিশ্বাসের অস্তিত্বের অভাবে। ওর জীবন থেকে বিশ্বাস নামক শব্দটার মৃ’ত্যু হয়েছে জ’ঘন্যভাবে। সামনে দাড়ানো স্নিগ্ধতা ওর বোন নয়, ভ’য়ানকভাবে আট-আটটা খু’ন করা এক ভ’য়ংকর সত্ত্বা। অন্যদিকে অগ্নিলা। কাতর চোখে চেয়ে সাইফের বরাবর দাড়ানো ও। সাইফ তাচ্ছিল্যে হাসলো। দুবার কেশে থুতু ফেললো। বড়বড় শ্বাস নিতে নিতে বললো,
– ডোন্ট টেল মি, আমাকে পেছন থেকে আঘাতটা তুমি করেছো নীলা।
এটুক বলে আবারো ব্যথায় ‘আহ’ আর্তনাত করে উঠলো সাইফ। চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। স্নিগ্ধতা পাথরের মতো দাড়িয়ে। অগ্নিলা একপা এগিয়েও থেমে গেলো। ওর পাশ থেকে অপর পুরুষালী অবয়ব এগিয়ে আসে। লোহার পাইপ মেঝেতে টানতে টানতে আলোর মাঝে এসে দাড়ায় সে। ভরাট কন্ঠে বললো,
– অগ্নিলা তোমার পেছন থেকে অনেককিছুই করেছে সাইফ। শুধু তোমাকে আঘাতটাই করতে পারেনি। শি ফেইলড।
পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে চোখ তুলে তাকায় সাইফ। মেদবহুল পেটে ইনকরা চেইক শার্ট পরিহিত ইন্সপেক্টর বাকেরকে দেখে ওর ভঙ্গিমার খুব একটা পরিবর্তন হলো না। তেমনই টলোমলো চোখে তাকিয়ে রইলো কেবল। ওকে নিরব থাকতে দেখে ইন্সপেক্টর বাকের নিজেই মুখ খুললেন। ভাঙ্গাস্বরে বললেন,
– ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে একটা সিরিয়াল কি’লিংয়ের মতো অপরাধে ইনভল্ব থাকতে দেখে অবাক হওনি সাইফ?
সাইফ আবারো তাচ্ছিল্যে হাসলো। ঘাড় ঝাকিয়ে বললো,
– আমার অনুভূতিরা মৃত স্যার। বিস্ময় আসছে না আর!
পরপরই দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
– বিশ্বাস, প্রেম, ভালোবাসার মতো সবচেয়ে মুল্যবান অনুভূতিরা আমার সাথে জ’ঘন্য এক খেলা খেলেছে। সবটা দিয়ে যাদেরকে আপন ভেবেছিলাম, নিষ্কলঙ্ক ভেবেছিলাম, তারাই কলুষিত বেরোলো। বিশ্বাসঘাতক বেরোলো। তাদের জন্য ঘৃনা ব্যতিত, এ মুহুর্তে আর কোনো আবেগ কাজ করছে না আমার।
স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে বললো সাইফ। কিন্তু স্নিগ্ধতা ওর দিক তাকাচ্ছে না। স্থির হয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে ও। চোখের কাজল ওর মুখচেহারায় লেগে আছে, ঠোটের কোনে জমাটবাধা র’ক্ত, চুলগুলো এলোমেলো, হাতের তালুতে মেহেদীর বদলে রঙ, সাদা নির্দাগ জামাটায় এ মুহুর্তে দাগের অন্ত নেই, মাথায় থাকা টায়রা বিক্ষিপ্ত। ইন্সপেক্টর বাকের এগিয়ে আসলেন আরো। পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে সাইফের সামনে রাখলেন। সাইফ চোখ বুলালো সেটা। চিঠিটায় লেখা,
‘আমি আর ঢাকায় যেতে চাইনা বাবা। ওই জানোয়ারদের ভোগের বস্তু হবার জন্য আর হলে ফিরতে চাইনা আমি। জানিনা হলের বাকিসব মেয়েরা কিভাবে সব সহ্য করে আছে। কিন্তু ভয় পেয়ে, এই সত্যি লুকিয়ে বাচাটা আমার জন্য অসহনীয় লাগছে। আর আমি এটাও জানি। ‘হলে থাকতে নিয়মিত আমাকে অমুক নেতা, তমুক নেতার সঙ্গীনি হতে হয়েছে’ এই সত্যি প্রকাশ করে বাচতে চাইলে এ সমাজ আমাকে বাচতে দেবেনা। তাই ম’রে যাওয়াটাকেই বেছে নিলাম। আমাকে ক্ষমা করো বাবা। পারলে এই নোংরা ছাত্ররাজনীতি থামিয়ে, ওইসব প’শুদের শা’স্তি দিও। আমার আত্মাকে মুক্তি দিও, তোমার মেয়েসম বাকি হলের মেয়েগুলোকে মুক্তি দিও। এটাই আমার শেষ চাওয়া। ইতি, তোমার ভীতু মেয়ে’
সাইফ প্রশ্নসূচক চাওনি নিয়ে সামনে তাকালো। ইন্সপেক্টর বাকের বললেন,
– আমার একমাত্র মেয়ে। মা ছিলোনা বলে মেয়েটা নিজেরমতো করে বড় হয়েছিলো। একদম ছায়ার মতো নিশ্চুপ ছিলো৷ দুচোখে কেবল পড়াশোনা আর বড় হবার স্বপ্ন। ডিউটি শেষে আমি বাসায় ফিরলেই দেখতাম, মেয়েটা আমার খেয়ে না খেয়ে পড়াশোনা করতো। রাতের পর রাত জাগতো একটা ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি হবার জন্য। কতো কষ্ট করে মেয়েটা চান্সও পেলো। স্বপ্নপুরনের জন্য ভর্তি হলো ঢাকায় এসে। সিট পেয়ে চলে আসলো হলে। সবই ঠিক ছিলো। কিন্তু হলে যাবার কিছুদিনের মধ্যেই আমার মেয়েটা কেমন যেনো বদলে গেলো। বাসায় আসার সুযোগ হতো না ওর তেমন। আসলেও, ঢাকায় ফিরতে চাইতো না। আমি ভাবতাম হয়তো আমার জন্য মন খারাপ করে ওর। আমার মেয়েটা হাসতো না সাইফ। ঠিকমতো খেতো না। আমার সাথে কথাও বলতো না সেভাবে। ঠিক করলাম যেভাবেই হোক, ঢাকায় ট্রান্সফর্ম হবার ব্যবস্থা করবো। মেয়েকে নিয়ে একসাথে থাকবো। তারপর একসময় পেয়েও যাই ট্রান্সফার লেটার। খুশিতে ছুটে যাই বাসায়। সুস্থ্য মেয়েকে বাসায় রেখে ডিউটিতে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু বাসায় গিয়ে দেখি আমার মেয়েটা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আর সাথে এই চিরকুট।
সাইফ রাগে দাঁতে দাঁত আটকায়। দেশসেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই নোংরা দিকগুলো এখনো অবদি ওর অগোচরেই ছিলো। হয়তো লজ্জায়, নয়তো ভয়ে কেউ মুখ খোলেনি। আইন তাদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। আর তার বিনিময়ে এমন কতোকতো মেয়েরা ভেতরেভেতরে আত্মহত্যা করছে। ভাবতেও সাইফের নিজের পেশার ওপর রাগ হচ্ছিলো। ইন্সপেক্টর বাকের বললেন,
– ওর সুইসাইড নোট দেখিয়ে কেইস তৈরী করি আমি নিজে। এক ছেলে এসে পরদিনই স্বীকারোক্তি দিয়ে যায়। কিন্তু শাস্তির পরিবর্তে তার কয়েকদিন পরেই জামিন হয়ে যায়। কারন? আমার মেয়ের ফরেনসিক রিপোর্টে নাকি কোনোরুপ সে’ক্সুয়াল হ্যা’রাজিং ফ্যাক্ট পাওয়া যায়নি। ভুয়া রিপোর্ট বানিয়ে পুরো কেইসটা ধামাচাপা দিয়ে দেয় ওরা। আমি হাইকোর্টে যাই, হলের মেয়েদের বলি সাক্ষ্য দিতে, কোনো লাভ হয়না। আমার মেয়েটার মৃত্যুকে সুইসাইড বলে কেইস ক্লোজড্ ঘোষনা করে আইন।
…
– এবার তুমি বলো সাইফ, আমার মেয়ের জায়গায় স্নিগ্ধতা, আর আমার জায়গায় থাকলে তুমি কি করতে? তখনও কি তুমি এই আইনের ভরসায় থাকতে? নাকি নিজহাতে খু’ন করতে তোমার বোনের সম্রম হননকারীকে? কোনটা?
সাইফ জবাব দিলোনা। ওর দৃষ্টিতে যেনো ‘যাই কিছু হয়ে যাক, আপনি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না।’ এমনটাই দেখলেন ইন্সপেক্টর বাকের। বললেন,
– মেয়ে হারানোর পর আমার পোস্টিং হয় ঢাকায়। চলে আসি এখানে। বুকজুড়ে তখন সন্তান হারানোর যন্ত্রনা। আর মস্তিষ্কে ক্ষোভ। আমার মেয়ের অপরাধীরা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে, খোলা বাতাসের শ্বাস নিচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিলাম আইন যা পারেনি, তা আমি নিজহাতে করবো। খু’ন করবো ওইসব প’শুদের। কিন্তু ওদের চিনতাম না আমি। হলের কোনো মেয়ে আমার কাছে মুখ খুলতে চাইলো না। পুলিশ হয়েও নিজের মেয়েকে সুবিচার দিতে পারিনি আমি। ওর শেষ ইচ্ছে পুরন করতে পারলাম না এমন একবুক যন্ত্রণা নিয়ে ভেতরে ভেতরে গু’মরে মরছিলাম। তারপর একসময় আবির্ভাব হয় এক বিনাশীনির।
একটু থামলেন ইন্সপেক্টর বাকের। তারপর স্নিগ্ধতার দিক এগিয়ে গিয়ে, ওরদিক তাকিয়ে বললেন,
– স্নিগ্ধতা।
স্নিগ্ধতা চোখ তুলে চাইলো তার দিকে। ইন্সপেক্টর বাকের ওরদিক জলভরা চোখে চেয়ে বললেন,
– কোনো মেয়ের সাথে অন্যায় দেখলে সহ্য করতে পারেনা সে। কোনোরকম প্রমাণ না রেখে ততোদিনে চার চারটে খু’নও করে ফেলেছে। আর ঠিক তারপর কেইস চলে যায় ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে তুখোড় পুলিশের কাছে। স্নিগ্ধতার ভাই, সাইফ এহমাদের হাতে। স্নিগ্ধতা ঘাবড়ে যায়। যাওয়ারই বিষয়। সাইফ এখনো অবদি কোনো কেইস আনসলভড রাখেনি। একই ছাদের নিচে পুলিশ-আসামী কিকরে বাস করতে পারে? পুলিশিজীবনী চেইক করে, ডিপার্টমেন্টের সবার মাঝে আমাকে ভরসাযোগ্য মনে হয় তার। মেয়ে হারা বাবার সম্পর্কে তার নিরীক্ষণ ভুল ছিলো না। একসময় এক পৃথিবী স্নিগ্ধতা আমাকে এসে বললো, ‘ভরসা রাখুন। যেভাবেই হোক, অ’ন্যায়কারীদের সাজা দেবো আমি।’ ওমন স্নিগ্ধ, মায়াবী, মাসুম মুখে ‘শাস্তি দেবো!’ কথাটা আমার কাছে কেবলই ঠাট্টা মনে হতো ; যদি না ও আমাকে আগের চারটে খু’নের প্রমানাদি দেখাতো। আমি ভরসা রাখলাম। চোখ বন্ধ করে, কোনোরুপ প্রশ্ন না করে তাই তাই করলাম, যা যা ও চেয়েছিলো। পরের চারটে মা’র্ডারে সবরকমের সাহায্য করা, মোহিনীকে এ’সিড ছোড়া, কলাভবন-হাসপাতালসহ তোমার কাজে দিতে পারে সেসব জায়গার সিসিক্যামের ফুটেজ হাইড করা, অগ্নিলার ডিএনএ রিপোর্ট বদলে দেওয়া, তারেকের ব’ডি ডাম্প এমনসব কাজগুলো আমারই নিজহাতে করা। আরো আছে। তবে এসব করার জন্য বিন্দুমাত্র আফসোস নেই আমার।
– সবাইকে নিজের মতো করে ইউজ করেছে ও!
সাইফের কথায় আবারো ওর সামনে এসে দাড়ালেন ইন্সপেক্টর বাকের। চিঠিটা ভাজ দিয়ে নিজের বুকপকেটে পুরলেন ওটা। তারপর নিচে রাখা ব্রিফকেইসটা থেকে একটা ফাইল বের করলেন। পেইজ খুলে সাইফের কোলে রেখে, কলম বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
– সাইন করো সাইফ।
সাইফ পেইজটায় চোখ বুলালো। স্পষ্ট লেখা, ওটা সাইফের কেইস থেকে অব্যহতিপত্র। কেইস সলভ করতে না পেরে, নিজথেকে কেইস থেকে অব্যহতি নিচ্ছে ও এমনটার স্বীকারোক্তি। সাইফ হেসে বললো,
– আজকের মধ্যে আমার খু’নীকে খুজে বের করার কথা ছিলো স্যার। আর আমি ব্যর্থ নই!
– কিন্তু এই কেইসে আমি তোমাকে আর থাকতে দেবোনা সাইফ। তোমার কাছে থাকা প্রমাণ, সারিকা, সব সামলে নেবার জন্য আমি আছি। স্নিগ্ধতা আমাকে বাধ্য করেনি। কোনোরুপ ইউজ করেনি আমাকে ও। শুধু অ’ন্যায় উ’চ্ছেদে সঙ্গ চেয়েছিলো। এন্ড আই গেভ হার দ্যাট! যার পরিণয়ে ভার্সিটির ছাত্রীহল গত কয়েকমাস যাবত ওই প’শুদের যাতায়াতমুক্ত ছিলো। সামনেও আর রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখিয়ে ছাত্রীহলে যাবার সাহস করবেনা কেউ। মেয়েগুলো বেচে যাবে ওই পি’শাচদের অত্যাচার থেকে। যেটা তোমার আইন কোনোদিনও পারতো না সাইফ! আমার মেয়ের শেষ ইচ্ছে পুরন হয়েছে। এবার আমার শেষ ইচ্ছে পুরনের পালা। যেভাবে এই ইন্ডাস্ট্রি আমার মেয়ের কেইস সাজিয়েছিলো, সেভাবেই এই আট খু’নের মামলা আমি নিজহাতে সাজাবো৷ কোনো আ’সামী থাকবে না এই কেইসে। কোনো সন্দেহভাজন থাকবে না। তুমি শুধু সাইনটা করো।
– আপনি জানেন আমি সাইনটা করবো না।
সাইফ এবারেও গায়ে লাগালো না। ইন্সপেক্টর বাকের অকস্মাৎ প্যান্টের পকেট থেকে রি’ভলবার বের করলেন। সেটা সাইফের কপালে রিভ’লবারটা ঠেকালেন নির্দ্বিধায়। সাইফ সেভাবেই হেসে বললো,
– অ’পরাধ করতে গিয়ে যাদের মৃ’ত্যুভয় হয় না, তাদের জানা উচিত, অ’পরাধ আটকাতে সাইফেরও মৃ’ত্যুভয় নেই।
ইন্সপেক্টর বাকের দুদন্ড সময় নিলেন। তারপর হাত ঘুরিয়ে রি’ভলবারটা অগ্নিলার দিক ফেরালেন তিনি। সাইফ অগ্নিলার মুখের দিকে তাকালো। ইন্সপেক্টর বাকের স্বাভাবিকভাবে বললেন,
– অ’পরাধীকেই সাজা দেই তবে? কি বলো? ওর নাকি মুক্তি চাই। ওদের সাজা দেওয়াতে খুশী হলেও, তোমাকে ঠকিয়ে একবিন্দু ভালো নেই ও।
সাইফ-অগ্নিলার দৃষ্টিবিনিময় হলো শুধু। অগ্নিলা দেখলো, সাইফের শীতল চাওনিতে স্পষ্ট বলা, আজ ওর মৃত্যুতে কিচ্ছুটি আসবে যাবে না সাইফের। মুখ দিয়ে দম ছাড়লো অগ্নিলা। দুফোটা চোখের জল ফেলে, একটা শুকনো ঢোক গিলে বললো,
– শুট মি মিস্টার বাকের। সত্যিই মুক্তি চাই আমার।
ইন্সপেক্টর বাকের একটা ছোট শ্বাস ফেলে রি’ভলবার রেডি করে নিলেন। অগ্নিলা শক্ত হয়ে দাড়ানো। সাইফ এরমাঝেই বলে উঠলো,
– আই’ল সাইন।
রি’ভলবার নামিয়ে নিলেন বাকের সাহেব। সাইফ সময় নিলো না বিষয়টা তার মোটেও স্বাভাবিক লাগছে না৷ স্বরে বিস্ময় মিশিয়ে বললেন,
– ঠিক শুনলাম আমি?
– হাত খুলুন। সাইনটা করছি।
– তুমি মোটেও ওকে বাচাতে রাজি হওনি সাইফ!
– ওকে কথা দিয়েছিলাম। কখনো আমার নিজের জীবন আর ওর মাঝে একটাকে বেছে নিতে হলে, আমি ওকে বেছে নেবো। সাইফ নিজের ওয়াদা ভোলেনি। সাইন করবো আমি।
সাইফের সেই তাচ্ছিল্য হাসি। ইন্সপেক্টর বাকের খুশি হয়ে যায়। সাইফের ডানহাতের বাধন কিঞ্চিৎ খুলে সাইন করার সুযোগ দেয় ওকে। সাইন করার পর আবারো হাত বেধে দেয় ওর। ব্রিফকেইস গুছিয়ে নিয়ে সাইফকে বলে,
– আশা করছি দ্রুতই দেখা হচ্ছে আমাদের।
– তারমানে য়্যুমু মা’রবে না আমাকে। পবিত্র পা’পী। অ’পরাধীদের নৃশংসভাবে খু’ন করে তাদের দৈহিক মৃত্যু দেয়, আর নিরপরাধের অনুভূতি খু’ন করে আত্মিক মৃ’ত্যু দেয়।
সাইফ হাসলো। স্নিগ্ধতা তেমনই মূর্তির মতো দাড়ানো। ইন্সপেক্টর বাকের একটু চুপ রইলেন। তারপর স্নিগ্ধতার কাছে গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তখনই ফোনে ম্যাসেজ টোন বেজে ওঠে স্নিগ্ধতার। স্নিগ্ধতা রোবোটের মতো সাইফের দিকে এগোলো। তারপর হাটু গেরে ওর সামনে বসে, সাইফের বাধা ডানহাতের তালুতে মাথা গুজে দিয়ে বললো,
– বর এসেছে। আর ঠিক তার আগে তোমার র’ক্ত আমার কনেসাজ নষ্ট করে দিয়েছে মিস্টার এহমাদ।
– শারাফের জীবনটা নষ্ট করোনা য়্যমু।
সাইফ কোনোমতে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করে বললো। স্নিগ্ধতা কেবল শুনলো কথাটা। সাইফের বলা শেষ হলে ধীরস্থিরে উঠে দাড়ালো ও। বললো,
– শারাফ এ গল্পের উপসংহার। গল্পের ইতি লিখতে, এ বিয়েটা আবশ্যক।
– ওকে কেনো এসবে জরিয়েছো? ওর তো কোনো দোষ নেই।
– দোষ তো তোমারও ছিলোনা। নাইবা নীলাম্যাডামের। নাইবা…
বলতে গিয়ে থেমে যায় স্নিগ্ধতা। সাইফ চোখ উল্টিয়ে চাইলো ওর দিকে। স্নিগ্ধতা বললো,
– ইটস্ মাই ওয়েডিং মিস্টার এহমাদ। আই’ল হ্যাভ টু গো।
সামনে থাকা ঝিকমিক গয়না, উজ্জ্বল মুখশ্রী আবছা হয়ে আসতে লাগলো সাইফের। স্নিগ্ধতা পেছন ফিরেছে। সেভাবেই রিনঝিন শব্দ তুলে যে পথে এসেছিলো, সে পথেই বেরিয়ে গেলো ও। চোখ বন্ধ করে নিলো সাইফ। যে মুখটাকে ও পৃথিবীর সবচেয়ে নিস্পাপ মুখখানা বলে দাবী করেছিলো, সে মুখটাই সবচেয়ে হিং’স্র আর ভ’য়ংকররুপে ধরা দিলো ওর সামনে। চারপাশে কেবলই আধার আর আধার। হঠাৎ অনুভব হলো, কেউ একজন ওর পায়ের ওপর মাথা রেখেছে। সাইফ চোখ বন্ধ করেই বললো,
– তোমার স্পর্শ আমার ঘৃণার বস্তু অগ্নিলা।
– সত্যের তান্ডবে নন্দিত চাঁদটাও ক’লঙ্কে ডুবেছে সাইফ। আমি তো সেই আকাশেরই এক উল্কাপিণ্ড। নীলা থেকে অগ্নিলা হয়েছি। আমার স্পর্শ সহ্য হবেনা তোমার জানি।
ওভাবেই সাইফের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে রেখে বললো অগ্নিলা। চোখের কোনা বেয়ে জল গরালো ওর। বললো,
– সাইনটা অতি সহজে করে দিলে যে?
– রিস্ক নিতে চাইনি। এখনই আত্নহননের পথ দেখলে কিকরে হয়? তোমাদের তো বাচতে হবে। যাতে আইন তোমাদের সাজা দিতে পারে।
অগ্নিলা কান্নার মাঝেও হেসে ফেললো। ও জানতো, সাইফ ওকে মৃ’ত্য থেকে বাচায়নি। মুলত নিজে হাতে আইনি সাজাভুক্ত করবে বলে ওকে জিইয়ে রাখলো। সাইফ চোখ মেললো। ওর পায়ে পরে থাকা দীর্ঘকেশী রমনী যে ওর বুকজুড়ে হাহাকার তুলে দিয়েছে, তা প্রকাশের মতো দুর্বল ও নয়। শক্ত গলায় বললো,
– গেট আউট অফ মি অগ্নিলা।
– পরকালের বেহেশত হারানোর মতো পা’প আমি করে ফেলেছি সাইফ। বেহেশতের আশা আমি করিনা। শেষবারের মতো, কয়েকমুহুর্তের জন্য এই ইহকালীন বেহেশতে আমাকে থাকতে দাও প্লিজ। সরে যেতে বলোনা।
সাইফ শান্ত রইলো। একটু সময় নিয়ে বললো,
– আমার মতো শারাফের জীবনটাও শেষ হতে দিওনা অগ্নিলা। পারলে বিয়েটা আটকাও।
#চলবে…

