#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৬৬.
কালো জ্যাকেট, জিন্স, ক্লিন হ্যান্ড গ্লাভস আর বুট পরিহিত অবয়বের ছবিটা দেখে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। সাইফের চোখে পানিতে টলমল করছে। কোনাজোড়া যেনো র’ক্তাক্ত। আর সে লালাভ দৃষ্টি স্নিগ্ধতার হাতের দিকে স্থির। আস্তেধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের ডানহাতের দিক তাকালো স্নিগ্ধতা। জামা ধরে রাখা ওর হাতের তালু মেহেদীরাঙা। আর আঙুলের ফাঁকে সে তালুতে শারাফের নামটা স্পষ্ট দেখা যায়। স্নিগ্ধতা আবারো সামনে তাকালো। সাইফের হাতে ধরে থাকা ফোনটায় জুম করে অবয়বের হাত দেখানো। ক্লিন গ্লাভস পরা বলে, চঞ্চলের দেহটা রেলিংয়ের ওপরে তুলে ফেলে দেবার সময় স্পষ্ট দৃশ্যমান হচ্ছে সে হাতের মেহেদি। আর তাতে লেখা, শারাফ।
সাইফের চোখ থেকে জল গরালো। ছবিটা দেখার পর থেকে পাগলপাগল লাগছে ওর নিজেকে। এমন মেহেদী সকালেই স্নিগ্ধতার হাতে দেখে বেরিয়েছিলো ও। তাই শারাফ লেখা মেহেদীরাঙা হাতের মালিককে চিনতে ওর বিন্দুমাত্র দেরী হয়নি। খু’নীর জায়গায় আপন বোনের অবয়ব দেখে থমকে ছিলো সাইফ। দিশেহারা হয়ে পরে ও। দিকদ্বিক হারিয়ে ফেলে। ওই ছবিটাকে মিথ্যে প্রমাণ করতে পাগলের মতো ছুটে যায় পুলিশস্টেশনে। সেখানে থাকা সবুজের প্রেমিকা ছিলো ওর একমাত্র ভরসা। সাইফ দম নেয়। মেয়েটার নাম সারিকা। সবুজেরই ক্লাসমেট। চঞ্চলের মৃত্যুর পর নিঁখোজ হয়েছিলো ও। সাইফ ওকে দেখেই বুঝলো, ওর অবস্থাও সুবিধাজনক না। একধ্যানে নিচদিক তাকিয়ে বসে ছিলো সারিকা। সাইফ জিভ দিয়ে ঠোট ভেজালো নিজের। সারিকার সামনে বসে বললো,
– কোথায় ছিলে এতোদিন?
– কেউ একজন আটকে রেখেছিলো।
– কেনো আটকে রেখেছিলো? কি মনে হয় তোমার?
– হয়তো আমি সবুজের খু’নীকে চিনি বলে তাই।
– তুমি চেনো সবুজের খু’নীকে?
জিজ্ঞেস করতে গিয়ে গলা ধরে আসে সাইফের। অজানা ভয় হতে থাকে ওর ভেতরটায়। সাইফ শুকনো ঢোকে গলা ভেজায় নিজের। আশেপাশে তাকালে কেবিন থেকে বাকিসব বেরিয়ে যায়। সারিকা বলতে লাগলো,
– যে রাতে সবুজ খু’ন হয়, আমাকে কল করেছিলো ও। আমি ওর গলার আওয়াজ শুনেই বুঝেছিলাম, ও আবারো চঞ্চল ভাইয়ের সাথে নেশা করতে বসেছে। হল থেকে বেরিয়ে পরি পুরোনো কলাভবনের দিকে। আর কলাভবনের ছাদে উঠতেই…
সারিকা শিউরে ওঠে। ভয়ে। ওর দৃষ্টিতে আতঙ্ক ফুটে ওঠে, ঠোঁটজোড়া কেপে ওঠে। সাইফ শ্বাস ধরে রাখলো নিজের। যেনো ওর শ্বাসের শব্দে সারিকার বলায় ব্যাঘাত ঘটবে। দম নিয়ে সারিকা আবারো বললো,
– ছাদে সবুজের ক্ষতবিক্ষত প্রাণহীন দেহটা পরে আছে৷ ওর মুখ একদম আমার বরাবর। র’ক্ত বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। হাতের কনুই বিশ্রিভাবে বাকানো। আর…
– আর?
সারিকা অসহায়ভাবে সাইফের দিকে তাকালো। বললো,
– উচু হিল পরিহিত এক মানবী ওর লজ্জাস্থান পা দিয়ে পিষছে।
সাইফ কাপাকাপা হাতে ফোন বের করলো নিজের। ওকে অনুর হলে পাওয়া অবয়বের ছবি দেখালো। বললো,
– এইবেশে ছিলো?
– হ্যাঁ! এটাই! এই ছিলো ইন্সপেক্টর!
– মুখ দেখেছিলে তার?
সাইফের অধঃগামী স্বর। সারিকা এবারেও মাথা ওপরনিচ করলো। মানে হ্যাঁ। মুখে বললো,
– আত্মতৃপ্তি নিয়ে সবুজের দেহটার ওপর অ’ত্যাচার করা শেষে শেষে হাটুগেরে মাটিতে বসে পরে সে। খুলে ফেলে মুখোশ। ক্লান্তিতে আকাশপানে মুখ করে চোখ বন্ধ করে নেয়। বিশ্বাস করুন ইন্সপেক্টর, ওই চেহারা একবার দেখলে আর ভোলার মতো না। আমার জীবনে আমি ওমন সুন্দরী মেয়ে দ্বিতীয়টি দেখিনি।
মেয়ে কথাটা শুনে হাতপা অসাড় হয়ে আসতে থাকে সাইফের। সারিকা বলছেই,
– আকাশে চাঁদ ছিলো সে রাতে। কিন্তু তুলনায় সে চাঁদের চেয়েও সুন্দর মুখশ্রী ছিলো তার। ছাদে থাকা বাল্বের আলোর চেয়ে উজ্জল দেখাচ্ছিলো তার মুখ। লালাভ গাল, তীরের মতো বাকানো ভ্রু, ঘন পাপড়ির চোখজোড়া বন্ধ। মেয়েটা চোখ তুলে তাকালো। ডানহাতে মাথার ক্যাপ খুলে ফেলতেই পিঠজুড়ে ছড়িয়ে পরলো তার চুলগুলো। ওই পরিস্থিতেও একটা মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের মুগ্ধতায় ঠায় রইলাম আমি। ওই নিকষকালো মুখোশ, ক্যাপ, জ্যাকেটের আড়ালে একরাশ স্নিগ্ধতার বসবাস, তা কেউ কোনোদিন ভাবতেও পারবে না ইন্সপেক্টর। ভাবতেও পারবেনা!
স্নিগ্ধতার নির্দোষ হবার সব আশারা সাইফের কাছ থেকে আত্মগোপন করলো। চোখ নামিয়ে নিলো ও সারিকার মুখ থেকে। সারিকা নাক টেনে আঙুলে নাক ডলে বললো,
– তারপর হুশ হলো, এমন স্নিগ্ধতাভরা মুখের মেয়েটা আসলে একটা খু’নী। মানতে কষ্ট হচ্ছিলো। তারপরও লুকিয়ে চলে আসি ওখান থেকে। জানতাম আমাকে দেখলে ও আমাকেও মেরে ফেলবে। পুলিশের কাছে যাবার সাহস হয়নি। তাই আগে চঞ্চল ভাইয়ের বাসায় যাই তাকে সবটা বলতে। আর ঠিক সেদিন সেখান থেকেই কেউ আমাকে কিডন্যাপ করে নেয়। এতোদিন কোনো অত্যাচার করেনি যদিও। আজকে হুট করে একজন চলে আসে আমাকে আটকে রাখা জায়গাটায়। ওটা নাকি তার পরিত্যক্ত গুদামঘর। অলৌকিকভাবে সে কিডন্যাপারের লোক ছিলোনা। তাকে অনুনয় করে ছাড়া পাই সেখান থেকে। প্রাণটা হাতে নিয়ে ওখান থেকে বেরোতে পেরেছি, তা এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা।
সাইফ কিছুক্ষণ নিরব থেকে ক্রাইমব্রাঞ্চে কল লাগালো। আর্টিস্ট পাঠানোর জন্য। মিনিটবিশেকের মধ্যে চলে আসে আর্টিস্ট। সারিকার বর্ননামতো শেষ করে খু’নির স্কেচ। আর সেটাও পুরোপুরিভাবে মিলে যায় স্নিগ্ধতার সাথে। সাইফের শ্বাসেরা থেমে যেতে চায়। পরিপূর্ণভাবে থেমে যেতে চায় ওর দুনিয়া। তারপরও সময় নিয়ে ও নিজেকে বোঝায়, সত্যের ওপরে কিছুই নেই। আইনের উর্ধ্বে কেউই নয়। সবটার ইতি টানতে সাইফ চলে আসে বাসায়। কনেসাজে স্নিগ্ধতাকে দেখে ওর স্মরণ হয় সে সব ভয়ানক মৃ’ত্যুগুলোর কথা। পকেট থেকে সারিকার বলামতো সদ্য শেষ করা স্কেচটা বের করলো সাইফ। স্নিগ্ধতা শব্দহীন। ভাইয়ের হাতের ছবিটায় ওর চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সাইফের চোখ দিয়ে জল গরালো। গলায় আটকে আসছে ওর সব। তারপরও বললো,
– এজন্যই সেদিন খু’নীর স্কেচ করতে গিয়ে অজ্ঞান হয়েছিলি তাইনা?
স্নিগ্ধতা নিরব। সাইফ স্পষ্ট স্বরে বললো,
– এসবের শুরু কোথায়?
– ভাইয়া…
আরকিছু বলার আগেই সশব্দে চ’ড় পরে স্নিগ্ধতার গালে। চ’ড়ের তীব্রতা এতোটাই বেশি ছিলো যে, কয়েকপা পিছিয়ে যায় ও। মাথা ধাধিয়ে যায় কয়েকমুহুতের জন্য। চারপাশ ঘুরে ওঠে। গালে হাত দিয়ে পাথরের মতো কিছুক্ষণ আটকে রইলো স্নিগ্ধতা। তারপর গাল থেকে আস্তে আস্তে হাত নামালো ঠোঁট অবদি। তরলের আভাস পেয়ে হাত সামনে আনলো। ঠোঁটের বা কোন থেকে রক্ত ঝরছে। স্নিগ্ধতার চোখে বিস্ময়। যে সাইফ আজোবদি ওর গায়ে ফুলের টোকাটা লাগতে দেয়নি, সেই সাইফ চ’ড় মেরে র’ক্তাক্ত করেছে ওকে। স্নিগ্ধতা কাঁপতে থাকে। চোখের জলেরা বেরিয়ে আসতে চায়। তারপরও তাদের থামিয়ে দেয় ও। কানে আসে,
– একটা খু’নী কখনো সাইফ এহমাদের বোন হতে পারে না। তুই আমার বোন নস।
স্নিগ্ধতা তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে চোখ তুলে তাকালো সাইফের দিকে। কিন্তু সামনে দেখে নিমীলিত হয়ে আসতে থাকে ওর চোখজোড়া। সাইফ শক্ত চোখমুখ করে ওর দিকে রিভলবার তাক করে আছে। পরনের শার্টটা ঘেমে পেশিতে আটকে আছে ওর। হাতও ঘেমে ভিজে উঠেছে। স্নিগ্ধতার ঠোঁটের কোণে র’ক্ত দেখে ওর কলিজা খামচে ধরে কেউ যেনো। যে আদরের বোনকে কোনোদিন উচুগলায় কথা শোনায়নি, সে বোনকে আজ নিজেহাতে চ’ড় মে’রে র’ক্তাক্ত করেছে সাইফ। যে বোনের বধুবেশে বাসা থেকে বিদায়ের কষ্টে ওর জর্জরিত থাকার কথা ছিলো, সেই বোনকে খু’নীর পরিচয়ে বন্দুকতাক করতে হচ্ছে। সাইফের ভাই-সত্ত্বার গগনবিদারী কান্নারা বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু পুলিশি-সত্ত্বা তাদের আটকে দেয়। পুলিশি সাইফ চায় রিভলবারের সামনে থাকা খু’নীকে হাতকড়া পরিয়ে টেনে-হিচড়ে দুনিয়ার সামনে নিয়ে যেতে। আর টুকির ভাই সাইফ চায় টুকির ঠোঁটের কোনে থাকা র’ক্ত মুছে দিতে। ব্যস্তভাবে শুধাতে, ‘খুব লেগেছে টুকি? কষ্ট হচ্ছে ঠোঁটে? ‘
দুসত্ত্বার মাঝে দিশেহারা হয়ে, রিভলবার ধরে রাখা হাতটাও কেপে ওঠে সাইফের। জিভ দিয়ে ঠোট ভেজালো সাইফ। আজ ওর দূর্বল হবার দিন না। দুহাতে রিভলবারটা আরো শক্তকরে আঁকড়ে ধরলো ও। সামনে দাড়ানো স্নিগ্ধতার ভাষাহীন দৃষ্টি। ও অবুঝ দৃষ্টিতে একবার রিভলবারের দিকে তাকাচ্ছে, তো একবার সাইফের চোখের দিকে। সাইফ শান্তভাবে বললো,
– চুপ করে থাকিস না। জবাব দে। বল এসবের শুরু কোথায়?
…
– জীবনে প্রথমবারের মতো তোকে যখন আঘাত করতে পেরেছি, আরো আঘাত করতে আমি দুবার ভাববো না টুকি! সো ডোন্ট স্টে কোয়ায়েট! আন্সার মি!
চেচিয়ে বলে উঠলো সাইফ। স্নিগ্ধতা সেভাবেই স্থির হয়ে দাড়িয়ে। সাইফ বুঝলো সময়নষ্ট হচ্ছে। এগিয়ে আবারো কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই মাথার পেছনদিকটায় শক্ত কিছুর আঘাত অনুভব করলো ও। বড়বড় কয়েকফোটা রক্ত ছিটে এসে লাগলো স্নিগ্ধতার জামায়। জমকালো শুভ্র জামাটায় র’ক্তের ফোটা পরতেই তা ছোপছোপ দাগ বসিয়ে দিলো। তীব্র যন্ত্রণায় একহাত মাথার পেছনে চেপে ধরলো সাইফ। স্নিগ্ধতার দিকে রি’ভলবার তাক রাখা হাতটাও নেমে আসতে লাগলো ওর। মাথা থেকে হাতে তরলের উপস্থিতি অনুভব করে সাইফ অবিশ্বাসী চোখে তাকালো স্নিগ্ধতার দিকে। স্নিগ্ধতা একচুল নড়ছে না। ওর কনেসাজে র’ক্তের দাগ পরেছে। কেবল দুফোটা জল গরালো স্নিগ্ধতার চোখ দিয়ে। সাইফ টলতে টলতে পেছনে ফিরতে যাবে, তার আগেই আরো একটা আঘাত!
হাতের রি’ভলবার ছিটকে দুরে গিয়ে পরলো সাইফের। মুখ থুবড়ে মাটিতে পরেছে ওউ। মাটিতে হাত দিয়ে জোর খাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করলো সাইফ। পারলোনা। ঘোলাটে হয়ে আসলো ওর চারপাশ। দিপ্ত, তেজী চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো নিশব্দে। স্নিগ্ধতা কিছুক্ষণ পাথরের মতো ঠায় হয়ে দাড়িয়ে রইলো। তারপর ধপ করে বসে পরলো ফ্লোরে। উপুর হয়ে পরে থাকা মানুষটার মাথার রক্ত ফ্লোরে চুইয়ে পরছে। যে লোকটা ওর গায়ে ফুলের টোকাটাও বরদাস্ত করতো না, সে মানুষটার রক্তাক্ত হওয়ার কারন ও। তার ক্ষতবিক্ষত হওয়ার কারন ও! চারপাশ যেনো ওকে চেচিয়ে জানান দিলো, ও বোন নয়, বোন নামে কলঙ্ক ও! কলঙ্ক!
•
জ্ঞান ফিরলে চোখ খোলার চেষ্টা করলো সাইফ। কোনোমতে চোখ খুলতেই বুঝলো, আবছা অন্ধকারে ডোবা কোনো এক ঘরে আছে ও। নড়াচড়া করতে গেলে বুঝলো, ওর মাথায় ব্যান্ডেজ। চেয়ারে বেধে রাখা হয়েছে ওকে। চোখ একবার বন্ধ করে নিয়ে আবারো টলোমলো চোখে সামনে তাকালো সাইফ। এবার ওর চোখ গেলো কাঠের তাকগুলোর দিকে। সেখানে হরেকরকমের ছু’ড়িসহ নানা ধা’রালো অ’স্ত্র রাখা। আর তার পেছনের দেয়াল ভর্তি করে কাগজ আটকানো। খু’ন হওয়া সাতজনের ছবি ঝুলছে সেখানে। খু’নের সবরকমের তথ্য, প্রমাণ, পেপারওয়ার্ক, পেপারকাটিং ও আছে। আরো একবার সাইফের ধারনা হলো, ঠিক কিভাবে কিভাবে সাতজনকে খু’ন করা হয়েছে।
গয়নার রিনঝিন শব্দ শুনে কোনোমতে হাতের বা পাশে চোখ ফেরালো সাইফ। ওপরের দিকে বাল্ব জ্বলছে একটা। দরজার মতো জায়গাটা দিয়ে, মাথা কিছুটা ঝুকিয়ে, দুহাতে জামা ধরে সিড়ি দিয়ে ভেতরে নামছে কেউ। সাইফ চুপ থাকলো। কয়েকপা এগোতেই ঝুলতে থাকা লাইটটায় দৃশ্যমান হয় তার চেহারা। সে আর কেউ নয়, কনেসাজে স্নিগ্ধতা। সাইফের বুকের ভেতরে আবারো য’ন্ত্রণা হানা দেয়। মাথার পেছনদিকটার চেয়ে তী’ব্রতর ব্য’থায় হৃদযন্ত্র চিনচিন করে। চোখ বন্ধ করে নিলো ও। স্নিগ্ধতা তেমনি গয়নার শব্দে চারপাশে ঝংকার তুলে দেয়ালের দিক তাকালো। সর্ববামে থাকা ‘YS’ লেখা কাঠের ওয়ালমেটটা ছুয়ে দিয়ে বললো,
– সবটার শুরু শুনতে চাইছিলে। তাইনা মিস্টার সাইফ এহমাদ?
স্নিগ্ধতার মুখে মিস্টার এহমাদ সম্বোধন শুনে চোখ খুলে ফেললো সাইফ। য়্যুমুর নাম শুনে বিস্মিত হলোও বটে। তবে সেটা স্নিগ্ধতার সম্বোধনকে ছাপিয়ে গেছে। সাইফচোখ উল্টিয়ে সামনে দাড়ানো স্নিগ্ধতার দিকে তাকালো। তার চাওনি ভাষাহীন। কিছুই যেনো গায়ে লাগছে না তার। স্নিগ্ধতা ওর চোখে চোখ রেখে বললো,
– সবসময় তো তুমি তোমার টুকিকে গল্প শোনাতে। আজ আমি তোমাকে একটা গল্প শোনাই। শুনবে?
সাইফ জবাব দিলোনা। শুধু ক্লান্তিতে পলক ফেললো দুবার। স্নিগ্ধতা দেয়ালের একপ্রান্ত থেকে একটা কাগজ টেনে অপরপ্রান্ত অবদি ঢেকে দিলো। তারপর রঙের কৌটোগুলো সারিবদ্ধ করে সামনে রাখলো। ছলছল চোখে চেয়ে, একরকম চাপা কষ্টের হাসি হেসে বললো,
– আজ শেষবারের মতো স্নিগ্ধতা রঙে মাতবে মিস্টার এহমাদ। ওর গল্প শুনতে হবে তোমাকে। ইউ’ল হ্যাভ টু! আর এ গল্পের নাম, ‘Beauty and the Beasts ‘ Rise of a beauty, ending of the beasts.
সাইফ নিরবই রইলো। স্নিগ্ধতা কোনোদিক পাত্তা দেয়না। এককৌটো রঙ ছুড়ে মারলো দেয়ালে। রঙ দেয়ালে লেগে ছিটে আসলো ওর ধুসর জামাতেও। দাগ বসে যায় জামায়। আরো কয়েককৌটো রঙ ছুড়ে মে’রে, দেয়ালে হাত দিলো স্নিগ্ধতা। ঘরে থাকা প্রতিটা ছু’ড়ি, চা’কুতে স্নিগ্ধতার প্রতিফলন হয়। ডলেডলে সবুজ ঘাস, নীল আকাশ, ফুল আর একটা মেয়ের উচ্ছ্বল মুখ আঁকালো ও। গুনগুনিয়ে গাইলো,
‘ Yumu was a little girl
Unafraid of the big wide world
She grew up, outer her castle walls.
Now and then she tried to run
And then on the night
With the setting sun
She went in the woods away
So unafraid, all alone.’
স্নিগ্ধতা সে অংশে থামলো। বললো,
– একটা নির্ভীক, বাধাহীন, অস্থবির ভ্রমণপিপাসী যুবতী, য়্যুমু। যে কোনোদিন কারো পরোয়া করেনি। স্রোতবীনির মতো ছুটে চলা যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সেই মেয়ে ম্যাসাচুসেটসে থাকাকালীন প্রেমে পরলো এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের। এক বাংলাদেশী যুবকের। আর সে প্রেমসীমা এতোটাই বেশি যে, তাকে ভালেবাসি বলবে বলে পুরোপুরিভাবে তার মাতৃভাষা আয়ত্ব করলো, তাকে সারপ্রাইজ দিতে সব ছেড়ে পাড়ি জমালো সে যুবকের দেশে। বাংলাদেশে। নতুন দেশে এসে পাখির মতো সবজায়গায় উড়তে থাকে য়্যুমু। প্রেমের টানে যুবকের সাথে দেখা করার আগে সৌন্দর্যের টানে ছুটে যায় কক্সবাজার। সমুদ্রতীরে মধ্যদুপুর, সূর্যাস্ত দেখে মুগ্ধ হয় ওর দুচোখ। এতোবেশিই মুগ্ধ হয় যে, সেখানকার ম্যানগ্রোভে সূর্যোদয় দেখার সিদ্ধান্ত নেয়। একরাশ উচ্ছ্বলতা নিয়ে শেষরাতের দিকে বেরিয়ে পরে, ম্যানগ্রোভ, সমুদ্র আর সূর্যের মিলন দেখবে বলে।
এটুক বলে পরের অংশ আঁকতে আবারো দেয়ালে রঙ ছুড়লো স্নিগ্ধতা। কয়েকদন্ড সেদিক তাকিয়ে থেকে, শব্দ করে কেদে দিলো ও। কাদতে কাদতে ঝাপিয়ে পরলো দেয়ালে। সাইফ অবাকচোখে দেখছিলো ওকে। স্নিগ্ধতা কাদছে, আঁকছে, গাইছে,
‘They warned her, don’t go there
There’s creatures,
Who are hiding in the dark.
Then she ran, faster and
Start screaming,
Is there someone out there?’
আঁকানো, গান, কান্না, দুটোই থামায় স্নিগ্ধতা। রঙভরা দুহাতের পিঠে কান্না মোছে দুচোখের। কাজল, আইলাইনার লেপ্টে গেছে ওর চোখ থেকে গালে। সাইফ দেখলো, এবারে স্নিগ্ধতা একটা বি’ব’স্ত্রপ্রায় মেয়ে আর তার চারপাশে চারটে ন’গ্ন ছেলের অবয়ব আকিয়েছে। স্নিগ্ধতা ভাঙ্গা গলায় বললো,
– য়্যুমু জানতো, ম্যানগ্রোভে হিং’স্র জা’নোয়ার-প’শু ছিলো। ওই হিংস্র প’শুরা মেরেও ফেলতে পারে ওকে। তারপরও রাতের ম্যানগ্রোভের রুপকে উপেক্ষা করতে পারেনি ও। আর না পেরেছিলো ওর অ’দৃষ্টকে আটকাতে। সে রাতে নিজেদের স্বার্থে ওই জঙ্গলে এসেছিলো আরো চারজন। য়্যুমুর পায়ের আওয়াজ পেয়ে টেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে তারা। মুখোমুখী হয়, এক দুরন্ত মানবী, আর চার মানুষরুপী প’শু! স্ব’প্নআঁকা একজোড়া চোখ, আর ম’দ আর ড্রা’গস নিয়ে মাতাল হয়ে পরা প’শুগুলো লোলুভ দৃষ্টি।
য়্যুমু টের পায়, ওরা স্বাভাবিক নয়। ছুটে পালাতে চায় সেখান থেকে। কিন্তু সম্ভব হয় না। জা’নোয়ারগুলো ধরে ফেলে ওকে। য়্যুমু গায়ের জোর খাটায়, চিৎকার করে, লাভ হয়না। আট আটটে পুরুষালি হাতের থাবা থেকে বেরোতে পারে না। হাত পা ধরে রেখে, সে রাতে চারজন মিলে ওকে…
মুখ চেপে ধরে স্নিগ্ধতা। ফুপিয়ে কেদে ওঠে আবারো। সাইফ বুঝতে পারলো, সেদিন গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলো য়্যুমু। মাথা নিচু করে নিলো ও। স্নিগ্ধতা বললো,
– এতোগুলো দেশ, এতোগুলো পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে আসা মেয়েটি তার ভালোবাসার জন্য বাংলাদেশে আসলো। আর সেই দেশের কিছু অ’মানুষ মিলে সব স্বপ্ন ন’ষ্ট করে দিলো ওর। যে ম্যানগ্রোভের রুপে মুগ্ধ হয়ে ও সূর্যোদয় দেখতে বেরিয়েছিলো, সে ম্যানগ্রোভের মাটিতে সর্বস্ব হারাতে হয় ওকে। সেরাতে চারজন মিলে পশুর মতো ঝাপিয়ে পরেছিলো য়্যুমুর ওপর। ওর শরীরের প্রতিটা অংশে তাদের নি’স্রংসতার ছাপ বসিয়েছিলো। একের পর এক শরীরী উল্লাসে ফেটে পরছিলো ওরা। আর ওদের নোংরা স্পর্শে আর্ত’নাত করে উঠছিলো য়্যুমু! শি ওয়াজ গ্যাং-রে’পড মিস্টার এহমাদ! শি ওয়াজ গ্যাং-রে’পড!
চেচিয়ে বলে দেয়ালটাতেই পিঠ ঠেকিয়ে বসে গেলো স্নিগ্ধতা। হাটুতে দুহাত নিচেরদিক তাকিয়ে স্থির হয়ে বসে রইলো কিছুটা সময়। এরপর ক্লান্ত দৃষ্টিতে সাইফের দিকে তাকালো ও। আহত হেসে বললো,
– চিনেছো এই য়্যুমুকে মিস্টার এহমাদ? প্রায় চারবছর আগে তোমার গাড়িতে এক্সিডেন্ট করা সেই সেই নরওয়েজিয়ান ট্যুরিস্ট?
সাইফের চেহারায় বিস্ময়ের আভাস। কেইসের জন্য ও এই য়্যুমুর অতীত জানার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু সেদিন য়্যুমুর সাথে কি ঘটেছিলো, তার কোনোরকম হদিশ নেই কারো কাছে। তাহলে ওকে নিয়ে এতোকিছু কিকরে জানে স্নিগ্ধতা? এক্সিডেন্টের সময় মা’রা যাওয়া য়্যুমুকে তো স্নিগ্ধতা দেখেও নি। ও তো নিজেই সেন্সলেস ছিলো তখন। তাহলে? স্নিগ্ধতা বললো,
– কিন্তু য়্যুমু তো সেদিনই তোমার গাড়িতে এক্সিডেন্ট করে মা’রা গিয়েছিলো তাইনা? তাহলে এসব আমি কি করে জানি, তাইতো?
সাইফ জবাব দিলোনা। স্নিগ্ধতার প্রশ্ন শুনে ওর শ্বাসের গতি বেড়েছে। স্নিগ্ধতা উঠে দাড়ালো। এগিয়ে এসে আবারো সাইফের সামনের টেবিলে হাত রেখে ঝুকে দাড়ালো ও। ঘাড় কাৎ কাতরভাবে বললো,
– এক্সিডেন্টের কতোদিন পর তোমার জ্ঞান ফিরেছিলো মিস্টার এহমাদ?
সাইফ বড়বড় চোখে তাকালো। স্নিগ্ধতা সোজা হয়ে দাড়িয়ে স্পষ্টভাবে বললো,
– এক সপ্তাহ। আর এই এক সপ্তাহে অনেককিছু ঘটেছিলো ইন্সপেক্টর। শুনতে চাওনা কি কি ঘটেছিলো সেসময়?
বাধা হাতই মুঠো করে ফেললো সাইফ। মানে পরেরটুকো শোনার জন্য প্রস্তুত নয় ও। স্নিগ্ধতা ওর মুঠো করা হাত দেখে নিলো। সাইফের চোখের কাতরতাও পড়লো। তবে গায়ে লাগালো না। অকপটে বললো,
– একসপ্তাহ পর জ্ঞান ফেরে তোমার। তোমাকে জানানো হয়, ইমার্জেন্সিতে তোমার বোন মৃ’ত্যুমুখী। অথচ সত্যি তো এটাই, জ্ঞান ফেরার পর ইমার্জেন্সির বেডে যাকে দেখেছিলে, সে তোমার বোন ছিলোই না। তোমার বোনের তোমার পরিবারের সাথেই স্পট ডেথ হয়ে গিয়েছিলো।
– নাহ…
সাইফ অস্ফুটস্বরে কিছু বলতে চাইলো। স্নিগ্ধতা সুযোগ দিলোনা ওকে। তেমনি নিস্প্রাণ দৃষ্টি রেখে বললো,
– ঠিক শুনেছো তুমি। স্নিগ্ধতা এহমাদ এক্সিডেন্ট স্পটেই মা’রা গিয়েছিলো।
…
– আর তার সাতদিনের মাথায় তোমার দেখা ইমার্জেন্সির বেডে যে ছিলো, সে ছিলো স্নিগ্ধতার প্রতিরুপ। প্লাস্টিক সার্জন জেনেলা সাকলিকের মেয়ে, য়্যুমু সাকলিক।
টপটপ করে জল গরাতে লাগলো সাইফের চোখ থেকে। ও বুঝতে পারছে, জীবনের সবচেয়ে তিক্ত সত্যগুলো আজ ওকে নিঃশেষ করে দেবে। শুরুতে খু’নী হিসেবে বোনকে ; পরে সে বোনের মৃ’ত্যুর কথা! তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে যাকে বোন মেনে এসেছে, সে ওর বোন ছিলোই না। ওর ফুলের মতো বোনটাও নাকি সেদিনের এক্সিডেন্টে মা’রা গেছে। কথাগুলো বলে দিয়ে সাইফের কান্না দেখতে লাগলো স্নিগ্ধতা। ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সাইফের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ও শান্ত স্থির। মিনমিনে গলায় বলতে লাগলো,
– সেদিন হসপিটালে তোমার কোনো আত্মীয়স্বজন তোমাদের পরিবারের খোজ নিতে আসেনি। শুধু জেনি মম এসেছিলো। আদুরে মেয়েকে একাধারে রে’প, এক্সিডেন্টে ক্ষতবিক্ষত দেখে তিনি নিজেকে কি করে সামলেছেন, তা কেবল তিনিই জানেন। এক্সিডেন্টের ফলে গাড়ির কাচ ঢুকে আমার চেহারা নষ্ট হয়ে যায়। ওদিকে তোমার পরিবারের মধ্যে একমাত্র তুমিই বেচে ছিলে। আর তোমার বেচে থাকার জন্য অবলম্বনের প্রয়োজন ছিলো। তাই দ্বিতীয়বার ভাবেনি মম। যেহেতু সে নিজেই সার্জন, আমাকে স্নিগ্ধতার রুপ দেয় সে। সবটা সীমাবদ্ধ থাকে মমের কিছু পরিচিত ডক্টর আর কক্সবাজারের এক ইনচার্জের মাঝে।
জ্ঞান ফেরার পর পাগলামো শুরু করি। সতীত্ব হারিয়ে বাচার ইচ্ছা ছিলোনা আমার। অন্যকারো রুপে নিজেকে দেখে, আরোবেশি ম’রিয়া হয়ে ওঠি নিজেকে আঘাত করতে। তারপর জেনিমম আমাকে বোঝায়, আমার বেচে থাকাটা জরুরি। তোমার বেচে থাকার জন্য আমার স্নিগ্ধতা হওয়া জরুরি। আর সেই দ্বিতীয় কারনে থেমে যাই আমি। সত্যিই তো! আমার জন্যই তুমি পরিবারহারা। চারজনের ভোগের বস্তু হয়ে যখন নিজের কাছে নিজেকেই বোঝা মনে হচ্ছিলো, যন্ত্রণা সইতে না পেরে ইচ্ছে করে তোমার গাড়ির সামনে চলে এসেছিলাম। বুঝিনি আমাকে বাচাতে গিয়ে তুমি তোমার পরিবারের বলিদান দিয়ে দেবে। তোমার পরিবার হারানোর জন্য আমি দায়ী। আর সে আত্মগ্লানির দরুনই আমি নিজেকে স্নিগ্ধতারুপে মেনে নিলাম। তোমার জ্ঞান ফিরলো। এক্সিডেন্টে কি কি ঘটেছিলো, তুমি তাই জানলে, যা জেনিমম তোমাকে জানাতে বলেছিলো। তারপর বোনকে নিয়ে এ বাসায় ফিরলে তুমি। বোনকে শোক কাটিয়ে ওঠার জন্য সময় দিতে থাকলে। স্নিগ্ধতার সব বৈশিষ্ট্য বুঝে নেওয়ার জন্য আমাকে সুযোগ দিতে থাকলে। আর আমিও মাসের পর মাস অবরুদ্ধ থেকে নিজেকে বোঝাতে লাগলাম, কলঙ্কিত য়্যুমু হয়ে মরে যাওয়ার চেয়ে নিস্কলঙ্ক স্নিগ্ধতা হয়ে বেচে থাকা শ্রেয়। য়্যুমুর মাঝে আস্তেআস্তে তৈরী করলাম টুকিকে। আর আজও তোমার সামনে সেই য়্যুমুই দাড়ানো ইন্সপেক্টর এহমাদ। ইট ওয়াজ মি। এন্ড আই অ্যাম স্টিল নাও।
গরগর করে সবটা স্বীকার করে নিলো স্নিগ্ধতা। স্থির হয়ে দাড়িয়ে সাইফকে দেখতে লাগলো ও।সাইফের চোখের জলেরা অবাধে বইছে। পরিবার হারানোর যন্ত্রণা আজ আরো একবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ভেতরটায়। তারসাথে জাগছে রাগ! রাগে কাপতে কাপতে, দাতে দাত চেপে সাইফ বললো,
– কেনো?
চোখ তুলতেই স্নিগ্ধতার র’ক্তজমা চোখ চোখে পরলো সাইফের। কিন্তু আজকে ওর কান্না দেখে আর সাইফের বুক কেপে উঠলো না। আর কলিজা খামচে ধরলো না। সাইফ চেচিয়ে উঠলো এবারে। আরো উচ্চস্বরে বললো,
– এতোবড় খেলাটা কেনো খেললে তুমি য়্যুমু? হুয়াই?
সাইফ আরো চেচাতে গিয়েও পারলোনা। মাথার আঘাত ওর স্বরকে নমিয়ে দেয়। স্নিগ্ধতার চোখ থেকে আবারো জল গরায়। সাইফের দিকে ও চুপচাপ তাকিয়ে রইলো ও। তারপর দেয়ালের বাপাশ থেকে ড্রয়িংয়ের কাগজটা খুলে দিলো। সেখানে থাকা প্রথম মৃ’তদেহের ছবিটা টান মে’রে খুলে সাইফের দিকে ফিরে বললো,
– প্রথম খু’ন। ওয়াজেদ পাটোয়ারী। পেশায় ব্যবসায়ী। কিন্তু আরেকটা পরিচয় ছিলো তার। মেয়ে দেখলে ওর মাথা ঠিক থাকতো না। হোক তা যেকোনো বয়সের। নিজের বাসায় ভাড়াটিয়ার মাত্র আট বছরের শিশুটাকে রে’প করেছিলো ও। নিউজে খবরটা দেখে মাথা গুলিয়ে যায় আমার। নিজেকে সামলাতে পারিনি। ওই অবুঝ শিশুটার সাথে এমনটা করার বিনিময়ে আমি ওকে হার্ট এটাক দিয়েছি।
সাইফ জোরেজোরে শ্বাস ফেলছে। কিছুই বলছে না। স্নিগ্ধতা এগিয়ে এসে ওর সামনে থাকা টেবিলটায় ছবিটা রাখলো। মৃতদেহের বি’ভৎস ছবিটায় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললো,
– পুরোপুরি হার্ট এটাক না এটা। এটাক অন হার্ট। শুরুতে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করা, দেন হাতপা বাধা, আয়রন, ইলেকট্রিক শ’ক, পানিতে চোবানো শেষে শরীরী-লি’প্সায় লকলক করতে থাকা অঙ্গগুলোকে একটা একটা করে আলাদা করা। আর সবশেষে ড্রিল মেশিনের সাহায্য মৃ’ত্যুকামনা করতে থাকা হৃদযন্ত্রের কামনা পূরণ করা।
চোখ বন্ধ করে নিলো সাইফ। স্নিগ্ধতা গিয়ে বাকি ছবিগুলোও নিয়ে আসলো টেবিলে। একলাইনে সাজিয়ে রেখে বললো,
– বাকি সাতজনেরও সমসাময়িক অবস্থা। এখনো অবদি যাকে, যেখানে, যেভাবে চোখে পরেছে কোনো মেয়েকে অপমান করতে, মে’রে দিয়েছি। দ্বিতীয় অ’পহরন হয় সিএনজিতে। মেয়েসঙ্গ ভোগ করে নেশায় বুদ হয়ে বাসায় ফিরছিলো সে। রাস্তাতে অ’পহরন, আর তারপর মৃ’ত্যু। তৃতীয়জন নিজের বাসায়ই মা’রা যায়। সেটাকে ছদ্মবেশী কাজের মেয়ের কাজ বলা চলে। চতুর্থজন বই কিনতে এসে স্নিগ্ধতার রাজ্যে হারায়, অতঃপর সোজা মৃ’ত্যুপুরী। পঞ্চমজন সবুজ। সারিকা হয়তো বলেছে তোমাকে সে বিষয়ে রাইট? ডক্টর নাজমুলকে বাসা থেকে বের করেও সেদিন মা’রতে পারিনি। সিসিক্যামের রিস্ক নিয়ে, হসপিটালে গিয়ে তার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ইন্জিনিয়ার তারেকের কেইসটা হুবহু দ্বিতীয়জনের মতোই। চঞ্চলের পরিণয়ের সাক্ষী মোহিনী। আর অনুকে অপমান করেছে বলে মোহিনীর পরিণয় কি, তার সাক্ষী তুমি নিজে।
তবে এতোক্ষণ যা যা বললাম, এছাড়াও এই দেয়ালে আরো ইনফো টানানো আছে। পুলিশের বোন হিসেবে যেমন যেমনটা পুলিশ কালেক্ট করেছে, তেমন তেমনটা। আর খু’নী হিসেবে তারচেয়ে বেশি। শাস্তি প্রাপ্য ছিলো ওদের। তাই সাজা দিয়েছি। নিজেকে আড়াল রাখতে তোমার বোন হওয়াটাই সবচেয়ে বেস্ট অপশন ছিলো। আমি তোমার রুমে এমনিএমনি নক করে যেতাম না মিস্টার এহমাদ। নক করে আমি মুলত তোমাকে সুযোগ দিতাম, আমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লুকিয়ে ফেলার। এমনিএমনি তোমার ঘর গুছাতাম না আমি। তোমার কাবার্ড, লকার, চাবি থেকে শুরু করে, টেবিলের কলমদানিটায় কলম কতো ডিগ্রিতে রাখা, সেটা অবদি আমার মুখস্ত ছিলো। আর সেখানে থাকা আটারোটা কলমের একটা কলম, আমার নিজের হাতে বানানো। উইথ মাইক্রোক্যামেরা এন্ড মাইক্রোফোন। সবসময় আনুভমিকভাবে সাতাশ ডিগ্রিতে রাখা থাকতো ওটা। এক্সাক্ট টু ইওর টেবিল।
হাতের মুঠো থেকে একটা কলম বের করে নিব ওঠানামার শব্দ করতে লাগলো স্নিগ্ধতা। সাইফ তাকালো। স্নিগ্ধতার ঠোঁটের কোনে র’ক্ত জমাট বেধেছে৷ হাত দিয়ে ডলা মেরে আবারো সে জায়গাটা জ’খম করে ফেললো ও। আবারো টকটকে লাল তরল বেরিয়ে আসলো ওর ঠোঁট থেকে। স্নিগ্ধতা ডানহাতের বৃদ্ধাঙুলে সে র’ক্ত নিয়ে বললো,
– এমনিএমনি র’ক্তে ফোবিয়া না আমার। ওইসব নর’পশুর র’ক্তস্নাত য়্যুমুকে লুকোতে স্নি’গ্ধস্নাত স্নিগ্ধতার মিথ্যাচার দরকার ছিলো যে! দরকার ছিলো তোমাকে এই কেইসের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলার। দরকার ছিলো তোমার চারপাশে অদৃশ্য মায়া তৈরীর। দরকার ছিলো…
– আর কে কে আছে তোমার সাথে?
বড়বড় শ্বাস ফেলে সাইফ প্রশ্ন ছুড়লো। শরীর ভার ছেড়ে দিচ্ছে ওর। বাচার ইচ্ছে করছে না আর। কিন্তু ম’রে যাবার আগে এই কু’ৎসিত অধ্যায়ের আদ্যোপান্ত জানতে ইচ্ছে করছে ওর।
স্নিগ্ধতা শান্তশিষ্টভাবে সরে দাড়ালো। তারপর একটা বোতল নিয়ে একটুএকটু করে ছিটিয়ে দিলো কাগজ লাগানো দেয়ালটায়। সাইফের চোখ বারবার বন্ধ হয়ে আসছিলো। তবুও তাদেরকে জোর করে খোলা রাখলো ও। দুবার পলক ফেলার সময়ে ওর চোখের সামনে হাজির হলো আরো দুটি অবয়ব। তারমধ্যে একটা পুরুষালী অবয়ব। তার চেহারা আধারে। আর দ্বিতীয়জন শারী পরিহিত ছায়াময়ী। ম্যাচের কাঠিতে আগুন ধরিয়ে, জ্বলন্ত কাঠিটা দেয়ালে ছুড়ে মা’রলো সে। মুহুর্তেই আগুন পুরো দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে যায়। আর সে জ্বলতে থাকা দেয়ালের সামনে এসে দাড়ায় সে নারী। দৃশ্যগোচর হয় তার মুখচেহারা। অগ্নিলা…
#চলবে…

