নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা ৬৯.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা

৬৯.

– আয়নায় কাকে দেখতে পাচ্ছো শারাফ?

– আমার জন্য পৃথিবীতে নেমে আসা চাঁদকে।

শারাফের জবাব শুনে হাততালি দিয়ে হৈহৈ করে উঠলো প্রত্যেকে। বিয়ের পর একসাথে বসানো হয়েছে শারাফ স্নিগ্ধতাকে। দুজনের সামনে একটা আয়না ধরে কথাটা জিজ্ঞেস করেছিলো মেহেরুন। শারাফ আয়নায় তাকিয়ে আছে। তবে স্নিগ্ধতা চোখ তুলে চাইছে না। শায়েরী বললো,

– এবার তুমি বলো স্নিগ্ধুভাবী! আয়নায় কাকে দেখছো?

চোখ তুলে চাইলো স্নিগ্ধতা। আবারো শারাফের সেই হাসোজ্জল মুখ। চোখ ভরে ওঠে ওর। গলায় কথারা দলা পাকিয়ে যায়। তারপরও বলে,

– চন্দ্রিমাস্নাত এক প্রেমিকপুরুষকে।

সবাই আরোবেশি উল্লাসী হলো। মিসেস নাহিদ বললেন,

– শারাফ কিন্তু আর তোমার প্রেমিক না স্নিগ্ধতা। ও কিন্তু তোমার বর হয়ে গেছে! সম্বোধন সামলে হুম! মিস্টার ইনি তোমার!

স্নিগ্ধতা ঘাড় ঘুরিয়ে শারাফের দিকে তাকালো। হাটুর ওপর ভর করে বসলো শারাফ। স্নিগ্ধতার দুগাল ধরে ওর কপালে চুমু দিয়ে বললো,

– আর এই মিস্টার তার মিসেসকে অনেক ভালোবাসে।

টুপ করে জল গরায় স্নিগ্ধতার চোখ বেয়ে। শারাফ বৃদ্ধাঙুলে সে পানি মুছে দিলো। বললো,

– মিস্টার এহমাদ চলে আসবে স্নিগ্ধতা। তুমি প্লিজ কেদোনা।

স্নিগ্ধতা কান্না থামলো। যাকে ও নিজে আটকে রেখেছে, তার ফেরার নিশ্চয়তা দিয়ে শারাফ ওকে শান্ত করার ক্ষমতা রাখেনা। নিজেকে সামলাতে হবে ওর। ওর কাজ যে এখনো বাকি।
দুজনে মিলে উঠে দাড়ালো। একেএকে বড়দের সবার কাছে গিয়ে দোয়া চাইলো। অগ্নিলা এসে শারাফের শেরওয়ানীর চাদরে স্নিগ্ধতার ওড়নায় গিট দিলো। শারাফ হাসিমুখে বললো,

– ডক্টর জেনেলা আসেনি মিস হটি?

কিঞ্চিৎ চকিত চোখে শারাফের দিকে চাইলো স্নিগ্ধতা। অগ্নিলা আরো বেশি বিস্ময়ে স্নিগ্ধতার দিকে চাইলো। বললো,

– ডক্টর জেনেলার আসার কথা ছিলো?

স্নিগ্ধতা চুপ রইলো। শারাফ অগ্নিলাকে ইশারায় চুপ হতে বললো। বুঝালো, এখন স্নিগ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করতে, কিছু মনে না করাতে। সাইফের অনুপস্থিতি ওর জন্য কষ্টকর। সরে দাড়ায় অগ্নিলা। আস্তেআস্তে কনেবিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসলো। বিয়েবাড়ির রমরমে ভাবটাও নিভিয়ে যেতে লাগলো তার সাথে। স্নিগ্ধতা কবুল বলে দেবার পরপর থেকে অনেকেই মুখ লুকিয়ে কাদছেন। সবার আদুরে মেয়েটা আজ এ বাসা ছাড়ছে। তারচেয়ে বড় কথা সাইফের এখনো আসার নাম নেই। ফোনটাও অগ্নিলার কাছে রেখে গিয়েছে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেজান সাহেব এক বয়্যজৈস্ঠর কাছে এগোলেন। তার হাত মুঠো করে ধরে বললেন,

– শারাফ-স্নিগ্ধতাকে নিয়ে আমাদের এখন বেরোনো উচিত ভাইজান।

-কিন্তু সাইফ…

অগ্নিলার দিক তাকিয়ে ভদ্রলোক থেমে যান। ও বুঝালো, সাইফের আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। বাকিসবেরও একই মত। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝালেন তিনি। শারাফ সবার মতে সন্তুষ্ট হলো না। স্নিগ্ধতাকে স্পষ্টভাবে বললো,

– তুমি কি চাও?

– তুমি না চাইলে এখন কেউ স্বপ্নীলে ফিরবে না।

– ভাইয়ার সাথে দ্রুতই দেখা হবে আমার।

শান্তশিষ্ট ভঙিতে জবাব দিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ওর সম্মতি বুঝলো। বাবা-ছোটচাচাকে মাথা নাড়িয়ে অনুমতি দিলো বেরোনোর জন্য। স্নিগ্ধতা পা বাড়ালো। ওর হাত একমুহূর্তের জন্যও ছাড়েনি শারাফ। কনেবিদায়ে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরী হলো জায়গাটায়। স্নিগ্ধতার বিদায়ে বয়স্কা, মধ্যবয়সী, সমবয়সী উপস্থিত সবাই কাদছে। শুধু কাদছে না ও। রোবোটের মতো গেইটে এসে ফিরে দাড়ালো স্নিগ্ধতা। ফুলে সাজানো গাড়ির সামনে দাড়িয়ে, নিজের বাড়িটার দিকে চোখ তুলে তাকালো ও। সাইফ রান্না করছে, ওকে খাইয়ে দিচ্ছে, ওর চুলে তেল দিয়ে দিচ্ছে, দুষ্টুমির দায়ে ওকে ধাওয়া করছে, আবার ও একটু ব্যথা পেলেই অস্থির হয়ে উঠছে ; স্নিগ্ধতার অশ্রুভরা চোখে মুহুর্তেই ভেসে উঠলো সব। সামনে দাড়ানো মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটস্বরে বললো,

– আ’ম সরি।

সবারই কান্নার বেগ বাড়ে। কিন্তু আওয়াজ হয়না কোনো। অগ্নিলা চুপ করে একপাশে দাড়ানো। একপলক ওর দিকে তাকিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলো স্নিগ্ধতা। শারাফ সবার কাছে যথেষ্ট সময় নিয়ে বিদায় নিলো। গাড়িতে বসে দেখলো স্নিগ্ধতা শক্ত হয়ে বসে। ওর চোখ থেকে জল গরাচ্ছে তো গরাচ্ছেই। গাড়ি ছেড়ে দিলো। শারাফ দুহাতে স্নিগ্ধতার দুহাত নিলো। চুমু দিয়ে বললো,

– আজ থেকে আমার তোমার ভেতরে থাকা সব কষ্টগুলো চাই স্নিগ্ধতা। দেবে?

স্নিগ্ধতা শারাফের দিকে তাকালো। জবাব দেওয়ার পরিবর্তে, হাত ছাড়িয়ে নিজের চোখ মুছলো ও। শারাফ বিচলিত হলো না, আহত হলো না। স্নিগ্ধতা নিমীলিত কন্ঠে বললো,

– কিন্তু আমি তোমাকে ধারক বানাতে চাইনি শারাফ।

শারাফ হেসে দিয়ে স্নিগ্ধতাকে নিজের বুকে টেনে নেয়। হতে চলা তাডবের ভয়ে ওর শেরওয়ানি মুঠো করে ধরে স্নিগ্ধতা। শারাফ দুহাতের বাহুবন্ধনী শক্ত করলো। চোখ বন্ধ রেখে বললো,

– স্নিগ্ধতায় স্নিগ্ধসিক্ত পুরুষ আমি। আমিতো প্রলয়ার প্রলয়ে প্রণয় রচনা করেছি। তোমার সবরুপ ধারনের ক্ষমতা আছে আমার স্নিগ্ধতা। তোমার জানা অজানায়, আমিই তোমার ধারক।

স্নিগ্ধতার ভেতরটা ধ্বক করে ওঠে। শারাফের প্রলয়া ডাক নতুন নয় ওর। কিন্তু আজ তার অর্থে ভিন্নতা শোনাচ্ছে। একবর্ণ উচ্চারন না করে, ঘাপটি মেরে শারাফের বুকে পরে রইলো ও। হাজারো কলঙ্কের মাঝে, একটু সুখের লোভ তো করাই যায়। এই সুখ যে ওর চিরন্তন না।

বরকনের গাড়ি স্বপ্নীলে পৌছালো। মিসেস সেজান মিষ্টিমুখ করিয়ে ছেলে ছেলেবউকে ঘরে তুললেন। স্নিগ্ধতা চুপচাপ রইলো পুরোটা সময়। ওকে ড্রয়িংয়ে মাঝখানে বসিয়ে কিছুক্ষণ আড্ডাও দিয়েছে পুরো স্বপ্নীল। স্নিগ্ধতা বুঝলো, সবটাই ওকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা। কাতর চোখে পুরো পরিবারকে দেখে নিলো ও। ও তো এই পরিবারের সমস্ত হাসি ধূলিস্মাৎ করতে এসেছে। ও হবে এদের প্রত্যকের জীবনে কলঙ্কিত অধ্যায়। মিসেস নাহিদ মেহেরুনকে বললেন,

– শাওন কোথায় মেহু? সেইযে বরযাত্রীর গাড়ি থেকে নামলো, ওকে আর দেখছি না যে?

ঘোমটার ওড়না শক্তমুঠো করে নেয় স্নিগ্ধতা। সেটা লক্ষ্য করেছে শারাফ। আলতোকরে ওর হাত ধরলো ও। মুঠো খুলে দিয়ে বললো,

– বিয়েতে স্নিগ্ধতার ভাই ছিলোনা। এখানে স্বপ্নীলে আমার ভাই নেই। টপিকটা আজ থাক বউমা।

মেহেরুনের মনটাও খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো। শাওনকে কয়েকবার কল করেও পায়নি ও। শারাফের কথায় কথা ঘোরাতে তাল মেলালো ও। জোরালো হেসে বললো,

– হ্যাঁ ছোটমা। ছাড়ো তো ওর কথা! জানোই তো দেশে ফেরার পর থেকেই কেমন বন্ধুদের নিয়ে মেতেছে সে। দেখো গিয়ে, শারাফের বিয়েতে আসা দলবলের সাথে আছে হয়তো!

মুসকান স্নিগ্ধতার শাড়ির আঁচল ধরে ছিলো। আঙুলে মোড়াতে মোড়াতে হাই তুললো ও এবারে। বললো,

– আমার ঘুম পাচ্ছে ভাবীন। চলো আজকে আমি আর তুমি একসাথে ঘুমোবো। আজকে আর বার্বি না, ভাবী নিয়ে ঘুমোবো।

মুসকানের কথায় আটকে গেলো সবাই। শারাফ সবে মুখ খুলতে যাবে, গলা ঝারলেন সেজান সাহেব। উঠে দাড়িয়ে বললেন,

– মেহেরুন? ঘুমোতে যাও সবাই। সত্যিই অনেক রাত হয়েছে। তাছাড়া অনেক ধকল গেছে সারাদিন।

স্নিগ্ধতার মাথায় হাত বুলিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন উনি। মিসেসে সেজানও মেহেরুনকে ইশারা করে চলে গেলেন। ওনারা চলে যেতেই মুসকানের কান চেপে ধরলেন মিসেস নাহিদ। বললেন,

– তুই ভালো কবে হবি মুসু?

– আমি খারাপটা কি বললাম আম্মু?

আর্তনাৎ করে বললো মুসকান। শারাফ ওকে ইশারায় নিজের কাছে ডাকলো। নিজেকে ছাড়িয়ে শারাফের কাছে গেলো মুসকান। শারাফ ওর গাল সুন্দরমতো টেনে দিয়ে আদুরে গলায় বললো,

– ছোটমার থেকে প্রতিবার তো আমিই বাচাই তোকে। কিন্তু আজকে আবোলতাবল আবদার করবি তো যে কানটা অক্ষত আছে, ওটাতে আমি একটা লাগাবো। বুঝেছিস?

মুসকান আহত চোখে চেয়ে রইলো শারাফের দিকে। যে শারাফ ওকে বিগড়েছে, প্রথমবার সেই শারাফ ওকে শাসানোর কথা বলছে। বাকিসব হাসাহাসি করছে। মেহেরুন দেখলো স্নিগ্ধতা তেমনই স্থবির। এগিয়ে গিয়ে স্নিগ্ধতার পাশে বসলো ও। পর কাধে হাত রেখে বললো,

– আর মন খারাপ করে থেকোনা স্নিগ্ধতা। এখন আমরাও তো তোমার পরিবার বলো? স্বপ্নীল ভালোবাসায় ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখবে তোমাকে দেখো!

শারাফ পাশ থেকে বলে উঠলো,

– শারাফও।

ওরদিক ফিরলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ওর হাত ধরে উঠে দাড়ালো। ফলে স্নিগ্ধতাও দাড়াতে বাধ্য হলো। শারাফ মেহেরুনকে স্পষ্টভাবে বললো,

– আমরা তাহলে এখন ঘরে যাই? ড্রয়িংয়ে বাসর সারার মতো বন্দোবস্ত করোনি নিশ্চয়ই?

মেহেরুন হাসলো। মিসেস নাহিদ বললেন,

– কখনো তো মুখে লাগাম রাখো শারাফ?

শারাফ কিছু বললো না। শায়েরী গা ছাড়াভাবে বললো,

– আবির ভাইয়াসহ তোর বাকি বাইশজন বন্ধু গার্ডেনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। বাসরঘরের চাবিটা ওদের কাছে।

– কতো লাগবে?

শারাফ সোজা কথা পারলো। মেহেরুন হাত বাড়িয়ে আগ্রহের সাথে বললো,

– তোমার তেইশটা বন্ধু আর আমরা স্বপ্নীলের সাতজন। ত্রিশজন। বাকি হিসেবটা তুমি জানো!

– এতো টাকা ক্যাশ নেই।

– দ্যাখ ভাইয়া, ও বাসায় স্নিগ্ধুভাবীর কোনো বান্ধবীকে তোর জুতার ধারেকাছে আসতে দেইনি। নইলে ওখানেই কিন্তু সব টাকা খসে যেতো তোর। এখন মোটেও কিপ্টামি করবি না বলে দিলাম!

– আমি কিপ্টেমি কখন করলাম? চাবিটা দে, দিচ্ছি টাকা। রুম থেকে চেকবুক নিয়ে আসি।

শারাফের গলা স্বাভাবিক। মিসেস নাহিদ সরুচোখে চেয়ে বললেন,

– চালাকি করছো?

– একদমই না! আজব! এতো টাকা এখন আমাকে স্লাইস করলেও পাবেনা। চাবিটা দাও, চেকবই এনে টাকা দিচ্ছি।

শারাফ তেমনই স্বাভাবিক গলায় বললো। মেহেরুন হেচকা টানে স্নিগ্ধতাকে নিজের কাছে টেনে নিলো। শায়েরীকে বললো,

– ননদীনি? দিয়ে দাও চাবি ওকে! মূলধন জমা রেখে জনাব যাক, সুদ নিয়ে আসুক!

শারাফ কোমড়ে হাত রেখে ক্ষুদ্রশ্বাস ফেললো। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিলো। ওর স্বভাব বুঝে গেছে স্বপ্নীল। শায়েরী চাবি দিলো ওকে। মেজাজ তিরিক্ষি করে চাবিটা কেড়ে নিলো শারাফ। ওপরে এসে দ্রুততার সাথে চেকবই বের করলো। কিন্তু রুম বেরোতে গিয়ে দরজায় পা থামলো ওর। পেছন ফিরে আবারো পুরো ঘরটায় চোখ বুলালো ও। পুরো ঘরটা অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো। লাল ফুলে বিছানা, দেয়াল সব সাজিয়েছে ওর বন্ধুরা। শারাফ হেসে বারান্দায় গেলো। নিচে গার্ডেনে গোল হয়ে বসে বিশ-বাইশজন। হাসছে, আড্ডা দিচ্ছে। শারাফ ডাক লাগালে ওপরে তাকালো সবাই। শারাফ বললো,

– জোশ হয়েছে!

আবির গলা উচিয়ে জবাব দিলো,

– থ্যাংকিউ বন্ধু! টাকাটা দিয়ে দে শায়েরীকে!

– দিচ্ছি! তোরাও এখান থেকে সর। তোদের ভাবিকে নিয়ে চন্দ্রবিলাস করবো।

শারাফের কথায় হেসে দেয় সবগুলো। শারাফ নিজেও হেসে বেরিয়ে আসে। পুরো ত্রিশহাজার টাকার চেইক ধরিয়ে দেয় শায়েরীকে। তারপর মেহেরুনের হাত থেকে স্নিগ্ধতার হাত নিজের হাতে গুজে বললো,

– এ মুলধনের জন্য শারাফ সব সুদ চুকাতে রাজি মেহুভাবী।

কথা না বাড়িয়ে স্নিগ্ধতাকে নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালো শারাফ। কেউ আরকিছু বললো না। সিড়ির একটা একটা ধাপে ভেতরটার তুফান আরো বাড়তে থাকে স্নিগ্ধতার। শারাফের ঘরের সামনে দাড়িয়ে চারপাশ দেখে থমকে যায়। ভেতরের ফুলের সাজ দেখে গগনবিদারী কান্না আসে ওর। শারাফ পেছন বললো,

– এটলাস্ট দ্যা মোমেন্ট! বর হিসেবে আমি, লাল বেনারসিতে আমার বধূরুপে তুমি, আর ফুলে ফুলে সাজানো আমাদের ঘর!

একপা দুপা করে ভেতরে এগোয় স্নিগ্ধতা। বিছানায় সাজানো ফুলের ঝালড়টা আলতোকরে ছুয়ে দেয়। ওর পুরো পৃথিবী বিষাক্ত লাগছে লাগছে। মাথার ভেতর যন্ত্রণা করছে। বুকের ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এক অদৃশ্য বিষে নিঃশেষ হয়ে আসছে যেনো। সহ্য হচ্ছেনা এই ফুল! এই ফুলের বিছানা, এই ভালোবাসা ক্ষনস্থায়ী মনে হয়ে চুরমার হয়ে যাচ্ছে ওর সবটা। আওয়াজ শুনে পেছন ফিরলো স্নিগ্ধতা। শারাফ চেন্জ করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। ওর পরনে ধবধবে সাদা সুতির পান্জাবী। বড়হাতা টেনে গুটাতে গুটাতে আয়নার দিকে এগোলো ও। আয়নার সামনে দাড়িয়ে সেখানে থাকা প্রতিবিম্বে তাকালো। স্নিগ্ধতা ওর কয়েককদম পেছনে দাড়ানো। ওর পরনে থাকা লাল বেনারসি আর স্বর্নের গয়নার ক্ষণপ্রভা যেনো ঘরজুড়ে। শারাফ ঘাড় কাৎ করে আয়নায় তাকিয়ে বললো,

– নজর দিচ্ছো? খুববেশি হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে আমাকে?

স্নিগ্ধতা জবাব দিলো না। শারাফ হেসে ড্রেসিংটেবিল থেকে একটা ছোট্ট বক্স হাতে নিলো। তারপর স্নিগ্ধতার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিষ্পলক দৃষ্টিতে কয়েকদন্ড দেখলো ওকে। দৃষ্টি নামিয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ আচমকা ওর সামনে এক হাটু গেড়ে বসে গেলো। তারপর হাতের বক্সটা খুললো। স্নিগ্ধতা দেখলো বক্সটাতে একটা সরু পায়েল। শারাফ ওকে ইশারা করলো কিছু। স্নিগ্ধতা তখনো স্থির, নিরব। শারাফ নিজেই হাত বাড়ালো ওর পায়ের দিকে। স্নিগ্ধতা দুপা পেছোয়। শারাফ হেসে বললো,

– রিল্যাক্স। সালাম করছি না তোমাকে।

স্নিগ্ধতা বুঝে ওঠার আগেই আলতোকরে ওর বা পা তুলে নিজের হাটুর ওপর রাখলো শারাফ। স্নিগ্ধতার শাড়ী কিছুটা উচিয়ে ধরে পায়ে থাকা মলটা খুলে দিলো। স্নিগ্ধতা টের পেলো, শারাফের স্পর্শে শ্বাস ভারী হচ্ছে ওর। কম্পিতস্বরে বললো,

– ক্ কিছু বলার ছিলো তোমাকে।

দুদন্ড সময় নিয়ে, পায়েলটা পরিয়ে দিয়ে উঠে দাড়ালো শারাফ। দুহাত পেছনে দিকে, স্নিগ্ধতার দিকে একটুখানি ঝুকে বললো,

– হুম? বলো?

শুকনো ঢোকে গলা ভেজালো স্নিগ্ধতা। কি বলবে ও? আজ শারাফেকে ভয় পাচ্ছে ও। শারাফের চাওনিতে সব কথা ফুরিয়েছে ওর। উদ্দেশ্য তো ছিলো এই মানুষটাকে প্রেমে পরতে বাধ্য করা। কিন্তু ওর দুর্বলতা, সেটা কিকরে কাটাবে ও? শারাফ শীতল চাওনিতে চায়। হাত বাড়ায় স্নিগ্ধতার দিকে। একহাতে গাল, আরেকহাতে গলা ছুয়ে, কপালে কপাল ঠেকায় স্নিগ্ধতার। চোখ বন্ধ করে নেয় স্নিগ্ধতা। শারাফের উষ্ণ নিশ্বাসে ওর নিজের শ্বাসেরা ইতি টানতে চায় যেনো। শারাফ আস্তেকরে বললো,

– বলা, না বলা, আমি তোমার সবটাতে থাকতে চাই স্নিগ্ধতা। লেট মি বি…

স্নিগ্ধতা বড়বড় শ্বাস নিতে থাকে। শারাফ চোখ মেললো। ঘন পাপড়ির চোখজোড়া বন্ধ, কাপতে থাকা রক্তজবার মতো ঠোঁট, আর পাগল করা নিশ্বাসের উষ্ণতা। স্নিগ্ধতাকে এতোটা কাছ থেকে দেখা হয়নি ওর। চেনা ভয়টা ওকে অনেকবার শাসিয়েছে, এ প্রলয়ে জড়াস না শারাফ। কিন্তু পারেনি ও নিজেকে থামাতে। নাইবা আজ পারবে। হার মেনে স্নিগ্ধতা চুলে থাকা ঘোমটা খুলে দেয় শারাফ। চমকে উঠে চোখ মেলে স্নিগ্ধতা। শারাফের ঘোর লাগা চাওনি আবারো তোলপাড় শুরু করে দেয় ওর ভেতরটায়। কিছু বলার আগেই শারাফ আঙুলে আটকে দিলো ওর ঠোঁট। বললো,

– আজ তোমায় বলতে দিতে ইচ্ছে করছেনা স্নিগ্ধতা। আকাশের চাঁদকে নিজের বাহুডোরে দেখে লোভী হতে ইচ্ছে করছে আমার! চন্দ্রবিলাসের ইচ্ছে করছে, স্নিগ্ধসিক্ত হতে ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে…

বলতে বলতেই শারাফ থেমে যায়। স্নিগ্ধতা আকুলতা নিয়ে তাকালো। যেনো ও চায়নি শারাফ থামুক! যেনো ও চায়নি শারাফের ইচ্ছেরা অপ্রকাশিত থাকুক, অপূর্ণ থাকুক! স্নিগ্ধতা চুলের খোপা ছেড়ে দেয়। ছলছল চোখে চেয়ে বলে,

– এক্সেপ্ট মি শারাফ। আমি আমার প্রাপ্তির খাতায় এ রাতটাকে রাখতে চাই।

শারাফের ঠোঁটে হাসি ফোটে। স্নিগ্ধতার দুগাল ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ছোয়ায় ও। শরীরজুড়ে বিদ্যুৎ খেলে যায় স্নিগ্ধতার। চোখ আবারো বন্ধ করে শক্তকরে শারাফের পান্জাবী মুঠো করে নেয় ও। বারান্দা দিয়ে বাইরের আকাশে চাঁদ দেখা যায়। ফুলে ফুলে ভর্তি ঘরটার ভেতরে দুই মানব মানবী যেনো একে ওপরের তৃষ্ণার সহায়। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে শারাফ সরে দাড়ালো। স্নিগ্ধতা মাথা নিচু করে ওর পান্জাবী খামচে ধরে রেখেছে। ওকে ঘুরিয়ে দাড় করালো শারাফ। পিঠে ছড়ানো চুলগুলো ঘাড়ের একপাশে দিয়ে গয়না খুলে দেয় স্নিগ্ধতার। ওর কাধের কাটা দাগটায় পরপর কয়েকবার চুমু দেয়। তারপর নাক ডোবায় স্নিগ্ধতার চুলে। শারাফের প্রতিটা স্পর্শে স্পর্শে কেপে ওঠে স্নিগ্ধতা। ওর অনুভব হয়, ওর দুই পৃথিবী একাকার হয়ে আসছে। যাদের কোনোটাতে, কোথাও-ই প্রেম-প্রনয়ের কথা ছিলো না। যা ছিলো, তা ছিলো কেবল প্রতিশোধ আর ধ্বংস। অথচ আজকের রাত সে ধারা বদলে দিলো। প্রেমের পর আরেকটা অপরিকল্পিত মুহুর্ত জুড়ে গেলো সেখানে। প্রণয়…

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here