নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা ৭০.

0
1

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা

৭০.

ঘড়ির ছোট কাটাটা তিনের ঘর পার করে গেছে। মিনিটের কাটা পাঁচ ছুইছুই। বাইরের জোছনাগলা আলো বারান্দা দিয়ে শারাফের ঘরে ঢুকছে। জানালার দুপাশে হালকা রঙের পাতলা পর্দা মৃদ্যু বাতাসে দোদুল্যমান। ওপাশের দেয়ালে জড়ানো মানিপ্লান্ট গাছের পাতাগুলোর অবয়ব দেখা যায়। শারাফের বুক থেকে চোখ তুলে ওরদিক চাইলো স্নিগ্ধতা। শারাফ চোখ বন্ধ করে আছে। স্নিগ্ধতার খোলা চুল শারাফের চোখেমুখে৷ আলতোহাতে সে চুলগুলো সরিয়ে দিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ নড়েচড়ে আরো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো ওকে। চোখ বন্ধ রেখে, স্নিগ্ধতার কাধে নাক ঠেকালো। ঘুমুঘুমু কন্ঠে বললো,

– তোমার চুলের ঘ্রাণ আমাকে এক অদম্য নেশায় ডুবিয়ে বাচিয়ে রাখতে চলেছে স্নিগ্ধতা। এ নেশা থেকে আমাকে দুর হতে দিওনা প্লিজ। প্লিজ!

শারাফ চোখ মেলে। কেবল শুভ্র চাদর জড়িয়ে ওর বুকে পরে থাকা রমনীর দিকে আবারো চায় সেই চিরচেনা মুগ্ধতা নিয়ে। তার দেহে নববধুর একবিন্দু সাজও অবশিষ্ট নেই। প্রেমময় স্পর্শে তার স্বল্পবিস্তর কৃত্রিম সাজে অনেক আগেই ইতি টেনেছে ও। বাইরে থেকে ঘরে আসা আবছা আলোয় স্নিগ্ধতার উজ্জ্বল মুখ স্পষ্ট বোঝা যায়। ফর্সা মুখখানায় গোলাপী ঠোঁট আর বড়বড় পাপড়িবিশিষ্ট ঝলমলে তারার চোখ। শারাফের চোখজোড়া চিরচরায়িত নিয়মে মন্তব্য করে, কোনোরুপ সাজ ব্যতিরেকেই সে অপরুপা। চাঁদের মতোই স্নিগ্ধ তার রুপ। আর তার শরীরজুড়ে ওর পবিত্র স্পর্শ। যাতে একবিন্দু কলঙ্ক নেই। চাঁদের গায়েও তো দাগ হয়। কেবল কোনো দাগ নেই স্নিগ্ধতার গায়ে। ভাবতে ভাবতে শারাফের শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে অকস্মাৎ। নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখে স্নিগ্ধতার একগালে হাত রাখে ও। স্নিগ্ধতা ওকে তাকাতে দেখে গাঢ় শ্বাস ফেললো। বললো,

– ঘুমোওনি?

শারাফ নড়েচড়ে ওঠে। স্নিগ্ধতার ঠোঁটের খুব কাছাকাছি ঠোঁট এগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

– নিজেই ঘুম উড়িয়ে দিয়ে আমায় ঘুমন্ত চাইছো? আজ নাহয় নাই ঘুমালাম?

স্নিগ্ধতার নাকে নাক ঘষে দেয় শারাফ। মুচকি হেসে আলতোকরে ওর কপালে ঠোঁটও ছোয়ালো। হঠাৎই গম্ভীরস্বরে বললো,

– আমি তোমাকে অনেকবেশি ভালোবাসি স্নিগ্ধতা। অনেকবেশি।

শারাফের বলার ধরন স্নিগ্ধতার ভেতরটায় আচড়ে দেয় যেনো। আস্তেআস্তে নিজেকে সরিয়ে নিতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু শারাফ তা হতে দিলো না। নিজের হাতের বাধন জোরালো করলো ও। স্নিগ্ধতার গাল থেকে হাত সরিয়ে কাধে থামালো। তারপর আলতোকরে ওর কাধের চুলগুলো মুঠো করে নিলো। স্পষ্ট গলায় বললো,

– কিন্তু আমাকে ভালোবাসা এই তুমিটা ঠিক কে?

বড় এক শ্বাস ফেললো স্নিগ্ধতা। এতোক্ষণ যেনো শ্বাস আটকে ছিলো ও। শারাফের বুকে থাকা অবস্থাতেই টপটপ করে জল গরাতে লাগলো ওর চোখ দিয়ে। শারাফ দাঁতে দাঁত চেপে আছে। স্নিগ্ধতার চোখের জল ওর বুক স্পর্শ করছে। আর তার উষ্ণতা ওর কাছে এতোটাই বেশি মনে হচ্ছে, যেনো ফুটন্ত আগ্নেয়গিরির মতো সে অশ্রু ওর বুকের চামড়া ভেদ করে হৃদপিন্ডে ছেদ ঘটাচ্ছে। স্নিগ্ধতার নিশ্বাস ওর মুখে আছড়ে পরছে৷ কান্নারত স্নিগ্ধতার নিশ্বাস অগ্নিশিখার মতো উত্তপ্ত লাগছে। তারপরও চুপ রইলো ও। জবাবের জন্য ওভাবেই চেয়ে রইলো স্নিগ্ধতার দিকে। স্নিগ্ধতার আকুতিভরা চাওনি। আর সে চাওনিজোড়া ছাড় চাইছে শারাফের কাছ থেকে। শারাফ হাত আলগা করলো নিজের। স্নিগ্ধতা তাকালো ওর নিস্তেজ বাহুবন্ধনীর দিকে। তারপর তাকালো ওর চোখে। একটা শুকনো ঢোক গিলে গলা ভেজালো। অস্ফুটস্বরে বললো,

– আমি জানিনাহ!

শারাফ চোখ বন্ধ করে নিলো। বড় একটা শ্বাস ফেলে, নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। হুট করেই ওর কাধ দুহাতে খামচে ধরলো স্নিগ্ধতা। উদ্ভ্রান্তের মতো করে বললো,

– ব্ বিশ্বাস করো শারাফ…আ্ আমি…আমি সত্যিই জানিনা আমি কে। সত্যিই জানিনা আমি!

শারাফ চোখ মেলে। নিজের কাধের দিক তাকিয়ে দেখে সেখানে স্নিগ্ধতার নখের দাগ বসে গেছে। এতোটাই জোরে ওকে আকড়ে ধরেছে ও৷ স্নিগ্ধতা শারাফের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের হাতের দিকে তাকালো। সেখানে হওয়া আঁচড়ের দাগ দেখে তৎক্ষনাৎ হাত সরিয়ে নিলো ও। আস্তেধীরে গায়ের চাদরসমেত বিছানা থেকে নেমে আসলো। লাগেজ থেকে জামা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। পুরোপুরি কালো রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পরে বেরিয়ে আসে স্নিগ্ধতা। ট্রাউজার পরিহিত উন্মুক্তদেহের পুরুষ তখন রুমের মাঝখানে দৃঢ়চিত্ত্বে দাড়িয়ে। ওকে দেখে শারাফ এগিয়ে আসে। স্নিগ্ধতার দুহাত তুলে ধরে তালুর ওপরপিঠে চুমু খায়। তারপর ওর দু গাল ধরে বলে,

– তোমায় অনেককিছু বলার আছে।

– আমারও।

শারাফ মাথা নামিয়ে মৃদ্যু হাসলো। যেনো ও জানতো স্নিগ্ধতা এমনই কিছু বলবে। অগ্রাহ্যে ডিভানে পরে থাকা কালো টিশার্টটা গায়ে পরে নিলো শারাফ। তারপর স্নিগ্ধতার হাত ধরে ওকে বারান্দায় নিয়ে গেলো। আকাশে তখন চাঁদহীন। স্নিগ্ধতা শূন্য দৃষ্টিতে তাকালো সে আকাশে। শারাফ ওর হাত ছেড়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়েছে। বুকে দুহাত গুজে বললো,

– ফাইন…আগে তুমি।

স্নিগ্ধতা শারাফের দিকে তাকালো। ওরদিক মুখ করে দাড়িয়ে, একপা দেয়ালে ঠেকিয়ে দাড়ানো শারাফ। অসম্ভব সুন্দর একটা হাসি ওর ঠোঁটে। অজানা উৎসের আলোয় সে মুখটা যেনো পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধসিক্ত মুখ। সে হাসিটা যেনো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি। স্নিগ্ধতা আবারো শুকনো ঢোকে গলা ভেজায়। স্পষ্টভাবে বলে,

– আমি স্নিগ্ধতা নই শারাফ।

শারাফের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় ছিলো স্নিগ্ধতা। কিন্তু ওর ভাব বদলালো না। স্নিগ্ধতা আবারো বললো,

– আ্ আমি স্নিগ্ধতা নই। আমি ওর চেহারাধারী আরেকটা মানুষ। আমার আসল পরিচয়, আমি ডক্টর জেনেলা সাকলিকের মেয়ে, য়্যুমু সাকলিক। যার সাথে চারবছর আগে ম্যাসাচুসেটসে বন্ধুত্ব করেছিলে তুমি।

প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দু দন্ড সময় নিলো শারাফ। শান্তস্বরে পাল্টা প্রশ্ন করলো,

– তাহলে স্নিগ্ধতা কোথায়?

স্নিগ্ধতা ওর এমন সরল প্রশ্ন শুনে অবাক হয়। তবে কি শারাফ মেনে নিয়েছে ওই য়্যুমু? এতো সহজে সত্যিটা মেনে নিলো ও? কিকরে? প্রথমবারের মতো ভয় দানা বাধে স্নিগ্ধতার মনে। তারপরও নিজেকে সামলায় ও। দম নিয়ে সাইফকে বলা কথাগুলোই আবারো শারাফের কাছে আওড়ায়। য়্যুমুর বাংলাদেশে আসা, রেপ হওয়া, সুইসাইড করতে যাওয়া, এক্সিডেন্টে সাইফের পুরো পরিবারের মৃত্য, জেনেলার মাধ্যমে প্লাস্টিক সার্জারী করিয়ে স্নিগ্ধতা হওয়া, ট্রমার দোহাই দিয়ে নিজেকে ঘরকুনো রেখে, স্নিগ্ধতার বৈশিষ্ট্য লুফে নেওয়া। সবটা চুপচাপ শুনে শারাফ বললো,

– কেনো করেছো এসব?

– ওই ধর্ষকদের সাজা দিতে, ইউনিভার্সিটির ছাত্রহলের মাদকসাম্রাজ্য শেষ করতে, ছাত্রীহলে চলা অনাচারগুলো থামাতে, ছাত্ররাজনীতির আগাছা উপরে দিতে, আর…

একটু থামলো স্নিগ্ধতা। পরপরই রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

– আর এই সবকিছুর মূল, তোমার বড়ভাই শাওনকে এইদেশের মাটিতে ফেরত এনে, ওর প্রাপ্য সাজা দিতে।

শাওনের কথা শুনেই দৃষ্টি নামিয়ে নিলো শারাফ। চোখ বন্ধ করে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। স্নিগ্ধতার চোখ থেকে আবারো জল গরায়। ক্ষোভে শরীর জ্বলে ওঠে। মুখে বলে,

– এসবকিছুর মুল তোমার ভাই শাওন আর ওরই তিন সঙ্গী সৌরভ, চঞ্চল আর তারেক। সেদিন ওরা চারজন মিলেই…

শারাফ দৃষ্টি নিচু রেখেই বললো,

– আর ওরা তিনজনই এখন মৃ’ত!

স্নিগ্ধতা জোর গলায় বললো,

– হ্যাঁ। আমিই খু’ন করেছি ওদের। ইনফ্যাক্ট ওদের মতো আরো মানুষরুপী জানোয়ারকে পরপার দেখিয়েছি আমি। ইন্সপেক্টর সাইফ এহমাদ যে সিরিয়াল কিলারের খোঁজ করে চলেছে, তা আর অন্য কেউ নয়, আমি। আমি স্নিগ্ধতা নই। আমি ওর মতো চন্দ্রনন্দিতা নই। আমি তো কক্সবাজারে চার পশুর থাবায় কলঙ্কিত হওয়া কলঙ্কীনি। সার্জারী করিয়ে স্নিগ্ধতার রুপ নেওয়া পররুপী আমি। সবাইকে ঠকিয়ে, একের পর এক খু’ন করা খু’নী আমি। সিরিয়াল কিলার আমি। ভাইয়ের কাছে বোনকে মে’রে ফেলা পিশাচীনী আমি। হাজাররঙা স্বপ্নীলে ধ্বংসযজ্ঞ তৈরীর জন্য, বহর সাজিয়ে বধূরুপে এ বাড়িতে প্রবেশ করা তান্ডব আমি। তোমার হয়ে, তোমাকে ছুয়ে দিয়ে, তোমাকেও কলুষিত করা প্রলয়া আমি। আমি স্নিগ্ধতা নই শারাফ। আমি স্নিগ্ধতা হওয়ার যোগ্য নই। আমি নই স্নিগ্ধতা।

বলা শেষ করে দম নেয় স্নিগ্ধতা। নিজের ওপর শেষবারের মতো মায়া হলো ওর। পবিত্র সম্পর্কটার শুরুতেই সবটা শেষ করে দিলো ও। নিজে! আজকের পর শারাফ নামক ব্যক্তিটি আর ওকে ভালোবাসবে না। বরং সর্বোচ্চ ঘৃণায় মনে রাখবে ওকে। ঠিক যেমনটা সাইফের প্রতিক্রিয়া ছিলো! প্রেমময় কথার পরিবর্তে শারাফের মুখ থেকে ঘৃণার বাণ সইতে হবে ওকে এখন। নিজেকে প্রস্তুত করে স্নিগ্ধতা। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখালো শারাফ। মাথা নিচু রেখে বললো,

– অগ্নিলাকে এইসবই বলেছো তারমানে। মিস্টার এহমাদ কোথায়?

স্নিগ্ধতা বড়বড় চোখে চায়। শারাফের এমন প্রশ্ন কাঙ্ক্ষিত ছিলোনা ওর। শারাফ এবারে সোজা হয়ে দাড়ালো। ওকে দাড়াতে দেখে স্নিগ্ধতার গা শিওরে ওঠে। ওর গহীন দৃষ্টি যেনো শিরদাঁড়ায় ভয়ের শিরশির অনুভব তৈরী করে দেয়। শারাফ কয়েকপা এগোলো। ওর একদম সামনে দাড়িয়ে সাবলীলভাবে বললো,

– শেষ প্রশ্ন। আজ আমাদের বাসরে তোমার সাইডব্যাগে ক্লোরোফর্ম কেনো? ওটার প্রয়োগ কার ওপর করতে চেয়েছিলে তুমি? আমার ওপর?

স্নিগ্ধতার বিস্ময় সর্বোচ্চ সীমা ছোয়। ক্লোরোফর্মের কথা শারাফের জানার কথা নয়। কিন্তু শারাফের কথায় ওর মনে হতে লাগলো, শুধু আজকের না, এ অবদি ঘটা কোনো ঘটনাই ওর অগোচরে ছিলো না। ‘মাইন্ডগেইমার ইয়াকীন শারাফের মন নিয়ে খেলাটা সহজ হবেনা স্নিগ্ধতা!’ প্রথমদিনেই অগ্নিলার বলা কথাটা মনে পরে যায় স্নিগ্ধতার। মাথা ঘুরে ওঠে। কাপাকাপা গলায় বলে,

– ত্ তুমি জানতে?

প্রশ্নের প্রতিত্তোরে শারাফের মুষ্টিবদ্ধ হাত, জলভরা চোখ আর শক্ত চোয়াল চোখে পরে স্নিগ্ধতার। চোখ বন্ধ করে নিয়ে অশ্রুকে সংবরন করে শারাফ। তারপর শক্তহাতে রেলিং ধরে, সামনে তাকিয়ে বললো,

– বলেছিলাম তোমায়, তোমার জানা অজানায় আমি তোমার ধারক স্নিগ্ধতা। যেটা তুমি জানো, সেটা আমাকে জানতেই হতো। এমনকি যেটা তোমার অগোচরে, সেটাকেও অজানা করে রাখিনি আমি।

স্নিগ্ধতা দুপা পিছিয়ে যায়। শ্বাস আটকে সামনে চেয়ে রয় অপ্রত্যাশিত সত্যি শোনার জন্য। শারাফের হাতের রগ দৃশ্যমান। এতোটাই শক্তিতে রেলিং মুঠো করেছে ও। স্নিগ্ধতার চোখ ভরে ওঠে। আর সেকেন্ড দশেকের ব্যবধানে নমনীয় হয়ে আসে শারাফের মুখচেহারা। একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে ও বলতে লাগলো,

– পিএইচডি শেষে আমার দেশে ফেরার একমাত্র কারন ছিলো এক্সপেরিমেন্টাল থেসিস। ইউরোপীয় দেশগুলোতে মানসিক সমস্যার সাথে কাউন্সিলিং শব্দটা বেশ স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হলেও, আমাদের দেশে কাউন্সিলিংয়ের চল নেই বললেই চলে। এদেশে ডিপ্রেশন, ট্রমা, মানসিক অশান্তিতে থাকা মানুষগুলোর সমস্যা তাদের নিজেদের কাছেই পাত্তা পায়না। কাউন্সিলিং তো দুরের বিষয়। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এ বিষয়ে দেশীয়দের অজ্ঞতা দুর করবো। তাই চলে আসি বিডিতে। এনালাইসিস শুরু করি ভার্সিটি থেকে। পরিসংখ্যান বলে, এ বয়সটাতেই ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে বেশি মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয় । তাই ছোটকাকুর অনুমতি নিয়ে চেনা জায়গা, নিজের ভার্সিটি থেকেই প্রজেক্ট শুরু করি আমি। এর বাইরে বিভিন্ন শো আর কাউন্সিলিং সেন্টারেও অনেককিছুর মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু যেটা আমার সবটা বদলেছে, তা ছিলো তোমার সাথে সাক্ষাৎ।

প্রথম দেখাতেই ভালোলাগে তোমাকে। অনুভব হয়, তোমার স্নিগ্ধ মুখ চাওনি আমার হৃৎস্পন্দনকে থামিয়ে দিতে জানে। মনে পরে স্নিগ্ধতা? দ্বিতীয়বারের সাক্ষাতে চুপিচুপি আমার ড্রয়িং করেছিলে তুমি। আর প্রথমবারের জন্য আমার মনে হয়েছিলো, এটা আমার একপাক্ষিক চাওয়া না, তুমিও চাও আমাকে। আমাদের আরো কয়েকদফায় দেখা হয়। ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে একটা সার্ভের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চারুকলার বাকি চুয়াল্লিশজনকে ছাড়িয়ে মনেমনে শুধু তোমাকে নিয়ে এক্সাইটেড ছিলাম। তোমাকে নিয়ে ভাবনা কয়েকগুনে বেড়ে গিয়েছিলো আমার। বুঝে যাই, দুর্বল হয়ে পরেছি। ভয়ানক পরিমানে ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে। তোমার দৃষ্টিভঙ্গি জানার ছিলো। সবার এন্সারশিট থাকলেও, সেদিন তুমি এন্সারশিট সাবমিট করোনি। তোমাকে জানার আগ্রহ এতোবেশি ছিলো যে পরবর্তীতে তোমার সার্ভে এন্সারশিট খুজতে ডাস্টবিনে হাত ঢুকাতেও আমি পিছপা হইনি স্নিগ্ধতা। লাকিলি করিডোরের বিনে পেয়েও যাই কাগজটা। আর সেখানে থাকা তোমার জবাবগুলো তোমাকে নিয়ে আরোবেশি ভাবতে বাধ্য করে আমাকে। তবে সেটা তোমায় ভালোবাসি বলে নয়! তোমার এন্সারশিটে থাকা মাল্টিপল পার্সোনালিটি সিনড্রোমের জন্য।

শারাফ চোখ তুলে স্নিগ্ধতার দিকে তাকালো। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজালো নিজের। বললো,

– আমার এক্সপেরিমেন্টের শিরোনামই ছিলো আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার। আর ঠিক সেটারই কেন্দ্র হয়ে দাড়ালো তোমার এন্সারশিট। নমনীয় প্রশ্নে নমনীয়তা আর কঠোরতার প্রশ্নে অপ্রত্যাশিত জবাব দিয়ে, আমার সামনে এক তোমার সম্পূর্ণ ভিন্ন-বিপরীত দুটি সত্ত্বা দাড় করিয়ে দিয়েছিলে তুমি। অভুক্ত খাবারের লোভীকে খাবার দিয়ে সাহায্য করার জবাব তো তুমি স্নিগ্ধতা রুপেই লিখেছিলে। কিন্তু নারীলোভীর পরিণতি কেমন হওয়া উচিত, তার উত্তরে যা লিখেছিলে, আমি সেটাকে নজরান্দাজ করতে পারিনি। সবগুলো প্রশ্নের অদ্ভুত রকমের উত্তর ছিলো তোমার। যে দৃষ্টিতে ছবির মতো সৌন্দর্য, সে দৃষ্টিতে শাস্তি এতোবেশি ভয়ানক হতে পারে, ওই এন্সারশিট না দেখলে বুঝতামই না আমি। ভালোবেসেছি তোমাকে। অথচ প্রেমের দৃষ্টিতে তাকানোর পরিবর্তে তারপর প্রতিটাসময় তোমাকে অবজার্ভ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। একটা একটা মুহুর্ত কাউন্ট করেছি।

অনুর সাথে স্টোররুমে ঘটা ঘটনায় মোহিনীকে প্রথমবার দেখেছিলাম। আন্দাজ করেছিলাম, অনুকে অপমান করা মোহিনীর প্রতি তোমার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হতে পারে। নিজের দিক থেকে চেষ্টা করেছিলাম মোহিনীকে তোমার থেকে দুর রাখার। শাওনের রাজনীতি সেদিনই প্রথমবার কাজে লাগিয়েছিলাম আমি। মোহিনীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিলো শাওন। আর আমি ওর ভাই, এটা টের পেয়েই বোধহয় তোমার থেকে পিছিয়েছিলো চঞ্চল। তবে এসব মাথাতে আসেনি আমার। এটাও ভাবিনি, সেদিনই তুমি মোহিনীর চোখে এসিড ফেলে ওকে প্রতিঘাত করবে। ভায়োলেন্সে ফোবিয়া, তারপরও অন্যায় দেখলে যে এতোটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, কি বলবে তাকে আর? নিশ্চিত হলাম, ইউ হ্যাভ সেভার ডিআইডি।

স্নিগ্ধতা অবুঝের মতোকরে তাকিয়ে আছে শারাফের দিকে। যেনো কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওর। শারাফ দম নিলো। বললো,

– ডেফিসিয়েন্সি আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার। ট্রমার কারনে তৈরী হওয়া এমন একটা মাইন্ড স্টেট, যেখানে একটা মানুষের মাঝেই একাধিক পরিচয় তৈরি হয়। একাধিক চরিত্র বাস করতে থাকে তার মাঝে। আলাদা আলাদা পার্সোনালিটি ওই একটা মানুষকে চালনা করতে থাকে। কন্টিনিউয়াসলি বা সিচুয়েশন অনুযায়ী তারা একে অপরের থেকে সুইচও করতে থাকে। মানসিক অসুস্থতার এতোটাই রেয়ার ফর্ম এটা যে, ঠিকঠাক রিপোর্টিং ছাড়া রোগীর ভিন্নভিন্ন ব্যক্তিত্ব আলাদা করা অসম্ভব। অকস্মাৎ দেখলে একটা মানুষ টেরও পাবে না, তার সামনের মানুষটা ঠিক কোন ব্যক্তিত্বে বহাল আছে। হ্যালুসিনেশন আর ভুলে যাওয়া, এই দুইয়ের মাঝে পেশেন্ট আলাদা আলাদা জীবদ্দশা যাপন করতে থাকে। অনেকসময় সে নিজেও বুঝে উঠতে পারে না, তার সাথে কি ঘটছে বা সে কখন, কোথায় কোন ব্যক্তিত্বে অবস্থান করছে। আর ঠিক এগুলোই ঘটছিলো তোমার সাথে। যে সত্ত্বাকে তুমি কলঙ্কীনি, পিশাচীনী, তান্ডব, প্রলয়া বলছো, সেটা তুমি নও স্নিগ্ধতা। ও শুধু তোমার রোগের অংশ, তোমার অসুস্থতা। অন্যায় দেখলেই স্নিগ্ধতাকে পেরিয়ে কোনো এক ভয়ংকরীর রুপ ধারন করো তুমি। ফেটাল স্টেজ অফ মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার।

মূর্তির ন্যায় দাড়ানো স্নিগ্ধতার চোখে আবারো জল গরায় এবারে৷ শারাফ তৎক্ষনাৎ এগিয়ে গিয়ে দুগাল ধরে ওর। ব্যস্তভাবে বলে,

– শান্ত হও প্লিজ। কেদোনা।

– হয়তো ভেবেছিলে শাওনকে দেশে আনতে তুমিই আমাকে নিজের সাথে জড়িয়েছো। কিন্তু সত্যি তো এটাই, আমি নিজে থেকে তোমার সাথে নিজেকে জড়িয়েছিলাম। শপিংমলে ওই ছিনতাইকারীকে পাঠিয়ে আমি মিস্টার এহমাদের সাক্ষাৎ তো চেয়েছিলাম, সাথে এটাও যাচাই করছিলাম, তোমার হিমোফোবিয়া সত্যি কিনা। এজন্যই আঘাত করেছিলো ও তোমাকে। মিস্টার এহমাদ জানতো আমি তোমাকে ভালোবাসি। লুকিয়ে তোমার সাথে বৃষ্টিবিলাসের ছবি তুলে পোস্ট করে মিস্টার এহমাদকে ফিলও করিয়েছি, তুমিও ভালোবাসো আমাকে।

স্নিগ্ধতা আস্তেকরে গাল থেকে ওর হাত সরিয়ে দিলো। শারাফ বললো,

– এসবের মাঝে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা একবিন্দুও মিথ্যে নয় স্নিগ্ধতা। সাইকোলজিস্ট হিসেবে না, তোমাকে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দেওয়া আমার ভালোবাসার দায় ছিলো। বলেছিলাম তোমাকে, অন্যায় করে হলেও অন্যায় হতে দেবোনা তোমার সাথে। আমার একমাত্র দুর্বলতা ছিলো তোমার এই অসুস্থতা। দেশের বাইরের এক কনসালটেন্টের সাথে যোগাযোগ করি আমি। তার নির্দেশনা এমন ছিলো, আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডারে কাউন্সিলিং কাজে দেবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তোমার দ্বিতীয় চরিত্র কে, তার উৎপত্তি, উদ্দেশ্য, ইতি কোথায় সেসবের ধারণা থাকা প্রয়োজন। আর আমি এসবের কিছুই জানতাম না। এই স্টেটে পেশেন্টরা অনেক সেন্সিটিভ থাকে। আর তোমার কেইসে সেকেন্ড পার্সোনালিটি অনেকবেশি ভয়ংকর। এটা ভালোমতোই জানতাম, যে তুমি সার্ভে এন্সারশিটটুকো জমা দাওনি, সে তোমাকে এ বিষয়ে সরাসরি বললে হিতের বিপরীতই হতো। সিদ্ধান্ত নেই এ বিষয়ে মিস্টার এহমাদকে জানাবো। কিন্তু তিনি আইনের রক্ষক। তোমার আগে সে আইনকে প্রাধান্য দিতো। প্রতিটা ত্রুটির জন্য আগে তোমার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিতো সে। ততোদিনে নীলা আর তার বিয়ের কথাও শুরু হয়ে যায়। আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমাকে পাশ থেকে অগ্নিলা কিছু একটা লুকিয়ে যাচ্ছিলো। হুট করে মিস্টার এহমাদের সাথে জড়িয়ে যাওয়া, বিয়ের জন্য হ্যাঁ বলে দেওয়ার মেয়ে ও কোনোকালেই ছিলোনা। সবুজের মৃত্যুতে ওকেই সর্বপ্রথম সন্দেহ হয়েছিলো আমার। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, খু’নগুলো অন্যকারো না তোমার হাতে হয়েছে।

তারপর থেকে আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিলো এধরনের অন্যায় থেকে তোমাকে আগলে রাখা। শায়েরীকে ডক্টর নাজমুল ব্যাডটাচ করেছিলো বলে রাগ আমারও হয়েছিলো। কিন্তু সাথে ভয়ও। সে ঘটনার প্রভাব তোমার ওপরেও পরবে, সেটা মাথায় ছিলো আমার। অগ্নিলার বিয়ের শপিংয়ের দিন নাজমুল আবারো তোমার মুখোমুখি হয় সেটাও দেখেছিলাম আমি। যেখানে আমি চেষ্টায় ছিলাম তোমাকে এসব থেকে দুর রাখার, সেখানে ও যেচে এসে তোমাকে…এজন্যই সে রাতে তোমায় নিয়ে বেরিয়েছিলাম। যাতে তুমি আমার সাথে থেকে ব্যাপারটা ভুলে যাও। মিস্টার এহমাদকে কল করে নাজমুলের খবরও নিতে বলেছিলাম। কিন্তু সেটা তোমাকে থামালেও অগ্নিলাকে থামাতে পারিনি। খু’ন না করলেও, নাজমুলের ওপর কম অত্যাচার করেনি অগ্নিলা। নাজমুলের অবস্থা শুনে আমার চিন্তা বাড়ে। অন্যায়ের বিপরীতে তোমার দ্বিতীয় সত্ত্বা যে পথ চুজ করেছিলো, সেটা আমি মানলেও, মিস্টার এহমাদ কোনোদিনও মানতো না।

তোমাকে অক্ষত, সুস্থ্য রাখার সব উপায় যখন আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিলো, তখনই একদিন আমার আর য়্যুমুর একটা মুহুর্ত ড্র করে ফেলো তুমি। অপ্রত্যাশিতভাবে সেটা চোখে পরে আমার। আর ওটা দেখার পরই আমার মাথায় আসে, তুমি যাকে নিজের মাঝে আবদ্ধ করেছো, তা অন্য কেউ নয়, য়্যুমু। তিনবছর পর আবারো ওর খোজ লাগানো শুরু করি আমি। তোমাকে স্বাভাবিক আর আগলে রাখার চেষ্টায় থাকি। কিন্তু পারিনি। মিস্টার এহমাদের বিয়ের রাতে তুমি নাজমুলকেও…আমার মাথায় আবারো প্রশ্ন জমা পরে। য়্যুমুর উদ্দেশ্য কারা? শুধু অন্যায়কারী? নাকি ওর সাথের অন্যায়কারী? আমাকে ভালোবাসা এসবের কোনো অংশবিশেষ? নাকি তোমার অনুভব? এজন্য য়্যুমুর মতো হুবহু চেইন দিয়ে আমি সেদিন তোমার প্রতিক্রিয়া দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বরাবরের মতো সেদিনও আমার সামনে স্নিগ্ধতাই ছিলো। যার চোখে আমি প্রেম ছাড়া কিছুই পাইনি। এতোটাও নাটক তুমি জানোনা স্নিগ্ধতা। উদ্দেশ্য যাই থাকুক, ততোদিনে সত্যিই তুমি আমায় ভালোবেসে ফেলেছো। আমি আর সময় নেইনি। চলে যাই কক্সবাজার। ওখানকার ইনচার্জ রওনককে বলে য়্যুমুর মৃত্যুর আসল ডিটেইলস জোগার করি। শাওনের সত্যিটা তখনই সামনে আসে আমার। এক্সিডেন্টের পর যে হাসপাতালে তোমরা ছিলে, পুরোনো ওয়ার্ডবয়কে খুজে বের করে সেখানকার ঘটনা জানতে পারি। তার ফিরে এসে মিস্টার এহমাদের কাছেও তোমাদের এক্সিডেন্টের বিষয়ে জানতে চাই। এন্ড আফটার দ্যাট, আই হ্যাড দ্য কনক্লুশন!

আসলে ওইদিনের এক্সিডেন্টে য়্যুমুর স্পটডেথ হয়নি। স্পটডেথ ছিলো শুধু তোমার বাবা-মার। আর জ্ঞান ছিলো একমাত্র য়্যুমুর। আন্ট জেনি খবর পেয়ে সেদিনই ইমারজেন্সি ফ্লাইটে বিডিতে আসে। য়্যুমু সেদিন মায়ের সাথে দেখা করার পর মারা যায়। আর মায়ের কাছে রেখে যায় নিজের ডাইরি আর ওর চার ধর্ষকের নাম। মেয়েকে হারিয়ে তার ডাইরি তোমার হাতে ধরিয়ে দেয় আন্ট জেনি। এদিকে তুমি জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারো তোমার বাবা মা আর নেই। বাবা মা হারানোর যন্ত্রণা, এক্সিডেন্টের গিল্টফিলিং, ঠিক ওই সময়েই য়্যুমুর ডাইরী পাওয়া। মিস্টার এহমাদ যখন অনড়, হসপিটালের বেডে ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে য়্যুমুর ডাইরি পড়তে তুমি। এন্ড দ্যাটস দ্যা স্টার্টিং! ডাইরিতে বলা য়্যুমুর লাইফস্টাইল, ওর সাথে হওয়া নৃশংসতা আর ওর মৃত্যু, এসবই তোমার মাঝে য়্যুমুকে তৈরী করে দিয়েছিলো স্নিগ্ধতা।

এতোগুলো দিন যাবত এই দুটো পরিচয়কেই একসাথে ধারণ করে এসেছো তুমি। য়্যুমু সাকলিকের প্রতিশোধপরায়ণতা, আর নমনীয় স্নিগ্ধতা এহমাদ, বোথ! আর তোমার মাধ্যমে গত কয়েকমাসের মধ্যে য়্যুমু নিজের লক্ষ্যেও পেয়ে গেছে। ওর চার ধর্ষকের তিনজন, সৌরভ, চঞ্চল, তারেক, কেউই আর বেচে নেই। মনে রাখার জন্য অর্ধচন্দ্র চিহ্নে তাদের আলাদা করে মার্ক করেছো তুমি। আমি চেষ্টা করেছিলাম ইউআরএল হ্যাক করে তারেককে ফাসাতে। ওকে জেলে রাখতে। যাতে তুমি কিছু করতে না পারো। কিন্তু ও বেইল পেয়ে যায়। আর তুমিও ওকে…শাওন তো চঞ্চলদের ছাত্রীহলে যাতায়াতে মানা করেছিলো। এদিক থেকেও নিশ্চিন্ত ছিলাম কিছুটা। কিন্তু বিয়েতে আমি ব্যস্ত থাকবো, হলে খোজ লাগাবো না, এই ধারনা করে গতরাতেই চঞ্চলকে অনুমতি দিয়ে দেয় ও। চঞ্চল অনুর রুমে যায় আর তুমি ওকেও…

স্নিগ্ধতা ফাঁকা দৃষ্টিতে আশপাশ দেখলো নিজের। নিস্তব্ধ রাতের শেষভাগ যেনো ওকে চেচিয়ে বলছে, ওর পৃথিবী মিথ্যে! ওর বেচে থাকা মিথ্যে! ওর সত্ত্বাও মিথ্যে! শারাফ এগিয়ে গিয়ে নিজের বুকের মাঝে ওর মাথা চেপে ধরলো। বললো,

– এতোসবের মাঝে একটা চরম সত্যি আছে স্নিগ্ধতা। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী। আর আমি সবটা জেনেই স্ত্রীরুপে গ্রহন করেছি তোমাকে।

শারাফ থামলো। আবারো বললো,

– শাওন ব্যতিত সবাই মারা গেছে স্নিগ্ধতা। আমি চেয়েও আটকাতে পারিনি তোমাকে। কিন্তু শাওন তোমার হাতে সাজা পাবেনা। ওকে যা করার, আইন করবে। আর তোমাকে এভাবে আমার বুকের মাঝখানটায় অতি যত্নে, আদরে, ভালোবাসায় আগলে রাখবো আমি। আইন কখনো তোমায় প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। আমার এনালাইসিসের সবটুকো দিয়ে আমি আইনের যুক্তিখণ্ডন করবো। ইট ওয়াজ’ন্ট ইউ!

শারাফ থামলো। স্নিগ্ধতা চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। শারাফ নাক টেনে আরো শক্তকরে জড়িয়ে ধরলো ওকে। ওর কাধের চুলে নাক ডুবিয়ে দিয়ে বললো,

– তোমায় ভালোবেসেছি। এতোবেশি ভালোবেসেছি যে তোমার সুস্থ্যতার বিপরীতে এই সাত খু’ন মেনে নিতেও আমার দ্বিধাবোধ নেই স্নিগ্ধতা। তোমার জন্য সত্যিই সাত খু’ন মাফ। আমি সব সামলে নেবো স্নিগ্ধতা। ব্যস আমার একটাই চাওয়া, তুমি আমার হয়ে থাকো আজীবন। এটুকোই!

শারাফের বুকের মাঝখানে নাক ঠেকিয়ে, একহাতে ওর টিশার্ট খামচে ধরেলো স্নিগ্ধতা। শারাফ চোখ বন্ধ করে ওর চুলে নাক গুজে ছিলো। কয়েকদন্ড পর চোখ খুলতেই মাথা ঘুরে ওঠে ওর। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে গলা শুকিয়ে আসে। স্নিগ্ধতাকে আস্তেকরে ছেড়ে টালমাটাল পায়ে এককদম পিছিয়ে দাড়ালো শারাফ। মাথা ঝারা মারলো নিজের। স্নিগ্ধতা দেখলো শারাফ বারবার ঢোক গিলছে। টলছে। একচুলও নড়লো না ও। আস্তেকরে বললো,

– তুমি ঠিকই বলেছিলে শারাফ। আমার চুলে নেশাই আছে বটে। লিকুইড এক্সট্যাসি। গামা হাইড্রোক্সিবিউটারেট।

শারাফ বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। অবিশ্বাস ওর চোখের তারায় জ্বলজ্বল করছে। স্নিগ্ধতাকে কাছে রাখার সবচেয়ে ফলপ্রসূ উপায় ভেবেছিলো ও। বিয়ে। কিন্তু সে কাছে আসাকেও নিজের মতো করে কাজে লাগিয়েছে স্নিগ্ধতা। শারাফ মানতে চায়না৷ সাইডব্যাগের ক্লোরোফর্ম সরিয়ে দেবার পরও দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ও এক্সিট্যাসির ব্যবহার করবে, একবারের জন্যও ভাবেনি ও। নিজেকে সজ্ঞানে রাখতে ডানহাতে কামড় বসালো শারাফ। এতোটাই জোরে যে, রক্ত বেরিয়ে আসলো সেখান থেকে। স্নিগ্ধতা নির্বাকচোখে তাকালো ওর হাতের দিকে। হাতের ওপরপিঠে মুখে ডলা লাগালো শারাফ। ঠোঁটের কোনের রক্ত মুছে টলতে টলতে বললো,

– এর প্রয়োজন ছিলো না স্নিগ্ধতা।

শরীরটাকে কোনোমতে টেনেটুনে ঘরের দিকে এগোতে যাচ্ছিলো শারাফ। স্নিগ্ধতা আবারো জাপটে জড়িয়ে ধরে ওকে। শারাফের গায়ের জোর কমে আসে৷ কামড় লাগানো জায়গাতেই ও দ্বিতীয়বার কামড় বসায় নিজের স্থিতি ধরে রাখতে। স্নিগ্ধতা ওকে জরিয়ে রেখে বললো,

– আজ রাতের কোনো স্মৃতি তোমার মনে থাকবে না শারাফ। জিএইচবি হ্যালোসিনেশন তৈরী করতে জানে। আমি নিজের শরীরে তো এন্টিডোড পুশ করেছি, কিন্তু তুমি…নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেও খুব বেশিক্ষন নিজেকে সামলাতে পারবেনা তুমি। নিজেকে আর কষ্ট দিও না প্লিজ।

থুতুর মতো করে রক্ত মুখ থেকে ফেলে দেয় শারাফ। হেচকা টানে স্নিগ্ধতাকে বুক থেকে সরিয়ে দেয় ও। টলমলো চাওনিতে আরেকপলক দেখে নেয় স্নিগ্ধতাকে। পা বাড়াতে যাবে, শরীরের সবটুকো শক্তি অকস্মাৎ উবে যায় যেনো ওর। শারাফ হাটুতে বসে পরলো। ওর মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। ঝাপসা চোখজোড়া তুলে তাকালো স্নিগ্ধতার দিকে। অসহায়ের মতো করে হাত বাড়ালো। স্নিগ্ধতা তেমনই স্থির। শারাফ অস্ফুটস্বরে বললো,

– স্ স্নিগ্ধতা…

শেষ করার আগেই ঢলে পরে শারাফ। স্নিগ্ধতা হুড়মুড়িয়ে ওর সামনে মেঝেতে বসে যায়। নিস্তব্ধ শারাফকে বুকে জড়িয়ে নেয়। চুমু দেয় ওর কপালে। জ্ঞানহীন মুখটার দিকে তাকিয়ে, একফোটা অশ্রু ঝরিয়ে বলে,

– তোমার প্রেমময় বাহুডোর আমার জায়গা না শারাফ। এই জঘণ্য রোগের উপশম হিসেবে তোমার ভালোবাসা নামক ঔষধী আমার ভাগ্যে নেই। আর তুমি হীনা, আমার মৃত্যুই শ্রেয়!

#চলবে…

[ প্রায় ৩২০০ শব্দ। পুরো গল্পের প্রতিফলন আজকের পর্বেই দেওয়া আছে পাঠকমহল। এবার সেই ক্ষুদ্রক্ষুদ্র মুহুর্তগুলোকে মস্তিষ্কে সাজানোর, মিলিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব আপনাদেরই। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আমার খুবই আগ্রহের বস্তু। আর সে আগ্রহ থেকেই ‘আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার’ কে এ থিম হিসেবে চুজ করেছিলাম আমি। আজকে থিম আর চরিত্র বিশ্লেষন নিয়ে একটু গঠনমুলক মন্তব্য করবেন প্লিজ। নন্দিত চন্দ্রকলঙ্ক এর সার্থকতা/ব্যর্থতা কতোটুকো, আমি তা অনুভব করতে চাই। আজ সবার কমেন্টে সাড়া দিবো ইনশাআল্লাহ্। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here