#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
আঞ্জুম!
আভিরা হকচকাল, ভড়কাল, থমকাল! বিমূঢ় নয়নে চাইল নাওয়াজের দিকে। নাওয়াজ আভিরার চাহনিতে বুঝল সে ঠিক কোন ভুলটা করে বসেছে। তবুও খুব একটা বিচলিত হতে দেখা গেল না তাকে। অত্যন্ত শান্ত শীতল কণ্ঠে বলল,
– আমার জানা মতে আপনার নাম আঞ্জুম। ঠিক বলেছি তো?
আভিরা সম্মোহিত হয়ে মাথা ঝাঁকায়। পরমুহূর্তেই ধীর স্বরে বলল,
– তবে সকলে আভিরা বলে ডাকে।
– আমি আঞ্জুম বলে ডাকব। আশা করি আপনার কোন আপত্তি নেই তাতে?
আভিরার ইচ্ছে করল চিল্লিয়ে বলতে আপত্তি আছে। এই নামে আপনি আমায় ডাকবেন না। আপনি কেন? অন্য কেউ আমাকে এ নামে ডাকতে পারবে না। শুধু একজন ছাড়া। তবে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না।
নীরবতা সম্মতির লক্ষণ। নাওয়াজ আভিরার নীরবতাকে তার সম্মতি হিসেবে ধরে নেয়।
আনেসা, ইয়াজমীন আসতে আভিরা আর নাওয়াজ বেরিয়ে গেল। নাওয়াজ আগে হাঁটছে তার পিছনে আভিরা। অনেকের নজর তাদের উপর আটকে। নাওয়াজ ঘাড় ঘুরিয়ে আভিরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– পা চালিয়ে হাঁটুন আঞ্জুম। পিছনে পড়ে যাচ্ছেন। আমার পাশাপাশি এসে দাঁড়ান।
আভিরা পা চালিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে ব্যর্থ হলো। নাওয়াজ তার থেকে অনেকটা এগিয়ে। সে এ পুরুষের নাগাল পাবে কী করে?
লিফটে উঠতে আভিরা কুণ্ঠায় বুঁদ হয়ে রয়। নাওয়াজ সবটা দেখেও অদেখা করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। একটা ওয়ার্ড বয় আভিরার পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক পাশ ঘেঁষে নয়। বলতে গেলে আভিরার শরীর ছুঁয়ে। অস্বস্তিতে শরীর ভেঙে আসছে আভিরার। ছলছল চোখে তাকাল পাশে দাঁড়ানো কাঠখোট্টা পুরুষটার পানে। তার দৃষ্টি আভিরাতে। চোখের চাহনি কঠোর। চাহনি দিয়ে আভিরার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জো। ছেলেটা হয়তো এখনও নাওয়াজকে খেয়াল করেনি। খেয়াল করলে আভিরার দিকে চোখ তুলে চেয়ে দেখার মতো দুঃসাহসিকতা দেখাতে যেত না, ছোঁয়া তো দূরের কথা।
আভিরাকে ছুঁতে আসতে নাওয়াজ এক টানে সরিয়ে নেয় মেয়েটাকে। হঠাৎ টান পড়াতে আভিরা আছড়ে পড়ল নাওয়াজের চওড়া বুকে।
নাওয়াজকে দেখে ছেলেটার কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেল। কোনোরকম তুতলিয়ে বলল,
– স্যা..র্..র।
– কত নম্বর ফ্লোরে ডিউটি?
নাওয়াজের শান্ত স্বর। তাতেই যেন ছেলেটার আত্মা শুকিয়ে এলো! কোনোরকম বলল,
– তিন তলায়।
– কাল থেকে যেন হসপিটালে আর না দেখি।
ছেলেটা নাওয়াজের পা আঁকড়ে ধরতে চাইলে নাওয়াজ চেঁচিয়ে উঠল,
– দূরে সরো। যা বলেছি তার হেরফের হবে না। আর না আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে।
নাওয়াজকে মানাতে ব্যর্থ হয়ে আভিরার পা আঁকড়ে ধরে।
চোখের পানি ফেলে বলল,
– আমায় মাফ কইরা দেন আপামণি। আমার ভুল হইয়া গেছে। বাড়িতে আমার অসুস্থ মা আছে। চাকরিটা গেলে সব শেষ হইয়া যাইব। মায়ের ঔষধ কেনার টাকা কই পামু।
অসুস্থ মায়ের কথা শুনে আভিরার মায়া লাগল। নরম মনের মেয়ে সে। মায়া লাগারই কথা। একটু আগের ঘটনা বেমালুম ভুলে নাওয়াজের উদ্দেশ্যে বলল,
– মাফ করে দিন ওনাকে। ভুল হয়ে…
– এটাকে আপনার ভুল মনে হচ্ছে আঞ্জুম। অসভ্যটা ইচ্ছে করে করেছে এমন। এখন চাকরি বাঁচাতে এত আকুতি মিনতি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকুন। এতক্ষণ যেমনটা ছিলেন। নিজেকে তো বাঁচাতে ব্যর্থ। এ যুগের মেয়ে হয়ে আপনি এত দুর্বল কী করে হতে পারেন। কই ওর কাজের জন্য জুতার বাড়ি দিবেন, তা না করে আসছেন মানব দরদী সাজতে। আমি না থাকলে কী হতো তার ধারণা আছে আপনার।
নাওয়াজের কণ্ঠে কী যেন ছিল। আভিরা কথা খুঁজে পেল না।
মেয়েটা এখনও পুরুষটার বুকে লেপ্টে। শক্তপোক্ত বুকের ঐ সেকেন্ড এ সেকেন্ড এ বিট করা শব্দ কানে বাড়ি খাচ্ছে।নাকে ঠেকছে তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণ। কী মাতাল করা ঘ্রাণ!
আভিরা সে ঘ্রাণে খেই হারিয়ে খামচে ধরল বুকের একাংশ শার্ট। নাওয়াজ চাইল গাঢ় চোখে, আভিরাও চাইল।চোখাচোখি হলো দুজনের। বাদামি চোখে মেয়েটা ডুবে গেল মুহূর্তে।
কতক্ষণ পুরুষটার বুকে লেপ্টে ছিল জানা নেই। হুঁশ আসতে ছিটকে সরে গেল। ছিঃ! কী নির্লজ্জের মতো এতক্ষণ লেপ্টে ছিল। লজ্জায়, অস্বস্তিতে আভিরা আর চোখ তুলে দেখল না পুরুষটার পানে। মনে হচ্ছে এখান থেকে সে এই মুহূর্তে পালাতে পারলে বাঁচে। অথচ নাওয়াজ অত্যন্ত স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি।
গ্রাউন্ড ফ্লোরে লিফট থামতে নাওয়াজ হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল। আভিরাও পিছু ছুটল। মেয়েটা পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন বড়ো বড়ো কদম ফেলে হেঁটে চলা পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে চলা কোনোকালে সম্ভব নয়।
রাস্তা পার হওয়ার সময় নাওয়াজ আভিরার ছোটো হাতটা নিজের মুঠোয় পুরে নেয়। আভিরাকে হতবাক হওয়ার সুযোগ দিল না। অপর প্রান্তে গিয়ে মুঠোয় থাকা হাতটা যেমন ধরে ছিল তেমন ছেড়ে দেয়। আভিরা আটকে রাখা শ্বাস ফেলে। এতক্ষণ দম বন্ধ হয়েছিল যেন।
_
সিটি পয়েন্ট রেস্টুরেন্ট কুমিল্লা শহরের নামকরা রেস্তোরাঁ। পরিবেশ থেকে শুরু করে খাবারের মান সবদিক থেকে ভালো। ভালো সার্ভিস দেওয়ার দরুন অল্প সময়ে বেশ নাম করেছে।
অনেকে আছে বাসায় রান্নাবান্নার ঝুট ঝামেলা পোহাতে চায় না। রান্নাবান্না তাদের কাছে বেশ খেসারতের কাজ মনে হয়। তাই রান্নার ঝামেলা থেকে বাঁচতে রেস্তোরাঁয় ছুটে আসে। আবার অনেক কর্মজীবী আছেন যারা চেয়েও বাড়ি বসে রেঁধে খেতে পারে না। তাদের জন্য আনাচে কানাচে থাকা রেস্তোরাঁগুলোই যেন সম্বল।
দুপুর সময় হওয়ায় লোকজনের সমাগম বেশি। কর্ণারের একটা টেবিলে দুজন বসে পড়ল।
– সরি ম্যাম, এখন আইটেম হিসেবে সাদা ভাত আর পোলাও পাওয়া যাবে।
আভিরার মন খারাপ হয়ে গেল। পরোটা খেতে ইচ্ছে করছে। দুপুর সময়ে পরোটা পাওয়া যাবে না এটাই স্বাভাবিক। সে তো জানে। তবুও মনটা খারাপ হয়ে গেল। খানিকটা মুখ ভার করে বলল,
– ওহ্।
নাওয়াজ আভিরাকে জিজ্ঞেস করল,
– এই ভরদুপুরে আপনি ভাত না খেয়ে পরোটা খেতে চাচ্ছেন?
– খেতে ইচ্ছে করছে।
আভিরার সহজ স্বীকারোক্তি দেখে নাওয়াজ অল্প হাসল।
– আচ্ছা পরোটা খেতে পারবেন। তবে সাথে ভাতও খেতে হবে। রাজি থাকলে বলুন?
পরোটার কথা শুনে খুশি হলেও ভাত খাওয়ার কথা শুনে তা মিলিয়ে গেল। আভিরার মোটেও ভাত খেতে ইচ্ছে করছে না। তবে পরোটা খাওয়ার লোভও ছাড়তে পারল না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরোটা খাওয়ার লোভে জানান দিল সে রাজি।
– পরোটা করে এনে দিতে পারবেন?
– জি স্যার, তবে অপেক্ষা করতে হবে।
– আচ্ছা আমরা অপেক্ষা করছি। আপনি নিয়ে আসুন।
আধ ঘণ্টা পর দুটো পরোটা, ডিম ভাজি, দু প্লেট ভাত, পাতলা ডাল, ঝাল মাংস আর মাছ ভাজা দিয়ে টেবিলটা অল্প পরিসরে সাজিয়ে দেওয়া হলো।
আভিরার দুটো পরোটাতে পেট ভরে গেছে। তাকে খাবার মুখে না দিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে নাওয়াজ বলল,
– খাচ্ছেন না কেন আঞ্জুম?
– খাব না। মানে আমার পেটে আর জায়গা নেই।
– তা বললে তো হবে না। আপনাকে আগেই শর্ত দিয়েছিলাম। এখন কী কথার খেলাপ করবেন?
– এখানে কথার খেলাপ হলো কই?
অবাক হয়ে জানতে চাইল আভিরা।
– হয়েছে। ভাত খেয়ে নিজের কথা রাখুন।

