#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৮
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
আভিরা বহু কষ্টে প্লেটে থাকা ভাতটুকু গলাধঃকরণ করছে।গলা দিয়ে খাবার নামছে না তার। নামবে কী করে? পেটে যে চুল পরিমাণ জায়গা নেই। এইটুকুনি পেট তার। তাতে এত খাবার আঁটে। কেন যে নাওয়াজের কথায় রাজি হতে গেল। ভালোই ফ্যাসাদে পড়েছে। তার লোভের কারণে এমন হলো। সে না হয় একটু পরোটা খেতে চেয়েছে তাই বলে এমন করবে। আভিরা তো ভেবেছিল পরোটা খেয়ে আর কিছু না খেলেও লোকটা কিছু বলবে না। কিন্তু নাওয়াজ তাকে খাওয়ার জন্য জোর করছে। অবশ্য এটাকে জোর বলে না, রীতিমতো অধিকার খাটানো।
আভিরা জেদ করে সবটা গিলতে লাগল। চোখের কোণে অশ্রু জমেছে। আভিরার অবস্থা দেখে নাওয়াজ হতবাক। তার একটা কথায় যে মেয়েটা এমন করবে সে ভাবেনি। নাওয়াজ ওর অবস্থা দেখে বলল,
– খেতে হবে না, রেখে দিন।
তবে মেয়েটা শুনল না। জেদ করে সবটা খেল।
_
– মেয়েটা কে? এই বুঝি আপনার হবু ব…
হঠাৎ প্রশ্নে নাওয়াজ থেমে গেল। সাথে আভিরাকেও থামতে হয়। সামনে শেরিন দাঁড়িয়ে। আভিরা দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীকে। সুন্দরী রমণী। উচ্চতায় নাওয়াজের কাছাকাছি। আর সে এই লোকের বুক অবধিও না। নিজের ভাবনায় আভিরা নিজেই অবাক হলো। এসব কী ভাবছে। সে লোকটার বুক অবধি না মাথা অবধি তা ভাবার তো কোনো প্রয়োজন নেই। আভিরা নিজের ভাবনা বাদ দিয়ে সামনে থাকা মেয়েটার দিকে তাকাল আবার।
গায়ে থাকা সাদা এফ্রোন দেখেই বুঝা যাচ্ছে হবে হয়তো হসপিটালের কোনো ডক্টর। তবে কোন প্রসঙ্গে কথা বলছে আভিরার ঠিক বোধগম্য হলো না। অর্ধেক কথা শুনে কি পুরো কথা অনুধাবন করা যায়। নাওয়াজ কেন পুরো কথা শেষ করতে দিল না তাও বুঝল না আভিরা। হয়তো সে আছে বিধায়। তার সামনে হয়তো এ নিয়ে নাওয়াজ কথা বলতে চাইছে না।
আভিরা কী করবে? দাঁড়িয়ে থাকবে? না কি চলে যাবে?
এখানে যেমন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না তেমনি চলেও যেতে পারছে না। লোকটার সাথে এসেছে। হুট করে এখান থেকে চলে যাওয়াটা কেমন দেখায়। এখন চলে যাওয়া মানে অভদ্রতার পরিচয় দেওয়া। নাওয়াজের ভরাট কণ্ঠ কানে এলো।
– মিস শেরিন আপনার সাথে পরে কথা হবে। আমার একটু তাড়া আছে, দুঃখিত!
বেখেয়ালে আভিরার হাত ধরে হাঁটা ধরল। শেরিন একদৃষ্টে নাওয়াজের ধরে রাখা হাতটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার প্রশ্ন যে নাওয়াজ কৌশলে এড়িয়ে গেল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এড়ানোর কারণটা বোধগম্য হলো না শেরিনের।
_
মাঝে দুটো দিন তোফায়েল আহমেদকে হসপিটালে থাকতে হলো। ওনার সাথে আনেসা থেকেছে। আভিরা থাকতে চাইলেও থাকতে দেওয়া হয়নি। তাযীম আর তাকে পুনরায় নানা বাড়িতে পাঠানো হলো। ছেলেমেয়ে দুটোকে একা বাড়িতে কি করে থাকতে দেয়। তাই মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিল।
বাবা বাড়ি আসবে শুনে দু ভাইবোন বাড়ি ফিরে আসে। আতিয়া খানম কত করে বলল, আরও দুদিন থেকে যা।আমার একা থাকতে ভালো লাগে না। কিন্তু ওদের একটাই কথা। বাবা ফিরছে আর তারা এখানে পড়ে থাকবে তা কি হয়। নানিকে বলে গিয়েছে, পরে এসে অনেক দিন থেকে যাবে। তবে বাবা মায়ের সাথে নাওয়াজকে আভিরা আশা করেনি। সে তো ভেবেছে ঐদিনের পর হয়তো তাদের আর দেখায় হবে না। তোফায়েল আহমেদকে পৌঁছে দিতে এসেছে নাওয়াজ। আনেসা না করেছিল। বলেছিল তোমার যেতে হবে না। আমি পারব। তবে নাওয়াজ শুনেনি। তার একটা দায়িত্ব আছে। সে কীভাবে দায়িত্বহীনের মতো আচরণ করবে।
তোফায়েল আহমেদ মেয়েকে বললেন,
– আম্মাজান পানি দিন।
– দিচ্ছি বাবা।
বলে আভিরা পানি আনতে গেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন নাওয়াজের হৃৎস্পন্দন থেমে যায়। এক হাত দিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে অন্য হাতে গ্লাস নিয়ে ছোটো ছোটো কদমে এগিয়ে আসা রমণী তার সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর শাস্তি হিসেবে রমণীকে কী করবে সে? কষিয়ে একটা থাপ্পড় বসাবে ঐ তুলতুলে গালে? না কি আদুরে পরশ বুলাবে?
নাওয়াজ ঢোক গিলল। কী সব ভাবছে সে! রমণী তার মনের কথা জানলে নিশ্চয় তাকে কথা শোনাতে ছাড়বে না। সাথে অসভ্য উপাধি দিতেও দ্বিধা করবে না।
আনেসা এসেই রান্না চড়িয়েছে। মেয়ে তার টুকটাক কাজ জানলেও রান্নাঘরের ধারের কাছেও ঘেঁষতে দেননি তিনি।এখন মনে হচ্ছে একটু শিখিয়ে রাখলে ভালো হতো। তাহলে হসপিটাল থেকে এসে তাকে রান্না চড়াতে হতো না।
নাওয়াজ যদিও আজ প্রথমবার এ বাড়ি আসেনি। আগেও এসেছিল। তবে তখনকার আর এখনকার হিসেব আলাদা।
দুপুরের সময় চাইলেও নাস্তা ধরিয়ে দেওয়া যায় না।
নাওয়াজ যাওয়ার জন্য তাগিদ দেওয়া শুরু করেছে। তার নাকি হসপিটালে কাজ আছে। আসলেই তার কাজ আছে। এখান থেকে হসপিটালে গিয়ে মাহাদের সাথে বের হবে। আর এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি বের হওয়া যায় ততই মঙ্গল।
তোফায়েল আহমেদ বেজায় চটে গেলেন। এ ছেলে এখন তার ছাত্র থাকলে এমন অভদ্রতার জন্য দিত কয়েকটা। তবে এখন তিনি নিরুপায়। সময় তারও আসবে। তখন শায়েস্তা করে ছাড়বে এ অসভ্য ছেলেকে।
নাওয়াজ এত বলে কয়েও যেতে পারল না। একপ্রকার জোর করেই তাকে আটকে রাখা হয়েছে। না খেয়ে এক পা ও নড়তে পারবে না। নাওয়াজ কি করে তাদের বুঝাবে তার মনের অবস্থা। ওর মনে যে ভয়ঙ্কর ইচ্ছা জেগেছে। সামনে থাকা রমণীর উপর রাগ হলো। তাকে কে বলেছে এমন রূপে নাওয়াজের সামনে ঘুরঘুর করতে।
গোসল করে চুলগুলো মুছেনি অবধি। ভেজা চুলে ঘুরঘুর করছে। চুল থেকে টপটপ করে পড়তে থাকা পানিতে মেঝে ভিজে চলেছে। আভিরা সবসময় এমন করে। গোসল করে কখনো ভেজা চুল মুছে না। বলতে গেলে এটা তার অন্যতম একটা বদ অভ্যাস। নিজ রমণীর এমন রূপ দেখে কী তার পুরুষ মন মানে? কোনো পুরুষের মনই মানবে না। আর সে যদি শখের, আকাঙ্ক্ষার নারী হয় তবে তো মনকে বুঝ দেওয়া দায়। নাওয়াজের মতো পুরুষও দিশেহারা হয়ে উঠল।
আধ ঘণ্টার মধ্যে আনেসা বেশ কয়েক পদ রান্না করে ফেলেছে। আভিরা মায়ের হাতে হাতে এটা ওটা টেবিলে এনে সাজিয়ে রাখল। বেশ ভালো ঘ্রাণ বেরিয়েছে। পোলাও, সাদা ভাত, ডিম কারি, ছোটো মাছের চ্চরি আর ঝাল কষা মাংস।
এতটুকু সময়ে যা পেরেছে তাই রেঁধেছে। আভিরা সাথে শসা, টমেটো, পেঁয়াজ, মরিচ কেটে সালাদও বানিয়েছে। গরম গরম ভাত, মাংসের সাথে সালাদটা যেন খাবারের স্বাদ দ্বিগুণ বাড়িয়ে তোলে। পেঁয়াজ কাটার আগে হালকা আগুনের তাপ দিয়ে নিয়েছে।
রাসুল (সা.) কাঁচা পেঁয়াজ খেয়ে মুখে তার গন্ধ থাকা অবস্থায় জন সমাগম কিংবা মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন। যেহেতু এর গন্ধ মুসল্লি, অন্যান্য মানুষ এবং মসজিদে থাকা ফেরেশতাদের জন্য কষ্টদায়ক। তাই নবী করীম (সা.) এরশাদ করেছেন, তোমরা তা খাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি খাবে, এর দুর্গন্ধ দূর না হওয়া পর্যন্ত সে যেন মসজিদে না আসে। (সুনানে আবু দাউদ)
যদিও কাঁচা পেঁয়াজ খাওয়া মুসল্লিদের জন্য বর্জনীয় কিংবা হারাম নয়। তবে কাঁচা পেঁয়াজের থেকে রান্না করা পেঁয়াজ খাওয়ায় উত্তম। কারণ তাতে কাঁচা পেঁয়াজের ন্যায় ঝাঁজ থাকে না এবং তা খেলে দুর্গন্ধ তৈরি হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।
নাওয়াজ আজ অনেক দিন পর পেট পুরে খেল। আনেসার রান্নার হাত বেশ ভালো। সবগুলো আইটেম অসাধারণ হয়েছে। নাওয়াজের মনে হচ্ছে সে না খেয়ে গেলে অনেক কিছুই মিস করত। মায়ের রান্না কত বছর ধরে খাওয়া হয় না।
এক্সিডেন্ট এ যে সে শুধু বাবাকে হারিয়েছে তা নয়। মায়ের হাতেও মারাত্মক চোট পেয়েছিল। সেই থেকে হাতে সমস্যা। যদিও হাত ভেঙে গেছে বা হাত নেই তেমন না, সামান্য চোট।
তবুও রান্নার কাজটা লাবণ্যই করে থাকে। তার নাকি রাঁধতে ভালো লাগে। সেজন্য ইয়াজমীনকে রান্নার কাজ থেকে দশ হাত দূরে সরিয়ে রাখবে। লাবণ্যর রান্না ভালো হলেও নাওয়াজ মায়ের হাতের রান্নাটাই মিস করে।
_
তোফায়েল আহমেদ বারবার নিজের স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু এই মহিলাকে দেখো কী সুন্দর অন্যদিকে ফিরে শুয়ে আছে। তিন দিন একবারের জন্যও তার সাথে কথা বলেনি। অথচ সবার সাথে কী সুন্দরই না হাসিমুখে কথা বলেছে।
– তাযীমের মা রাগ করে আছো?
– কী সমস্যা? রাগ করে থাকব কেন? রাগ করে থাকার মতো কিছু হয়েছে কী?
তোফায়েল আহমেদ আনেসার কাঁধ স্পর্শ করে নিজের দিকে ফেরাতে চাইলে তিনি তেতে উঠলেন। ঝাঁজালো কণ্ঠে বললেন,
– রাত বিরাতে কী শুরু করলে? ঘুমাতে দিবে না নাকি। যত্তসব! তিন রাত ধরে আমার চোখে ঘুম নেই। আজও কি ঘুমাতে দেবে না?
রাগে গজগজ করছে আনেসা। এত রাতে নাটক শুরু করেছে। কই যখন তিনি জানতে চেয়েছেন তখন তো মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয়নি। এখন আসছে তামাশা করতে।
তোফায়েল আহমেদ স্ত্রীর রাগের কারণ বুঝলেন। তার কারণেই রেগে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– মোর্শেদ এসেছিল তিন দিন আগে। তখন আমি ক্লাস নিচ্ছিলাম। দপ্তরি এসে বলল আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে। বললাম আপনি ক্লাসে আছেন। শুনল না। বলল জরুরি কাজ আছে। এখনই দেখা করতে হবে। অফিস রুমে আছে। আপনি যাইয়া দেখা কইরা আহেন। আমি বড়ো স্যাররে পাঠাইতাছি।
আনেসা তড়িৎ গতিতে স্বামীর দিকে ফিরে চাইল।
– ঐ অমানুষটা কেন এসেছিল?
– শাওনের জন্য তোমার মেয়ের হাত চাইতে।
– কী বললে?
আনেসার অবিশ্বাস্য কণ্ঠ।
– হ্যাঁ, ওর ভাইয়ের ছেলের নাকি আমাদের আভিরাকে পছন্দ হয়েছে। ওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। তাই মোর্শেদ নিজে প্রস্তাব নিয়ে এলো।
– তুমি না করোনি?
– করেছি। ঐ ছেলের আগাগোড়া সবটাই তো জানা। জেনেশুনে অমন একটা ছেলের হাতে কি করে মেয়ে তুলে দেই। আর তাছাড়া আমি তো অন্য কারো কাছে ওয়াদাবদ্ধ। ওয়াদা ভঙ্গ করি কী করে!
– শাওন তো মাস্টার্স শেষ করেছে তাই না। পড়ালেখা শেষ করেও বেকার ঘুরে বেড়ায়। চাকরি বাকরির খবর নেই। সারাদিন মেয়েদের পিছনে ঘুরে বেড়াবে। আমার মেয়ের জন্য এমন একটা প্রস্তাব কী করে আনতে পারে তোমার বোন জামাই?
– আহা! রাগ করছ কেন?
– রাগব না তো কী করব? আমার মেয়ে কী ফেলনা নাকি। এমন সম্বন্ধ আনার সাহস করে কী করে? দুনিয়াতে আর মেয়ে নেই। শেষ পর্যন্ত অমন একটা ফালতু ছেলের জন্য আমার মেয়েকেই পেল। তুমি ঐদিন আমায় বলোনি কেন?
– তোমার এ স্বভাবের জন্য। মেয়েমানুষ বুঝে কম চিল্লায় বেশি। আমি তো না করে দিয়েছি। কাহিনী শেষ। এত কথা বলছ কেন?
– এত সহজে মেনে গেলে তো হতোই। আমি ওদের চিনি না ভেবেছ। সবগুলোকে হারে হারে চেনা আমার। আমার মেয়েটা নম্র ভদ্র বলে ভেবেছে এ মেয়েকে নিজের ছেলের বউ করে নিলে মেয়ে তাদের কথায় উঠবে বসবে। একদম নিজেদের মনমতো মেয়েকে চালাতে পারবে। আমার মেয়ে কোনো প্রতিবাদ করবে না, সব মুখ বুজে সয়ে নিবে। তাই নিজেদের বখে যাওয়া ছেলেকে আমার মেয়ের ঘাড়ে গছিয়ে দেওয়ার ধান্দা।
– আমি না করে দিয়েছি। তুমি চিন্তা করো না। ওরা আর এ বিষয়ে কোনো কথা বলবে না।
– সত্যি বলছ তো? মেনে নিলে তো ভালো কথা। তবে তোমার বুকের ব্যথা কেন বেড়েছিল। কোন চিন্তায় নিজের এমন অবস্থা করেছ? আমার থেকে কিছু লুকিয়ে যাচ্ছ না তো?
– আরে না, লুকাতে যাব কেন? ঘুমাও তুমি। কথা বলতে বলতে ঘুমানোর কথা ভুলে গেলে দেখছি।
তোফায়েল আহমেদ খুব সাবধানে কথা এড়িয়ে গেল। স্ত্রীর কাছে বলল না সবটা। শুধু শুধু চিন্তা করবে। মোর্শেদ তো সেদিন তার কথা মানেনি। বরং একপ্রকার হুমকি দিয়ে গিয়েছে। আভিরাকে শাওনের বউ করে না পাঠালে তাহমিদাকেও সে আর রাখবে না, বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে।
_
আনেসার সাথে কলেজ জীবন থেকে প্রেম। প্রেম বললে ভুল হবে। তোফায়েল আহমেদ পছন্দ করত। আনেসারও কিছুটা দুর্বলতা ছিল। একই কলেজে অধ্যয়নরত ছিল দুজন। জুনিয়র ছিল মেয়েটা। একটু ভীতু টাইপের, লাজুক। সেই ভীতু রূপে তোফায়েল আহমেদ পাগল হয়েছিল, বিয়েও করে নেয়। সমস্যা করল তার পরিবার। কেউ আনেসাকে মেনে নিল না। শাশুড়ি, ননদের জ্বালায় অতিষ্ঠ আনেসা। স্বামীকে এসব বলবে কী বলবে না ভেবে দোটানায় ভুগতে থাকে। তোফায়েল আহমেদ বিচক্ষণ পুরুষ। স্ত্রী বলার আগেই যেন বুঝে গেল সংসারে ঠিক কী হচ্ছে। তোফায়েল আহমেদ ওনার বাবাকে সব জানাতে তিনি বললেন, তাহমিদার বিয়ের ব্যবস্থা করো।
তোফায়েল আহমেদের মন মানতে চায়নি। একটাই বোন তার। তার উপর বয়স কম। না বুঝে মায়ের কথায় আনেসার পিছনে লাগে। তবে সংসারে রোজ রোজ অশান্তির চেয়ে মনে হলো এ পন্থা অবলম্বন করলেও মন্দ হয় না। সে হিসেবে ছেলেও দেখা হলো। মোর্শেদ তখন ব্যাংকে ছোটোখাটো একটা পদে ছিল। উচ্চতায়, চেহারায় একদম সুপুরুষ। তোফায়েল আহমেদের ভালো লাগল ছেলেটাকে দেখে। তার এক বন্ধু খোঁজ দিয়েছিল। ছেলে যেহেতু ভালো তাই আর দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই। বিয়ে দেওয়া হলো। তবে মোর্শেদ বিয়ের আগে শর্ত দিয়েছিল, বিয়ের পরপরই যাতে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়। সে মোতাবেক শর্ত অনুযায়ী তোফায়েল আহমেদ নিজের ভাগের জমি বেচে মোর্শেদকে বিদেশ পাঠায়।
বছর যেতে ভালো টাকা উপার্জন করতে শুরু করল মোর্শেদ। হাতে টাকা আসতে স্বভাবেও যেন পরিবর্তন ঘটে।
ঠিকমতো টাকা পাঠায় না, রাত জেগে মেয়েদের সাথে কথা বলা এসব করে দিন পার করে দেয়। ঘরে যে বউ আছে সে খেয়াল পর্যন্ত নেই। থাকবে কী করে? সে তো তাহমিদাকে বিয়ে করতেই চায়নি। যেই দেখল তার শর্তে মেয়ের বাড়ির মানুষজন রাজি সেই সুযোগ কী আর হাতছাড়া করা যায়। লুফে নিল। তাহমিদা স্বামীর এসব বেপরোয়াভাব সইতে না পেরে ভাইদের বলতে তোফায়েল আহমেদ বুঝলেন মানুষ চিনতে কত বড়ো ভুল করেছে। তোফায়েল আহমেদ বোনকে নিয়ে আসতে চাইলেও তাহমিদা এলো না। বিয়ে যেহেতু হয়ে গিয়েছে চাইলেই তো সব ছেড়ে আসা যায় না। তাহমিদা মাটি কামড়ে পড়ে রইল স্বামীর ভিটায়।
মোর্শেদ এত সহজে কি করে বলল তাহমিদাকে ছেড়ে দেবে।
দুটো মেয়ে আছে তার। বয়স তো আর আগের মতো নেই। এ বয়সে এসে এ কথা বলতে মেয়ে দুটোর কথা মাথায় এলো না। তোফায়েল আহমেদ সবকিছুর জন্য নিজেকে দায়ী মনে করলেন। তার জন্য সব হয়েছে, তার ভুলের জন্য। সে যদি বাবার কথায় বোনের জন্য ছেলে না দেখত তাহলে আজ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। তবে মোর্শেদ যাই বলুক মেয়ের জীবন নিয়ে তিনি হেলাফেলা করবেন না। এখন যার আমানত তার হাতে তুলে দিতে পারলেই ওনার চিন্তার অবসান ঘটবে।

