প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_১৭

0
1

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_১৭
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

জিদান নিষ্পলক চোখে আভিরাকে দেখছে। এই যে মেয়েটা কাঁদছে না, শুধু সেই তখন থেকে বিড়বিড় করে কী যেন বলে চলেছে।
তোফায়েল আহমেদ আর নাওয়াজরা পাশের মসজিদ থেকে নামাজ আদায় করে সবেমাত্র এলো। এ অবস্থা দেখে সকলে স্তম্ভিত। মিনিট দশেকের মধ্যে কী থেকে কী হয়ে গেল। মাহাদ ছুটে ছেলেটাকে নিজের কাছে নেয়। এখনও রক্ত পড়া বন্ধ হয়নি। তবে আগের থেকে কিছুটা কম। ওর অবস্থা দেখে মাহাদ খানিকটা চেঁচিয়ে উঠল,
– আপনারা কি পাগল? হসপিটালে না নিয়ে এখানে বসে আছেন।

ওর চিৎকারে যেন সকলের সম্বিৎ ফিরে। তোফায়েল আহমেদ ছুটে এলেন ছেলের কাছে।

– আঙ্কেল ওকে আর এখানে রাখা ঠিক হবে না। হসপিটালে নিতে হবে।

– এখানে রেখে কিছু করা যাবে না, মানে হাসপাতালে নিতেই হবে।
তোফায়েল আহমেদের কণ্ঠ যেন খানিকটা কাঁপল।

– না আঙ্কেল, এখানে রেখে কিছু করা সম্ভব নয়। অবস্থা খুব একটা ভালো না। হসপিটালে নিতে হবে। নয়তো… আপনি যাবেন আমাদের সাথে? এই নাওয়াজ তুই যাবি তো না কি?

– হু।
আপনমনে আভিরার দিকে তাকিয়ে বলল নাওয়াজ। মেয়েটা মাটিতে কী এত দেখছে? চোখ তুলে কেন তাকাচ্ছে না? সে কি কাঁদছে?

এক মুরুব্বি বলে উঠল,
– ও চলে গেলে বিয়ে হবে কখন? কাজি যে বসে আছে।

মরার উপর খাঁড়ার ঘা। বিপদ এলে যেন সবদিক দিয়েই আসে। বিয়ের কথা সকলে ভুলতে বসেছিল। তোফায়েল আহমেদ এক মিনিটও ভাবার প্রয়োজন মনে করলেন না। গম্ভীর স্বরে বললেন,
– ও যাবে না। বিয়ে এখনই হবে।

– কিন্তু আঙ্কেল এ অবস্থায়।

– এ অবস্থায় বিয়ে হবে। কিছু হয়নি।

_

– দেখো ছেলে মরতে বসেছে এখন কিনা মেয়ের বিয়ে দিবে। কত রঙ ঢং করতে পারে বুঝি না বাপু। বলিহারি আজই কেন বিয়ে দিতে হবে, সময় কি চলে যাচ্ছে।

– দেখেন গিয়ে কোনো কিচ্ছা রটিয়ে রেখেছে কিনা। এ ছেলে তো এককালে তোফায়েলের ছাত্র ছিল‌। হয়তো কোনো সম্পক্ক টম্পক্ক ছিল। জল বোধ হয় বেশি দূর গড়িয়েছে। সব ধামাচাপা দিতেই এত তাড়াহুড়ো।

অথচ বাবা অসুস্থ হওয়ার আগ মুহূর্ত অবধি নাওয়াজদের কাউকেই চিনত না মেয়েটা। না জেনে শুধু তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে সকলে জল ঘোলা করতে ব্যস্ত, কথাবার্তায় নোংরা ইঙ্গিত।
কতজন কত কথা বলছে। তোফায়েল আহমেদ সেসবে কান দিল না। লোকজনের কাজই হলো আজেবাজে কথা বলা। সেসবে পাত্তা দিলে চলবে না। তারা রসিয়ে রসিয়ে মনগড়া যত গপ্প বানাতে পটু। তোমার বিপদে এরাই সান্ত্বনা দিবে আবার সময়ে এরাই তোমার দিকে কাদা ছুঁড়তে দ্বিধা করবে না।

– আভিরা আম্মা, ভিতরে যান।

মেয়েকে ভিতরে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিলেন। আভিরার কানে তা গেলে তো। সে এখনও আগের মতোই বসে আছে।
মেয়ের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে তোফায়েল আহমেদ কিছুটা ধমকে উঠলেন,
– আভিরা ভিতরে যেতে বলেছি আপনাকে।

এবার বোধহয় শুনল মেয়েটা। মাটি থেকে চোখ সরিয়ে টলমলে চোখে বাবার দিকে চাইল। অস্ফুট স্বরে বলল,
– ভাই।

তোফায়েল আহমেদ কিছুক্ষণের জন্য থমকালেন। নিজেকে আজ বড্ড অসহায় লাগছে তার। স্ত্রীর দিকে চাইলেন, ঐ মহিলা কাঁদছে। তার অবস্থা কাকে বুঝাবেন। নিজেকে শক্ত করলেন তিনি। ছেলের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে বললেন,
– ভাইকে সহীহ সালামত আপনার কাছে এনে দেবো। বাবার উপর বিশ্বাস রাখুন। কেউ আপনার অপেক্ষায় আছে।আমার কথার খেলাপ করাবেন না আম্মা। কাউকে কথা দিয়েছি আমি। এখন আপনাকে দিলাম। ভাইকে সুস্থভাবে আপনার কাছে এনে দেবো। তাকে দেওয়া ওয়াদা রাখতে সাহায্য করুন।

আভিরা জানে না বাবা কাকে কথা দিয়েছে বা কী নিয়ে। তবে সে যদি ভুল না হয় সেই কথা কয়েক মিনিট বাদে রাখতে চলেছে। আভিরা কোনো প্রকার শব্দ ব্যয় না করে ভিতরে চলে গেল। বাবা তাকে কথা দিয়েছে ভাইয়ের কিছু হতে দিবে না, এনে দিবে তার কাছে।

জিদান আভিরার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে তার, গায়ে ভেজা পাঞ্জাবি। বর্ণ এসে ওর কাঁধে হাত রাখতেই ছেলেটা ছিটকে পড়ে। সামান্য হকচকায়ও। নজর লুকাতে চাইল এদিক ওদিক। বর্ণ সবটা বুঝলেও সে প্রসঙ্গে কথা তুলল না। পাল্টা প্রশ্ন করল,
– ভেজা পাঞ্জাবিতে দাঁড়িয়ে আছো যে? যাও পাল্টে এসো।

– যাচ্ছি।
বলে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না ছেলেটা। ধরা পড়ার ভয়ে একপ্রকার হন্তদন্ত হয়ে পালায়।

_

আভিরা চুপচাপ খাটে বসে আছে। গায়ে জড়ানো শাড়িতে মাটি লেগে আছে, সাথে ছোপ ছোপ তাজা রক্ত। অনুভূতি শূন্য হয়ে তিন কবুল বলল মেয়েটা। এখন বিপরীত রুমে অবস্থারত পুরুষটার কবুল বলার পালা। সকলে এ ঘর ছেড়ে ও ঘরে গেল।
বর কনে দুজনকে একসাথে বসানো হয়েছে। নব দম্পতি তারা। শরীয়ত মোতাবেক তিন কবুল বলে মিনিটখানেক আগে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

আনেসার মামি শাশুড়ি বেশ কঠোর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। করোনার বছরে স্বামীকে হারায়। ভদ্রলোক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামীর শোক কাটিয়ে উঠার আগে আবার বড়ো মেয়েকে। করোনার প্রকোপে মেয়েটাও মারা যায়। বয়স কত হবে তার মেয়ের। স্বামীর ঘর, সংসার সামলানোর বয়স। আইদাহর বয়সী একটা মেয়ে আছে। এর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। তিন কবুল বলে যে লাপাত্তা হলো আর খবর পাওয়া যায়নি তার স্বামীর। কয়েক বছর খোঁজ চালানোর পরও যখন খবর মিলল না তখন তাকে আবার বিয়ে দেওয়া হয়।
যুবতী মেয়ে ঘরে ফেলে রাখলে তো হবে না। আগে পরে বিয়ে দিতেই হবে। আর কোন ঠক জোচ্চোরের জন্য মেয়েকে ফেলে রাখবে, যে নতুন বউ রেখে ভিন দেশে পড়ে আছে। সকলে খবর পেয়েছে সে ছেলে পশ্চিমা বিশ্বের কোনো এক দেশে আছে। কোনোভাবেই আর যোগাযোগ করে উঠতে পারল না কেউ। কত চেষ্টা করল। লাভ হলো না। দেখা পাওয়া গেল না তার। শেষে নিজ দায়িত্বে ছেলে দেখে মেয়েকে আবার বিয়ে দিলেন। তবে অল্প বয়সে মেয়েটা প্রাণ খোয়াল। তার মেয়ে মরার বছরের মাথায় বর্তমান স্বামী আবার বিয়ে করে। যদিও তাতে ভদ্রমহিলার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার যত চিন্তা মেয়ের রেখে যাওয়া বাচ্চাটাকে নিয়ে। সে তো আর আগের মতো শক্তপোক্ত নেই। বয়স হয়েছে তার। এ বয়সে একা একলা বাচ্চা একটা মেয়েকে লালন পালন করা মুখের কথা নয়। চিন্তার অবসান ঘটায় তার ছোটো মেয়ে। বোনের মেয়েকে সে নিজে মানুষ করবে, নিয়ে গেল নিজের কাছে।

সকলে যেখানে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে সেখানে সব নিয়ম উনি নিজ দায়িত্বে পালন করছেন। এটা বিয়ে বাড়ি তা ভুলে গেলে তো আর চলবে না। নব দম্পতির সামনে আয়না ধরা হলো। সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, ওরা কী বলবে তা শোনার জন্য।

– নতুন জামাই আয়নায় কাকে দেখতে পাচ্ছেন?

– আমার অনুভূতির খোরাক।

আভিরাকে একই কথা জিজ্ঞেস করতে এক মুহূর্তের জন্যও ভাবনায় পড়েনি মেয়েটা। ঠোঁট নাড়িয়ে মৃদু স্বরে প্রত্যুত্তর করল,
– আমার ভবিতব্য।

সকলে চমৎকার একটা হাসি দিল। চমৎকার কথার জন্য চমৎকার হাসি।

– দেখি একে অপরকে খাইয়ে দাও তো।

আগে নাওয়াজ এক চামচ মিষ্টান্ন আভিরার মুখে তুলে দিল। তারপর আভিরা। এটাই নাকি নিয়ম। বিয়ের পর বর বউ একে অপরকে খাইয়ে দিবে।

_

– শাড়িতে রক্ত লেগে আছে। পাল্টে আসবেন? কাউকে খবর দিব?

ঘরে আপাতত আভিরা আর নাওয়াজ একা। সকলে কাজে ব্যস্ত। কেউ কাজে, কেউ বা কষ্ট লুকাতে।

– না। লাগবে না।

– ঠিক আছে। পরিষ্কার করে নিন। দেখি আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।

আভিরা বাধা দিল না। নাওয়াজ হাত দিয়ে আগে শাড়ির আনাচে কানাচে লেগে থাকা মাটি ঝেড়ে ফেলে দিল। পকেট থেকে রুমাল বের করে পানিতে ভিজিয়ে ভালো করে রক্তও পরিষ্কার করল। যদিও এভাবে কাজ হবে না। ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার না করলে এ রক্ত উঠবে না। তবে কিছুটা উঠেছে।

– আব্বুকে একটু কল দিবেন। মানে ঐদিকের কী অবস্থা আমি…

– দিয়েছিলাম।

– কখন?

– কবুল বলার সময়। স্যার লাইনেই ছিল। ওনাকে লাইনে রেখেই বিয়েটা হয়েছে। রাস্তায় আটকে আছে, জ্যামে আটকেছে। বেশি দূরে না হসপিটালের কাছাকাছি। পৌঁছে কল দিবে। আর চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি। এখন ওরা অনেক ব্যস্ত থাকবে। বারবার কল দিয়ে বিরক্ত করার কোনো মানে নেই। তাছাড়া ঘণ্টাখানেক পরে আমরা যাব সেখানে।

মেয়েটা মৌন রইল। ওকে চুপ থাকতে দেখে নাওয়াজ শুধাল,
– ঠিক আছেন?

– না।
আভিরার সহজ স্বীকারোক্তি।

– কষ্ট হচ্ছে?

– হু।
মেয়েটা কী কান্না সংবরণ এর চেষ্টা করছে!

– দেখি কাছে আসুন। কান্না এলে তা কখনো গিলে ফেলবেন না। যত কষ্ট আছে চোখের পানিতে তা বের করে দিবেন।
আর এখন থেকে এই আমিটা আপনার। কাঁদতে ইচ্ছে করলে কেঁদে আমার বুক ভাসাবেন। তবে খবরদার যত কান্না আমার সামনে, আড়ালে নয়। ভিতরের অস্থিরতা গোপন করার প্রয়াস করবেন না কখনো, এসব আমার একদম অপছন্দের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here