#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংস্যা_২০
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
– মিসেস নাওয়াজ ইয়াজিদ, ঘুম হলো আপনার? কাল রাতের জন্য কি রাগ করে মুখ ফুলিয়ে বসে আছেন? অযথা মুখ ভার করে বসে থাকবেন না। আজ আপাতত আপনার রাগান্বিত মুখশ্রী দেখার ইচ্ছে নেই। ঐ সুশ্রী চেহারায় ক্রোধ ঠিক মানায় না। আমি যেন এসে আপনার হাস্যোজ্জ্বল আননখানি দেখতে পাই। আমি যদি ভুল না হই আপনার মুখাবয়বে এ মুহূর্তে হাসির দেখা মিলেছে। হাসবেন না। বিয়ের পরেরদিন সকালে স্বামী কাছে নেই আর বউ হাসছে। ব্যাপারটা মোটেও ভালো দেখায় না। আমি যখন আসব, আমার সামনে বসে হাসবেন। তখন বাধা নেই। কিন্তু এখন একেবারে হাসা যাবে না।
বাড়িতে নতুন বউ রেখে হসপিটালের এ মাথা থেকে ও মাথা চক্কর কাটতে হচ্ছে আমার। কী একটা জঘন্য ব্যাপার, বলুন! সকলে আমায় নিয়ে হাসাহাসি করছে। আমি এসব গায়ে মাখার প্রয়োজন বোধ করতাম না, যদি না ঘরে বউ রেখে আসতাম। তবে এখন বউয়ের থেকে আমার দায়িত্ব আগে। বাড়ি ফিরে না হয় বউকে নিজের দখলে রেখে দিব। আজকে বউ আমার জন্য বরাদ্দ।
আভিরা সত্যিই হাসছে। যদিও কালকে রাতের কথা সে ভুলেনি। আভিরা দেখল আসলেই নাওয়াজ নেই। ঘরে শুধু তাযীম আর সে। নাওয়াজ কোন সকালে বেরিয়েছে কে জানে? ঘড়িতে এখন বেলা এগারোটা বাজতে চলল। সে এতক্ষণ অবধি পড়ে ঘুমিয়েছে। শ্বশুর বাড়িতে প্রথম দিন সে কীভাবে পারল এভাবে ঘুমাতে। নাওয়াজের উপর চাপা রাগ হলো। লোকটা পারত তাকে ডেকে দিতে। ইচ্ছে করে দেয়নি। সে বেশ বুঝতে পারছে। নিশ্চয় কাল রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আভিরাকে ডাকেনি। আভিরার কমে যাওয়া রাগটা যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল হঠাৎ। একটু আগের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা এখন আর নেই।
আভিরার ঘুম ভাঙতে চোখে পড়েছে সাইট টেবিলে রাখা ছোটো চিরকুটের দিকে। ফুরফুরে মনে মেয়েটা চিরকুটে থাকা প্রতিটা লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়ল, অল্পস্বল্প হাসলও। তবে নাওয়াজের কাণ্ডে মেয়েটার হাসি বেশিক্ষণ টিকল কই। চিরকুট যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দিল। এমন একটা ভাব ধরল যেন এটা তার চোখে পড়েনি।
আভিরা উঠে দাঁড়ায়। ঘরটাকে ভালো করে পরখ করে নিল একবার। ঘরের দেয়ালে সাদা রঙ করা আভিরার খুব একটা পছন্দ না। অপছন্দের কারণও আছে। এত রঙ থাকতে ঘরের দেয়ালে কেন সাদা রঙ করতে হবে। চার দেয়ালে সাদা নয় বরং অফ হোয়াইট রঙ। দরজায়, জানালায় লাগোয়া পর্দাগুলোও এক রঙা অফ হোয়াইট রঙের, মাঝে হালকা জলছাপ। ঘরে থাকা ফার্নিচারগুলোতে আভিরার যেন নজর আটকে গেল। অটবি ফার্নিচার সব। তাও কালো রঙের। আভিরার পছন্দের। সবেতে যেন নতুনত্ব। দেখে বুঝা যাচ্ছে এদের এ বাড়িতে আসার স্থায়ী দিনক্ষণ বেশি না।
হয়তো সপ্তাহখানেক আগে এ ঘরে জায়গা হয়েছে তাদের।
নতুন ফার্নিচার আনা হলে কী হবে। খুব বেশি কিছু নেই।
ডাবল বেডের একটা খাট, কাবার্ড, ড্রেসিং টেবিল, একটা মাঝারি সাইজের বুক শেলফ, একটা সিঙ্গেল সোফা।
আভিরা নিজের লাগেজ খুঁজল। ওর স্পষ্ট মনে আছে কাল
জিদান, বর্ণ লাগেজ দুটো এ ঘরে রেখে দিয়ে গিয়েছে। তবে
এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? অনেক খুঁজে লাগেজের দেখা মিলল। মেয়েটার মুখে হাসি ফুটতে ফুটতে তা যেন ধপ করে নিভে যায়। কাবার্ডের উপরে রাখা। একটা রাখা হলেও মানা যেত। দুটো লাগেজের দুটোই একটার উপর আরেকটা রাখা। আভিরার পক্ষে এত উপর থেকে লাগেজ নামানো সম্ভব না। এগুলো যে ভারী, তার মতো চুনোপুঁটি শরীর নিয়ে এত উপর থেকে টেনে লাগেজ নামানো অসম্ভব প্রায়। আভিরা কাউকে ডাকতেও পারছে না। কেউ তাকে ডাকতে আসেনি। সে নতুন বউ। কেউ না এলে সে তো আর একা একা নিচে নেমে যেতে পারে না। আভিরা কতক্ষণ লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চেষ্টা করল। উহু সম্ভব নয়। কারো সাহায্য লাগবে।
তার পার্স ব্যাগটা কোথায়? কাউকে যে কল করবে সে উপায়ও নেই। ব্যাগের মধ্যে তার ফোন রাখা। ফোনটা পেলে কল দিয়ে কাউকে ডাকা যেত। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল মেয়েটার। আভিরা জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
নড়বড়ে কী টুলটা? তাই তো মনে হচ্ছে। আভিরা ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়াল। এবার যদি নাগাল পায়। আভিরা যেন অবাক হলো! টুলে দাঁড়িয়েও সে নাগাল পাচ্ছে না। সে কী এতটাই খাটো? আভিরা পা দুটো সামান্য উঁচু করে দাঁড়ায়। লাগেজে হাত দিতে বুঝল লাগেজ দুটো তুলনায় অতি হালকা। এত হালকা হওয়ার তো কথা নয়। মেয়েটা কসরত ছাড়াই টেনেটুনে নামায় লাগেজ দুটো। লাগেজ খুলতেই রাগে দু্ঃখে কান্না এলো তার। ভিতরে তার জামাকাপড় কিছুই নেই। সে যে এত কষ্ট করল সব তবে জলে গেল।
আলমারির পাল্লা খোলা যাচ্ছে না। লক করা বোধহয়। সাইট টেবিলের এক পাশে চাবির গোছা রাখা। আভিরা আলমারি খুলে দেখল এক পাশে নাওয়াজের শার্ট, প্যান্ট, ব্লেজার, জ্যাকেট আর অপর পাশে তার শাড়ি, সালোয়ার, কামিজ।
এটা যে নাওয়াজের কাজ বুঝতে বাকি রইল না আভিরার।
তবে পোশাক বাছাইয়ে মেয়েটা দোটানায় পড়ে গেল। তার নিশ্চয় এখন শাড়ি পরা উচিত। কিন্তু দুঃখের বিষয় সে শাড়ি পরতে পারে না। আভিরার নিজেকে এত অসহায় লাগছে। নাওয়াজ এখন বাড়িতে থাকলে তাকে নিশ্চয় এত সমস্যায় পড়তে হতো না। লোকটা সমস্যা হওয়ার আগেই সমাধান করে দিত।
_
– শরীরের এ হাল করার কারণ কী লাবণ্য?
লাবণ্য আমতা আমতা করেও বলার মতো কিছু পেল না।
– জবাব দিচ্ছিস না কেন? বল দুদিন ধরে না খেয়ে ঠিক কোন কারণে শরীরের এ দশা?
লাবণ্য এবারও চুপ রইল।
– কথা নেই তো। চল আমার সাথে, এখনই খাবি। আমার বাড়িতে কী খাবারের অভাব পরেছে যে না খেয়ে একেকজন জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকবে।
লাবণ্য কথাগুলোর মানে বেশ বুঝতে পারল। আসলে দুদিন ধরে শরীরটা দুর্বল লাগছিল। সে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। প্রায়ই এমন দুর্বল লাগে। ভেবেছিল ঠিক হয়ে যাবে। তবে এভাবে যে জ্ঞান হারাবে কে জানত। সকলে আপাতত তার রুমে। এতেই যেন মেয়েটার অস্বস্তি কয়েক গুণ বেড়ে গেল। আজ নাওয়াজ, আভিরার বউভাত। কত কাজ বাড়িতে। আর সকলে কিনা কাজ ফেলে তার ঘরে ভিড় জমিয়েছে।
– খালা আমি ঠিক আছি। তুমি চিন্তা করো না। নিচে যাও। কত কাজ আজ। আর তোমরা কিনা কাজ ফেলে আমাকে নিয়ে পড়ে আছো।
– বেশি কথা বলো না লাবণ্য। খাবার পাঠাচ্ছি। কোনো তালবাহানা না করে খেয়ে নিবে।
বর্ণা কিছুটা ধমকে বলল। সকলে বেরিয়ে গেল, শুধু থেকে গেল মাহিরা। মুহূর্তেই লাবণ্য মুখাবয়ব কঠিন করে নেয়।
– এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?
– এসব নিশ্চয় তোর কাজ। এভাবে সকলকে ডেকে না আনলে হতো না।
– তাহলে কী তোকে ওভাবে ফেলে রাখতাম?
– রাখতি। বাড়িতে যে অনুষ্ঠান তা কী তোর মাথায় নেই?
– আমার মাথায় আছে। তোর হয়তো মাথায় নেই। থাকলে নিশ্চয় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকতি না। ডাক্তার বলেছে দুদিন ধরে না খেয়ে আছিস। আন্টি শুনে কতটা অবাক হয়েছে তোর ধারণা নেই। আন্টি নিজেকে দোষ দিচ্ছেন। তোর দিকে নাকি ঠিকভাবে খেয়াল রাখতে পারেননি। অথচ মূল বিষয় সম্পর্কে উনি অবগত নন। শুধু শুধু নিজেকে দোষ দিয়ে যাচ্ছে। এতগুলো মানুষকে এভাবে হেনস্তা করার মানে কী? তোর কী উচিত না যা হয়েছে তা মেনে নেওয়া? এভাবে খাওয়া বন্ধ করে, নিজের অযত্ন করে, জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকলে কী সবটা ঠিক হয়ে যাবে? কিছু কী বদলাবে?
– তোকে কে বলল আমি মেনে নেইনি? যা হয়েছে আমি নিজে দাঁড়িয়ে স্বচক্ষে দেখেছি। তাহলে মেনে না নেওয়ার কথা আসছে কেন?
– আমি তো সব দেখছি, বুঝতে পারছি। মনে রাখবি হাজার চেষ্টা করেও তুই আমার থেকে কিছু লুকাতে পারবি না। তাই উল্টা পাল্টা বুঝ দিতে আসিস না।
লাবণ্য বিড়বিড় করে বলল,
– সকলে বুঝে, সে কেন বুঝল না।
– কারণ তুই তাকে বুঝতে দেসনি।
লাবণ্য শক্ত কণ্ঠে বলতে চাইল তার বুঝা উচিত ছিল। কিন্তু আগত কলে সে থেমে যায়। একবার বেজে কেটে যেয়ে পুনরায় কল এলে লাবণ্য বলল,
– ফোনটা তোল।
– ইম্পর্ট্যান্ট কল না, বাদ দে।
লাবণ্য স্ক্রিনে চেয়ে চোখ ঘুরিয়ে বলল,
– ভাইয়া কল দিয়েছে।
মাহিরা ফোনটা তুলে দেখল স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে সামাদ নামটা। মাহিরা কল ধরে চুপচাপ বসে রইল।
– কী হলো কথা বলছ না কেন? বিয়ে খেতে গিয়ে আবার নিজে বিয়ে করে বসে আছো না তো?
মাহিরার নীরবতায় যেন ওপাশের মানুষটার রাগ তরতর করে বেড়ে গেল।
– বের হও। এই মুহূর্তে তুমি আমার সাথে দেখা করবে।
– বাড়িতে অনুষ্ঠান।
– সে আমার অজানা নয়।
– তারপরেও বলার কারণ?
– তুমি বাধ্য করলে। কাল রাত থেকে কথা নেই, ফোন বন্ধ।এখন আবার কল ধরে কথা বলছ না।
– ব্যস্ত ছিলাম।
– কী এমন ব্যস্ততা আমিও দেখতে চাই। পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। রেডি হয়ে রাস্তায় এসো। আমি অপেক্ষা করছি।
– অসম্ভব।
– সব সম্ভব। কথা না বাড়িয়ে নিচে এসো।
– লাবণ্য অসুস্থ। ওকে একা ফেলে যাওয়া সম্ভব নয়।
লাবণ্য চোখ পাকিয়ে তাকায়। কী ধুরুন্ধর মেয়ে দেখো। সে তো সুস্থ। আর তাকে কিনা অসুস্থ বানিয়ে ছাড়ছে। ওপাশের লোকটা লাবণ্যর কী হয়েছে তা জানার জন্য কোনো আগ্রহ দেখাল না।
– ওকে ও সাথে করে নিয়ে এসো।
বলেই কল কেটে দিল।

