#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_১৯
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
– নিন।
– কী আছে এতে?
– দেনমোহর, আপনার সম্মাননা। বুঝে নিন।
আভিরা জানে এখানে কত আছে। লাখ পাঁচেক। কাজি যখন দেনমোহরের কথা বলছিল তখন তার কানেও কিছুটা এসেছে।
নাওয়াজ হাত ঘড়ি খুলতে খুলতে বলল,
– জানেন দেনমোহর সর্বনিম্ন দশ দিরহাম ধার্য করা হয়েছে। এর কমে যদি স্ত্রীর আপত্তি না ও থাকে তবুও দেওয়া যাবে না। দিলেও ইসলামি শরীয়তে তা বৈধতা পাবে না। আবার লোক দেখানো অতিরিক্ত দিরহামও নির্ধারণ করা যাবে না।
স্ত্রীকে তার ন্যায্য মূল্যায়ন দিয়ে তবেই আনতে হবে।
স্ত্রীর বংশ কিংবা তার সমমানের হলে সেক্ষেত্রে দেনমোহর নির্ধারণে বিবেচনা করতে হবে। আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে না এত কম মোহরানা কেন ধার্য করা হলো? আমি চাইলে লাখ দশেক সম্মাননা প্রদান করে আপনাকে আমার ঘরে আনতে পারতাম। আপনার স্বামীকে এই পরিমাণ মোহরানা দেওয়ার সামর্থ্য খোদা দিয়েছে। তবুও কেন করিনি জানেন?
আভিরা মৌন রইল। হয়তো সে জানে। তবুও নাওয়াজের কাছ থেকে জানতে চাইছে।
– জানেন তো আমি মৃত্যুর আগ অবধি থাকাতে বিশ্বাসী। বিয়ে হলো পূর্ণতা পেল, কয়েক বছর পর আবার ভাঙন ধরল। এমন পরিণয়ে আমি বিশ্বাসী নয়।
আজকাল সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আবার সম্পর্ক ভাঙনের পর ছেলেপক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত মোহরানা ধার্য করা হয়, স্ত্রীর সম্মাননা হিসেবে নয়। আমি একপ্রকার ইচ্ছে করেই আপনার মোহরানা কম রেখেছি। কারণ আপনার সম্মাননা আমার কাছে। আমি যদি যোগ্য সম্মান না দিতে পারি তবে ঐ লাখ দশেক মোহরানা দিলেও কোনো লাভ হবে না। মোহরানা দিয়ে কখনো স্ত্রীর সম্মাননা যাচাই করা যায় না। তবে ন্যায্য সম্মাননা দিয়ে ঘরে আনতে হবে, যা আমি করেছি। এর থেকে বেশি মোহরানা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি।
নাওয়াজ একটু থেমে আবার বলল,
– আমাদের সম্পর্ক ভাঙনের কোনো সুযোগ নেই। আজন্মকাল আপনি আমার হয়ে থাকবেন। কী থাকবেন না?
প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে চাইল নাওয়াজ আভিরার পানে। আভিরা খানিকক্ষণ চুপ থেকে ছোটো করে জবাব দিল।
– থাকব।
– আপনি সন্তুষ্ট তো আঞ্জুম? না কি আপনার মনে হচ্ছে এত কম মোহরানা দিয়ে আমি আপনার অবমাননা করছি?
– আপনি তো বললেন আমার সম্মাননা আপনার কাছে। তাহলে এ কথা আসছে কেন? নাকি আপনিও মোহরানা দিয়ে আমার সম্মাননা যাচাই করছেন।
আভিরার পাল্টা প্রশ্নে নাওয়াজ কিছু বলল না। সামান্য হাসল শুধু। আভিরা চেয়ে দেখল সে হাসি। অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার। মুহূর্তেই মনে হলো এ হাসি দেখার জন্য হলেও মানুষটাকে তার লাগবে। গম্ভীর মানুষরা বুঝি এমন অল্প বিস্তর হাসিতে মানানসই।
নাওয়াজ কিছুটা ঝুঁকে এলো। আভিরা সামান্য ভড়কালেও দূরে সরে গেল না। মূলত নাওয়াজ কি করে সে তা দেখতে চাইছে। পকেট থেকে ছোটো একটা জিনিস বের করে আভিরার পায়ে পরিয়ে দিল। সাথে ছোটো একটা চুমু। মেয়েটা কেঁপে উঠে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। বাধা দেওয়ার সুযোগ পেল না। পরপর কপালে, চোখে ঠোঁট ছোঁয়ায়। চোখ নামিয়ে আভিরার পুরো মুখের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। তারপর ঠোঁটে। নাওয়াজের শ্বাস প্রশ্বাস মেয়েটার চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। আভিরা মোহাবিষ্ট হয়ে আঁকড়ে ধরল নাওয়াজের চুল। নাওয়াজ ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসে। ঠোঁট জোড়া স্মিত নাড়িয়ে বলল,
– উহু, এখন না। সময় হয়নি।
আভিরা বেচারি লজ্জা পেল। হাত দুটো গুটিয়ে নেয়। ছিঃ কী করতে যাচ্ছিল সে, ভাবতেই মুখাবয়ব রক্তিম হয়ে ওঠে!
ছাড়া পেয়ে নাওয়াজ উঠে দাঁড়ায়। আভিরার উদ্দেশ্যে ছোটো একটা আদেশ বাক্য ছুঁড়ে মারল,
– এটা কখনো খুলবেন না।
_
আব্বু, আম্মু আমি ডুবে যাচ্ছি। আমাকে ধরো। আপু তুম…তুমি….
অস্পষ্ট শব্দে আভিরা ধড়ফড়িয়ে ওঠে। বুঝার চেষ্টা করল কী হচ্ছে। পাশ ফিরে দেখল, তাযীম ঘুমের ঘোরে ছটফট করছে। আভিরা চট জলদি ভাইকে বুকে টেনে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– এই তো আমি। কী হয়েছে সোনা? কাঁদছিস কেন? দেখ বোন আছে।
জবাব এলো না। ছেলেটা আধো আধো চোখ মেলে ফের দু চোখের পাতা বন্ধ করে নেয়। আভিরা ফুঁপিয়ে উঠল। ভয় পাচ্ছে সে। চোখ খুলে আবার বন্ধ করে ফেলল কেন? দিগ্বিদিক হয়ে নাওয়াজকে ডেকে তুলল।
– শুনছেন, একটু উঠবেন।
আভিরাকে কাঁদতে দেখে নাওয়াজ তড়াক করে উঠে বসে।
তড়িঘড়ি করে শুধায়,
– কী হলো? কাঁদছেন কেন?
– দেখুন ও কাঁদছে।
নাওয়াজ দেখল তাযীম বিড়বিড় করে কী যেন বলে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ তার। তবে সেই বন্ধ চোখ থেকে অবিরাম ধারায় গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল।
– আমার কাছে দিন। খারাপ স্বপ্ন দেখেছে, তাই এমন করছে। কাঁদবেন না। দুজন একসাথে কান্না করলে আমি কাকে রেখে কাকে সামাল দেবো। কান্না বন্ধ করে উঠে আসুন।
নাওয়াজ তাযীমকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বারান্দার দরজা খুলে কাউচে গিয়ে বসে।
– দেখুন ঘুমিয়ে গিয়েছে। কিছু সময়ের জন্য জেগে ছিল। কাল দুপুরের আগে আর উঠবে না। ঔষধের প্রভাবে এত ঘুম। এখনও উঠার কথা ছিল না। তাই খানিকক্ষণ জেগে আবার ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে। ভাই উঠছে না দেখে তখন আবার কাঁদতে বসবেন না।
আভিরার জবাব না পেয়ে নাওয়াজ চোখ তুলে তাকায়। মেয়েটা নিঃশব্দে কেঁদে চলেছে, চোখ দুটো রক্ত লাল।
একবার তার কারণে ঘুম ভাঙল। এখন আবার তাযীমের কারণে। নাওয়াজ তপ্ত শ্বাস ফেলে। এভাবে হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভাঙলে চোখ তো লাল হবেই। তাছাড়া হুট করে ঘুম ভাঙলে মানুষের মস্তিষ্কেও বিরাট চাপ পড়ে।
– ঘুমাবেন চলুন।
– ঘুমাব না, ওকে আমার কাছে দিন।
– আপনার ঘুমানো দরকার। এমনিতেই দু দুবার ঘুম ভেঙেছে। সারাদিন এত ধকল গেল। এখন না ঘুমালে অসুস্থ হয়ে যাবেন।
– আমি যাব না, বললাম তো ওকে দিন আমার কাছে। দিচ্ছেন না কেন?
ফের মেয়েটা ফুঁপিয়ে ওঠে।
– কথা শুনুন। ঘুমাতে যান।
– যাব না আমি, বলছি তো যাব না। ওকে দিন।
নাওয়াজ খানিকটা কঠিন স্বরে বলল,
– ও ঘুমাচ্ছে। ওকে নিয়ে এখন কী করবেন, ঘুমাতে যান।নয়তো ওকে এখন বর্ণার কাছে দিয়ে আসব। জেদ করবেন না। অকারণে জেদ করা আমার পছন্দ না।
– আমি অকারণে জেদ করছি। এটাকে আপনার কাছে জেদ মনে হচ্ছে। আপনি ব্যাপারটা তুচ্ছ করে দেখছেন। দিয়ে আসুন ওকে আপুর কাছে, লাগবে না।
আভিরা দৌড়ে রুমে চলে গেল। মেয়েটা কাঁদছে তাতে যেন মোটেও খারাপ লাগল না নাওয়াজের। সে ইচ্ছে করেই এমন কথা বলেছে। নয়তো এ মেয়েকে সে চিনে। হাজার বলে কয়েও এখান থেকে সরানো যেত না। বাকি রাত ভাইকে নিয়ে কাটিয়ে দিবে, ঘুমাতে যাবে না আর। তবে এ মেয়ে যে এমন জেদ করতে জানে তা জানা ছিল না নাওয়াজের।
_
মাহিরা ঢুলুঢুলু পায়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। কাল রাতে এসে যে শুয়েছে আর উঠেনি, সবে ঘুম ভাঙল। মাহিরা কাল এসেই সোজা রুমে ঢুকেছে। ওসব ঝুট ঝামেলায় যায়নি আর। লাবণ্যও যায়নি। তার মনে হয়েছে ঐখানে যাওয়ার চেয়ে লাবণ্যকে সঙ্গ দেওয়া ভালো। তবে সঙ্গ দেওয়া আর হলো কই। বিছানায় শুতেই ঘুম এসে শত্রুর ন্যায় হামলা চালায়। আর সেও পরাস্ত সৈনিকের মতো হার মেনে তলিয়ে গেল ঘুমের রাজ্যে।
পাশের জায়গাটা খালি। তাহলে কি লাবণ্য উঠে গিয়েছে?
বাহির থেকে হালকা চেঁচামেচির আওয়াজ কানে আসে।
মাহিরা ব্রাশ আর টুথপেস্ট নিয়ে নিচে গেল। ঘুমে শরীর টলছে। এখনও ঘুমের রেশ কাটেনি। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। মাহিরা এদিক ওদিক তাকিয়ে লাবণ্যকে খুঁজল। মেয়েটা নেই। রান্নাঘরে আছে নাকি। একবার গিয়ে দেখে আসবে। তার আর যাওয়া হলো না। ইয়াজমীনকে দেখে থেমে গেল। ইয়াজমীন এদিকেই আসছে। মাহিরাকে দেখে ইয়াজমীনের মায়াভরা মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মাহিরার কেন জানি ইয়াজমীনকে বেশ লাগে। হয়তো এই হাসির জন্যই।
– উঠে গেলে?
– জি আন্টি।
– লাবণ্যটা কোথায়? কাল রাতে এসে যে রুমে গেল বের হওয়ার নাম নেই। এখনও ঘুমে নাকি। এত বেলা পর্যন্ত তো মেয়েটা ঘুমায় না। আমার গিয়ে দেখে আসা উচিত ছিল। হাতের কাজ সামলে যাওয়ার সুযোগ পেলাম কই। তুমি একটু ওকে ডেকে দাও তো।
– ও উঠেনি এখনও। রুমে নেই। আমি আরও ভাবলাম হয়তো নিচে আছে।
ইয়াজমীনকে চিন্তিত দেখাল। কয়েক দিন ধরে খেয়াল করছে, লাবণ্যর হাবভাব কেমন ভালো ঠেকছে না তার কাছে। জিজ্ঞেস করবে করবে ভেবেও কাজের ব্যস্ততায় আর জানা হয়নি।
মাহিরার কপালেও ভাঁজ পড়ে। মেয়েটা রুমে থাকলে তো তার চোখে পড়ত। অবশ্য সে তো ঠিকমতো খেয়াল না করেই নিচে নেমে এসেছে। মাহিরা ভাবল হয়তো উপরে কোথাও আছে। তার নজরে পড়েনি। মাহিরা সামান্য হেসে বলল,
– আমি দেখছি আন্টি। রুমেই হয়তো আছে। আপনি দাঁড়ান। আমি দেখে আসি।
– আচ্ছা যাও। ওকে বলো আমার সাথে যেন দেখা করে।
– আচ্ছা বলব। আপনি চিন্তা করবেন না।
হঠাৎ কিছু চোখে পড়তেই মাহিরার পা দুটো থেমে গেল।
এ দৃশ্য দেখবে কল্পনাও করেনি। দু হাতে মুখ চেপে ধরল মেয়েটা। লাবণ্য অচেতন হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে আছে।

