প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_২৩

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_২৩
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

আভিরা নাওয়াজের পাঞ্জাবির উপরের একটা বোতাম খোলা রেখে পরপর থাকা বাকি তিনটা বোতাম লাগিয়ে দিল। ইতোমধ্যে নাওয়াজ পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিয়েছে।
নাওয়াজ দেখল মেয়েটার চোখে কাজল ছাড়া আর কিছুই নেই। ঠোঁটে শুধু হালকা লিপগ্লস।

মেয়েরা তো সাজগোজ পছন্দ করে। সাজের বেলায় তারা বেশ সচেতন। সবসময় চায় তাকে যেন আর দশজনের থেকে ভিন্ন লাগে। গর্জিয়াস লুকে নিজেকে সকলের সামনে প্রেজেন্ট করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। তাহলে এ মেয়ে এমন কেন? নিজেকে একটু সাজালে কী হয়?
সাজলে যে এ মেয়েকে ভয়ঙ্কর সুন্দর লাগে তা হয়তো জানে না। জানলে নিশ্চয় নিজেকে সাজাতে এমন কার্পণ্য করত না।

জুয়েলারি বক্সটাও টেবিলে পড়ে আছে। কান, গলা খালি রেখেই কী মেয়েটা নিচে যাবে।‌ নাওয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সব দেখছি তাকেই করে দিতে হবে। টেবিলে থাকা জুয়েলারি বক্স থেকে ভারী একটা নেকলেস বের করে নিজ দায়িত্বে আভিরাকে পরিয়ে দেয়। আভিরাকে বাধা দেওয়ার সুযোগ দিল না।

নেকলেস পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু তাই বলে এমন ভারী ঝুমকা কানে দিবে কেমন করে? মেয়েটা কানে রিং জাতীয় কিছু পরে থাকতে পারে না। এমনি ঠিক থাকলেও বালিশে মাথা ঠেকাতে কানের ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। রোজ রোজ যাতে ভোগান্তি পোহাতে না হয় সেজন্য‌ রিং এর পরিবর্তে দু কানে চিকন কাঠি পরে থাকত। নয়তো কিছু না পরলে দেখা যাবে দুদিনে কানের ছিদ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বিয়ে উপলক্ষ্যে কাল ভারী ইয়ার রিং পরতে হয়েছে। সেই ব্যথা এখনও রয়ে গিয়েছে। আজকে আবার পরলে বোধ হয় তার কান ছিঁড়ে যাবে।

আভিরাকে ভাবনায় মত্ত থাকতে দেখে নাওয়াজ শুধাল,
– কোন সমস্যা?

– না, মানে… আসলে…

– কী হয়েছে?

– এসব ঝুমকা না পরলে হয় না?

– কান খালি থাকলে ভালো দেখাবে না। পরে নিন।

আভিরা হাত বাড়িয়ে ঝুমকা দুটো নিল। দেখতে যতটা ভারী লাগছে পরার পর ততটাও ভারী লাগেনি।

নাওয়াজ হাত ঘড়ি পরতে পরতে বলল,
– চুল কী ছেড়ে রাখবেন?

– বুঝতে পারছি না।

– ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে খোঁপা করে নিলে বোধ হয় ভালো দেখাবে।

আভিরা চুল আঁচড়ে খোঁপা করে নিল। একটু আলগা করে খোঁপা বেঁধেছে। এক হাতে চারটা মোটা বালা আর অন্য হাতে একটা ব্রেসলেট পরে নিয়ে বলল,
– আমার হয়ে গিয়েছে, চলুন।

– হয়নি।

বলে নাওয়াজ শাড়ির আঁচলটা মাথায় তুলে দিয়ে বলল,
– এবার ঠিক আছে। একদম বউ বউ লাগছে।

আভিরা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে নেয়। কী বউ বউ করছে লোকটা। বের হতে গিয়েও নাওয়াজকে থেমে যেতে দেখে আভিরা বলল,
– যাবেন না?

– সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজটাই তো করা হলো না। সে কাজ না করে নিচে যাই কি করে।

আভিরা বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করল,
– কী কাজ?

নাওয়াজ জবাব না দিয়ে মৃদু হাসল। হাসি বিদ্যমান রেখেই মেয়েটার কপালে নিজের পুরু ঠোঁটের স্পর্শ এঁকে দেয়।
ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,
– কারো নজর না লাগুক।

আভিরা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে। নজর না লাগার জন্য কেউ চুমু খায় বুঝি। তাযীম যখন হলো মাকে দেখত ভাইয়ের কপালের এক পাশে কাজলের কৌটা থেকে কাজল নিয়ে গোল বৃত্তের মতো প্রলেপ লাগিয়ে রাখে।
তখন সে অবুঝের ন্যায় শুধাত,
– এটা দিলে কী হয় মা?

– এটা দিলে ভাইয়ের উপর কারো নজর লাগবে না।

– বাচ্চাদের নজর দিবে কেন? বাচ্চারা তো আদরের জিনিস।

– ভালো খারাপ মিলিয়েই এ দুনিয়া। দুনিয়াতে যেমন ভালো মানুষ আছে তেমন খারাপ মানুষও বিদ্যমান। এমন অনেকে আছে যাদের অন্যের ভালো সহ্য হয় না। সে যা পায়নি অন্য কেউ কেন পাবে। হিংসাত্মক মনোভাবের কারণে তারা নজর দেয়। শুধু বাচ্চাদের না বড়োদেরও নজর লাগে। মানুষের নজর সব থেকে খারাপ জিনিস। একজন মানুষের খারাপ নজর যে কারো ক্ষতি সাধনের জন্য যথেষ্ট।

– কাজল দিলে নজর থেকে রক্ষা পাওয়া যায়?

মেয়ের এমন আগ্রহ দেখে আনেসা হেসে বলল,
– তা তো জানা নেই। তবে নজর থেকে রক্ষার জন্য কাজল দেওয়া হয়। আমাদের সমাজে আগে থেকে এর চল রয়েছে। কাজল দিলে নাকি কারো নজর লাগে না। তারা এমনটাই বিশ্বাস করে। ছোটো থাকতে মা, চাচিকে এমন করতে দেখে এসেছি। এখন আমিও তাই করছি। মানুষ ছোটো থেকে যা দেখে আসে তাই করে। দেখবি ভবিষ্যৎ এ আমার দেখাদেখি তুইও এমনটা করবি। কাজল দেওয়ার ব্যাপারটা বলতে গেলে একপ্রকার বিশ্বাস থেকে করে। নয়তো অন্যদের দেখে। এর দ্বারা নজর থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে কিনা তা সঠিক বলতে পারব না।

– তাহলে আমাকেও লাগিয়ে দাও।

আনেসা হাসতে হাসতে মেয়ের কপালে কাজলের প্রলেপ লাগিয়ে দিত। সেই কাজলের প্রথা শেষ হয়ে চুমুর খাওয়ার রেওয়াজ কবে চালু হলো আভিরার জানা নেই। মাকে কী একবার জিজ্ঞেস করে দেখবে। যদি বলে এ কথা কেন জানতে চাইছে তখন কী বলবে, মা তোমার জামাই লোকেদের নজর থেকে বাঁচানোর জন্য কপালে চুমু খেয়েছে। ছিঃ, কী লজ্জা!

– এই যে, আপনাকে এত নজরকাড়া লাগছে তার পুরো ক্রেডিট কিন্তু আমার। এত সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আপনার কি উচিত না আমার ঠোঁটে ছোট্ট একটা চুমু খাওয়া।

রম্য হেসে বলল নাওয়াজ। আভিরা এক পলক চেয়ে চোখ খিঁচে নাওয়াজের ডান হাতের উল্টো পিঠে নিজের ওষ্ঠ ছোঁয়াল। নাওয়াজ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে বার কয়েক শ্বাস ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে তার শ্বাস প্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে। বাদামি চোখের মণি কেমন জ্বলে উঠল।

এতটুকু স্পর্শে, ঐ নরম ওষ্ঠের সামান্য ছোঁয়ায় যেন পুরুষটার রক্ত তীব্র বেগে তরান্বিত হয়। শিরা, উপশিরায় উষ্ণ রক্তের সঞ্চালন ঘটে। ক্রমশ ধাবিত হলো মরণাপন্ন দশায়।

নাওয়াজ নিজেকে সামলে জোরালো শ্বাস ছাড়ে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে দেখল রমণীর আনত মুখশ্রী কেমন রক্তিম আভায় ছেয়ে আছে। শাড়ির আঁচল দু হাতে অনবরত মুচড়ে চলেছে। যেন এ কেবল তার অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ।

এই মেয়ে পাগল হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন তাকে পাগল করার উপক্রম। ও তো এমনি চুমু দেওয়ার কথা বলেছিল। কারণ নাওয়াজ জানে আভিরা আর যাইহোক ওকে কখনো চুমু খাবে না। কিন্তু এ মেয়ে সত্যি চুমু খেয়ে বসবে জানলে এ কথা বলতে যেত না। প্রথমে শাড়ি তারপর চুমু। নাওয়াজ নিজের বিমূঢ় ভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না।

নাওয়াজ ভেবেছিল আভিরা লজ্জায় তার কাছেই আসবে না। এ মেয়ের লাজ ভাঙাতে গিয়ে আবার না তাকে বিপাকে পড়তে হয়‌। কিন্তু আজকে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না মেয়েটা তার সাথে এত সহজ কি করে হলো। চুমুর ব্যাপারটা না হয় মানা যায়। কিন্তু শাড়ি পরানোটা। ওর যেন এখনও সবকিছু অবিশ্বাস্য লাগছে।

_

লাবণ্য, বর্ণা টেবিলে বিভিন্ন পদের খাবার সাজাচ্ছে।
মাহিরাও বসে নেই। সেও হাতে হাতে সাহায্য করছে। যদিও তাদের কাজ না করলেও চলবে। কাজের জন্য আলাদা লোক রাখা হয়েছে। তবুও অনুষ্ঠান বাড়ি, কাজের কী শেষ আছে। একটার পর একটা কাজ লেগেই থাকে। হাত গুটিয়ে তো আর বসে থাকা যায় না। বাড়ির লোকেদের ডাইনিং এ খাওয়ানো হবে। তারই তোড়জোড় চলছে।

সিঁড়ির দিকে চোখ পড়তে লাবণ্যর চলতি পা থেমে গেল।
নাওয়াজ আর আভিরা নেমে আসছে। তার ধ্যান সেদিকে নেই। সে তো নাওয়াজের হাতের দিকে তাকিয়ে।
নাওয়াজের হাতের মুঠোয় আভিরার হাত। আভিরার পরনে অন্য শাড়ি দেখে লাবণ্যর বুক ধক করে উঠল। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। চোখ সরিয়ে কাজে মন দেয়। শুধু লাবণ্য কেন মাহিরাও যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকাল। আভিরা মেয়েটা দেখতে অসম্ভব সুন্দর। তা সে অস্বীকার করতে পারবে না। অন্তত আজ স্বচক্ষে এমন রূপ দেখার পর অস্বীকার করার মানে নেই। দুজনকে কী চমৎকার মানিয়েছে!

_

বাড়ির সব ছেলে আজ কাজে ব্যস্ত। মেয়েদের তুলনায় যেন ওদের খাটনি বেশি হচ্ছে। টেবিলে খাবার দেওয়া আবার এর ওর পাতে বেড়ে দেওয়া সবটাই নিজেরা করছে। সকালে সূর্যের প্রখরতা খুব বেশি না থাকলেও এখন রোদের উত্তাপ বেশ টের পাচ্ছে। সকলের অবস্থা নাজেহাল। তবুও কেউ থেমে নেই, সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে।

টেবিল ফাঁকা হতে না হতেই পুনরায় ভরে যাচ্ছে। দাওয়াতের বাইরেও লোক এসেছে। গ্রামে এ জিনিসটা বেশি হয়। অনুষ্ঠানের খবর পেলে লাইন ধরে মানুষ ছুটে আসে। যদিও বিয়ে বাড়িতে বিনা দাওয়াতে খুব একটা লোক খেতে যায় না। তবে চল্লিশা, জেফতে যেন লোকের ঢল নামে।

সকলেরই মনে হয়েছিল দাওয়াতের বাইরেও লোক আসতে পারে, হলোও তাই। সে হিসেব মতো বাড়িয়ে রান্নাও করা হয়েছে। কপাল ভালো খাবার কম পড়ার সম্ভাবনা নেই। নয়তো মানসম্মান যেত। বিয়ে বাড়ি হোক বা যেকোনো অনুষ্ঠান বাড়ি খাবারের ঘাটতি লজ্জাজনক ব্যাপার।

বাড়তি লোক আসার পরও কারো চোখ মুখে বিরক্তি নেই। বরং হাসিমুখে অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। সকলে খেয়াল রাখছে কেউ যেন অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে না যায়। দরকার পড়লে আবার রান্না চড়ানো হবে। সকলকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে খেয়েদেয়ে তারা তৃপ্ত।

অনেকে পেট পুরে খেয়েছে। কেউ আবার খাবার নষ্ট করেছে। বারবার বলা হয়েছে, দরকার পড়লে আবার দেওয়া হবে। তবুও অতিরিক্ত নিয়ে যেন কেউ খাবার নষ্ট না করে। কিন্তু তাদের কথা শুনলে তো। খেতে না পারলেও এক গাদা খাবার নিয়েছে, বাচ্চাদের পাতেও ঠেসে দিচ্ছে। সেই সুবাদে এত এত খাবার নষ্ট হয়েছে। কিছু কাজের মহিলা এঁটো খাবারগুলো কোমরে গুঁজে রাখা পলিথিনে পুরে নিচ্ছে। এ দিয়ে আরামসে তাদের তিন-চার দিন চলে যাবে। শুধু খাওয়ার আগে গরম করে নিলেই হবে। কেউ খেতে পায় না, কেউ আবার পেয়ে অযথা নষ্ট করে।

_

নাওয়াজ আভিরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– আপনি এখানে বসুন। আমি একটু বাহিরের দিকটা দেখে আসি।

আভিরা ঘাড় কাত করে সায় জানায়। নাওয়াজ বাইরে গিয়ে দেখল সকলের খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। কলপাড়ে দুজন মহিলা এঁটো বাসন কোসন ধুতে ব্যস্ত। বড়ো একটা স্টিলের বোলে সব বাসন একত্র করে সেগুলো ধুয়ে যাচ্ছে। বসে বসে লেজ নাড়তে থাকা কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করল। যেন তারা নালিশ জানাচ্ছে যে, তাদের ঠিকমতো খেতে দেওয়া হয়নি।

নাওয়াজ পা চালিয়ে মাহাদের কাছে গেল। মাহাদের ঘাড়ে হাত রেখে বলল,
– আর কতক্ষণ?

– এখনও দুটো টেবিল বাকি আছে।

মাহাদের কণ্ঠ শুনে বুঝা যাচ্ছে বেচারা কত ক্লান্ত! নাওয়াজ চাপা স্বরে বলল,
– তোরা যা, বাকিটা আমি সামলে নেব।

– মাথা খারাপ। দুটো টেবিলের জন্য তোর হাত লাগাতে হবে।
আমরা এতগুলো লোক কী জন্য আছি।

– দেখ মাহাদ, ঘেমে গেছিস। এখন যা।

মাহাদ নাওয়াজের দিকে একটা চেয়ার বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– এটাতে বসে থাক ভাই। আমাদের হয়ে গিয়েছে। বেশিক্ষণ লাগবে না।

বলে দ্রুত কেটে পড়ল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here