#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_২৫
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
পানের বাটা থেকে বেশ বড়োসড়ো একটা পান নিয়ে তাতে চুন, জর্দা, সুপারি দিয়ে বটে মুখে পুরে নিল। একজন পান বানিয়ে পাশে বসা বাকিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। রোজ রোজ যেন পান খাওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। পান না খেলে কেমন শরীর অসাড় অসাড় লাগে। দুপুরের খাবারের পর একটা হলেও পান মুখে পুরতে হবে। দাওয়াত খেয়ে উঠানে চেয়ার পেতে পাড়ার কয়েকজন মহিলা খোশ মেজাজে আসর বসিয়েছে। সকলের মুখে বেশি করে চুন, জর্দা দিয়ে বানানো পান ঠাসা।
এ কথা ও কথা বলতে বলতে একজন বলল,
– বুঝলাম না ঘরে মাইয়া রাইখা ইয়াজমীন এত ছোটো একখান মাইয়ারে পোলার বউ কইরা লইয়া আইলো।
ওনার কথার প্রেক্ষিতে মালেকা পানের পিক মাটিতে ফেলে বলল,
– কী যে কন না ভাবি। এতিম মাইয়ারে ঘরে রাখছে, পড়ালেখা করতে দিতাছে এই তো অনেক। তাই বইলা কী মাইয়ারে পোলার বউ করব?
– এতিম মেয়েকে ঘরে রেখে যেমন পড়ালেখা করতে দিতে পেরেছি তেমন ছেলের বউও করতে পারতাম। কিন্তু কী বলেন তো আপা, ছেলে আমার লাবণ্যকে বোনের নজরে দেখে। তাছাড়া ছেলের পছন্দ সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও মা হয়ে কি করে তার বিরুদ্ধে গিয়ে লাবণ্যর সাথে বিয়ে দেই।
হুট করে ইয়াজমীনকে দেখে ওনারা কিছুটা ভড়কে গেলেন।
ইয়াজমীন হয়তো তাদের বলা সব কথায় শুনে নিয়েছে।
সকলে একটু হাসার চেষ্টা করল।
– আরে ইয়াজমীন, তুমি কখন আইলা? বসো।
– না আপা, আমার কাজ আছে। আপনারা কথা বলেন।
– আরে কাজ পরে করতে পারবা, আগে বসো।
বলে জোর করেই ইয়াজমীনকে বসিয়ে দিল। মালেকা বুঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
– তুমি ভুল বুঝতাছো। আমরা অমনভাবে কইবার চাই নাই।
– ভুল বুঝার কিছু নেই আপা, আপনাদের ভুল ধরিয়ে দিলাম। ধরেন ছেলে বিয়ে দেওয়ার পর তাদের বনিবনা হলো না। মাঝ পথে যখন তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরবে, ছাড়াছাড়ি হবে তখন কিন্তু আপনারাই আমার দিকে আঙুল তুলবেন। আমাকে কটূ কথা শোনাতে ছাড়বেন না। বলবেন, দেখো মেয়ে এতিম বলে ইয়াজমীন ছেলের ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছে। এখন আবার ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে দ্বিধা করছে না। এতিম না হলে কি মেয়েটার সাথে এমন অন্যায় করতে পারত।
ওনার কথায় সকলে চুপসে গেল। ইয়াজমীন যে মুখের উপর এসব বলে বসবে তা তারা ভাবেনি। পাশ থেকে কুলসুম বলল,
– আরে আপা ওনাদের কথা বাদ দেন। তবে যাই বলেন না কেন, মেয়ের বয়স কিন্তু থেমে নেই। লাবণ্যর বিয়ের বিষয়ে কিছু ভেবেছেন। মেয়ের যেহেতু চার কুলে আপনি ছাড়া কেউ নেই। তাই তার বিয়ের দায়ভারও কিন্তু আপনার। আমার কাছে একটা ভালো প্রস্তাব আছে। আমার বাপের বাড়ির চেয়ারম্যানের ছেলের বউয়ের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মাইয়া ভালো পড়ে নাই বুঝলেন।
সকলে আগ্রহের সহিত জানতে চাইল,
– কও কী কুলসুম?
– তই আর কী কইতাছি। দুই দিন আগে এর লাইগাই বাপের বাড়ি যাওন লাগছে। চেয়ারম্যান সাব ছেলের লাইগা একটা ভালো মাইয়া খুঁজতাছে।
একটু থেমে ইয়াজমীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– আপনি যদি কন লাবণ্যর লাইগা কথা কইয়া দেখতে পারি।
কোনোকিছু দেওন লাগব না। ছেলের বাপের অনেক টাকা।মাইয়া দিলেই চলব। এক্কেবারে রাণীর হালে থাকব লাবণ্য।
ইয়াজমীন সামান্য হেসে বলল,
– কিছু মনে করবেন না আপা। মেয়ে আমার ফেলনা না। তাকে বিয়ে দিলে খালি হাতে পাঠাব না। যেহেতু মেয়ের চার কুলে আমি ছাড়া আর কেউ নেই তাই মেয়ের বিয়ে দিলে দেখেশুনেই দিব। তাছাড়া এখন বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছি না। এ বছর গেলে তো মাস্টার্স শেষ হবে। তারপর না হয় কিছু একটা চিন্তা করব।
– তা তো দিবেন। তবে ছেলের বাড়ির কোনো চাহিদা নেই।তাই বললাম আরকি। আর পড়ালেখা নিয়া চিন্তা করবেন না। ওরা বউরে পড়তে দিব। আমি নিশ্চয় খারাপ সম্বন্ধ আনব না। লাবণ্য তো আমার মেয়ের মতোই।
– মেয়ের কথা বলে ভালো করলেন। আমি যত দূর জানি আপনার ঘরেও বিয়ের বয়সী মেয়ে আছে। এত ভালো সম্বন্ধ হাতছাড়া না করে আপনার মেয়ের জন্য রাজি হয়ে যান।
– তা কী করে হয়, আমি তো লাবণ্যর জন্য…
– কেন হয় না আপা? ভেবে দেখেন প্রস্তাবটা কিন্তু খারাপ না। আপনার মেয়ে রাজরাণী হয়ে থাকবে।
বলে আর এক মুহূর্তও বসে রইল না। উঠে চলে গেলেন।
ইয়াজমীন উঠে যেতেই ওনারা মুখ বেঁকায়। কুলসুম রাগে রি রি করতে করতে বলল,
– ভাব দেখলে? কেমনে ঘুরাইয়া আমার মাইয়ার কথা আনল। আমার মাইয়ার কী বাপ মা নাই যে বিয়াইত্তা পোলার লগে বিয়া দিমু। নেহাত ভালোর লাইগা কইলাম। অমনি দেমাগ দেহাইল। আমিও দেখমু এ এতিম মাইয়ার লাইগা এর চে ভালা সম্বন্ধ কই পায়।
ইয়াজমীন তপ্ত শ্বাস ফেলে। ঘরে বসে ভালো লাগছিল না বিধায় ভাবল একটু বাইরে বের হওয়া যাক। তবে এখানে এসে এসব কথা শুনতে হবে জানলে ঘর থেকেই বের হতো না। কিছু মানুষের যেন অন্যের ঘরের বিষয় নিয়ে কথা বলা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। অযথাই উৎ পেতে থাকে কার ঘরের কোন বিষয় নিয়ে হিল্লি উড়ানো যায়।
লাবণ্যকে নিয়ে যে তিনি ভাবেননি তা না। কয়েকবার এমন কথা তারও মাথায় এসেছিল। মেয়েটাকে নিজের কাছে রেখে দিলে কেমন হয়। কত বছর ধরে তার কাছে আছে। না জানি অন্যের ঘরে গিয়ে কেমন থাকবে। তার চেয়ে নিজের ঘরে রেখে দিলে তিনি অন্তত মেয়েটাকে সারাক্ষণ চোখের সামনে দেখে নিশ্চিন্তে থাকবেন। মেয়েটা তার ভালো আছে তো? এমন চিন্তায় অস্থির হতে হবে না তাকে। ভেবেছিলেন এ বিষয়ে ছেলেকে বলে দেখবে। কিন্তু বছর কয়েক আগে ছেলের মনোভাব জানতে পেরে এ চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে।
_
– এখানে কী করছ তোমরা? খাবে না?
– দেখছ না?
জিদানের কথায় বুশরা খানিকটা বিরক্ত হলো। তার ভাইকে দেখো সে যে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছে সে খেয়াল আছে। সে তো অন্য খেয়ালে মত্ত। বুশরা তিরিক্ষি মেজাজে বলল,
– তা তো দেখছি। মেয়েদের পিছনে ঘুরঘুর করছেন।
বর্ণা বুশরাকে বলেছে যাতে জিদান, বর্ণকে গিয়ে বলে খেতে যেতে। ছেলে দুটো সেই সকালে খেয়েছে। তারপর আর খাওয়ার সুযোগ করে উঠতে পারেনি। শুধু ওরা দুজন কেন। বাড়ির কারোরই আজ সময়মতো পেটে খাবার পড়েনি। মাহাদ, জিদান আর বর্ণকে অনেক আগেই কাজ থেকে নিস্তার দিয়েছে। বাড়ির মেহমান ওরা। এখানে এসেছে বিয়ে উপলক্ষ্যে। আর এসে কিনা খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে কাজ করছে। তাই মাহাদ একপ্রকার ধমকে ওদের দুজনকে খেতে পাঠিয়েছে। ছোটোদের খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে পরে বড়োদের পালা। সকলে উপস্থিত থাকলেও বর্ণ, জিদানের খোঁজ নেই। তাই বর্ণা বুশরাকে ওদের খুঁজতে পাঠিয়েছে। বর্ণা বলার পরপরই বুশরা সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে এদের খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও পায়নি। শেষে পুকুর পাড়ে দেখা মিলে। তবে এখানে এসে যা দেখল তাতে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। মেয়েদের পিছনে ঘুরছে জানলে খামোখা এদের খুঁজে বুশরা হয়রান হতো না।
জিহাদ ভয়ঙ্কর চোখে তাকাল বুশরার দিকে। যেন এ কথা বলে মেয়েটা বিশাল অপরাধ করেছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ঘুরঘুর করছি না, প্রেমে ফেলার চেষ্টা করছি।
বুশরা জিদানের চাহনিকে পাত্তা না দিয়ে দায়সারাভাবে বলল,
– এক ই তো হলো।
বুশরার এমন কথায় জিদান বলল,
– এক না, দুটো ভিন্ন সাবজেক্ট। ঘুরঘুর করা ছ্যাঁচড়াদের কাজ। আর কাউকে প্রেমে ফেলার চেষ্টা করা প্রেমিকদের কাজ। ছ্যাঁচড়া আর প্রেমিকের কাজ কখনো এক হতে পারে না।
বুশরা মুখ ভেংচায়। বুজে আসা স্বরে বিড়বিড়ায়, আসছে আমার প্রেমিক। যত্তসব ছ্যাঁচড়ের দল। মেয়ে দেখলেই ছোকছুকানি শুরু হয়ে যায়। এরা আবার নিজেকে প্রেমিক বলে দাবি করে। মেয়েটা মুখের উপর এমন কথা বলতে পারল না। শুধু বিড়বিড়িয়ে নিজের ক্ষোভ জানান দেয়। কথাগুলো যদি মুখের উপর বলা যেত। কিন্তু আফসোস আদৌতেও তার দ্বারা এসব বলা সম্ভব নয়। চোখ ঘুরিয়ে মেয়েগুলোকে একবার দেখল। চার পাঁচটা মেয়ে কী নিয়ে যেন নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে। এরা নিশ্চয় আশেপাশের কোনো বাড়ি থেকে এসেছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বয়সে জিদান, বর্ণের থেকে বছর কয়েক বড়ো হবে। পিছনে ঘোরার জন্য কী আর মেয়ে পেল না। এত এত মেয়ে রেখে শেষে কিনা এদের পিছনে ঘুরছে।
বুশরা চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
– তাই বলে সিনিয়রদের পিছনে ঘুরতে হবে?
– প্রেম করলে সিনিয়র জুনিয়র দেখতে নেই মেয়ে। তাছাড়া আমাদের জন্য সিনিয়র মেয়েরাই ঠিক আছে। ও তুমি বুঝবে না।
বুশরা জিদানকে ব্যঙ্গ করে বলল,
– এ্যা আসছে, ও তুমি বুঝবে না। বুঝব না কেন? অবশ্যই বুঝব। এই বুশরা বুঝে না এমন কিছু নেই বুঝলেন?
জিদান ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল,
– তা কী বুঝলে?
বুশরা কিছু বলবে তার আগেই সেখানে জ্যোতি এসে উপস্থিত হয়। মেয়েটা হাঁপিয়ে গিয়েছে। এত ভারী লেহেঙ্গা পরে হাঁটা যায়। তার উপর হাই হিল পরেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
– কী এত কথা বলছ তোমরা? ভিতরে চলো। সবাই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
হঠাৎ করে জিদান বোনকে ধমকে উঠল,
– এই তোকে না বলেছি সবসময় ফোন হাতে নিয়ে ঘুরবি না। সারাক্ষণ ফোনে কী কাজ তোর? আজকের পর যদি তোর হাতে আর কখনো ফোন দেখি তাহলে ওটাকে আছড়ে ভাঙতে দু মিনিটও লাগবে না।
বলেই হনহনিয়ে চলে গেল। জ্যোতি বোকার মতো ভাইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কী বলল আর তার ভাই কী নিয়ে ধমকিয়ে গেল। সে কী এখন ফোন হাতে নিয়ে বসে আছে নাকি। আশ্চর্য! হুট করে এমন ধমকানোর কারণ খুঁজে পেল না। তবে জ্যোতি না বুঝলেও বুশরার বুঝতে বাকি রইল না, পরোক্ষভাবে তার রাগ জ্যোতির উপর দেখিয়েছে।
_
খাবার টেবিলে বসে আছে সবাই। হরেক রকমের খাবার সাজানো টেবিল জুড়ে। কেমন একটা রমরমা ভাব। কত ধরনের খাবার চোখে পড়ছে। এত খাবার দেখে কোনটা রেখে কোনটা খাবে কেউ বুঝে উঠতে পারছে না। ওদের এভাবে বসে থাকতে দেখে বর্ণা বলল,
– কী হলো? তোদের কী এখন বেড়ে দিতে হবে?
বুশরা ঠোঁট উল্টে বলল,
– কোনটা আগে খাব?
বর্ণা বোনের অহেতুক কথায় রেগে বলল,
– আমার মাথা খা।
পাশে সৌভিক বসেছিল। বর্ণার কথা কানে যেতে বলে উঠল,
– সে তো রোজ তুমি আমার মাথা খাও।
বর্ণা কঠিন চোখে তাকাল সৌভিকের দিকে। মুখে কিছু না বলে চোখ দিয়ে শাসায়। বর্ণার অমন চাহনিতে সৌভিক হিমশিম খায়। সে যেন বুঝল ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে। এ কথা বলে মোটেও ঠিক করেনি। আজ ধারের কাছেও ঘেঁষতে দিবে কিনা সন্দেহ। অসহায় চোখে তাকাল বর্ণার দিকে। সেও নিজের চাহনি দিয়ে বুঝাল এমন আর করবে না।
সৌভিকের অবস্থা দেখে সবাই একজোটে হেসে উঠলেও বর্ণার রাগান্বিত মুখশ্রী দেখে সকলে হাসি বন্ধ করে খাওয়ায় মনোযোগী হয়।
_
ছাদে মাদুর পেতে সকলে বসে আছে। আজ রাতটা জেগে পার করে দিবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। মেয়েরা এক পাশে আর অন্য পাশে ছেলেরা। সকলের হাতে পেপসি আর সেভেন আপ এর মিনি সাইজের বোতল। আসর প্রায় জমে উঠেছে। সাথে গরম গরম সিঙাড়া, সমোচা তো আছেই।
জিদান আর বুশরা ঝগড়া লেগে গিয়েছে প্রায়। বুশরার পাকা গুটি জিদান খেয়ে দিয়েছে। আরেকটু হলে মেয়েটা গুটি চালান করে দিত। জিদানের জন্য তা হলো না।
বুশরার রাগে দুঃখে কান্না আসে। ভাবল উঠে চলে যাবে। খেলবে না এদের সাথে। পরমুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে নেয়। যতক্ষণ না জিদানকে হারাতে পারছে ততক্ষণ সে খেলা ছেড়ে যাবে না।
– একটা ছয়, আল্লাহ একটা ছয়।
জ্যোতি বিড়বিড় করে একটা ছয় চেয়ে যাচ্ছে। যেখানে সকলের গুটি পেকে যাচ্ছে সেখানে ও একটা ছয়ের জন্য গুটি চালতে পারছে না। তার সবগুলো গুটি পড়ে রয়েছে। যতবার ভাবছে এই ছয় উঠল বলে ততবার কানা উঠছে।
– কিরে তোদের কত দূর? এখানে সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খাবি না?
ডাক শোনা মাত্র জ্যোতি হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ায়।জ্যোতিকে এভাবে খেলা ছেড়ে উঠতে দেখে বর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
– কোথায় যাচ্ছ?
– ওই আপনার আপু ডাকছে।
– তা তো শুনেছি। তাই বলে খেলা ছেড়ে উঠে যাবে। আগে শেষ করো।
– আমি আর খেলব না।
বর্ণ বিদ্রুপ হেসে বলল,
– তাহলে হার মেনে নিচ্ছো?
বর্ণের এমন হাসি দেখে গা জ্বলে উঠল জ্যোতির। তবুও কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে গেল। এখানে হার মানার কথা উঠছে কেন? সে হার কিছুতেই স্বীকার করবে না। তার তো ছয় ওঠেনি। খেলা এগোবে কেমন করে। ছয় উঠলে ঠিক একটা সময় জিতে যেত। আজ যেন ওর ভাগ্যটাই মন্দ। একটা ছয় উঠলে কী হতো? ভেবে গরম সিঙাড়ায় কামড় বসায়।
– আহ্!
– আরে হলো কী?
– কী গরম!
বলেই জ্যোতি হা করে বার কয়েক শ্বাস ফেলল।
– ফুঁ দিয়ে খাবে না।
বর্ণের মুখবিবরে ফিচেল হাসির দেখা মিলে। এক মনে বিড়বিড়ায়, খেলা ছেড়ে পালানোর সাজা।
_
– দেখ ভাই ঘুমাতে চল।
– বিয়ের পর বউ ছাড়া থাকা যে কত যন্ত্রণার তোরা তা বুঝবি না।
– তা তখন বউকে ওসব বলার সময় মনে ছিল না।
– আমি কী তখন জানতাম যে, সামান্য একটা কথায় রাগ করে অন্য ঘরে ঘুমাতে যাবে।
– আচ্ছা এখন ডাক দে। নয়তো আমি গেলাম। সকালে আমার ডিউটি আছে।
– দাঁড়া, তুই একটু ডেকে দে। আমার গলার আওয়াজ শুনলে জীবনেও দরজা খুলবে না।
মাহাদের এবার বিরক্ত লাগছে। এখন রাত প্রায় দুটো বাজে। সারা রাত জেগে পার করে দিবে বললে তো আর দেওয়া যায় না। কতক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর ঘুমে সকলের চোখ লেগে আসার উপক্রম। বউভাত উপলক্ষ্যে আজ সারাদিন সকলে কম দৌড়াদৌড়ি তো করেনি। রাত জাগা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কাল আবার আভিরাদের বাড়িতেও যেতে হবে। সব মিলিয়ে সবাই ছাদ থেকে নেমে ঘুমাতে চলে এলো। এসেই সব মেয়েরা এক রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ যে আটকাবে সে সুযোগটুকু পায়নি। কারো সমস্যা না হলেও সৌভিকের সমস্যা হচ্ছে। বউ ছাড়া তার ঘুম হবে না। সৌভিক ভেবেছিল বর্ণা হয়তো আজ রেগে তার সাথে কথায় বলবে না। কিন্তু তা না করে অন্য ঘরে থাকবে এটা যেন সে মানতে পারছে না।
মাহাদ সৌভিকের হাত টেনে বলল,
– চল এক রাত বউ ছাড়া থাকলে তেমন কিছু হবে না।
– বিয়ে কর তখন বুঝবি।
– তা না হয় তখন বুঝব, এখন চল। আধ ঘণ্টা ধরে তো দেখলাম একটা ডাক অবধি দিতে পারলি না। আবার বউ বউ করছিস। তোর তো রোজ বউ ছাড়া রাত কাটানো উচিত।
সৌভিক অসহায় চোখে বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। কেউ তার অবস্থাটা বুঝতে পারছে না। রুমে গিয়ে দেখল বর্ণ আর জিদান কী নিয়ে হাসাহাসি করছে। ওদের দেখে হাসি বন্ধ করে সে যার মতো শুয়ে পড়ে। সৌভিক বুঝল ওকে নিয়েই হাসাহাসি করছিল এতক্ষণ। রাগে ধুম করে বিছানার এক পাশে শুয়ে পড়ল। কতক্ষণ গড়াগড়ি খেয়েও যখন ঘুম এলো না মোবাইল হাতড়ে টাইপ করল, আ’ম সরি বউ। একটা কথার জন্য এভাবে নির্ঘুম রাত কাটানোর সাজা দিতে পারলে? নির্দয় মহিলা!
মেসেজ সিন করল। কিন্তু কোনো জবাব এলো না। ওদিকে জ্যোতি, বুশরা ফোনের দিকে তাকিয়ে হেসে কুটিকুটি। বর্ণা তো ঘুমিয়ে গিয়েছে। ফোন তাদের হাতে। ভাবল মজা নেওয়া যাক। পরে ভাবল থাক বেচারা এমনি বউয়ের শোকে কাত হয়ে আছে।
বিয়ের আগে এ মেয়েকে কত চড় থাপ্পড় মেরেছে সে হিসেব নেই। আর এখন দেখো এ মেয়ে তাকে রীতিমতো নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে। সকলের সামনে কীভাবে হেনস্তা করে চলেছে যেন তার দু পয়সারও দাম নেই। ছোটো ছোটো বাচ্চা ছেলেগুলোও তাকে নিয়ে মজা লুটতে ব্যস্ত। সৌভিক উঠে দাঁড়ায়। আজ এর একটা বিহিত না করলেই নয়।

