প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_২৬

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_২৬
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

পরপর তিনবার শব্দ হতে বুশরা দরজা খুলে দেয়। কিন্তু ঐ পাশের মানুষটাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। এত রাতে সৌভিক এখানে আসবে ও ভাবেনি। দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল,
– কোন দরকার ভাইয়া?

– হুম, তোমার আপু কই?

– আপু তো ঘুমাচ্ছে।

সৌভিক চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
– ঘুমাচ্ছে, আমার ঘুম হারাম করে এখন সে ঘুমাচ্ছে। দাঁড়াও ওর ঘুম বের করছি।

বুশরা জ্যোতি এক অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। কিছুই যেন বুঝল না তারা।

– এখানে দেখছ কী? যাও বারান্দায় যাও।

বুশরা অবাক হলো কিছুটা। সৌভিক আগে কখনো তার সাথে এমনভাবে কথা বলেনি। দেখে বুঝা যাচ্ছে বেশ রেগে আছে। ধমক খেয়ে সুরসুর করে ওরা দুজন বারান্দায় চলে গেল। বুশরা তো ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল তারা যে মেসেজ দেখেছে তা বুঝে হয়তো এখানে এসেছে। কিন্তু তা না। খানিকটা উঁকি দিয়ে দেখল সৌভিক ঘুমন্ত বর্ণাকে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

কায়দা করে দরজা আটকে ঠাস করে বর্ণাকে ফেলল বিছানায়। ধড়ফড়িয়ে উঠল বর্ণা। সৌভিকের দিকে চেয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
– হচ্ছেটা কী?

– কিছুই হয়নি, এখন হবে ।
বলে সৌভিক বর্ণার দিকে এগিয়ে গেল।

– কী করতে চাইছ?

– রোজ যা করি।

– একদম অসভ্যতামি করার চেষ্টা করবে না।

– বা রে এখানে অসভ্যতামির কী হলো? বউকে আদর করতে চাওয়াকে বুঝি অসভ্যতামি বলে।

– আমায় এখানে নিয়ে এসেছ কোন সাহসে?

– সাহসের কী দেখলে?

– দেখো সৌভিক, ভালো হচ্ছে না কিন্তু।

সৌভিক বর্ণাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে বলল,
– খারাপের দেখলেটা কী? কিছু বলি না দেখে বেশি বাড় বেড়ে গেছ, অন্য ঘরে থাকার কথা মাথায় আনলে কী করে? আবার বলছ এখানে নিয়ে এলাম কোন সাহসে?

বর্ণা এমন কথায় একটুও বিচলিত হলো না। সৌভিকের স্বভাব সম্পর্কে সে অবগত। লোকটা এই রেগে যায় তো এই শান্ত। বর্ণাকে চুপ করে থাকতে দেখে সৌভিক বলল,
– কী হলো? কথা বলছ না কেন?

– কী বলব?

– কি বলবে বুঝতে পারছ না?

– না।

– দেখো বর্ণা, মাথা গরম হয়ে আছে। উল্টা পাল্টা কথা বলে মেজাজ বিগড়ে দিবে না।

– আশ্চর্য! একে তো দুপুরে‌ ভরা মজলিসে ধুম করে একটা কথা বলে বসলে, এখন আবার বলে না কয়ে আমায় এ ঘরে নিয়ে এসে বলছ যেন মেজাজ বিগড়ে না দেই। মেজাজ বিগড়ানোর মতো কী করেছি? তুমি যা করেছ তাতে আমার মেজাজ দেখানোর কথা। উল্টো তুমি মেজাজ দেখাচ্ছ?

– তার জন্য কী আমাকে ভুগতে হয়নি? তোমার ভাই কত বড়ো বেয়াদব হয়েছে আমাকে নিয়ে মজা উড়ায়।

– একদম ভাই নিয়ে কথা বলবে না।

– বললে কী করবে?

বর্ণা কিছু না বলে উঠে যেতে নিলে সৌভিক বিছানায় চেপে ধরল ওকে। হিসহিসিয়ে বলল,
– এখান থেকে যেতে দেওয়ার জন্য তো তোমায় ও ঘর থেকে নিয়ে আসিনি।

বর্ণা দুর্বল কণ্ঠে বলল,
– তাহলে?

– আদর দেওয়ার জন্য।

বলেই বর্ণার গলায় মুখ গুঁজল। বর্ণা জমে যায়। বর্ণার অবস্থা বুঝে সৌভিক বলল,
– কী হলো? যাবে না? তখন তো খুব বলেছিলে কাছে আসতে দিবে না। এখন আসলাম যে, কিছু করতে পারলে কই।

বলেই আবার নাক ঘষল। বর্ণা জবাবে নীরব থাকে। ও তো রাগ করে ও ঘরে থাকতে যায়নি। তবে এমন পাগলামি করার মানে কী! বর্ণা হাসল। এ লোক জানে কীভাবে তাকে বশে আনতে হয়। ঠিক কোন জায়গায় ছুঁলে তাকে কাবু করা যাবে।

_

আভিরা না ডান দিকে ফিরতে পারছে আর না বাম দিকে। এভাবে সোজা হয়ে শুয়ে ঘুমানো যায়। আভিরাকে এমন এপাশ ওপাশ হতে দেখে নাওয়াজ গম্ভীর স্বরে বলল,
– কী সমস্যা?

– কানে ব্যথা করছে।

নাওয়াজ হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে গেলে মেয়েটা দূরে সরে গেল। খানিকটা চেঁচিয়ে বলল,
– ছুঁবেন না, ব্যথা পাব।

নাওয়াজ আলতো হাতে স্পর্শ করতে মেয়েটা মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে। নাওয়াজ ব্যতিবস্ত হয়ে শুধাল,
– খুব বেশি ব্যথা করছে?

আভিরা অস্ফুটে হু বলে।

– হঠাৎ কী কারণে?

– হঠাৎ না তো, সারাদিন যে কানে ঝুমকা পরেছিলাম তাই।
রিং পরলে আগে থেকে এমন ব্যথা হয়।

নাওয়াজ গম্ভীর স্বরে বলল,
– সেজন্য দুপুরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, রিং না পরলে হবে কি না?

আভিরা এত গম্ভীর হয়ে কথা বলার কারণ বুঝল না। কী হলো? একটু আগে না কেমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মুহূর্তে আবার এমন গম্ভীর হয়ে গেল কেন? নাওয়াজ শব্দ করে নেমে ড্রয়ারে কিছু একটা খুঁজল। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরও যখন পেল না তখন মেজাজ খারাপ হলো তার। কোনোকিছু না বলে এক টানে মেয়েটাকে বুকের উপর ফেলে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বলল,
– আর কখনো যেন নিজের সুবিধা অসুবিধার কথা জানাতে ভুল না হয়।

– জি।

– ঘুমান।

আভিরা পুনরায় নড়তে নাওয়াজ রাশভারী স্বরে বলল,
– আবার কী সমস্যা?

আভিরার লজ্জার চেয়ে অস্বস্তি বেশি হচ্ছে। অস্থির হয়ে উঠল নিমিষেই। এভাবে একটা পুরুষের সান্নিধ্যে যাওয়ায় হয়তো এত অস্থিরতা। যদিও লোকটা তার স্বামী, তবুও আভিরা কিছুটা শঙ্কিত। শরীর অসাড় হয়ে আসছে। স্পষ্ট কানে আসছে লোকটার হৃৎস্পন্দন। এভাবে লোকটার বুকে পড়ে থাকা অসম্ভব।

আভিরা বহু কষ্টে বলল,
– এভাবে আমি ঘুমাতে পারব না।

– পারবেন।

আভিরা আর কিছু বলল না। শক্ত হয়ে পড়ে রইল।

_

ঘুম ভাঙতে প্রথম দিনের মতো নিজেকে ঘরে একা পেল। তবে আজ বেশি বেলা হয়নি। ঘড়িতে সময় দেখল, সবে সাড়ে আটটা বাজে। তবুও যেন নতুন বউ হিসেবে অনেক দেরি। আভিরা চট জলদি উঠে বসল। বিছানা গুছিয়ে, ফ্রেশ হয়ে বাইরে পা বাড়ায় আভিরা। গায়ে তার রাতে পরে থাকা সেলোয়ার কামিজ। বর্ণা কাল বলে গিয়েছিল ঘুম ভাঙলে যেন কারো অপেক্ষায় বসে না থাকে। সকলে এ সময়টায় ব্যস্ত থাকবে। তাকে ডাকার কথা হয়তো মাথায় না ও থাকতে পারে। কেউ না এলে সে যেন ঘরে বসে না থেকে বাইরে যায়।

আভিরা ভাবল নিচে যাওয়ার আগে একবার তাযীমকে দেখে যাওয়া ভালো। ছেলেটা কাল অনেক কান্না করেছে। প্রথমে না বুঝলেও পরে যখন বুঝল সেই থেকে একই প্রশ্ন। তার মাথায় এমন ব্যান্ডেজ করা কেন? এখানে সে আর থাকবে না, বাড়ি চলে যাবে। তাকে যেন বাড়ি দিয়ে আসে।
কত কসরত করে তাকে বুঝাতে হলো এখন অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। এত রাতে যাওয়া সম্ভব না। তাযীম হয়তো বুঝল। রাজি হলো। তবে বলে দিয়েছে সকাল হতে সে চলে যাবে।

কাল রাতে ছাদ থেকে নেমে সবাই ঠিক করেছিল মেয়েরা এক রুমে আর অন্য রুমে ছেলেরা থাকবে। যদিও এক্সট্রা রুম খালি ছিল, তবুও তারা একসাথে থাকবে বলে ঠিক করে। আবার কবে দেখা হয় তা তো বলা যায় না। জেগে না হোক একসাথে রাতটা ঘুমিয়ে কাটাবে। তবে ব্যতিক্রম হলো আভিরা নাওয়াজের বেলায়। ওদেরকে একটা রুম ছেড়ে দিয়ে বাকিরা যে যার মতো ঘুমাতে গেল।

ভাইয়ের অবস্থা দেখে আভিরা তাযীমকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিল। তবে ওরা দেয়নি। নতুন বিবাহিত দম্পতি কই আলাদা সময় কাটাবে, তা না যেচে পড়ে ভাইকে সাথে রাখতে চাইছে। তাযীমকে দেখার জন্য অনেক লোক আছে। আভিরা আর কিছু বলেনি। প্রথম রাতটাও তাযীমকে নিয়ে ছিল। তাই বলে আজকেও ভাইকে নিয়ে থাকবে তা কি করে হয়। যদিও নাওয়াজের আপত্তি ছিল না। তবুও ব্যাপারটা ভালো দেখায় না।

আভিরার একটু অস্বস্তি হচ্ছে। যত যাইহোক এ ঘরে সৌভিক, মাহাদও আছে। সে এভাবে দরজা ঠেলে ভিতরে যেতে পারে না। একবার ভাবল না দেখে চলে যাবে। পরে ভাবল এতক্ষণে নিশ্চয় ওরা ঘুমে থাকবে না। এসেছে যখন না হয় দেখেই গেল। আভিরা দরজাটা একটু ফাঁকা করে দেখল না সৌভিক, মাহাদ এরা কেউই নেই। তার মানে ওরা উঠে পড়েছে। জিদান আর বর্ণের মাঝে হাত পা ছড়িয়ে তাযীম বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ওদের দেখে আভিরা আর ভিতরে গেল না। তাযীমের ঘুমের ঘোরে হাত পা ছোড়াছুড়ির অভ্যাস আছে। কাল রাতে নিশ্চয় তাযীমের জন্য ওদের ঠিকমতো ঘুম হয়নি।

_

আভিরা নিচে যেয়ে দেখল ইয়াজমীন আর লাবণ্য খাবার টেবিলে বসে আছে।‌ নিশ্চয় তার জন্য অপেক্ষা করছে।
আভিরা লজ্জা পেল। কত দেরি করে উঠেছে। ঐ লোক তাকে একটু ডেকে গেলেই পারে। না জানি সকলে কী ভাবছে। যদিও আপাতত ডাইনিং এ ইয়াজমীন, লাবণ্য ছাড়া আর কেউ নেই। আভিরা বর্ণাকে খুঁজল। আশেপাশে কোথাও দেখল না। হয়তো ঐ বাড়িতে গিয়েছে।

– আরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এদিকে এসো।

ইয়াজমীনের হাসিমাখা মুখ দেখে আভিরার অস্বস্তি যেন কিছুটা কমে এলো। নত মুখে গিয়ে বসল খাবার টেবিলে।

– নাও খাওয়া শুরু করো, তোমার জন্যই বসেছিলাম ।

আভিরা কিছু বলতে চাইল। তবে লাবণ্যর কথায় থেমে যায়।

– এরপর থেকে একটু তাড়াতাড়ি উঠার চেষ্টা করবে। খালা সেই কখন থেকে না খেয়ে তোমার অপেক্ষায় বসে আছে। সকালে নাস্তার পর ঔষধ খেতে হয়। সময়মতো ঔষধ না খেলে শরীর খারাপ করবে।

বলে একটু হাসার চেষ্টা করল। আভিরা দেখল এ হাসিটা যেন কেমন কৃত্রিম। জোর করে হাসা যাকে বলে।

– ওর কথা কানে নিও না তো। তোমার তাড়াতাড়ি উঠার কোনো দরকার নেই।

ইয়াজমীনের কথায় আভিরা দ্বিমত করে বলল,
– কোনো সমস্যা নেই মা। আমি এরপর থেকে এমন দেরি করব না।

নির্দ্বিধায় আভিরার এমন মা বলাতে ইয়াজমীন প্রসন্ন হাসলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here