#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_২৭
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
– তা ভাই আমায় শাড়ি পরাতে বলছ কেন? অপেক্ষা করো। তোমার বর এসে পরিয়ে দিবে।
পাশ থেকে বুশরা মুখ টিপে বলল,
– হ্যাঁ দেখলাম তো সব ম্যাচিং ম্যাচিং।
– ধ্যাত!
– আরে যা আমি কিছু বলেছি নাকি।
বলে বুশরা হাসতে লাগল। কাল নাওয়াজ আভিরার সাথে মিলিয়ে ম্যাচিং পাঞ্জাবি পরেছিল। কালকে ওরা ব্যস্ততায় মজা উড়াতে না পারলে কী, আজ সুযোগ পেয়ে ছাড়ল না।
– আচ্ছা যাও। তোমার সে তো নেই। আজকের মতো না হয় আমিই পরিয়ে দিলাম।
বর্ণার কথায় আভিরা কুণ্ঠায় মাথা নুইয়ে ফেলে। কালকের ঘটনা মাথায় আসতে রক্তাভ শূন্য হয়ে এলো মুখাবয়ব। সে কেমন করে কাল ঐ লোকের হাতে শাড়ি পরতে পারল। কাল তার কী হয়েছিল। এমন লাজহীন হতে পারল কী করে?
বর্ণা কয়েকটা শাড়ি বের করে বলল,
– কোন শাড়িটা পরবে দেখো।
আভিরা পিচ কালারের একটা কাতান শাড়ি বেছে নিল।
– ওয়াশরুমে যাওয়ার দরকার নেই। ব্লাউজ, পেটিকোট এখানে পরে নাও। আর চিন্তার কিছু নেই। তোমার দিকে কেউ তাকাবে না।
বর্ণা শাড়িটা হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলতে লাগল। ঘরে শুধু বর্ণা, জ্যোতি আর বুশরা। জ্যোতি ফোনে মগ্ন। আর বুশরা বাকি শাড়িগুলো আলমারিতে তুলে রাখছে। আভিরা এর মধ্যে ব্লাউজ, পেটিকোট পরে নেয়।
– এত উঁচু জুতা পরতে গেলে কেন, হাঁটতে পারবে তো?
– পারব আপু।
– পারলে তো হলোই। দেখো আবার পড়ে টড়ে যেও না। অনেক উঁচু জুতা কিন্তু। শাড়ি সামলে হাঁটতে অসুবিধা হবে। দেখে হাঁটবে।
– আচ্ছা।
আভিরা কালকের তুলনায় আরও আধ ইঞ্চি উচ্চতা বেশি জুতা পায়ে দিয়েছে। কাল উঁচু জুতা পরেও সে নাওয়াজের কাঁধ অবধি হয়নি। তাই আজ হাই হিল পরা। যদি লোকটার কাঁধ অবধি যেতে পারে সে আশায়।
আভিরা কানে বেশ হালকা রিং পরেছে। কান তো আর একেবারে ফাঁকা রাখা যায় না। তাই বেছে বেছে নিজের কেনা ইয়ার রিং কানে দিল। হোয়াইট এন্ড ব্লু কালারের মারাত্মক কম্বিনেশনের লীফস ইয়ার রিং দুটো আভিরার অনেক পছন্দের। কানে তেমন ব্যথা নেই। অনেকটা কমে গিয়েছে। তাই ইয়ার রিং দুটো কানে গলিয়ে নিল।
নাস্তা শেষ করার পর বর্ণা আভিরার হাতে ব্যথার ট্যাবলেট ধরিয়ে দেয়। এসব ট্যাবলেট স্যাবলেট দেখলেই আভিরার নিজেকে কেমন রোগী রোগী লাগে। খেতে না চাইলে বর্ণা একপ্রকার জোর করে খাওয়ালো। নাওয়াজ তাকে বলে গিয়েছে আভিরার খাওয়া শেষ হতেই যেন ব্যথার ট্যাবলেট খেতে দেয়। মেয়েটা রাতে ব্যথায় ছটফট করেছে। যেহেতু সে আভিরার ঘুম থেকে উঠা অবধি থাকবে না সেজন্য বর্ণাকে বলে গেল। বর্ণা জোর করেই ট্যাবলেট খাওয়ায়। নয়তো নাওয়াজ পরে তাকে কথা শোনাবে।
ভেবেছিল রাতে ঘুম আসবে না। আভিরার একটা বদ স্বভাব আছে। তার উপর কেউ হাত পা রাখলে সে ঘুমাতে পারে না।
আর সেখানে কারো বুকের উপর গোটা রাত পার করা দুষ্কর! তবে সারা রাত ছটফট করলেও ভোরের দিকে চোখে ঘুম নেমে এলো।
_
ঘড়ির কাঁটা তিনটায় ঠেকল। আভিরা সেই কখন থেকে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। শুধু সে কেন? সকলে রেডি হয়ে নাওয়াজের অপেক্ষায় আছে। নাওয়াজ এলো ঠিক তিনটা পঁয়ত্রিশে। নাওয়াজকে দেখে বুঝা যাচ্ছে সে বেশ ক্লান্ত। আভিরা ভাবল এক গ্লাস লেবু পানি করে এনে দেবে। দু টুকরো লেবু চিপে তার রস বের করে পানিতে মিশিয়ে তার মধ্যে বরফ কুচি। অল্প একটু লবণ মিক্সড লেবু পানি যেন ক্লান্তি দূর করতে যথেষ্ট। আভিরা উঠতে যাবে তার আগেই দেখল লাবণ্য গ্লাস ভর্তি পানি নাওয়াজের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। নাওয়াজ এক নিমেষে পানিটা শেষ করে গটগট পায়ে হেঁটে উপরে চলে গেল।
ইয়াজমীন বুঝল ছেলে হয়তো কোনো কারণে রেগে আছে। নয়তো এমন আচরণ করত না। ইয়াজমীন আভিরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– আভিরা মা, যাও তো। একটু গিয়ে দেখো ছেলেটার কিছু লাগবে কিনা।
আভিরা যেন এ অপেক্ষায় ছিল। ইয়াজমীন বলতেই উপরে যেতে দেরি করে না সে।
নাওয়াজ গায়ের শার্টটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। আভিরা আলমারি থেকে নাওয়াজের শার্ট, প্যান্টের সাথে কী মনে করে যেন পাঞ্জাবিও বের করে। হ্যাঙ্গারে শাড়ির কালারের সাথে ম্যাচিং করা বেশ কয়েকটা পাঞ্জাবি ঝুলানো। আভিরা পিচ কালারের পাঞ্জাবিটা নিল।
নাওয়াজের পরনে শুধু একটা টাওয়াল। আভিরা তা দেখে নজর ফেরায় লোকটার উপর থেকে। মেয়েটার মুখশ্রী কিছুটা রক্তিম হয়ে আসে, লাজে রাঙা হলো মুখাবয়ব।
এভাবে কেউ বেরিয়ে আসে। সে যে ঘরে আছে এ লোক কী জানে না। পুরুষ মানুষ বলে কী এমনভাবে বেরিয়ে আসতে হবে।
নাওয়াজ এসে পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে নেয়। ভেজা চুল থেকে পড়তে থাকা পানিতে নাওয়াজের কাঁধের একাংশ ভিজে গিয়েছে। আভিরা তা দেখে রেগে গেল। কিছুটা তেতে বলল,
– চুল না মুছে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
নাওয়াজ একটু হাসল। আভিরার হাতে টাওয়াল ধরিয়ে দেওয়াতে আভিরা কয়েক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। তা দেখে নাওয়াজ বলল,
– কী হলো মুছে দিন?
– আমি…
– হ্যাঁ, আপনি।
– আপনি মুছে নিন, আমি খাবার নিয়ে আসছি।
নাওয়াজ আভিরার হাত ধরে বলল,
– আগে আমার চুল মুছে দিন। তারপর খাবার আনতে যাবেন।
আভিরা টাওয়াল হাতে নিয়ে দেখল সে নাওয়াজের মাথা স্পর্শ করতে পারছে না। আভিরা ভেবে পেল না সে কী এত বেশি খাটো যে আধ ইঞ্চি উঁচু জুতা পরেও লোকটার মাথা ছুঁতে পারছে না।
নাওয়াজ একটু ঝুঁকে বলল,
– নিন, এবার মুছে দিন।
দরজায় শব্দ হতে আভিরা তড়িঘড়ি করে সরে যায়। শাড়ির কোণায় পা বেঁধে পরতে নিলে নাওয়াজ ধরে ফেলে।
– এখনই তো পড়ে যেতেন। এমন করার কী আছে? লাবণ্য এসেছে হয়তো, দাঁড়ান।
বলে নাওয়াজ ভিড়িয়ে থাকা দরজাটা খুলে দিল।
– এসো। অনুমতি নেওয়ার কী আছে?
– বা রে এখন কী আর আগের মতো যখন তখন তোমার রুমে আসা যাবে। তুমি কী আর একা আছো। নতুন বিয়ে করলে, প্রাইভেসির একটা ব্যাপার আছে না।
নাওয়াজ বিড়বিড় করে বলল,
– চার, পাঁচ বছর আমার রুমে আসার জন্য অনুমতি না নিলেও চলবে। এখন মনে হচ্ছে বিয়েটা চার বছর পরে হলেই বোধহয় ভালো হতো। চোখের সামনে জলজ্যান্ত বউ রেখে ছুঁতে না পারার জ্বালা সইতে হতো না…
লাবণ্য বুঝতে না পেরে বলল,
– কিছু বললে?
– না।
– আচ্ছা খেয়ে নাও।
লাবণ্য টেবিলে খাবার রেখে বেরিয়ে গেল। নাওয়াজ খেতে বসতে আভিরা জিজ্ঞেস করল,
– আজ এত দেরি হলো যে?
আভিরার কথা শুনে নাওয়াজ বিরক্তি নিয়ে তাকায়।
নাওয়াজের বারোটার মধ্যে চলে আসার কথা ছিল। বের হওয়ার সময় ওয়ার্ড বয় এসে জানায় ইমার্জেন্সি পেশেন্ট এসেছে। কোনো সিরিয়াল কাটা নেই। হুট করে এসে বলল ইমার্জেন্সি পেশেন্ট এসেছে। এখন পেশেন্ট দেখতে গেলে নিশ্চয় অনেক সময় চলে যাবে। বাড়িতে সকলে তার অপেক্ষায় আছে। নাওয়াজ পেশেন্ট দেখবে না জানাতে সিনিয়র ডক্টর বলে উঠে, সে নাকি কাজে হেলাফেলা করছে। ঠিকমতো নিজের দায়িত্ব পালন করছে না। অথচ বিয়ে উপলক্ষ্যে এক সপ্তাহের ছুটি নেওয়া সত্ত্বেও হসপিটাল থেকে তাকে কল দেওয়ায় বিয়ের পরেরদিন থেকে হসপিটালে ছুটেছে। আজও তাই করল। আর এখন কিনা শুনতে হচ্ছে সে তার দায়িত্বে গাফিলতি করছে। হসপিটালে এত এত ডাক্তার থাকতে তার প্রয়োজন কেন পড়ছে নাওয়াজ তাই বুঝল না। মেজাজ তখনই বিগড়ে গেল তার। তবুও ধৈর্য ধরে পেশেন্ট দেখে বাড়ি ফিরেছে। এ মেয়ে কিনা এখন জানতে চাইছে দেরি কেন হলো। নাওয়াজ নিজেকে সামলে বলল,
– একটু কাজ ছিল।
– ওহ।
নাওয়াজ এতক্ষণে আভিরাকে খেয়াল করল। আভিরা আজ একটু ভিন্ন সাজে সেজেছে। কাল তো চোখে কাজল দিয়েছিল। আজ চোখে কাজল নেই, মাশকারা দেওয়া। ঠোঁটের ভাঁজে লিপস্টিক। কানে পরা ইয়ার রিংও তার নজর এড়ায়নি।
– কানের ব্যথা কমেছে?
– জি।
– খেয়েছেন?
– হুম।
– কখন?
– অনেকক্ষণ হলো।
– নিন এখান থেকে দু লোকমা মুখে দিন।
– না, খাব না।
– কেন লিপস্টিক নষ্ট হওয়ার চান্স তো নেই? এখন একটা গাঢ় চুমু খেলেও আপনার লিপস্টিক নষ্ট হবে না।
নাওয়াজের বেফাঁস কথায় আভিরা কেশে উঠল। নাওয়াজ পানির গ্লাস আভিরার হাতে ধরিয়ে বলল,
– শুনেই এ অবস্থা, না জানি চুমু খেতে গেলে কী হবে!
লজ্জায় লাল হয়ে এলো আভিরার স্নিগ্ধসিক্ত মুখশ্রী।আঁটসাঁট হয়ে বসে রইল। নত হওয়া মুখ তুলে সামনে বসা মানুষটার দিকে তাকানোর প্রয়াস করে উঠতে পারল না। পুরুষ মানুষ বুঝি এত নির্লজ্জ হয়। কেমন নির্লজ্জের মতো কথা বলছে। লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে খাটে থাকা শার্ট নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
– কী করছেন?
আভিরা আমতা আমতা করে বলল,
– শার্টটা ধুয়ে দেই।
নাওয়াজ আভিরার হাত থেকে শার্ট নিয়ে বলল,
– লাগবে না, রেখে দিন। লাবণ্য করে নিবে।
– আপু আপনার জামাকাপড় ধুয়ে দেয়?
– না। আমার সব কাজ আম্মু করে। আম্মু ব্যস্ত থাকলে মাঝেমধ্যে লাবণ্য ধুয়ে দেয়। আপনি আসুন। শাড়ি পরে কোন আক্কেলে এখন কাপড় ধোয়ার কথা ভাবলেন।
লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে শার্ট নিলেও আভিরা ঠিকই ধুয়ে দিত। তবে নাওয়াজ ভুল বলেনি। শাড়ি পরে এখন শার্ট ধুয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। আভিরা ভাবল এরপর থেকে এ লোকের সব জামাকাপড় সে নিজে ধুয়ে দিবে।
_
– আরও দুটো দিন থেকে যেতে পারতে। তোমাদের ঠিক মতো আপ্যায়ন করতে পারলাম না।
বুশরা ইয়াজমীনের হাত ধরে বলল,
– এসব বলে লজ্জা দিবেন না আন্টি। যথেষ্ট আপ্যায়ন করা হয়েছে। বরং আমরা এসে আপনাদের বিপাকে ফেলে দিলাম।
– তাই বুঝি যাওয়ার জন্য এত তাড়াহুড়ো।
– সামনে আমার পরীক্ষা। আম্মু তো আসতে দিতেই চায়নি। অনেক কষ্ট করে আম্মুকে রাজি করাতে হয়েছে। এ তিন দিন যে থাকতে পেরেছি এই অনেক। পরীক্ষা শেষে আবার আসব।
বর্ণ, বুশরা আজ চলে যাবে। মাহাদ দিয়ে আসবে ওদের। বর্ণা যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ও চলে গেলে সৌভিক আর মাহাদকে অনেক অসুবিধায় পড়তে হবে। শাশুড়ি মা বাড়িতে নেই। উনি থাকলে হয়তো যেতে পারত। তাছাড়া সৌভিক আজ থেকে ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে। দুপুরের খাবার বাড়ি থেকে পাঠাতে হয়। বাইরের খাবার খেতে পারে না। তাই বর্ণা আর গেল না।
প্রথমে ভেবেছিল সৌভিক ওদের দিয়ে আসবে। পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো মাহাদ যাবে। একটু সুযোগ পেলে কর্মচারীরা কাজে ফাঁকি দেওয়া শুরু করে। এ কয়েক দিন ঠিকমতো কাজ হয়নি। সৌভিক কাজে না গেলে হয়তো আরও পেয়ে বসবে। মাহাদের যেহেতু হসপিটাল থেকে ছুটি নেওয়া আছে তাই মাহাদই যাবে।
লাবণ্যকে বলে কয়েও নাওয়াজদের সাথে পাঠানো সম্ভব হলো না, বর্ণাও যাবে না। মাহাদ বর্ণদের দিয়ে এসে যদি সময় পায় তখন ও বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে। তাই নাওয়াজ আর আভিরাকে যেতে হবে। সাথে জ্যোতি, জিদান তো আছেই।
নাওয়াজদের সাথে বর্ণরা বের হলো। জিদানের মনে হলো কেউ তাকে দেখছে। পিছন ফিরে দেখল যা ভাবছে তাই। একজোড়া চোখ তাকে গভীরভাবে দেখে চলেছে। জিদান ভাবল তার তাকানোতে মেয়েটা হয়তো থতমত খেয়ে চোখ সরিয়ে নিবে। কিন্তু না চোখ সরায়নি। জিদানও কী ভেবে যেন তাকিয়ে রইল। চোখ ফেরাল না, যতক্ষণ না গাড়িটা তার দৃষ্টিসীমার বাইরে যায়।

