#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৩৪
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
হঠাৎ শব্দ হতে আভিরা চোখ মেলে চাইল। নিচ থেকে শব্দ আসছে। নাওয়াজ এসে গিয়েছে বোধহয়। আভিরা সময় দেখে, রাত বারোটা বাজতে চলল। কখন যে চোখ লেগে গেছে টের পায়নি। বইয়ে মাথা ঠেকিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। বই বন্ধ করে উঠে ফ্রেশ হতে গেল। সেদিন নাওয়াজের বলা কথা সে আমলে নিয়েছে। তবে কাজ থেকে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। পড়ার পাশাপাশি টুকটাক যতটুকু সম্ভব ঘরের কাজ করার চেষ্টা করে। দিনের বেলা পুরোটা সময় সে কাজ করে সময় পার করে। সন্ধ্যার পরপরই বই হাতে বসবে। সেই এক বসাতে বেশ রাত করেই টেবিল ছেড়ে ওঠে। এখনও পড়তে বসে ঘুমিয়ে গিয়েছিল। সেই সন্ধ্যায় পড়তে বসেছিল। মাঝে কয়েক ঘণ্টার বিরতি নিয়েছে আজ। রাতের তখন আটটা। প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় আভিরার অবস্থা নাজেহাল। কোনোভাবেই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারল না। তাই বই রেখে উঠে গিয়েছিল। নিচে গিয়ে কড়া করে এক কাপ কফি বানিয়ে এনেছিল নিজের জন্য। পুরো রুম অন্ধকার করে বারান্দায় বিছিয়ে রাখা পাটিতে আসন পেতে বসে।
এই পাটি আভিরাই বারান্দায় বিছিয়েছে কয়েক দিন আগে।
মাঝেমধ্যে ভরদুপুরে, কখনো নিস্তব্ধ বিকেলে, কখনো বা অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতে বই হাতে শুয়ে থাকবে। গুনগুনিয়ে গানও ধরে মেয়েটা। তার গানের গলা অতটা মোহনীয় না হলেও চলনসই। বেছে বেছে বেশ কয়েকটা পুরোনো বাংলা গান ধরবে, ভারতীয় বাংলা গানও গাইবে। নাওয়াজের না ফেরা অবধি এই পাটিতেই শুয়ে থাকে। কখনো আবার এখানেই ঘুমিয়ে যায়। সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখবে সে বিছানায়। পুরো ঘরে সে ছাড়া কেউ নেই। আভিরা বুঝে এই একলা ঘরে ঐ পাটিতে ঘুমিয়ে থাকা তাকে কে ঘরে এনে বিছানায় শুয়ে দেয়। কিন্তু সকাল হতে ঐ লোকের দেখা পায় না সে।
গরম গরম সেই কফিতে কয়েক চুমুক দিয়ে দেয়ালে আস্তে ধীরে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে দিল। হঠাৎ কোন ভাবনায় ডুবে গেল কে জানে? কাপে রাখা কফি কখন যে বরফ শীতল হয়েছে আভিরার জানা নেই। পরে সেই ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফিটাই গিলে ছিল সে। মাথা ব্যথা খানিকটা কমে আসতেই আবার টেবিলে বসে। তারপর আর কিছু মনে নেই, তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।
পাপশে পা আটকে পড়তে নিলে কোনোরকম দেয়াল ধরে দাঁড়ায়। ঘুমের রেশ এখনও কাটেনি। আভিরা চোখ মুখে বেশ কয়েকবার পানির ঝাপটা দিল। ফ্রেশ হয়ে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে এলো। লোকটা সারাদিন না খেয়ে থাকে। বাহিরের খাবার খুব একটা খাওয়া হয় না নাওয়াজের। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হলে রেস্তোরাঁয় যাবে। নয়তো দুপুরে না খেয়ে থাকবে। কখনো কলিগদের জোরাজুরিতেও যাওয়া হয়। ওসব খাবার স্বাদের হলেও নাওয়াজের কাছে ঘরের রান্নায় বেশ লাগে, পাত পেরে খেতে পারে। নয়তো ঐ নামিদামি রেস্তোরাঁর খাবার খুব একটা মুখে রুচে না তার।
সেজন্যই লাবণ্য সাথে করে খাবার দিয়ে দেয়। মাঝেমধ্যে নাওয়াজ খাবার নেয় না। সেই দিনটা একপ্রকার অভুক্তই কাটে তার। আবার পেশেন্ট দেখাতে ব্যস্ত থাকায় ঠিকমতো খেতে পারে না। তাই রাতে ফিরলে সাথে সাথেই পাতে গরম ভাত বেড়ে দেবে লাবণ্য। লোকটা না উঠা অবধি ঠায় তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। আভিরা এসবই দেখে আসছে।
সিঁড়ির ধারে যেতেই পায়ের গতি কিছুটা কমে আসে আভিরার। নাওয়াজ ইতোমধ্যে খেতে বসে পড়েছে। পাশেই ব্যস্ত হাতে লাবণ্য গোরুর গোশের বাটি এগিয়ে দিচ্ছে।
নাওয়াজের পাতে ভুনা খিচুড়ি আর বেশি করে ঝোল দিয়ে রাঁধা গোরুর গোশ। এক মনে খেয়ে যাচ্ছে সে। আর তার খাওয়া অধীর আগ্রহে দেখে চলেছে লাবণ্য।
আভিরা এখন বেশ কয়েকটা পদ রাঁধতে পারে। শাশুড়ির সহায়তায় অল্প কয়েক দিনে রান্নাটা বেশ আয়ত্ত করে ফেলেছে। অনেক ভেবে আজ খিচুড়ি রাঁধল। নাওয়াজের ভুনা খিচুড়ি বেশ পছন্দের। নাওয়াজের পছন্দ দেখে পুরো এক ঘণ্টা লাগিয়ে খিচুড়ি আর গোশ রেঁধেছে। যদিও সে পারত না। ইয়াজমীনের দিক নির্দেশনা মোতাবেক রান্না করেছে। তাতেই অনেকটা সময় লাগে। গরম গরম খিচুড়ি আর তরকারি আলাদা করে রেখেছিল লোকটা এলে খেতে দিবে তাই।
তার রান্না করা খাবার ঠিকই খাচ্ছে। অথচ পাশে দাঁড়ানো মানুষটা অন্য কেউ। একটু তার জন্য অপেক্ষা করলে কী হতো? আর লাবণ্যই বা কেন এমন করল? কথা তো ছিল এখন থেকে লাবণ্য আর রাত জাগবে না। তবে জেগে রইল যে? না কি এতদিনের অভ্যাস বলে? তবে তাকে ডাকল না কেন?
আভিরা জানে না, জানতে চায় না। শুধু মনে হলো তার এখন আর নিচে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আভিরা আর দাঁড়াল না। কারো চোখে পড়ার আগেই দ্রুত রুমে চলে যায়।
আভিরার কেন যেন চোখে একটুও পানি এলো না। অনুভব করল তার শরীর মন কেমন বিষিয়ে উঠেছে।
_
নাওয়াজের উপস্থিতি টের পেল বেশ খানিকক্ষণ পর। আভিরা মুখ চেপে কান্না আটকানোর প্রয়াস চালায়। সে জেগে আছে লোকটাকে বুঝতে দেওয়া চলবে না। নিজের খুব নিকটে কারো উপস্থিতি টের পেল আভিরা। বুঝল লোকটা তার খুব সন্নিকটে এসে শুয়েছে, একদম গা ঘেঁষে।
আভিরা শক্ত হয়ে রইল। কান্নার দরুন এতক্ষণ শরীর কেঁপে উঠলেও এবার কোনো নড়চড় নেই।
নাওয়াজ হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে কাছে টেনে নেয়। আলতো ঠোঁটের পরশ বুলায় নরম মেদুর গালে। আভিরা কিছুটা নড়েচড়ে ওঠে। নাওয়াজ কানের কাছে মুখ নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
– জেগে আছেন যে? ঘুমাননি কেন?
আভিরা কেঁপে উঠল। লোকটা কী করে বুঝল সে জেগে আছে। তাকে কী তখন দেখেছিল না কি? মনে তো হয় না।
তবে কেমন করে বুঝল সে জেগে আছে?
বুঝে এলো না মেয়েটার। জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল।
– কী হলো? কিছু জিজ্ঞেস করেছি। জবাব কেন দিচ্ছেন না? আজ না ঘুমিয়ে এতক্ষণ অবধি জেগে কেন আছেন?
আড়ষ্টতায় আভিরার শরীর বেঁকে এলো। লোকটার ঠোঁট তার কানের লতি ছুঁই ছুঁই। আভিরা মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
– ঘুম ভেঙে গেল।
– সত্যি তো?
– হু।
দূরত্ব কমিয়ে আগের থেকে গাঢ় স্বরে বলল,
– এখন ঘুমাবেন?
আভিরার মনে হলো এখান থেকে পালাতে পারলে সে বাঁচে।
– না।
– তাহলে চলুন।
– কোথায়?
– গেলেই দেখতে পাবেন।
আভিরা উঠে দাঁড়ায়। গায়ে ওড়না জড়িয়ে বের হলো নাওয়াজের সাথে। নাওয়াজ একেবারে শব্দ যেন না হয় সে খেয়াল রেখে গেট খুলে বাইরে বের হয়। চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ। রাতের আঁধারে কাকপক্ষীরও দেখা নেই। আভিরার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আর কোনো কাজ নেই। এত রাতে কোন পাগলে বের হয়। এ লোকের কথা শুনে কেন যে বের হতে গেল। তার একদম বের হওয়া উচিত হয়নি। ভয়ে ভয়ে আশেপাশে দেখে নিল। অন্ধকারে কিছু দেখার জো নেই। শেয়ালের ডাক ভেসে এলো। আশেপাশেই বোধহয় কোথাও শেয়ালের আনাগোনা। ভয়ে আভিরার কলিজা ছলকে ওঠে। ছোটো থেকে শেয়ালে ভীষণ ভয় তার। ছোটো থাকতে শুনে এসেছে শেয়াল নাকি মানুষ দেখলেই লাল চোখ দেখিয়ে ভয় দেখায়। এখন যদি সামনে চলে আসে। তখন কী হবে? না আভিরা আর ভাবতে পারছে না। তাকিয়ে দেখল ঐ লোক অনেকটা সামনে চলে গিয়েছে। দেখো তাকে সাথে করে এনে এখন কেমন আগে আগে হেঁটে চলেছে। একাই যখন যাবে তাহলে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে গেল কেন।
– আরে এত জোরে হাঁটছেন কেন? আস্তে হাঁটুন।
আভিরা একপ্রকার দৌড়ে গেল নাওয়াজের কাছে।
– ভয় পেলেন?
আভিরা ভয়ঙ্কর চোখে তাকায়। পাগল লোক তাকে একা ফেলে চলে এসেছে। আভিরার এমন চোখ রাঙানো দেখে নাওয়াজ ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। মৃদু স্বরে বলল,
– ভয় পাবেন না, আমি আছি।
আভিরা এ কথায় মানলে তো। নাওয়াজ কাঁধে হাত রাখতে ঝামটা মেরে ফেলে দিল।
– বদ লোক, ছুঁবেন না একদম।
– ছুঁলে কী করবেন?
– আপনাকে এখানে ফেলে চলে যাব।
নাওয়াজ হো হো করে হেসে উঠল। আভিরা ফুঁসে ওঠে।
– এখান থেকে বাড়ি যেতে পারবেন?
আভিরার শরীর জ্বলে ওঠে। নিজেকে কী ভাবে এ লোক। সে একা বাড়ি অবধি যেতে পারবে না। ঐ তো বাড়ির গেট দেখা যাচ্ছে। এখান থেকে দু কদম হাঁটলেই হবে। দাঁত কিড়মিড় করে সামনে পা বাড়ায় আভিরা। নাওয়াজকে রেখে বাড়ির পথ ধরে বলল,
– থাকুন আপনি, আমি গেলাম।
পিছনে কারো উপস্থিতি টের না পেয়ে আভিরা ভয় পেল।
পিছন ফিরে দেখার চেষ্টা করল লোকটা আসছে কিনা। না ঐ লোকের দেখা নেই। কত খারাপ লোক। আভিরা আর ঐ লোকের সাথে কথা বলবে না।
ভয়ে আভিরার দম যায় যায়। সামনে কিছু একটা আছে। আওয়াজ করতেই আভিরা চিৎকার করে উঠল। কীসের আওয়াজ না বুঝে মেয়েটা উল্টো দৌড় লাগায়। কারো বুকে ধাক্কা খেতে সামনের মানুষটাকে একপ্রকার জাপটে ধরল।
– হয়েছে, দেখি আর কাঁদবেন না। ওটা অন্য কিছু না কুকুর ছিল।
আভিরা ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। শরীর থেমে থেমে কেঁপে উঠছে। ভালোই ভয় পেয়েছে। নাওয়াজ আভিরাকে সামান্য উঁচুতে তুলে ঘাসের উপর বসে পড়ল। শরীর ঘেমে গেছে একেবারে।
আভিরার মাথার কাপড় খানিকটা নামিয়ে ঘাড়ে হাত গলিয়ে ঘামের কণাগুলো মুছে দেয়। ভেজা চোখের পাতায় চুমু খেল।
আভিরাকে কান্না থামাতে না দেখে আবার বলল,
– হয়েছে তো। এবার কান্না থামান। এভাবে কাঁদলে আপনাকে দেখতে বিচ্ছিরি দেখায়।
আভিরা চট করে কান্না থামিয়ে দেয়। ফ্যাচফ্যাচ কণ্ঠে নাক টেনে বলল,
– অন্ধকারে আপনি আমার চেহারা দেখছেন কী করে?
নাওয়াজ মোবাইলের ফ্ল্যাশ অন করে মেয়েটার মুখের সামনে ধরে বলল,
– এই যে, এভাবে।
আভিরা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় নাওয়াজকে। হঠাৎ ধাক্কায় সামলাতে না পেরে নাওয়াজ পড়ল ঘাসের উপর। সাথে মেয়েটাকে টেনে নিজের উপর ফেলতে ভুলল না। আভিরা আছড়ে পড়ল শক্তপোক্ত বুকে। নাওয়াজ দু হাতে কোমর জড়িয়ে নিজের সাথে মেয়েটাকে একেবারে মিশিয়ে নেয়।
আভিরা লজ্জায়, অস্বস্তিতে ছটফট করল লোকটার বাঁধন ছাড়া হতে। তবে এমন শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি মিললে তো।
আভিরা খানিকক্ষণ চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলো তখন আস্তে ধীরে মাথা রাখল ইস্পাত কঠিন বক্ষে। অমন কঠিন বুকের হৃদযন্ত্রও কেমন বেগতিক হারে চলছে। এমন বেগতিক কেন হৃৎস্পন্দনের চলন। কই তার তো এমন হচ্ছে না।
নাওয়াজ নিশ্চুপ হয়ে তার বুকে লেপ্টে থাকা মেয়েটাকে ডাকল,
– আঞ্জুম।
– হু।
– শুনতে পাচ্ছেন কিছু?
– হুম।
– কী শুনছেন? কী বলে যাচ্ছে?
– ভালোবাসি!
– কাকে বলল এই ভালোবাসার কথা?
– আমাকে।
বলেই আভিরা মাথা তুলে চাইল নাওয়াজের পানে। এই কঠিন পুরুষের কী তীক্ষ্ণ চাহনি! আভিরার রুহ কেঁপে উঠে অমন চাহনিতে। নাওয়াজ হঠাৎ মেয়েটার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকায়। আকাশে থাকা চাঁদটা এবার মেঘের আড়ালে মুখ লুকাল। প্রেমে মগ্ন কপোত কপোতীকে সে যেন বিপাকে ফেলতে চাইছে না। তাই তো সময় বুঝে মিলিয়ে গেল আঁধারে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন নিশীথে, নিস্তব্ধ রাতকে সাক্ষী রেখে কাঠখোট্টা পুরুষটা প্রথমবারের মতো স্বীকারোক্তি স্বরূপ মেয়েটাকে প্রেম নিবেদন করল। ঠোঁট নাড়িয়ে কেমন নেশাগ্রস্তের ন্যায় আওড়ায়,
– ভালোবাসি!
অপ্রত্যাশিত স্বীকারোক্তিতে আভিরার সময় যেন সেখানেই থমকায়, থমকাল বোধহয় এতক্ষণ ধরে স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকা হৃৎস্পন্দনও!

