#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪৪
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
আলো আঁধারিতে অস্পষ্ট নারী মূর্তি দেখে মাহাদ থমকায়। একটু এগিয়ে যেতে স্পষ্ট ধরা দিল তার অবয়ব। যদিও সে নারী মূর্তি উল্টো ফিরে রয়েছে। তবে এ রমণী কে তা বুঝতে অসুবিধা হলো না মাহাদের।
– এত রাতে ছাদে কী করছ লাবণ্য?
লাবণ্য প্রত্যুত্তর করে না। মেয়েটার জবাব না পেয়ে মাহাদ আবার জিজ্ঞেস করল,
– কী হলো? ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে কেন আছো? তাও এত রাতে। গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে আসতে পারতে।
– ঠান্ডা লাগছে না।
– মানে? এত শীতের রাতে বলছ তোমার ঠান্ডা লাগছে না। মাথা ঠিক আছে তোমার?
লাবণ্য মাহাদের দিকে ফিরে চায়। জবাবে কাটকাট গলায় বলল,
– আমাকে দেখে কী কোনোভাবে মনে হয় আমার মাথায় সমস্যা আছে?
এমন ক্ষিপ্ত কণ্ঠে মাহাদ মুখোমুখি দাঁড়ায় মেয়েটার।
চাইল তীক্ষ্ণ চোখে। চাঁদের আলোয় মেয়েটার মুখ কেমন মোহাচ্ছন্ন লাগছে। নেত্র পল্লবে জমে আছে অশ্রু কণা। কেমন জ্বলজ্বল করছে তা।
– না, নিচে যাও। দেড়টা বাজতে চলল।
– যাব না।
– কেন যাবে না?
– তোমাকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।
– কৈফিয়ত দিতে বলিনি তো। কারণ জানতে চেয়েছি। বলো?
– বলব না।
মাহাদ আরও এগিয়ে আসে।
– এই মুহূর্তে রুমে যাবে তুমি।
– না গেলে কী করবে?
– জোর করতে বাধ্য হব। এমন কিছু করতে বাধ্য করো না আমায়। যাও, রুমে যাও।
– সবসময় তোমাদের কথামতো চলতে হবে আমাকে?
– সবার না। তবে আমার কথামতো চলতে হবে।
– তুমি কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ মাহাদ ভাই।
লাবণ্যর কণ্ঠে তেজ। এমনি মন মেজাজ ভালো নেই তার। তার মধ্যে মাহাদের এসব কথা মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছে।
– বাড়াবাড়ি করলে তুমি মেয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার কথার অবাধ্যতা করার মতো স্পর্ধা দেখাতে পারতে না।
অতিরিক্ত রাগে লাবণ্যর চোখে পানি এলো। হাতে থাকা মোবাইলটা খামচে ধরল একপ্রকার। বাড়াবাড়ি না করলে কী করছে? কোন অধিকারে তাকে এমনভাবে নিচে যাওয়ার কথা বলছে। এত অনধিকার চর্চা কেন করছে।
– তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না।
– আমি কী করতে পারি না পারি সে নিয়ে তোমার ধারণা নেই।
– আমার সাথেই কেন? তোমার কথা শুনতে বাধ্য নই।
– তুমি বাধ্য। আমার কথা না শুনলে কী হবে জানো?
– কী করবে? সবাইকে বলে দিবে তাই তো? দাও বলে।
– এমন কিছু নয়। বলার হলে এতদিন সবার জানা হয়ে যেত সে কথা।
– কেন বলবে না। দয়া করছ তুমি? তোমার দয়া লাগবে না আমার।
– দয়া করছি না। তোমাকে দয়া দেখানোর আমি কেউ না।
– তাহলে কী করছ? কেন বলছ না সবাইকে? আমি এসব নিতে পারছি না। বলে দাও তুমি। সবাই জানুক এ লাবণ্য আড়ালে কী করে বেড়ায়। কতটা জঘন্য আমি। সবার জানা দরকার। তুমি বলে দাও মাহাদ ভাই।
– আমি কখনোই বলব না কাউকে। তুমি তা জানো লাবণ্য।
– কেন বলবে না?
– সে কথা তোমার না জানলেও চলবে। তবে এমনটা না করলেই পারতে।
– আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু করিনি সেদিন।
– কিন্তু প্রথমবার স্বইচ্ছেই করেছিলে লাবণ্য।
মাহাদের এমন শক্ত কণ্ঠে লাবণ্য দু হাতে মুখ চেপে ধরে। বিড়বিড় করে বলল,
– আমি এমনটা করতে চাইনি মাহাদ ভাই, করতে চাইনি।
মাহাদ কিছু বলে না। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল এ মেয়ের কান্না। লাবণ্য কাঁদতে কাঁদতে দেয়াল ঘেঁষে বসে। মাহাদ আগেও লাবণ্যর এমন কান্না দেখেছিল। নাওয়াজের হলুদের রাতে। এইখানটাই, ঠিক এইখানটাই বসে কাঁদছিল মেয়েটা। সে রাতেও তীব্র শীত ছিল, গায়ে চাদর ছিল না এ মেয়ের। সেই তীব্র শীতে পাগলের মতো দু হাতে মুখ চেপে কাঁদছিল। আজও সেই কান্না, চোখ মুখে সেই বিধ্বস্ত ভাব।
সে রাতে দূর থেকে দেখেছিল এ মেয়ের কান্না। আজ রাতের মতো এত কাছ থেকে দেখা হয়নি।
– এখন নিশ্চয়ই ঐ ঘটনার জন্য কান্না করছ না?
– হু।
– কেন কাঁদছ তাহলে?
লাবণ্য জবাব দেয় না। মাহাদ বুঝল এ কান্নার কারণ বলবে না মেয়েটা। সে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল।
– উঠে এসো।
লাবণ্য ধরে না সে হাত। নিচু স্বরে বলল,
– তোমার স্পর্শ নিতে পারি না আমি।
মাহাদও বিড়বিড় করে বলল, তোমার কান্নাও নিতে পারি না আমি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এমন বিধ্বস্ত রূপ দেখা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,
– আচ্ছা হাত ধরতে হবে না। এবার নিচে যাও।
– যাব না। জোর করো না।
মাহাদ জোর করে না। সেও লাবণ্যর মতো দূরত্ব রেখে দেয়াল ঘেঁষে বসল। লাবণ্য অবাক হলেও কিছু বলল না।
মাহাদ নিজের গায়ে থাকা চাদরটা খুলে লাবণ্যর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলল,
– খোল না। শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে তোমার।
_
– আঞ্জুম, কোথায় আপনি? একটু রুমে আসুন।
আনেসা রুটি বেলতে বেলতে মেয়েকে বলল,
– ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে বোধ হয়। ডাকছে তোকে, রুমে যা।
– কাজ করছি তো আম্মু। পরে যাব।
আনেসা কিছুটা ধমকে উঠল,
– রুমে যেতে বলেছি তোকে। এমন করবি না কখনো। কাজ থাকলেও ডাক দেওয়ার সাথে সাথে হাতের কাজ রেখে রুমে যাবি। মনে থাকবে?
আভিরা গাল ফুলিয়ে বলল,
– থাকবে।
আভিরা চুলোর আঁচ কমিয়ে রুমে গেল। নাওয়াজের ঘুমের রেশ এখনও কাটেনি। শ্বশুর বাড়ি এসেছে আজ দুদিন। ঘোলাটে চোখে তাকায় আভিরার দিকে। মাথা নুইয়ে রুমেই আসছে মেয়েটা, কোমরে তার ওড়না গুঁজে রাখা।
নাওয়াজ কিছুটা নিচু স্বরে বলল,
– কী করছিলেন?
– আম্মুকে সাহায্য করছিলাম। কিছু লাগবে আপনার?
বলে মাথা তুলতেই দেখল নাওয়াজ কেমন তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আভিরা বিব্রত বোধ করে সে চাহনিতে। তড়িঘড়ি করে কোমরে গুঁজে রাখা ওড়না মাথায় তুলে। আভিরাকে এমন করতে দেখে নাওয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। এ মেয়েকে প্রতিবার মনে করিয়ে দিতে হবে সে তার স্বামী। কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল,
– হ্যাঁ, ফ্রেশ হব। আমার জামাকাপড় বের করে দিন।
আভিরা লাগেজ খুঁজল। দেখল আলমারির উপরে তুলে রাখা তা। প্রথম দিন নিচেই রাখা ছিল। কাল রাতে সে ই উপরে তুলেছে।
– লাগেজ তো উপরে। নামিয়ে দিবেন।
– দাঁড়ান।
নাওয়াজ এগিয়ে আসে মেয়েটার দিকে। তারপর হঠাৎ আভিরাকে উপরে তুলে নেয়। আভিরা হকচকায়। আঁতকে উঠে বলল,
– কী করছেন? নামান আমাকে। পড়ে যাব।
– পড়বেন না, ধরে রেখেছি আমি। লাগেজ নামান এবার।
আভিরা দ্বিধাদ্বন্দ্ব নজরে চায়। তাকে এভাবে দু হাতে উপরে তোলার কী আছে। এ লোক নিজেই তো লাগেজ নামিয়ে দিতে পারত।
_
আব্দুল্লাহ দাঁতে দাঁত পিষে চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
– এই জিদান ওই মাইয়ারে কো এইখান থেইকা যাইতে। শালি এমন বেহায়ার মতো তাকিয়ে আছে কেন।
বন্ধুরা একজোটে বলে উঠল,
– তোকে দেখছে ভাই।
আব্দুল্লাহর রাগ যেন এতেই বেড়ে যায়। মেজাজ খুইয়ে বলল,
– আমাকে দেখার কী আছে, বাল। আমি কী ওর লাং যে আমাকে দেখবে। চোখের সামনে থেকে সরতে বল। নয়তো উঠে দু চারটা দিয়ে বসব। জিদানের আত্মীয় তা মানবো না আমি।
– রেগে যাচ্ছিস কেন? একটা মেয়ে এত ছেলে রেখে তোর দিকে তাকিয়ে আছে ব্যাপারটা ইনজয় কর ব্যাটা।
– এসব বেহায়া গোছের মেয়ে আমার পছন্দ না। এরা খালি তাকানো অবধি সীমাবদ্ধ থাকে না, সময়ে ছেলেদের সাথে শুয়েও পড়ে। এমন নষ্ট মেয়েমানুষের চাহনি সহ্য হয় না আমার। ইচ্ছে করছে এ মেয়ের চোখ দুটো উপড়ে ফেলতে।
– আচ্ছা হয়েছে। এটা নিয়ে সিনক্রিয়েট করিস না। বাড়ি ভর্তি মানুষ।
আব্দুল্লাহ কিছু বলে না। পা দিয়ে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। উপরে নজর যেতে দেখল পর্দার আড়ালে থাকা অহমিকায় ক্ষুব্ধ ভাসা ভাসা নেত্র যুগল। আব্দুল্লাহ সেখানে দৃষ্টি রেখেই লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দুই ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট গুঁজে। তার বিগড়ে যাওয়া মেজাজ যেন এবার কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট হতে সেখান থেকে নজর সরায় সে। তবে ফোন বের করে ধরল না তা। আশেপাশে নজর বুলায়। বাড়ির ভিতরে বাইরে অনেক মানুষের আনাগোনা। জিদানের কাকা, ফুফু সবাই এসেছে বেড়াতে। বাড়িতে এত মানুষ আছে জানলে সে ভুলেও এ বাড়ির চৌকাঠ মাড়াতে যেত না।
জিদানের সাথে বন্ধুত্ব গভীর হলেও তার বাড়িতে খুব একটা আসে না আব্দুল্লাহ। জিদানের বাবার কারণেই মূলত। উনি যে তার এ বাড়িতে আসা খুব একটা পছন্দ করে না তা এ বাড়িতে প্রথম দিন পা রেখেই বুঝে ছিল।
জিদানের সব বন্ধুরাই হাই ক্লাস ফ্যামেলির। তার মাঝে সে ই বখাটে গোছের, যার চলনে ফিরনের ঠিক নেই একেবারে। শিক্ষা দীক্ষাও নামমাত্র। কথাবার্তাও পাড়ার বখাটেদের মতো। স্বনামধন্য বিজনেসম্যান এর ছেলে একটা বখাটের সাথে চলাফেরা করে এমনটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তার মধ্যে আবার রাস্তা থেকে বাড়ি অবধি আসা কোনোকালেই বরদাস্ত করবেন না তিনি। তার এখানে আসাটা তিনি পছন্দ করবেন না এইটা স্বাভাবিক।
সেজন্য আব্দুল্লাহ খুব একটা এ বাড়িতে আসে না। যতটা সম্ভব চেষ্টা করে এ বাড়িতে না আসার। তবে একেবারে না এসেও থাকতে পারে না সে। আব্দুল্লাহ শক্ত করে সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে ধরে। অনেক বড়ো একটা ভুল করে ফেলেছে। এর পরিণতি যে ভয়াবহ হবে এখন থেকেই আন্দাজ করতে পারছে। তবে আন্দাজ করলেও তার পক্ষে দূরে সরা সম্ভব নয়।
এই যে আজ জিদান একপ্রকার জোর করেই নিয়ে এলো তাকে। অনেক দিন ধরে এ বাড়িতে আসে না সে। সেজন্যই নিয়ে এলো। তবে জিদানের ছোটো ফুফিও এ বাড়িতে আছে জানা ছিল না তার। জিদানের ছোটো ফুফির মেয়েটা এক নাম্বারের বেয়াদব। স্কুল পড়ুয়া একটা বাচ্চা মেয়ের ভাবভঙ্গি দেখলেই আব্দুল্লাহর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তবে এটাকে বাচ্চা বললে ভুল হবে। এতটুকু একটা মেয়ে নোংরা অঙ্গিভঙ্গি করে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। এ বয়সেই বিগড়ে গেছে একেবারে। তবে এ মেয়ে জানে না এসব নোংরা অঙ্গিভঙ্গি করে আব্দুল্লাহকে আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়।
পুনরায় ফোন বেজে উঠতে হাতে নেয় তা। গোটা গোটা অক্ষরে বার্তা পাঠিয়েছে কেউ।
– কল ধরছেন না কেন?
ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট গুঁজে মেসেজ করল।
– কী বলবে বলো?
– কল ধরুন।
– পারব না, মেসেজেই বলো।
পুনরায় কল এলো। আব্দুল্লাহর আবার যেন মেজাজ বিগড়ায়। কিছুটা চেঁচিয়ে উঠল,
– কী সমস্যা? কল দিতে নিষেধ করেছিলাম।
ওপাশ থেকে জবাব আসে না। আব্দুল্লাহ ঘুরে দেখল পর্দার আড়ালে থাকা রমণী সেখানে নেই। জবাব না পেয়ে সামনে ফিরে কিছুটা নরম স্বরে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
– কী হয়েছে বলো?
কান্না ভেজা স্বরে কেউ বলে উঠল,
– আপনাকে অন্য কেউ দেখলে সহ্য হয় না আমার।
আব্দুল্লাহ হাসে এমন পাগলামিতে। কী একটু কেউ তাকে দেখেছে সেজন্য কাঁদতে হবে। কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে সেও প্রত্যুত্তর করল,
– আমারও, তুমি ছাড়া অন্য কেউ আমাকে দেখলে আমারও সহ্য হয় না।

