#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪৫
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
– ভিতরে আয়।
তাযীম ধুপধাপ শব্দ করে এগিয়ে আসে। তবে রুমে এলো না। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে খানিকটা বিরক্তি নিয়ে বলল,
– আম্মু খেতে যেতে বলেছে তোমাদের।
যেমন এলো তেমনভাবে চলে গেল, একেবারে ঝড়ের বেগে। আভিরা অবুঝের ন্যায় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখল এ ছেলের দৌড়ে যাওয়া। ওভাবে চেয়ে থেকেই দু হাতে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠল মেয়েটা। নাওয়াজ ঘুমের ঘোরে এলোমেলো স্বরে বলল,
– আপনি কাঁদছেন আঞ্জুম?
জবাব না পেয়ে টেনে বিছানায় ফেলে আভিরাকে। ওর গলায় মুখ গুঁজে ক্ষীণ স্বরে জানতে চাইল,
– কাঁদছেন কেন?
আভিরা কথা বলে না। নাওয়াজ গলায় নাক ঘষে। ঠান্ডা হাতে ছুঁয়ে দেয় উদর। আভিরার গা শিরশিরিয়ে ওঠে। অনুভূতি আলোড়ন করে যেন তনু জুড়ে। তীব্র অস্বস্তি ঘিরে ধরে রমণীকে, মরিয়া হয়ে উঠে বাঁধন ছাড়া হতে। তবে এ শক্তপোক্ত পুরুষের দৃঢ় হাতের বন্ধন থেকে ছাড়া পাওয়ার সাধ্যি এ কন্যার নেই। মেয়েটার ছটফটে ভাব কমে বরফের ন্যায় জমে যায় পুরুষটা যখন তার গলার ধারে ওষ্ঠ ঠেকায়। সময়ে ঠোঁটের ছোঁয়া গাঢ় হয়। ছোটো ছোটো চুমু আঁকে। নাওয়াজের শ্বাস প্রশ্বাসের বেগ জোরালো। উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ে উত্তাল ঢেউয়ের ন্যায়।
মেয়েটা একটু স্থির হতেই নাওয়াজ শিথিল করে হাতের স্পর্শ, থামায় ওষ্ঠের বেপরোয়া ছোঁয়া। গলায় মুখ গুঁজেই শুধায়,
– বলছেন না কেন আঞ্জুম? হঠাৎ করে কাঁদছেন কেন আপনি?
– ও আমার সাথে কথা বলে না।
বলেই ফুঁপিয়ে উঠল। নাওয়াজ ভ্রুকুটি করে শুধায়,
– কে?
নাওয়াজের বুঝতে কিছুটা সময় লাগে। পুনরায় বলল,
– তাযীমের কথা বলছেন?
– হু।
নাওয়াজ হুট করে হেসে উঠল। উঠে মেয়েটাকে টেনে বসায় ঊরুতে। থুতনিতে চুমু খেলে বলল,
– এর জন্য কান্না করতে হবে? আপনি এত ছিঁচকাদুনে কবে হলেন আঞ্জুম?
আভিরা নাক টেনে বলল,
– আমি ছিঁচকাদুনে?
– তা নয় তো কী? তাযীম তো ছোটো। অত কিছু বুঝে না। ধমকিয়ে ছিলেন সেজন্য এমন করছে।
– অত কিছু বুঝে না। কিন্তু অভিমান ঠিকই করতে জানে। এইটুকু ছেলের এত অভিমান কেন থাকতে হবে?
– এত বড়ো হয়েও একজন কথায় কথায় মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে। শুধু মুখ ফুলিয়েই থাকে না, চোখের পানি ফেলে একাকার করে ফেলবে। সে জায়গায় তাযীমের এমন এড়িয়ে চলা জায়েজ। বরং আপনার করা কাজগুলো বাচ্চামো। কথায় কথায় এমন কান্না করবেন না তো।
– কান্না করব না কেন?
– আমি নিষেধ করেছি সেজন্য।
– অকারণেই?
– হু, সে কথা বাদ দিন। ওকে সেদিন ধমকিয়ে ছিলেন কেন?
– মেজাজ খারাপ ছিল আমার।
– মেজাজ খারাপ ছিল কেন?
মেয়েটা এবার জবাবে তোতলায়,
– ঐ আআরকি…
– আমার সাথে আপনার বিয়ে হবে, সেজন্য রাগ করেছিলেন?
আভিরা ফট করে বলে উঠল,
– আপনার সাথে বিয়ে হবে জানতাম না আমি।
পরপর মেয়েটার কণ্ঠ বুজে আসে। কথা বন্ধ হলো তার। দু হাতে মুখ চেপে ধরে মাথা নাড়ায়। আল্লাহ কী বলল সে। ইশ্! এ লোক নিশ্চয় তাকে লজ্জা দিতে দিতে মেরে ফেলবে। তবে নাওয়াজ কিছু বলে না, কিছুই না।
_
– আঞ্জুম তৈরি হয়ে নিন। বাহিরে যাব।
– কোথায় যাব আমরা?
আভিরা পিছন ফিরতে দেখল নাওয়াজের হাত মুঠোয় নিয়ে তাযীম দাঁড়িয়ে। ভাইকে দেখে কোথায় যাবে তা শোনার প্রয়োজন মনে করল না। ছোটো করে বলল,
– একটু অপেক্ষা করুন। আমি আসছি।
মেয়েটা একপ্রকার দৌড়ে গেল তৈরি হতে। সাদা রঙের সেলোয়ার কামিজ পরেছে আভিরা। ধীর পায়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। জর্জেট কাপড়ের সাদা ওড়না টেনে মাথায় দিল। মুখের সামনে পড়ে থাকা কেশ কানে গুঁজল বেশ অস্বস্তি নিয়ে। নাওয়াজ চেয়ে দেখল সুশ্রী চেহারার সৌন্দর্য চাপা পড়েছে মলিনতায়। কেমন আড়ষ্ট ভঙ্গিতে কদম ফেলছে। নাওয়াজ ভ্রু কুঁচকায়। মুখ ভার করে রেখেছে কেন এই মেয়ে। কাছে আসতেই শুধাল,
– কী সমস্যা?
আভিরা মিনমিন করে,
– আব্…
– কী হয়েছে?
– দেখতে খারাপ লাগছে কী?
– না।
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো মেয়েটা। তীব্র অস্বস্তি নিয়ে কোনোরকম বলল,
– আসলে জামাটা অনেক পাতলা…
নাওয়াজ চাইল তীক্ষ্ণ চোখে। অমন শানিত চাহনিতে আভিরা কথা হারায়। নাওয়াজ সূক্ষ্ম চোখে নজর বুলায় রমণীর পুরো দেহে। লজ্জায়, অস্বস্তিতে রক্ত শূন্য হয়ে এলো আভিরার মুখাবয়ব। এ লোকের নজর ঠিক নেই। কেমন অসভ্যের মতো চেয়ে দেখছে।
এ জামাটা বেশ পাতলা, শরীরের গড়ন বুঝা যাবে সূক্ষ্ম চোখে চাইলেই। হাতের কাছে এটাই পেয়েছিল। অত না ভেবেই পরে বেরিয়ে এসেছে। নাওয়াজ আর তাযীমকে অপেক্ষায় রাখে না। তবে বাড়ির বাইরে পা রাখতেই মনে হলো যে মিহি কাপড় পরেছে শরীরের ভাঁজ না বুঝা যায়। এ কথা মাথায় আসতেই অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে। তার মধ্যে নাওয়াজের এমন চাহনি।
নাওয়াজ পুরো শরীরে নজর বুলিয়ে বলল,
– আসুন।
– কিন্তু…
– ওড়না দিয়ে শরীর ডেকে রাখার পরও কেন মনে হলো শরীরের গড়ন বুঝা যাবে? শরীরের ভাঁজ বুঝা গেলে এতক্ষণ অবধি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন না আমার সামনে।
নাওয়াজের এমন কথাতে আভিরা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। চপল পায়ে হেঁটে চলল ঐ লোকের সাথে কদম মিলিয়ে। ওরা খেতের আইল ধরে হেঁটে চলেছে। আভিরার নজর স্থির নেই। বড়ো বড়ো আঁখি মেলে দেখছে চারপাশ। একটা দুটো খেত বাদে প্রায় সব খেতেই শীতকালীন সবজি লাগানো। কেউ আবার মাচা বানিয়ে লাউ, শিম লাগিয়েছে। বেশ কয়েকটা লাউ ধরেছে। মাছের মাথা দিকে রাঁধলে বেশ ভালো লাগবে।
হঠাৎ আভিরা পড়তে নিলেই নাওয়াজ বাহু টেনে ধরে। নিচু স্বরে বলল,
– সাবধানে, দেখে হাঁটবেন তো। এখনই পড়ে যেতেন।
আভিরা মাথা নাড়ে। মৃদু স্বরে বলল,
– সাবধানে কেন হাঁটব? আপনি আছেন, পড়ে যেতে নিলে এভাবেই ধরবেন।
_
বাঁশ থেকে হাত ছুটে যায় তাযীমের। নিচে পড়তে নিলেই আভিরা ভাইয়ের হাত টেনে ধরল। তাযীম ভয়ে দু হাতে বোনের হাত আঁকড়ে ধরে। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বলল,
– হাত ছেড়ো না, পড়ে যাব।
নাওয়াজ ছেলেটাকে তুলতে গিয়েও কী ভেবে যেন আর তুলে না। নাওয়াজ বলেছিল হাত না ছাড়তে। একটু এদিক সেদিক হলেই সাঁকো থেকে খালে পড়বে। তাছাড়া আভিরা সাঁকো পার হতে পারলেও তাযীম পারে না। সেজন্য নাওয়াজ হাত ধরে রেখেছিল ছেলেটার। কিন্তু হঠাৎ করে তাযীম বলল এখন সে নিজেই পারবে। নাওয়াজ না করতেই মুখ ফুলায়। নিজেই হাত ছাড়িয়ে সামনে এগোয়। কিছু দূর যেতেই পড়তে নেয়। আভিরা ধরল, নয়তো পড়ত কাদা পানিতে।
আভিরা তুলে না। রয়েসয়ে ভাইকে বলল,
– আপু বল। নয়তো ছেড়ে দিব।
তাযীম ভয়ে চিৎকার করে উঠে,
– ছেড়ো না আপু।
– এভাবে না। বল আভিরা আপু, আমার হাত ছেড়ো না। আর কখনো এমন করব না। তুমি হাজারবার ধমক দিলেও আমি কথা বলা বন্ধ করব না।
ছেলেটা ভয়ে আভিরার শিখিয়ে দেওয়া বুলি আওড়ায়। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
– বলেছি। এবার তো তোলো।
– পরে আবার সব ভুলে যাবি না তো। তাহলে কিন্তু এই খালে ধাক্কা দিয়ে ফেলব তোকে।
– ভুলব না। তোলো তুমি আমায়।
আভিরা টেনে তোলার চেষ্টা করল তাযীমকে, সক্ষম হলো না। তাযীম এবার কান্নার জোর বাড়ায়। চোখ মুখ লাল হয়ে আসে ছেলেটার। আভিরা নাওয়াজের দিকে চেয়ে বলল,
– ওকে তুলুন। তুলতে পারছি না।
– তুলছি।
নাওয়াজ তাযীমকে তুলতেই আভিরার কোমর জড়িয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। আভিরা প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও পরক্ষণেই বুঝল তাযীম কতটা ভয় পেয়েছে।
_
– কার সাথে কথা বলছ জ্যোতি?
হঠাৎ মায়ের কণ্ঠ কানে আসতেই আত্মা ধক করে উঠে জ্যোতির। তড়িঘড়ি করে কান থেকে মোবাইল নামিয়ে পিছন ফিরে চাইল। কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,
– তুমি হঠাৎ আমার রুমে?
– কেন তোমার রুমে আসতে হলে আমায় বলে আসতে হবে?
– তেমন কিছু নয়।
– তাহলে কেমন কিছু? আর এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? চোখ নামাও।
জ্যোতি মায়ের কথায় নজর ফেরায়। খানিকক্ষণ নীরব থেকে বলল,
– কেন এসেছ বলোনি।
– আমার আসার কারণ না জানলেও চলবে তোমার। এত রাতে কার সাথে কথা বলছিলে?
জ্যোতি কিছু বলে না।
– কী হলো? বলছ না কেন?
মায়ের ধমকে জ্যোতি কিছুটা কেঁপে ওঠে। চোখের চশমা ঠেলে জবাবে ছোটো করে বলল,
– মাহা কল দিয়েছিল।
– এত রাতে? এত রাতে কীসের কথা তোমাদের?
জ্যোতি এবার যেন বিরক্ত হলো। এত কৈফিয়ত কেন চাইছে। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল,
– ক্লাস টেস্ট আছে কাল, সেজন্য কল দিয়েছে। ও কয়েকটা টপিক পারে না। আমাকে বলল ভালোভাবে যেন পড়ে যাই।
ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কঠিন গলায় বলল,
– দেখি মোবাইল দাও তোমার। কদিন বাদে তো তোমার পরীক্ষা। অথচ যখন আসি তখনই দেখি মোবাইল হাতে বসে আছো। বই হাতে নিয়ে বোধ হয় বসো না একেবারেই। তোমার মোবাইল ধরা এখন থেকে বন্ধ। আমার কাছে থাকবে।
জ্যোতি ভয় ভুলে কাটকাট গলায় বলল,
– মোবাইল দিব না আমি।
– পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমার কাছেই থাকবে, মোবাইল দাও।
– বললাম তো দিব না।
– বেয়াদবি করবে না জ্যোতি। তোমার বাবাকে জানাতে বাধ্য হব।
বাবার কথা শুনে জ্যোতির কণ্ঠ বুজে আসে। চোখে মুখে অন্ধকার দেখল মেয়েটা। আর টু শব্দও করে না। হাতের মোবাইলটা দিয়ে দিল।
ভদ্রমহিলা যেতেই জ্যোতির এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা চোখের পানি গাল বেয়ে গলায় ঠেকে। তীব্র ক্রোধে তার ছোটোখাটো শরীরটা কেঁপে উঠে যেন। শব্দ করে দরজা আটকে বালিশের নিচে থাকা বাটন ফোনটা হাতে নেয়। বন্ধ হয়ে থাকা মোবাইল অন করল সেকেন্ডেই। মোবাইল অন হতেই চোখে পড়ল ছোটো একটা বার্তা। জ্যোতির ঠোঁটের ভাঁজে দেখা মিলে এক চিলতে হাসি। কান্নার মাঝেই হেসে উঠল মেয়েটা।
– ফোন নিয়ে নিয়েছে?
জ্যোতি চোখ মুছে। মাথা ঠেকায় বালিশে। ব্যস্ত হাতে টাইপ করল।
– জি।
– বলেছিলাম তোমায় উনি যখন বাড়িতে থাকবে কল দেওয়ার প্রয়োজন নেই, মেসেজ দিবে। তাহলে কল দিতে গেলে কেন?
– ঐ ফোনে ব্যালেন্স শেষ। এইটাতে মিনিট এনে রেখেছিলাম। আর উনি তো এ সময়ে কখনো আমার রুমে আসেন না। সেজন্য কল দিয়েছিলাম। কিন্তু হুট করে এসে ফোন নিয়ে গেল।
– কিছু সন্দেহ করেনি তো জ্যোতি?
জ্যোতির চলতি হাত থামে। সন্দেহ তো করেছেই। নয়তো ফোন নিয়ে যাবে কেন। ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে জবাবে লিখল,
– জানি না।
ওপাশ থেকে আর জবাব আসে না। জ্যোতি ফোনের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল জবাবের আশায়।
_
আব্দুল্লাহ গায়ে শার্ট জড়িয়ে বের হলো রুম থেকে। রাতের তখন বারোটা পঁয়তাল্লিশ। কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বোনের ঘরের দোরে কড়া নাড়ে। প্রথমবার না খুললেও দ্বিতীয়বারে খুলে যায় বন্ধ ঘরের দোর। আব্দুল্লাহ দেখল বোনের ঘুমন্ত মুখশ্রী। ঘুমিয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়। এত রাতে জেগে থাকার কথাও নয়। ছেলেটার নিজেরই যেন খারাপ লাগল এতে। তার জন্য ঘুম ভেঙে গেল।
– কিছু লাগবে তোর?
– বুবু, মানে বড়ো আপা কী করছে?
আলো সন্দিহান নজরে চাইল ভাইয়ের দিকে। বোনের প্রখর দৃষ্টিতে আব্দুল্লাহ থতমত খেল। আলো সে কথার জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
– এত রাতে কেন এসেছিস তা বল।
– টাকা আছে তোমার কাছে?
আব্দুল্লাহ কণ্ঠে তীব্র সংকোচ।
– কত লাগবে?
– একশ।
– তুই কী সিগারেট খাওয়া ছাড়তে পারিস না। আপা শুনলে কিন্তু রাগ করবে। আমাকে বলেছে তোকে যেন সিগারেট খাওয়ার জন্য টাকা দেওয়া না হয়। তার মানা করা সত্ত্বেও তোকে টাকা দিয়েছি জানলে কিন্তু তুলকালাম বাঁধাবে।
– তুমি না বললে বুবু জানবে কী করে? আর এ টাকা সিগারেট খাওয়ার জন্য চাইছি না।
– তাহলে?
– কাজ আছে।
কাজ আছে না বলে তো কী কাজ তা বললেই হয়। যেহেতু বলেনি তার মানে কী কাজ তা জানতে চেয়ে লাভ নেই। আব্দুল্লাহ বলবে না কখনোই। আলো কথা না বাড়িয়ে ভাইকে একশ টাকা ধরিয়ে দিল। কিছুটা চাপা স্বরে বলল,
– যে পথে হাঁটছিস দুঃখ ছাড়া কিছুই মিলবে না। বুঝে পা বাড়াস। তুই ছাড়া আমাদের কেউ নেই কিন্তু।
আব্দুল্লাহ জোর করে মুখে হাসি টানার চেষ্টা করে। তবে হয়ে উঠল না। গম্ভীর স্বরে বলল,
– তোমার এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।
ছেলেটা এই গভীর রাতেই বেরিয়ে গেল। আলো দেখল ভাইয়ের যাওয়া। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। আব্দুল্লাহ তো ভালো করেই জানে এ হবার নয়। তবে জেনেশুনে কেন ধ্বংসের পথে পা বাড়িয়েছে!
_
– কোনো ভদ্র বাড়ির ছেলে এত রাতে বাড়ি ফিরে না।
জিদান ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসে। বড়ো বড়ো কদম ফেলে এগিয়ে আসে।
– আমার দেরি করে বাড়ি ফেরা নিয়ে আপনার সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
– তুমি দিনকে দিন বেয়াদব হচ্ছো জিদান। নিশ্চয় ঐ বস্তির ছেলেটার জন্য তোমার এ অধঃপতন।
জিদানের শান্ত মেজাজ যেন বিগড়ে গেল এমন কথায়। দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বলল,
– ওকে বস্তির ছেলে বলবেন না।
– আচ্ছা বলব না। কিন্তু তাতে তো এ ছেলের পরিচয় বদলে যাবে না।
জিদান কাঠিন্য স্বরে বলে উঠল,
– আব্দুল্লাহকে নিয়ে আপনার মুখে কোনো কথা শুনতে চাই না আমি।
– ঐ ছেলেকে নিয়ে কিছু বলার ইচ্ছে আমার নেই। তবে আজকাল সারওয়ার ম্যানশনে ঐ ছেলের আনাগোনা বেড়েছে। এতে তোমার বাবার আমার দুজনেরই আপত্তি রয়েছে।
জিদান এগিয়ে আসে। দাঁড়ায় মুখোমুখি। ছেলেটা লম্বা চওড়ায় সুপুরুষ। তাচ্ছিল্য করে বলল,
– মিসেস সারওয়ার সমস্যা কী আব্দুল্লাহর সারওয়ার ম্যানশনে আসা নিয়ে? না কি অন্য কোন ব্যাপারে আপনি আর আপনার স্বামী ভয়ে আছেন?
– কী যা তা বলছ? আর ভুলে যাবে না উনি সম্পর্কে তোমার বাবা।
– আমি কিছুই ভুলে যাইনি। বরং আপনারা ভুলে যাচ্ছেন। আমাকে আর জ্যোতিকে নিয়ে আপনাদের চিন্তা না করলেও চলবে। এসব ভেবে অযথা নিজেদের সময় নষ্ট করবেন না।
_
ভয়ে আভিরার পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। হাতের রিমোট শব্দ করে পড়ল মেঝেতে। নাওয়াজ সেই শব্দেই রুম থেকে বেরিয়ে আসে। সোফায় বসে ভয়ে কাঁপতে থাকা মেয়েটাকে কাছে টেনে নেয়। এক পলক টিভির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে মেঝে থেকে হাত বাড়িয়ে রিমোট তুলে অফ করে দিল।
ব্রিজের নিচে হাত কাটা অজ্ঞাত এক লোক অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। শুধু ডান হাত কাটা। সেই রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে মাটিতে। তার পাশেই পড়ে আছে কাটা হাত। নিউজে আপাতত তাই প্রচার করা হচ্ছে। এতটুকু দেখেই ভয়ে মেয়েটা ছটফটিয়ে ওঠে। এসব দেখতে পারে না সে।
মেয়েটা নিভে যাওয়া কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
– কেন করল?
– হয়তো ঐ নোংরা হাত দিয়ে কারো ব্যক্তিগত মানুষকে ছোঁয়ার হিম্মত দেখিয়েছে। তাই সে নোংরা কাজ করার জন্য ঐ হাতটাই রাখেনি।
আভিরা নাওয়াজের সাথে মিশে যায়। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বলল,
– আপনি করেছেন এই কাজ?
নাওয়াজ বুকে লেপ্টে থাকা রমণীর দিকে চেয়ে রহস্যময় হাসি দেয়। ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল,
– আপনার কী আমাকে সন্ত্রাসী মনে হয়?
– না। তবে ঐ লোক ঐ…
– ঐ লোক কী?
মেয়েটা কিছুটা তোতলায়।
– আব কিছু না।
আভিরা কথা গিলে নেয় একপ্রকার। এই লোকই তো ছিল সেদিন রেস্টুরেন্টে। কেমন কামুক নজরে চেয়েছিল। তাদের বের হতে দেখে সেও বের হয়েছিল। পিছনে না ফিরেও বুঝে ছিল ঐ লোক তার কোমর ছুঁয়েছে। আভিরা চোখ খিঁচিয়ে নেয়। টিভিতে ঐ লোককে এমন হাত কাটা অবস্থায় দেখে শরীরে কাঁটা দেয় তার। এমন দৃশ্য দেখেই বোকার মতো ভাবল নাওয়াজ করেছে কী। পরমুহূর্তে নিজের উল্টা পাল্টা ভাবনা বাদ দেয়। নাওয়াজ তো জানেই না তাকে কে ছুঁয়েছে। তাছাড়া দুদিন ধরে তো তার সাথেই আছে।
– ভয় পাবেন না, এই ইয়াজিদ আড়ালে কিছু করতে অভ্যস্ত নয়। তবে আপনার ক্ষেত্রে হলে আলাদা। সে তা করতে বাধ্য।
শেষ দিকে তার কণ্ঠস্বর কেমন খাদে নামে। এতটা ধীর, মেয়েটার কানে গেল না ঠিকঠাক।

