#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪৬
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
মেডিকেলে আভিরা চান্স পেল না। সে যেন জানত এমনটাই হবে। এখন সাত কলেজ শেষ ভরসা। এটাতে চান্স না পেলে মুখ দেখানোর জো থাকবে না। মেয়েটা আগের তুলনায় পড়ার সময় বাড়িয়েছে। রাত জেগে খেয়ে না খেয়ে বই নিয়ে বসে থাকে। তোফায়েল আহমেদের চাওয়া মেয়ে যেন তার মেডিকেলে না হোক সাত কলেজে অন্তত চান্স পায়। নাওয়াজও যেন এমনটাই আশাবাদী। আভিরা সাত কলেজে টিকে যাবে। কিন্তু সাত কলেজেও আভিরা টিকল না।
আভিরার চান্স না পাওয়াতে যতটা না খারাপ লাগছে তার থেকেও বেশি খারাপ লাগছে তার বাবার জন্য, ঐ লোকটার জন্য। লোকটা তো কম করেনি। তাকে যতটা সম্ভব গাইড করার চেষ্টা করেছে।
সে যখন রাত জেগে থাকত ঐ লোকও তার জন্য জেগে থাকত। মাঝেমধ্যে রাতে বাড়ি ফেরার পরেই তার বই হাতে বসতো, কোনোকিছু বুঝতে অসুবিধা হলে লোকটা অযথা ধমকাধমকি না করে বুঝিয়ে দিত। এমনও দিন গিয়েছে ঐ লোক হসপিটাল থেকে ফিরেছে বেশ রাত করে, এত রাতে ফিরেও খেয়েই তাকে পড়াতে বসবে। পড়া শেষ না হওয়া অবধি ক্লান্ত শরীর নিয়েই ঠায় তার পাশে চেয়ার টেনে বসে থাকবে। ও ঠিকঠাক পড়া বুঝতে পারছে কিনা, কোনো টপিক বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখত। আর সে কিনা ঐ লোকের এত প্রচেষ্টা বৃথা করে দিল।
আভিরা মনমরা হয়েই বারান্দায় বসে আছে। দু পা ভাঁজ করে কোলের উপর বই রাখা, পাশে ধোঁয়া উঠা কফির মগ। আভিরা হাতের আঁজলায় কফি মগ তুলে নিল, একটু করে চুমুক দেয় কফি মগে। দূর আকাশে দৃষ্টি তাক করল মেয়েটা।
আসমানি রঙা আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘের বাহার। সারিবদ্ধ পাখি ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে গগন জুড়ে। শীতল বাতাস বইছে। হালকা রোদ আছড়ে পড়ছে বারান্দার গ্রিল গলিয়ে। মেয়েটা পাতলা একটা কামিজ পরে এই শীতের মধ্যে পা গুটিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। শরীর কাঁপছে তার, দাঁতে দাঁত লেগে যাওয়ার জো। তবুও ঠায় বসে রইল।
নীলচে অম্বর ধীরে ধীরে হলুদ কমলাটে রঙে নিজেকে রাঙায়। বেলা শেষে সময় গড়িয়ে এলে দিবাকর তলিয়ে যেতে লাগল, একেবারে ডুবে গেল জল ছলছল নালায়। জলে সিক্ত থাকা হাঁসের ছানাগুলো প্যাক প্যাক আওয়াজ তুলে সাথের সঙ্গীদের সতর্ক করে। সময় ঘনিয়ে এসেছে, আঁধার নেমেছে ধরণী জুড়ে। এবার তাদের বাড়ি ফেরার পালা। ডুবুডুবু জল থেকে উঠে আসে হাঁসের দল, বাড়ির পথ ধরে তারা। লেজ গুটিয়ে বসে থাকা কুকুরটা এবার ঘেউ ঘেউ করে উঠল হাঁসের দল দেখে। হামলা করবে বলে, তবে তার আগেই হাঁসের মালিক তেড়ে এলো লাঠি হাতে।
আভিরা উঠে দাঁড়াল, রাতের রান্না করতে হবে তাকে।
সকালের আর দুপুরের রান্না লাবণ্য করলেও রাতের রান্নাটা আভিরাই করে। যদিও আগে এমন ছিল না। ঘরের কোনো কাজে হাত লাগাতে পারত না আভিরা। তবে আজকাল এমনটা হয় না। ঘরের টুকটাক কাজ করার পাশাপাশি রাতের রান্নাটা সে ই করে।
আগে তো আভিরা একটা দুটো পদ বাদে রাঁধতেই পারত না। তবে এখন সব ধরনের রান্নায় পারে। রান্নাটা যেন একেবারে আয়ত্তে এসে গেছে তার। বিরিয়ানি, গোরু গোশ রান্না থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের ভর্তা সবই একা হাতে বানাতে পারে। এখন আর সাথে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না, বলে দিতে হয় না এই ফোড়নের পর ওই ফোড়ন দাও। রান্নায় লবণ বেশি হয়েছে কিনা তাও কাউকে চেখে দেখতে হয় না। অল্প সময়েই সব শেখা শেষ তার। এতে অবশ্য ইয়াজমীনের বিশাল অবদান রয়েছে। নয়তো আভিরার পক্ষে এত রান্না শেখা কোনোকালে সম্ভব ছিল না। ইয়াজমীন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে বলে দিত কোন পদ কীভাবে রাঁধতে হবে। কোন রান্নায় কতটুকু নুন, মরিচ, হলুদ গুঁড়ো দিতে হবে।
আভিরাকে প্রথম প্রথম রান্না শেখাতে গিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছে ইয়াজমীনকে। একবার তো তিনি একটু হেঁশেল ছেড়ে ঘরে গিয়েছিলেন কাজে, এসে দেখে ডালের মধ্যে পাতিল ভর্তি পানি দিয়ে রেখেছে আভিরা। লবণ, হলুদ কোনটাই ঠিকঠাক দেওয়া হয়নি। কেমন পানিতে টলটল করছে। সে ডাল বহু কষ্ট করে খাওয়ার যোগ্য করেছিলেন ইয়াজমীন। খাবার তো আর ফেলে দেওয়া যায় না। তেল মশলা দিয়ে আলাদা করে বাগার দিয়েছিলেন। শাশুড়ির কাজকর্মে আভিরা অবাক হয়েছিল, হতভম্ব হয়ে চেয়েছিল শুধু। ঠায় দাঁড়িয়ে ভাবছিল ইয়াজমীনের জায়গায় অন্য কেউ হলে কী এমনটাই করত? করত না নিশ্চয়ই। বরং দায়সারাভাবে বলে উঠত, তোমার মা তোমাকে কিছু শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠায়নি দেখছি। এত বড়ো মেয়ে হয়ে ডালটাও রাঁধতে জানো না। মেয়েদের তো ঘরের কাজে পারদর্শী হতে হয়। রান্নার মতো সহজ কাজ পারো না, বাকি কাজকর্মে না জানি অষ্টরম্ভা।
আভিরা মৃদু হাসে। তার ভাগ্য নিশ্চয় ভালো। নয়তো এমন শাশুড়ি জুটে। আজকাল এত ভালো শাশুড়ি পাওয়া দুরূহ। এ যেন তার আরেক মা। আভিরার কখনো মনে হয় না আনেসা আর ইয়াজমীন আলাদা কেউ। ইয়াজমীন অনুভব করতে দেয় না তাকে।
_
আভিরা ফ্রিজ থেকে ফুলকপি, গাজর, টমেটো বের করে ঝুড়ি থেকে আলু নিল কয়েকটা। সব কেটেকুটে ধুয়ে রেখে দিল পানি ঝরে পড়ার জন্য। এর মাঝে আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা রুই মাছের পিসগুলো ধুয়ে তাতে নুন হলুদ মাখিয়ে গরম হয়ে থাকা তেলে ছেড়ে দিল। এপিট ওপিট উল্টে ভালো করে ভেজে তুলে নিল তা। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে তা হালকা ভাজা হয়ে এলে আদা বাটা, রসুন বাটা দিয়ে তাতে হলুদ গুঁড়ো, মরিচ গুঁড়ো পানি দিয়ে ভালো করে কষিয়ে ভাজা মাছের পিস দিয়ে দিল। উঠানোর আগে সামান্য ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিল। অন্য একটা কড়াইয়ে তেল দিয়ে গরম হয়ে এলে তাতে ফুলকপি, গাজর, টমেটো দিয়ে একে একে নুন, হলুদ মরিচ দিয়ে নিল। ভাজা ভাজা হয়ে এলে কুসুম গরম পানি দিয়ে চুলোর আঁচ বাড়িয়ে দেয়। রান্না হয়ে আসতেই নামিয়ে নিল সব। খুন্তি রেখে মেয়েটা গলা উঁচিয়ে ডাকল,
– মা, একটু এদিকে আসবেন।
ডাক শুনেই ইয়াজমীন বেরিয়ে আসে। চওড়া হেসে জানতে চাইল,
– রান্না শেষ?
– হ্যাঁ। তবে ভাতের মাড় গেলে দিতে হবে।
– সে তো রোজ দিতে হয়।
আভিরা ঠোঁট উল্টায়। পরক্ষণেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল মেয়েটা। রান্না ঠিকঠাক আয়ত্তে এলেও এখনও ভাতের মাড় গালতে পারে না সে। প্রতিদিন রাতের রান্না শেষ করেই ইয়াজমীনকে ডাকবে মাড় গেলে দেওয়ার জন্য।
আভিরা চেয়ে দেখল লাবণ্যর টেবিল ছেড়ে উঠে যাওয়া। এমনিতেও রাতে লাবণ্য খুব একটা খায় না। তবে আজ যেন বসতে বসতেই উঠে গেল। পুরো ভাত প্লেটে পড়ে রয়েছে। আভিরা সেদিকে চেয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে। সে রান্না করেছে বিধায় এমন করে উঠে গেল। তার শাশুড়ি তো এখনও খাচ্ছে। তবে লাবণ্য উঠে গেল কেন? ইয়াজমীন উঠতে উঠতে বলল,
– খেয়ে নাও। নাওয়াজের আসতে দেরি হবে।
– উনি এলে তারপর খাব।
_
কোনোদিকে না চেয়ে সোজা রান্নাঘরে গেল। নাওয়াজ প্লেট হাতে আভিরাকে বের হতে দেখে ভ্রু কুঁচকাল। এ মেয়ে এখানে কী করছে। এত রাত অবধি তো জেগে থাকে না কখনো। লাবণ্য কোথায়। আভিরা নাওয়াজের পাতে ভাত বেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল তার পাশে। নাওয়াজ চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
– আপনি? লাবণ্য কোথায়?
তরকারির বাটি এগিয়ে দিয়ে আভিরা ধীর স্বরে বলল,
– নিন খেয়ে নিন।
– এত রাতে জেগে আছেন যে?
– এত রাত কোথায়? বারোটা বাজল সবে।
– আপনি তো এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন না। লাবণ্য কোথায়?
লাবণ্যর কথা শুনে আভিরার কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হলো। তবে সেটা নাওয়াজকে বুঝতে দিল না। থমথমে মুখ করে বলল,
– আপু ঘুমিয়ে গিয়েছে।
নাওয়াজ ভ্রুকুটি করে। কপাল কুঁচকে চাইল আভিরার পানে। এ মেয়ে তার প্লেটে এটা ওটা বেড়ে দিতে ব্যস্ত। হাত বাড়িয়ে প্লেট নিয়ে বলল,
– ও তো এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না। কিছু হয়েছি কী?
– না।
নাওয়াজ ভাতের লোকমা মুখে তুলে বলল,
– রান্না কে করেছে?
আভিরা একই স্বরে জবাব দেয়,
– আমি।
– খেয়েছেন?
এবার মেয়েটা কিছু বলে না। থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল শুধু। জবাব না পেয়ে নাওয়াজ মুখ তুলে চায়। নজরে এলো আভিরার থমথমে মুখাবয়ব। ছেলেটা ফিচেল হাসে। হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে টেনে বসায় পাশের চেয়ারে।
– কী হয়েছে? মুখ ভার করে রেখেছেন কেন?
আভিরা এবারও জবাব দেয় না। এক পলক নাওয়াজের দিকে চেয়ে থেকে নজর ফেরায়।
– না খেয়ে বসে আছেন কেন?
এবারও জবাব আসে না।
– দেখি হা করুন। এরপর থেকে না খেয়ে আমার জন্য বসে থাকবেন না।
– আমার ইচ্ছে।
এমন জবাবে নাওয়াজ কিছুটা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। আভিরা বিব্রত বোধ করে সে হাসিতে। ছেলেটা বিগলিত হেসে বলল,
– আপনার ইচ্ছে?
আভিরা জবাবে হিমশিম খায়। এদিক ওদিক চেয়ে নজর লুকায়। নাওয়াজ মুখের সামনে ভাত মাখিয়ে তুলে ধরল।
– হা করুন।
মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল,
– আমি খেয়েছি।
– আপনার জানা উচিত আমার সাথে এসব বাহনা দিয়ে লাভ নেই। আমার জন্য যে এতক্ষণ অবধি না খেয়ে বসে আছেন তা অজানা নয় আমার। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নিন।
– না খেলে কী করবেন?
নাওয়াজ টেনে মেয়েটাকে নিজের ঊরুতে বসায়। এক হাতে গাল চেপে মুখে ঠেসে ভাতের লোকমা দিয়ে বলল,
– এই যে, এভাবে খাওয়াব।

