#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫৮
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
মেঘলা আকাশ, আঁধার কেটেছে কেবল। কিন্তু অম্বরের ঘনঘটা কালো মেঘ কাটেনি। ধূসর আবরণে ঢাকা পড়েছে আসমান। মৃদু বাতাস বইছে, কেমন একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। পুরোপুরি বৃষ্টি থেমেছে ভোরের দিকে। কিন্তু তার আমেজ রয়ে গিয়েছে পরিবেশে। তীব্র ঠান্ডায় আভিরা কেঁপে ওঠে। শরীর গুটিয়ে শুতে চাইলে কেমন দম বন্ধ হয়ে এলো তার। নিজের দেহের উপর কারো অস্তিত্ব অনুভব হতেই আভিরার ঘুম ছুটে গেল। চোখ মেলতেই নজরে এলো নাওয়াজ তার কোমর জড়িয়ে পেটে মুখ গুঁজে ঘুমে আচ্ছন্ন। রাতের কথা মনে হতেই গা হিম হয়ে আসে। আভিরা সলজ্জায় কুঁকড়ে যায়, কেমন হাঁসফাঁস করতে লাগল। রক্তাভ শূন্য মুখাবয়ব, অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল কায়া জুড়ে। আভিরা আড়ষ্ট হয়ে দৃষ্টি ফেরায়। পরক্ষণেই মৃদু হাসে মেয়েটা। কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার।
কাল রাতে অন্য এক নাওয়াজকে দেখেছিল আভিরা। গম্ভীর স্বভাবের লোকটাকে কেমন যেন বেপরোয়া, উন্মাদ মনে হচ্ছিল। আভিরা উঠার চেষ্টা করল। লোকটার মুখোমুখি হতে পারবে না সে। নাওয়াজ উঠার আগেই সে কোথাও চলে যাবে। মেয়েটা ফ্লোরে পা রাখতেই ঘুম জড়ানো কণ্ঠে কেউ ধমকে উঠল। আভিরা কেঁপে উঠে এমন গম্ভীর স্বরে।
– সমস্যা কী? নড়ছেন কেন?
মেয়েটা জবাব দিতে পারে না তৎক্ষণাৎ। হঠাৎ নাওয়াজ চোখ মেলে চাইলে খানিকটা অপ্রস্তুত হতে দেখা গেল আভিরাকে। ঐ চোখে চোখ রাখার সাধ্যি আভিরার নেই। কাল রাতে যা হলো তারপর তো মেয়েটা মোটেও চাইবে না নাওয়াজের দিকে। নাওয়াজ পুনরায় পেটে মুখ গুঁজে বলতে লাগল,
– আমি যখন বুঝে ছিলাম আপনার জন্য আমি অন্যরকম কোনো অনুভূতি অনুভব করি তখন আমি নিতান্তই অল্প বয়সের বালক। উঠতি বয়সের অনুভূতি ভেবে ভুলে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টায় ছিলাম। এমনটা আবার হয়? হবে হয়তো আমার দৃষ্টি ভ্রম, নিতান্তই চোখের ভালো লাগা। সেই ভেবে সদ্য তৈরি হওয়া অযাচিত অনুভূতি চাপা দিয়েছিলাম। কিন্তু দিন যেতেই আপনার প্রতি নিজের অনুভূতির প্রগাঢ়তা টের পেলাম। সামনে আমার মাধ্যমিক পরীক্ষা, আর আমি সব ভুলে আপনার প্রেমে উন্মাদ প্রায়। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ব্যাপার হলো আমি আমার অনুভূতি ঠিকমতো বুঝার আগেই আপনার বাবা বুঝে গেলেন। তিনি আমাকে সরাসরি বলে দিলেন, আমি যেন ওনার কাছে আর পড়তে না যাই। আমার মতো কাউকে পড়াবেন না উনি। আপনার বাবার পছন্দের ছাত্র ছিলাম আমি। এভাবে কোনো কারণ ছাড়াই বলে দিল আমাকে আর পড়াবে না। কারণ জিজ্ঞেস করতে আপনার বাবা কী বলল জানেন? বলল, আমার নাকি নজর ভালো না। আমি তার মেয়েকে অন্য নজরে দেখি।
আপনি তখন ঐটুকু একটা মেয়ে। দুই ইঞ্চি, হাফ প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতেন। আর আমি কিনা আপনার দিকে অন্য নজরে তাকাব। আমার এতটাও অধঃপতন হয়নি যে আপনার দিকে অন্য নজরে তাকাতে যাব। আমি কখনো ভাবতাম না যে, আমার সামনে হাফ প্যান্ট পরে কোনো বাচ্চা মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আপনাকে বউয়ের নজরে দেখতাম আমি, ঐ নজরে প্রেম ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।
আভিরা হা করে চেয়ে আছে। এ লোকের কাজকর্মে প্রায় সন্দেহ হতো এই লোক বোধহয় তাকে অনেক আগে থেকে চিনে। নয়তো এমন খুঁটিনাটি বিষয় এই লোকের আয়ত্তে থাকে? আভিরাকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নাওয়াজ মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
– আপনাকে কিন্তু আমি হাফ প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখেছি।
বলেই নাওয়াজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। আভিরা বুঝল এই লোক তাকে বিপাকে ফেলতে চাইছে। হাফ প্যান্ট আভিরার খুব কম পরা হয়েছে। দৌড়াতে শেখার পর থেকেই মেয়েটা সেলোয়ার পরত। গোল জামা পরলে তখন হাফ প্যান্ট পরত সে। এছাড়া হাফ প্যান্ট পরা হতো না। অল্প বয়স থেকেই মেয়েটা ছোটো জামাকাপড় পরলে অস্বস্তি বোধ করত। হাত পা বেরিয়ে থাকলে কেমন বিরক্ত লাগত তার। সেজন্য বেশিরভাগ সময় গোল জামা পরা হতো। আর এ লোক বলছে তাকে হাফ প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখেছে।
_
হঠাৎ করে আভিরা উঠে দাঁড়ায়। নাওয়াজ উঠে বারান্দার রেলিং ধরে সামান্য ঝুঁকে রয়েছে। আভিরা নাওয়াজের দু হাত ছাড়িয়ে একদম বরাবর হয়ে দাঁড়াল। দুজনের শরীর প্রায় ছুঁই ছুঁই। নাওয়াজ অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আভিরার দিকে। মেয়েটা কী করতে চাইছে বোধগম্য হলো না তার।
আভিরা হাত দিয়ে তার আর নাওয়াজের উচ্চতা আন্দাজ করার প্রয়াস করল। কাঁধ অবধিও না সে। কোনোরকম নাওয়াজের বুকে পড়ে। সে ঐ লোকের ভাষ্যমতে, দুই ইঞ্চিই তবে। নাওয়াজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে পা দুটো সামান্য উঁচু করে গলা জড়িয়ে ধরতে গিয়েও ব্যর্থ হলো। এভাবে নাওয়াজের পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়েও গলা জড়িয়ে ধরতে পারছে না। আভিরা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
– সাহায্য করুন।
নাওয়াজ কোমর জড়িয়ে মেয়েটাকে উঁচুতে তুলে ধরে। একদম নিজের মুখ বরাবর। নাওয়াজ মেয়েটার পুরো মুখে নজর বুলায়। সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– কী করতে চাইছেন?
আভিরা জবাব দেয় না। দুজনের দৃষ্টি মেলে। আভিরা নাওয়াজের ঠোঁটে চুমু খেল। মেয়েটার শরীর শিরশির করে ওঠে। এই প্রথম, নিজ উদ্যোগে প্রথম চুমু। নাওয়াজ বুঝি ছেড়ে দেওয়ার লোক। কোমর জড়িয়ে আরও উঁচুতে তুলে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে আভিরা আঁতকে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে নাওয়াজের। পুনরায় মিলিত হলো দুটো ওষ্ঠাধর। চুমুর প্রগাঢ়তা বাড়ে। সেকেন্ডের পর সেকেন্ড পেরিয়ে এক মিনিট দু মিনিট করে পাঁচ, ছয় মিনিট হলেও ওষ্ঠের বেপরোয়া চলন থামে না।
_
আভিরা গোসল সেরে দ্রুত কদমে রান্নাঘরে গেল। কী রাঁধবে বুঝে উঠতে পারল না মেয়েটা। নাওয়াজকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া দরকার ছিল লোকটা কী খাবে। আভিরা ফ্রিজ খুলে ডিম বের করল। সকালে ভাত রান্না হয় না এ বাড়িতে। সকালের নাস্তা হিসেবে রুটি পরোটা যেন নির্ধারিত। আভিরা ঠান্ডা পানি দিয়ে ময়দা গুলে নিল। নিপুণ হাতে রুটি বেলে তাওয়ায় সেঁকে নেয় একটা একটা করে। তেল গরম হয়ে আসতেই ডিম ছেড়ে উপরে সামান্য লবণ মরিচ ছিটিয়ে দেয়। আলু ভাজি হয়ে এলেই উপরে গেল নাওয়াজকে ডাকতে। নাওয়াজ এখনও উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। এ লোক এখনও ঘুমাচ্ছে। আভিরা গিয়ে নাওয়াজকে ডাকল।
– শুনছেন?
– বলুন।
– খেতে আসুন।
– আসছি। আপনি যান।
– নিন, ধরুন। এইটা খেয়ে নিবেন। ব্যথা কমে যাবে।
আভিরা বিব্রত বোধ করে। এলোমেলো চাহনি ফেলে এদিক ওদিক। ফ্যাকাশে হয়ে এলো মুখাবয়ব। নাওয়াজের আভিরার এমন ছটফটে ভাব নজর এড়ায় না। মৃদু হেসে চেয়ার টেনে বসল। রুটি ছিঁড়ে আভিরার মুখের সামনে ধরে বলল,
– হা করুন।
আভিরা হা করতেই তার মুখে রুটি দিল নাওয়াজ। আভিরার নজর এখনও তার হাতে থাকা ট্যাবলেটের দিকে। এই লোক বাহিরে কখন গেল। আর ব্যথার ট্যাবলেটই বা কখন নিয়ে এলো আভিরার জানা নেই। নাওয়াজ আরেকবার রুটি ছিঁড়ে মেয়েটার মুখের সামনে ধরে বলল,
– লাবণ্য কোথায়?
লাবণ্যর কথা উঠতেই আভিরার মুখে আঁধার নেমে এলো। এই লোক এখনও লাবণ্যর কথা জিজ্ঞেস করছে।
– জানি না। রুমেই আছে। ঘুমিয়ে আছে হয়তো।
– এত বেলা অবধি ঘুমিয়ে থাকার মেয়ে লাবণ্য না। আপনি ওকে ডাকেননি কেন?
– জি খেয়াল ছিল না আমার।
আভিরার সত্যি খেয়াল ছিল না।
– খেয়াল রাখা উচিত ছিল।
নাওয়াজ স্বাভাবিক গলায় বলল। এমনভাবে কথা বলছে যেন কাল রাতে কিছুই হয়নি। আভিরা অবাক হলেও কিছু বলল না।
– আমি কি ডেকে নিয়ে আসব?
– হ্যাঁ। কিন্তু এখন না। আমি বের হওয়ার পর ডাকবেন।
আভিরা বুঝল নাওয়াজ লাবণ্যর মুখোমুখি হয়ে চাইছে না। কিন্তু এভাবে কতদিন এড়িয়ে যাবে। লাবণ্যর মুখোমুখি তো হতেই হবে। একই বাড়িতে থেকে কাউকে এড়িয়ে চলা সম্ভব?
আভিরা লাবণ্যর দরজায় কড়া নাড়ে। ডাকতে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। লাবণ্যকে নিয়ে তার মনে ঘৃণা নেই, ক্ষোভ নেই কোনো। কাল রাতে সে লাবণ্যকে থাপ্পড় মেরে ছিল। এতটুকু মাথায় আসতেই অস্বস্তি বাড়ছে তার। মেয়েটা কিছুটা ধীর কণ্ঠে বলল,
– আপু খেতে আসুন।
– এখন খাব না আভিরা। তুমি যাও।
আভিরা কিছুটা অবাক হলো। এত মাস হয়ে গেল এ বাড়িতে এসেছে সে। এর আগে কখনো লাবণ্য তার নাম ধরে ডাকেনি। এই প্রথম বোধ হয় তার নাম নিল।
_
দুপুর সময়টা আভিরা ঘুমিয়ে কাটাল। বিকেলে বের হলো ঘর থেকে। একা একা ভালো লাগছে না। তার শাশুড়ির কথা মনে পড়ছে। ইয়াজমীন থাকলে বউ শাশুড়ি মিলে বিকেলের নাস্তা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়া যেত। নিচে নামার সময় দেখল লাবণ্যর ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। আভিরা ভাবল একবার ডাকবে, পরে না ডেকেই বাড়ির আঙিনায় গেল। উঠান খানিকটা পিচ্ছিল হয়ে আছে। কর্দমাক্ত আঙিনায় পা রাখতে কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল শুভ্র পা যুগল। আভিরা জুতা খুলে কাদায় পা রাখে। খানিকক্ষণ হেঁটে বাড়ির বাইরে লাগোয়া ট্যাপ ছেড়ে পা ধুয়ে নেয়।
রাতের রান্না আভিরা একাই করল। লাবণ্য একবারের জন্যও ঘরের দরজা খুলেনি। এমনকি সকালের নাস্তাও খায়নি। আভিরার এবার দুশ্চিন্তা হচ্ছে। যত যাই হোক সে তো আর বিবেকহীনের মতো আচরণ করতে পারে না। রক্তে মাংসে গড়া মানুষ সে। মনুষ্যত্ব আছে তার, নরম মনের অধিকারী সে। মানুষের প্রতি রাগ, ক্ষোভ রাখে না সে। শত অন্যায় করলেও কারো প্রতি ঘৃণ্য মনোভাব পোষণ করতে পারে না। আভিরা রুম থেকে বেরিয়ে লাবণ্যর রুমের দিকে গেল। দরজা এখনও ভিতর থেকে বন্ধ। আভিরা কয়েকবার কড়া নাড়ল। ভিতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ আসছে না। আভিরার দুশ্চিন্তা এবার ভয়ে রূপান্তর হলো। হাত পা কেমন কাঁপতে লাগল। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে কম্পিত গলায় বলল,
– আপু ঠিক আছেন আপনি?
জবাব আসছে না কোনো। আভিরা ভাবল নাওয়াজকে কল দিয়ে বলা উচিত লাবণ্য যে দরজা খুলছে না। মেয়েটা ফোনের লক খুলে নাওয়াজকে কল দিতে গিয়েও দিল না। শুধু শুধু লোকটাকে এসব বলে দুশ্চিন্তায় ফেলার দরকার নেই। লাবণ্য নিশ্চয় ঘুমিয়ে আছে। সেই বেশি ভাবছে, অযথা ভয় পাচ্ছে।
শেষমেশ মেয়েটা নাওয়াজকে কল দিয়েই ক্ষান্ত হলো। দু বার রিং হতেই কল রিসিভ হয়। নাওয়াজকে কিছু বলতে না দিয়েই আভিরা অস্থির হয়ে বলল,
– আপু দরজা খুলছে না?
– কে? লাবণ্য?
– হুম।
– সময় হলে খুলবে। আপনি এত অস্থির হচ্ছেন কেন?
– সারাদিন একবারের জন্যও দরজা খুলেনি। এখনও খুলছে না। আমার ভয় করছে।
মেয়েটা বোধ হয় এবার কেঁদেই ফেলবে।
– ভয় পাবেন না। লাবণ্য ঠিক আছে, কিছু হয়নি। আপনি এক কাজ করুন। মায়ের রুমে যান।
আভিরা তাই করল। দ্রুত ইয়াজমীনের রুমে গেল।
– কোথায় আছেন? মায়ের রুমে?
– জি।
– দক্ষিণ দিকের দরজা খুলে লাবণ্যর রুমে যান।
আভিরা দরজার নব ঘুরিয়ে লাবণ্যর রুমে গেল। দেখল, কাঁথা মুড়িয়ে পুরো শরীর ঢেকে লাবণ্য ঘুমিয়ে আছে। আভিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
– কী করছে?
– ঘুমাচ্ছে।
– আচ্ছা। আর কিছু বলবেন?
– না।
– রাখছি তাহলে।
_
আভিরা শাড়ির আঁচল তুলে নিল। সদ্য গোসল সেরে বেরিয়েছে সে। স্নিগ্ধতায় ছেয়ে গেছে বদন, যেন সদ্য শিশিরে ভেজা ফুটন্ত রক্তিম ফুল। কালো জর্জেট শাড়িতে ধূসর রঙা আকাশে শ্রাবণের ঘনঘটা মেঘের ন্যায় লাগছে মেয়েটাকে। চুলে প্যাঁচানো টাওয়াল খুলে দিতেই ভেজা এলোমেলো চুল পিঠ দখল করে রমণীর। চুলের পানিতে ভিজতে লাগে দেহে জড়ানো শাড়ি, ব্লাউজ। ভিজে পিঠের সাথে লেপ্টে রইল। আভিরা চুল আঁচড়ায় না, আর না ভেজা চুল মোছার তাগিদ দেখা গেল তার মাঝে। দুই ঠোঁটে গাঢ় টকটকে লাল রঙা লিপস্টিক লেপ্টায় সযত্নে। মুখশ্রী জুড়ে পানির কণা লেপ্টে, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক।
অপেক্ষা জিনিসটা বোধহয় মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বেশি অসহ্যকর ব্যাপার। আভিরা সারা রুমে একবার এদিক তো আরেকবার ওদিক অস্থির চিত্তে পায়চারি করছে। স্থির হয়ে এক জায়গায় বসে থাকতে পারছে না সে। চিত্ত জুড়ে কেমন ব্যাকুলতা। নিজের এমন অস্থিরতা আভিরা টের পেল খুব করে।
হলরুমের বাতি নেভানো দেখে নাওয়াজ মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। লাবণ্যর রুমের আলো জ্বলছে। বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে রুমের আলো ঠিকরে বের হচ্ছে। তাহলে হলরুমের লাইট অফ কেন? দেখে মনে হচ্ছে শুধু হলরুমের না পুরো বাড়িতে কোথাও আলোর দেখা নেই। নাওয়াজ কপাল কুঁচকে রুমের দিকে পা বাড়ায়। ভিড়ানো রুমের দরজা ঠেলে ভিতরে যেতেই পা জোড়া থেমে যায় তার। হঠাৎ করে হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। নাওয়াজের যেন গরম লাগছে, তীব্র উষ্ণতা শরীর জুড়ে। ছেলেটা মুহূর্তে কেমন ঘেমে উঠেছে। নাওয়াজ শার্টের দুটো বোতাম খুলে সামনে পা বাড়ায়। আভিরা রুমের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। নাওয়াজ রুমের লাইট দিতেই মেয়েটা চোখ বন্ধ করে নেয়। সহসাই লাইটের তীব্র আলো সহ্য হলো না। নাওয়াজ এগিয়ে মেয়েটার কোমর নিজের শক্ত হাতে চেপে ধরে। আভিরা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল, চোখ গলিয়ে পানি পড়ে তার। বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে ওষ্ঠাধরের সেই টকটকে লাল রঙা লিপস্টিক মুছিয়ে দিয়ে বলল,
– এসব রঙ চঙ মেখেছেন কেন?
নাওয়াজের এমন কাজে আভিরা বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রঙ চঙ? এই রঙ চঙ তো সে এই লোকের জন্যই মেখেছে।নাওয়াজ একবারের জন্যও আভিরার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। নাওয়াজের মুখাবয়বের কাঠিন্যতা আভিরার নজর এড়ায় না। আভিরা বুঝল না সে কি কোনো ভুল করেছে। নাওয়াজ এমন কেন করছে? মেয়েটার চোখ ভরে এলো অশ্রুতে। টলমল চোখে নাওয়াজের দিকে চাইল। নাওয়াজ আভিরার দিকে না তাকিয়ে বলল,
– মাথা ব্যথা করছে, আমি ঘুমাব। আপনি এসব ছেড়ে আসুন।
আভিরা থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা কী বুঝেনি সে এই লোকের সান্নিধ্য চাইছে। এড়িয়ে গেল কেন? না কি সব বুঝে ইচ্ছে করে তাকে অবজ্ঞা করল। সরাসরি প্রত্যাখ্যানে আভিরা অপমানিত বোধ করে। অপমানে দুমরে মুচড়ে গেল ভিতরটা, সদ্য জাগা অনুরক্তি যেন পিষে ফেলল নাওয়াজ।
আভিরার লজ্জায়, অস্বস্তিতে মরে যেত ইচ্ছে করছে। নিজ থেকে কী বেহায়াপনায় করল সে! ছিঃ তার এত অধঃপতন হয়েছে!

