#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫৭
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
মেঘের গর্জনে আভিরা কেঁপে উঠল। বিকট শব্দে ধারে কাছে কোথাও বাজ পড়েছে। তুমুল জোরে বর্ষণ হচ্ছে বাহিরে। সকালে রোদ উঠেছিল। সূর্যালোক বেরিয়ে এসেছিল মেঘের আড়াল থেকে। দিন কয়েক ধরে ভারী বর্ষণের ফলে রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। বাড়ির উঠানে পা ফেলতেই ভয় লাগে। সতর্কতার সহিত পা ফেলতে হয়। অসাবধানতাবশত কদম ফেললেই স্লিপ কেটে পড়তে হবে। কর্দমাক্ত হয়ে আছে পথঘাট। কাদা মাটিতে মানুষের পা ডেবে পায়ের ছাপ স্পষ্ট, গাড়ির টায়ারে পিষ্ট হচ্ছে মাটির রাস্তা। জায়গায় জায়গায় জমাট বেঁধে রয়েছে বৃষ্টির পানি। খালবিলের পানি বেড়ে রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম। জনসাধারণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। রাস্তাঘাটে বের হওয়া যায় না ছাতা ছাড়া। এই আকাশ স্বচ্ছ দেখাচ্ছে তো আবার অতর্কিতে অম্বর ছেয়ে যাচ্ছে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটায়।
আজ সকালেই আকাশ একেবারে পরিষ্কার ছিল, রোদের হালকা আলোয় মুদে ছিল ভূলোক। বিকেল হতেই নীলাভ আসমান ছেয়ে যায় কৃষ্ণাঙ্গ মেঘে। হালকা বাতাসের সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামতে শুরু করে রাতের দিকে। সময় বাড়তেই কেমন ঝড়ের বেগে বাতাস বইতে থাকে, আসমান কাঁপিয়ে বর্ষণ নামে। সেই বর্ষণেই অষ্টাদশী রমণীর গা ভিজেছে। ভেজা গায়েই লেপ্টে আছে নিজ পুরুষের বাহুডোরে।
লোডশেডিং হয়েছে অনেক আগে। মোমের হালকা হলদেটে আলোয় আলোকিত হয়ে থাকা কামরা সম্পূর্ণ তমসায় তলিয়ে গেল। হালকা নিভু নিভু আলোয় জ্বলতে থাকা মোমবাতির আলো নিভে গিয়েছে বাতাসের দাপটে। মেঘের তীব্র গর্জন, শো শো আওয়াজে বাতাস বইছে। জানালায়, দরজায় লাগোয়া পর্দাও উড়ছে অনবরত। নিস্তব্ধ কামরায় নাওয়াজের বলা কথা ভয়ঙ্কর ঠেকল আভিরার কাছে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। বুঝতে অসুবিধা হলো না আজ তার রক্ষা নেই। এ লোকের কাছে সমর্পিত করতে হবে নিজেকে।
– আপনার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে আঞ্জুম, উষ্ণতা দরকার।
_
– বারান্দায় চলুন আঞ্জুম।
এই রাতের বেলা এখন আবার বারান্দায় যেতে হবে। ব্যথায় ছটফট করতে থাকা আভিরা মাথা তুলে চাইল। বিছানা ছেড়ে এক কদম ফেলার মতো শক্তি শরীরে নেই আপাতত। পুরো দেহ অসহ্য যন্ত্রণায় জর্জরিত। মেয়েটা অস্ফুটে স্বরে বলল,
– ঘুমাবেন না?
– হুম।
– তাহলে?
– আপনি আসুন, পরে ঘুমাব।
বলেই মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। আভিরা মৃদু স্বরে আর্তনাদ করে ওঠে। হাত বাড়িয়ে লোকটার গলা আঁকড়ে ধরার প্রয়াস অবধি করে না। শরীর ব্যথায় অসহ্য লাগছে, চোখ গলিয়ে পানি পড়ে মেয়েটার। নাওয়াজের বুকে মিশে রইল একেবারে। আভিরাকে দোলনায় বসিয়ে ওর পেটে মুখ গুঁজল নাওয়াজ, চুমু খেল মেয়েটার উন্মুক্ত উদরে। আভিরার শরীর শিরশির করে উঠল। মেয়েটা চোখ বুজে মাথা হেলিয়ে দেয়। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। বাহিরে হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এখনও বিদ্যমান। বৃষ্টির ছটা এসে মুখবিবরে পড়তেই আভিরা চোখ মুখ কুঁচকে চায়। শীতল বাতাসে চোখ লেগে এসেছিল খানিকক্ষণের জন্য। হালকা নড়তেই বুঝল নাওয়াজ এখনও তার পেটে মুখ গুঁজে রয়েছে। কোনো নড়চড় নেই। এই লোক ঘুমিয়ে গিয়েছে কি? আভিরা বুঝল না। এভাবে স্থির হয়ে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। আভিরা পুনরায় নড়তেই নাওয়াজ থমথমে গলায় বলে উঠল,
– এমন নড়াচড়া করছেন কেন আঞ্জুম?
আভিরা মিইয়ে গেল কেমন। এই লোক কী সারা রাত এভাবেই থাকবে নাকি। মেয়েটার কান্না পেল। এমনি ব্যথায় শরীর অবশ হয়ে আসছে, তার মধ্যে এ লোকের কর্মকাণ্ড তার মন বিক্ষিপ্ত করে তুলছে। আভিরা হঠাৎ রেগে গেল। ইচ্ছে করল নাওয়াজকে ঠেলে দোলনা থেকে ফেলে দিতে। মেয়েটা নিশ্চুপ হয়ে চোখ বুজে পড়ে রইল। নাওয়াজের কথার প্রত্যুত্তর করে না, প্রত্যুত্তর করার প্রয়োজন মনে করল না।
– আপনি জানেন আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান।
এমন কথায় আভিরা বিস্ফোরিত নয়নে চাইল। এই লোক পাগল হয়ে গিয়েছে না কি? এ লোক যে তার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান তা তো আভিরার অজানা নয়। হঠাৎ এমন উদ্ভট কথা কেন বলছে? আভিরার আর ভালো লাগছে না। এভাবে কতক্ষণ পড়ে থাকবে। এই লোকই বা কেন বুঝতে পারছে না এভাবে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে, বসে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে। যন্ত্রণায় মেজাজও কেমন খিটখিট করছে।
– ছোটো থেকে আমার একটাই আফসোস ছিল আঞ্জুম।
সবার বোন আছে, আমার কোনো বোন নেই কেন। সবার মতো ছোটো একটা বোন থাকলে জীবনে চাওয়ার কিছু থাকত না আমার। অপূর্ণতার মাঝে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় আব্বুকেও হারাতে হলো আমাকে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমি একেবারে অনুভূতি শূন্য হয়ে পড়ি। ঐ বয়সেই নিজের মাঝে ব্যাপক পরিবর্তন টের পেলাম। বুঝতে পেরেছিলাম আস্তে ধীরে আমি কেমন কঠোর হয়ে যাচ্ছি, এমন গম্ভীর স্বভাবের ছিলাম না আমি। সারাক্ষণ আমোদে থাকা আমিটা সময়ের সাথে পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেলাম। একদিন আম্মু হুট করে একটা মেয়ে এনে বলল, ছোটো থাকতে না বলতি সবার বোন আছে। তোর কেন নেই? তোর বোন লাগবে। এই নে, এনে দিলাম বোন।
নাওয়াজ চেয়ে দেখল মেয়েটাকে। নীল রঙা একটা গোল জামা পরে আছে, মাথায় ওড়না দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। তবুও মুখ দেখতে অসুবিধা হয়নি তার। ছোটোখাটো মুখটা কেমন চুপসে আছে, আতঙ্ক ছেয়ে আছে পুরো মুখ জুড়ে। নাওয়াজের মায়া লাগল। অনুভূতিহীন, কাঠখোট্টা ছেলেটা প্রথমবারের মতো কেমন প্রশান্তি অনুভব করল, বুঝল সে একেবারে অনুভূতি শূন্য হয়ে যায়নি। তার অনুভূতি রয়েছে। কিন্তু সেইটা কেমন চাপা পড়ে রয়েছে। আল্লাহ কিছু নিয়ে তার দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেয়। এই যে বোনের অভাব পূরণ করে দিল। একই মায়ের উদরের না হোক, বোন তো। এই মেয়েটাকে মাথায় তুলে রাখবে সে।
– আপনার বাবার মতোই লাবণ্যর বাবাও একজন শিক্ষক ছিলেন। তবে দুজনের মধ্যে মনুষ্যত্বের দিক থেকে আকাশ পাতাল ফারাক। একজন একাধারে আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ স্বামী, আদর্শ বাবা হলেও অন্য একজন ঠিক ততটাই নিকৃষ্ট মানসিকতার ছিল। মানুষে মানুষে, পুরুষে পুরুষে যে তফাৎ হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ লাবণ্যর বাবা। আঞ্জুম মানুষ বলে না পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নেই। এই কথা সম্পূর্ণ ভুল। খারাপ বাবা হয় আঞ্জুম। আপনার, আমার বাবা ভালো বিধায় অন্যের বাবাও ভালো এমন ধারণা পোষণ করা নিতান্তই বোকামি। খালা বেঁচে থাকতেই ঐ লোক বিয়ে করে ঘরে বউ আনে। কেমন চরিত্রহীন হলে এমন কাজ করে আমায় বলুন। খালা স্বামীর এমন প্রতারণা সহ্য করতে পারেনি। খালা মারা যেতেই লাবণ্যর জীবন কেমন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
লাবণ্য ছিল তার সৎ মায়ের সংসারে একটা উটকো ঝামেলা। ভদ্রমহিলার আগের স্বামীর সাথে বনিবনা হয়নি বিধায় ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। লাবণ্যর বাবা আর সেই মহিলা একই স্কুলে শিক্ষকতা করত। দীর্ঘদিনের সংসার জীবনে, চৌদ্দ বছরের একটা মেয়ে থাকা সত্ত্বেও লাবণ্যর বাবা পরকীয়ার মতো জঘন্য একটা কাজে জড়িয়ে পড়ে। তারপর বছর যেতেই ঘরে তুলে ঐ মহিলাকে।
ঘরের সব কাজ লাবণ্যকে করতে হতো। বাচ্চা একটা মেয়ে একা হাতে গোটা সংসারের কাজ করে। সারাদিন ঘরের সব কাজ করিয়ে রাতে স্বামী এলেই লাবণ্যর নামে নালিশ জানাত। লোক সমাজে থাকা তথাকথিত স্ত্রীর কথায় যাচাই বাছাই ছাড়াই সব বিশ্বাস করে মেয়ের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করেনি। কত শত আঘাত করত ছোট্ট ঐ শরীরে। মুখ বুজে সব সহ্য করতে হতো লাবণ্যকে। সেই থেকে মেয়েটা কেমন গুটিয়ে যায়, সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকত। এই বুঝি তার কোনো ভুলের জন্য ছোটো মা বাবার কাছে নালিশ করবে। তারপর বাবা তার গায়ে হাত তুলবে। প্রতিবারের মতো সে আদৌ ঐ কাজ করেছে কিনা জানতে না চেয়েই আঘাত করবে। মা মরা মেয়েটাকে দিনের পর দিন অমানবিক অত্যাচার সহ্য করে পড়ে থাকতে হলো বাবা নামক পুরুষটার ঘরে। একদিন ভাতের মাড় গালতে গিয়ে হাতে পড়েছিল লাবণ্যর। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে ভাতের পাতিল ফেলে দিয়েছিল মেয়েটা। দুপুরের সময় ভাত খেতে বাড়িতে এসেছিল লাবণ্যর বাবা। এমন সময় ভাতের পাতিল ফেলে দেওয়ায় লাবণ্যর সৎ মা বলেছিল, লাবণ্য ইচ্ছে করে পাতিল ফেলে দিয়েছে যেন লাবণ্যর বাবাকে না খেয়ে যেতে হয়। লাবণ্যর সৎ মা শলার ঝাড়ু দিয়ে মেরে ছিল সেদিন মেয়েটাকে। লাবণ্যর বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল সব। একবারের জন্যও আটকায়নি। লাবণ্য জলভরা চোখে বাবার দিকে চেয়েছিল। ভেবেছিল এই বুঝি বাবা বাধা দিবে। বলবে, অকারণে কেন মারছ মেয়েটাকে। কিন্তু তিনি কিছু বলেননি সেদিন। তার সেই নিশ্চুপতা ভয়ঙ্করভাবে আঘাত হানে লাবণ্যর নাজুক মনে। মার সহ্য করতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল লাবণ্য, সারা রাত জ্বরে ভুগতে হয়েছে। জ্বরে কাতরাতে থাকা মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না।
কথায় আছে না, প্রকৃতি ছাড় দেয়। কিন্তু ছেড়ে দেয় না। প্রকৃতি ছাড় দেয়। কিন্তু উপরে যিনি আছেন তিনি বোধহয় ছাড় দেন না। লাবণ্যর বাবাকেও দেয়নি। চলন্ত ট্রাকের চাপায় পিষে গেল। কী ভয়ঙ্কর মৃত্যু। এমন মৃত্যু তাদের এলাকায় আগে কখনো হয়নি। পুরো গ্রামবাসী আতঙ্কে সিঁটিয়ে গিয়েছিল লাশ দেখে। অনেকে সেই লাশ চোখে দেখার সাহস করে উঠতে পারেনি। পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছিল, রক্তে ছেয়ে গিয়েছিল পুরো শরীর।
মিডিয়ায় সেই মৃত্যুর খবর একেবারে তোলপাড় করে দিল। ইয়াজমীন খবর পেয়েই ছুটে গিয়েছিল। সেখানে গিয়েই আশেপাশের সবার কাছ থেকে জানতে পারে লাবণ্যকে নিজের বাড়িতে কেমন কাজের মেয়ের মতো থাকতে হচ্ছে।কত লাঞ্ছনা অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে অতটুকু একটা মেয়েকে। ইয়াজমীন সব শুনে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। সেদিনই লাবণ্যকে নিয়ে আসে নিজের সাথে করে। মনে মনে অনুতপ্ত হয় ইয়াজমীন। স্বামীকে হারিয়ে পরিবারের কারো সাথে সুসম্পর্ক ছিল না, একপ্রকার নিজ দায়িত্বে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাকে দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাতেই মূলত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছিল।
লাবণ্যকে পেয়ে বোন নেই এই কথা কখনো মাথায় আসেনি নাওয়াজের। এমন একটা ফুটফুটে আদুরে মেয়ে থাকতে বোনের অভাব বোধ হবে কেন। কিন্তু কঠোরতায় মুড়ে থাকা নাওয়াজ নিজের স্বভাব সুলভ আচরণ করতে পারত না লাবণ্যর সামনে। শত চেষ্টা করেও মেয়েটার সামনে নিজের অনুভূতি প্রকাশে ব্যর্থ হতো। তাছাড়া লাবণ্য কেমন ভয়ে ভয়ে থাকত। দিনের বেশিরভাগ সময় দরজা আটকে ঘর বন্দি হয়ে থাকত মেয়েটা। মাস ছয়েক তো ঠিকমতো নাওয়াজের সামনেই আসেনি। নাওয়াজ হতাশ হতো লাবণ্যর এমন কর্মে। তাছাড়া নিজের প্রতিও বিরক্ত হতো ছেলেটা। নাওয়াজ চেয়েও আর পাঁচটা ভাইয়ের মতো সহজতর আচরণ করতে পারেনি লাবণ্যর সাথে। কেমন একটা দূরত্ব থেকে গেল দুজনের মাঝে।
– ও এমন কেন করল আঞ্জুম? আমাকে… আমাকে নিজের বাবার মতোই ভেবেছিল।
নাওয়াজের শরীর কাঁপছে। আভিরা স্পষ্ট টের পেল সে কম্পন। আভিরা বুঝল লাবণ্যর কাজটা নাওয়াজ এখনও মানতে নারাজ।
– আমি এখন ঘুমাব। দয়া করে রুমে চলুন।
– কেন শুনবেন না? আপনার স্বামীকে নিয়ে তার বোন কেমন নিকৃষ্ট ধারণা পোষণ করে রেখেছে।
– না আমি শুনতে চাইছি না, শোনার প্রয়োজন নেই। আপনি আসবেন? না কি আমি একাই রুমে যাব?
– চুপচাপ বসে থাকুন। আমার কথা শেষ হয়নি।
আভিরা নিঃশব্দে নাওয়াজের কথা শুনতে লাগল। এতক্ষণ যেমন শুনছিল।
– লাবণ্য সবসময় আমার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলত।
সেজন্য আমিও মেয়েটার সাথে তেমনভাবে সহজ হওয়ার চেষ্টা করিনি। যেই মেয়ে কোনোদিন আমার সাথে অকারণে কথা অবধি বলেনি তার মনে আমাকে নিয়ে এমন অযাচিত ভাবনা তৈরি হতে পারে এমন কথা কখনো মাথায় আসেনি। মেয়েটার মনে আমাকে নিয়ে কোনো অনুভূতি আছে তা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি আমি। লাবণ্য কখনো বুঝতে দেয়নি আমাকে। এমন কোনো আচরণও করেনি যাতে বুঝা সম্ভব আমাকে নিয়ে লাবণ্যর মনে কোনো অনুভূতি আছে। আমি বুঝলে এমন কিছু হতো না, হতে দিতাম না।
ওর গায়ে থাকা লাল শাড়িটা আপনার জন্য এনেছিলাম। লাল শাড়ি পরিহিত অবস্থায় মেয়েটাকে দেখে একবারের জন্যও মনে হয়নি ঐটা আপনি না। মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম আমি, যে উদ্দেশ্যে আপনাকে জড়িয়ে ধরি। ওর ভাবনায় সঠিক হলো। আমি ওর বাবার মতোই চরিত্রহীন।
আভিরা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,
– আল্লাহর দোহাই লাগে, চুপ করুন। মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে আপনার। কী উল্টা পাল্টা কথা বলে যাচ্ছেন তখন থেকে।
নাওয়াজ থামে না। বলতেই থাকে নিজের মতো করে।
– আপনার গায়ের ঘ্রাণ আমার চেনা, আমার অবচেতন মস্তিষ্ক যেন জানান দিল এটা আমার আঞ্জুম না। সাথে সাথেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। লাবণ্যকে আপনার জায়গায় দেখে আমি এতটাই হতভম্ব হয়েছিলাম, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না ও শাড়ি পরে আমার রুমে কেন এসেছে। মেয়েটা যখন ভালোবাসার কথা বলেছিল বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল আমার। নিজের প্রতি কেমন ঘৃণা আসছিল।
লাবণ্যকে ঐ অবস্থায় দেখে মাথা কাজ করছিল না, চেষ্টা করেও যখন মেয়েটাকে দূরে সরাতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছিলাম তখন আপনার মুখশ্রী চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল ঐ চোখে ঘৃণা দেখার আগে আমার মরণ হোক। আমার মনে আপনি ছাড়া অন্য কেউ নেই। এই ইয়াজিদকে পাওয়া এত সহজ নয়। কিন্তু আপনি ঠিক সময়ে না আসলে কি হতো আমি ভাবতে পারছি না। আপনাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলতে হতো। আঞ্জুম আপনারও কী মনে হচ্ছে, আপনার স্বামী চরিত্রহীন? আপনি আমাকে চরিত্র…
কথা সম্পূর্ণ হলো না। উদরে উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তেই আভিরা বুঝল নাওয়াজ ঘুমিয়ে গিয়েছে। আভিরা নাওয়াজের কপালে চুমু খেল। একে একে সারা মুখে ঠোঁট ছোঁয়াল। মেয়েটা আজ লজ্জায় হাঁসফাঁস করল না, আড়ষ্ট হলো না তনু মন। শুধু বিড়বিড় করে বলে গেল, এ মানুষটা তার, শুধু তার।
ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে থাকা নর নারী পাশের বারান্দায় থাকা মানবীর উপস্থিতি টের পেল না। আস্তে আস্তে সে অবয়ব মিলিয়ে গেল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের সব কথায় শুনেছে সে।

