#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫৬
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
আভিরা বিছানায় শুয়ে ছিল মাত্রই, ফোনের আওয়াজে ধড়ফড়িয়ে উঠল। নাওয়াজ প্রায় এ সময়ে ফোন দিয়ে খোঁজ নিবে। আভিরা ভাবল হয়তো নাওয়াজ কল দিয়েছে। কিন্তু না বাড়ি থেকে কল এসেছে। আভিরা হাফ ছেড়ে বাঁচল। তিনটে বাজতে চলল। সে এখনও দুপুরের খাবার খায়নি। লোকটা কল দিলে ঝামেলায় পড়ে যেত। খেয়েছে কিনা জানতে চাইলে, না পারত মিথ্যা বলতে আর না পারত সত্য বলতে। চাইলে সে এ লোককে মিথ্যা বলতেই পারে। কিন্তু লোকটা কেমন করে যেন বুঝে যায়। সেদিন সে না খেয়ে ভার্সিটিতে গিয়েছিল। তড়িঘড়ি করে বেরুতে গিয়ে খাওয়ার সময় পায়নি একদম। ইয়াজমীন বারবার বলেছে খেয়ে যেতে, সে বলেছিল পরে কিছু একটা খেয়ে নিবে। কিন্তু পরে আর খাওয়ার সময় বের করে উঠতে পারেনি। সে যাওয়ার পাঁচ মিনিটের মাঝেই ক্লাসে স্যার প্রবেশ করে। মেয়েটা আর বের হতে পারেনি। নাওয়াজ ফোন দিয়ে জানতে চাইলে আভিরা তৎক্ষণাৎ মিথ্যা বলে বসে। কিন্তু ধরা পড়ে যায় পরমুহূর্তে। সেই থেকে এ লোককে সে মিথ্যা বলে না। আবার সত্য বললেও তার বিপদ। এ লোক বাড়ির সকলকে ফোন করে খাইয়ে ছাড়ে। সে না খাওয়া অবধি ইয়াজমীনও কাছ ছাড়া হয় না। ইয়াজমীন না পারলে বর্ণা এসে খাইয়ে যাবে। এমন ঝামেলার তোপে কে পড়তে চায়। সেজন্য ফোনে কল এলেই মেয়েটা আঁতকে উঠে নাওয়াজ কল দিয়েছে এই ভেবে।
আভিরা কল রিসিভ করতেই কানে এলো বাচ্চা কোনো ছেলের কান্নার শব্দ।
– আম্মুর কী যেন হয়েছে, আপু তুমি তাড়াতাড়ি এসো।
আম্মুর কী যেন হয়েছে। কথাটা শুনেই আভিরার বুক ধক করে উঠল। তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করল,
– কী হয়েছে আম্মুর?
– জানি না। রান্না করছিল, হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায়। কয়েকবার ডেকেছি। কিন্তু চোখ মেলেনি। আমার ভয় করছে।
ছেলেটা ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে লাগল। বাড়িতে কেউ নেই। সে আর মা একা। বাবাকে কয়েকবার কল দিয়েও পায়নি। পরে আভিরাকে কল লাগাল।
– আচ্ছা তুই কান্না থামা, আমি আসছি।
আভিরার বুক ধড়ফড় করছে। মায়ের হঠাৎ কী হলো। মেয়েটা কল কেটে বেরিয়ে গেল। বের হওয়ার আগে লাবণ্যকে বলে গেল নাওয়াজকে যেন বলে সে ও বাড়ি যাচ্ছে। পথিমধ্যে বার কয়েক ব্যস্ত হাতে নাওয়াজকেও কল দিল। কল ধরছে না ঐ লোক। তার শাশুড়ি মা বাড়ি নেই। নাওয়াজের বড়ো খালা অসুস্থ। এতটাই রোগাক্রান্ত যে প্রৌঢ়া মহিলা বিছানা থেকে উঠতে সক্ষম নন। বোনের অসুস্থতার কথা শুনে ইয়াজমীন সেদিনই বোনের বাড়ি ছুটে গিয়েছে। লাবণ্য সাথে যেতে চাইলেও ইয়াজমীন নেয়নি। আভিরা না থাকলে তিনি লাবণ্যকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। কিন্তু লাবণ্য তার সাথে চলে গেলে আভিরাকে একা থাকতে হবে। নাওয়াজকে প্রায় রাতে হাসপাতালে থাকতে হয়। তখন লাবণ্য না থাকলে আভিরা একা থাকবে কি করে। এমনিতেই দুটো মেয়েকে বাড়িতে একা রেখে যেতে মন মানছে না তার। মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না। রাতের আঁধারে তারা জানোয়ারের রূপ ধারণ করে, ছিঁড়ে খুবলে খেতে চায়। আশেপাশের কাউকে যে বাড়িতে রেখে যাবে সে উপায়ও নেই। মাহিরা বাড়িতে থাকলে তাকে দিয়ে যাওয়া যেত আভিরা, লাবণ্যর সাথে। কিন্তু মেয়েটা বাড়িতে নেই। ইয়াজমীন বোনের এ অবস্থায় তাকে না দেখতে যেয়েও পারবে না। মায়ের পরে এ বোনই তাকে আগলে রেখেছে। বছর কয়েক আগে এমনভাবেই তো মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে তাকে দেখতে ছুটে গিয়েছিল ইয়াজমীন। কিন্তু ফিরতে হয়েছিল স্বামীর লাশ নিয়ে। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ঘটনা মনে পড়লে আজও ইয়াজমীন কেঁপে ওঠে। ঐ মানুষটাকে হারিয়ে সে নিঃসঙ্গ, একাকী এতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছে। অথচ তার পরিবার থেকে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য জোর করা হয়েছিল স্বামী মারা যাওয়ার বছর যেতেই। বিধবা মেয়েদের সমাজে টিকে থাকা অনেক দুরূহ। উঠতে বসতে শুনতে হয় সে অপয়া, পরিবারের বোঝা হয়ে কতকাল পড়ে থাকবে। শান্তশিষ্ট ইয়াজমীন কাউকে তোয়াক্কা করেনি তখন। সে অন্য কাউকে গ্রহণ করবে না। যতদিন বেঁচে আছে গত হওয়া স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে থাকবে। তাছাড়া ওনার সতেরো বয়সের একটা ছেলে আছে। এই ছেলে রেখে তিনি বিয়ের কথা ভাবতেই পারেন না। ইয়াজমীনের মা তো একসময় মেয়েকে বোঝাতে না পেরে নিজের অসুস্থতার দোহাইও দিয়েছিল। কিন্তু মেয়েকে টলাতে পারেনি। ইয়াজমীন নিজের সিদ্ধান্তে অটল, সে তার জীবনে কাউকে জড়াবে না। বয়স পঁয়ত্রিশ ছুঁই। বাঁচবে আর কয় বছর। এই বয়সে কিনা স্বামীকে হারিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করবে। বিষয়টা লজ্জার, ধিক্কারের। তাছাড়া তিনি নিজেই চাইছেন না তার জীবনে কাউকে জড়াতে। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়েছিল ইয়াজমীনের। বিয়ের এক বছরের মাথায় নাওয়াজ আসে তার কোল জুড়ে। তার প্রথম সন্তান, তার আর তার স্বামীর ভালোবাসার অংশ। সেই ছেলেকে নিয়ে আজ জীবনের অনেকটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গীর প্রয়োজন হয়নি কখনো, একাকীত্বে, নিঃসঙ্গতায় ভোগেননি তিনি। কখনো ভুলবশতও মনে আসেনি তার কোনো সঙ্গীর প্রয়োজন।
_
আভিরা একপ্রকার ছুটে গেল মায়ের ঘরে। আনেসা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। তোফায়েল আহমেদ নির্বাক চিত্তে বসে আছে স্ত্রীর পাশে। মাকে সজ্ঞানে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আভিরা। গিয়ে বসল মায়ের গা ঘেঁষে। হলবলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– কী হয়েছে তোমার?
– প্রেশার ফল করেছে তোমার মায়ের।
– হঠাৎ এমন হলো কেন?
– সে তোমার মাকে জিজ্ঞেস করো।
বাবার এমন গম্ভীর কণ্ঠ শুনে আভিরার এ অবস্থায়ও হাসি পেল। তবে হাসির ছাপ চেহারায় ফুটে উঠল না। বাবাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখা যায় না সচরাচর। বাবা নামক এ মানুষটা নিতান্তই গম্ভীর পুরুষ। ছোটো থেকে মেয়েটা বাবার গম্ভীর রূপই দেখে এসেছে সদা। সে এমন রূপের সাথেই অভ্যস্ত। তোফায়েল আহমেদের পেশাগত স্বভাব যেন কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়ি অবধি। মেয়ের সাথেও সেই কলেজের গম্ভীর অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ। ছেলেমেয়ে দুটোই বাবাকে গম্ভীর মানুষ হিসেবে জানে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ সর্বদা মেয়ের সাথে নমনীয় কণ্ঠে কথা বলেন। তবুও যেন তার নমনীয়তা আড়ালে পড়ে সেই কলেজ অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদের নিকট। তবে মেয়ের সাথে নমনীয় হলেও ছেলের সাথে সর্বদা কঠোর। সেজন্য তাযীম বাবার থেকে দূরে দূরে থাকে। তার যত আবদার বোনের কাছে। আভিরা বলতে পাগল, বোনের নেওটা একেবারে। তাদের সম্পর্ক আর পাঁচটা ভাইবোনের মতো না। তাদের মধ্যে কখনো ঝগড়াঝাঁটি, মারামারি, হৈ হুল্লোড় হয়েছে কিনা সন্দেহ। ভাইকে ভীষণ স্নেহ করে আভিরা, তাযীম তার বড্ড আদরের। ভাইয়ের সাথে কখনো চোখ রাঙিয়ে কথা বলেনি মেয়েটা। বাবার গম্ভীর স্বভাবটা না পেলেও বাবার মতোই আভিরা স্বল্পভাষী, চাঞ্চল্যতা নেই তার মাঝে। অনুভূতি প্রকাশে অক্ষম। সহসাই কারো প্রতি নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে উঠতে পারে না। নাওয়াজের প্রতি তার অনুভূতিও অন্তরিন্দ্রিয়ে সুপ্ত প্রায়। মেয়েটা স্বীকারোক্তি স্বরূপ প্রকাশ্যে আনতে পারেনি সেই অনুভূতি।
আভিরা ভাইয়ের ঘুমন্ত মুখপানে চেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তাযীম মায়ের পাশেই শরীর গুটিয়ে ঘুমিয়ে আছে।
আভিরা লেবুর শরবত বানিয়ে এনে মাকে দিল খাওয়ার জন্য। রান্নাঘরে যেতে দেখল চুলোয় অর্ধেক রান্না পড়ে আছে। আভিরা পুরো রান্না শেষ করে বাবাকে খেতে ডাকল। বাবার নিশ্চয় দুপুরে খাওয়া হয়নি। এতটা সময় ধরে অভুক্ত। আভিরার খারাপ লাগল। তাযীমকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে চটপট খাইয়ে দিল। এ বাড়িতে থাকতে সর্বক্ষণ যে নিজের হাতেই খাইয়ে দিত। ছেলেটাকে খাওয়ানো থেকে শুরু করে তার স্কুলের টিফিন প্যাক করে দেওয়া সব একা হাতে করত আভিরা। আর এখন কিনা সে ভাইয়ের দেখা মেলাই দুষ্কর। জীবন কাকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় বলা মুশকিল।
–
দেহে রক্তের পরিমাণ হ্রাস পাওয়া, হরমোনের পরিবর্তন, রক্তগাত্রের প্রশস্ততা বেড়ে যাওয়া, ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, রক্তস্বল্পতা, হৃৎপিণ্ডে কিংবা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির সমস্যার কারণে নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে। রক্তের পরিমাণ কমে যাওয়া নিম্ন রক্তচাপের প্রধান কারণ।
দিনের বিভিন্ন সময় আমাদের রক্তচাপের তারতম্য হয়। হাঁটাচলা, ব্যায়াম, পরিশ্রম, পানিশূন্যতা, বিশ্রাম কিংবা ঘুম অনেক কিছুর সঙ্গে রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সময় দাঁড়ানো, শোয়া বা বসে থাকাও রক্তচাপের উপর প্রভাব ফেলে। মধ্যরাতে ঘুমের মধ্যে রক্তচাপ সবচেয়ে কম থাকে। বাড়তে শুরু করে ভোর থেকে। দুপুর ও বিকেলে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে কমতে থাকে সন্ধ্যা থেকে। এই উঠানামা সাধারণত সিস্টোলিকের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং ডায়াস্টোলিকের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ মিলিমিটারের মধ্যে থাকে। তাই বিভিন্ন সময় পরিমাপ একটু এদিক ওদিক পাওয়াটা স্বাভাবিক। নিম্ন রক্তচাপ উচ্চ রক্তচাপের মতো কোনো রোগ নয়। নিম্ন রক্তচাপ হতে পারে অন্য কোনো রোগের উপসর্গ। তাই কারো নিম্ন রক্তচাপ হলে (৯০/৬০ মিমি পারদের কম), তার সঠিক কারণ বের করে চিকিৎসা করতে হবে। আর যদি হঠাৎ করে এমনটা হয় তাহলে অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
তোফায়েল আহমেদ বসে রইলেন না। আনেসা একটু ঠিক হতেই তাকে নিয়ে ক্লিনিকে এসেছে। হঠাৎ করে প্রেশার লো কেন হলো। আগে এমনটা কখনো হয়নি। হঠাৎ প্রেশার লো হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের সরনাপন্ন হওয়া উচিত। বাবা মায়ের সাথে আভিরাও এসেছে। হাসপাতালের করিডোরের চেয়ারে বসে আছে আভিরা। হঠাৎ নাওয়াজের কথা মাথায় এলো তার। মাকে নিয়ে এতটাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিল যে লোকটার কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। কল দিতেই ফোন সুইচড অফ দেখাল। আভিরা অবাক হলো কিছুটা। বিকেল পাঁচটা নাগাদ বাড়িতে এসেছে, এখন রাতের নয়টা। বিকেল থেকে তার দেওয়া লাগাতার কল রিসিভ না হলেও এতটা ভয় জেঁকে ধরেনি, এখন যতটা আতঙ্কগ্রস্ত লাগছে তাকে। লোকটার ফোন বন্ধ কেন। সে যে এতগুলো কল দিয়েছে ঐ লোক কী দেখেনি। চিন্তায় আভিরার মাথা খারাপ হয়ে গেল। আভিরা ধীর পায়ে মায়ের কেবিনে যায়। চিন্তিত মুখে চেয়ার টেনে বসল মায়ের সামনে। আনেসা দেখল মেয়ের মুখ শুকিয়ে একটুখানি হয়ে আছে। এমন অবস্থা যে তার অসুস্থতায় নয় তাও বেশ বুঝতে পেরেছেন।
– কী হয়েছে তোর?
– আমি বাড়ি যাব মা।
– সে তো একটু পরেই যাব। তোর বাবা ডাক্তারের সাথে কথা বলছে, কথা শেষ হলেই বের হব।
– আমাদের বাড়িতে না…
– তাহলে?
– ও বাড়িতে যাব।
– মানে? মাথা ঠিক আছে তোর? এই রাতের বেলা বলছিস ও বাড়িতে যাবি। বিকেলে কেন বললি না এই কথা। এখন তো তোর বাবাও তোকে যেতে দিবে না। আর না আমি দিব।
আভিরা হঠাৎ দু হাতে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠল। আনেসা অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। মেয়ে কখনো তার সামনে কান্না করে না। সে কাঁদবে আড়ালে, মাকে বুঝতে দিতে চায় না নিজের অসহায়ত্ব। আর আজ কিনা এই হাসপাতালের কেবিনে বসে কাঁদছে। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,
– কী হলো? কাঁদছিস কেন? আমাকে বল।
– ও বাড়িতে যাব।
আনেসা বুঝল না তার মেয়ে হঠাৎ এমন পাগলামি করছে কেন ঐ বাড়িতে যাওয়ার জন্য।
– আচ্ছা কান্না থামা। তোর বাবা দিয়ে আসবে তোকে।
তোফায়েল আহমেদ ক্লান্ত পায়ে হেঁটে এলেন কেবিনে। ভদ্রলোককে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আভিরা বাবার দিকে চেয়ে মায়ের দিকে তাকাল। তোফায়েল আহমেদ আনেসাকে এক হাতে আগলে বেড থেকে নামতে সাহায্য করলেন। আভিরা গেল বাবা মায়ের পিছনে। অসহ্য লাগছে তার। মা কেন বাবাকে বলছে না।
– মেয়েটাকে একটু দিয়ে আসো তো।
তোফায়েল আহমেদের কদম থেমে যায়। প্রশ্নবিদ্ধ নজরে চাইলেন স্ত্রীর পানে। না বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন,
– দিয়ে আসব মানে?
– ও বাড়িতে দিয়ে এসো। লাবণ্য মেয়েটা বাড়িতে একা। আপা তো এখনও ফিরেনি। নাওয়াজ কখন আসবে না আসবে তার ঠিক নেই।
আনেসাকে বাড়িতে না দিয়ে মেয়ের সাথে যাওয়া সম্ভব নয়। তোফায়েল আহমেদ মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– আসুন। আপনার মাকে বাড়িতে দিয়ে এসে আপনাকে নিয়ে যাব।
আভিরা অস্থির হয়ে উঠল। এখন রাতের নয়টা বাজে। এখান থেকে কুমিল্লা যেতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগবে। আবার তাকে দিয়ে এসে বাবাকে ফিরতেও হবে। এখন রওনা না দিলে অনেকটা দেরি হয়ে যাবে। আভিরা বাবাকে বলল,
– তুমি মাকে নিয়ে চলে যাও। আমি একা যেতে পারব। তোমার দিয়ে আসতে হবে না।
– আপনাকে এত রাতে একা ছাড়ব না। ভুলেও একা যাওয়ার কথা মাথায় আনবেন না।
– এখন আমাকে দিয়ে আসতে গেলে তোমার ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
– সে নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। বজলুল ভাইকে আসতে বলেছি।
– চাচাকে বলে ভালো করেছ। আমাকে না হয় চাচা দিয়ে আসবে। তুমি আম্মুকে নিয়ে বাসায় চলে যাও।
– বজলুল আপনার মাকে নিতে আসবে।
– আম্মুর শরীর দুর্বল অনেক। এখন তুমি আমার সাথে চলে গেলে হবে।
তোফায়েল আহমেদ ভাবনায় পড়ে গেলেন। আনেসার শরীর দুর্বল অনেক। ঠিকমতো কদম ফেলতে পারছে না। তার হাত ধরে হাঁটার পরও ধীর কদমে পা ফেলছে। কী করবেন না করবেন ভেবে উঠতে পারলেন না। এর মধ্যেই হর্নের আওয়াজ কানে এলো। আভিরা সিএনজিতে চড়ে বসে। বাবাকে আশ্বাস দিয়ে বলল,
– আমি যেতে পারব বাবা।
– বাবা আসি সাথে, আপনি যেতে পারবেন না।
আভিরা বাবার চিন্তার কারণ বুঝল। তোফায়েল আহমেদ দোটানায় ভুগছেন। কাকে রেখে কার সাথে যাবে। আনেসার শরীর ঠিক নেই। তাকে একা রেখে যাওয়া সম্ভব নয়। আবার মেয়েকেও একা ছাড়তে ভরসা পাচ্ছেন না।
– যেতে পারব। তুমি চিন্তা করো না। আম্মুকে নিয়ে বাড়িতে যাও। আম্মুর বিশ্রাম দরকার।
– আচ্ছা। সাবধানে যাবেন। পৌঁছে বাবাকে জানাতে ভুলবেন না।
– আচ্ছা।
– বজলুল ভাই, মেয়েটাকে তোমার ভরসায় ছাড়ছি। সাবধানে নিয়ে যেও।
– চিন্তা করবেন না ভাইজান। আভিরা মাকে সাবধানে পৌঁছে দিব।
যদিও ড্রাইভার তাদের চেনা পরিচিত। অনেক আগে থেকে বি-বাড়িয়া থেকে বাড়ি এলে এ সিএনজি করেই আসত। আভিরার তবুও কেমন যেন ভয় করছে। একা চলাফেরার অভ্যাস নেই তার। তাও এমন রাতের বেলা। মেয়েটা চোখে মুখে অন্ধকার দেখল। বাবা সাথে আসলেই ভালো হতো। কেন যে বেশি বুঝে নিষেধ করল। এখন সহি সালামত শ্বশুর বাড়ি পৌঁছাতে পারলেই হলো। পথিমধ্যে যেন কোনো অঘটন না ঘটে। আভিরা বারবার আল্লাহ আল্লাহ করছে, বিড়বিড় করে দোয়া দরুদ পাঠ করছে। বিপদে পড়লে যেন খোদা তায়ালার কালাম এমনিতেই জিভের ডগায় থাকে। এছাড়া আল্লাহর নাম নিতেও মানুষ জাতি গড়িমসি করে বেড়ায়।
মাঝ রাস্তায় এমন গাড়ি থামাতে দেখে আভিরা ভয় পেয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
– কী হয়েছে চাচা? এখানে থামালে কেন?
– আর বইল না, জ্যাম লাগছে। সামনে নাকি বালুর গাড়ি উল্টাইয়া খাদে পড়ছে।
– বেশি সময় লাগবে চাচা?
– মনে হয় না। গাড়ি খাদ থেকে উঠালেই জ্যাম ছেড়ে যাবে।
আভিরার নজর ফোনের দিকে। বারবার দেখছে লোকটা কল দিয়েছে কিনা। এই যে সে এতক্ষণ ধরে বাড়িতে নেই লোকটা একটা কল দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। এখন আবার ফোন বন্ধ করে বসে আছে। অভিমানে আভিরার আঁখি সিক্ত হয় অশ্রুতে।
_
– আঞ্জুম কোথায়?
লাবণ্য কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,
– রু্রুমে।
নাওয়াজ এতটা খেয়াল করল না। ভাতের লোকমা মুখে তুলে বলল,
– খেয়েছেন উনি?
– হ্যাঁ।
নাওয়াজ টেবিল ছেড়ে উঠে বলল,
– এই প্যাকেটটা নাও। ওনাকে বলো এটা পরে তৈরি হয়ে নিতে। আমি একটু বাহিরে যাচ্ছি।
– কোথায় যাবে?
– কাজ আছে একটু। দশ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসব।
লাবণ্য উপরে যেতে নিলেই নাওয়াজ পিছু ডাকল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে মেয়েটার হাতে দিয়ে বলল,
– বন্ধ হয়ে গেছে। চার্জে লাগিয়ে দিও।
নাওয়াজ ফিরল মিনিট বিশেক পর। তার মাথা কেমন ঝিম ধরে গিয়েছে। হঠাৎ কেন এমন হলো বুঝে উঠতে পারল না। দ্রুত মায়ের রুমে গেল। গোসল করলে যদি কিছুটা ভালো লাগে। নাওয়াজ টলতে টলতে রুমে এলো। চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে সে। শরীর টলছে অনবরত। ঘোর লাগা চোখে সামনে চাইল। টকটকে লাল শাড়িতে কোনো অপ্সরা দাঁড়িয়ে আছে তার রুমে। নাওয়াজ গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। নিজের সাথে মিশিয়ে নেশাগ্রস্তের ন্যায় ডাকল,
– আঞ্জুম, শরীর কাঁপছে কেন আপনার?
প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। নাওয়াজের ঘোর কাটে। হঠাৎ মনে হলো এটা তার আঞ্জুম না। নাওয়াজ আলগা করে হাতের বাঁধন। দরাজ কণ্ঠে বলল,
– লাবণ্য তুমি…
মেয়েটা ফিরে চায়। অশ্রু টলমল করছে তার চোখে। এই বুঝি বর্ষণ করবে। ভিজিয়ে দিবে মুখশ্রী। নাওয়াজ ঐ টলমলে চোখের দিকে চাইলও না। ক্রোধে তার শরীর কাঁপছে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– তুমি এখানে কী করছ? আঞ্জুম কোথায়?
– আমি তোমাকে ভালোবাসি নাওয়াজ ভাই।
নাওয়াজ বিস্ফোরিত নয়নে চাইল। তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল হঠাৎ। দু হাতে মাথা চেপে ধরে বলল,
– কী আবোল তাবোল বকে যাচ্ছ? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার?
– আবোল তাবোল না, আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি নাওয়াজ ভাই। বুঝ হওয়ার পর থেকেই।
– চুপ করো লাবণ্য। বের হও আমার রুম থেকে। আঞ্জুম দেখলে ভুল বুঝবেন আমাদের দুজনকে।
– তোমার আঞ্জুম তো বাড়িতে নেই। সেজন্য তো আমি তোমাকে নিজের করার সুযোগ পেয়েছি। আমাকে আপন করে নাও। বিশ্বাস করো আভিরাকে ভুলিয়ে দিব।
নাওয়াজের শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল এমন নোংরা ইঙ্গিতে। এই মেয়ে তাকে কী ভাবে। নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তাকে পেয়ে যাবে। নাওয়াজ কিছুটা এগিয়ে আসে। লাবণ্যর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে দু হাতে শক্ত করে গাল চেপে ধরল লাবণ্যর। হিসহিসিয়ে বলল,
– এই মুখ দিয়ে যেন আর একটাও বাজে কথা বের না হয়। তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।
লাবণ্য ভয় পেল কিনা জানা নেই। তবে পাগলের মতো উচ্চস্বরে হেসে উঠল মেয়েটা। বিড়বিড় করে বলল,
– আমাকে কেন ভালোবাসলে না নাওয়াজ ভাই? আজ আমাকে তোমার গ্রহণ করতেই হবে। আমি বাধ্য করব। তোমার খাবারে মেডিসিন মিশিয়ে রেখেছিলাম। তুমি চাইলেও দূরে ঠেলতে পারবে না, নিয়ন্ত্রণ হারাবে নিজের। আমাকে তোমার করতেই হবে।
নাওয়াজের বুঝতে বাকি নেই এ জন্যই শরীর এমন লাগছে, মাথা ভার হয়ে আসছে। তার শরীরে যেন কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। টাল সামলাতে না পেরে বিছানায় পড়ল সে। ঘোলাটে চোখে দেখল লাবণ্য ঝুঁকে আসছে তার দিকে। মেয়েটার হাত শাড়ির আঁচলে। নাওয়াজ বুজে আসা স্বরে বলল,
– এমন ভুল করবে না লাবণ্য। আল্লাহর কসম শাড়ির আঁচল নামালে আমি তোমাকে খুন করব।
_
ঝিরঝির করে পড়া বৃষ্টির ফোঁটায় আভিরা ভিজে একাকার। দমকা হাওয়া বইছে তীব্র বেগে, ধুলোবালি উড়ে চোখে বিঁধছে। আভিরা চোখ বুজে পড়ে রইল। মেঘ ডাকছে। এই বুঝি ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে। কালো মেঘে ছেয়ে গেল আসমান। চাঁদটাও ডেকে গেল কৃষ্ণবর্ণ মেঘের আড়ালে। বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতে আভিরা তড়িঘড়ি করে নেমে বজলুলের হাতে হাজার টাকার একটা নোট গুঁজে দিল।
– এই টাকা ক্যান দিতাছ আম্মা। তোমার আব্বা গাড়ি ভাড়া দিছে আমারে।
– এইটা ছুটকির জন্য চাচা। ওকে কিছু কিনে দিয়েন। আমি আসছি। সাবধানে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি যান। আকাশের অবস্থা ভালো না।
বলে মেয়েটা এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দৌড়ে বাড়ির ভিতরে গেল। বৃষ্টির দাপটে ঠিকমতো চোখ মেলতে পারছে না। বাড়ির ভিতরে আসতে আসতে শরীর ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। আভিরা জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সদর দরজায় কয়েকবার কড়া নাড়া হলেও কেউ খুলল না। ঠান্ডায় আভিরার শরীর কাঁপছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। আভিরা নিজের ব্যাগের চেইন খুলে দেখল বাড়ির চাবি আছে কিনা। ইয়াজমীন এক্সট্রা চাবি দিয়ে রেখেছিল তার কাছে। বাড়ির সদর দরজা থেকে শুরু করে প্রতিটা রুমের চাবি আছে। আভিরা কাঁপা হাতে নব ঘুরায়। দরজা খুলতে ধীর কদমে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। তার ভেজা জামা থেকে পড়া পানিতে টাইলস লাগানো সিঁড়ি ভিজে চলেছে। দ্রুত কদমে উঠতে গেলে পা পিছলে নিচে গড়িয়ে পড়বে তাতে সন্দেহ নেই।
আভিরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুমের দরজা ধরে। আধ খোলা দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল। দৃষ্টিগোচর হলো রুমের নোংরা দৃশ্য। তারই স্বামীর শরীর ছুঁয়ে লাবণ্য ঝুঁকে আছে, শাড়ির আঁচল অর্ধেক নামানো। আভিরা চোখ বুজে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।
_
থাপ্পড় মেরে আভিরা আর ফিরেও চাইল না। হঠাৎ মনে হলো গুনগুন করে কেউ কাঁদছে। এ কান্না মোটেও স্বাভাবিক নয়। আভিরা চেয়ে দেখল লাবণ্য হাঁটুতে মুখ গুঁজে কেঁদে চলেছে। হঠাৎ বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
তুমি কেন আসলে? সেদিনও এসেছিলে। আজও চলে এলে। তুমি না এলেই তো তাকে পাওয়া হতো। কেন এলে আভিরা। তোমার জন্য তাকে পেলাম না, তোমার জন্যই।
বলতে বলতেই চলে গেল রুম ছেড়ে। আভিরা সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নাওয়াজের দিকে চাইল। নাওয়াজ চোখ বুজে পড়ে আছে। আভিরা এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে তড়িৎ বেগে আছড়ে পড়ল নাওয়াজের বুকে। দু হাতে জাপটে বলল,
– শুনছেন?
নাওয়াজের সাড়া না পেয়ে মেয়েটা ডুকরে উঠল। কান্নারত কণ্ঠে বলল,
– আর কখনো কোথাও যাব না। কথা বলুন। এভাবে চুপ করে আছেন কেন? দয়া করে কথা বলুন। তাকান আমার দিকে। অসহ্য লাগছে আমার।
নাওয়াজ চোখ মেলে চায়। আভিরা ভয় পেল কিছুটা। চোখ দুটো কেমন রক্তিম হয়ে আছে। এত কাছ থেকে এমন রক্তিম চোখ জোড়া দেখে মেয়েটা ভয় পেয়ে গেল। উঠতে নিলেই নাওয়াজ ধীর কণ্ঠে বলল,
– উঠবেন না। এভাবেই থাকুন।
আভিরা আমতা আমতা করে বলল,
– আমার শরীর ভিজে গিয়েছে। জামা পাল্টাতে হবে।
নাওয়াজ হাতের বাঁধন শক্ত করল। আভিরা বুঝল আজ তার নিস্তার নেই। এভাবে ভেজা কাপড়েই এ লোকের বাহুডোরে আবদ্ধ থাকতে হবে।
– অবিশ্বাস করবেন না আমাকে।
নাওয়াজের ধীর কণ্ঠ কানে আসতে আভিরা তড়িঘড়ি করে বলল,
– অবিশ্বাস করছি না আমি। একটুও না। আমি বিশ্বাস করি আপনাকে।
নাওয়াজ মেয়েটার কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে ধীর কণ্ঠে আওড়ায়,
– মনের ভিতর কোনোরকম আশঙ্কা থাকলে তা দূর করুন। আমার অবচেতন মনও আপনাকে ছাড়া অন্য কোনো মেয়েকে ছোঁয়ার স্পর্ধা দেখাবে না। আর এখন তো আমি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আছি।

