#গোধুলি_রক্তিম_শিখা
#পর্ব_৫
#লেখিকা_নওশিন_আদ্রিতা
আকাশে একাধিক তারার মেলা বসেছে। অন্ধকার এর বুকে এই তারাগুলো যেন আলোর পথ তৈরি করেছে। যা অগনিত,যার পরিমান আজ অবধি কেউ কোনদিন জানতে পারেনি। কিন্তু আদ্রিতা যেন আজকে এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে নেমেছে। হাতের ব্যাথায় জ্বর নেমেছে শরীরে,কিন্তু তবুও ঠায় বসে আছে জানালার কাছে। বুক পাজরে অদ্ভুত শূন্যতা তাকে ঘিরে রেখেছে। চোখ দুইটাই বেয়ে অঝোরে অশ্রু নামছে, গলা শুকিয়ে আছে। কিন্তু কেউ নেই তাকে এক গ্লাস পানি খাওয়ানোর। আদ্রিতা কাঠের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠে,
“আমার কেউ নেই মা,কেউ না তুমিও ত বাকিদের মতোই আমাকে ফেলে দিয়েছে৷ কারো জীবনে আমার প্রয়োজন নেই,অপ্রোয়জনীয় এক বস্তু যেমন ব্যবহারের পরে ছুড়ে মারা হয় ঠিক তেমনই।”
আদ্রিতা জানালায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে ছিল। ঠিক এমন সময় ঝড়ের গতিতে তাকে বসা থেকে উঠিয়ে দেওয়ালে চেপে ধরে এক পুরুষালী হাত । পুরুষালী শরীরের তীব্র ঝাঝালো ঘ্রাণ আদ্রিতার নাকে প্রবেশ করতেই আদ্রিতার নাক অবধিও জ্বলে উঠেছে। আদ্রিতা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে নিলেই পুরুষালী হাত তার চোয়াল চেপে ধরে, হিসহিসিয়ে বলে উঠে,
“তোকে এখন এই মুহূর্তে জিন্দা কবর দিলে ব্যাপারটা কেমন হয় সুইটহার্ট? ব্যাপারটা বেশ থ্রিলিং তাই না? কেউ টের ও পাবেনা বুঝবেও না যে কি হলো কীভাবে হলো ব্যাপারটা মজা না?”
পুরুষটির কথায় আদ্রিতার শীড়দাড়া বেয়ে যেন ঠান্ডা শ্রোত বেয়ে গেল। শরীরের লোম গুলো কাটা দিয়ে উঠল ভয়ে, অসুস্থ শরীরে এমনিতেও শক্তি নেই তার। সেখানে এত শক্তিশালী একজনার থেকে ছাড়া পাওয়া অসম্ভব।
আদ্রিতা দুই হাত দিয়ে পুরুষটির বুকে ধাক্কা দিতে নিলেই পুরুষটির শক্ত হাত চেপে ধরে আদ্রিতার ব্যান্ডেজ করা হাত। ব্যাথায় কুকিয়ে উঠে আদ্রিতা,ব্যাপারটাই যেন সামনের মানুষটা মজা পেল। হাতের চাপ আরও দৃঢ় করে কাঠ কাঠ কণ্ঠে বলে উঠে,
“বেপরোয়া,অবাধ্য মানুষকে আমি সহ্য করতে পারিনা, তাই আমার অবাধ্য হয়ে নিজেকে শেষ করার চিন্তা ভাবনা করার কথা চিন্তাতেও এনো না সুইটহার্ট৷ আমি মানুষটা বড্ড পাষান। মায়া জিনিসটা একেবারেই নেয়৷ আর তোমার মতো কুৎসিত মানুষ এর প্রতি মায়া আসবেও না। কথাটা মাথায় ঢুকেছে?”
অতিরিক্ত ব্যাথা,ভয়, জ্বর না খাওয়া মেয়েটা আর চাপ নিতে পারে না৷ ঢলে পরে নীড় এর শক্ত বুকে। নীড় ভরকে যায় কিছু সময়ের জন্য। ধরতে গিয়েও ধরে না সেভাবেই দাড়িয়ে থাকে। কিছুক্ষনের মধ্যেই যখন আদ্রিতা নীড়ের বুক থেকে পড়ে যেতে নেয় ঠিক তখন ই নীড় তার বাহু জড়িয়ে কাধে তুলে নেয়,
“ইস্টুপিট,আর কোনদিন যদি তোকে দেখেছি ওই বাড়ি থেকে বের হয়েছিস তাহলে জান নিয়ে নিবো বেয়াদব মেয়ে।”
অজ্ঞান আদ্রিতা শুনলো না সে হুমকি। দেখলো না তাকে আবারো ফিরিয়ে আনা হয়েছে তার নীড়ে৷ যেখানে তার ঠায়,যার বুকের পাজরে তার স্থান সে বুকেই সারারাত ঘুমালো আদ্রিতা। নীড় বিরক্ত নিজের কাজে, তবুও সে ঘুমন্ত আদ্রিতাকে ফেলে যায়নি। কেন যায়নি এর উত্তর বের করতেও নীড়ের অনিহা।
—–
আজ নাইট ডিউটি থাকায় হসপিটালেই রাতের খাবার সারতে হবে আয়াজের। আয়াজ টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে ক্যান্টিনে প্রবেশ করে৷ বাহিরের আনহেলদি খাবার খেতে সে পছন্দ করে না। তার উপর ওসিডি থাকায় সে চেয়েও পারেনা সব পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে।
আয়াজ নিজের খাবার খেতে আরম্ভ করবে এর আগেই নিজের প্লেটে মাংসের পিস দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। বিরক্তি আর রাগে সামনের মানুষটাকে ধমক দেওয়ার আগেই একটা বাচ্চা মেয়ের কণ্ঠ কানে আসে,
“এইসব গরু ছাগলের খাবার কেউ কিভাবে মানুষকে দিতে পারে, আপনাকে কষ্ট করে খেতে হবে না চশমা ওয়ালা ডাক্তার। আপনি আমার চিকেন এর ভাগ নিতে পারেন।”
কথাটা বলেই মেয়েটি মিষ্টি করে হাসে, আয়াজ কিছু সময় ব্যায় করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,গোলগাল মুখের এক ষলো কিংবা সতেরো বছরের মেয়ে তার সামনে বসে আছে। গায়ের রঙ অতি মাত্রায় ফরসা হওয়াই মনে হচ্ছে সামান্য টোকা দিলেও রক্ত গড়িয়ে পড়বে। খাবার খেয়েছে আবার সাথে তার মুখেও মাখিয়েছে। ব্যাপারটা বিরক্ত হলো আয়াজ। পাশের টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু বাড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠে,
“ক্লিন ইউর লিপস”
মেয়েটি বোকা বোকা চোখে তাকায় আয়াজের দিকে। নিজের মুখটা আয়াজের দিকে বাড়িয়ে দেয়, আয়াজ ভরকে উঠে। চোখ বন্ধ করে জোরে একটা নিশ্বাস ফেলে টিস্যুটা সেখানেই ফেলে উঠে দাঁড়ায়। গটগট পায়ে চলে যায় সেখান থেকে। মেয়েটি হতবাক হয়ে তার যাওয়া দেখে৷ দুইবার ডাক ও দেয় কিন্তু আয়াজের শক্ত মন নরম হয় না। সে পিছনে ঘুরে তাকায় না।
———-
ড্রয়িং রুমের বড় সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে নীড়, তার সামনে কয়েকটা সার্ভেন্ট মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নীড় সবার দিকে একবার করে তাকিয়ে। একজনকে ফিমেল স্টাফকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“ওই মেয়েটার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দিবে কোনভাবেই যেন সে নিচে না নামে,যতক্ষন না আমি এই বাড়ি থেকে যাচ্ছি। কথাটা মাথায় ঢুকেছে?”
স্টাফ দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে সেখান থেকে চলে যায়,পরেরজন এর উদ্দেশ্য নীড় বলে উঠে,
“আমেনা চৌধুরী আর আমিরুল চৌধুরীকে ডেকে নিয়ে আসো ফাস্ট।”
পরেরজন ও পড়ি মরি করে দৌড় লাগায়। নীড়ের সামনে দাড়িয়ে ছিল এতক্ষন ভাবতেই ত তার হাত পা জমে যাচ্ছে। সেখানে আর কিছু ক্ষন থাকলে নির্ঘাত হার্টএট্যাক করেই ফেলত।
নীড় ডেকেছে শুনে আমেনা চৌধুরী ছুটে আসতে নিলেই আমিরুল চৌধুরী থামায়,
“কি করেছ তুমি আমেনা?”
আমেনা চৌধুরী থমকায়,
“কি বলছো তুমি? কি করবো আমি?”
আমিরুল চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠে,
“তুমি, আমি দুইজনেই খুব ভালো করে জানি নীড়ের সাথে তোমার সম্পর্ক আর পাচটা মা ছেলের মতো না যে সে তোমার সাথে খেজুর আলাপ করতে ডাকবে। তাই বলছি কি করেছো তুমি?”
আমেনা চৌধুরী স্বামির কথাকে পাত্তা না দিয়ে বলে উঠে,
“তোমার ভুলকে সঠিক করেছি, ওই মেয়েকে আমার ছেলের ঘর থেকে বের করেছি সে জন্যেই আমার ছেলে আবার এই বাড়িতে পা রেখেছে।”
আমেরুল চৌধুরী হতভম্ব স্ত্রীর কথা। তিনি অবাক কণ্ঠে বলে উঠল,
“তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছো আমেনা?”
আমেনা চৌধুরী চিৎকার করে বলে উঠে,
“হ্যা হ্যা আমি পাগল হয়ে গেছি। আমার ছেলের জন্য আমি পাগল হতেও দুই বার ভাববো না আমিরুল। এইটা তুমি ভালো করেই জানো।”
“তুমি ভুলে যাচ্ছো আমেনা ওই ছেলেটা নীড় চৌধুরী। সে বিয়েটা করেছিল শুধু যেন আমি তার কাজে কোন ঝামেলা না করতে পারি সেজন্য। ওই মেয়েটার মুখ অবধি দেখেনি তোমার ছেলে সেখানে তার রুপ আছে কি নেই সেটা তোমার ছেলে জানত না। বরং তোমার ছেলে যে দুই বছরের মধ্যেই ফিরেছে এটাই ত অনেক। ওই যে ভাবে দেশ ছেড়েছিল এই জীবনেও সে দেশে ফিরত না সেখানে সে দেশে ফিরেছে তা কি এমনি এমনি? সে দুই দিন হলো দেশে আছে কিন্তু একবার ও আদ্রিতাকে ওই ঘর থেকে বের করেনি। এমনি এমনি? তোমার ছেলে নিজের শত্রুকেও অন্যেকারো হাতে মরতে দিতে রাজি হয় না। সেখানে মেয়েটা তার স্ত্রী,পছন্দ করুক বা অপছন্দ। কিন্তু সে যে তার স্ত্রীর উপরে অন্যে কারো অধিকার ফলানো বা তাকে কষ্ট দেওয়া পছন্দ করবে না এইটা তোমার জানা উচিত আমেনা। সে আমার ছেলে বউ পাগল হবে না তার গ্যারান্টি আছে?”
আমেনা নিজের স্বামীর কথা শুনল। কিন্তু তবুও তার মাঝে আত্মবিশ্বাস আছে যে আর যায় হোক তার সন্তানকে সে বুঝে আর যায়হোক আদ্রিতার মতো কুৎসিত কালো মেয়েকে তার ছেলে কোনদিন ও মেনে নিবে না।
চলবে?

