গোধুলি_রক্তিম_শিখা #পর্ব_৪

0
1

#গোধুলি_রক্তিম_শিখা
#পর্ব_৪
#লেখিকা_নওশিন_আদ্রিতা

প্রিন্সিপাল রুমে হাতে ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিতা। তাকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে আদ্রিয়ান। তাদের থেকে একটু দূরেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে মিস.লামিয়া। তার কপাল বেয়ে সুক্ষ্ণ ঘাম গড়িয়ে পরে। সে ভাবতেও পারেনি তখন কার ঘটনা আদ্রিয়ানের কান অবধি পৌছে যাবে। লামিয়া বুঝতে পেরেছে আজ তার রেহাই নেই। কিন্তু এমনি এমনি বেরিয়ে যাওয়ার মতো মেয়ে ত সে না। তাই চওড়া গলায় বলে উঠে,
“দেখুন স্যার, আপনার সামনেই কিভাবে প্রফেসার আদ্রিয়ান ওই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। স্যার আর ছাত্রীর এমন বিকৃত সম্পর্ক কলেজে কি প্রভাব ফেলবে। আর আমি ত খাতাও জমা দিয়েছি যেখানে এই মেয়েটার অসভ্য কথা বার্তা গুলো লিখা আছে।”

আদ্রিয়ান হাত মুষ্ঠি বদ্ধ করে নেই। আদ্রিতা, আদ্রিয়ানের হাত জড়িয়ে নিঃশব্দে কেদে উঠে,বোনের কান্না যেন আদ্রিয়ানের বুকে তীব্র আঘাত হানে। রাগে হিসহিসিয়ে বলে উঠে,
“মুখ সামলে মিস লামিয়া। নয়ত আমি ভুলতে বাধ্য হবো আমার সামনে দাঁড়ানো ব্যাক্তি একজন মেয়ে।”

প্রিন্সিপাল বুঝলেন আদ্রিয়ানকে না থামালে এই মুহূর্তে কেলেংকারী ঘটে যাবে, তিনি নিজের চোখের চশমা ঠিক করে বলে উঠেন,
“মিস লামিয়া,আপনি যে খাতা গুলো সাবমিট করেছেন সে খাতায় যে লিখা আছে সেগুলো যে আদর মা এর না ওইটা ত স্পষ্ট তাহলে এইসব মিথ্যা অভিযোগ এর কারন কি?”

প্রিন্সিপালের মুখে “আদর মা” শুনে থো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লামিয়া। আদ্রিয়ান আবারো বলে উঠে,
“আমি এখানে প্রফেসার হিসেবে দাঁড়িয়ে নেই মিস লামিয়া। আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি আদ্রিতার গার্জিয়ান আর তার বড় ভাই হিসেবে। আপনি কোন অধিকারে আমার বোনের গায়ে হাত তুলেছেন? কোন সাহসে তাকে নোংরা বাজে বলেছেন এন্সার মি ড্যাম ইট?”

আদ্রিয়ান চিৎকার করে সজোরে টেবিলে আঘাত করে, লামিয়া ভয়ে কুকরে উঠে,সে কখনো আদ্রিয়ানকে রাগতে দেখেনি। আদ্রিয়ান ত হাসিখুশি থাকত সবসময়। প্রিন্সিপাল আদ্রিয়ানকে থামাতে বলে উঠে,
“আহা আদ্রিয়ান কি হচ্ছে এইসব। আমি কথা বলছি ত! মিস লামিয়া, আদর মাকে সরি বলুন।”

লামিয়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই আদ্রিয়ান ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠে,
“সরি? আর ইউ কিডিং উইথ মি রাইট নাও? সে হিসেবে আমিও এই মুহূর্তে মিস লামিয়ার ডান হাত ভেংগে দিয়ে সরি বলে ফেলি চলবে ত?”

প্রিন্সিপাল ক্ষিপ্ত হাতে টেবিলে আঘাত করে,
“ভদ্রতা বজায় রাখো আদ্রিয়ান।”

“ভদ্রতা মাই ফুট,এখন ই মুহূর্তে এই মেয়ে সম্পূর্ণ ভার্সিটির সামনে আমার বোনের পা ধরে ক্ষমা চাইবে। আর নিজের গালে নিজে থাপ্পড় মারবে। নয়ত এর এমন দশা করব না কোথাও চাকরি পাবে আর না কোন জায়গায় মুখ দেখানোর অবস্থায় থাকবে। বাকিটা আপনার ইচ্ছা।”

আদ্রিতা, আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
“ভাইয়া,এমন করো না। বাদ দেও যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে।”

আদ্রিয়ান এর রাগ মুহূর্তে উবে যায়। কাঠিন্য রুপ মুহূর্তে আদুরে হয়ে যায়। নিজের বোনকে সযত্নে আগলে আদর মাখা কণ্ঠে বলে উঠে,
“কলিজাবাচ্চা, ভাইয়া রেগে আছে তাই ভালো বাচ্চার মত চুপটি করে থাকো। এরপরে তোমাকে এক বক্স আইসক্রিম কিনে দিবো। কেমন?”

আদ্রিতা বুঝে আদ্রিয়ান এর জেদ এই মুহূর্তে কোনভাবেই কমবে না। আদ্রিতা অসহায় দৃষ্টি নিয়ে তাকায় প্রিন্সিপালের দিকে। প্রিন্সিপাল ও অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

শেষ মেষ আদ্রিয়ানের জেদ পূরন হলো, সবার সামনেই লামিয়া হাত জোর করে ক্ষমা চাইল আদ্রিতার কাছে। এতে অবশ্য আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়েছে কারন সে পা ধরাতে চেয়েছিল কিন্তু আদ্রিতার কথা লামিয়া তার শিক্ষক তার গুরুজন। তার শিক্ষক তার পা ধরবে এটা পাপ হবে।

আদ্রিয়ান তাই আর কথা বারায় না। চুপচাপ মেনে নেই সবটা,আদ্রিতা ভাই এর পাগলামো দেখে হালকা হাসে। এই একটা মানুষ ই ত আছে যে তার জন্য দুনিয়ার বিরুদ্ধে চলে যেতেও একবার ভাবে না।

আদ্রিয়ান বোনকে নিয়ে সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরিয়ে দিয়ে চলে যায় নিজ গন্তব্যর দিকে। আদ্রিতা নিজের ব্যাথা পাওয়া হাত ভালো মতো বোরখা আর হিজাবের আড়ালে লুকিয়ে ভীতরে প্রবেশ করে।
তার কামরার সামনে আসতেই সেখানে নিজের সুটকেস দেখে হতভম্ব হয়ে যায় আদ্রিতা। কিছু বলবে তার আগেই একজন সার্ভেন্ট বলে উঠে,
“আপনার জন্য সার্ভেন্ট কোয়াটারের রুম খোলা হয়েছে বড়ভাবি। আপনি সেখানেই থাকবেন, এটা বড় ম্যাডামের আদেশ।”

আদ্রিতা এই কথা শুনে আলত হাসে, এটা ত হওয়ারই ছিল। এই বাড়ির সার্ভেন্ট ছাড়া আর কিছুই ত না সে। তবুও যে দুইটা বছর চৌধুরী বাড়ির বড় পুত্রের আলিশান রুমে কাটাতে পেরেছে এটাই বা কম কিসে? আদ্রিতা কোন তর্ক না করেই সার্ভেন্ট এর অনুসরণ করে নিজের নতুন গন্তব্যতে এসে পৌছায়।
আদ্রিতা ঘরটার দিকে নজর বোলায়। ছোট একটা রঙচটা ঘর। যেখানে একটা খাট আর একটা টেবল আর একটা আলনা রাখা আছে। আদ্রিতার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সে নাকি জন্ম হওয়ার সাথে সাথেই তার মা তার জন্য নিজে হাতে ডিজাইন করে রুম বানিয়েছিল। খান বাড়ির সব থেকে বড় আর সুন্দর রুমটাই তার ছিল। অবশ্য সে রুম আদ্রিতার ধকলে বেশি দিন ছিল না। সে রুম পরবর্তীতে দেওয়া হয়েছিল বড় ফুফুর মেয়েকে।
আদ্রিতা আনমনেই বলে উঠে,
“আমারও একটা নীড় হোক। যেটা আজীবন আমার হয়ে থাকবে। যেখান থেকে বের করার অধিকার আর সাহস কোনদিন কারো হবে না কখনো না।”

আদ্রিতা জানে এই ইচ্ছা পূরন হওয়ার নয়। তবুও আদ্রিতার দীর্ঘশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসা কথা গুলো হয়ত পূরন হবে। এই ক্ষ্ণিন আশা আদ্রিতার বুকে বাসা বেধে রয়েছে।

——-
রাতের মধ্যেভাগ, চারিদিকে নিস্তব্ধতা সম্পূর্ণ চৌধুরী বাড়ি এই মুহূর্তে ঘুমে তলিয়ে আছে। নীড় একপ্রকার বিরক্ত হয়েই বাড়িতে প্রবেশ করে। এই গরম তার সহ্য হয় না। গাড়ি থেকে এতটুকু আসতেই যেন ঘামে গোসল করে ফেলেছে সে। নীড় নিজের আউটহাউজের দিকে হাটা দিতে নিলেই কি মনে করে নিজের ঘরের দিকে তাকায়৷ কিন্তু ঘরের বাতি নিভানো দেখে ঠোঁটের কোনে বাকা হাসি ফুটে উঠে,
“বউ থাকতে একা গোসল করতে যাবো কেন?”

কথাটা বলেই শিষ বাজাতে বাজাতে প্রবেশ করে চৌধুরী নিবাসের দিকে। নিজের ঘরের দরজার নব ঘুড়াতেই দরজা খুলে যায়। নীড় এর রাগ উঠে বিড়বিড় করে বলে উঠে,
“ইডিয়েট একটা মেয়ে,বাড়িতে এত গার্ড আছে পুরুষ মানুষ আছে। আর বেয়াদব গাধাটাকে দেখো দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়েছে।”

নীড় রুমে প্রবেশ করে সোজা এগিয়ে যায় বিছানার দিকে। কিন্তু অন্ধকারেও নীড় বুঝতে পারে ঘড় সম্পূর্ণ খালি। সাথে সাথেই নীড়ের কপালে ভাজ পরে। তার জানামতে আদ্রিতা সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে ফিরে এসেছে তাহলে ঘড় ফাকা কেনো?

নীড় সিকিউরিটি হেডকে কল করে,
“আমার বউ কোথায়?”

সিকিউরিটি হেড মাত্র ঘুমিয়েছিল। কাচা ঘুম ভাংগায় এমনিতেই তার মস্তিষ্ক চলছে না সেখানে কেউ যদি ফোন করে জিজ্ঞেস করে তার বউ কোথায় তাহলে কেমন লাগবে? সিকিউরিটি হেড ছ্যাত করে উঠে বলে,
“তোর বউকে কি আমি কোলে নিয়ে ঘুরি? আমি কিভানে জানবো। নিজের বউ এর খবর নাই আমি নাকি অন্যের বউ এর খোজ রাখবো।”

নীড় দাত কিড়মিড় করে উঠে, ফোনের অপরপাশ থেকেই রামধমক দেয়। এক ধমকে বেচারার ঘুম পালিয়ে যায়। সিকিউরিটি হেড কাপা কাপা কণ্ঠে বলে উঠে,
“সরি স্যার, আমি জানতাম না আপনি। ইয়ে মানে আসলে”

নীড় রাগী কণ্ঠে বলে উঠে,
“ছাগলের মতো ম্যা ম্যা না করে যা প্রশ্ন করেছি তার উত্তর দেএ। আমার বউ কই। আই এম ফাকিং ড্যাম সিরিয়াস রাদিব।”

রাদিব হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। তার স্যার বিয়ে করলো কবে। তার আবার বউ আসল কবে,পরক্ষনেই মনে পরে তার আদ্রিতার কথা। নিজের জিব্বায় কামড় দেয় সে। আমতা আমতা করে বলে উঠে,
“স্যার আমি ত জানিনা আপনার বউ কোথায়।”

“আই ইউল কিল ইউ বাস্টার্ড।”

নিজের হাতের ফোন দেওয়াল আছাড় মারে নীড়।।রাগে নিজের চুল নিজেই মুষ্ঠিবদ্ধ করে ধরে নীড়। তার সম্পূর্ণ শরীর কাপছে। ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠে,
“তোকে একবার হাতের কাছে পাই ইডিয়েট তোর এই রাত বেরাতে ঘুরার জন্য তোর পা যদি আমি না ভেংছি।”

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here