গোধুলি_রক্তিম_শিখা #পর্ব_২_৩

0
1

#গোধুলি_রক্তিম_শিখা
#পর্ব_২_৩
#লেখিকা_নওশিন আদ্রিতা

নিজের উপরে গরম পানির ছোয়া পেতেই ধরফরিয়ে উঠে বসে আদ্রিতা। ঘুম তখনো সম্পূর্ণ ছুটেনি তার। কিন্তু শরীরের জ্বালাপোড়ায় মুখটা মুহূর্তে বিকৃত হয়ে গেল তার। এরই মধ্যে ঝাঝালো মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এলো,
“এই মুখ*পুরী তোকে এই বাড়িতে কি আয়েস করার জন্য ঢুকতে দিয়েছি আমি? সকাল হয়ে গেছে এখনো রান্না বসেনি চুলাতে। সবাই খাবে কি? তোর জন্য কি আমার স্বামি আর সন্তান না খেয়ে অফিস যাবে?”

আদ্রিতা তাকালো সামনে দাঁড়ানো মা এর আরেক রুপের দিকে। সম্পর্কে ইনি তার শাশুড়ী আমিরুল চৌধুরীর বউ আমেনা চৌধুরী৷ আদ্রিতা নিজের হয়ে কোন সাফায় না দিয়েই মিন মিন করে বলে উঠল,
“এখনো যাচ্ছি ম্যাডাম”।

কথাটা বলেই তড়িঘড়ি করে ওয়াসরুমের দিকে দৌড় দিল। তাকে এইভাবে যেতে দেখে বিরক্ত হলো আমেনা। এই মেয়ের প্রতি তার রাগ কোনভাবেই কমে না। বরং দিন গড়াচ্ছে আর সে রাগের পারদ বেড়ে চলেছে। আমেনা ঘর থেকে বের হতেই নিজের স্বামির মুখোমুখি হন, আমিরুল থমথমে কণ্ঠে বলে উঠে,
” মেয়েটার উপর এমন অত্যাচার করে কি পাও আমেনা? কি দোষ ওই বাচ্চা মেয়েটার?সম্পর্কে সে তোমার বড় ছেলের স্ত্রী। এইটুকু ভেবে হলেও ত তাকে আগলে রাখতে পারো।”

আমেনার চোখে পানি,
“আমি মানিনা তাকে আমার ছেলের স্ত্রী।কোথায় আমার চাদের টুকরা আমার মানিক কোথায় এই কালো বেয়াদব মেয়ে। কাকের গায়ে ময়ুরের পালক লাগালে সে ময়ুর হয়ে যায় না। আর ভুলে যাবেন না আজ এই মেয়ের জন্যেই আমার মানিক আমার চাঁদ আমার বাড়িতে নেই বিদেশের মাটিতে। একে ত এনেছিলেন আমার ছেলেকে বেধে রাখতে কই পারলো না ত। উলটা এই মেয়ে পালিয়ে গিয়ে আমার ছেলেটাকে আরও উষ্কে দিল।”

আমিরুল চৌধুরী নিজের স্ত্রীকে বুকে চেপে বলে উঠেন,
“তোমার ছেলের জেদ তোমার অজানা নয় আমেনা। তাহলে কেনো এই বাচ্চামো? কেনো নিজের ছেলের দোষ ওই মেয়েটার উপরে দিচ্ছো? তোমার ছেলে আগে থেকেই টিকিট বুক করে রেখেছিল যেভাবেই হোক সে দেশ ছাড়তোই।”

“আমি এই মেয়েকে কোনদিন ও মানবো না। তুমি যাই বলো আর তাই বলো। এর জায়গায় যদি কোন সুন্দরী মেয়ে নিয়ে আসতে তাহলে আমার নীড় সে মেয়ের রুপের মোহে পরে হলেও দেশে থেকে যেত।”

আমিরুল চৌধুরী নিজের স্ত্রীকে আর কিছু বললেন না। কারন আমেনা কিছু বুঝবে না, দুই বছর ধরে কম ত বুঝায়নি। কিন্তু আমেনা সব কিছু মানতে নারাজ। নাহিদ খান যখন পরেরদিন কই থেকে নিজের মেয়েকে নিয়ে আসল, আমেনা ত তাকে কোনভাবেই তাকে বাড়িতে ঢুকতে দিবেনা। কিন্তু আমিরুল নিজের বাড়ির মর্যাদাকে কিভাবে বাহিরে রাখবে লোকে কি বলবে তাই ত আদ্রিতাকে রেখে দিল চৌধুরী বাড়িতেই। তাকে দেওয়া হল নীড়ের ঘর। এতেও ত কম চিল্লাপাল্লা করেনি আমেনা। কিন্তু দিন শেষে আদ্রিতার ভাগ্যেতে নীড়ের ঘরটাই জুটল। কিন্তু সেদিনের পর থেকে শুরু হলো আদ্রিতার উপর অত্যাচার। আর সে অত্যাচার আমিরুল চুপচাপ দেখে যাওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। মাঝেমধ্যে প্রতিবাদ করলেও আমেনার কান্নার জন্যে আর কিছু বলতে পারে না সে।

দরজার পাশে দাড়িয়ে সবটাই শুনল আদ্রিতা। এটা নতুন কিছু না, কথা গুলো আদ্রিতার মুখস্থ হয়ে গেছে। তবুও কেন যেন তার কষ্ট লাগে প্রতিটা কথা তার বুকে বিধে। মনে মনে বলে উঠে,
“আসলেই কি সে আমার জন্যে এই দেশ ছেড়েছে? আমার রুপ নেই বলেই কি আমাকে মেনে নিতে তার আপত্তি?”

আদ্রিতার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে মাথা নিচু করেই এক প্রকার দৌড়ে রান্না ঘরে চলে গেল। বাড়ির সদস্য সংখ্যা দশজন । নীড়ের দাদা, দাদী, নীড়ের বাবা আমেরুল চৌধুরী তার স্ত্রী আমেনা চৌধুরী আর তাদের দ্বিতীয় ছেলে আয়াজ চৌধুরী৷ ছোট চাচা নিহারুল তার স্ত্রী নিহারিকা চৌধুরী আর তাদের দুই সন্তান নওমি,আঞ্জুম।

একে একে সবাই এসে বসে পরলো ডাইনিং টেবিলে। সার্ভেন্ট একে একে সব খাবার টেবিলে সাজিয়ে রাখল। আদ্রিতা রান্নাঘরেই ঘাপটি মেরে বসে রইল। তার একমাত্র কারন আয়াজ,সে কোনভাবেই এই একটা পুরুষের সামনা সামনি যেতে চাইনা। গেলেই কেমন অস্বস্তি হয়। আদ্রিতার খুব ইচ্ছা করে জানতে কেনো তাকে মিথ্যা বলা হলো কেনো নীড়ের সাথে বিয়ে দেওয়ার কথা থাকলে আয়াজের নাম আর ছবি তাকে দেখানো হলো। কিন্তু এই প্রশ্নটা করা হয়নি তার।

এরই মাঝে তার ধ্যান ভাংগে ছোট আঞ্জুমের তার পা জড়িয়ে ধরায়। পাচ বছরের আঞ্জুম আদ্রিতার নেওয়াটে বললেই চলে,
“কি হয়েছে বনু? খাওয়া বাদ দিয়ে উঠে এলেন কেন হ্যা?”

ছোট আঞ্জুম তার আধো আধো বুলি আওড়ে বলে উঠে,
“আমাকে খাইয়ে দেও, আমার হাতে ব্যাথা ব্যাথা। তুমি না খাওয়াই দিলে আমি খাওয়া খাওয়া করবো না।”

আঞ্জুমের বাচ্চামো কথায় ফিক করে হেসে দেয় আদ্রিতা। চৌধুরী বাড়িতে এই একটা প্রাণের মাঝেই ত সে শান্তি খুজে পায়। আদ্রিতা আঞ্জুমকে কোলে তুলে কেবিনেটের উপর বসিয়ে দেয়। পা্শ থেকে তার জন্য করা সবজি দিয়ে বানানো ফ্রাইড রাইস খাওয়াই দিতে দিতে রাজ্যের গল্প জুড়ে দেয়। আঞ্জুমের বাচ্চা বাচ্চা কথায় কখনো আদ্রিতা হেসে খুন হয়ে যায় ত কখনো আবারো মায়া মায়া দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

———

রাত বারোটা,
বই পড়তে পড়তেই চেয়ারের উপরে বসে বই এর উপর মাথা দিয়েই ঘুমিয়ে গেছে আদ্রিতা। এইচএসসি পরিক্ষা সামনে তার,কলেজ যাওয়া না হলেও তার সব পড়াই সে প্রতিদিন পেয়ে যায় এর ক্রেডিট অবশ্য তার শশুড় আর আয়াজের।

গভীর ঘুমে আচ্ছাদিত আদ্রিতার হঠাৎ করেই নিজের কোমরে শিহরণ অনুভব করতেই কেপে উঠে। ঘুমের মাঝেই ভ্রু জোড়া কুচকে যায় তার, ধীরে শিহরণ কোমর বেয়ে পিঠ ঘাড়ে এসে পৌছায়। আদ্রিতা চোখ মেলে তাকাতে চাইলেও সারাদিনের ক্লান্তি তাকে তাকানোর সুযোগ দিল না। কিন্তু ঘুম টিকলো না বেশিক্ষন নিজের গলায় দাতের তীব্র স্পর্শ পেতেই ঘুম ছুটে যায় তার। মুখ দিয়ে ব্যাথাতুর আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। নিজের ঘাড়ে হাত দিতেই টের পায় তরল কিছু বেয়ে পড়ছে তার গলা বেয়ে, আদ্রিতা হতভম্ব হয়ে ছুটে যায় আয়নার কাছে। লাইট অন করতেই নিজেই গলায় রক্ত দেখে ভয় পেয়ে যায়। সারারুম খুজেও কারো অস্তিত্ব টের না পেয়ে যেন ভয়ের মাত্রা বেড়ে যায়। আয়াতুল কুরসী পড়তে পড়তেই বাকি রাত পার করে দেয়। আ

কিন্তু আদ্রিতা টের ও পেল না যার ঘর যার সম্রাজ্য সে ফিরে এসেছে। আর ফিরে এসেই নিজের সবচেয়ে বড় সম্পদের উপরে নিজের সিলমোহর লাগিয়ে দিয়েছে।

——-

নিজের আউটহাউজের বিশাল ডিভানে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে নীড়,সে ভেবেছিলো এসেই মেয়েটাকে নিজের ঘর থেকে ছুড়ে মারবে কিন্তু কোন এক কারনে কাজটা করতে পারেনি সে। নিজের হাটুর বয়সী মেয়েটার প্রতি তার কোন প্রকার মায়া নেই। কিন্তু এই কিন্তু উত্তর হঠাৎ করেই নীড়ের মধ্যে থেকে আসে না। সে নিশ্চুপ হয়ে থাকে। নিকোটিনের ধোয়া উড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তাচ্ছিল্য হেসে বলে উঠে,
“যেখানে সুন্দর লালস্যময়ী রমনীদের দেখে নীড় আটকায় না সেখানে কিনা ড্যাড এমন সাধারণ কালো মেয়েকে নিয়ে এসেছে আমাকে বশ করতে।”

নীড়ের কেন যেন নিজের কথা পছন্দ হলো না নিজের কাছেই। কিন্তু তবুও নির্লিপ্ত পরে রইল। নিকোটিনের শেষ ধোয়া উড়িয়ে ডিভানে শরীর এলিয়ে বলে উঠে,
“আজকের রাতটা শান্তিতে কাটিয়ে নেও মেয়ে, কাল থেকে ওই ঘর তোমার জাহান্নাম হবে৷ ওই ঘরে তোমার প্রবেশ নিষিদ্ধ জারি হবে।”

কথাটা বলেই নীড় চোখ বন্ধ করে নিল। কিন্তু আজব কথা তার চোখে ঘুম এর জায়গায় ফুটে উঠছে প্লাজো আর কামিজ পরিহিত এলোমেলো হয়ে চেয়ারে ঘুমিয়ে থাকা এক নারী অবয়ব। যার অবচেতন অবস্থায় কামিজের অনেকঅংশ উমুকত হয়ে বেরিয়ে আছে তার সৌন্দর্য। চট করে নীড় চোখ মেলে তাকায়। নিজের আউটহাউজে থাকা সুইমিংপুলে ঝাপ দেয় এই মাঝরাতে৷ নিজেকে শান্ত করতে নাকি নিজের মানসপটে ভেসে উঠা নারীকে সরাতে?

চলবে?

#গোধুলি_রক্তিম_শিখা
#পর্ব_৩
#লেখিকা_নওশিন আদ্রিতা

ভরা ভার্সিটির সামনে গালে থাপ্পড় খেয়ে মাথা নিচু করে সমান তালে ফুপিয়ে চলেছে আদ্রিতা। গালে পাচটা আঙুলের দাগ স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। শ্যামলা গালেও দাগ গুলো জলজল করছে। কিন্তু গালের ব্যাথার থেকে তীব্র যন্ত্রণা দিচ্ছে তাকে বলা একেকটা তিরস্কারমূলক কথা গুলো।

“গায়ের রঙ নোংরা হলে কি হবে শরীর দেখিয়ে পুরুষ বশ করার ভালোই শিক্ষা আছে দেখছি। লজ্জা করে না প্রফেসারকে পরিক্ষার খাতার মধ্যে প্রেম পত্র দিতে। ছিঃ ছিঃ! এই মেয়ে কথা বলছো না কেন? দেখে ত মনে হচ্ছে কোন বস্তি থেকে উঠে এসেছো, দুশ্চরিত্রা মেয়ে মানুষ । তোমাদের মতো মেয়েদের জন্যেই সব মেয়ে জাতের বদনাম হয়। এখনি বেরিয়ে যাও কলেজ থেকে। ভুলেও যেন এই কলেজের আশেপাশে না দেখি।”

কথাটা বলেই একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে আদ্রিতাকে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। আশেপাশের সবাই তা দেখে মজা লুটতে ব্যাস্ত। কেউ কেউ আবার বাজে দৃষ্টি দিয়েই বোরখার উপর দিয়ে তার শরীর স্ক্যান করছে। ঘৃণা,লজ্জা,অপমানে আদ্রিতার শরীর রি রি করে উঠল৷ কিছু না ভেবেই এলোমেলো পায়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল কলেজ থেকে। চোখের পানিতে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে তার। সে অবস্থায় রাস্তা পার হতে নিলেই একটা চলন্ত বাইকের সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তাতেই পড়ে যায়। ব্যাথায় আওয়াজ করার মতো শক্তিটাও যেন অবশিষ্ট নেই৷

কিছু সময় আগে,
সারা রাত না ঘুমানোর কারনে মাথা আর চোখ ব্যাথায় জান যায় যায় অবস্থা আদ্রিতার। তবুও কোনভাবে টেনে টুনে নিজেকে বিছানা থেকে তুলে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকে। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে আজ রান্নাঘরে হুলুস্থুল কান্ড। স্টাফ দৌড়াদৌড়ি করে রান্না করছে বাড়ি পরিষ্কার করছে। সব মিলিয়ে এলাহি কান্ড। আদ্রিতা মনে করার চেষ্টা করলো আজ কোন অনুষ্ঠান আছে কি না? কিন্তু কোনভাবেই কিছু মনে করতে ব্যর্থ হওয়াই একজন স্টাফের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“আজ তোমরা রান্না ঘরে যে, ম্যামসাহেব দেখলে রাগ করবেন ত”!

মিনা নামের স্টাফ পাস্তার প্লেটটা টেবিলে রেখে বলে উঠে,
” ম্যডাম নিজেই আমাদের কাজে লাগিয়েছে।”

আদ্রিতা আর কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমেনা চৌধুরী ভারি কণ্ঠে বলে উঠে,
“আজ তোমাকে কিছু করতে হবে না। কলেজে চলে যাও,শুনলাম পরিক্ষা আছে।”

আদ্রিতা হতবাক,আমেনা কোনদিন তাকে কলেজে যেতে দিতে চাইত না। ফ্রী সার্ভেন্ট এর মতো ট্রিট করত। তাহলে আজ তার এমন আচারণ আদ্রিতাকে ভাবতে বাধ্য করলো।

“পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে বলিনি। আমার কথা কানে যায়নি তোমার?”

আমেনার হঠাৎ ধমকে কেপে উঠে আদ্রিতা। দ্রুত স্থান ত্যাগ করবে এমন সময় আমেনা আবারো ডেকে উঠে,
“এই টাকাটা রাখো, দুপুরে বাহিরে লাঞ্চ করে নিও। আর পারলে সন্ধ্যার পরে আসার চেষ্টা করো।”

আদ্রিতা বুঝলো আজ হয়ত বাড়িতে কোন গুরুত্বপূর্ণ অতিথি আসবে। সেজন্যেই তাকে বাড়ি থেকে বের করা হচ্ছে। আদ্রিতা তাচ্ছিল্য হাসে টাকাটা নিয়ে নিজের ঘরে দৌড় দেয়৷ এটা নতুন না যখনই বাড়িতে কোন মেহমান আসে বা বিজনেস ক্লায়েন্ট আসার হয় তাকে হয় ঘড় বন্দি করে রাখা হয় বা বের করে দেওয়া হয়৷ তার চেহারা নাকি অশুভ,শুভ কাজে কালো রঙ অভিশপ্ত ।

আদ্রিতা বেশি চাপ নেই না চটজলদি তৈরি হয়ে বেরিয়ে যায়, মনে মনে বাড়িতে আসা মেহমানকে শুকরিয়া জানায়। তার জন্যেই বিনা বাধায় পরিক্ষা দিতে যেতে পারবে সে।

——–

ফোনের কর্কশ আওয়াজে ঘুম ভেংগে যায় নীড়ের, আড়মোড় ভেংগে কাচ দেওয়া বেলকনিতে যেতেই দৃষ্টি যায় তার ঘরের ব্যলকনির দিকে। সাথে সাথে হালকা বাদামী রঙ্গের চোখ জোড়া কুচকে যায়। উলটো দিকে ঘুরে বিরবির করে বলে উঠে,
“ইডিয়েট একটা,ড্রেস চেঞ্জ করার আগে যে ব্যলকনির দরজা লক করতে হয় এতটুকু কমসেন্স অবধি নেয়।”

নীড় কিছুক্ষন পরে আবারো তাকায় সেদিকে, চোখ জোড়া আগে যায় ব্যলকনির দিকে। কিন্তু সেখানে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির দেখা না পাওয়াই নীড় এর মুখটা কেমন থমথমে হয়ে গেল সে কি কোনভাবে আশাহত হলো? বুঝা গেল না তার মনোভব।
নীড় সরতে নিলেই তার দৃষ্টি যায় মেন ফটকের দিকে। কালো বোরখা পরিহিতা এক মেয়ে ধীর পায়ে হেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। নীড় এর মুখ মুহূর্তে স্বাভাবিক হয়ে গেল। আনমনেই বলে উঠল,
“ইডিয়েটটা এতটাও গাধা না।”

——–

পরিক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক মিনিট আগেই আদ্রিতা তার খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে যায়। আজ মেলা দিন পরে কলেজে এসেছে আর যেহেতু হাতে অনেক সময় আছে তাই ভেবে নিল এই সময়টা ইঞ্জয় করবে। কতদিন পরে এইভাবে মুক্তির নিশ্বাস নিচ্ছে সে। কতদিন পরে কাজের কোন তাড়া নেই কারো কর্কশ কণ্ঠের তিরষ্কার নেই। ভাবতেই অষ্টাদশী মনটা নেচে উঠল। আদ্রিতা তখন মাঠের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে এইসব আকাশ কুশুম ভাবনায় মত্ত ছিল ঠিক তখনই নিজের মাথায় কারো হাত এর ছোয়া পেতেই আদ্রিতা তড়াক করে পিছনে ফিরে। সাথে সাথে তার চোখ দুইটা খুশিতে চকচক করে উঠে, উৎফুল্ল চিত্তে ডেকে উঠে,

“ভাইয়ায়ায়ায়া”

বোনের খুশিতে আদ্রিয়ানও হাসে। বোনকে আলত করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

“কেমন আছে আমার কলিজাবাচ্চাটা?”

আদ্রিতা আহ্লাদী কণ্ঠে বলে উঠে,
“তোমাকে অনেক অনেক মিস করেছি ভাইয়ায়া”!

আদ্রিয়ান হাসে,নিজের পকেট থেকে কিটক্যাট এর দুইটা পেকেট বের করে আদ্রিতার দিকে বাড়িয়ে দেয়,
” ভাইয়ার কলিজাবাচ্চাটা! কতবার বললাম ভাইয়ার কাছে চলে আয়,কিন্তু তুই তো তোর ভাইয়াকে এতটা সামর্থ্যবান মনেই করিস না যে, সে তোর খেয়াল রাখতে পারবে।”

আদ্রিতা হাসে, যখনই দেখা হয় তখনই আদ্রিয়ানের এই এক অভিযোগ৷ কে বলে রক্তের সম্পর্ক শুধু আসল হয়। যেখানে তার রক্তের সম্পর্ক গুলো তাকে দূরছাই করে শুধু মাত্র তার শ্যামবর্ণ রঙ এর জন্য। সেখানে তার এই ভাইটার সাথে তার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। শুধু আছে আত্মার সম্পর্ক। আদ্রিতার মা আনিয়া খান এর প্রথম সন্তান মৃত্য অবস্থায় জন্ম নেই। আর আদ্রিয়ানের মায়ের শারীরিক দুর্বলতার কারনে আদ্রিয়ানকে দুধ দিতে পারেননা তিনি। কয়েক ঘণ্টা আগে জন্ম হওয়া বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন আনিয়া খান। নিজের সন্তানের মতো দুই বছর আগলে রেখেছিলেন তিনি। তারপর আদ্রিয়ানের মা সুস্থ হওয়াই এর পর থেকে সেই ফিডিং করাতেন কিন্তু ততোদিনে আদ্রিয়ানের কাছে আনিয়া হয়ে উঠেছিল তার দুধ মা।

“এমন কিছু না ভাইয়া,ওটা আমার শশুড়বাড়ি৷ যেমনই হোক ডিভোর্স না হওয়া অবধি আমাকে সেখানেই থাকতে হবে।”

আদ্রিয়ান তাচ্ছিল্য হাসে,
“আমাকে বাচ্চা মনে হয় জানবাচ্চা? আমি কি বুঝিনা ওই খান কিছু একটা বলে তোকে বাধ্য করেই সেখানে রেখেছে।”

আদ্রিতা আৎকে উঠে, সে কোনভাবেই কাউকে জানতে দিতে চাইনা সে ব্যাপারে। তার আর নাহিদ খানের মধ্যে হওয়া সে চুক্তির কথা কেউ জানবে না কোনদিন ও না।আদ্রিতা কথা ঘুরাতে বলে উঠে,
“ছাড়ো ত ওইসব কথা৷ আজ আমি সারাদিন ফ্রী। চলো না ভাইয়া আমি ঘুরবো কবে থেকে ঘুরিনা। আজ তোমার পকেট ফাকা করবো,আমিও ত দেখতে চাই আমার ভাই তার বোনের পিছনে কত খরচা করতে পারে।”

আদ্রিয়ান নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিজের আদুরে বোনের দিকে। তার কৃত্রিম হাসির দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতে পারলো না।
“আচ্ছা তুই যা বলবি তাই, আমি হেড স্যারের সাথে একটু কথা বলে আসছি। তুই এখানেই অপেক্ষা কর ভাইয়া যাবে আর আসবে কেমন?”

আদ্রিতা আলত হেসে মাথা নাড়ায়। আদ্রিয়ান চলে গেলে আদ্রিতা হাটতে হাটতে চকলেটের পেপার খুলে মুখে দিতেই কোথায় থেকে হনহন করে তার ক্লাস টিচার মিস লামিয়া হনহনিয়ে এগিয়ে আসে, এতক্ষন সে উপরে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান আর আদ্রিতার কান্ড দেখছিল রাগে হিংসায় শরীর তার জ্বলে যাচ্ছে।

আদ্রিতাকে এক ধাক্কায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে সাপটে থাপ্পড় মেরে উপরুক্ত কথা বলে উঠে।

বর্তমানে,

গাড়ির বোনাটে বসে একের পর এক সিগারেট পুড়িয়ে যাচ্ছে নীড়, চারিদিকে ধোয়ার কুণ্ডুলী পেকে গেলেও তার থামার কোন নাম নেই। একটু দূরেই হাত পা বাধা অবস্থায় ভয়ে ঠকঠক করে কাপছে নীড়েরই একজন গার্ড।

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here