গোধুলি_রক্তিম_শিখা #পর্ব_১

0
4

নিজের থেকে বয়সে দ্বিগুন বড় কারো সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনতেই ষড়োশী কণ্যার বুক কেপে উঠল। চারিদিকে আতশবাজি, হৈইহুল্লোর সবটাই যেন এখন কানে বিধছে তার। কিন্তু সে ত যানে তার বিয়ে হচ্ছে তার থেকে কিছুটা বড় আয়াজ চৌধুরীর সাথে। যাকে প্রথম দেখায় হৃদয় কুঠুরিতে জায়গা দিয়ে দিয়েছিল ষড়োশী। তাহলে কি তারসাথে ছলনা করা হলো? এত বড় পরিকল্পনা করে তাকে ঠকানো হলো? এর জবাব কার কাছে চাইবে সে,নিজের জন্মদাতা পিতার কাছে নাকি তাকে ঘৃণা করা তার পরিবারের কাছে?

ষড়োশী কন্যা যেন পাথর মানবী হয়ে গেল, অনেক ভাবনা চিন্তার মাঝেই নিজের ফোন তুলে আয়াজ নামক ব্যক্তিকে কল দিল। নাম্বারটা দিয়েছিল স্বয়ং আয়াজের বোন৷ তারা নিশ্চয় ছলনা করেনি তার সাথে?এই ভেবেই আয়াজকে কল লাগায় সে। মনে মনে ক্ষীন আশা নিয়েই কাজটা করে সে। কিন্তু পর পর পাচবার কল দেওয়ার পরেও যখন অপরপাশ থেকে কল রিসিভ করা হয় না তখন ষড়োশী কন্যা হাল ছেড়ে দেয়। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবিও যেন আজ তাকে নিয়ে মজা করছে।

এরই মাঝে দরজায় কড়াঘাতের আওয়াজ ভেসে আসে,
“আদরমা তৈরি হয়েছিস? বরপক্ষ কিন্তু আরেকটু পর ই রওনা দিবে। বিউটিপাল্লারে ত গেলি না একা একা পারবি ত মা?”

নিজের ফুফির এত স্নেহ মাখা ডাক শুনে আদ্রিতার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে এই সম্পূর্ণ পরিবার তাকে দূর ছাই করেছে। শেষ কয়েকটা দিনের ভালো মানুষীর কারন আজ বুঝতে পারছে আদ্রিতা।

“আমাকে শুধু ব্যবহারই করে গেলেন বড় সাহেব? বাবা ডাকটা কি আমার জন্যে অভিশাপ? নাকি আপনার ভালোবাসা আমার ভাগ্যেতে লিখা নেই?”

নিজের চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ায় আদ্রিতা,
“আমি জানি এই বিয়ে হবেই। কিন্তু সংসার হবে না আর না বড় সাহেব আপনার কোন ইচ্ছা পূরন হবে। আপনার তরী তীরে এসে ডুবে যাবে আর এটা আদ্রিতা আদর খানের প্রমিজ। আপনার রক্ত যে আপনার থেকে কম না তা আপনি হারে হারে টের পাবেন।”

——

বিয়ে সম্পূর্ণ হওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সম্পূর্ণ বিয়ে বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে গেল বিয়ের বধূ পালিয়েছে। ঘটনাটা যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। বরের বাবা হতভম্ব হয়ে ছুটে এল আদ্রিতার বাবা নাহিদ খানের কাছে,

“এইসব কি শুনছি নাহিদ? তোমার মেয়ে পালিয়েছে মানে, তুমি ভুলে গেছো তুমি আমাকে কি কথা দিয়েছিলে? আমি কিন্তু একবারও ভাববো না এই সম্পূর্ণটা উলটে দিতে। খান ইমপায়ারকে ধূলোয় মিশিয়ে দিবো আমি।”

নাহিদ খান নিজের মেয়ের উপরে ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু তা এই মুহুর্তে প্রকাশ করলেন না তিনি। এই মুহূর্তে নিজের এত কষ্টের গড়া সম্রাজ্য বাচানোর চিন্তা আগে করতে হবে তার।

“দেখো আমিরুল কিন্তু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। আদর মা মনে হয় আশেপাশেই আছে। ছোট ত বিয়ে নিয়ে ভয় আছে, মেয়েটা আমার বাচ্চা স্বভাবের একটু ধৈর্য ধরো। আমি তাকে নিয়ে আসছি।”

নাহিদের মিষ্টি কথায় আমিরুল ভুললো না। কাঠ কাঠ কণ্ঠে বলে উঠল,
“তোমার কাছে এক ঘন্টা আছে নাহিদ, কোথায় থেকে তুমি তোমার মেয়েকে নিয়ে আসবা তা সসম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমি যদি পূত্রবধূ ছাড়া অপমানিত হয়ে এই বাড়ি থেকে বের হয় তাহলে এর ফল ঠিক কতটা তিতা হবে তার অনুমান ও তোমার নেই।”

নাহিদ মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পরে। আমিরুল সেদিকে একবার তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে ফিরে যায় নিজের বড় ছেলের কাছে। পরিবেশ এত ঠান্ডা দেখেই তার তার বুক কাপছে ভয়ে৷ তার ছেলে শান্ত আছে মানেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নিতে বেশি সময় নেই।

আমিরুল নিজের ছেলের কাছে এগিয়ে আসতেই গমগমা পুরুষালী কণ্ঠে ভেসে আসে,
“তোমার নাটক শেষ হলে আমি ফিরতে চাইছি ড্যাড৷ এইসব সার্কাস আমি আর হ্যান্ডেল করতে পারছিনা। যদি এই বিয়ে বাড়িকে মৃত বাড়ি না বানাতে চাও তাহলে আমাকে যেতে দেও। বিয়ে করার কথা ছিল করেছি। আমার কাজ শেষ৷”

আমিরুল আৎকে উঠে, যাকে দেশে আটকানোর জন্য এত কিছু করলেন দিন শেষ এ সবটা এইভাবে ভেস্তে যেতে দিতে পারেন না তিনি,
“দেখো নীড়”

নীড় অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই আমিরুল চৌধুরী চুপসে যান। ছেলের এই প্রলয়কারী রুপ তাকে ভীত করে। নীড় আর এক মুহূর্তের জন্যেও সেখানে থামল না। হনহন পায়ে বেরিয়ে গেল, নিজের গাড়িতে উঠে ড্রাইভার এর উদ্দেশ্য বলে উঠে,
“সোজা এয়ারপোর্টের রাস্তা ধরবে শফিক। যদি কোথাও গাড়ি থেমেছে তাহলে তোমার নিশ্বাসটা অল্প বয়সে থেমে যাবে।”

নিজের স্যারের রাগ সম্পর্কে অবগত শফিক। এই কাজটা যে তিনি খুব ভালো ভাবেই করতে পারে তা নিয়ে সন্দেহ করা মানেই মৃত্যু৷ তাই সময় ব্যায় না করেই গাড়ি চালাতে শুরু করে।

নীড় প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে কল লাগায়,
“হ্যালো ড্যানি, আমি ফিরছি সব প্রস্তুতি করে রাখো। আর হ্যা ওই মেয়েটাকে কাল সকালে সসম্মানে বাড়ি ফিরিয়ে দিবে।”

কথাটা বলেই গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে নীড়। বিড়বিড় করে বলে উঠে,
“নীড়ের অনুমতি বিহীন নীড়কে দিয়ে কোন কাজ করানো অসম্ভব৷ তুমি আমাকে দেশে আটকাতে চেয়েছিলে তাও একটা বাচ্চা মেয়েকে দিয়ে ছ্যাহ৷ তোমার প্ল্যানিং তোমার মতোই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য কাজটা ওই মেয়েই সোজা করে দিয়েছে। আমি ত ভেবেছিলাম কালকে ফিরবো৷ কিন্তু মেয়েটা বাড়ি থেকে পালানোর চেষ্টা করে আমার কাজটা সহজ করে দিল।বিয়ের আগে পালালে পরবর্তীতে আবার বিয়ে করার ঝামেলা থাকত। এক কাজে দুই স্বিকার।মাঝখান দিয়ে বেচারী বাচ্চাটার লাইফ হেল হলো। তোমার জেদ তোমার উপরেই ভারি পরে গেল ড্যাড।”

নিজের উপর নিজেই প্রাউড ফিল করছে নীড়। কিন্তু যে জানতেও পারলো না তার এই প্ল্যানিং খুব শীঘ্রই অনেক বড় ঝড় তার জীবনে নিয়ে আসতে চলেছে।

———

দুই বছর পর,

লন্ডনের বিলাশ বহুল বার ক্লাবে একের পর এক ড্রিংক শেষ করে চলেছে নীড় চৌধুরী, দূর থেকেই তার দিকে দৃষ্টি দিয়ে বসে আছে দুইজন রমনী। নীড়ের বারো নাম্বার গ্লাস ফাকা হতেই প্রথম রমনি দ্বিতীয় রমনিকে চোখ দিয়ে ইশারা করে। ইশারা পেতেই প্রথম রমনি হেলে দুলে আকর্ষনী ভঙে এগিয়ে আসে নীড় এর দিকে। নীড়ের কাধে হাত রাখতেই নীড় চোখ তুলে সেদিকে তাকায়। তার দৃষ্টি পড়তেই রমনী আবেদনময়ী ভঙ্গিতে হেসে পাশের চেয়ার দখল করে নেই,
“হ্যালো হ্যান্ডসাম। আমি এলিনা, ক্যান আই জয়েন ইউ?”

নীড় নিজের ডিংক্স ফিল ঢালতে ঢালতে বলে উঠে,
“গো টু দা হেল।”

এলিনা হাসি মুখে অপমান হজম করে নীড়ের আরোও কাছে চলে আসে, নীড়ের টাই নিজের হাতে পেচিয়ে নিজের দিকে টেনে নিতেই নীড় লাত্থি দিয়ে স্টুল সহ এলিনাকে নিচে ফেলে। হঠাৎ আক্রমনে খেয় হারিয়ে মাটিতেই লুটিয়ে থাকে। কিন্তু সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ না করে আবারো ওয়ান খেতে মনোযোগ দেয় নীড়৷ কিন্তু প্রথম দুই ঢোগ দিতেই নীড়ের মাথা যেন চক্কর খেয়ে উঠে। বেসামাল নীড় উঠতে গিয়ে পা বেধে যেতেই এলিনা নামক মেয়েটির ঠোঁটের কোনে বাকা হাসি ফুটে উঠে। নীড়কে ধরতে এগিয়ে এসে বলে,
“আমি যা চাই তা পেয়েই ছাড়ি,হয় সোজা ভাবে নয়ত আঙুল বাকিয়ে। কিন্তু হারার স্বাদ আমি কোনভাবেই টেস্ট করিনা। এটা এলিনা বেরেল এর ধাতের সাথে যায় না। তোমাকেও আমার চাই হোক সেটা এক রাতের জন্য আর নয়ত সারাজীবন আমার পোষা কু*কুরের মতো।”

নীড় হাসল, পকেট থেকে ছোট চাকু বের করে খুব সহজেই এলিনার তার কাধে রাখা হাতে পোচ করে একটা টান দিয়ে দিল। হঠাৎ আক্রমনে এলিনা ব্যাথা অনুভব করার সময় ও পেল না। তার আগেই ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল।

“নারী জিনিসটাকে আমি ঘৃণা করি,সেখানে আমাকেই বিছানায় নিবি ছ্যাহ তোর মতো প্রস্টিটিউড আমাকে ছুয়েছিস এটা ভাবতেই ত আমার আবারো গোসল করতে হবে।”

নীড় এর ইশারায় ড্যানি দৌড়ে আসে, এতক্ষন সে এখানেই ছিল নীড়ের আদেশের অপেক্ষাই।
“বাংলাদেশের টিকিট কাট ড্যানি,আমি দেশে ফিরতে চাই। কেউ একজন নাকি আমার ঘরেই নিজের রাজত্ব তৈরি করেছে। তার রাজ্য কেড়ে নিতে হবে। আর এই নীড়ের সাথে তার যে নাম জুড়ে আছে সেটাও বাদ দিতে হবে।”

ড্যানি অবাক হয়ে তাকায়, নীড় আবারো দেশে যাবে ভাবতেই তো তার ভয় লাগছে ওই বাচ্চা মেয়েটার জন্য। ড্যানি যতটুকু জানে আদ্রিতা নামক মেয়েটি নীড়ের একদম বিপরীত। গুরুগম্ভীর নীড় আর কোথায় চঞ্চল আদ্রিতা ।

#গোধুলি_রক্তিম_শিখা
#পর্ব_১
#লেখিকা_নওশিন আদ্রিতা

চলবে?

চলবে?

রিয়েক্ট বা রেসপন্স না করলেও এই গল্প আমি কন্টিনিউ করবো৷ ইনশাআল্লাহ্।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here