#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#অন্তিম_পর্ব
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
কিশলয়ের গা বেয়ে অবাধে বয়ে চলেছে জলের ধারা। ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দে প্রকৃতির সাথে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে মানব জাতি। প্রখর রোদে দুর্বিষহ জনজীবন। জিভ বের করে রাস্তায় ধারে বসে ঝিমুনি কাটে কুকুরের দল। মাটির রাস্তায় একাকী মানুষ পেলেই ঘেউ ঘেউ করে ঘিরে ধরবে। ভাদ্র মাসের গরম, কুকুর তখন পাগলা বনে যায়। লালা না পায়ে লেগে যায় সেজন্য পথচারীদের কত শত সাবধানতা। ভুলেও এ পথে খালি পায়ে বের হয় না কেউ। অত্যধিক রৌদ্র তাপে বসে থেকেও যেন স্বস্তি নেই। খেটে খাওয়া মানুষের জীবন যখন অতিষ্ঠ, আকাশ ভেঙে পড়া বর্ষণ যেন তীব্র উত্তাপ থেকে নিস্তার দেয়।
ছোটো ছোটো দুটো হাত গ্রিল গলিয়ে বৃষ্টির পানি ছোঁয়ার সুযোগে। রক্তিম ঠোঁট জোড়া ফাঁক করে বারবার বলে চলেছে,
– আম্মা, বিততি ধব্বব।
মোটা দু হাতে রুপোর চুড়ি। হাত নাড়ার সাথে সাথে শব্দে ঝংকার ওঠে। বাহিরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ, আর এদিকে দু হাতের করতালিতে মুখরিত কামরা।
লাবণ্য মেয়ের ভেজা দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শব্দ করে চুমু খায়। মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের আরও সন্নিকটে আসে। বুকের সাথে ছোটো শরীরটা লাগিয়ে মুখে আঙুল পুরে। চুকচুক শব্দ করে লালা ভর্তি মুখে মায়ের গালে ঠেসে চুমু খেতে লাগে। লাবণ্য মেয়ের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। কত সাধনার পর খোদা কৃপা করে এই অমূল্য রত্ন তাকে দিয়েছে। একে সে পারে না সিন্দুকে লুকিয়ে রাখতে।
গা ভিজে চুপচুপে। হাঁচি কাশি দিয়েই চলেছে সমানতালে। শব্দ পেয়ে লাবণ্য দরজার দিকে চায়। ভেজা চুল কপালে লেপ্টে চোখ দুটো আড়াল করে রেখেছে। পরনের প্যান্ট শুকনো হলেও, গায়ের শার্ট অর্ধ ভেজা। লাবণ্য তোয়ালে হাতে ছুটে গেল।
– ভিজলি কী করে?
ভেজা চুল মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল।
– মা তোমাদের জন্য পাকোড়া পাঠিয়েছে।
– এই বৃষ্টিতে আভিরা তোকে পাকোড়া দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে? সত্যি তো? না কী কোন অপরাধ করে এসেছিস?
– ইউ নো লাবু ফুপি আমি মিথ্যে কথা বলি না। আমার কথা বিশ্বাস না হলে নুরেনকে জিজ্ঞেস করে দেখো।
বলেই ভেজা কাপড়ে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে।
– নুরেনকেও পাঠিয়েছে? তাহলে তুই একা কেন? ও কোথায়?
– তোমার কনডেন্সড মিল্ক আসছে। জানো তো ও কত লেজি।
– তাই বলে ওকে একা ফেলি আসবি তুই? ছেলেটা আমার ভিজে আসছে না কি? জানিস না ওর ঠান্ডার ধাঁচ আছে?
লাবণ্য জানালার পাশে গিয়ে দেখল গেটের ধারে নুরেন। এক হাতে বক্স, আর অন্য হাতে ছাতা। ছেলেটা ছোটো দু হাতে এত সব আগলে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ছাতাটাও বন্ধ করতে পারছে না। লাবণ্য দেরি না করে দ্রুত নিচে নামে।
– আব্বা আমার কাছে দাও। তুমি আমায় ডাকলে না কেন?
– এই বৃষ্টিতে নিচ থেকে ডাকলে তুমি শুনতে না ফুপি আম্মু।
– আচ্ছা, উপরে আয়। ভিজিসনি তো আবার?
– না। নাযীর ভিজেছে। আমার হাতে পাকোড়ার বক্স, ছাতা ধরিয়ে দৌড়ে চলে এসেছে। আম্মি জানলে ওর খবর আছে।
– থাক আমি বকে দেবো। আম্মিকে নালিশ দিতে হবে না। ভাইকে মারবে তখন।
– আম্মি কী অযথাই মারে ওকে? মার খাওয়ার মতো কাজ করলে মারবে না?
– তোকে আর মায়ের হয়ে কথা বলতে হবে না। মায়ের নেওটা হয়েছে একেবারে।
– আমি মোটেও আম্মির নেওটা না ফুপি আম্মু।
– আচ্ছা জলদি আয়। এত আস্তে ধীরে হাঁটলে হবে?
– কী করব? এর থেকে দ্রুত হাঁটতে পারি না। কষ্ট হয় আমার।
লাবণ্য এক পলক তাকায় নুরেনের দিকে। ছেলেটা এক পা ফেলতেই কেমন হাঁপিয়ে ওঠে।
– ফুপি আম্মু থাকতে কীসের কষ্ট? আয় তোকে কোলে নেই।
– না। তোমার কোলে উঠা যাবে না।
– কেন? বারণ করেছে কেউ?
– হ্যাঁ। আম্মি তোমার কোলে উঠতে নিষেধ করেছে।
লাবণ্যর হাস্যোজ্জ্বল মুখে ঘোর অমানিশা দেখা মিলে। আভিরা ছেলেদের নিষেধ করেছে তার কোলে উঠতে।মেয়েটা কী পূর্বের রেশ ধরেই বারণ করল? না কি অন্য কোন কারণে?
– মায়ের বারণ কে শুনে?
– তুমি তো অসুস্থ ফুপি আম্মু। আমি ভারী, আমাকে নিতে হবে না।
আসল কারণ লাবণ্যর বুঝে এলো। তার অসুস্থতার কারণে আভিরা বারণ করেছে।
– আমার আব্বা একটুও ভারী না। দেখি আয়। কতদিন হলো কোলে নেই না তোকে।
নুরেন দু হাতে লাবণ্যর গলা জড়িয়ে ধরে। কোলে উঠতে দারুণ লাগে তার। নাওয়াজ অফিস থেকে ফিরলেই বাবার কোলে চড়ে বসে থাকবে। নাযীরের তুলনায় নুরেন অনেকটাই মোটাসোটা। নাদুসনুদুস শরীরটা দেখতে আদর আদর লাগলেও, ছেলেকে কোলে নিতে গেলে আভিরার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। কোলে নিয়ে বেশিক্ষণ রাখতে পারে না। সেজন্য নুরেনও মায়ের কোলে উঠার জন্য বায়না করে না। তার যত আবদার সাজে বাবার কাছে।
বৃষ্টির দিনে গরম গরম পাকোড়া খেতে নেহাত মন্দ লাগছে না লাবণ্যর নিকট। সকালে খিচুড়ি রান্না করেছিল সে। সপ্তাহে দুদিন বাড়িতে খিচুড়ি রান্না হবে। মাহাদের পছন্দের দিকে খেয়াল রেখেই খিচুড়ি রান্না করা হয়।
নাযীর, নুরেনের সামনে খিচুড়ির প্লেট রাখতেই দুজন সমস্বরে চিৎকার করে উঠল,
– আমরা খেয়ে এসেছি ফুপি।
যদিও দুজনের নজর খিচুড়ির প্লেটে। লাবণ্য মিটিমিটি হাসছে দু ভাইয়ের কাণ্ড দেখে।
– আমি ভুলে গেলাম কী করে, আমার আব্বারা পাকা পাকা কথা বলতে জানলেও মুখে খাবার তুলে না দিলে খেতে পারে না।
– আমরা খেতে পারি। আম্মি খেতে দেয় না।
– আপনারা দু ভাই কী খেতে পারেন তা কী অজানা? এক লোকমা মুখে দিলে মুখে না গিয়ে সব নিচে পড়ে। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ আমার হাতে খেয়ে নে।
আলু দিয়ে মুরগির মাংসের ঝোল, ঝাল গোরুর মাংসের ভুনা, বেগুন ভাজা, পটল ভাজা করেছে। নাযীর, নুরেন কেউই ঝাল খেতে পারে না। আলু দিয়ে ভালো করে খিচুড়ি মাখিয়ে, দুজনের জন্য দুটো লেগ পিস নেয়। নাযীর খাচ্ছে কম, লামহাকে দেখছে বেশি। কেমন রাগান্বিত চাহনি! লামহার এই আনন্দ উল্লাস তার সহ্য হচ্ছে না যেন।
– আর খাব না ফুপি।
– আরেকটু খা।
– না। নুরেনকে খাওয়াও। খেতে ভালো লাগে না আমার।
– ভালো না লাগলেও খেতে হবে আব্বা। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিস।
নাযীর কথা না বলে লামহার হাত টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে। মেয়েটা ধপ করে পড়ে বালিশে। মুহূর্তেই চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেয়।
– শুকিয়ে আমি যাচ্ছি না, যাচ্ছে তোমার মেয়ে। এই লামহা দিন দিন বেয়াদব হচ্ছে লাবু ফুপি।
– মেয়েটাকে কাঁদালি কেন নাযীর?
– তোমার মেয়েকে কাঁদানো লাগে? এই নটাঙ্কিকে ছুঁতে না ছুঁতেই ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয়।
লাবণ্য হেসে দেয়। নটাঙ্কি? মেয়েকে দেখে লাবণ্য। দাঁত বের করে হাসছে। এই না কাঁদছিল, সবাইকে হাসতে দেখে তার বোকা মেয়েটাও হাসছে। এই হাসি সবসময় থাকুক, মনে মনে আর্জি জানায় লাবণ্য।
_
আগের মতো উজ্জ্বল ভাব নেই। লাবণ্যতা হারিয়েছে, গায়ের রঙটাও বড্ড ফ্যাকাশে ঠেকছে জ্যোতির নিকট। জ্যোতি ঠোঁট উল্টে ঘুরেফিরে দেখতে লাগল নিজেকে। আগের তুলনায় স্বাস্থ্য বেড়ে দ্বিগুণ। পেট ফুলো দেখাচ্ছে অত্যধিক। জ্যোতি ওড়না টেনে উদর আড়াল করে। যদিও মেক্সি পরাতে বাড়ন্ত পেট বুঝা যায় না তেমন। তবুও ওড়না দিয়ে উদর লুকাতে ব্যস্ত।
জ্যোতির বিমর্ষ নজর এড়ায় না বর্ণের। সকাল থেকে মেয়েটার এই বিষণ্ণ দৃষ্টি তাকে পোড়াচ্ছে ভীষণভাবে।
এই মেয়েটার প্রতি তার অনুভূতি অজানা রহস্যের মতো সুপ্ত! প্রেম, ভালোবাসার প্রতি আগ্রহ না থাকলেও কারো
রূপে সে বিমোহিত! সে নারী অন্য কারো প্রেম বুঝতেই সে সরে আসে। তবে তার সরে আসাটা বোধহয় ক্ষণিকের ছিল। জীবনের মোড়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জড়িয়ে পড়ে অবিচ্ছেদ্য এক সম্পর্কে।
এই নারীর সাথে সে সর্বতোভাবে জড়িয়ে পড়লেও কখনো প্রেম নিবেদন করা হয়নি। প্রেম নিবেদন করে পূর্বের ক্ষতে আঘাত হানতে চায়নি। তাছাড়া প্রত্যাখ্যান হবার সম্ভাবনা তীব্র। এ রমণীও বিব্রত হবে। কেবল দায়বদ্ধতা থেকেই নিশ্চয় তার সাথে এ অবধি পথচলা। তবে দায়বদ্ধতা হোক কিংবা স্বইচ্ছে, এই মেয়ে যখন দুঃখ পেলে তার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদে তখন বর্ণের মনে হয় সে হৃদয়ে জায়গা না পেলেও আস্থা অর্জনে সক্ষম। আগে আড়ালে কাঁদত, এখন কাঁদে তার সম্মুখে। চোখের পানিতে মেয়েটার কপোল ভিজে, ভিজে বর্ণের বুকের বা পাশ!
শক্ত দু হাতের কোমল ছোঁয়া লাগে উদরে। জ্যোতি নড়চড় বিহীন। দৃষ্টি তার আরশিতে, উদরে হস্তক্ষেপিত হাতে।
– খারাপ লাগছে? শুবে এসো।
বর্ণ জ্যোতির হাত ধরে বিছানায় নিয়ে বসায়। পায়ের নিচে বালিশ রেখে পা নেড়েচেড়ে দেখে।
– দেখো তো পা নাড়াতে পারো কী না? বেশি উঁচু হয়ে গিয়েছে বোধহয়। দাঁড়াও অন্য বালিশ দেই।
– লাগবে না।
– শিওর?
– হুম।
– আচ্ছা শুয়ে থাকো, আমি বের হব এখন। কোনো সমস্যা হলে কল দিও। নয়তো আম্মুকে বলো।
– কালকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
– ভুলে যাইনি। মনে আছে আমার।
বলেই খানিকটা ঝুঁকে মেয়েটার উদরে চুমু খায়। জ্যোতি ক্ষীণ হাসে। বাচ্চার আগমনের বার্তায় এই পুরুষটা কতই না হম্বিতম্বি করেছিল, আজ তার মাঝে বিস্তর পরিবর্তন।
এলোমেলো শাড়ির ভাঁজে উন্মুক্ত পেট, পিঠ আকর্ষিত করে বর্ণকে। সে দৃষ্টি সংযত করার চেষ্টা করলেও অপরাগ। অবাধ্য চোখের দৃষ্টি থেমে নেই। এই প্রথম কোনো মেয়েকে এতটা কাছ থেকে এলোমেলো অবস্থায় দেখে বর্ণ দিশেহারা প্রায়। শরীরে উষ্ণতা অনুভব করে, ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়েও ঘামছে। কপাল চুঁইয়ে পড়া স্বেদবারি যেন তার দুর্বলতার কথা জানান দেয়। যতই হোক পুরুষ মন, মেয়েটা স্ত্রী তার। তার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু তাদের সম্পর্ক আর পাঁচটা স্বামী স্ত্রীর মতো নয়। মেয়েটার মনে সে কোথাও নেই। এমনটা জেনেও কি করে মেয়েটাকে কাছে টেনে নেয়?
সে রাতে কাঙ্ক্ষিত কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দুটো মানব দেহ মিলেছিল একে অপরের সঙ্গে। মেয়েটা তাকে বাধা দেয়নি, আবার সায়ও জানায়নি। কেবল জড়বস্তুর ন্যায় পড়েছিল। উন্মাদ বর্ণ ছুঁয়ে ছিল রমণীর সমস্ত কায়া। নারী দেহের উষ্ণতায় হারিয়ে ছিল নিজেকে।
উদরে বাড়ন্ত সন্তানের কথা জানতে পেরে মেয়েটার অধর জুড়ে খেলে যায় প্রাপ্তির স্ফূর্তি। প্রাণোচ্ছল রমণী উল্লাসে মাতোয়ারা হলেও বর্ণের ক্ষেত্রে ঘটে ব্যতিক্রম। কনসিভের কথা শুনেই যেন বিতৃষ্ণা ঘিরে ধরে। ক্ষিপ্ত বর্ণ তখন অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটায়। নিরুদ্দেশ হয়ে যায় পুরোপুরি। বর্ণের লাপাত্তায় পুরো পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত হলেও জ্যোতি নির্বাক। দুশ্চিন্তা যেন তাকে গ্রাস করতে পারেনি। নিজের অস্তিত্বকে নিয়ে কেউ শঙ্কায় ভুগলে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা মানানসই নয়।
দিন তিনেক পর বর্ণের দেখা মিলে। বিধ্বস্ত ছেলেটা সকলকে উপেক্ষা করে জড়িয়ে ধরে জ্যোতিকে। নিজের কাজে সে অনুতপ্ত। এমন একটা জঘন্য কাজ তার দ্বারা হয়েছে ভেবেই জ্যোতির চোখে চোখ রাখতে অসীম দ্বিধা!
বিয়েটা সর্বোপরি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই হয়েছে। আকাঙ্ক্ষার নারী হলেও একটা সম্পর্কে অকস্মাৎ জড়িয়ে পড়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না বর্ণ। বিয়ের পরে তার চালচলনে বিস্তর পরিবর্তন আসে। রাতে দেরি করে ফেরা ছেলেটা দ্রুত ফেরার তাড়নায় থাকে। মেয়েটা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। তার সঙ্গ দেওয়া উচিত। সেই জন্য বন্ধুবান্ধব, পরিচিত সকলের সাথে সময় অসময়ের আড্ডা বাদ দিয়ে একপ্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। জ্যোতির স্বাভাবিক হওয়া অবধি সে সঙ্গ দেয় ছায়ার মতো। যার দরুন তাদের সম্পর্কটাও নির্দিষ্ট ধারায় বহমান। তবে নতুন এক মানুষের দায়িত্ব নেওয়া কী মুখের কথা? হুট করে বিয়ে হওয়াতে চাকরি বাকরি নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা ছিল না। সে চাকরির কথা মাথায়ও আনেনি এতদিন যাবৎ। সে যেমন বাবার টাকায় চলে এসেছিল জ্যোতিও সেই টাকায় চলছে। কিন্তু তাই বলে তার দায়িত্বও অন্য কেউ নিবে? দুজনের দায়িত্বভার যেন আচমকা তার উপর এসে পড়ে। বর্ণের মনে হচ্ছে স্বাধীনতাচেতা সে দায়িত্বের দায়বদ্ধতায় আটকে পড়ছে। দায়িত্বের মতো কঠিন একটা দায়ভার সে পালন করতে ব্যর্থ হবে। দায়িত্ব এড়াতেই নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তবে সময়ের পূর্বে নিজের ভুল বুঝতে পারে সে।
দিন রাত চাকরির পিছনে ছুটে চলেছে বর্ণ। ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত দেহের বর্ণকে রাত নিশি ফিরতে দেখা যায়। আড্ডাবাজ, দায়িত্ব এড়িয়ে চলা ছেলেটা হুট করে একজন দায়িত্ববান পুরুষ হওয়ার চেষ্টায়। সে সফলও হয়। নিজ নারীর ভরণপোষণের সম্পূর্ণ খরচ সে দেয়। যে আসছে তার দায়িত্বও নির্দ্বিধায় নিতে পারবে।
জ্যোতির পায়ে পানি এসেছে, ফুলেছে অনেকটা। মেয়েটা ঠিকভাবে পা নাড়াতে পারে না। বর্ণ জ্যোতির চিন্তায় অস্থির। কেউ বুঝিয়ে উঠতে পারে না প্রেগন্যান্সিতে এসব নরমাল। নিজে তো দুশ্চিন্তায় তটস্থ থাকবেই, সাথে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদেরও প্যারা দেয় মিনিটে মিনিটে। বর্ণের পাগলামিতে সকলে মুখ টিপে হাসে।
– ঢং দেখলে মনে হয় ভাইজানের বউ একলাই মা হইব। ভাই আমরা কী আবুইদ্দা জন্ম দেই নাই। আমরার জামাই দো ব্যথায় কাতরাইলেও ফিরা চাইত না। এরা আবার দেখাশোনা করার লাইগা টেহা দিয়া কামের বেডিও রাহে।
– এইডারে কয় ভাগ্য। ভাবিজান নিজের বাড়িতও রাণীর হালে আছিল।
– নিজের সংসারে রাণী আর কামের বেডি কী? ঘরের কাম করব না?
– তো ভাবিজান কী কাম না কইরা থাকে? কত বড়ো বাড়ির মাইয়া হে জানস? এরপরও কোনো নাক তোলা ভাব নাই। সব কাম করব। হের জাগাত অন্য মাইয়া হইলে ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুইলা খাইত।
– খালি ঘরের কাম করলে হইব। জামাইয়ের লাইগাও টান থাহন লাগব। ভাইজানের দিকে কোনো খেয়ালই নাই। ভাইজান বাইরে গেলে কত টেনশনে থাকে ভাবিজানরে নিয়া। ভাবিজানরে ফোনে না পাইলে পাগল ঐয়া খালাম্মার মোবাইলে কল দেয়। ভাবিজানরে দেখলাম না ভাইজানরে নিয়া কখনো টেনশন করতে। খাইছে কিনা হেই খবরডা পর্যন্ত নে না।
– বেশি কথা বলস কেন? তোরে কী হেরার সাংসারিক বিষয়ে আলাপ করার লাইগা রাখছে। কাম কর।
জ্যোতি কাজের মেয়ে দুটোকে দেখে। তার দেখাশোনা করার জন্য বর্ণ একটা মেয়ে রেখেছে। সারাক্ষণ তার সাথে সাথেই থাকে এ মেয়ে। হয়তো খেয়াল করেছে বর্ণের প্রতি তার উদাসীনতা। শুধু এই মেয়ে কেন, এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ এ বিষয়ে অবগত। এমনকি বর্ণ নিজেও। যে মেয়ে নিজের প্রতিই বেখেয়ালি সে অন্যের প্রতি যত্নশীল হবে কেমন করে? তবুও মেয়েটা নিজের সবটুকু দিয়ে এ সংসারটাকে আগলে রেখেছে। তারপরও তাকে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু করাটা কতটা যৌক্তিক?
_
ভরদুপুরে রোদের তাপ বেশিই প্রখর। আলোক রশ্মি চোখে লাগতেই পানি গড়িয়ে পড়ে। আলো মায়ের দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। চোখের নিচে কালো দাগ, চোয়াল ডেবে কেমন বেহাল অবস্থা। হঠাৎ দেখে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে।
– মা ওঠো। খাবে চলো।
– আমার ছেলে…
আলো বিরক্ত হলো। না খেয়ে খেয়ে জীর্ণ শীর্ণ শরীর নিয়ে পড়ে থাকলে আদৌও বাঁচবে কিনা সন্দিহান। শরীরের সব হাড়গোড় বেরিয়ে আসার উপক্রম। এই বদ্ধ কামরায় একাই পড়ে থাকে। মানুষ দেখলেই কেঁদে ওঠে। সেজন্য সহজে এ ঘরে কেউ আসে না।
– তুমি কাঁদলেই কী যে চলে গিয়েছে সে ফিরে আসবে? এসব কান্নাকাটি বাদ দিয়ে ছেলেটার জন্য দোয়া করো।
– ছেলে হারানোর যন্ত্রণা তুই কী বুঝবি!
– হ্যাঁ। সব যন্ত্রণা তো একার তোমারই। তুমি ছেলে হারিয়েছ বলে তোমারই দুঃখ লাগে। আর আমি যে ভাই হারালাম? ওকে হারানোর শোকে কী আমার যন্ত্রণা হয় না। না কি আমাকে মানুষ মনে হয় না তোমাদের? স্বাভাবিক থেকে তোমার আর বাবার দেখভাল করছি দেখে ভেবেই বসেছ তোমার ছেলের মৃত্যুতে আমার যায় আসে না।
– ও এভাবে চলে গেল, আমার যে মানতে কষ্ট হয় আলো। আমার ছেলেটা তো এত স্বার্থপর ছিল না।
– তোমার ছেলে স্বার্থপরই ছিল মা। তা না হলে এভাবে ছেড়ে যেত না। ওর জন্য না কেঁদে খেতে চলো। আমি আর পারছি না। তোমাদের এ অবস্থায় দেখতে ভালো লাগে না, কেন বুঝো না?
মায়ের চোখের পানি যেন শুকায় না। দিন, মাস গিয়ে বছর পেরুল, তবুও মায়ের চোখের জল গড়িয়ে পড়ে নিরন্তর। একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে আব্দুল্লাহর মা শয্যাশায়ী। ছেলের মৃত্যুতে কেবল নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করে। আব্দুল্লাহর অগোচরে সেদিন সুস্মির সাথে ঘরোয়াভাবে বিয়ের আয়োজন সেরে ছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন মানসম্মানের কথা ভেবে হলেও ছেলেটা তার বিয়ে করে নিবে। সুস্মির বউ সাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটে, তবে আব্দুল্লাহর দেখা মিলে না।
সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছেলের রক্তাক্ত দেহ দেখে জ্ঞান হারান সেদিন। সজ্ঞানে এলেও কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। গাড়ির নিচে চাপা পড়েছিল আব্দুল্লাহর দেহ। সাথে সাথেই প্রাণ যায়। ছেলের প্রয়াণে ভদ্রমহিলার অবস্থা অবনতি হতে থাকে দিনকে দিন। আব্দুল্লাহর মৃত্যুতে পুরো পরিবারেই যেন ধস নেমে আসে। ফ্ল্যাট বাসা ছেড়ে তারা আবার সেই টিনশেডের বাসায় উঠেছে। ছেলের উসিলায় এত বড়ো ফ্ল্যাটে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। নয়তো তাদের কী আর সামর্থ্য আছে? উপরওয়ালা তাদের ভাগ্যে সুখ রাখেননি হয়তো। তাই তো সুখ ধরা দিতে না দিতেই কেমন করে বিভীষিকাময় হয়ে উঠল জীবন!
_
প্রাক্তনের মৃত্যুতে শোক কীভাবে প্রকাশ করা যায়? জ্যোতির জানা ছিল না। তবুও শেষবারের মতো গিয়েছিল। যেই রূপে মানুষটা তাকে দেখতে চেয়েছিল সেই রূপে! তবে শেষবার প্রিয়তমার মুখটি দেখার সৌভাগ্য অবধি হলো না। এই মানুষটা সেদিনও এসেছিল। তবে জ্যোতি দেখা দেয়নি। আড়াল করে রেখেছিল নিষ্ঠুর মানবীর ন্যায়। জিদানের ফোনকলেই ভেঙেচুরে যায় এতদিনের কঠোরতা। এমন হবে জানলে সে ধরা দিত। আক্ষেপ নিয়ে মরতে দিত না মানুষটাকে!
সেজেগুজে কেউ লাশ দেখতে আসে? সবার অবাক চাহনি। লাল টকটকে বেনারসি পরিহিতা রমণী খাটিয়ার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ানো। উপস্থিত প্রত্যেকে হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে।
থমথমে নারী কণ্ঠে পরিবেশ যেন ভারী হয়ে আসে।
– কাপড় সরান, দেখব।
দৃঢ় চোখের দৃষ্টিতে আজ দৃষ্টি মিলিত হলো না। জ্যোতি অপলক চেয়ে থাকলেও অপর ব্যক্তির তাকানোর কোনো তাগিদ নেই। সে নিশ্চিন্তে চোখ বুজে পড়ে আছে। উপেক্ষা করছে রমণীর ক্রন্দনরত নীরব আর্তনাদ, আহাজারি। যেমন করে তাকে উপেক্ষা করা হয়েছিল এতদিন যাবৎ!
– কী করছেন কী?
– রক্ত লেগে আছে। পরিষ্কার করে দিচ্ছি।
জ্যোতি আলতো হাতে কপালের ধার গড়িয়ে পড়া রক্ত মুছে দেয়। পুরো মুখ অক্ষত। কোথাও কোনো চোট নেই। কেবল কপালের ডান পাশে সূক্ষ্ম আঘাতের চিহ্ন।
– আপনি বলেছিলেন সাজলে আমাকে সুন্দর দেখায়। এই দেখুন আমি সেজেছি। আপনার দেওয়া বেনারসি আমার গায়ে। আপনি বলেছিলেন আমি ভালো থাকলে আপনিও ভালো থাকবেন। তাহলে আজ এই অবস্থা কেন? আপনার সব কথায় তো আমি রেখেছি। সংসার করছি আমি। এই দেখুন বর্ণর অনাগত সন্তান আমার উদরে বেড়ে উঠছে। আপনি কথা রাখলেন না কেন? সবসময় এমন করেন কেন আপনি? কথা দিয়ে কথা রাখেন না। আমি তো এমন ঠক, প্রতারককে ভালোবাসিনি!
– লাশের পাশে মেয়েমানুষের এত সময় অবধি বসে থাকতে নেই। আর তুমি কে? এমন সেজেগুজে এসেছ কেন? মুর্দা দেখতে কেউ এভাবে আসে?
লাশ! জ্যোতির কাছে লাশ শব্দটা ভয়ঙ্কর ঠেকল। নিথর, নিষ্প্রাণ দেহের দিকে এক নজর তাকিয়ে জ্যোতি আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। ধীরস্থে সরে যেতে চাইলে লোকটা পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
– তুমি কে বললে না তো? কে হও আব্দুল্লাহর?
জ্যোতি বলতে চাইল, কেউ না। কিন্তু তার কণ্ঠনালী দিয়ে শব্দ বের হয় না। কেবল ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়,
– পরিচিত!
ঘটা করে জানান দেওয়ার মতো আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে তাদের? পুরনো সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে আজ কত দ্বিধা। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলা যায় না সে আমার প্রাক্তন! এককালের প্রেমিক পুরুষ সময়ে নিষিদ্ধ হয়ে যায়, কখনো দেখা হলে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয় অচেনা পথচারীদের ন্যায়।
ভাগ্যের দ্বারে হেরে যাওয়া এক ব্যর্থ প্রেমিক, ভাগ্যও যেন তাকে পরিহাস করছে!
আব্দুল্লাহর লাশ দেখে এসেও জ্যোতিকে স্বাভাবিক দেখায়। রাতের বেলা নারী কণ্ঠের কান্নায় বর্ণের নিদ্রা হালকা হয়ে আসে। সারাদিন বেশ ধকল গিয়েছে তার উপর দিয়ে। হাসপাতাল থেকে আব্দুল্লাহর লাশ আনা, দাফনের কার্যক্রম অবধি জিদানের সাথে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে তাকে। বর্ণ আলো আঁধারিতে চোখ মেলে চায়। জ্যোতি অসহায়ের মতো চেয়ে থেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। সেই প্রথম রাতের মতো কাঁদছে। তবে আজকের কান্না বর্ণের কাছে অদ্ভুত ঠেকছে কেমন। বর্ণ কাল বিলম্ব না করে হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। জ্যোতি চাপা স্বরে কাঁদতে লাগে।
বিকার শূন্য মস্তিষ্ক। অপ্রকৃতস্থ, বদ্ধ উন্মাদের ন্যায় আচরণ করে জ্যোতি। ঘরের দরজা, জানালা বন্ধ করে একেবারে অন্ধকার করে রাখবে কামরা। না খেয়ে ঐ বন্ধ কামরায় পড়ে থাকে দিন রাত। আশেপাশে কাউকে সহ্য করতে পারে না। এটা ওটা ছুড়ে মারে। দিনকে দিন জ্যোতির পাগলামি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। লোকে বলাবলি করতে লাগে প্রেমিকের শোকে জ্যোতির এহেন হাল। আড়ালে ফিসফিস করে, মেতে উঠে অট্টহাসিতে। পথেঘাটে দাঁড় করিয়ে বর্ণকে পরামর্শ দেয়, জ্যোতিকে যেন রিহাবে পাঠানো হয়। বর্ণ শুনে তাদের কথা, তবে প্রতিক্রিয়াহীন। লোকের ঠাট্টা তামাশায় তার যায় আসে না।
বর্ণ সময় দেয় মেয়েটাকে। এই মেয়েটার ক্ষেত্রে কাউকেই তোয়াক্কা করে না সে। না এই সমাজ, আর না সমাজের মানুষকে। একটা সময় মেয়েটা স্বাভাবিক হয়। মনোযোগ দেয় সংসারে। তাকে কেউ বাধ্য করেনি, মেনে নিতে বলেনি, বলেনি থেকে যেতে। সে যেতে চাইলে কেউ আটকাবে না তাও জানে। তবুও মেয়েটা বাঁধা পড়েছে স্বইচ্ছায়। নারীর কাজই তো সংসার ধর্ম পালন করা। বাস্তবতা মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়েছে আল্লাহ। যে আসছে তার জন্য হলেও মেনে নিতে হবে। জ্যোতি মেনে নিয়েছে। তাছাড়া কেউ একজন বলেছিল তার একদিন সুখের সংসার হবে। সে সুখী হবে, সমস্ত বিষাদ চাপা দিয়ে সুখ কুড়াবে।
জ্যোতি উদরে হাত রাখে। বিড়বিড় করে বলে,
– কী অদ্ভুতভাবেই না মানুষ সম্পর্কের বেড়াজালে আটকা পড়ে! কাগজে কলমের সম্পর্কের দায় বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন!
_
ছোটো দু হাতে জাপটে ধরে কেউ ফুঁপিয়ে উঠল। আভিরা তড়িৎ গতিতে পিছন ফিরে চায়।
– কী হয়েছে সোনা, কাঁদছ কেন? ভাই কোথায়?
নুরেন কিছু না বলে পিছন ফিরে চায়। আভিরা দরজায় তাকাতে হতভম্ব হয়ে গেল, দৌড়ে গেল ছেলের কাছে।
– কী হয়েছে? মারামারি করেছ তুমি? ঠোঁট কাটল কেমন করে?
নাযীর নিশ্চুপ। ছেলের জবাব না পেয়ে মেজাজ খারাপ হলো আভিরার। ঠাঁটিয়ে চড় মেরে বলল,
– মারামারি করতে নিষেধ করেছিলাম তোমাকে, কেন করলে?
নুরেন বলতে চাইল, ঐ ছেলে আমাকে মেরেছে। তাই ভাই ওকে মেরেছে। কিন্তু মায়ের রাগ দেখে কিছু বলার সাহস পেল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কেবল। মাকে ইদানিং ভয় লাগে তার। অকারণে কেমন রেগে যায়। চেঁচামেচি করে তাদের উপর। ফাস্টেড বক্স নাযীরের সামনে রেখে আভিরা হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল। পিছন ফিরে ছেলেকে দেখলও না একবারের জন্য।
নাওয়াজ আসে বেলা গড়িয়ে। বাড়ি জুড়ে কেমন নীরবতা। নাওয়াজের এমন নিস্তব্ধতা ভালো লাগল না। প্রতিদিন সে আসলে ছেলে দুটো তার হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কে আগে বাবার কোলে উঠবে এই নিয়ে দু ভাই লেগে যায়। আজ একটারও দেখা নেই। নাওয়াজ রুমে এসেও রুম ফাঁকা পেল। সে ভেবেছিল নাযীর, নুরেন হয়তো ঘুমিয়ে আছে। সেজন্যই দেখা নেই। আজকে অনেকটা দেরি করে ফেলেছে সে।
– ছেলেরা কোথায়?
আভিরা খাবার গরম করছিল। হঠাৎ ডাকে পিছন ফিরে চায়। নাওয়াজ দেখল গরমে তার ঘরনীর নাজেহাল অবস্থা। তবে চোখ ফুলে আছে কেন? গরমে তো চোখ ফুলে থাকার কথা নয়। তবে?
আভিরার হঠাৎ মনে পড়ে নাযীরের কথা। ছেলেকে মেরে ছিল সে। দৌড়ে বেরিয়ে গেল, নাওয়াজও গেল আভিরার পিছু। আভিরা দোতলায় উঠে না। সোজা নিচ তলায় শেষ রুমটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সে জানে ছেলে তার এখানেই আছে। তবুও দরজায় কড়া নাড়ার সাহস পেল না। আভিরা সরে দাঁড়াতেই নাওয়াজ যা বুঝার বুঝে গেল। জোরালো শব্দে কড়া নাড়ে বন্ধ দরজায়।
ভেতর হতে নাযীরের শান্ত স্বর ভেসে এলো,
– আম্মিকে আসতে মানা করো।
নাওয়াজ ধীর গতিতে আভিরার দিকে চেয়ে বলল,
– মেরেছেন?
আভিরা মাথা নামিয়ে নেয়। হৃদয়ে উথাল ঝড়, চোখে অথৈ জল। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে কোনোরকম মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়।
– আপনাকে বলেছিলাম বাচ্চাদের গায়ে হাত না তুলতে। কথা শুনেন না কেন? ছেলে এখন যেতে বারণ করছে ভালো লাগছে?
আভিরার চাহনি করুণ। চোখ টলমল করছে অশ্রুতে।
– চোখের পানি ফেলবেন না, এখন যান এখান থেকে। আমি দেখছি।
আভিরা যায় না। দরজার কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়। নাওয়াজ ভিতরে যেতেই নাযীর ঝড়ের বেগে দৌড়ে আসে। বাবার হাঁটু জাপটে ধরে নিঃশব্দে, নিঃসংকোচে! নাওয়াজ ছেলের পিঠে হাত বুলায়। ছেলেকে শান্ত করার সামান্যতম চেষ্টা। সে জানে এতেই কাজ হবে।
– বাবা মাত্র ফিরেছি কাজ থেকে। এভাবে জাপটে ধরলে কেন? শরীরে জার্মস আছে ব্যাটা!
নাযীর নাক টেনে বলল,
– থাকুক।
– আচ্ছা বলেন তো আম্মির ব্যাড বয় আম্মির কথা কেন শুনেন না? মারামারি করা হতো ব্যাড ম্যানারস বাবা। টিচারকে নালিশ না করে তাকে কেন মেরেছেন?
– ও ভাইকে শুধু শুধু মেরেছে।
– ঐ ছেলে মেরেছে তো কী হয়েছে? আপনিও তো ভাইকে মারেন।
– আমার ভাই ও। আমি ওকে মারব, কাটব, যা ইচ্ছে করব। কিন্তু ও কেন মারবে?
– আচ্ছা পরেরবার থেকে এমন করবেন না। কেউ কিছু বললে প্রিন্সিপালের কাছে যাবেন। নয়তো বাড়ি এসে আম্মিকে বলবেন।
– ওকে।
– এখন বাবার সাথে আসেন। আম্মিকে সরি বলবেন।
আম্মির সাথে ওরকম আচরণ কেন করলেন? আপনি দোষ করেছেন। আম্মি বকবে না।
– বকেনি, মেরেছে।
– আচ্ছা মারতে নিষেধ করব। আর মারলেও আম্মির সাথে এমন করবেন না। মনে থাকবে?
– হু।
– এই তো গুড বয়। আর আম্মির ব্যাড বয়।
_
দুঃসময় কী দীর্ঘস্থায়ী? আর সুসময় ক্ষণস্থায়ী? কে জানে কী? অনেকে তো বলে সুসময় চোখের নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। আদৌ তা হয় কী? সময় তো তার নির্দিষ্ট গতিধারা ঠিক রেখে যথা নিয়মেই চলে। আমরা মানুষজন দুঃসময়কে দীর্ঘ করে অযথা আক্ষেপ করি? আক্ষেপের মাত্রা কমিয়ে দিলেই সুখ ধরা দেয়। আমরা সুখী হতে নারাজ। দুঃখের মাঝেই দিন পার করি। কেউ আবার দুঃখের মাঝে সুখ কুড়াতে ব্যস্ত।
জ্যোতিকে কোন কাতারে শামিল করা উচিত? সুখ, দুঃখ কোনোকিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তবুও তুমুল ভিড়ের মাঝে নিঃসঙ্গ সে, হৃদয় গহীনে অদ্ভুত এক শূন্যতা। প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান পছন্দ করে না, পূরণ করে দেয় কোনো না কোনোভাবে। তবে জ্যোতির কেন মনে হয় ঐ একজনের শূন্যস্থান কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। তার কথা মনে হলেই শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে, চোখ থেকে পানি পড়তে লাগে অনর্গল। এই চোখের জল জ্যোতি কাউকে দেখায় না। কিছু বিষাদ একান্তই নিজের, কাউকে দেখাতে নেই, দেখানো যায় না।
ড্রয়িংরুমেও মানুষের অগণিত আনাগোনা। জ্যোতি এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে ছেলেকে নিয়ে। ছেলেটা তার এত মানুষ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছে। কেমন লেপ্টে আছে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে।
– জ্যোতি?
নিজের নাম শুনে জ্যোতি পিছনে ফিরে তাকায়। এই মেয়েকে সে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না। তবে সে না দেখলেও এই মেয়ে হয়তো তাকে চিনে।
– জি।
– আপনার ছেলে বুঝি?
– আব্দুল্লাহ।
– মানে?
– ওর নাম আব্দুল্লাহ।
– আমি একটু ওকে কোলে নেই?
– নিন।
– আমাকে চিনতে পেরেছেন? অবশ্য আমাকে আপনার চেনার কথা নয়। তবে আমি আপনাকে চিনি।
– আপনাকে না চিনলেও যার বদৌলতে আমাকে চেনেন তাকে আমার চেনা।
– বাবুর হাতের এই দাগ? এমন জন্মদাগ ওনার ডান হাতেও ছিল।
– ছিল বোধহয়।
– আপনার মতো উনিও যদি জীবনটাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিত, তাহলে গল্পটা অন্যরকম হতো।
– জীবন আমাকে দ্বিতীয় সুযোগ করে দিয়েছে, আমি সুযোগ দিলে গল্পটা সত্যিকার অর্থে অন্যরকম হতো।
– আমি ভেবেছিলাম আপনি ওনাকে চিনতে অস্বীকৃতি জানাবেন।
– এমনটা ভাবনায় আসার কারণ?
– সে থাকতেও আপনার অন্যত্র বিয়ে হতে দেওয়াটা যথেষ্ট কারণ নয় কী?
– যথেষ্ট নয়। নিজের আত্মাকে অস্বীকৃতি কোন কারণে, কীভাবে জানাতে হয় আমার জানা নেই।
– এই কারণেই বোধহয় সে আমাকে মেনে নেয়নি। এখনও তার প্রতি এত অনুরাগ? উনি ভুল বলেননি আপনার মতো ভালো তাকে কেউ বাসতে পারবে না। আপনার মনে হয় না আপনার হাজব্যান্ডের সাথে অন্যায় হচ্ছে?
– হয়। তবে উনি কখনো অভিযোগ করেননি এ নিয়ে। কখনো করবেনও না। এজন্যই বোধহয় উপরওয়ালা এই মানুষটাকে পাঠিয়েছে আমাকে আগলে রাখার জন্য।
বর্ণ ফিডারে পানি ভরে এগিয়ে এলো। ছেলেটার তেষ্টা পেয়েছে। বারবার মুখে আঙুল পুরে অদ্ভুত শব্দ করছে।
– উপরে না গিয়ে এখানেই দাঁড়িয়ে আছো? ঐদিকে চলো।
জ্যোতি সুস্মির নিকট এগিয়ে গেল। ধীর কণ্ঠে বলল,
– আসি তাহলে। আশা রাখছি এইটাই আমাদের শেষ দেখা।
– আপনি বোধহয় আমার উপর রাগান্বিত?
– উহু। সে হয়তো আপনাকে বলেনি আমার একান্ত ব্যক্তিগত পুরুষে অন্য কারো নজর সহ্য হয় না।
বিছানার উপর শাড়ি, প্যান্ট, শার্ট, বাচ্চাদের কাপড় এলোমেলোভাবে ছড়ানো ছিটানো। ঘরের অবস্থা নাজেহাল। আভিরা পুরো ঘরে নজর বুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে। রুম গোছাবে না ছেলে দুটোকে তৈরি করবে। আভিরা এত না ভেবে নাযীর, নুরেনকে তৈরি করাতে লাগে।
– আভিদি তুমি এখনও তৈরি হওনি?
– ওহ্ জ্যোতি! কখন এসেছ?
– মাত্রই এলাম। অতিথিরা সবাই চলে এসেছে। তোমাদের এখনও হয়নি।
– আর বলো না। কোনটা রেখে কোনটা করব বুঝে উঠতে পারছি না। ঘরের অবস্থা দেখেছ? ছেলে দুটো আমার মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে।
– কাকে কোনটা পরাবে দেখিয়ে দাও। আমি ওদের তৈরি করছি।
– এত দূর থেকে জার্নি করে এলে, তুমি বোসো। আমি দেখছি।
– আরে দাও। কিছু হবে না। বাচ্চাদের আমি সামলে নিব। তুমি তৈরি হয়ে নাও।
আভিরা চট জলদি শাড়ির কুচি গুঁজে আঁচল টানে। ওয়াইন পার্পল কালারের সিমারী জর্জেট শাড়িটা আনেসা দিয়েছে। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে গোল্ডেন কালারের হিজাব পরে।
ইয়াজমীনের হজে যাওয়া উপলক্ষ্যে মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে। আত্মীয় স্বজনদের সাথে বহুদিন ধরে দেখা সাক্ষাৎ হয় না। ওনার হজে যাওয়া উপলক্ষ্যে সকলের একত্রে সাক্ষাৎ হয়ে যাবে।
– জিদান আর বুশরা কখন আসবে?
– রাস্তায় আছে। এসে পড়বে, কিছুক্ষণের মধ্যে।
বাচ্চারা দৌড়ে চলেছে। লামহা সকলের ছোটাছুটি দেখে নিজেও মায়ের কোল থেকে নামার জন্য মোচড়ানো শুরু করেছে।
– কী হয়েছে মা? এমন করছ কেন?
– আম্মা, নামব।
– ব্যথা পাবে আম্মু। মায়ের কোলে থাকো।
মেয়েটা ঘাপটি মেরে বসে থাকে। মাহাদ এসে বসে বসে মা, মেয়ের পাশে। সকলে ঘাসের উপর বসে নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উল্লাস উপভোগ করে চলেছে। ভুল ভ্রান্তি, বাধা বিপত্তি পেরিয়ে এই গোধূলি লগ্ন তাদের অর্জন। সকলেই আজ পরিপূর্ণ। কেবল জ্যোতিই যেন পরিপূর্ণ হয়েও কেমন অপরিপূর্ণ! আর এই অপরিপূর্ণের নাম আব্দুল্লাহ!
কেউ পাবে, কেউ নিষ্ঠুরভাবে হারাবে, এইটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে দুর্ভাগাদের ভাগ্য যেন কোনোকালেই সহায় হয় না। তাদের কেবল হারাতেই হয়। প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির হিসেবে ফলাফল বরাবরের মতোই শূন্য! জীবদ্দশায় এরা হাতড়েও সুখ কুড়াতে পারে না। তবুও ভাগ্য তাদের নিয়ে নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে। একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলেও ছাড় নেই। মালাকুল মউতই কেবল রেহাই দেয় এ খেল থেকে।
_
– নক করে আসতে হবে না দাদুভাই।
– আম্মি বলেছে কারো ঘরে যাওয়ার আগে নক করে যেতে।
– সেটা আম্মি বাবার ঘরে গেলে করবে, দিদানের ঘরে নয়। তা আজকে হঠাৎ দিদানের ঘরে?
– আজকে আমরা এখানে ঘুমাব।
– আম্মি বাবা ছাড়া দিদানের কাছে?
– তুমি তো চলে যাবে। আমরা দুজন মিস করব তোমাকে।
– তাই? আমিও মিস করব আমার দাদুভাইদের। তা কার কী চায়? দিদানকে লাগবে, না কী চকলেট?
– চকলেট, দিদান দুটোই লাগবে।
ইয়াজমীন দুজনকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে। আল্লাহ অবুঝ শিশু দুটোকে হেফাজতে রাখুক। ইয়াজমীনের চোখের মণি এরা। নাযীর, নুরেনও ইয়াজমীনকে চোখে হারায়।
_
ক্যান্ডেলের হলদেটে আলো ঘরময়। দমকা হাওয়ায় আলো নিভু নিভু। আভিরা চট জলদি বারান্দার দরজা টেনে দেয়। নয়তো দমকা হাওয়ায় জ্বলন্ত প্রদীপ নিভে যাবে। ঘরের আলো জ্বালিয়ে আরেকবার দেখে নেয় সব ঠিকঠাক আছে কিনা! না, সব ঠিকঠাক। সুযোগে আয়নায় একবার দেখে নিল নিজেকে। সন্ধ্যার সেই সাজসজ্জা! নিজেকে আর আলাদাভাবে সাজায়নি। তবুও তার নজরকাড়া রূপ!
– শুভ জন্মদিন, জনাব!
– কোথায় উঠে আমার চোখ ধরেছেন বলুন তো আঞ্জুম। পড়ে ব্যথা পাবেন।
আভিরা নাওয়াজের চোখ থেকে দু হাত সরায়। ধপ করে নামে খাট থেকে।
– ধ্যাত! দিলেন তো আমার সারপ্রাইজের বারোটা বাজিয়ে।
– আচ্ছা, আমি চোখ বন্ধ করছি। আবার উইশ করুন।
– বললেই হয়।
– উহু, করলেই হয়। আপনি উইশ করুন।
– করব না উইশ। আপনি থাকুন, আমি ঘুমাতে গেলাম।
নাওয়াজ একটানে আভিরাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
– কীসের ঘুম? ভেবেছিলাম সারাদিনের কাজের চাপে জন্মদিনের কথা ভুলে গিয়েছেন। কখন করলেন এত সব?
– আপনি যখন নিচে ছিলেন।
– ছেলেরা আজ মায়ের সাথে থাকবে?
– হু।
বলতে বলতেই কেঁপে ওঠে। পিঠের উপরি অংশে শুষ্ক ঠোঁটের লাগাতার ছোঁয়ায় আভিরার বেহাল দশা। শাড়ির আঁচল খামচে ধরে মেয়েটা নড়তে চায় তৎক্ষণাৎ, বাধাপ্রাপ্ত হয় সঙ্গে সঙ্গেই।
– নড়বেন না আঞ্জুম!
আভিরা স্থির হয়ে দাঁড়ায়। নড়াচড়ার সামান্য প্রয়াস করে না। ওয়েস্টার্ন পার্ল নেকলেস, সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস লুক দিচ্ছে। হিজাবের উপর দিয়েই নেকলেসটা পরিয়েছে নাওয়াজ। আভিরা বারবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছে। এই নেকলেসটা সে অনলাইনে দেখেছিল বেশ কয়েকবার।
– এটা আমার?
– হু।
নাওয়াজ একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেয় আভিরার হাতে। আভিরা প্রশ্নবিদ্ধ নজরে তাকায়।
– কী আছে এতে?
– খুলে দেখুন।
শাড়ি? আভিরার ভ্রু কুঁচকে এলো। শাড়ি তার খুব একটা পরা হয়। অনুষ্ঠান আড়ম্বরে কিংবা বিশেষ কোনোদিনে শাড়ি গায়ে জড়ায়।
– হঠাৎ শাড়ি?
– ইচ্ছে হলো। পরে আসুন। থাক, আমিই পরিয়ে দেই।
– আমিইইই, আমি পরতে পারব।
– আচ্ছা পরুন তবে।
বলেই নাওয়াজ প্যান্টের পকেটে হাত রেখে সটান দাঁড়ায়। আভিরা নির্বোধের মতো চেয়ে থেকে বলল,
– আপনার সামনে?
– হ্যাঁ।
– আপনার সামনে কীভাবে…
– আপনার সামনে পরতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সংকোচ হলে সে ভিন্ন কথা। তবে এতদিনে আড়ষ্টতা, লজ্জা ভঙ্গ হওয়ার কথা। আপনি এখনও আমার সামনে লজ্জায় নুইয়ে পড়েন কেন? যাইহোক শাড়িটা পরুন।
ধূসর বর্ণের আকাশে মেঘের আড়ালে চাঁদ লুকিয়ে। আকাশ কালো হয়ে আসছে। বৃষ্টি নামার আগ মুহূর্তের ন্যায় গুমোট ভাব প্রকৃতিতে। পর্দার অনবরত উড়াউড়িতে ভেতরের দৃশ্য স্পষ্ট ধরা দিচ্ছে নাওয়াজের কাছে। শাড়ির রঙটা কী বেশি কড়া? তার রমণীর উপর থেকে চোখ সরানো দায় হয়ে পড়ছে কেন? নাওয়াজ বারান্দা ছেড়ে রুমে যায়। মেয়েটার সামনে ছিল না সে। এতক্ষণ অবধি বারান্দায় ছিল। তবে মেয়েটাকে চোখের আড়াল করেনি। কুঁচি গোঁজা থেকে বুকের আঁচল টানা সবই দেখেছে তীক্ষ্ণ চোখে। মেয়েটা তার তীক্ষ্ণ নজর দেখেনি, দেখলে নিজের সর্বনাশ টের পেত খুব করে।
নাওয়াজ নিজের বৃদ্ধা আঙুল ঠেকায় রমণীর ওষ্ঠাধরে।
– বাসন্তী রঙে আপনাকে আমার ভাবনার থেকে অত্যধিক নজরকাড়া লাগছে।
আভিরা নিশ্চুপ রয়। অকারণেই আতঙ্কিত দেখাচ্ছে তাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের বেগতিক গতিবিধি নাওয়াজের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।
– আমাকে ভয় পাচ্ছেন আঞ্জুম? ভয় পাবেন না। আপনার ভীত চোখের দৃষ্টি বড্ড নেশালো। নিজেকে সামলে রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে বেসামাল হতে চাইছি না।
আভিরা নাওয়াজের চোখে চোখ রাখে। সহসাই দৃষ্টি মিলিত হয় দুজনার। মাঝের দূরত্ব কমে একেবারে মিশে গেল দুটো মানব দেহ। আভিরার চঞ্চল চোখ দুটো যেন কিছু বলতে চাইছে। নাওয়াজ মেয়েটাকে দু হাতে আবদ্ধ করে উপরে তুলে নেয়। নারী কণ্ঠের ফিসফিসানিতে গা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে নাওয়াজের।
– সে আসছে!
– সমাপ্ত!

