প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৮৩

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৮৩
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

শো শো শব্দ করে মাথার উপর সিলিং ফ্যান ঘুরছে। কামরা শুদ্ধ নীরবতায় ছেয়ে। দুজন নারী, একজন পুরুষ ঘরে থাকলেও কোনোরকম শব্দ নেই। ভদ্রলোক এসে প্রথমেই নিষেধ করেছেন কোনোরকম শব্দ করা যাবে না। অযাচিত শব্দে তার মনোযোগ বিনষ্ট হয়। সেই থেকে কোনোরকম শব্দ হয়নি।
সুরভীর ডান পা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক। সুরভীর চোখ মুখে ক্রোধ। মিনিট বিশেক ধরে এভাবে পা দেখেই যাচ্ছে। কিছু বলছেও না। সে জানে তার পায়ে কিছু হয়নি। এই ডাক্তার শুধু শুধু পা দেখে যাচ্ছে তখন থেকে। এভাবে একটা রোগী বসিয়ে রাখলে তারই লাভ। বাড়ি বয়ে এসে রোগী দেখার কথা বলে ফি নিবে হাজার টাকা। তারপর একগাদা ঔষধ পত্তর তো আছেই।

শাশুড়ির অস্থির ভাব বুঝতেই লাবণ্য মিইয়ে গেল। এই ডাক্তার কী এত দেখছে কে জানে। সুরভী অনেক রুক্ষ মেজাজের, কখন না জানি চেঁচিয়ে উঠে এই ডাক্তারের উপর। মানসম্মান যাবে তখন। তার শ্বশুর মশাই নিয়ে এসেছেন এনাকে। লাবণ্য ভাবছে সে গেলেই ভালো হতো। অন্তত এমন কাউকে নিয়ে আসত না।

ফ্যানের বাতাসে শরীর জমে যাচ্ছে লাবণ্যর। এমন হাড় কাঁপানো শীতের সকালে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দেওয়ার কথা কে বলে? এই আধ বুড়ো লোকটাকে কোনোভাবেই ডাক্তার মনে হচ্ছে না তার। মাথায় গণ্ডগোল আছে নিশ্চয়। একটু পরপর নাকের ডগায় পড়ে থাকা চশমা ঠিক করে, আর সুরভীর পা দেখে।

– অবস্থা কী বেশি ক্রিটিক্যাল? পা ভেঙে যায়নি তো আবার?

চোখে মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকে তাকান। চোখের চশমা ঠিক করে কিছুটা গম্ভীর স্বরে বললেন,
– দেখছি।

লাবণ্য না পেরে বলেই বসল,
– আর কতক্ষণ দেখবেন?

– আপনি দেখছি আপনার শাশুড়ির মতোই অধৈর্য। উনি স্থির হয়ে বসছেন না। পা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বারবার। যার ফলে আমার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে, একটু চুপ করে থাকুন। দেখতে দিন আমাকে।

লাবণ্যর রাগ হলো। পা ই তো দেখছে। এতে এত সময়, এত মনোযোগের কী আছে? ইচ্ছে করছে এই লোকের টাকমাথা ফাটিয়ে দিতে।

– পা ভাঙেনি। তবে ডান পায়ে মারাত্মক চোট পেয়েছে। এই বয়সে এসে পায়ের ব্যথায় ভুগতে হবে। ওনাকে প্রোপার বেড রেস্টে থাকতে হবে। মেডিসিনগুলো নিয়মিত খাওয়াবেন। কিছু এক্সারসাইজ করতে হবে সকাল বিকেল। হাঁটাচলা আপাতত বন্ধ, একটু ঠিক হলে বিকেলে হাঁটতে বের হবেন। দুদিন পর এসে চেকআপ করে যাব।

একনাগাড়ে কথা বলা শেষ করেই ভদ্রলোক উঠে চলে গেলেন। লাবণ্য পিছু ছুটল। এ লোক দেখছি আচ্ছা পাগল।

– আরে আপনার টাকা, ফি নিবেন না?

– লাগবে না। আপনার শ্বশুর দিয়েছেন।

বলেই অমায়িক হাসি হাসলেন। লাবণ্য যা বুঝার বুঝে গেল। ভুলভাল বুঝিয়ে আগেই বেশি টাকা আদায় করে নিয়েছে। সেজন্যই এত গুরুত্বের সাথে পা দেখার অভিনয় করে গিয়েছে। জনসাধারণকে সেবা দেওয়া মানুষগুলোও যদি ছলচাতুরি করে বেড়ায় তাহলে মানুষজন ভরসা করবে কাকে?

লাবণ্য উপরে না উঠে রান্নাঘরে গেল। পাতিলে পানি নিয়ে চুলোয় বসায়। সুরভীর পায়ে গরম পানির ছ্যাঁক দেওয়া দরকার। লাবণ্য বের হতেই চৌকাঠে মাহাদকে দেখে তার কদম আপনাআপনি থেমে যায়। গরম পানির বোতলটা সজোরে টেবিলে রেখে একপ্রকার দৌড়ে গেল মাহাদের নিকট।

– তোমার এ অবস্থা কেন? এমন করে ঘামছ কেন? দেখি।

বলেই নিজের ওড়না দিয়ে মাহাদের ঘামে ভেজা ললাট মুছে দেয় সযত্নে। অন্য সময় হলে মাহাদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখত উদ্বিগ্ন নারীর মুখশ্রী, আপ্লুত হতো সামান্য যত্নে। তবে আজ যেন বিরক্তি ঘিরে ধরে।

– মায়ের কী হয়েছে?

লাবণ্য কিছু পল থমকে তাকায়। মাহাদের এ অবস্থা তবে সুরভীর চিন্তায়। সে এখন অবধি সুরভীর অবস্থার কথা কিছু জানায়নি মাহাদকে। মূলত জানাতে ভুলে গিয়েছিল। নিশ্চয় তার শ্বশুর ফোন দিয়ে জানিয়েছে। খবর পেয়েই ছুটে এসেছে চেম্বার ছেড়ে।

– তেমন কিছু হয়নি। ডান পায়ে চোট পেয়েছে। ওয়াশরুমে স্লিপ কেটে পড়ে গিয়েছিল।

উদ্বিগ্ন মাহাদ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে কিছুটা কর্কশ গলায় বলল,
– তুমি ছিলে কোথায় লাবণ্য? তোমার খামখেয়ালি স্বভাব কী এখনও যায়নি?

লাবণ্য বলতে চাইল, সে রুমে ছিল। কিন্তু মাহাদের পরের কথায় কণ্ঠনালী দিয়ে কথা বের হয় না আর। মাথা নুইয়ে নিঃশব্দে মাহাদের পিছন পিছন উপরে ওঠে। একজন সুস্থ সবল মানুষ ওয়াশরুমে গেলে সে নিশ্চয় তার পিছু নিতে পারে না। কিংবা বাহিরে দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায় থাকাটাও সমীচিন নয়। আর সুরভী যে তাকে খুব একটা দেখতে পারে না তা তো অজানা নয় মাহাদের। তারপরও তাকে নিয়ে এমন একটা মন্তব্যের কারণ? লাবণ্য যথেষ্ট চেষ্টা করে সুরভীর মন জুগিয়ে চলার। তবে প্রতিবারই মনে হয় তার পক্ষে সুরভীর মনে জায়গা পাওয়া অসম্ভব!

মাহাদকে দেখে সুরভী চেঁচিয়ে উঠল,
– অসভ্য, এই তোর সময় হয়েছে আসার? দু ঘণ্টা ধরে পা ভেঙে বসে আছি। আর আমার গুণধর পুত্রের কেবল সময় হয়েছে মাকে দেখতে আসার।

মাহাদ মাথা নুইয়ে হাসে। সুরভী আজকাল অদ্ভুত সব আচরণ করে। তার বাবা যতটা মাথা ঠান্ডা রেখে কথা বলে সুরভী যেন ততটাই কর্কশ। সময়ের সাথে সাথে মেজাজ চটে যায় অতি দ্রুত। কথা বলার মানুষের অভাব, নিঃসঙ্গতায় সুরভীর খিটখিটে মেজাজের অন্যতম কারণ।

মাহাদের বাবার বয়স হয়েছে। চামড়ায় ভাঁজ পড়ছে, চেহারায় বয়স্ক ছাপ। নিজের মতো করেই থাকেন দিনের পুরোটা সময়। সকালে চা, নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে পড়বেন। এসে দুপুরের খাবার খেয়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটান। বিকেল হতেই হাঁটতে বের হয়, কখনো বা চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয় বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে। ওনার সময় ব্যস্ততায় কেটে গেলেও সুরভীর সময় কাটে একাকী, নিঃসঙ্গতায়। লাবণ্যর সাথে প্রয়োজন ছাড়া অযথা কোনো কথা বলেন না তিনি। বর্ণা মাস কয়েক হবে বাড়িতে নেই। দ্বিতীয়বারের মতো অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় গর্ভাবস্থার পুরোটা সময় বাবার বাড়িতেই থাকা হবে। বলতে গেলে পুরো বাড়িতে লাবণ্য আর সুরভী একাই থাকে। এক ছাদের নিচে থাকলেও তিন বেলা রান্না আর খাবার সময় ছাড়া দেখায় হয় না তাদের।

_

– কী গো বর্ণের মা, বউয়ের বাপ মা কী মানুষরে কেমনে সমাদর করতে হয় শিখাইয়া পাঠায়‌ নাই? চা নাস্তা কিছুই তো সাধল না। আসার পর সালাম দিয়া একটা কথাও বলে নাই। কী দেমাগি মেয়ে বাবা! এই জন্যই বলি অত শিক্ষিত, বড়োলোক ঘরের মেয়েরে বউ করে না আনতে।

এত কথার বিনিময়ে ভদ্রমহিলা নিশ্চুপে হাসেন। কাজের মেয়েকে ডেকে বললেন,
– এতক্ষণ লাগে তোর নাস্তা দিতে।

– আমি তো নাস্তা কখন রেডি কইরা থুইয়া রাখছি।

– মেহমানদের সামনে নাস্তা না দিয়ে কিচেনে রেখে দিলে হবে? নিয়ে আয়।

আপেল, মাল্টা, কমলার স্লাইস, সাবুদানার পায়েস, বিস্কিট, ক্যাটলি ভর্তি চা সমেত দুটো ট্রে এনে রাখা হয় গোলাকার টেবিলে।

– আগে পায়েসটা মুখে দিন। আমার বউ মা বানিয়েছে। ও খুব ভালো পায়েস বানায়। মেয়েটা এসেছে কয়েক মাস হলো। ওকে কাজে হাত লাগাতে দেই না তেমন। তাছাড়া ও মোটেও দেমাগি না। স্বভাবে স্বল্পভাষী, কথা খুব কম বলে এই আরকি। দেখুন না আমার বলতে হয়নি নিজ থেকেই আপনাদের জন্য পায়েস রান্না করেছে।

ঘন ক্রিমি একটা ভাব। উপরে কাজু বাদাম, পেস্তা বাদাম, কিশমিশ ছিটানো। দেখেই কেমন খেতে ইচ্ছে করছে। দেখতে যতটা না লোভনীয় খেতে ততটাই সুস্বাদু। একেবারে মুখে লেগে থাকার মতো স্বাদ। এমন স্বাদের খাবার খেয়ে প্রশংসা না করাটা যেন বেমানান। বর্ণালীর এক প্রতিবেশী খুব ভোজনরসিক। তার স্ত্রী মুখ ভার করে রাখলেও ভদ্রলোক প্রশংসা করতে কার্পণ্য করছেন না।

– কই ডাকুন, জ্যোতি মাকে। যাওয়ার আগে একটু দেখা করে যাই।

বর্ণালী গলা ছেড়ে ডাকলেন জ্যোতিকে,
– জ্যোতি একটু এদিকে এসো।

ডাকার সাথে সাথে মেয়েটা প্রায় ছুটে এলো। বলিরেখায় ঘামের আস্তরণ। জ্যোতির কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখার দাগ আছে। দাগগুলো যেন মেয়েটার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিতে উদ্যত। ভদ্রলোক উঠে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই জ্যোতির হাতে হাজার টাকার নোট গুঁজে দেয়। মেয়েটা নিতে না চাইলেও জোর করেই ধরিয়ে দিল। মাথায় হাত রেখে অমায়িক কণ্ঠে বলল,
– আঙ্কেল কিন্তু খেতে ভালোবাসি ভীষণ। মাঝেমধ্যে এসে আবদার করব, তুমি বিরক্ত হবে না তো?

জ্যোতি মাথা নুইয়ে ক্ষীণ স্বরে জবাব দেয়,
– জি না।

– আজ তাহলে আসি আপা। বউ মার হাতের পায়েস খেতে যখন তখন চলে আসব।

ড্রয়িংরুম জুড়ে নীরবতা। জ্যোতি রান্নাঘরে গিয়ে এক বাটি পায়েস এনে বর্ণালীর হাতে দিয়ে বলল,
– খেয়ে দেখুন কেমন হয়েছে?

বর্ণালী এক চামচ খেয়ে মুখটা কেমন গম্ভীর করে রাখে।জ্যোতির সব উৎফুল্লতা মিলিয়ে গেল। খেতে ভালো হয়নি না কি? তবে ওনারা যে প্রশংসা করে গেলেন। তাছাড়া এই সাবুদানার পায়েসটা সে ভালো বানায়। আব্দুল্লাহর ভীষণ পছন্দের। প্রায় বানিয়ে নিয়ে যেত। জ্যোতি দ্বিধাদ্বন্দ্ব মনে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
– ভালো হয়নি?

বর্ণালী এক চামচ পায়েস জ্যোতির মুখের সামনে ধরে বলল,
– নিজেই টেস্ট করে দেখো।

জ্যোতি মৃদু হেসে মুখে নেয়। বর্ণালীর সাথে তার খাতির জমেছে বেশ। এ বাড়ির প্রতিটা মানুষের সাথেই মিশে গিয়েছে অল্প দিনে। যেন তার আত্মার কেউ এরা, নিজের বাড়িতে, নিজের মানুষগুলোর মাঝে থেকেও যা মনে হয়নি কখনো।

– এখনও টেস্ট কেমন হয়েছে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কী? হলে তোমার শ্বশুর মশাইয়ের অপেক্ষা করো। পুত্র বধূর হাতে বানানো পায়েসের গুণগান আমার থেকে ভালো উনি বেশি করতে পারবেন। এই প্রশংসার দিক থেকে তোমার ভাগ্যটা হয়েছে মন্দ। রান্না হাজার ভালো হলেও বর্ণ কখনো মুখ ফুটে প্রশংসা করবে না।

জ্যোতি নীরবে শুনে গেল। বর্ণালীর কথা যত শুনে তার যেন ততই ভালো লাগে। যেমন আগ্রহ নিয়ে মেয়েরা তার মায়েদের কথা শুনে, জ্যোতিকে যেন তার থেকেও বেশি মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে পাওয়া যায় বর্ণালীর কথা বলার সময়কালে।

_

কিচেন থেকে ঝাঁজালো গন্ধ ভেসে আসছে। তীব্র ঝাঁজে বর্ণালী কেশে উঠল পরপর। এই ভোর সকালে কিচেনে কারো থাকার কথা নয়। তবে এমন ঝাঁজালো গন্ধ কোথা থেকে আসছে?

শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে দক্ষ হাতে রুটি বেলছে জ্যোতি। রুটি বেলার ফাঁকে ফাঁকে খুন্তি নাড়তে ভুলছে না। লো হিটে উল্টে পাল্টে সেঁকে নিচ্ছে পরোটা। মুচমুচে পরোটার সাথে আলুর দম, ভাজি, অমলেট, চা, সাথে বাটিতে করে চিনি রাখা। তার শ্বশুর গরম গরম পরোটা চায়ে ডুবিয়ে কখনো বা চিনি দিয়ে খায়।

ফর্সা মুখ লালিমায় আরক্ত। নাকের ডগায় ঘামের আস্তরণ। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে স্বেদবারি। চুলোর জলন্ত আগুনের উত্তাপেই চেহারায় এমন লালচে ভাব।

– এসব কী করতাছেন ম্যাডাম? খালায় আজকে আমার চাকরি নট করে তবেই ছাড়বে। জলদি কিচেন থেকে বের হোন। খালা ডাইকা পাঠায়ছে আপনারে। কে কয়ছে সক্কাল সক্কাল অমন চুলার ধারে আইয়া চেহারা জ্বালাইতে।

হঠাৎ উচ্চ কণ্ঠে জ্যোতি ভড়কে গেল। জ্যোতির ভড়কে যাওয়া চেহারা দেখে কাজের মেয়েটাও কেমন থতমত খায়।

– ডরাইছেন না কী? ডরাইয়েন না। আমি এমনেই কথা কই। আমার কথা হুনলে আতকা মানুষ ডরাই যায়। তয় সবাই আবার ডরাই না। এ বাড়ির হগ্গলে আমার কথার লগে অভ্যস্ত। আপনিও থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হইয়া যাইবেন।

জ্যোতি মৃদু হাসে। আধখোলা এলোমেলো চুলগুলো ঘাড়ের ধারে লেপ্টে, আলগোছে আঁচল সরিয়ে বেঁধে নেয়। ট্যাপ ছেড়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দেয় বার কয়েক। তার মুখে জ্বালা অনুভব হচ্ছে অল্পস্বল্প।

বর্ণালী তজবি হাতে সোফায় বসে। সাদা জ্বলজ্বল গুটিতে চুম্বন এঁকে গুনতি থামায়। জ্যোতি হাঁটু গেড়ে সম্মুখে বসতেই দোয়া দরুদ পাঠ করে মাথায়, মুখে ফু দেয়। এই মায়াময় মুখের হাসি যেন সবসময় অক্ষুণ্ন থাকে।

– চুলে তেল দেওয়া হয় না কদিন ধরে? কী উশকোখুশকো হয়ে আছে। এসো তেল দিয়ে দেই।

জ্যোতি ড্রয়িংরুমের মেঝেতে হাঁটু ভাঁজ করে বসে। ছোটো থেকেই সে চুলে তেল দেয় না কখনো। চুলে তেল দেওয়া তার সব থেকে অপছন্দের কাজ হলেও মুখে রা অবধি করে না।

– কিচেনে কী করছিলে তুমি? বিছানায় পড়ে যাইনি আমি। বিয়ের পর থেকে এখন অবধি ঘরকন্যার যাবতীয় কাজ আমি একাই করে এসেছি। নিশ্চিন্তে আরও কয়েক বছর সংসারের কাজ করে যেতে পারব। তুমি এসেছ মাস কয়েক মাস হলো কেবল। এখনই সংসারের দায়িত্ব তোমার নিতে হবে না। সময় হলে আমি নিজেই তোমাকে তোমার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবো। তার আগে কোনো কাজে হাত লাগাতে যাবে না। তাহলে কিন্তু মার একটাও মাটিতে পড়বে না।

জ্যোতির মনে হচ্ছে প্রেমিকের ভালোবাসা না পেলেও এতদিন কাঙালের মতো মায়ের একটুখানি মমতার জন্য তড়পিয়েছে তা এখানে পেয়ে যাবে। তার এভাবে, বর্ণালীর গা ঘেঁষে থাকতে ইচ্ছে করছে, সাধ জাগছে বাঁচার।

_

জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। আব্দুল্লাহ ছুটে চলেছে সময়ের ঘূর্ণনে। এই জীবনে কী পেল না পেল সেই হিসেব আর কষতে বসে না। তার সময় কাটে ব্যস্ততায়। পাওয়া না পাওয়ার আক্ষেপ করার সময় কয়? ফুসরত মিললে তো অপ্রাপ্তির খাতা মেলে বসবে। সময়ই হয়ে উঠে না তার। কোনোরকম গোগ্রাসে গিলে ছুটতে হয় কাজে। বেশ কড়াকড়ি নিয়মে আটকেছে কদিন ধরে।

অন্ধকার কক্ষে পর্দা টেনে রাখায় আরও অন্ধকারাচ্ছন্নে ছেয়ে। এমন নিগূঢ় আঁধারে যে কারো প্রাণ নাশের জো। আলো সব পর্দা সরিয়ে কপাট মেলে দেয়। রোশনাই এসে ছুঁয়ে দেয় ঘুমন্ত মানবের উদাম পিঠ, পেশীবহুল বাহু।

– এত বেলা অবধি ঘুমাচ্ছিস যে? কটা বাজে খেয়াল আছে?

ঘুম ঘুম চোখে আব্দুল্লাহ সময় দেখে। ঘড়ির কাঁটা কেবল পৌনে ছয়টায়। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে আলোর মুখের দিকে তাকায়।

– এই সাত সকালে উঠে কী করব? আজ অফ ডে আগেই বলেছিলাম।

– বাবার ঔষধ লাগবে।

– আগে বলোনি কেন?

– একটু আগে ঔষধ দিতে গিয়ে দেখলাম চারটা পাতা শেষ।

– রাতে দেখোনি?

– না। রাতে ঔষধ মা দিয়েছিল। আমি দেখলে তখনই নিয়ে আসতে বলতাম তোকে।

– কী যে করো তোমরা? এমন বেখেয়ালে হলে কী করে হবে?

বলেই ঝট করে বিছানা থেকে নামে। তাড়াহুড়ো করে উদোম গায়ে শার্ট জড়িয়ে দ্রুত বের হয় ঘর ছেড়ে। সিঁড়ির ধারে যেতেই মেজাজ চটে যায় আব্দুল্লাহর। দেখেও অদেখা করে কোনোরকম পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামে। স্থির, অপলক নিরেট মেয়েলি চোখের চাহনি আব্দুল্লাহর পানেই। অব্যক্ত, অলিখিত অভিযোগ, প্রণয়, উপেক্ষা ঝরে পড়ে কান্না হয়ে। চোখ জুড়ে ব্যাকুলতা, না পাওয়ার তীব্র বেদনা।

– সুস্মিকে কী বলেছিস তুই?

ঘর্মাক্ত দেহ থেকে ভেজা শার্ট টেনে খুলে কোনোরকম। ফ্যানের বাতাসে যেন গরম লাগছে আরও। আব্দুল্লাহ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। গরমে তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। তার মাঝে মায়ের আহ্লাদী কথাতে মেজাজ বিগড়ে যায় মুহূর্তেই।

– ওকে আমি কী বলতে যাব?

– তাহলে মেয়েটা কাঁদছে কেন?

– আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছ? ও কেন কাঁদছে তা কী আমার জানার কথা? সবে বাহির থেকে এলাম মা, তোমার এসব আহ্লাদীপনা এখন না দেখালে নয় কী?

– আহ্লাদীপনা? মা মরা মেয়েটা সব ছেড়েছুড়ে তোর জন্য এখানে পড়ে আছে দিনের পর দিন, আর মেয়েটার দিকে দু দণ্ড তাকাবার সময় তোর কাছে নেই। কোন না কোন মেয়ের জন্য তুই এমন হীরের টুকরো মেয়েটাকে অবজ্ঞা করছিস?

কাঁচের জারটা দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে মেঝেতে। হঠাৎ শব্দে কম্পন ধরে যায়। ঝনঝন শব্দ থামে অচিরেই, তবে আব্দুল্লাহর মায়ের চাহনি তেমনই নিস্তব্ধ, নিস্পৃহ।

– সব কথার মাঝে জ্যোতিকে কেন টেনে আনো মা? সমস্যা কী তোমাদের? ও তো কিছু করেনি, উল্টো ওর সাথে অন্যায় হয়েছে। তোমার ছেলে ওকে ঠকিয়েছে। তাহলে তোমার সব রাগ, ক্ষোভের কারণ আমার জ্যোতি কেন? জ্যোতি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ আমার জীবনে আসবে না। তোমরা হাজার চেষ্টা করলেও লাভ হবে না। এই শেষ, সুস্মিকে নিয়ে আর কিছু বলবে না। তা না হলে এই বাড়িতে আজই আমার শেষ দিন হবে।

আব্দুল্লাহ এই গরমেই পুনরায় বেরিয়ে গেল। তার মেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। এখন ভালো কথাও সহ্য হবে না তার। রাগ ধরে যাবে অকারণে, তার থেকে ভালো একাকী সময় কাটানো।

আব্দুল্লাহ নিজের গন্তব্যে ছুটে। অনেক দিন ধরে প্রাণটাকে দেখা হয় না এক নজর। সময় সুযোগ মেলে না তেমন। বাবার অসুস্থতা, বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাওয়া বোনদের জন্য সম্বন্ধ এসে এসে ফিরে যাওয়াও যেন আব্দুল্লাহকে কাজের তাগিদে মরিয়া করতে সক্ষম হয়নি। কেবল জ্যোতিকে নিজের করার জন্য একটা চাকরি জোগাড় করে। সেখান থেকেও বের করে দেওয়া হয় মিস্টার সারওয়ারের নির্দেশে। আব্দুল্লাহ তখন বেদিশারি চাকরির খোঁজে। একটা চাকরি জোগাড় করতে পারলেই মেয়েটা তার হয়ে যাবে। তবে তার সব চেষ্টায় বৃথা যায়। একের পর এক নৈরাশ্যে হীনম্মন্যতা আঁকড়ে ধরে, নিজেকে অযোগ্য মানুষের কাতারে শামিল করে দ্বিধাহীন চিত্তে। অপারগতা, ব্যর্থতায় পরাস্ত সৈন্যের ন্যায় স্বীয় পরাজয় স্বীকার করে।

তবে সব হারানোর পর ভাগ্যের লিখন ফিরতি ঘুরে। প্রথমাবস্থায় বারো হাজার টাকা বেতন ধরলেও পরবর্তীতে আব্দুল্লাহর কাজের প্রতি একাগ্রতা, নিষ্ঠা দেখে তার বেতন বেড়ে দ্বিগুণ। একের পর এক সাফল্যতা হাতছানি দেয় তাকে। সেও গ্রহণ করে সাদরে। কেবল নারী সঙ্গীনি ব্যতীত!

সুস্মি মেয়েটার বয়স সবে ষোলো। ধবধবে ফর্সা গড়নের মেয়েটার চামড়ায় টোকা দিলেই যেন রক্ত গলিয়ে পড়বে। যেমন তার সৌন্দর্য, তেমনি গুণের অধিকারী। কথাবার্তায়, চালচলনেও নম্র ভদ্র। ছোটো থেকেই সবকিছু আয়ত্তে এনে রেখেছে। এক দেখাতেই যে কেউ এই মেয়ের রূপে, কর্মে মুগ্ধ হতে বাধ্য। আব্দুল্লাহর মায়ের দুঃসম্পর্কের এক বোনের মেয়ে। দুঃসম্পর্কের হলেও তাদের মধ্যে ভাব ঢেড়। যেন আপন দু বোন। সেই সম্পর্ক আত্মীয়তায় বদলাতে চেয়েছিলেন ছেলেমেয়ে দুটোর চার হাত এক করে। তবে আব্দুল্লাহর এতে আপত্তির শেষ নেই। সুস্মির নাম শুনলেই চোটপাট করে।

আব্দুল্লাহর মা অনেক ভেবে সুস্মিকে নিজেদের বাড়িতে এনে রাখার চিন্তা ভাবনা করে। মেয়েটাকে সামনাসামনি দেখে যদি মতের পরিবর্তন হয়। কিন্তু মেয়েটাকে ঠিকঠাক দেখেনি অবধি। তার নজর এক নারীতে নিবদ্ধ। অন্য নারীকে চাওয়া তো দূর, দেখাও নিষিদ্ধ!

আবহাওয়া বেশ রূপ বদল করছে। বলা নেই কওয়া নেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামায় আকাশ চিরে। জ্যোতির মস্তিষ্ক চিড়বিড়িয়ে আছে ভীষণ। সকালে একগাদা কাপড় ধুয়েছে। রোদ উঠেছে সকাল সকাল, সেজন্য বেলা গড়ানোর আগেই কাপড় ধুয়ে মেলে দিয়েছে। কিন্তু খানিক বাদেই আকাশ কালো হয়ে আসে, আর অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে। তার অর্ধ ভেজা, শুকনো কাপড় পুরোপুরি ভিজে চুপচুপে। সেই থেকে তার মেজাজ বিগড়ে আছে। এই হঠাৎ রোদ, হঠাৎ বৃষ্টিতে সে যেন অতিষ্ঠ। এই শেষ বিকেলেও রক্ষা হলো না। ঝিরঝির বৃষ্টি থেমে নেই। নিজ ধারায় ভিজিয়ে চলেছে ধরণী, পথঘাট, খোলা প্রান্তর। অলিন্দের শিক গলিয়ে এক একটা বৃষ্টির ফোঁটা গভীরভাবে ছুঁয়ে চলেছে রমণীর চোখের পাপড়ি, মেদুর গাল, চোয়াল, মলিন, বিষণ্ণতায় ছেয়ে থাকা মুখশ্রী!

চোখ বন্ধ থাকলেও তার ঘ্রাণেন্দ্রিয় প্রখর। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন জানান দেয় তার আগমনের বার্তা। জ্যোতি চোখ বুজেই মাথা রাখে চেয়ারে। ল্যাম্পপোস্টের বিপরীতে থাকা মানব মিলিয়ে যেতে লাগে আস্তে ধীরে। কার্নিশ ঘেঁষে উত্তপ্ত নোনাজল গড়ায় অচিরেই। তবুও রমণী ঘুরে তাকায় না। পিছন ফিরে তাকালেই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা তার ভঙ্গুর সত্তা খোলা বইয়ের মতো উন্মুক্ত হয়ে যাবে। যা সে চায় না। জ্যোতি দু হাতে মাথা চেপে বিড়বিড়ায়,
– কেন আসেন? আমার কোনো পিছুটান নেই। মিথ্যে মায়ার হাতছানি দিয়ে জ্যোতিকে পুনর্বার ভাঙা সম্ভব নয়।

_

– এমন কাঞ্জুছি করছ কেন মাহাদ ভাই? আমার জন্য চেয়েছি না কী? তোমার মেয়েই তো খেতে চেয়েছে, আমার কী দোষ?

– দেখো লাবণ্য, একদম নাটক করতে এসো না। তোমার পায়ের নখ থেকে মাথা অবধি পুরোটাই চেনা। এসব সস্তা অভিনয় করে আমার কাছে লাভ হবে না।

লাবণ্য মুখ ফুলিয়ে বসে রইল। অভিমানে চোখ ভরে আসে। ফুচকায় তো খেতে চেয়েছে, তাই বলে ধমকাতে হবে। বুঝিয়ে বললে কী সে শুনত না? সামান্য বিষয়ে এমন ধমকাতে কেন হবে বুঝে আসে না।

বেশ কয়েক দিন ধরে লাবণ্যর শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব নেই, তবুও শরীর কেমন নিস্তেজ হয়ে আসে। দিন রাতের সময় কাটে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। মাহাদের ভাষ্যমতে দুর্বলতার দরুন এ অবস্থা হলেও, লাবণ্যর ভেতর কেমন খুঁতখুঁতে ভাব। মনে হচ্ছে তার ভেতরে কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে। শঙ্কিত লাবণ্য সরাসরি মাহাদকে সে কথা বলতেও পারছে না। ঘনঘন বমিভাব, খাবারের প্রতি তীব্র অনিহা কীসের লক্ষণ বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয়নি সুরভীর। ছেলের, ছেলের বউয়ের ছেলেমানুষিতে বিরক্ত তিনি। ডাক্তার হয়েও রোগের উপসর্গ দেখে বুঝবে না কেন? তার ছেলে আবার নকল সার্টিফিকেট দেখিয়ে ডাক্তার হয়নি তো? এমন আজগুবি প্রশ্নও উঁকি দেয় সুরভীর মনে।

মায়ের কথা শুনে মাহাদ বোকা বনে গেল, কী রিয়েকশন দিবে বুঝে উঠতে পারে না। শেষে কিনা তাকে ডাক্তারি পেশা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে? এমন অযৌক্তিক আরোপের যথাযথ কারণ জানতে চাইলেই, সুরভীর কথায় অবিশ্বাস্য দৃষ্টি ফেলে। তাদের প্রার্থনা কবুল হয়েছে তবে। ধৈর্য ধারণ করলে বিধি নিরাশ করেন না মোটেও। পূর্ণ আস্থা রেখে নেক নিয়তে খোদার কাছে চাইতে হবে। একটুতেই আশাহত হলে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে পদে পদে।

লাবণ্য জায়নামাজে সেজদারত। তার পাশে জায়গা দখল করে দাঁড়ায় মাহাদ। এমন একটা অবিশ্বাস্য সুখবরে খোদার দরবারে মাথা না ঠেকালেই নয়। কৃতজ্ঞতা জাহিরের জন্য স্বামী স্ত্রী একসাথে খোদার দাসত্বে মগ্ন। একান্তে মানব মানবী অশ্রু বিসর্জনের মাধ্যমে নিজেদের খুশি জানান দিতে উদ্যত!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here