প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৬২

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬২
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

আভিরা গভীর তন্দ্রায় নিদ্রিত। হালকা স্বরে তার নাম ধরে কারো ডাক কর্ণগোচর হলেও নিদ্রা ভাঙন হয় না মোটেও। বেশ কয়েকবার ডাকার পরও আভিরাকে ঘুমে মগ্ন থাকতে দেখে নাওয়াজ নিঃশব্দে বিছানা ছাড়ে। ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে গেল। তার ঘুমের রেশ এখনও কাটেনি। ঘুম ঘুম চোখে ওদিক ওদিক চেয়ে ফ্রিজ থেকে ডিম বের করল। চারটা ডিম হাফ সিদ্ধ করে, এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে উপরে উঠল। রুমে যেতে দেখল আভিরা বিছানায় নেই। মেয়েটা উঠে গিয়েছে তবে। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে। মেয়েটা তাহলে ফ্রেশ হচ্ছে। নাওয়াজ আলমারি থেকে শার্ট, প্যান্ট বের করে তৈরি হয়ে নিল। হাত ঘড়ি পরতে নিলেই দরজা খোলার শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আভিরা বেরিয়ে এসেছে। মুক্ত দানার মতো তার মুখে পানি চিকচিক করছে। নাওয়াজ মৃদু হাসে। আভিরা নাওয়াজের হাসি দেখে সামান্য অপ্রস্তুত হলেও তার মুখশ্রীতেও হাসি দেখা গেল। তবে টেবিলে চোখ পড়তেই মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। আভিরার গোমড়া মুখ নজরে আসতে নাওয়াজ কপাল কুঁচকায়। এ মেয়ের আবার কী হলো। এই মেয়েটাকে বুঝে উঠতে পারে না সে। এই ভালো তো এই খারাপ। ফোঁস করে শ্বাস ফেলে নাওয়াজ আভিরার কাছে এগিয়ে গেল। মেয়েটার চিবুক ছুঁয়ে প্রশ্ন করল,
– কী হয়েছে?

– আমায় ডাকেননি কেন?

নাওয়াজের কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়ে। এই মেয়ে দেখছি ঘুমকাতুরে। সে বেশ কয়েকবার ডেকেছে আভিরাকে। মেয়েটার নড়চড় না দেখে পরে উঠে গেল। এখন কিনা এই মেয়ে বলছে, আমায় ডাকেননি কেন?

– ডেকেছিলাম। কিন্তু কেউ একজন এতটাই ঘুমে নিমগ্ন ছিল যে আমার ডাক তার কর্ণকুহরে পৌঁছায়নি।

আভিরা ভারি লজ্জা পেল। দৃষ্টি নত করে সে। দিন দিন যেন আলসেমি জেঁকে ধরছে। এত গাঢ় ঘুম কখনো দেয় না সে। কেমন গভীর ঘুমে থাকলে লোকটার ডাক তার কানে যায় না। আগে তো আজানের ধ্বনি কানে আসতে ঘুম ভেঙে যেত। আর এখন কিনা কেউ ডেকে ডেকে অতিষ্ঠ হয়ে গেলেও সহজে ঘুম ভাঙতে চায় না।

নাওয়াজ খানিকটা পিছিয়ে দুধের গ্লাস মেয়েটার হাতে দিয়ে বলল,
– পুরোটা শেষ করবেন। কোনো বাহানা চলবে না। গ্লাসের দুধটুকু শেষ করে ডিম খাবেন।

সিদ্ধ ডিম দেখে আভিরা কেমন নাক মুখ কুঁচকে নেয়। দুধ ডিম অতটা খেতে পারে না সে। আভিরা নাক চেপে অর্ধেক দুধ শেষ করে নাওয়াজের হাতে দিয়ে মিনমিন করে বলল,
– আর সম্ভব না। গা গুলিয়ে আসছে।

নাওয়াজ জোর করে না। নিত্যদিন মেয়েটা এমন করে। এ ক্ষেত্রে হম্বিতম্বি করলেও হয় না। মেয়েটা একগুঁয়েমি করে অর্ধেকটা খেয়ে রেখে দেয়। জোর করেও খাওয়ানো যায় না। অতঃপর তাকেই শেষ করতে হয়। তিনটে ডিমের কুসুম নাওয়াজ মেয়েটার মুখে দেয়। সাদা অংশ তো এই মেয়ে খায় না। সেজন্য মেয়েটাকে কুসুম দিয়ে সাদা অংশটুকু সে খেল। মোবাইল পকেটে পুরে মেয়েটার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
– একটু পরেই বর্ণারা আসবে। ওদের সাথেই থাকবেন। এদিক ওদিক যাবেন না কোথাও। আমি ফোন করব।

বলতে বলতে নাওয়াজ বেরিয়ে যেতে নিলে আভিরা পিছু ছুটল।

– আপনি আসবেন না?

নাওয়াজ এক পলক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে সদর দরজা পেরিয়ে বলল,
– নিশ্চয়তা নেই। সময় পেলে আসব।

নাওয়াজ বেরিয়ে গেল। আভিরা সদর দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, যতক্ষণ নাওয়াজের অবয়ব পরিলক্ষিত হয় ততক্ষণ। তারপর গেল সকালের নাস্তা বানাতে। তার শাশুড়ি উঠেছে কিনা কে জানে, লাবণ্যও বোধহয় ঘুমে। আভিরা চট জলদি হাতের কাজ সারে। নিজের উপর চাপা রাগ হয়। এত ঘুমাতে গেল কেন আজ। সে ঠিক সময়ে উঠলেই তো নাওয়াজকে তখন নাস্তা বানাতে হতো না। সে থাকতেও কিনা লোকটাকে কাজ করতে হচ্ছে।

– আসব?

– এসো।

শাশুড়ির সাথে আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারে না আভিরা। কেমন একটা জড়তা কাজ করে। আভিরা মাথা নুইয়ে শাশুড়িকে বলল,
– মা আপনিও চলুন আমাদের সাথে। আসলে একা একা কীভাবে কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। তাছাড়া আপনার ছেলেও হসপিটালে গিয়েছে। আসবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই।

ইয়াজমীন নিজের স্বভাব সুলভের বিপরীত আচরণ করছে দিন তিনেক ধরে। যথারীতি গম্ভীর স্বরে বলল,
– বুঝতে না পারার কী আছে? শুধু তো হলুদের শাড়িই কিনতে যাচ্ছ। বাদবাকি সব তো কেনা হয়ে গিয়েছে। আর তোমাকে তো একা একা কোনোকিছু পছন্দ করে কিনতে হবে না। বর্ণারা তো সাথে যাবেই।

– তবুও আপনি গেলে ভালো হতো।

ইয়াজমীন ছেলের বউয়ের আনত মুখশ্রী তীক্ষ্ণ চোখে দেখে গেল। দুদিন ধরে আভিরার সাথে কথা বলছেন না। মেয়েটা যে এভাবে তার সাথে কথা বলতেই এসেছে বুঝতে বাকি নেই।

– দেখো আভিরা, আমার এখন বয়স হয়েছে। লাবণ্যও আজ বাদে কাল অন্যের বাড়ি চলে যাবে। গোটা সংসারটা কিন্তু একা হাতে তোমাকেই সামলাতে হবে। দশ বারোটা শাড়ি কেনার কথা শুনে এমন ঘাবড়ে গেলে চলবে? যাও তৈরি হয়ে নাও। বর্ণারা ডাকতে চলে আসবে।

আভিরা নীবরে সম্মতি জানায়। চপল পায়ে শাশুড়ি মায়ের ঘর থেকে প্রস্থান করে।

_

কী লাগবে আপা? আসেন, দেখেন। বিক্রেতাদের এমন হাঁকডাকে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। দোকানের সামনে কদম ফেলতে না ফেলতেই তাদের ডাকাডাকি শুরু হয়ে যাবে। তারপর তাদের বিব্রতকর সম্বোধন তো আছেই। অল্প বয়সী মেয়েদেরও খালা ডেকে বসে থাকে। আভিরারা সোজা দোতলার বস্ত্র বিতানে চলে গেল। বিশাল বড়ো শাড়ির দোকান। এখানে বিক্রেতাদের ব্যবহারও যথেষ্ট মার্জিত। অন্যের মতো কাস্টমারদের মা, খালা সম্বোধন করে না।

বেশ কয়েক রঙের শাড়ি দেখার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যেহেতু হলুদের অনুষ্ঠান সেজন্য লাল হলুদ কিংবা কাঁচা হলুদ রঙের শাড়ি নিলেই ভালো হবে। সব রেখে বাসন্তী রঙের প্রায় পঞ্চাশ, ষাটটা শাড়ি নিল ওরা। কনের বাড়ির, ছেলের বাড়ির সব শাড়ি একসাথেই কেনা হয়েছে। আলাদা আলাদা শপিং করার ঝামেলায় যায়নি। এমনিতেই সময় কম। অল্প সময়ে এত ঝামেলা করতে কে চায়। তাই দুই পরিবারে কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে সকল কিছু একসাথে কেনা হয়েছে।

পরিচিত দোকান তাদের। দরদাম নিয়ে তেমন চিন্তা নেই। তবুও তারা এতগুলো শাড়ি দেখে থম মেরে বসে রইল। না দামাদামিতে যাচ্ছে আর না অন্য শাড়ি মেলে দেখছে। চুপচাপ বসে রইল সকলে। প্রবেশদ্বারে মাহাদকে দেখে সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বর্ণা কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
– এতক্ষণ সময় লাগে, দশ মিনিটের কথা বলে আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করালি।

মাহাদ টুল টেনে বসতে বসতে হালকা স্বরে বলল,
– আরে জ্যামে আটকে গিয়েছিলাম। এখন বল সব কেনা হয়েছে?

– পছন্দ করে রেখেছি। তুই একটু দেখ ঠিক আছে কিনা।

মাহাদ মোবাইলে নজর রেখেই বলল,
– মেয়েদের জিনিস আমি কী বলব। পছন্দ হলে নিয়ে নে।

বর্ণা কিছুটা ফিসফিস করে বলল,
– লাবণ্যর জন্যও কি একই শাড়ি নিব?

মাহাদ এবার নড়েচড়ে বসে। মোবাইল রেখে হালকা কেশে সামনের শাড়িগুলো এক নজর দেখে বলল,
– ওর জন্য অন্য কোনো শাড়ি দেখ।

– তোর বউ, তুই দেখ। আমাকে বলছিস কেন?

মাহাদ যেন মুশকিলে পড়ে গেল। বুঝল বর্ণা তাকে ইচ্ছে করেই এমন বিপাকে ফেলছে। মাহাদ কিছু বলবে তার আগেই শাড়ির স্তূপের নিচে পড়ে থাকা হালকা গোলাপি আর আসমানি রঙা মিক্সড কম্বিনেশনের শাড়িতে চোখ আটকায়। মাহাদ অত না ভেবেই লাবণ্যর জন্য শাড়িটা নিয়ে নিল। এই শাড়িতে মেয়েটাকে কেমন লাগবে ভেবেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। মাহাদ অস্থির হয়ে উঠল নিজের না হওয়া বধূকে এই শাড়িতে দেখার জন্য।

যাওয়ার আগে বাড়ি ফাঁকা দেখে গেলেও এখন অল্পসল্প লোকের সমাগম। তার খালা শাশুড়িরা আর তাদের ছেলে, ছেলের বউ এসেছে। মামা শ্বশুরেরা এখনও পৌঁছায়নি। আসতে সন্ধ্যা হবে। আভিরা সকলের সাথে কুশল বিনিময় করে রান্না করতে গেল।

বিকেল হতেই বাড়িতে হৈ হুল্লোড় লেগে গেল। পাশাপাশি দুটো বাড়িতেই একই অবস্থা। মানুষের আনন্দ উল্লাসে চারদিকে একটা বিয়ে বিয়ে আমেজ। উঠানের মধ্যিখানে ছোটোখাটো স্টেজ করা হয়েছে। সেখানে বড়ো বড়ো করে লেখা আছে, লাবণ্য মাহাদের হলুদ সন্ধ্যা। গায়ে হলুদের পর্ব শেষ করে মেহেদী লাগানো হবে। লাবণ্যকে সাজাতে ব্যস্ত সকলে। মাহাদের দেওয়া শাড়ি পরিয়ে মেয়েটাকে স্টেজে নিয়ে বসানো হয়েছে। সকলের মাঝে কনে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় নত মুখে বসে আছে। মিউজিক বক্সে মৃদু ভলিউমে গান বেজে চলেছে, আজ কন্যার গায়ে হলুদ কাল কন্যার বিয়ে।

মাহাদের মুখে ছোটো বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ সকলে এটা ওটা তুলে দিচ্ছে, এই মিষ্টি তো এই ফল। তার সামনে জাতের জাতের মিষ্টান্ন, ফলফলাদি ডেকোরেশন করে রাখা। বাড়ির মেয়েরাই ডেকোরেশন করেছে সব। বেচারা এমন যত্নে অতিষ্ঠ। পারছে না সব ছুঁড়ে ফেলে সকলের মাঝ থেকে উঠে যেতে।

দূর দূরান্তের কোনো আত্মীয় স্বজন আসতে পারেনি। ধারে কাছে যারা ছিল তারাই এসেছে। এতেই সুরভীর মেজাজ চটে আছে। এমন তাড়াহুড়ো করে কেউ বিয়ে করে। আজ গায়ে হলুদ, মেহেদী আর কালকে বিয়ে। এমন বিয়ে তিনি কস্মিনকালে দেখেননি। নিজের ছেলের এমন হটকারী বিয়ে তিনি মানতে পারছেন না।

বসার ঘরে বসে তিনি সমানতালে চেঁচিয়ে বলে যাচ্ছেন,
– ঐ মেয়েকে আমি মানবো না।

মাহাদ মায়ের কাণ্ডে মৃদু হাসছে। তার গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি। সকাল থেকেই তার মা এমন করে যাচ্ছে। হলুদ লাগানো হবে তাকে কিছুক্ষণের মধ্যে। সেজন্যই এই বেশে বসে আছে। মাহাদকে তার খালাতো বোনের জামাই পাঁজাকোলা করে উঠানে নিয়ে গেল। ওকে পিরিতে বসাতেই সকলে হুমড়ি খেয়ে পড়ল যেন। হঠাৎ নাওয়াজের কথা মনে হতেই মাহাদ তৎপর হয়ে উঠে দাঁড়ায়। তবে ভিড় ঠেলে বের হওয়া মুশকিল। সকলে তাকে ঘিরে ধরে চিৎকার চেঁচামেচি করে যাচ্ছে। মাহাদ কিছুটা উচ্চস্বরে বর্ণাকে ডাকল। বর্ণা মেয়েকে সৌভিকের কোলে দিয়ে এগিয়ে এসে বলল,
– কী হয়েছে?

– আমার মোবাইলটা একটু এনে দে তো।

– মোবাইল দিয়ে কী করবি?

– কাজ আছে। একটু এনে দে।

মোবাইল এনে দিতেই মাহাদ একটু সাইডে গিয়ে নাওয়াজের নাম্বারে কল লাগায়। ধরছে না কেউ। মাহাদ হাল ছাড়ে না। একের পর এক কল দিয়েই গেল। খানিকক্ষণের মধ্যেই কল রিসিভ হয়।

– কোথায় আছিস?

– হসপিটালে।

মাহাদ হঠাৎ রেগে গেল। একপ্রকার চিৎকার করে বলতে লাগল,
– শালা আজকের দিনেও তোকে ডিউটিতে থাকতে হবে। হলুদে আসার সময় অবধি হচ্ছে না তোর।

নাওয়াজ কান থেকে ফোন সরিয়ে হালকা স্বরে বলল,
– ব্যস্ত আছি। পরে কল ব্যাক করছি।

মাহাদ আবার চেঁচিয়ে উঠল,
– এই নাওয়াজ, ফোন রাখবি না। শালা ***** আমাকে ব্যস্ততা দেখাস। এই ব্যস্ততা তোর বউকে দেখাস।

– গালিগালাজ করছিস কেন?

– গালিগালাজ করব না তো তোকে চুমু খাব।

নাওয়াজ বুঝল মাহাদ রেগে গিয়েছে। ঠোঁট কামড়ে হাসল।

– ছিঃ! তোর চরিত্রে দোষ আছে, আগে বলিসনি কেন?

– দেখ নাওয়াজ মেজাজ খারাপ করিস না।

– বিয়ে উপলক্ষ্যে দুদিন ছুটি নিয়েছি। সেজন্য আজ আসতে লেইট হবে। তুই খামোখা রাগ না দেখিয়ে ফোন রাখ।

– খামোখা রাগ দেখাচ্ছি। আজকের দিনে তুই হসপিটালে পড়ে আছিস। আমার রাগ দেখানোটা কি জায়েজ না?

– আমার অবস্থাটা একটু বুঝার চেষ্টা কর ভাই। আমার কি ইচ্ছে করছে না বোনের হলুদ অনুষ্ঠানে শামিল থাকতে।

– বোনের? শালা কল দিলাম আমি, আর তুই বোনের অনুষ্ঠানে শামিল থাকতে পারবি না দেখে দুঃখ প্রকাশ করছিস।

নাওয়াজ এবার বিরক্ত হচ্ছে বৈ কি। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,
– ফোন রাখছি।

বলেই ফট করে কল কেটে দিল। নয়তো এ ছেলে তার মাথা খারাপ করে দিবে।

_

– মাহাদ ভাই দেখা করো।

টুং টাং মেসেজের শব্দে মাহাদ ফোন হাতে নেয়। মেসেজ দেখে ভ্রু কুঁচকে এলো তার। গায়ে চট জলদি শার্ট গলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে গেল। উল্টো দিকে ফিরে থাকা রমণীকে দেখে হঠাৎ তার হৃদস্পন্দন বাড়তে লাগে। মাহাদ সহসাই দ্রুত কদমে মেয়েটার কাছে যেতে পারল না। কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করছে।

– সব জেনেও আমার মতো একটা মেয়েকে নিজের জীবনে কেন জড়াতে চাইছ?

– ভালোবাসি তাই।

লাবণ্য হঠাৎ উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তার হাসিতে যেন স্পষ্ট উপহাস। নিজের অনুভূতির প্রতি এমন অবজ্ঞা মাহাদ যেন মেনে নিতে পারল না। ক্ষিপ্ত হয়ে লাবণ্যর বাহু আঁকড়ে ধরে নিজের নিকটে নিয়ে আসে।

– আমার ভালোবাসাকে তুমি অবজ্ঞার চোখে দেখছ?

– উহু, ভালোবাসা না তুমি দয়া করছ‌ আমাকে।

মাহাদের মেজাজ ধরে রাখা যেন দুষ্কর হয়ে গেল। শক্ত হাতে চোয়াল চেপে ধরল লাবণ্যর। হিসহিসিয়ে বলতে লাগল,
– দয়া মনে হচ্ছে তোমার? এই মেয়ে আমার অনুভূতি বুঝতে কী তুমি এতটাই অপারগ যে আমার ভালোবাসাকে দয়া হিসেবে দেখছ।

মাহাদের হাত থেকে লাবণ্য নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। ছাদে লাগোয়া বাল্বের আলো মেয়েটার চোখে মুখে পড়তে মাহাদের দৃষ্টি স্থির হয়। একদৃষ্টে চেয়ে থাকল সম্মুখের রমণীর পানে। এই মেয়ে তার সর্বনাশের কারণ, সর্বক্ষণ যন্ত্রণা দেওয়া এই মানবী যেন তাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। মাহাদের হড়বড়িয়ে বেড়ে যাওয়া রাগটা হঠাৎ কমে এলো রমণীর চন্দ্রাভ মুখশ্রী নজরে আসতে। চাঁদের আলোয় মেয়েটার মুখশ্রী কেমন উজ্জীবিত। তার রূপের কাছে যেন চাঁদের আলো ফিকে পড়ে যাচ্ছে। মাহাদ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইল। ধ্যান ভাঙে লাবণ্যর কথায়।

– জীবনের একটা সময়ে গিয়ে মনে হবে তুমি ভুল মানুষের সঙ্গ বেছে নিয়েছ।

মাহাদের কণ্ঠে এবার যেন একটু আগের মতো রাগের আভাস নেই। খুব ধীর স্বরে বলল,
– ভয় নেই। অনেক আগের অনুভূতি।

– আমারও অনেক আগের অনুভূতি!

লাবণ্যও বিড়বিড় করে বলল। মাহাদের কানে গেল না তা। লাবণ্যর দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে আদেশের সুরে বলল,
– রুমে যাও।

লাবণ্য কদম বাড়াতে নিলেই পড়তে লাগল। মাহাদ মেয়েটার বাহু আঁকড়ে ধরে সহসাই।

– সাবধানে, দেখে হাঁটবে তো। আমি মোবাইলের ফ্ল্যাশ দিচ্ছি, তুমি নিচে যাও।

মাহাদ মোবাইলের ফ্ল্যাশ দিতেই লাবণ্য সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল। মাহাদ এভাবেই তাকে অন্ধকারে পথ দেখাবে মেয়েটা কী তা উপলব্ধি করতে পারছে!

ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে গেল না মেয়েটা। ভিড়িয়ে থাকা রুমের দরজা ঠেলে ভিতরে গেল। অন্ধকার রুমেও বিছানায় শুয়ে থাকা মানবকে দেখতে অসুবিধা হলো না তার। মেয়েটা ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। একেবারে মানুষটার সামনে গিয়ে থামে। তার কম্পনরত হাতে নাওয়াজের পা দুটো আঁকড়ে ধরে মাথা ঠেকায়। অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়,
– নাওয়াজ ভাই, মাফ করো। মাফ করো আমাকে।

মেয়েটার চোখ গলিয়ে পড়া এক ফোঁটা পানি নাওয়াজের পায়ে পড়তে স্থির পা খানিকটা কেঁপে ওঠে। আকুল হয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকা রমণী টের পেল না তা।

লাবণ্য যেতেই ঝড়ের বেগে কেউ যেন তার উপরে পড়ে।আভিরার শরীর কাঁপছে। নাওয়াজ অনুভব করল তা। হঠাৎ এমন করার কারণ বুঝে উঠতে পারল না। নাওয়াজ জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে শান্ত করার প্রচেষ্টায় বলল,
– কী হলো? কাঁদছেন কেন?

– উনি আমার ভাইকে, আমার ভাইকে আঘাত করেছিলেন। আপনি ভাবতে পারছেন, ছোটো বাচ্চাটার উপর কীভাবে নিজের ক্ষোভ মিটিয়ে ছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here