#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬১
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
নাওয়াজ কদম বাড়িয়ে একেবারে আভিরার সামনে এসে দাঁড়ায়, কাঁধ জড়িয়ে কাছে টেনে নেয় মেয়েটাকে। সহসাই আভিরার মুখের রঙ বিবর্ণ হয়ে গেল। আনত মস্তকে গলায় চিবুক ঠেকে। ছোটোখাটো পাঁচ ফুটিয়া গড়নের দেহে মৃদু কম্পন অনুভব হয়। হাস্যোজ্জ্বল আনন কেমন চুপসে গিয়েছে লোকটার অকস্মাৎ কাজে। ফ্যাকাশে মুখে নাওয়াজের বাহুতে আটকে রইল।
উপস্থিত সকলের দৃষ্টি তাদের উপর নিবদ্ধ। ছেলের বাড়ির লোকেদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব চাহনি। বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বি গোছের লোকগুলো এমন কাণ্ডে নাক মুখ কুঁচকে চাইছে। দু একজন আবার কানাঘুষা করে বলছে, ঘর ভর্তি লোকের সামনে এমন বেহায়াপনা করে কেউ।
নাওয়াজ এক পলক সম্মুখে বসে থাকা সকলের দিকে চেয়ে দরাজ গলায় বলল,
– মেয়ে দেখতে এসে তারই বড়ো ভাইয়ের বউয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেওয়াটা কেমন চোখে দেখছেন আপনারা?
এমন প্রশ্নে সকলে বিব্রত বোধ করে। মেয়েটা তবে এ বাড়ির বউ। অমন অল্প বয়সী মেয়েটাকে কোনোভাবে বিবাহিত মনে হয়নি তাদের কাছে। অবশ্য ভুলটা তাদের দিক থেকেই হয়েছে। এভাবে সরাসরি প্রস্তাব রাখা উচিত হয়নি। নিজেদের ভুল স্বীকার করে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,
– দেখো বাবা আমরা জানতাম না।
নাওয়াজের কণ্ঠে যেন কোনো পরিবর্তন এলো না। বরং আগের থেকে কঠোর গলায় বলল,
– মেয়ে দেখতে এসেছেন, খোঁজ নিয়ে আসা উচিত ছিল।
মেয়ের একটা বড়ো ভাই আছে। সে ভাইয়ের বউ থাকতে পারে এতটুকু অন্তত বুঝার কথা।
– আমরা একেবারেই বুঝতে পারিনি। তাছাড়া মেয়ের বয়স এত অল্প, কোনোভাবে দেখে বিবাহিত মনে হয়নি। কিছু মনে করো না।
নাওয়াজ আভিরাকে ছেড়ে এক পায়ের উপর অন্য পা তুলে সিঙ্গেল সোজায় বসল। খুব আয়েশী ভঙ্গিতে বসেছে সে। দু হাত দু পাশে রেখে সোফার ঊর্ধ্ব ভাগে পিঠ সামান্য হেলিয়ে দিল। পরমুহূর্তেই সম্মুখে সামান্য ঝুঁকে দু হাত মুঠ করে কনুই ঠেকায় হাঁটুতে। এবার তার বসার ধরন খুবই সভ্য গোছের।
মধ্যখানে থাকা গোলাকার টেবিলটা রকমারি আইটেম দিয়ে সজ্জিত। আপেল, কমলা, মালটা, কালো আঙুল, আনারস, রসগোল্লা, চমচম, সন্দেহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিখ্যাত ছানামুখী, কুমিল্লার মাতৃভান্ডারের রসমালাইসহ বেশ কয়েক ধরনের মিষ্টি টেবিলে সাজানো। সাথে তেলে ভাজা খাবার রয়েছে। এক পাশে ফলমূল মাঝে মিষ্টি তার অন্য পাশে ভাজাপোড়া আইটেম।
নাওয়াজ সেখান থেকে একটা আপেলের টুকরো নিয়ে মুখে পুরে। ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে সামান্য হাসল। মুখে হাসির রেশ বজায় রেখেই সম্মুখে থাকা মানুষগুলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– আপনারা কিছু খাচ্ছেন না যে? স্ন্যাকস ঠান্ডা হয়ে গেলে পরে কিন্তু খেতে ভালো লাগবে না।
বলেই একটা ডিমের কাটলেট পাত্রের মুখে ঠুসে দিল। হঠাৎ এমন কাজের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। ছেলেটা হকচকিয়ে ওঠে। পরক্ষণেই খুকখুক করে কেশে উঠল। নাওয়াজ পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিল।
– নিন সাবধানে।
ছেলেটা সামান্য হেসে পানির গ্লাস হাতে নেয়। জিহ্বা জ্বলে যাচ্ছে তার, মুখের ভিতর উত্তাপ অনুভব হচ্ছে তীব্র মাত্রায়। ডিমের কাটলেট এখনও অনেক গরম, ঠান্ডা হয়নি একটুও। মনে হচ্ছে চুলো থেকে খানিকক্ষণ আগে নামিয়ে এনেছে। এমনভাবে মুখে দিয়ে দিয়েছে চেয়েও বের করা সম্ভব না। এতগুলো মানুষের সামনে এমন করলে তাকেই লজ্জায় পড়তে হবে। বহু কষ্টে সামান্য চিবিয়ে গলাধঃকরণ করল। এক নিমিষেই পুরো গ্লাসের পানি শেষ করে। জিভ জ্বলছে। উল্টো ঘুরে গাল ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে বার কয়েক।
– আপনারা নিন।
ভয়ে ভয়ে সকলে মুখে নেয়। না নিলে না জানি কখন আবার তাদের মুখে ঠুসে দেয়।
– আপা আমরা আমাদের ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। বুঝার ভুল হয়েছে সামান্য। এখন যাকে দেখতে এসেছি তার বিষয়ে কথা বলা উচিত বলে মনে করছি। আপনি কী বলেন?
– মা কী বলবে? আমার সাথে কথা বলুন।
নাওয়াজের কথার প্রেক্ষিতে ছেলের মা সামান্য হকচকাল। ছেলেটাকে মোটেও সুবিধার ঠেকছে না। মুখে মেকি হাসির রেখা টেনে বললেন,
– তোমার সাথে কী কথা বলব? বাড়িতে বুজুর্গ মানুষ তো তোমার মা।
– আম্মু এ বিষয়ে কিছু বলবে না আর। আপনারা বলুন, আমি শুনছি।
– দেখো বাবা তোমার সাথে তো এভাবে কথা বলা যায় না। আমরা বরং এ বিষয়ে আপার সাথেই কথা বলি।
মহিলা ইয়াজমীনের দিকে চেয়ে হাসিমুখে বলল,
– মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে। আপনি সম্মতি দিলে আংটি পরিয়ে দিয়ে যেতে চাই।
– যে ছেলে একজনকে দেখতে এসে অন্য কারো বউয়ের দিকে নজর দেয় তার কাছে আমি আমার বোন দিব ভাবলেন কী করে?
– দেখো সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে সেরফ।
– দেখাদেখির সময় নেই। আপনাদের ছেলের কাছে আমি আমার বোন দেব না। আপনারা আসতে পারেন।
নাওয়াজের কথায় অপমানিত বোধ করেন সকলে। তারা তো নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তারপরও এ ছেলে বাড়াবাড়ি করছে। মুখের উপর বলছে, আপনারা আসতে পারেন।
– তুমি কিন্তু অপমান করছ।
– আমি আমার ধৈর্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবহার করছি আপনাদের সাথে। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করত বাড়ি থেকে। সে জায়গায় আমি যথেষ্ট ভদ্রভাবে কথা বলছি। তবে নিশ্চিয়তা নেই, দেখা যাবে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলে অন্যদের মতো আমিও ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছি। তাই বলছি আমি বের করার আগেই সসম্মানে বেরিয়ে যান।
এরপর আর বসে থাকা যায়। সকলে উঠে বাইরে চলে গেল। নাওয়াজ খানিকটা গলার জোর বাড়িয়ে বলল,
– পরেরবার মেয়ে দেখতে গেলে খোঁজ নিয়ে যাবেন। বলা তো যায় না এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে পারে।
নাওয়াজ এক পলক মায়ের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,
– ড্রয়িংরুম খালি করা হোক।
সবাই চলে যেতে নাওয়াজ শক্ত হাতে আভিরার চোয়াল চেপে ধরে। দু গালের মাংসপিণ্ড ভেদ করে আঙুল ডেবে গেল।
– এসব কী?
হঠাৎ কাজে আভিরা ভড়কে গেল। ছাড়ানোর প্রচেষ্টায় বলতে লাগল,
– ছাড়ুন, লাগছে।
– আগে কথার জবাব দিন।
– আমি জানি না।
– জানেন না? সে রাতের কথা মাকে আপনি বলেছেন?
আভিরা আহত চোখে তাকায়। এ লোক তাকে অবিশ্বাস করছে। সে তো কিছু বলেনি। লাবণ্য নিজেই তো বলল। আভিরা জবাব দেয় না। আর না বলে এই কথা আমি বলিনি, লাবণ্য আপু বলেছেন।
_
– শালা তোর না হওয়া বউকে যে আজ দেখতে এসেছে সে খবর জানিস।
মাহাদের হাসপাতালের সামনে থাকা মাঠে দাঁড়িয়ে আছে নাওয়াজ। তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা মাহাদের হাসপাতালে এসেছে।
– কখন এসেছে?
– কিছুক্ষণ আগে।
– তুই আমাকে জানাসনি কেন?
– জানালে কী হতো? তোর বউকে ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছে, সে খবর আমাকে কেন দিতে হচ্ছে? এই কথা তো আমি বলার আগে তোর জানার কথা। তোর কাছে দেখছি বোন দেওয়া যাবে না।
– কী হতো তুই জানিস। উল্টা পাল্টা কথা না বলে বল জানাসনি কেন?
– আমি নিজেই জানতাম না। বাড়িতে গিয়ে দেখি ড্রয়িংরুমে ছেলেপক্ষ বসে আছে। আঞ্জুমটাও এই বিষয়ে কিছু জানায়নি আমাকে।
– তোকে না জানিয়ে ছেলেপক্ষকে কে আসতে বলেছে?
– তোর ইয়াজমীন আন্টি।
– হঠাৎ করে?
– হ্যাঁ হঠাৎ করে বোনের মেয়েকে বাড়ি ছাড়া করতে ইচ্ছে হলো মায়ের।
নাওয়াজ হেসে হেসে কথা বললেও মাহাদ কেন যেন হাসতে পারল না। অজানা কারণে বুক ধকধক করছে। মেয়েটা কী কিছু করেছে নাকি। মাহাদ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইল। চেয়ে দেখল নাওয়াজের মুখের হাসি বিলীন হয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে।
– কিছু হয়েছে নাওয়াজ?
নাওয়াজ ঘাসের উপর বসে পড়ল। হাত দুটো পিছনে দিয়ে পা দুটো সম্মুখে মেলে বসে। আকাশে দৃষ্টি রেখে বলল,
– ঘৃণা হচ্ছে ওর প্রতি?
– না।
– কেন? সব শুনে তো ঘৃণা করার কথা।
– তাহলে তো আমার ভালোবাসায় আঙুল ওঠে। কাউকে ভালোবাসলে সে শত অন্যায় করার পরও তাকে ঘৃণা করা যায় না। হযরত আলী (রা.) বলেন, যদি তুমি সারা জীবনের মতো স্ত্রীকে ভালো বন্ধু হিসেবে পেতে চাও, তাহলে তোমার মনে একটা কবর তৈরি করে রাখো, যাতে তুমি তোমার স্ত্রীর ভুলগুলো তোমার মনে দাফন করতে পারো। সেই কবর আমি তাকে অর্ধাঙ্গী হিসেবে পাওয়ার আগেই তৈরি করে রেখেছি।
_
খাবার টেবিলে বসে আছে বাড়ির সবাই। বর্ণা সবার প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে। কারো কিছু লাগলে তাকেই বেড়ে দিতে হবে। সৌভিক মেয়েকে খাওয়াতে ব্যস্ত। মেয়েটা খাবার মুখে তুলছে না, আজ জেদ ধরছে কেমন। বর্ণা বাবা মেয়ের কাণ্ড দেখছে চেয়ে চেয়ে। মেয়ে খাচ্ছে না দেখে চোখ পাকিয়ে তাকাল মেয়ের দিকে। তার চোখ রাঙানোতে কোনো কাজ হলো বলে মনে হয় না। এক পলক তাকে দেখে আর তার দিকে তাকালই না।
বর্ণা মেয়েকে ডাকল,
– দেখি এদিকে এসো। আম্মু খাইয়ে দেই।
মায়ের কাছে যাওয়া মানে মেরে ধরে হলেও প্লেটের সব ভাত খাইয়ে ছাড়বে। মেয়েটা দ্রুত মাথা ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল,
– আব্বুল কাছে খাব।
– খাও, আম্মু দাঁড়িয়ে আছি। দ্রুত খাবার শেষ করো। তারপর ঘুমাতে যাবে।
মেয়েটা উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়। বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো চেহারা বানিয়ে বলল,
– আব্বু এত্তু খাব।
– আচ্ছা মা, বেশি খেতে হবে না। একটুই খাও।
মাহাদ খেতে খেতে বলল,
– একটা কথা বলার ছিল।
সবাই খাওয়া থামিয়ে মাহাদের দিকে দৃষ্টি ফেলে।
– কী কথা?
মাহাদ সরাসরি মায়ের দিকে তাকায়। মুখাবয়ব খুব স্বাভাবিক রেখে বলল,
– লাবণ্যকে পছন্দ আমার। ভেবেছিলাম ওর পড়া শেষ হলে তোমাদের এ বিষয়ে জানাব। কিন্তু ইয়াজমীন আন্টি হঠাৎ করে ওর বিয়ের তোড়জোড় শুরু করাতে এখনই তোমাদের জানাতে হলো।
সুরভীর মুখে বিরক্তিভাব ফুটে ওঠে। কপাল কুঁচকে জানতে চাইল,
– মানে কী সব বলছিস?
– লাবণ্যকে বিয়ে করতে চাইছি। ইয়াজমীন আন্টির কাছে প্রস্তাব নিয়ে যাও।
সুরভী রেগে গেল। তার ছেলে কিনা তাকে লাবণ্যর জন্য প্রস্তাব নিয়ে যেতে বলছে। সহসাই মানা করে বলল,
– অসম্ভব। তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস?
– না।
– তাহলে এসব কেন বলছিস?
– বিয়ের বয়স হয়েছে। সেজন্য বিয়ের কথা বলছি। বড়ো ছেলের বিয়ে দিয়ে তুমি একেবারে নিশ্চিন্তে বসে আছো মা। আমার যে বিয়ে দিতে হবে সে ভাবনা কারো মাথায় নেই।
সৌভিক ভাইকে ধমকে উঠল,
– এই বেয়াদব চুপ কর। বড়োদের সামনে বেহাল্লাপনা করছিস।
– বেহাল্লাপনা কোথায় করছি ভাই। বিয়ের কথা বলছি। বিয়ে করা তো সওয়াবের কাজ।
সৌভিক দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
– সওয়াবের কাজ করার জন্য বুঝি একেবারেই তর সইছে না?
– একদমই তর সইছে না আমার। তোমার মাকে রাজি হতে বলো।
– আমি পারব না। নিজের কাজ তুই নিজে কর বেয়াদব।
– এমন করছ। তোমার বিয়ের সময় আমি সঙ্গ দেইনি। এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে। অন্তত উপকারের প্রতিদান হিসেবে তোমার উচিত মাকে রাজি করানো।
– মানুষ উপকারের কথা মনে রাখে না বুঝলি। মানুষ বড়োই অকৃতজ্ঞ।
বলেই সৌভিক টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। মাহাদের খাওয়া শেষের দিকে। হাত ধুয়ে মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– আর কোনো পাত্রপক্ষ আসার আগেই তুমি প্রস্তাব নিয়ে যাবে ঐ বাড়িতে।
– আমি এমন কাজ করব না। দেখ কী ভালো মনে করিস।
– তোমার অমতে আমি কিছু করব না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। কিন্তু লাবণ্যকে ছাড়া তোমার ছেলে তার জীবনে অন্য কাউকে জড়াবে না। দেখো তুমি কী করবে। ছেলেকে আজীবন নিঃসঙ্গ দেখতে চাইলে প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।
_
নাওয়াজ দেখল আভিরা তার দিকে একবারের জন্যও তাকাচ্ছে না। চুপচাপ তাকে খাবার বেড়ে দিয়ে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তখনকার ব্যবহার মনে হতে নাওয়াজের নিজের উপর রাগ হলো। তখন অকারণেই মেয়েটার উপর রাগ দেখিয়েছে। সে যে কেন নিজের রাগ দমিয়ে রাখতে পারে না।
আভিরা নাওয়াজের পাতে রুই মাছের পিস তুলে দিল। জগ থেকে পানি গ্লাসে ঢেলে দিল তাকে। নাওয়াজ খেতে খেতে আভিরাকে জিজ্ঞেস করল,
– আপনি খেয়েছেন?
– জি।
– মা আর লাবণ্যর খাওয়া হয়েছে?
– হ্যাঁ।
নাওয়াজের হঠাৎ মেজাজ খারাপ হলো মেয়েটার জি, হ্যাঁ করাতে। কী জি, হ্যাঁ লাগিয়ে দিয়েছে এই মেয়ে। প্রতিটা কথার প্রত্যুত্তর করছে মাথা নামিয়ে। মনে হচ্ছে, তার দিকে তাকালে চোখ ক্ষয়ে যাবে। নাওয়াজ অল্প একটু খেয়ে উঠে যেতে নিলেই আভিরা পিছু ডাকে।
– না খেয়ে উঠছেন কেন?
– খাওয়া শেষ আমার।
– কোথায় শেষ? প্লেটের ভাত কে শেষ করবে? শেষ করে উঠুন।
– আপনি খেয়ে নিন। আমি আর খাব না।
বলেই শব্দ করে উপরে উঠে গেল। আভিরা নাওয়াজের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। চেয়ার টেনে বসে নাওয়াজের প্লেট থেকে ভাতের লোকমা মুখে তুলে। গলা দিয়ে খাবার নামছে না তার। বহু কষ্টে প্লেটের ভাতটুকু শেষ করল। তখন নাওয়াজকে মিথ্যা বলেছিল সে। তার খাওয়া হয়নি। ঐ লোক হয়তো বুঝে গিয়েছিল সে যে মিথ্যা বলেছে। সেজন্য না খেয়ে উঠে গিয়েছে। আভিরা সব গুছিয়ে রুমে গেল। এক পলক নাওয়াজের দিকে তাকিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। হঠাৎ নোনাজলে চোখ ভিজে যায়। গলায় দলা পাকিয়ে থাকা অশ্রু কণা চোখ গড়িয়ে পড়তে লাগল। আভিরা দু হাতে চোখ মুছে দূরত্ব রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ে। নাওয়াজ খানিকটা দূরেই চোখ বুজে শুয়ে আছে। লোকটার নিঃশ্বাসের শব্দ তার কানে ঠেকে। চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করল আভিরা। কিন্তু তা আর হলো না।
নাওয়াজ মেয়েটাকে বুকে টেনে নেয়। হাত বাড়িয়ে গাল ছুঁয়ে দেয় আলতো হাতে। মেয়েটা এত নাজুক। গালে আঙুলের দাগ বসে গিয়েছে। আভিরা শক্ত বুকটাই মুখ গুঁজে পড়ে রইল। নাওয়াজের স্পর্শে শরীর কেঁপে উঠল তার। দুজনের কেউই কথা বলছে না। যেন নীরবে একে অপরকে অনুভব করছে।
_
সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি সুরভী। ছেলেটা তার সেই যে বেরিয়েছে, রাতে আর ফিরেনি। বারবার কল দিয়েও মোবাইল বন্ধ পেয়েছে। তাতেই চিন্তায় পড়ে যান। সৌভিক খুব শান্ত মেজাজের হলেও মাহাদের মেজাজের ঠিক নেই। রেগে গেলে ছেলেটা কারো কথা শুনবে না। নামাজ পড়ে বিছানা ছাড়ে সুরভী। রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত চুলোয় পাতিল বসান। মাথা ভার হয়ে আছে। চা খেলে যদি ভালো লাগে। মাহাদের বাবা আসতে সুরভী বলল,
– ছেলেটা কোথায় আছে খোঁজ নিয়েছ?
– হ্যাঁ।
– অসভ্যটা কোথায়?
– তোমার বোনের বাড়িতে।
– বেয়াদবটা ওখানে কেন গিয়েছে? কই আপা তো আমাকে ওর যাওয়া নিয়ে কিছু বলেনি।
– তোমার ছেলে বলতে নিষেধ করেছে।
– সবকটা একজোট হয়েছে। কী ভেবেছে এভাবে বাড়ি না ফিরলে আমি মেনে নেব। দামড়াটা আর ভালো হবে না।
এত বড়ো হয়েও জ্বালিয়ে মারছে।
ভদ্রলোক চা শেষ করে উঠতে উঠতে স্ত্রীকে বললেন,
– এসো হাঁটতে বের হয়।
সুরভীর মেজাজ বিগড়ে গেল। এখানে সে ছেলের চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে আর এ লোক তাকে হাঁটতে বের হতে বলছে।
– তুমি যাও, যাব না আমি। ঐ বেয়াদবটাকে কল দিয়ে বাড়ি ফিরতে বলো।
উনি বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন,
– তুমি ও বাড়িতে প্রস্তাব নিয়ে যাও। তোমার ছেলে ফিরে আসবে।
সুরভী দাঁত কিড়মিড় করে স্বামীর বেরিয়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
বর্ণা খাট থেকে নেমে দাঁড়ায়। সৌভিক এখনও ঘুমিয়ে আছে। এদিকে তার মেয়ে উঠেই কান্না জুড়ে দিয়েছে। সকালের নাস্তা বানাতে হবে তাকে। মেয়েটা কান্না করার আর সময় পেল না। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে রুমের এ মাথা থেকে ও মাথা চক্কর কাটছে মেয়েকে নিয়ে। কোনোভাবেই যখন কান্না থামাতে পারল না তখন আস্তে আস্তে মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
– আম্মা আব্বাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেন। আম্মা একটু নিচে গিয়ে দাদি কী করছে দেখে আসি।
বর্ণা মেয়েকে কোল থেকে নামিয়ে তড়িঘড়ি করে নিচে নামল। রান্নাঘরে যেতেই দেখল তার শাশুড়ি আলু কাটছে।
– আমাকে দিন আম্মা। আমি কেটে দিচ্ছি।
– তোমার কাটতে হবে না। রুটি বেলে তাওয়ায় সেঁকো। দেরি হয়ে যাবে।
বর্ণা তাই করল। রুটি বেলে ভেজে নিল। আলু হয়ে এলে টেবিলে নিয়ে রাখল সব।
– বর্ণা একটু এদিকে এসো তো।
শাশুড়ির ডাকে বর্ণা দ্রুত তার কাছে গেল।
– কিছু বলবেন?
– হ্যাঁ, এখানে এসো। কথা আছে।
বর্ণা গিয়ে শাশুড়ির পাশে বসল।
– তুমি জানতে সব?
বর্ণা বুঝল না কিছু। কী জানার কথা বলছে।
– কোন বিষয়ে?
– লাবণ্যর ব্যাপারে। আগে থেকেই জানতে তাই না?
– হ্যাঁ।
– সব তাহলে এক দলের। যাও দূর হও আমার চোখের সামনে থেকে।
বর্ণা থতমত খেয়ে গেল। সে কী করেছে? রেগে গেল কেন তার উপর।
_
– কী করব?
– লাবণ্য মেয়েটা কিন্তু খারাপ না। তুমি ভেবে দেখতে পারো।
স্বামীর কথায় সুরভী ভাবনায় পড়ে গেল। লাবণ্য মেয়েটা খারাপ না। কিন্তু তার খুব একটা ভালো লাগে না লাবণ্যকে। এমনিতে সহানুভূতি এলেও ছেলের বউ হিসেবে মানতে নারাজ। এতিম মেয়েকে বাড়ির বউ করবেন কী করে। তাছাড়া বড়ো ঘরের মেয়েকে বাড়ির বউ করার ইচ্ছে। বর্ণার বাড়ির আর্থিক অবস্থা সচ্ছল। মাহাদের বউও তেমন একটা পরিবার থেকে আনার ইচ্ছে ছিল। সামিহাকে পছন্দ তার। সামাদদের পরিবারিক অবস্থা অনেক উন্নত। নাওয়াজের অবস্থা ভালো হলেও লাবণ্য তো ঐ বাড়ির কেউ না। মেয়ে এতিম শুনেই তো আত্মীয় স্বজন নাক মুখ কুঁচকাবে। তার উপর যদি শুনে অন্যের বাড়িতে মানুষ হয়েছে তাহলে তো কোনো কথায় নেই।
– কী ব্যাপার? সবাই আজ আমার বাড়িতে।
– কেন আপা আসা নিষেধ?
– কী যে বলেন ভাই, নিষেধ হবে কেন? আপনার তো দেখায় পাওয়া যায় না। তা কেমন আছেন?
– এই তো আল্লাহর রহমতে আছি আলহামদুলিল্লাহ।
বুঝেন তো ব্যবসায়িক মানুষ, কাজের চাপে থাকতে হয়।
তবে এখন থেকে দেখা করার মাধ্যমটা পাকাপোক্ত করতে এলাম।
– মানে?
– আপনার মেয়েটাকে আমার বাড়ির বউ করে নিতে চাইছি। আশা করছি আপনার আপত্তি নেই এতে। আমার ছেলে বলে যে মেনে নিতে হবে তা কিন্তু নয়। আপনি মেয়ের খালা, মা দুটোই। আপনার মতামতের দিকটাই আমরা সম্মান দিব।
আপনার অসম্মতি থাকলে বলতে পারেন।
ইয়াজমীন অনেকটাই আশ্চর্য হয়েছে। তার চিন্তার যেন অবসান ঘটল। মেয়েটাকে নিয়ে কিছুটা চিন্তায় ছিল বৈ কি। মুখ ফিরিয়ে নিলেও মেয়েটাকে তো যার তার হাতে তুলে দিতে পারেন না। হুট করে বিয়ে দিয়ে দিলেই হয়ে গেল না। ছেলের পরিবার যদি ভালো না পড়ে তখন তিনি এর জন্য নিজেকে দোষারোপ করে যাবেন। মাহাদের বাড়িতে লাবণ্য ভালো থাকবে। বাকিটা আল্লাহর ভরসায় ছেড়ে দিয়ে রাজি হয়ে গেলেন। সুরভী লাবণ্যর দু হাতে বালা আর স্বর্ণের আংটি পরিয়ে দিল।

