#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭১
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
গ্রামাঞ্চলে হুটহাট লোডশেডিং হওয়া যেন নিত্যদিনকার কারবার। গ্রামের ছিন্নমূল মানুষেরা এতেই অভ্যস্ত। কিন্তু শহর হতে আগত মানুষেরা এমন হুটহাট লোডশেডিং এ বড্ড বিপাকে পড়ে। এই যেমন হলরুমে আড্ডা দেওয়া অবস্থায় কারেন্ট চলে গেল। অন্ধকারে কিছুই দেখার জো নেই। ছোটো বাচ্চাগুলো হুট করে কারেন্ট যাওয়াতে ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। দৌড়ে মায়ের কাছে যেতে গিয়ে একটার সাথে অন্যটার পা বেঁধে ধপ করে পড়ল ফ্লোরে। ব্যথা না পেলেও সমস্বরে চিৎকার করে উঠল সবকটা। এদের এমন হঠাৎ চিৎকারে জ্যোতি কান চেপে ধরে দু হাতে। তার কানের কাছে একজন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে গলা ছেড়ে হেঁচকি তুলে কাঁদছে। এক পা ছড়িয়ে, অন্য পা বেঁকিয়ে ফ্লোরে বসে ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে লাগল অন্য একজন। মা কাছে আসতে অস্পষ্ট স্বরে নালিশ জানাল। বর্ণা মেয়েকে কোলে তুলে নিল। পা বেঁকে যাওয়ায় ব্যথা পেয়েছে বেশ। ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। গাল গড়িয়ে অঝোরে পড়ছে অশ্রু কণা। বর্ণা মেয়ের গাল মুছিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– আমার মায়ের কী অনেক লেগেছে?
ঠোঁট উল্টে মায়ের কাঁধে মুখ গুঁজে মাথা নাড়ায়। বর্ণা মেয়েকে নিয়ে বাড়ির বাইরে গেল। চাঁদের আলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব। ঘাসের উপর বসল মেয়েকে নিয়ে। খোলা জায়গায় বসেছে সে। নয়তো বাগানের দিকটায় আবার সাপ, বিষাক্ত পোকা থাকতে পারে। মোবাইলের ফ্ল্যাশ দিয়ে মেয়ের পা নেড়েচেড়ে দেখল। ব্যথার কোনো চিহ্ন না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বর্ণা। মেয়েটা খেলতে গিয়ে পড়ে টড়ে সামান্য ব্যথা পেলেও সৌভিক চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তোলে। মাহাদও একই কাজ করে। প্রাপ্তবয়স্ক দুজন পুরুষ বুঝেই না, বাচ্চারা খেলতে গেলে এমন একটু আধটু ব্যথা পাবেই। সে বুঝাতে গেলেই সৌভিক উল্টো তার উপর চড়াও হয়। সে থাকতেও মেয়ে তার ব্যথা পেল কীভাবে? সে নাকি মেয়েকে দেখে রাখতে পারে না। এমন অতিরিক্ত আহ্লাদীপনায় বর্ণা মাঝেমধ্যে অতিষ্ঠ হয়ে সৌভিকের সাথে কথায় বলে না। বুঝদার গম্ভীর পুরুষটা যেন মেয়ের বেলায় বড্ড অবুঝ। তাকে বুঝিয়েও লাভ হয় না।
একে একে সবাই বেরিয়ে এলো বাড়ির বাইরে। ড্রয়িংরুমে দুজন নারী আপাতত নীরবতা পালন করছে। সুরভীর ননাস চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
– কই বর্ণা তো এ বিষয়ে কিছু বলল না।
– দুই পরিবারের মধ্যে কথা হয়েছে কিছুদিন হলো। এই বিষয়ে ছেলেমেয়েদের জানানো হয়নি।
– আপনার ছোটো মেয়েও জানে না?
– না।
– তা ছেলে কী করে? আপনাদের পরিচিত কেউ না কী?
– আমার জায়ের ছোটো মেয়ের দেবর। ছেলে আপাতত পড়াশোনা করছে।
– সে কী! চাকরি বাকরি কিছু করে না?
– না।
– এমন একটা জায়গায় আপনারা মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেলেন?
নাক মুখ কুঁচকে তাচ্ছিল্য করে বলে উঠল। জবাবের আশায় না থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। বুশরার মা সবটাই নীরবে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন। এমন ব্যবহারের কারণ বুঝলেও প্রতিক্রিয়া করার বিশেষ প্রয়োজন মনে করলেন না। নিজের কার্য হাসিল না হলে মানুষ স্বভাবতই অন্যকে কটাক্ষ করার সুযোগ ছাড়ে না। বুশরার মা ওনার আনা প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলে এমন কিছু শুনতে হতো না ওনাকে। তাছাড়া তিনি চাইলেই নিজেদের স্বপক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে পারতেন। তিনি তো বেকার ছেলের হাতে মেয়ে তুলে দিচ্ছেন না। ছেলে এখন পড়াশোনা করছে। বছর কয়েক বাদে প্রতিষ্ঠিত হবে। মেয়েরও তখন পড়ালেখার পাঠ চুকানো হয়ে যাবে। ছেলেমেয়ে দুটো সেই পর্যায়ে যাওয়ার পরই বিয়ের কথা উঠবে। দু পক্ষে এমন কথায় হয়েছে।
_
সাত দিন পেরিয়ে আজ অষ্টম দিন বুশরার বোনের শ্বশুর বাড়িতে। গ্রামে আসা নিয়ে যতটা উৎকণ্ঠা, উচ্ছ্বলতা ছিল এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। নিদ্রাহীন চোখের নিচে কালসিটে দাগ পড়ে গিয়েছে। চোখ দুটো নিষ্প্রাণ। মলিন মুখখানায় শুষ্ক ওষ্ঠাধর। শীতকাল ছাড়াও বছরের বারো মাসই ঠোঁট আদ্র হয়ে থাকে। তার ঘরে সবসময় ভ্যাসলিনের ছোটো একটা কৌটা থাকবে। ঠোঁটে টানটান অনুভব হতেই একটুখানি ভ্যাসলিন ঘঁষে নিবে দু ওষ্ঠে। আজ কদিন ধরে শুষ্ক ঠোঁট জোড়া অযত্নে ফাটল ধরার জো। নিম্নাষ্ঠ ফেটে চামড়া উঠে গিয়েছে। বুশরা দাঁত দিয়ে সে চামড়া তুলে ফেলতেই তরল রক্তের দেখা মিলে। মেয়েটা বুড়ো আঙুল ছুঁয়ে সে রক্ত আলগোছে মুছে নিল। ট্রলি থেকে কালো রঙের সেলোয়ার স্যুট বের করে ওয়াশরুমে গেল। কালো রঙের সেলোয়ার স্যুটের সাথে শুভ্র বর্ণের হিজাব বেঁধেছে। এক রঙা কালো ওড়না এক সাইডে ঝুলিয়ে পিন দিয়ে সেট করে নিল। দরজায় কড়া নাড়তে মেয়েটা হালকা স্বরে বলে উঠল,
– এসো।
বুশরা আরশিতে বিদ্যমান জ্যোতির প্রতিবিম্বতে দৃষ্টি ফেলে। অফ হোয়াইট রঙের ওয়ান পিসের সাথে লেডিস ডেনিম প্যান্ট, পায়ে হাই হিল, চুলগুলো পনিটেল করে বাঁধা। ঠোঁটে হালকা রঙের লিপস্টিক, গৌর আননে মেকআপের ছোঁয়া। ঠোঁটের কোণে স্বভাব সুলভ মৃদু হাসি। একদম রেডি হয়ে এসেছে। জ্যোতি ঠোঁট নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
– তোমার শেষ?
– হ্যাঁ।
– চলো তাহলে। সবাই অপেক্ষা করছে।
রিকশা নিতে গিয়েও অটোতে উঠল সবাই। বড়ো সাইজের অটো হওয়াতে এক অটোতেই হয়ে গিয়েছে। মিনিট বিশেকের মধ্যে অটো এসে থামল বাজারে। একসাথে সারি সারি থাকা কাপড়ের দোকানে গেল সকলে। দোকানিরা টুল দেখিয়ে বসতে বলল। আভিরা, বর্ণা, লাবণ্য, মাহিরা বসলেও জ্যোতি, বুশরা গেল অন্য দোকানে। এই দোকানে শুধু থ্রি-পিস ছাড়া অন্য কিছু পাওয়া যাবে না। তাদের এই দোকানে কোনো কাজ নেই। পাশের দোকানে ওয়ান পিস, দু পিস, লং গাউনসহ স্টিচ আনস্টিচ থ্রি-পিস রয়েছে। জ্যোতি, বুশরা নিজেদের জন্য বেশ কয়েকটা ওয়ান পিস, দু পিস নিয়ে পাশের দোকানে গিয়ে দেখল সেখানে এলাহি কারবার। কাপড়ের স্তুপ পড়ে রয়েছে একপ্রকার। এই কাজ যে বর্ণার তা ভালো করেই জানা আছে বুশরার। সেজন্য সে খুব একটা অবাক হলো না। তবে জ্যোতির মুখ হা হয়ে গেল। এত বাছাবাছি করে কে কাপড় কিনে। কই সে তো কয়েক মিনিটে চারটা ওয়ান পিস আর দুইটা দু পিস কিনে নিয়ে এসেছে। সে তো এত বাদ বাছাই করেনি। জ্যোতি বেচারা দোকানিদের দিকে তাকাল। তারা আগ্রহ নিয়ে সামনে বসা রমণীদের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মধ্যে বিরক্তির ছিটেফোঁটাও নেই। যেন বর্ণারা বলার সাথে সাথে আরও কালেকশন বের করে দেখাতে প্রস্তুত।
মাহাদ আলগোছে লাবণ্যর হাত থেকে শপিং ব্যাগগুলো নিয়ে নিল। লাবণ্য আড়চোখে চেয়ে বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। রাস্তা পার হওয়ার সময়ও মাহাদ সযত্নে লাবণ্যর হাত মুঠোয় নেয়। রাস্তা পার হতে ছেড়ে দিল রমণীর হাত।
কাঁচা বাজারে একসাথে দুটো দোকান রয়েছে। মাটির তৈরি সব রকমের জিনিসপত্র পাওয়া যায় দোকান দুটোতে। আভিরারা সেই দোকানে ভিড় জমিয়েছে আপাতত। অভিজ্ঞ চোখে দেখে নিচ্ছে কোনো ত্রুটি কিংবা ফাটল আছে কিনা। বর্ণা ঊনচল্লিশ পিসের একটা ডিনার সেট কিনল। মাটির তৈরি হাঁড়ি, গ্লাস, বাটি, প্লেট, জগ, সসপেনসহ সব আছে এতে। আভিরা শুধু চা খাওয়ার জন্য মাটির তিন চারটে ভাঁড় নিল। সে চা না খেলেও তার শাশুড়ির, নাওয়াজের নিত্যদিন চা খাওয়ার অভ্যাস আছে।
একসময় মগ ও প্লাস্টিকের কাপে চা পানের প্রচলন দেখা গেলেও এখন ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে তাতে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বিভিন্ন মোড় কিংবা স্ট্রিট ফুডের পাশে মাটির ভাঁড়ে চা পানের রীতি দেখা যায়।
পুষ্টিবিদদের মতে, পোড়া মাটির পাত্রে চায়ের মতো উষ্ণ পানীয় ঢাললে, তার পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ রূপে বজায় থাকে। শুধু তাই নয়, অনেকেরই অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকে। চা পান করলে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে দুধ মেশানো চা খেলে অনেকেই অম্বলে ভোগেন। পোড়া মাটি চায়ের অম্লতার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। মাটির ভাঁড়ে অ্যালকালাইন থাকায় এতে চা পান করলে অ্যাসিডিটির সম্ভাবনা তেমন থাকে না। মাটিতে খনিজ, ফসফরাস, আয়রন, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামের মতো বিভিন্ন উপাদান থাকে। যা শরীরের জন্য উপকারী। ক্লান্তি দূর হয় এতে। প্লাস্টিকের কাপে গরম চা বা অন্য কিছু ঢালার পর রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
সাধারণত বাজারে যেসব প্লাস্টিকের কাপে চা পরিবেশন করা হয়, তা খুবই নিম্নমানের কাপ। সেসব প্লাস্টিকের কাপ তৈরিতে ব্যবহৃত উপাদান যদি কোনোভাবে শরীরে বেশি মাত্রায় প্রবেশ করে তাহলে ক্লান্তিবোধ, হরমোনাল ইমব্যালেন্স ও মস্তিষ্কের কার্যকরিতা হ্রাস পায়। এছাড়াও ছোটো ছোটো বিভিন্ন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই হিসেবে প্লাস্টিকের কাপের তুলনায় মাটির ভাঁড়ে চা পান একেবারে নিরাপদ।
পুষ্টিগুণ, উপকার, চায়ের স্বাদের কথা বিবেচনা করে আভিরা ভেবে নিল এখন থেকে রোজ মাটির ভাঁড়ে চা পান করবে। এতে করে শরীরে উপকারিতা যেমন পাবে তেমন ভিন্ন স্বাদের চা পানের সুযোগও মিলবে।
বর্ণার হাতে ফ্রাইপ্যান দেখে আভিরা কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। মাটির ফ্রাইপ্যানও আছে। আভিরা এগিয়ে গিয়ে একটা ফ্রাইপ্যান হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখল। বর্ণা এক ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল,
– নিবে?
আভিরা কিছুটা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,
– ফেটে যাবে না তো আপু?
বর্ণাও কিছুটা দ্বিধায় ভুগছে। মাটির হাঁড়িতে দুই একবার রান্না করা হলেও মাটির ফ্রাইপ্যানে কখনো রান্না করা হয়নি। না জানি গ্যাসের চুলোয় বসানোর পরে আগুনের হিটে আবার ফেটে না যায়। বর্ণা দোকানির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
– দাঁড়াও, জিজ্ঞেস করে দেখি।
– চাচা এই ফ্রাইপ্যান চুলোয় দিলে ফেটে যাবে না তো?
– না।
– সব ভাঁজা যাবে এতে?
– হ্যাঁ। ডিম, মাছ ভাঁজি সব করতে পারবে।
– লেগে যাবে না তো?
– তেল গরম না হলে লেগে তো যাবেই। বেশি করে তেল দিবা। গরম হবার পর ডিম, মাছ ছাইড়া দেখবা একটুও লাগে নাই।
– আচ্ছা লেগে গেলে কিন্তু পরে ফেরত দিয়ে যাব।
এমন অহেতুক কথায় দোকানি সরু চোখে চাইল। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। তিনি ঝাঁজালো কণ্ঠে বলে উঠলেন,
– এই তুমি ফ্রাইপ্যান রাখো। নেওয়া লাগবে না তোমার। জীবনেও মনো রান্নাবান্না করো নাই।
– রান্নাবান্না করব না কেন, বাড়ির বড়ো বউ আমি। সংসারের সব কাজ শাশুড়ি বউ মা মিলেই করেছি।
বর্ণা সগৌরবে বলে উঠল। কিন্তু দোকানি তাকে ঝাঁজালো কণ্ঠে ফের ধমকে উঠল,
– তাইলে এমন বেক্কলের মতো কথা বলছ কেন?
এভাবে বেক্কল বলায় বর্ণার রাগ হলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, তার বাড়ির লোক বাদে দোকানে থাকা প্রত্যেকে মুখ টিপে হাসছে। রাগে বর্ণা ফুঁসে উঠল। ইচ্ছে করল তেড়ে গিয়ে ঐ টাক মাথায় এই ফ্রাইপ্যানটা ভাঙতে। কিন্তু সে এমন কিছুই করল না। ভরা বাজারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অহেতুক ঝামেলা করতে চাইল না।
হিসেব করে টাকা দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে। বুশরা পিছন থেকে ডেকে উঠতে অগ্নিশর্মা হয়ে বর্ণা চেঁচিয়ে উঠল,
– কী হলো? ডাকছিস কেন?
বোনের ধমকে বুশরা চুপসে গেল। মিনমিন করে বলল,
– আজব। অন্যের রাগ আমার সাথে দেখাচ্ছ কেন?
– বেশি কথা না বলে কী জন্য ডেকেছিস সেইটা বল।
– টাকা দাও।
– কেন? টাকা দিয়ে তোর কী কাজ?
– ঐ একটা ফুলদানি পছন্দ হয়েছে।
– নিতে হবে না। দ্রুত আয়।
– নিব না কেন?
– আমি বলেছি সেজন্য।
– আমি তো নিবই। তুমি টাকা দিলে দাও, নয়তো মাহাদ ভাইয়ার থেকে নিব।
– এই বেয়াদব, ওর থেকে কেন নিবি?
– তো তুমি দিচ্ছ না কেন?
– আমি দিব না। আর মাহাদও দিবে না।
সকলে দাঁড়িয়ে নীরবে দুই বোনের কথোপকথন শুনে যাচ্ছিল। এই পর্যায়ে মাহাদ এগিয়ে এলো। বুশরার কাছে এসে বলল,
– আমার সাথে এসো।
বর্ণা এগিয়ে এলো। কড়া গলায় শাসিয়ে বলল,
– তুই ওকে এক টাকাও দিবি না।
মাহাদ এবার বিরক্ত হলো। এ জন্য সে মেয়েমানুষের সাথে কোথাও বের হতে চায় না। সেই কখন থেকে এখানে ওখানে ঘুরিয়ে যাচ্ছে। কোনোকিছুই কিনছে না। এটা ওটা দেখেই রেখে দিচ্ছে। এদের নাকি পছন্দ হচ্ছে না। আবার পছন্দ হলে দামে বনছে না। এখন আবার ভরা বাজারে দাঁড়িয়ে তামাশা করে যাচ্ছে।
– সমস্যা কী তোর? তখন থেকে কী শুরু করলি? সৌভিক ভাই সাথে আসেনি দেখে সেই রাগ এর ওর উপর দেখাবি?
সকালে সৌভিককে বলে রেখেছিল বিকেলে সবাই বের হবে। সে যেন আসে। সৌভিক তখন হ্যাঁ, না কিছুই বলেনি। বিকেলে বের হওয়ার আগে সৌভিককে কল দিয়েছিল বর্ণা। কিন্তু সৌভিক ব্যস্ততা দেখিয়ে কল কেটে দিল। সেই থেকে মেজাজ বিগড়ে আছে বর্ণার। এতটা সময় ধরে নিজের মেজাজ ঠিক রাখলেও দোকানদারের অপমানে তার কমে যাওয়া মেজাজ বিগড়ে যেতে সময় লাগল না।
বর্ণা দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
– মাহাদের বাচ্চা।
– আমার বাচ্চা হতে যাবে কেন? হলে আমার বউয়ের হবে। তাছাড়া এখনও কিছুই করিনি আমি। সময় হলে তোকে কাকি মা বানাব। এর আগে এসব লজ্জাজনক কথা বলবি না দয়া করে।
মাহাদের কথায় বর্ণ গা দুলিয়ে হেসে উঠল। বর্ণা চোখ রাঙিয়ে তাকাল ভাইয়ের দিকে। মাহাদ আড়চোখে একবার লাবণ্যর দিকে চেয়ে দেখল। এই মেয়ের মুখ খুব স্বাভাবিক। লাজুকতার ধাঁচ নেই। মাহাদ সেদিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলল,
– আমার লজ্জাবতী, লাজুকতা। অতি শ্রীঘ্রই আমার ছোঁয়ায় লজ্জাবতী গাছের ন্যায় লজ্জায় নুইয়ে পড়বে।
_
শরৎ এর আগমনী বার্তা যেন আসমান জুড়ে। ধূসর রঙা অম্বর নীলচে রঙ গায়ে মেখে শরৎ এর নিজস্ব রঙে রাঙিয়ে নিয়েছে। নীল অম্বর জুড়ে ভেসে চলেছে শুভ্র মেঘের ভেলা। এক ফালি রোদ্দুর ছিটিয়ে দিয়ে দিবাকর ডুবন্ত প্রায়।
গোধূলি লগ্নের বিষণ্ণতা ছাপিয়ে রমণীদের চাপা হাসিতে মুখরিত বাড়ির আঙিনা। চনমনে মনে সকলে সাদা চাদর বিছিয়ে দিল সবুজ সতেজ ঘাসের বুকে। মাটির প্লেট, বাটিতে সুসজ্জিত করল সাদা চাদরের মধ্যভাগ। গরম গরম ধোঁয়া উঠা চায়ের ভাঁড় হাতে নিতে কেমন একটা সুবাস নাসারন্ধ্রে পৌঁছাল। ফুঁ দিয়ে চায়ে চুমুক দিল বুশরা। ফুড়ফুড়ে মেজাজে দু চোখের পাতা এক করে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানান দিল,
– দারুণ!
ওর বলার ধরনে সকলে হেসে উঠল। কলকল প্রতিধ্বনিতে ছেয়ে গেল নিস্তব্ধ চারিপাশ। সকলে গোল হয়ে চাদরে বসে থাকলেও এক রমণী তার শুভ্র নগ্ন পা যুগল ঘাসের বুকে মাড়িয়ে দোল খেতে ব্যস্ত। কাটা দিয়ে চুল বেঁধে রাখা সত্ত্বেও ছোটো ছোটো অবাধ্য কেশ হিমেল হাওয়ায় চোখ মুখ ছুঁয়ে দিতে ব্যস্ত। রমণীর গায়ে আসমানি রঙের বাটিক থ্রি-পিস। এক পাশ ছেড়ে দেওয়া ওড়নার অন্য পাশ কাঁধে। কলসি হাতার ডিজাইন দেওয়া জামায়। ওড়না এক পাশে উঠিয়ে রাখায় ফর্সা হাত দৃশ্যমান। অলিন্দ থেকে একজোড়া তীক্ষ্ণ ঘোলাটে চোখ তাকিয়ে আছে নিজ জগৎ এ মত্ত থাকা রমণীর পানে। গৌর অঙ্গে শোভিত আসমানি রঙা সেলোয়ার কামিজে মনে হচ্ছে নীলাভ আসমানের নীলাভ কন্যার পদার্পণ ঘটেছে ভূমিতে।
হঠাৎ কারো আর্তনাদে আভিরা দোলনা ছেড়ে দ্রুত কদমে এগিয়ে এলো। জ্যোতি পা চেপে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। চোখ মুখ নীল হয়ে এসেছে মেয়েটার। মরিচা ধরা বড়োসড়ো পেরেক গেঁথে আছে জ্যোতির পায়ের পাতায়। আভিরা হাঁটু মুড়ে বসল জ্যোতির পাশে। এক হাতে আগলে ধীর স্বরে বলল,
– কীভাবে হলো?
– ঐদিকটায় সম্ভবত পেরেক ছিল। ও খেয়াল করেনি।
জ্যোতির চিৎকারে সকলে বেরিয়ে এসেছে। আনেসা আদরের ভাতিজির এই অবস্থা দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সকলে যখন হা হুতাশ করতে ব্যস্ত, পুরুষালি হাতের ছোঁয়ায় জ্যোতি কেঁপে উঠল। ঝাপসা চোখে চেয়ে দেখল, বর্ণ তার পা থেকে পেরেক খুলছে। তার গায়ে কোনো পুরুষ হাত রেখেছে ভাবতেই তটস্থ জ্যোতি পা সরিয়ে আনতে চাইল। তবে ব্যথায় পা নাড়াতে ব্যর্থ হলো। তাছাড়া বর্ণ বেশ শক্ত হাতে পা চেপে ধরে রেখেছে। ভীত জ্যোতি ব্যথা সইতে না পেরে ঢলে পড়ল আভিরার গায়ে।
_
জ্ঞান ফিরতে চোখের সামনে ভাইকে দেখে জ্যোতি ভীত চোখে তাকাল। জিদান নিশ্চয় বকবে তাকে। সেদিন নিজের সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। সে জেদ ধরে যায়নি। জিদানকে এমন নিশ্চুপ থাকতে দেখে জ্যোতি কাঁদো কাঁদো স্বরে ডাকল,
– ভাইয়া।
জিদান জবাব দেয় না। চেয়ারে মাথা হেলিয়ে জ্যোতির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ভাইয়ের ক্লান্ত ভরা চাহনি দেখে জ্যোতি মিইয়ে গেল। সে আঘাত পেয়েছে শুনে এত দূর থেকে ছুটে এসেছে তার ভাই।
জ্যোতি নিস্তেজ কণ্ঠে বলে উঠল,
– কখন এসেছ?
– ভোরে।
– তুমি কেন আসতে গেলে? আমি ঠিক আছি।
জিদান প্রত্যুত্তর করে না। বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
– তৈরি হয়ে নে। বাড়ি ফিরছিস আমার সাথে।
জ্যোতি অবাক হলো বেশ। ফিরে যাবে মানে, সে এখান থেকে দাদির বাড়ি যাবে বলে ঠিক করে রেখেছে। সেজন্য সেদিন জিদানের সাথে ফিরে যায়নি।
– আজকেই?
– হ্যাঁ।
জ্যোতি আরও কিছু বলতে চাইল। তবে জিদান সুযোগ দিল না। জ্যোতি রেডি হয়ে বিছানায় পা গুটিয়ে বসে রইল। জিদান এলো মিনিটখানেক পর। বোনের হাত ধরে উঠিয়ে বলল,
– আয়।
– বুশরার কাছে আমার ফুলদানি আছে। এনে দাও।
বুশরার নাম শুনেই জিদানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। বোনের সামনে নিজের রাগ সামলে বলল,
– ওসব নিতে হবে না। আমি তোকে ঢাকা গিয়ে কিনে দিব।
– আমি পছন্দ করে কিনেছি। ওটাই লাগবে আমার।
– আমি পারব না এনে দিতে।
– লাগবে না। আমি নিজেই যাচ্ছি।
জিদানের ইচ্ছে করল বোনকে ধমকে চুপ করিয়ে দিতে। কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত থাকায় কিছু বলল না।
– এখানে থাক। নিয়ে আসছি আমি।
জিদানকে হঠাৎ উশখুশ করতে দেখা গেল। খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থেকে থমথমে গলায় বলে উঠল,
– জ্যোতি ফুলদানি দিতে বলেছে।
পরিচিত কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে পৌঁছাতে বুশরা ধড়ফড়িয়ে উঠল। পিছন ফিরে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল বুশরার। অবিশ্বাস্য চোখে সম্মুখে দণ্ডায়মান পুরুষটিকে দেখে। বুশরাকে এমন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিদান ফের রাশভারী কণ্ঠে বলে উঠল,
– কী হলো? ফুলদানিটা নিয়ে এসো। সময় নেই আমার।
বুশরা নিশ্চুপে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা ফুলদানিটা হাতে তুলে নিয়ে সম্মুখে এগিয়ে এলো। জিদানের হাতে দিতে গিয়ে হাত ফসকে ফুলদানিটা ঠাস করে পড়ল মেঝেতে। বিকট শব্দ করে কারুকার্য খচিত ফুলদানিটা খণ্ড বিখণ্ড হয়ে গেল। হতভম্ব বুশরা স্থির দৃষ্টি ফেলে ভেঙে চুরমার হয়ে থাকা ফুলদানিতে। তড়িঘড়ি করে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে উঠল,
– দুঃখিত। আমি খেয়াল করিনি।
জিদান পলকহীন বুশরার নত মুখে তাকিয়ে থেকে বলল,
– ইটস্ ওকে।
– আমার কাছে আরেকটা আছে। আমি এনে দিচ্ছি।
– লাগবে না। আমি পরে কিনে দেব।
– একই রকম পাবেন না। ও অনেক শখ করে কিনেছে। আমি যাওয়ার আগে আরেকটা কিনে নিব নিজের জন্য।
জিদান কিছু বলে না। ফুলদানি হাতে বেরিয়ে গেল। একবারের জন্যও ফিরে চাইল না বুশরার দিকে। বুশরার ইচ্ছে করছে জিদানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে কাঁদতে। জানতে চাইবে, তার সাথে এমন কেন করছে?
_
– প্রাণ!
অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর কানে যেতে ব্যথায় ছটফট করতে থাকা রমণী থমকে চায়। আবছা নীল আলোতে অস্পষ্ট অবয়ব স্পষ্ট হলো। জ্যোতি বিছানা থেকে উঠার চেষ্টা করল। অক্ষম জ্যোতি পড়তে নিলেই পুরুষটা সযত্নে আগলে নিল তাকে।
পুরুষটার বুকে মাথা রেখে ভীত স্বরে বলে উঠল,
– কেন এসেছেন? কেউ দেখেনি তো আপনাকে?
– উহু।
জ্যোতি প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়। কতদিন পরে দেখছে তার মানুষটাকে। খসখসে চোয়াল কাঁপা কাঁপা হাতে ছুঁয়ে দিল। আব্দুল্লাহ জ্যোতির হাতে চুমু খেল। মোবাইলের ফ্ল্যাশ অন করে ব্যান্ডেজ করা ডান পা নিজের ঊরুতে রাখে। রুক্ষ হাতে ছুঁয়ে দিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ায়। পুরুষালি তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে জ্যোতির কাঁধে। মেয়েটা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল,
– আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যান।
আব্দুল্লাহ গভীর চোখে তাকায়। ঐ চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না জ্যোতি। আব্দুল্লাহ জ্যোতির চিবুক ছুঁয়ে মুখ উঁচুতে তুলে চোখে চোখ রেখে বলল,
– নিয়ে যাব।
– কবে?
– অতি শীঘ্রই।
থুতনিতে চুমু এঁকে মৃদু স্বরে আওড়ায়,
– আমার চোখে চেয়ে দেখেছ কখনো? তোমাকে পাওয়ার কী আমরণ তৃষ্ণা!

