প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_১৯

0
3

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৯

পুলিশের গাড়ির পেছনে নীল-লাল বাতিগুলো যখন ঘুরছে, তখন কনফারেন্স হলের বাইরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সাংবাদিক আর জনতার ভিড় সরিয়ে পুলিশ আয়াজকে গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আয়াজের চোখে ভয়ের কোনো চিহ্ন নেই। বরং তাঁর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন কোনো এক বড় অংকের অঙ্ক মেলানোর পর পাওয়া তৃপ্তি।

ঈনশু পুলিশের ব্যারিকেড পেরিয়ে আয়াজের কাছে ছুটে গেল। “আয়াজ! আপনি কেন বাধা দিলেন না? কেন আত্মসমর্পণ করলেন? এই তো সময় ছিল নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার!”

আয়াজ থামল। পুলিশ অফিসাররা একটু দূরত্ব বজায় রাখল। আয়াজ ঈনশুকে দেখে একটু হাসল। তারপর খুব নিচু স্বরে, যাতে শুধু ঈনশুই শুনতে পায়, বলল, “ঈনশু, আমি যদি আইনের তোয়াক্কা না করে প্রমাণগুলো সামনে আনতাম, তবে সেগুলো আদালতে ‘অবৈধভাবে সংগৃহীত’ বলে গণ্য হতো। জামান বা হাবিবুল্লাহর মতো প্রভাবশালীরা সেই সুযোগেই পার পেয়ে যেত। আমাকে তো ল্যাবে অনুপ্রবেশ করতে হয়েছে, সিস্টেম হ্যাক করতে হয়েছে এই সবই তো আইনত অপরাধ।”

ঈনশু অবাক হয়ে তাকাল। আয়াজ বলল, “আমি নিজের হাতে হাতকড়া পরলাম যাতে তদন্তটা হয় অফিশিয়াল। পুলিশ যখন আমার দেওয়া প্রমাণের ভিত্তিতে হাবিবুল্লাহকে জেরা করবে, তখন আর কেউ এই প্রমাণকে অস্বীকার করতে পারবে না। আমি আমার স্বাধীনতা দিয়েছি, যাতে আরিয়ানের সত্যটা আইনি স্বীকৃতি পায়।”

ঈনশু এবার বুঝতে পারল আয়াজের এই ‘আটক’ হওয়াটা স্রেফ হার নয়, এটা একটা মাস্টারস্ট্রোক।

পুলিশ আয়াজকে গাড়িতে তোলার আগে ঈনশু খেয়াল করল, আয়াজ বারবার অডিটোরিয়ামের কোণার দিকে তাকাচ্ছে। ঈনশু ঘুরে দেখল, সায়েব কোলে করে ছোট্ট আয়াতকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আয়াজ মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তাঁর সেই কঠোর, চতুর প্রফেসরের মুখোশটা এক নিমেষে খসে পড়ল। তিনি পুলিশের কাছে অনুমতি চাইল। এক মুহূর্তের জন্য সে আয়াতকে কোলে তুলে নিল।

ছোট্ট আয়াত বাবাকে দেখেই হাত বাড়িয়ে দিল। “ববা-বাব” বলে ডেকে উঠল। আয়াজ পরম আদরে মেয়ের কপালে চুমু খেল। সেই মুহূর্তে আয়াজের চোখে পানি। সে ঈনশুকে কাছে টেনে নিল। এক হাতে মেয়েকে ধরে অন্য হাতটা ঈনশুর কাঁধে রাখল।

“ঈনশু,” আয়াজ নিচু স্বরে বলল, “জানতাম না এই দিনটা এত তাড়াতাড়ি আসবে। আমি হয়তো কয়েকটা দিন দূরে থাকব। কিন্তু মনে রেখো, ভালোবাসা কোনো যুক্তির ধার ধারে না। আমি জেলে থাকলেও আমার মনটা এই খান বাড়িতেই পড়ে থাকবে। আয়াতকে বলবে, ওর বাবা কোনো খারাপ কাজ করেনি, ও সত্যের জন্য লড়েছে।”

ঈনশু কাঁদতে কাঁদতে আয়াজের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। “আমি আপনাকে বের করে আনব, আয়াজ। আমি কথা দিচ্ছি।”

আয়াজ ঈনশুর চিবুকটা ছুঁয়ে বললেন, “আমার জেদিলতা তো এটাই! তুমি হার মানবে না, সেটাই তো আমি চাই। এখন যাও, আয়াতকে নিয়ে ঘরে ফেরো। পুলিশি ঝামেলায় বাচ্চাটার কষ্ট হবে।”

আয়াতকে সায়েবের কোলে দিয়ে আয়াজ পুলিশের গাড়িতে উঠে বসল। গাড়িটা স্টার্ট নিল। ঈনশু দাঁড়িয়ে রইল, চোখের সামনে তার ভালোবাসার মানুষটা অপসারিত হচ্ছে।

বাড়ি ফিরে ঈনশু একদম চুপচাপ হয়ে গেল। আয়াতের ঘুম ভাঙলে সে আদর করে খাইয়ে দিল, কিন্তু তার মগজ তখন অন্য দিকে। সে জানে, এই লড়াইটা এখন আইনের ময়দানে। আয়াজকে বের করে আনতে হলে তাকে এমন উকিল বা এমন কোনো প্রমাণ বের করতে হবে যা হাবিবুল্লাহর ক্ষমতার চেয়েও বড়।

সায়েব সোফায় বসে টিভিতে নিউজ দেখছিল। সেখানে হেডলাইনে চলছে “মেডিকেল কলেজের ডার্ক সিক্রেট ফাঁস, ড. আয়াজ গ্রেফতার, তোলপাড় রাজধানী!”

সায়েব ঈনশুর দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে বলল, “ইনশু আয়াজ ভাইকে তো অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল। এখন কী হবে? আমি কি ওনার ল্যাপটপটা আবার চেক করব?”

ঈনশু স্থির দৃষ্টিতে সায়েবের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চতুর দীপ্তিটা আবার ফিরে এসেছে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “না সায়েব, ল্যাপটপ নয়। আমি আয়াজের ওই ডায়েরিটা আবার পড়ব। আয়াজ বলেছিল, সে শুধু জামান বা হাবিবুল্লাহকে নয়, এই সিন্ডিকেটের একদম মূল শিকড়কে খুঁজে বের করেছে।”

ঈনশু ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে সেই ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরির একেবারে শেষ পৃষ্ঠায়, যা আগে খেয়াল করেনি, সেখানে কিছু অস্পষ্ট কোড লেখা ছিল।

‘৯-১২-২৩, লালবাগ ৪৪/এ, লকার কি #৭’

ঈনশু কপালে হাত দিল। লালবাগ ৪৪/এ তো করিম চাচার ঠিকানা! আর লকার কি #৭? তার মানে করিম চাচার কাছে শুধু অডিও ক্লিপ ছিল না, সেখানে আরও বড় কিছু লুকানো আছে!

ঈনশু ফোনটা তুলে নিল। তার চোখে এখন আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছে জেদ। সে মনে মনে বলল, “প্রফেসর সাহেব, আপনি জেলখানায় বসে শুধু অপেক্ষা করুন। আপনার স্ত্রী খুব শিগগিরই আপনার মুক্তির চাবি নিয়ে হাজির হবে। এই কনফারেন্স তো ছিল স্রেফ ট্রেলার, আসল ছবিটা তো এখন শুরু!”

আয়াজ গ্রেফতার হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টা কেটে গেছে। পুরো বাড়িতে এক থমথমে নীরবতা। সায়েব ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে বিষণ্ণ মুখে ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট্ট আয়াত এখন ঈনশুর কোলে বসে তার ওড়নার খুঁট ধরে খেলছে। বাবার অনুপস্থিতি হয়তো সে পুরোপুরি বোঝেনি, কিন্তু মায়ের মনমরা ভাবটা বুঝতে পেরে সে বড্ড শান্ত হয়ে আছে।
ঈনশু আয়াতের কপালে আলতো করে একটা চুমু খেল। তার চোখ দুটো হালকা ভিজে উঠলেও মনের ভেতরের জেদটা আজ ইস্পাতের মতো শক্ত। সে মনে মনে বলল, “কান্নাকাটি করে সময় নষ্ট করার মেয়ে আমি নই, প্রফেসর সাহেব। আপনি নিজেকে আইনের খাঁচায় বন্দী করেছেন সত্য প্রমাণের জন্য, আর আমি আপনাকে সেখান থেকে টেনে বের করব ভালোবাসার জোরে।”

ঈনশু আয়াতকে সুমি বেগমের কোলে দিয়ে সায়েবের সামনে এসে দাঁড়াল। “সায়েব, গাড়ি বের কর। আমাদের একবার পুরোনো ঢাকায় করিম চাচার ওখানে যেতে হবে।”

সায়েব চট করে মাথা তুলল। “এখন? এই অবস্থায়? পুলিশ যদি আমাদের ওপর নজর রাখে?”

ঈনশু একটু বাঁকা হাসল। “নজর রাখলে রাখুক। আমরা তো কোনো চুরি করতে যাচ্ছি না। আয়াজের ডায়েরির ওই শেষ লাইনের মানে উদ্ধার করতে হবে। জলদি কর।”

লালবাগের সেই পুরোনো বাড়িতে যখন ঈনশু আর সায়েব পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। করিম চাচা দরজা খুলেই ঈনশুকে দেখে কেঁদে ফেলল।

“মা, আরশাদ সাহেবের এই খবরটা শোনার পর থেকে আমার বুড়ো বুকে বড্ড কষ্ট হচ্ছে। ওমন সোনার টুকরো ছেলেটাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল?”

ঈনশু করিম চাচার হাতটা ধরে শান্ত গলায় বলল, “চাচা, আপনি একদম ভেঙে পড়বেন না। আয়াজ একটা প্ল্যান করেই গেছে। আপনি শুধু আমাকে বলুন, ওনার ডায়েরিতে লেখা ‘লকার কি #৭’ বলতে উনি কী বুঝিয়েছেন? আপনার এখানে কোনো লকার আছে?”

করিম চাচা চোখ মুছে ঘরের কোণায় থাকা একটা পুরোনো কাঠের সিন্দুকের দিকে আঙুল দেখালেন। “লকার আমার এখানে নেই মা, লকার আছে এই লালবাগ এলাকারই একটা পুরোনো সমবায় ব্যাংকে। আরশাদ সাহেব আমার নামে ওখানে একটা সেফটি লকার খুলেছিলেন। ওটার চাবিটা এই সিন্দুকের ভেতরেই আছে।”

করিম চাচা সিন্দুক খুলে লোহার একটা চাবি বের করে ঈনশুর হাতে দিল। চাবির গায়ে ছোট করে খোদাই করা—’L-07’।

“এই লকারে কী আছে চাচা?” সায়েব কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল।

“ওখানে কোনো জটিল কোড বা ফাইল নেই বাবা,” করিম চাচা বললেন, “ওখানে আছে একটা আসল আইনি দলিল। মিস্টার হাবিবুল্লাহ আর প্রিন্সিপাল সাহেব যখন আরিয়ানকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছিল, তখন আরিয়ান গোপনে একটা ভিডিও স্টেটমেন্ট রেকর্ড করে ওটার মেমোরি কার্ড আর কিছু অরিজিনাল পেপারস এই লকারে রেখে দিয়েছিল। আরশাদ সাহেব বলেছিলেন, যদি কখনো উনি নিজে বিপদে পড়েন, তবে এই লকারের জিনিসগুলোই ওনাকে জামিন পেতে সাহায্য করবে।”

ঈনশু চাবিটা হাতে নিয়ে বুক ভরে একটা স্বস্তির নিশ্বাস নিল। রহস্যটা যতটা জটিল ভাবা হয়েছিল, আসলে ততটা জটিল নয়। আয়াজ নিজের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিজেই করে রেখে গেছে, শুধু আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিল

পরদিন সকাল ১০টা।
সায়েব আর একজন চেনা আইনজীবীর সাহায্যে ঈনশু লকার থেকে সেই আসল মেমোরি কার্ড আর পেপারসগুলো উদ্ধার করে সরাসরি থানায় হাজির হলো। ড. আরশাদ খান আয়াজকে তখনো কোর্টে চালান করা হয়নি, তিনি থানার একটা স্পেশাল লকআপে বসে আছেন।

আয়াজের পরনের সেই দামী ব্ল্যাক স্যুটটা এখন কিছুটা কুঁচকে গেছে, চশমাটা টেবিলের ওপর রাখা। কিন্তু তাঁর চেহারার আভিজাত্য আর শান্ত ভাবটা এক ফোঁটাও কমেনি।

ঈনশু যখন লকআপের সামনে এসে দাঁড়াল, আয়াজ মাথা তুলে তাকালেন। ঈনশুকে দেখেই তাঁর ঠোঁটের কোণায় সেই চেনা, মায়াবী বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল।
“আমি জানতাম, আমার জেদিলতা ২৪ ঘণ্টার বেশি ঘরে বসে থাকতে পারবে না,” আয়াজ নিচু, গম্ভীর কিন্তু এক অদ্ভুত ভালোবাসাময় স্বরে বলল।

ঈনশু লকআপের লোহার গ্রিলটার ওপাশে নিজের হাতটা রাখল। আয়াজ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঈনশুর হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিলেন। এতগুলো মানুষের সামনেও ওনার এই ভালোবাসার প্রকাশটা ঈনশুর বুকের ভেতর এক তীব্র কাঁপন তৈরি করল।

ঈনশু চোখে জল নিয়েই হেসে বলল, “আপনার সাইকোলজি এবার কী বলে প্রফেসর সাহেব? চিলতে পাখি কি আপনার চাবি নিয়ে আসতে পেরেছে?”

আয়াজ ঈনশুর হাতের আঙুলগুলোতে আলতো করে চাপ দিয়ে বললেন, “সাইকোলজি বলে, একজন চতুর পার্টনার থাকলে জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটাও একটা রোমান্টিক গেমের মতো মনে হয়। তুমি করিম চাচার লকার খুঁজে পেয়েছ, তাই তো?”

“হ্যাঁ,” ঈনশু ব্যাগ থেকে ফাইলটা আর মেমোরি কার্ডটা দেখিয়ে বলল, “আমাদের উকিল বাবু অলরেডি ওপরে গেছেন বেইল পিটিশন নিয়ে। আরিয়ানের নিজের মুখের ভিডিও স্টেটমেন্ট আছে এখানে, যেখানে সে পরিষ্কার বলেছে হাবিবুল্লাহ আর প্রিন্সিপাল ওনাকে জোর করে ড্রাগ ল্যাবে আটকে রেখেছিল। আপনার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের যে চার্জ আনা হয়েছে, তা এই প্রমাণের সামনে টিকবে না। আপনি আজ বিকালের মধ্যেই ছাড়া পাচ্ছেন।”

আয়াজ এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে পরম শান্তিতে একটা নিশ্বাস নিলেন। তারপর চোখ খুলে ঈনশুর দিকে গভীর মায়ায় তাকালেন। “বাড়ি ফেরার পর কিন্তু আমাকে এক কাপ কড়া করে আদা-চা বানিয়ে দিতে হবে, মিস জেদিলতা। অনেক দিন তোমার হাতের চা খাইনি।”

“শুধু চা কেন, আপনার জন্য স্পেশাল বিরিয়ানি রান্না করব,” ঈনশু হেসে বলল, “তবে শর্ত একটাই আজকের পর থেকে আর কোনো গোপন ডায়েরি বা রিভলভার ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা চলবে না। যা হবে, সামনাসামনি হবে।”

আয়াজ হাসল। লোহা আর ইটের এই ঠান্ডা লকআপটাও যেন এই দুই চতুর মানুষের ভালোবাসার উষ্ণতায় এক নিমেষে গলে গেল।

বিকেলের দিকে কোর্ট থেকে আয়াজের জামিন মঞ্জুর হলো। হাবিবুল্লাহ আর প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে নতুন করে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করল পুলিশ।
খান বাড়ির সদর দরজায় যখন আয়াজ এসে দাঁড়ালেন, তখন বাইরে মিষ্টি রোদ। সুমি বেগম আয়াতকে নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আয়াত বাবাকে দেখেই “বাবা… বাবা…” করে চিল্কার করে হাত বাড়িয়ে দিল। আয়াজ এক ছুটে গিয়ে নিজের কলিজার টুকরো মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন, আর অন্য হাত দিয়ে ঈনশুকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল।

সব ঝড়ের পর আকাশটা বুঝি এমনই সুন্দর আর শান্ত হয়।
(চলবে…)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here