প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_১১

0
1

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_10,১১

প্রিন্সিপালের রুম থেকে রনির সেই চূড়ান্ত অপমানের পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন। ক্যাম্পাসে এখন আর ঈনশুকে নিয়ে কোনো বাঁকা গুঞ্জন নেই, বরং করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জুনিয়র মেয়েরা তাকে সমীহের চোখে দেখে ড. আরশাদ খান আয়াজের স্ত্রী বলে কথা!

আজ শুক্রবার। কলেজের ছুটি থাকায় খান বাড়িতে এক অদ্ভুত অলস শান্ত পরিবেশ। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাড়ির বড়রা সবাই যাঁর যাঁর ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। সায়েবও কোনো এক বন্ধুর বাড়িতে গেছে গ্রুপ স্টাডির বাহানায় অবশ্য আয়াজের কড়া নজরদারির পর সে এখন সত্যিই একটু আধটু পড়াশোনায় মন দিয়েছে।

ঈনশু নিজের ঘরের বিছানায় আরাম করে বসেছিল। পরনে তার একটা হালকা গোলাপি রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ, চুলে কোনো ক্লিপ নেই, পিঠময় ছড়িয়ে আছে এক ঢাল কালো চুল। সে আয়াজের পড়ার টেবিলটা গোছানোর সিদ্ধান্ত নিল। এই মানুষটা ঘর গোছানোর ব্যাপারে যতটা পারফেক্ট, টেবিলের বইপত্র ছড়ানোর ব্যাপারে ততটাই উদাসীন।

বইগুলো লাইনে রাখতে রাখতে হঠাৎ একটা কালো চামড়ার ডায়েরি ঈনশুর চোখে পড়ল। ডায়েরিটা বেশ পুরোনো, কোণগুলো একটু ক্ষয়ে গেছে। ঈনশুর ভেতরের সেই চতুর আর কৌতূহলী মনটা ওমনি চাড়া দিয়ে উঠল। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল আয়াজ তখনো ওয়াশরুমে। সে গুটিগুটি পায়ে বিছানায় ফিরে এসে ডায়েরির পাতা ওল্টাতে লাগল।

পাতা ওল্টাতেই ঈনশুর চোখ দুটো কপালে উঠল। ডায়েরির প্রায় প্রতিটা পাতায় কাঁচা হাতের অক্ষরে তার নিজের নাম লেখা ‘ঈনশিরাহ’। একটা পাতায় তারিখ দেওয়া আছে আজ থেকে ঠিক চার বছর আগের, যেদিন ঈনশু প্রথম কলেজে পা রেখেছিল।
সেখানে লেখা আছে:
“আজ ও কলেজে প্রথম এলো। পার্পল রঙের জামা পরে মেয়েটা যখন করিডোরে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে হাসছিল, তখন আমার মনে হলো আমার এই চার দেয়ালের ক্লাসরুম আর থিওরির দুনিয়াটা বড্ড একঘেয়ে। ও বড্ড চঞ্চল, বড্ড জেদি। আমি জানি ও আমাকে কঠোর প্রফেসর ভেবে এড়িয়ে চলে, কিন্তু ও জানে না এই কঠোরতার আড়ালে আমি শুধু ওর ওই চঞ্চলতাটাকেই আগলে রাখতে চাই। ও আমার কাকার মেয়ে, আমার সীমানার বাইরের কেউ নয়। আমি অপেক্ষা করব, যেদিন ও নিজে থেকে আমার এই খাঁচায় ধরা দেবে।”

ঈনশুর বুকের ভেতরটা এক তীব্র আবেগে তোলপাড় হয়ে গেল। তার চোখ দুটো ভিজে এল। সে তো ভেবেছিল রনির ওপর জেদ করে হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তে তার এই বিয়েটা হয়েছে। কিন্তু সে জানত না, এই গম্ভীর মানুষটা গত চার বছর ধরে তাকে নিজের মনের গভীরে এক পবিত্র সিংহাসনে বসিয়ে রেখেছে!

“অন্যের ডায়েরি লুকিয়ে পড়া কিন্তু একটা ক্রাইম, মিস জেদিলতা!”
হঠাৎ দরজার কাছ থেকে সেই চেনা, মায়াবী অথচ গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে ঈনশু চমকে উঠল। সে চট করে ডায়েরিটা বন্ধ করে নিজের পেছনে লুকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

আয়াজ ওয়াশরুম থেকে চেঞ্জ করে বেরিয়েছেন। পরনে তাঁর একটা কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার, চোখে চশমাটা নেই। ভেজা চুলের দু-একটা ফোঁটা তাঁর কপালে এসে পড়ছে। চশমা ছাড়া এই মানুষটাকে এই মুহূর্তে এতটাই আকর্ষণীয় আর গভীর দেখাচ্ছিল যে, ঈনশু নিজের চতুরতা ভুলে শুধু তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।

আয়াজ ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। বিছানার পাশে এসে তিনি এক হাঁটু গেড়ে বসলেন, যাতে তাঁর মুখটা ঠিক ঈনশুর মুখের সমান্তরালে থাকে। তিনি নিজের বড় হাতটা বাড়িয়ে ঈনশুর পেছন থেকে ডায়েরিটা টেনে নিলেন এবং সেটা পাশে সরিয়ে রাখলেন।

“কী দেখছ ওমন করে? প্রফেসরের ভেতরের আসল রূপটা ধরে ফেলেছ বলে ভয় পাচ্ছ?” আয়াজ ঈনশুর চিবুকটা আলতো করে নিজের আঙুল দিয়ে উঁচিয়ে ধরে নিকু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে এখন কোনো ক্লাসরুমের কড়াকড়ি নেই, আছে শুধু এক সমুদ্র খাঁটি ভালোবাসা।

ঈনশুর চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে আয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে মায়াবী গলায় বলল, “আপনি এত বছর ধরে আমাকে ভালোবাসতেন, অথচ বাইরে ওমন হিটলার সেজে থাকতেন কী করে? আমাকে একবারও কেন বলেননি?”

আয়াজ একটু হাসলেন। তাঁর সেই হাসিতে ছিল এক পরম তৃপ্তি। তিনি নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঈনশুর গালের জলটা খুব সাবধানে মুছে দিলেন। তাঁর এই আলতো ছোঁয়ায় ঈনশুর পুরো শরীর শিউরে উঠল।
আয়াজ ঈনশুর দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব নরম গলায় বললেন, “বলিনি কারণ আমি জানতাম, তোমার ওই জেদি আর চঞ্চল মনকে জোর করে পাওয়া যেত না। তুমি রনিকে ভালোবেসে ভুল করেছিলে, কিন্তু আমি জানতাম ওই ভুলটা তোমাকে একদিন আমার কাছেই ফিরিয়ে আনবে। আমি শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলাম, ঈনশু। যে রাজকন্যা আমার ভাগ্যলিখন হয়ে আছে, তাকে দুনিয়ার কোনো রনি বা শওকত আমার থেকে কেড়ে নিতে পারত না।”

ঈনশু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নিজের হাত দুটো আয়াজের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরাসরি আয়াজের গলা জড়িয়ে ধরল। সে নিজের মুখটা আয়াজের ঘাড়ের কাছে গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি বড্ড ভাগ্যবতী, আয়াজ। আমার সমস্ত জেদ, সমস্ত অহংকার আজ থেকে শুধু আপনার কাছে সমর্পণ করলাম।”

আয়াজ ঈনশুর এই প্রথমবার করা সরাসরি ভালোবাসার স্বীকারোক্তিতে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। পরক্ষণেই এক তীব্র অধিকারবোধ আর ভালোবাসার টানে তিনি ঈনশুকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে পিষে ধরলেন। ঘরের ভেতরের এসি-র ঠান্ডা বাতাস আর দুপুরের নির্জনতা যেন তাদের এই পবিত্র ও শালীন মিলনকে সাক্ষী রেখে থমকে রইল।

আয়াজ ঈনশুর চুলে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বললেন, “আজ থেকে তুমি শুধু ড. আরশাদ খান আয়াজের ঘেরাটোপে বন্দি। এই খাঁচা থেকে মুক্তির কোনো থিওরি আজ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি,ঈনশু খান।”

রাত ৮টা
ঈনশু ডাইনিং টেবিলে বসে আয়াজের জন্য চা ঢালছিল। তার পরনে একটা নেভি ব্লু শাড়ি, হাতে কাঁচের চুড়ি রিনরিন করে বাজছে। সে এখন আর শুধু কলেজের ছাত্রী নয়, সে এখন এই বাড়ির আদর্শ বড় বউ।

আয়াজ সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। পরনে তাঁর ফরমাল শার্ট-ট্রাউজার, চোখে চশমা আর হাতে লেকচার শিট। টেবিলে এসে বসার পর ঈনশু চায়ের কাপটা তাঁর সামনে এগিয়ে দিল।

আয়াজ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চশমার আড়াল থেকে ঈনশুকে দেখে একটা চোখ টিপলেন। এই গোপন ইশারা দেখে ঈনশু মিষ্টি করে হাসল।
সায়েব ওমনি টেবিল থেকে পাউরুটি মুখে পুরতে পুরতে বলল, “আরে বাহ! সকাল সকাল প্রফেসরের রোমান্স শুরু হয়ে গেছে! ঈনশু, তুই তো ওনাকে একদম লাইনে এনে ফেলেছিস রে। কাল রাতে দেখলাম উনি তোর শাড়ির কুঁচি ঠিক করে দিচ্ছেন!”

ঈনশু ওমনি সায়েবের প্লেটে আর একটা ডিমের পোচ তুলে দিয়ে নিজের সেই চিরচেনা চতুর ভন্ডামি অন করে বলল, “সায়েব, তুই বেশি কথা না বলে নিজের পড়া কর। আজ কিন্তু ওনার ডিপার্টমেন্টে তোর ভাইভা আছে। বেশি পাকা কথা বললে স্যার তোকে আবার কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবে!”

আয়াজ গম্ভীর মুখে চশমাটা ঠিক করে বললেন, “একদম ঠিক বলেছো, ঈনশু। সায়েব, আজ যদি ভাইভায় ১০-এ ৯-এর কম পাও, তবে ঘরের মধ্যেও তোমার এন্ট্রি বন্ধ!”

সায়েব কপালে হাত দিয়ে বলল, “হায় রে! এরা স্বামী-স্ত্রী মিলে আমার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে ছাড়ল!”
পুরো ডাইনিং টেবিলে তখন হাসির রোল বয়ে গেল। ঈনশু আর আয়াজ একে অপরের দিকে তাকাল।

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here