প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৯

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৯

কলেজ ছুটি হওয়ার পর বিকেলের আকাশটা কেমন যেন একটু মেঘলা হয়ে এল। নিহা আর ঈনশু একসাথে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে মোড়ের চেনা ফুচকার দোকানটায় গিয়ে বসল। ঝাল ঝাল ফুচকা আর তেঁতুলের টক খাওয়াটা ঈনশুর বরাবরের স্বভাব। যতই তার জীবনে ঝড় বয়ে যাক না কেন, ফুচকা দেখলে তার জিভে জল আসবেই।

নিহা একটা ফুচকা মুখে পুরে দিয়ে বলল, “আচ্ছা ঈনশু, তুই যে হুট করে আয়াজ ভাইকে বিয়ে করলি, তোর মনের ভেতর রনির জন্য আর কোনো টান নেই তো? মানে, রনি তো তোকে ধোঁকা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তোদের সম্পর্কটা তো অনেক দিনের ছিল।”

ঈনশু ফুচকার বাটিটা হাতে নিয়ে একটু থমকে গেল। তার চোখে এক পলকের জন্য পুরোনো স্মৃতির মেঘ জমা হলো। সে চামচ দিয়ে ফুচকাটা ভাঙতে ভাঙতে শান্ত গলায় বলল, “ধোঁকা দেওয়ার পর আর কোনো টান থাকে না নিহা। রনির ওপর আমার এখন শুধু ঘেন্না আর জেদ কাজ করে। আর তাছাড়া, আয়াজ… উনি আমার জীবনে আসার পর পেছনের দিকে তাকানোর আর কোনো সুযোগই আমি পাইনি।”

“তাই নাকি? এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি আমায়, ঈনশু?”

হঠাৎ একটা চেনা অথচ এখন অত্যন্ত অপ্রিয় কণ্ঠস্বর শুনে ঈনশু আর নিহা দুজনেই চমকে তাকাল।

ফুচকার দোকানের ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রনি। পরনে তার জিন্স আর টি-শার্ট, চোখে সানগ্লাসটা মাথার ওপর তোলা। তার মুখে সেই চেনা চতুর আর দেমাগি হাসি, যা দেখে একসময় ঈনশু পা-গল হতো, আর এখন দেখলে তার গা রি রি করে।

রনি ধীর পায়ে ঈনশুর টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সে ঈনশুর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “বাহ রে ঈনশু! আমার ওপর রাগ করে শেষমেশ ওই খড়খড়ে, চশমা পরা বুড়ো প্রফেসরকে বিয়ে করে ফেললে? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি কোনো ভালো ছেলেকে বিয়ে করে আমাকে দেখাবে। কিন্তু ওই হিটলার আরশাদ আয়াজ? ওর সাথে সংসার করছ কী করে ভাবলেই আমার হাসি পায়।”

ঈনশু ফুচকার বাটিটা টেবিলের ওপর দড়াম করে রাখল। তার চোখের সেই চতুর আর জেদি রূপটা এক সেকেন্ডে ফিরে এল। সে চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রনির মুখোমুখি হলো।

সে কড়া গলায় বলল, “মুখ সামলে কথা বলো, রনি! কার ব্যাপারে কথা বলছ তুমি জানো? উনি আমার স্বামী আর এই কলেজের নামকরা প্রফেসর। তোমার মতো একটা ধোঁকাবাজ, থার্ড ক্লাস ছেলের মুখে ওনার নাম মানায় না। তুমি তো জেবার পেছনে ঘুরে বেড়াতে, এখন আবার আমার সামনে কোন মুখে এসেছ?”

রনি একটু হেসে ঈনশুর টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে একটু ঝুঁকে এল। সে নিচু স্বরে বলল, “আহা, এত রাগ কেন? আমি তো জানি তুমি আমাকে ভোলার জন্যই ওই বিয়েটা করেছ। কাকার জেদে পড়ে হোক আর নিজের রাগে হোক তুমি এখনো আমাকেই ভালোবাসো, ঈনশু। ওই গম্ভীর প্রফেসরের সাথে তোমার মতো একটা চঞ্চল মেয়ের লাইফ কখনো ম্যাচ করতে পারে না। চাইলে কিন্তু এখনো পুরোনো সবকিছু ঠিক করা যায় ”

“পুরোনো সবকিছু ঠিক করার থিওরি সাইকোলজিতে নেই, মিস্টার রনি।”

হঠাৎ একটি গম্ভীর, ভারী এবং বরফশীতল কণ্ঠস্বর পুরো ফুচকার দোকানের আড্ডার পরিবেশকে স্তব্ধ করে দিল। রনি আর ঈনশু দুজনেই চট করে পেছনের দিকে তাকাল।

রাস্তার ওপাশে কালো গাড়িটা দাঁড় করিয়ে ড. আরশাদ খান আয়াজ ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন। পরনে তাঁর সেই নেভি ব্লু ফরমাল শার্ট, চোখে কড়া ফ্রেমের চশমা। তাঁর প্রতিটা পদক্ষেপের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্ত কিন্তু ভয়ঙ্কর রাজকীয় ভাবমূর্তি প্রকাশ পাচ্ছিল।

আয়াজ এসে সরাসরি ঈনশুর পাশে দাঁড়ালেন। তিনি ঈনশুর দিকে একবার তাকালেন, তাঁর চোখে তখন স্ত্রীর জন্য এক পরম সুরক্ষাবোধ। তারপর তিনি চশমাটা নাকের ডগায় একটু নামিয়ে রনির দিকে তাকালেন। প্রফেসরের সেই তীক্ষ্ণ আর শীতল দৃষ্টির সামনে রনি এক পলকেই কেমন যেন দমে গেল।

আয়াজ অত্যন্ত শান্ত অথচ ইস্পাত-কঠিন স্বরে রনিকে বললেন, “তুমি বোধহয় ভুলে গেছ রনি, তুমি কার সাথে কথা বলছ। মিস ঈনশিরাহ খান এখন আর শুধু তোমার পুরোনো চ্যাপ্টার নয়, ও এখন ড. আরশাদ খান আয়াজের বৈধ স্ত্রী। আমার স্ত্রীর সীমানার মধ্যে দাঁড়িয়ে যদি দ্বিতীয়বার তোমাকে এরকম সস্তা কথা বলতে দেখি, তবে কলেজের ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন তো দূরের কথা আমি নিজে তোমাকে এমন এক শিক্ষা দেব যা তোমার পুরো ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।”

রনি আমতা আমতা করে নিজের দেমাগ দেখানোর চেষ্টা করল, “আয়াজ স্যার… আপনি তো আমাদের বড় ভাই হন, তাই বলে এভাবে”

“কলেজের বাইরে আমি তোমার কোনো স্যার নই, আর ঘরে তুমি আমার স্ত্রীর কেউ নও।” আয়াজ রনির কথা মাঝখানেই কেটে দিয়ে কড়া গলায় বললেন, “নিজের সীমানা চেনো, রনি। যে মেয়ে তোমার ধোঁকাবাজি চিনে তোমাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে, তার সামনে এসে পুনরায় নিজের মূর্খতা জাহির করো না। এখান থেকে এখনই বিদায় হও, নাহলে পুলিশ ডাকতে আমার এক মিনিটও সময় লাগবে না।”

আয়াজের সেই সিংহসুলভ গর্জন আর তীব্র ব্যক্তিত্বের সামনে রনি আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ানোর সাহস পেল না। সে মুখ কালো করে দ্রুত পায়ে ওখান থেকে কেটে পড়ল।

রনি চলে যেতেই ঈনশু একটা লম্বা শ্বাস নিল। নিহা তখন এক কোণায় দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছিল। আয়াজ নিহার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, “মিস নিহা, আপনি সাবধানে বাড়ি চলে যান। ঈনশুকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

নিহা মাথা নেড়ে প্রায় দৌড়ে ওখান থেকে চলে গেল।
আয়াজ ঈনশুর হাতটা আলতো করে ধরে নিজের গাড়ির দিকে নিয়ে গেলেন। গাড়ির ফ্রন্ট সিটে ঈনশুকে বসিয়ে দিয়ে তিনি নিজে ড্রাইভিং সিটে বসলেন। পুরো গাড়ির ভেতরে তখন এক থমথমে নীরবতা। গাড়ি চলতে শুরু করল।

ঈনশু আড়চোখে আয়াজের দিকে তাকাচ্ছিল। আয়াজের মুখটা খুব গম্ভীর, চোয়াল শক্ত। ঈনশু তার চতুর মনটা অন করে একটু নড়েচড়ে বসল। সে মিটিমিটি হেসে বলল, “কী ব্যাপার প্রফেসর সাহেব? মুখটা ওমন গম্ভীর করে রেখেছেন কেন? আপনার কি জেলাসি হচ্ছিল?”

আয়াজ একটা লাল বাতি দেখে গাড়িটা ব্রেক করলেন। তারপর চশমাটা খুলে ড্যাশবোর্ডে রাখলেন। তিনি ঘুরে ঈনশুর দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটোতে এখন আর কোনো রাগ নেই, সেখানে শুধু এক অতল গভীর অধিকারবোধ।

তিনি ঈনশুর মুখের খুব কাছে এগিয়ে এলেন। গাড়ির ভেতরের এসি-র মিষ্টি সুবাসের মাঝে আয়াজের এই আকস্মিক সান্নিধ্যে ঈনশুর নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে এল। আয়াজ ঈনশুর দুই হাত নিজের এক হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে অন্য হাত দিয়ে তার কপালটা ছুঁয়ে দিলেন।

“জেলাসি?” আয়াজ নিচু, মায়াবী ও অত্যন্ত পুরুষালি স্বরে বললেন, “ড. আরশাদ খান আয়াজ কখনো অন্য কোনো ছেলের জন্য জেলাস ফিল করে না, ঈনশু। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, তার এই জেদিলতা এখন কার নামের আছে। কিন্তু যখন কোনো সস্তা ছেলে আমার এই অমূল্য সম্পত্তিটার দিকে কুদৃষ্টি দেয়, তখন আমার ভেতরের মানুষটা শান্ত থাকতে পারে না।”

ঈনশু আয়াজের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের জেদি ভাবটা ভুলে নরম গলায় বলল, “আমি তো ওকে পাত্তা দিচ্ছিলাম না। আমি ওকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি যে আমি আপনাকে”

“কী বলেছ?” আয়াজ ঈনশুর ঠোঁটের খুব কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “বলেছ যে তুমি আমাকে ভালোবাসো? সেটা তো এখনো আমাকেই মুখে বলোনি, জেদিলতা!”

আয়াজের এই চূড়ান্ত রোমান্টিক এবং শালীন আক্রমণে ঈনশুর পুরো শরীর কেঁপে উঠল। সে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। আয়াজ ঈনশুর এই মিষ্টি আত্মসমর্পণ দেখে মৃদু হাসলেন এবং অত্যন্ত সাবধানে ও পবিত্রতার সাথে ঈনশুর কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়ালে।

তিনি এক পা পিছিয়ে গিয়ে আবার চশমাটা চোখে পরলেন এবং গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ফানি টোনে বললেন, “আজ রাতে কিন্তু কোলবালিশের বর্ডারটা ডাবল চেক করব। যদি একটাও বালিশ মাঝখানে দেখি, তবে কাল থেকে তোমার ফুচকা খাওয়া আজীবনের জন্য ব্যান!”

ঈনশু চাদরের আড়ালে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল আর মনে মনে বলল, “উফ! এই প্রফেসরের হাত থেকে আমার আর কোনোদিনই নিস্তার নেই!”

চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here