প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_৮

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৮

ঢাকার সেমিনার আর শওকতের ডেরায় সেই ঝোড়ো মিশন শেষ করে আরশাদ খান আয়াজ যখন পরদিন কলেজে ফিরলেন, তখন তাঁর পিঠে ক্যাম্পাসের চেনা রোদ। তবে শার্টের কলারটা আজ একটু বেশিই টানটান, চোখে সেই চেনা রাশভারী চশমা। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দু-চারজন জুনিয়র লেকচারার তাঁকে সালাম দিলেন। আয়াজ শুধু মাথা নেড়ে নিজের মেজাজটা বজায় রেখে সোজা চলে গেলেন ডিপার্টমেন্টের নিজের পার্সোনাল রুমে।

রুমে ঢুকে এসিটা অন করতেই টেবিলের ওপর রাখা একটা লাল ফাইলে চোখ পড়ল তাঁর। ফাইলের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘সায়েব আহমেদ, রোল নাম্বার ৪২’।

আয়াজ চেয়ারে আরাম করে বসে ফাইলটা হাতে নিলেন। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কাল রাতে যে ছেলে বাড়িতে কান্নাকাটি করছিল, সে আজ ঠিক সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে প্রফেসরের টেবিলের ওপর নিজের রি-সাবমিশন ফাইল জমা দিয়ে গেছে। আয়াজ লাল কলমটা হাতে নিয়ে পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলেন। দু-একটা জায়গায় কাটাকুটি করলেও বোঝা যাচ্ছে, সায়েব এবার ফাঁকিবাজি না করে সত্যি সত্যিই নিজের মগজ খাটিয়েছে।

ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।
“কাম ইন,” আয়াজের গলাটা মুহূর্তেই প্রফেসরের চেনা গাম্ভীর্যে ভারী হয়ে উঠল।

ভেতরে ঢুকল নিহা আর তার ঠিক পেছনেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঈনশু। ঈনশুর পরনে আজ একটা পার্পল কালারের সালোয়ার-কামিজ। বাইরে থেকে তাকে দেখলে মনে হবে ক্লাসের সবচেয়ে বাধ্য এবং নিরীহ ছাত্রী। কিন্তু আয়াজ খুব ভালো করেই জানেন, এই শান্ত মুখের আড়ালে কত বড় এক জেদিলতা আর চতুর মন লুকিয়ে আছে।

নিহা একটু আমতা আমতা করে বলল, “স্যার, গতকাল আমাদের যে অ্যাসাইনমেন্টটা দেওয়ার কথা ছিল, ঈনশু… মানে ইনশিরাহ কাল অসুস্থ থাকার কারণে ওটা কমপ্লিট করতে পারেনি। আজকে কি ওটা জমা নেওয়া যাবে?”

আয়াজ ফাইল থেকে চোখ না সরিয়েই খুব ঠান্ডা গলায় বললেন, “অসুস্থতা কি আগে থেকে নোটিশ দিয়ে আসে, মিস নিহা? কলেজের রুলস বুক অনুযায়ী ডেডলাইন পার হয়ে গেলে কোনো এক্সকিউজ চলে না।”

ঈনশু এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে নিহাকে একটু কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর আয়াজের টেবিলের একদম কাছাকাছি এসে দুই হাত টেবিলের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে তখন সেই পরিচিত জেদি চাউনি।

সে নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, “স্যার, নিয়ম তো মানুষের জন্যই তৈরি হয়, তাই না? আর কাল রাতে… মানে কাল সারাদিন আমি কেন প্রজেক্ট করতে পারিনি, তার আসল কারণটা তো আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ জানার কথা নয়! আপনি কি সত্যিই খাতাটা বাতিল করবেন?”

আয়াজ এবার চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে সরাসরি ঈনশুর চোখের দিকে তাকালেন। ক্লাসরুমে বা নিজের রুমে তিনি কখনোই কোনো ছাত্রীর সাথে এভাবে চোখ মিলিয়ে তাকান না, কিন্তু ঈনশুর এই জেদি চাউনি তাঁর ভেতরের পুরুষালি অধিকারবোধকে এক লহমায় জাগিয়ে তোলে।

আয়াজ নিহার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিস নিহা, আপনি একটু বাইরে যান। আমি রোল নাম্বার ২৩-এর সাথে পার্সোনালি কথা বলতে চাই।”

নিহা যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। সে ঈনশুকে একটা বেস্ট অফ লাক মার্কা লুক দিয়ে চট করে রুম থেকে বেরিয়ে দরজাটা টেনে দিল।

নিহা বাইরে যেতেই রুমের ভেতরের আবহাওয়া একদম বদলে গেল। এসি-র ঠান্ডা বাতাসের মাঝেও এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল চারধারে।

আয়াজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ছয় ফিট দীর্ঘ শরীরটা যখন ঈনশুর একদম সামনে এসে দাঁড়াল, ঈনশু অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেল। কিন্তু আয়াজ তাকে বেশি দূর যাওয়ার সুযোগ দিলেন না। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ঈনশুকে নিজের টেবিল আর নিজের শরীরের মাঝখানে একদম অবরুদ্ধ করে ফেললেন।

“কী ব্যাপার মিস ঈনশু? ক্লাসের বাইরে এসেও প্রফেসরের সাথে এভাবে চোখ রাঙিয়ে কথা বলা হচ্ছে? বাড়িতে কি শাসনের কোনো কমতি ছিল?” আয়াজ নিজের চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে খুব নিচু ও মায়াবী স্বরে বললেন।

ঈনশু টেবিলের কোণাটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে নিজের ঠোঁটকাটা ভাবটা বজায় রাখার চেষ্টা করল, “শাসন তো আপনি শুধু মুখেই করেন। এই যে এখন কলেজের রুমে আমাকে এভাবে আটকে রেখেছেন, কেউ যদি হুট করে ঢুকে পড়ে তখন আপনার এই হিটলার ইমেজটা কোথায় যাবে শুনি?”

আয়াজ একটু হাসলেন। তিনি ঈনশুর কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখার বাহানায় তার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এলেন। ঈনশু থমকে গেল, তার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

আয়াজ ঈনশুর কানের লতিটা আলতো করে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ইনভেস্টিগেশন কমপ্লিট, মিস জেদিলতা। তোমার কপালে কোনো জ্বর নেই, তবে চোখ দুটো বলছে কাল রাতে ঠিকমতো ঘুমানো হয়নি। বর্ডার লাইন খালি পেয়েও কেন ঘুমাওনি, তার সাইকোলজিক্যাল ব্যাখ্যাটা কি আমি দেব?”

ঈনশুর গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে আয়াজের বুক লক্ষ্য করে নিজের ছোট হাত দিয়ে একটা মৃদু ধাক্কা দিল, “আপনি বড্ড খারাপ, আয়াজ! দুনিয়ার সামনে কত বড় সাধু, আর আড়ালে আসলেই আস্ত একটা চোর!”

“আমি শুধু তোমার এই জেদ আর ভালোবাসাটাই চুরি করেছি, ঈনশু। আর কোনো জিনিসে আমার লোভ নেই,” আয়াজ ঈনশুর হাত দুটো নিজের এক হাতের মুঠোয় বন্দি করে অন্য হাত দিয়ে তার থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরলেন। তাঁর চোখ ছাড়া গভীর দৃষ্টিতে ঈনশু নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলল।

আয়াজ খুব নরম গলায় বললেন, “শওকতের চ্যাপ্টার ওখানেই ক্লোজড। ও আর কোনোদিন তোমার দিকে তাকানোর সাহস পাবে না। এবার নিজের এই মনটাকে একটু শান্ত করো। রনির ওপর জেদ করে যা করেছ, করেছ। কিন্তু এখন তুমি যার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, সে তোমাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”

ঈনশুর চোখের কোণায় এক ফোঁটা পানি চিকচিক করে উঠল। সে আর নিজের ভেতরের ভন্ড বা জেদি ভাবটা ধরে রাখতে পারল না। সে আলতো করে নিজের কপালটা আয়াজের চওড়া বুকে ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি। তাই তো এখন আর আপনার সামনে আমার কোনো জেদ কাজ করে না।”

আয়াজ খুব আলতো করে ঈনশুকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। এই বদ্ধ ঘরে, প্রফেসরের ডেস্কে রাখা ফাইলের স্তূপের মাঝেও যেন এক টুকরো বসন্ত এসে থমকে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে সায়েবের গলা শোনা গেল, “আয়াজ ভাই! আমি কি ভেতরে আসতে পারি? আমার থিসিসের ওই লাস্ট চ্যাপ্টারটা একটু…”

শব্দটা শুনতেই ঈনশু ছিটকে আয়াজের বুক থেকে সরে গেল। সে দ্রুত নিজের কামিজ আর চুলগুলো ঠিক করে এক কোণায় দাঁড়িয়ে বই ওল্টানোর ভান করতে লাগল।

আয়াজ চট করে নিজের চশমাটা চোখে পরে চেয়ারে গিয়ে বসলেন এবং মুহূর্তের মধ্যে সেই গম্ভীর প্রফেসরের মুখোশটা মুখে পরে নিলেন।

“ভেতরে এসো,” আয়াজ কড়া গলায় বললেন।
সায়েব দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখল ঈনশুও রুমে দাঁড়িয়ে আছে। সায়েব চতুর চোখে একবার আয়াজকে আর একবার ঈনশুকে দেখল। ঘরের ভেতরের থমথমে আর কিছুটা রোমান্টিক গন্ধটা সায়েবের ফাঁকিবাজ মগজ ঠিকই ধরে ফেলল।

সে বাঁকা হেসে ঈনশুর দিকে তাকিয়ে বলল, “কী রে ঈনশু? তুই এখানে কী করিস? প্রফেসরের কাছ থেকে স্পেশাল কোনো এক্সট্রা ক্লাস নিচ্ছিস নাকি রে?”

ঈনশু নিজের ভন্ড রূপটা আবার অন করে বলল, “তুই সবসময় ফালতু কথা বলবি না সায়েব! আমি স্যারের কাছ থেকে আমার বাতিল হওয়া প্রজেক্টের ব্যাপারে কথা বলছিলাম। তুই নিজের কাজ কর তো!”

সায়েব আয়াজের টেবিলের সামনে এসে খাতাটা রেখে বলল, “আয়াজ ভাই, আমি তো কাজ করেই এনেছি। তবে আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, ঘরের বউকে তুমি যেভাবে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দাও, আমাদের মতো গরিব ছাত্রদের যদি তার ১০% দিতে, তবে আমরা এই সেমিস্টারে গোল্ড মেডেল পেয়ে যেতাম!”

আয়াজ সায়েবের খাতাটা টেনে নিয়ে কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সায়েব, অতিরিক্ত কথা বলাও কিন্তু ডিসিপ্লিনের বাইরে পড়ে। তোমার এই প্রজেক্টের সেকেন্ড চ্যাপ্টারে যদি একটাও ভুল পাই, তবে আগামী এক মাস তোমাকে প্রতিদিন ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কান ধরে থাকতে হবে। মনে থাকে যেন!”

সায়েব ওমনি জিব কেটে বলল, “বাপ রে! ঘরের মধ্যে দুলাভাই আর কলেজের রুমে জল্লাদ! আমি চললাম ভাই, তোদের এই ভাইবোনের চক্করে আমার জানটাই শেষ হয়ে যাবে!”

সায়েব খাতাটা রেখে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সায়েব যেতেই ঈনশু আর আয়াজ দুজনেই একসাথে হেসে উঠলেন।

চলবে,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here