অভিমাননামা #md_shifu / ১ম পর্ব

0
3

“এক বড় না দুই বড়, সাজেদ ভাইয়ের পুঁন বড়!”

উঠানে পা রাখতেই নিজের নামে এমন আজব সাইরি শুনে থমকে দাঁড়ালো সাজেদ।
এক মুহূর্তের জন্য সে বুঝতেই পারলো না রাগ করবে, নাকি লজ্জায় মাটিতে মিশে যাবে!

বিকেলের নরম রোদ তখন পুরো উঠানজুড়ে ছড়িয়ে আছে। উঠানের একপাশে কয়েকটা ছোট ছোট বাচ্চা হাডুডু খেলছে। আর তাদের মাঝখানে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে সুর মিলিয়ে সাইরিটা বলছে চাঁদ বিবি—সাজেদের ফুফাতো বোন। বয়সে ছোট হলেও মুখে তার কোনো লাগাম নেই।

সাজেদ সাধারণত খুব হাসিখুশি মানুষ। সহজে রাগে না, বরং সবাইকে হাসাতেই বেশি পছন্দ করে। গ্রামের ছোট বড় সবাই তাকে পছন্দ করে। কিন্তু আজ যেন মাথার ভেতর আগুন জ্বলে উঠলো তার। কারণ চাঁদ বিবি এমন একজন মানুষ, যাকে সে দু’চোখে সহ্য করতে পারে না। অবশ্য তার কারণও আছে।

চাঁদের মা মানে সাজেদের ফুফু কোহিনূর পুরো এলাকায় নিজের অহংকার আর বড়লোকি ভাবের জন্য পরিচিত। কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলেন না। সবসময় এমন আচরণ করেন যেন বাকিরা সবাই তার চেয়ে নিচু শ্রেণির মানুষ। ছোটবেলা থেকেই মায়ের সেই স্বভাবটা চাঁদের মাঝেও ঢুকে গেছে। সুযোগ পেলেই কাউকে খোঁচা দেওয়া, অপমান করা কিংবা মজা নেওয়া এসব যেন তার স্বভাবে পরিণত হয়েছে।

সাজেদ দাঁত চেপে বলল,
“চাঁদ! এইসব কী বলতেছিস তুই?”

চাঁদ বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে উল্টো ভেংচি কাটলো।
“কী হইছে? সত্য কথা বললেই গায়ে লাগে নাকি, সাজেদ ভাই?”

চারপাশের বাচ্চারা হো হো করে হেসে উঠলো।
আর সেই হাসির শব্দে সাজেদের মুখটা আরও শক্ত হয়ে গেল। কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো সে। সকাল থেকে কোচিং করিয়ে এসে শরীরটা এমনিতেই ক্লান্ত হয়ে আছে। তার ওপর এই মেয়ের আজাইরা কথা শুনে মাথা আরও গরম হয়ে যাচ্ছে।

সাজেদ এমন মানুষ না যে যার-তার সাথে দাঁড়িয়ে তর্ক করবে। আর যাকে সে সহ্যই করতে পারে না, তার সাথে তো কথাই বলতে চায় না। এমনকি ছায়াও মাড়াতে ইচ্ছা করে না তার। তাই চাঁদের সাথে আর কোনো কথা বাড়ালো না সে।

চোয়াল শক্ত করে একবার তাকালো শুধু। সেই দৃষ্টিতেই জমে থাকা বিরক্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু চাঁদ যেন সেসবের তোয়াক্কাই করে না। উল্টো ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছিল।

সাজেদ আর এক মুহূর্তও উঠানে দাঁড়ালো না। চুপচাপ সোজা ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।

পেছন থেকে তখনও চাঁদের কণ্ঠ ভেসে আসছিল
“এই যে সাজেদ ভাই, রাগ করছেন নাকি?”

সাজেদ শুনেও না শোনার ভান করলো। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, চাঁদের সাথে তর্কে জড়ানো মানেই নিজের মাথা আরও গরম করা। আর এই মেয়েটা মানুষকে রাগিয়ে আনন্দ পায়। বিশেষ করে তাকে।

চাঁদকে সহ্য করতে না পারার পেছনে সাজেদের আরও অনেক কারণ আছে। আজকের এই সাইরিতে রাগটা হুট করে তৈরি হয়নি; বরং বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

ছোটবেলার একটা ঘটনা আজও স্পষ্ট মনে আছে তার।
তখন সাজেদদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। অভাব না থাকলেও স্বচ্ছলতা ছিল না বললেই চলে। আর সেই সুযোগটাই সবসময় কাজে লাগাতো কোহিনূর। আত্মীয় হলেও তাদের প্রতি তার আচরণ ছিল অবহেলায় ভরা। কথাবার্তায় সবসময় একটা তাচ্ছিল্য লেগে থাকতো।

একবার চাঁদের জন্মদিনে সাজেদ গিয়েছিল ওদের বাড়িতে। বাড়ি ভর্তি মানুষ, চাঁদের কয়েকজন কাজিনও এসেছিল সেদিন। সবাই মিলে হৈচৈ করছিল। সাজেদ তখন চাঁদের রুমে দাঁড়িয়ে কোনো একটা বিষয় নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়ে তার সাথে। তর্কটা খুব বড় কিছু ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই চাঁদ সবার সামনে রেগে গিয়ে বলে উঠেছিল
“তুমি আমার রুম থেকে বের হও! এখনই বের হও!”

কথাটা বলেই সে দরজার দিকে আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। আর আশেপাশে থাকা কাজিনরা তখন মুচকি মুচকি হাসছিল। সেদিন ছোট্ট সাজেদ অপমানে মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কেউ হয়তো ঘটনাটাকে সাধারণ ঝগড়া ভাবতে পারে, কিন্তু সাজেদের কাছে সেটা ছিল আত্মসম্মানে আঘাত।

সেই দিনের পর থেকেই চাঁদের প্রতি তার এক তীব্র বিরক্তি জন্ম নেয়। এরপর আরও বড় একটা ঘটনা ঘটে।

কোনো এক পারিবারিক ঝামেলায় কোহিনূর একদিন সাজেদের মা রাহেলাকে অপমান করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। ঘটনাটা এতটাই অপমানজনক ছিল যে রাহেলা বাসায় ফিরে সারারাত কেঁদেছিলেন।

সেদিন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখেছিল সাজেদ।
আর সেই দিনের পর থেকেই চাঁদদের পরিবারের প্রতি তার ঘৃণাটা আরও গভীর হয়ে যায়। এমনকি সেদিনের পর থেকে সাজেদ চাঁদের বাড়িতে আর পা ও রাখেনি।

চাঁদের সাথে সাজেদের সম্পর্ক ভালো না হলেও সাজেদের মা রাহেলাকে ভীষণ পছন্দ করে চাঁদ। ছোটবেলা থেকেই রাহেলা তাকে নিজের মেয়ের মতো আদর করতেন। কোহিনূরের অহংকারী স্বভাবের মাঝেও রাহেলার স্নেহমাখা ব্যবহারটা চাঁদের খুব ভালো লাগতো। তাই সুযোগ পেলেই শহর থেকে গ্রামে চলে আসতো সে মামিকে দেখতে।

আর সাজেদের ছোট বোন সাজেয়ার সাথে তো তার আলাদা বন্ধুত্বই আছে। দুজনেই সমবয়সী, এবার ইন্টার প্রথম বর্ষে পড়ে। একসাথে গল্প করা, ঘুরাঘুরি, রাতে এক বিছানায় শুয়ে আড্ডা দেওয়া সব মিলিয়ে তাদের সম্পর্কটা অনেকটা বেস্টফ্রেন্ডের মতো।

চাঁদের কলেজে এবার এইচএসসি পরীক্ষার সেন্টার পড়েছে। তাই কলেজ বন্ধ। সেই সুযোগে সে আবার গ্রামে বেড়াতে চলে এসেছে।

তবে শুধু মামি আর সাজেয়াকে দেখতেই আসেনি স।আরেকটা বিশেষ কারণও আছে, সাজেদকে জ্বালানো।

চাঁদ খুব ভালো করেই জানে, ছোটবেলার ঘটনাগুলোর জন্য সাজেদ ভাই তাকে দু’চোখে সহ্য করতে পারে না। আর ঠিক সেই কারণেই সুযোগ পেলেই সে সাজেদকে উল্টাপাল্টা কথা বলে ক্ষেপিয়ে তোলে। সাজেদ যত রেগে যায়, চাঁদের যেন ততই মজা লাগে।

কখনো তার সামনে দাঁড়িয়ে ভেংচি কাটে, কখনো ইচ্ছে করে নাম বিকৃত করে ডাকে, আবার কখনো ছোট ছোট কথায় খোঁচা মারে। আর সাজেদের রাগে শক্ত হয়ে যাওয়া মুখটা দেখলেই চাঁদের হাসি পায়।

তবে মজার ব্যাপার হলো চাঁদের এসব দুষ্টুমির পেছনে শুধু খেপানোর আনন্দই নেই, কোথাও যেন এক অদ্ভুত টানও লুকিয়ে আছে। যদিও সেটা এখনো কেউ বুঝতে পারেনি। এমনকি চাঁদ নিজেও না।

ঘরে ঢুকেই বিরক্ত মুখে গামছাটা খাটের ওপর ছুড়ে মারলো সাজেদ। তারপর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গভীর একটা শ্বাস নিল।

বাইরে উঠানে এখনও চাঁদের হাসির শব্দ ভেসে আসছে। সাজেদ এর কাছে সেই হাসির শব্দটাই যেনো লাগতেছে সবচেয়ে বিশ্রী হাসি।

হঠাৎ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো সাজেয়া। মুখে চাপা হাসি।

“ভাইয়া, তুই আবার চাঁদের সাথে লাগতে গেছিলি?”
সাজেদ বিরক্ত গলায় বলল, “আমি লাগতে গেছিলাম? ওই পাগল মেয়ে তো সুযোগ পেলেই আমাকে খোঁচায়!”

সাজেয়া খিলখিল করে হেসে ফেললো। “আরে ভাই, ও তো মজা করে!”

“এইসব তোর কাছে মজা লাগে?”

“তোরে রাগাইতে পারলেই ওর শান্তি।”

সাজেদ বিরক্ত মুখে খাটে বসে পড়লো। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, “দেখ, আমি ওই মেয়েরে সহ্য করতে পারি না। যতদিন এখানে আছে, সাবধানে করে দিবি যেনো আমার সামনে না আসে।”

সাজেয়া হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো। ভাইয়ের কথার বিপরীতে কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে গেলো। দেখ গেলো চাঁদের পক্ষে হয়ে কিছু বলতে গেলে চাঁদের রাগ সব তার ওপর ঝাড়বে।

সাজেদ সাজেয়া কে আরো কিছু বলতে যাবে তখনই বাইরে থেকে রাহেলার ডাক ভেসে এলো। “সাজেদ, হাত-মুখ ধুয়ে আয়। চা দিছি।”

সাজেদ ধীরে ধীরে উঠে বাইরে বের হতে যাবে, এমন সময় দরজার পাশ থেকে হঠাৎ চাঁদ বলে উঠলো, “মামি, চায়ে বেশি চিনি দিয়েন না। সাজেদ ভাই তো এমনিতেই মিষ্টি!”

কথাটা শুনে উঠানে আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।
সাজেদ চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হচ্ছে আর একটুখানি কিছু বললেই তার মাথা পুরোপুরি গরম হয়ে যাবে।

চাঁদ আবারও মুখ চেপে হাসছে। সেই হাসিতে দুষ্টুমি আছে, খুনসুটি আছে, আবার কোথাও যেন অদ্ভুত এক আপন ভাবও লুকিয়ে আছে।
কিন্তু সাজেদ সেটা দেখতে চায় না। সে শুধু দেখতে পায় বহু বছর আগের অপমান, মায়ের চোখের জল আর নিজের আত্মসম্মানে লেগে থাকা দাগগুলো।
( দেখা যাক তাদের প্রেম হয় নাকি?)
#অভিমাননামা
#md_shifu / ১ম পর্ব

চলবে……
( গল্প ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন। আর কোনো ভুল ত্রুটি থাকলে ধরাই দিবেন। ধন্যবাদ)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here