#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১৮.২ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি
স্মৃতিকথন :
অমাবস্যার রাত। আকাশে চাঁদের অস্তিত্ব চোখে পড়ছে না। আকাশটাও কালো মেঘে ছেঁয়ে আছে। এই অমানিশাতেই ক্লান্ত পায়ে হেটে চেলেছে এক পঞ্চদশী কিশোরী। কিশোরীর গায়ের জামা কাপড় জীর্ণ শীর্ণ হয়ে মলিন হয়ে আছে।কিশোরীর চোখ জোড়া ক্লান্তিতে বুজে আসার উপক্রম। শরীরের ভারটুকুও সইতে পারছে না যেন সে। পুরোনো জির্ণ-শীর্ণ জুতো জোড়া পরে অনেকটা পথ হাটায়,সেগুলোও কিছুক্ষণ আগেই ছিড়ে গিয়েছে।রোদেলা জুতো জোড়া আর ব্যবহারে উপয় না দেখে ঢিল মেরে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। এক জুতো দুই বার সেলাই করে পরায় যায়। কিন্তু রোদেলা তার জুতো জোড়া নিজ হাতেই সাতবার সেলাই করে পরেছে। জুতোর অবস্থা এতই বেহাল যে,সুঁচ ঢোকানোরো আর উপায় নেই,তাই কিছুটা রাগেই ছুড়ে মেরেছে সেগুলো।
অনেকক্ষণ পাঁকা রাস্তায় খালি পায়ে হাটতে থাকায় পায়ের পাতা লাল হয়ে গিয়েছে। রোদেলা ক্লান্ত শরীরটাকে আর টেনে নিয়ে যেতে না পেরে ধপ করে রাস্তার কিনারায় খাম্বার সাথে মাথা ঠেস দিয়ে বসে পরলো।রোদেলা নিজের স্কুলের ব্যাগ হাতরে পানির বোতলটা বের করলো। বোতলের মুখ খুলে গলায় পানি ঢালতে গিয়ে কিশোরীর শুষ্ক বুকটা পুনরায় মোচড় দিয়ে উঠলো। বোতলে সামান্য পানিটুকুও অবশিষ্ট নেই। আজকে সারাদিন না খেয়ে থাকায়, রোদেলা শরীরে যেন এক বিন্দু পরিমাণ শক্তি পাচ্ছে না ।
রোদেলার বাবা তিন মাস ধরে ঘরে পরে আছে
প্যারালাইজড হয়ে।সৎ মায়ের সংসারে রোদেলার আরও দুইটা ভাইবোন আছে। মোট পাঁচ সদস্যের সংসারে উপার্জণক্ষম লোক ছিলেন কেবল রোদেলার পিতা।তিনি তিন মাস ধরে ঘরে প্যারালাইজড হয়ে পরে থাকার কারণে পরিবারে আয়ের পথ বন্ধের পথে।রোদেলা তখন সবে ক্লাস নাইনে উঠেছে।
–
রোদেলা স্কুল থেকে, তার এক দূরসস্পর্কের খালামনির বাসায় গিয়েছিল। বাবার এই অবস্থায় তাদের নুন ভাত খেয়ে টিকে থাকারও উপায় নেই। তার উপর রোদেলার প্রতি সৎ মায়ের আক্রশ তো আছেই। তিনি উঠতে বসতে রোদেলাকে খোটা দেয়।রোদেলা বাসা থেকে যখন
বেরুলো, তখন তার সৎ মা নাজনীন বেগম রোদেলার গায়ে একটা ঝাড়ু ছুঁড়ে মেরে বলেছিল,
—– ” এই যে বের হচ্ছিস, লজ্জা শরম থাকলে আর এই ঘরমুখো হবি না।আমিই আমার ছেলে মেয়েদের মুখ দু মুঠু অন্ন তুলে দিতে পারি না, সেখানে তোর মতো মেয়েকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াতে পারবো না আমি। ”
রোদেলা সৎ মায়ের কথায় অশ্রুসজল চোখে ঠোঁট টিপে কান্না আটকে বেরিয়ে এসেছিল।রোদেলার সৎ ছোট দুই ভাই-বোন মাফীন আর মারুশা তখন বোনের জন্য চিৎকার করে কাঁদছিল।
–
রোদেলার ক্লাস শেষ হয়েছে বিকাল চারটায়। মাথার উপর ছাদের চিন্তা এতক্ষণ না থাকলেও,স্কুল ছুটি হতেই মেয়েটার তার সৎ মায়ের তিক্ত কথা গুলো মনে পরতে লাগলো। রোদেলা কোথায় যাবে ভেবে না পেয়ে তার দূরসস্পর্কের এক খালার কথা মনে পরেছিল। ছোট বেলায় রোদেলার মা থাকতে মিসেস লুবনা শেখ রোদেলাকে আর রোদেলার বড় ভাইকে অনেক আদর করতো। যদিও এতগুলো বছর তাদের সাথে রোদেলাদের যোগাযোগ নেই। তবে তার ধারনা ছিল, রোদেলা এক রাতের জন্য সেখানে আশ্রয় চাইলে তিনি তাকে মানা করবেন না হয়তো।মিসেস লুবনা শেখের বাড়ি রোদেলার স্কুল থেকে অনেকটা দূরে। ছোট বেলায় অবাধ যাতায়াত করায় তার ঠিকানা এখনো স্মরনে আছে।হাতে তার বিশ টাকার একটা নোট ছিল, সেটাও আসার সময় ছোট ভাই-বোনকে দিয়ে এসেছে। এতোটা পথ কিভাবে যাবে ভাবতে ভাবতে,মেয়েটা হেটেই মিসেস লুবনা শেখের বাড়ির পথ ধরলো। রোদেলা ভাবলো একটা রাত ওনার বাসায় থেকে কাটিয়ে দিলে পরে নাজনীন বেগমের রাগ পরলে আবার নিজ বাড়িতে না হয় চলে যাবে।
–
রোদেলা দুই মাইল পথ হেটে সন্ধ্যায় পৌঁছেছে লুবনা শেখের বাড়ি। লুবনাকে দেখে রোদেলা সালাম জানাতেই তিনি রোদেলার সালামের জবাব না দিয়ে হতভম্বের ন্যায় কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলো শুধু রোদেলার দিকে। রোদেলার ভীষণ অস্বস্থি হচ্ছে তবুও নিজের পরিচয় দিল,
—- ” আন্টি আমি রোদেলা? আমাকে কি চিনতে
পারছেন? ”
লুবনা মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কালো করে নিয়ে সোজাসুজি জানতে চাইলো,
—– ” তা এখানে কি মনে করে এলে? ”
রোদেলা ভদ্রমহিলার কথায় থমথম খেয়ে,অপমানে কাচুমুচু করতে লাগলো। রোদেলাকে মহিলাটা সদর দরজায় দাড় করিয়েই জেরা করতে লাগলেন। ভেতরে অবদ্ধি ঢুকতে বলল না। রোদেলা নিজের অপমান ভুলে আশেপাশে তাকিয়ে, দেখলো অন্ধকার নেমে পরেছে অনেক আগেই। এই অন্ধকারে তার মতো চুনোপুটির মেয়ের পক্ষে আবারও দুই মাইল হেটে আর নিজ বাড়ি ফেরা সম্ভব নয়।
রোদেলা নিজের অপমানটুকু গিলে,বিনয়ের স্বরে বলল,
—- ” আন্টি আপনার বাড়িতে একটা রাত কি আমি থাকতে পারি? বিশ্বাস করুন কাল সকাল সকাল আমি চলে যাবো। ”
রোদেলার মুখে থেকে আবদার টুকু শুনে লুবনা’র চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠলো। লুবনা শেখ কড়মড় করে তাকালো রোদেলার দিকে। তারপর যা নয় তা বলে, কিশোরীকে অপমান করতে লাগলো,
—- ” আমার বাড়িতে কি আশ্রম খুলে বসে আছি?তাছাড়া এখন তোমাদের ক্লাস আমাদের ক্লাসের সাথে যায় না। ঘরে আমার দুই জোয়ান ছেলে,এখন তোমাকে আমি আশ্রয় দিয়ে ঘরে বিপদ ডেকে আনবো নাকি?না বাবা তা তো হতে দেওয়া যায় না। তুমি তোমার পথ দেখ মেয়ে। আর সাবধান! আমার বাড়িতে আত্মীয়তার পরিচয়ে দ্বিতীয় বার আর পা রাখবে না। ”
কথা গুলো বলেই মিসেস লুবনা রোদেলার মুখের উপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলেন। ছোট রোদেলার তখন কি বা বয়স,মেয়েটা লুবনার এরকম ব্যবহারে বাকরুদ্ধ হয়ে কেবল চোখের পানি ছাড়তে লাগলো। রোদেলা অপমানে কাঁধের ব্যাগের দুইপাশ চেপে ধরলো। তারপর আনমনে পা বাড়ালো অমানিশায়।
এলোমেলো পা ফেলতে ফেলতে রোদেলার মনে পড়ে গেল মা আর তার ভাইয়া থাকাকালীন সময় গুলোর কথা।তখন মিসেস লুবনাদের অবস্থা এত ভালো ছিল না। রোদেলারা তখন লুবনাদের থেকেও ভালো অবস্থানে ছিল।লুবনার স্বামীর যখন চাকরি ছিল না। তখন রোদেলার বাবা আসাদুজ্জামান নিজেই, লুবনার হাসব্যান্ডকে নিজের অফিসে চাকরী দিয়ে ছিল।তখন লুবনা আন্তরিকতায় গদগদ হয়ে নিজের দূরসস্পর্কের বোনকে আপন বোন করে বসেছিল। লুবনা শেখ রোদেলা’র আসল মা মিসেস. শেফালিকে নিজের ছোট বোনের আসনে বসিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিলেন। তখন রোদেলা আর রোদেলার বড় ভাইকে লুবনা নিজের সন্তানের মতো আদর করতেন।একটা রাত রোদেলাকে নিজের বাড়িতে রাখতে কত কিছুই না করতেন। অথচ সময়ের ব্যবধানে তিনি তার আসল রূপ আজ দেখিয়ে দিলেন।
_
রোদেলার বুকটা আবার মা আর ভাইয়ের কথা স্মরণ করে কেঁপে উঠলো। রোদেলা আনমনে হাটার সময় রাস্তার পিচঢালা সড়কে পড়ে গিয়ে আর্তনাত করে উঠলো,
—– ” মা তুমি না হয় আকাশের তারা হয়ে গিয়ছো। কিন্তু আমার ভাইয়া কোথায়? সে কেন আমাকে একা রেখে হারিয়ে গেল মা? ভাইয়া,ভাইয়ারে কোথায় তুমি? দেখ তোমার পুতুলের পা আজ রক্তে রাঙা।মাথার উপর ঠাঁই গোঁজার মতো ছাদ টুকুও নেই। বাবা থাকতেও বাবাকে আল্লাহ নির্জীব করে দিয়েছেন। আমি আর পারছি না এই অসহায়ত্বে টিকে থাকতে। ”
রোদেলা কথাগুলো বলতে বলতে রাস্তার পিলারের সাথে ঠেস দিয়ে বসে চোখের পানি ফেলতে লাগলো। এই অন্ধকার অমানিশায় ছোট মেয়েটা কোথায় থাকবে,কোথায় যাবে এ নিয়ে যেন কারো কোন চিন্তা রইলো না। সময় গড়ানোর সাথে সাথে অন্ধকার যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।ক্ষুধার জ্বালায় রোদেলার পেটে যেন অসংখ্য ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। যাও গলাটা ভিঁজাতে নিয়েছিল,খালি বোতলটুকু দেখে মেয়েটার মুখে মলিনতা নেমেছে।
–
রোদেলা খাম্বায় দুই হাত চেপে উঠে দাড়ালো। অমানিশায় পা বাড়ালো সামনে এগোনোর জন্য। তার কাছে টাকা নেই।তবে একটা বাসটাস পেলে উঠে পরবে ভাবলো। টাকা না থাকায়,বাসের হেল্পার দুই একটা গালি দিলেও সইয়ে নিবে। এসব ভাবতে ভাবতেই রোদেলা বাসস্ট্যান্ডে এসে দাড়ালো। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো জন-মানব নেই বললেই চলে। রোদেলা সময়টা অনুমান করে নিল রাত আটটা হবে হয়তো। এত রাতে রোদেলা কখনও বাইরে থাকেনি। মেয়েটা ভয়ে জরোসরো হয়ে আছে।
আজ এক বিশেষ কারণে ‘ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘ এই এলাকায় কারফিউ জারি করেছে। সন্ধ্যার পর থেকে সারারাত এই কারফিউ চলবে।তাই এদিকটা বেশ জন-মানব শূন্য।রোদেলার অবশ্য তা অজনা। রোদেলা কাচুমুচু করে দাড়িয়ে আয়তুল কুরসি পড়তে পড়তে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে দশ মিনিট কেটে যাওয়ার পর তিন চারটা মাতাল লোককে একসাথে এদিকে আসতে দেখে পঞ্চদশী কিশোরী ভয়ে আঁতকে উঠলো। রোদেলা ভয়ে পিঁছিয়ে যেতে লাগলো, তখনি একটা মাতাল রোদেলাকে দেখে জিভ বের করে অশালীন ইঙ্গিত করে বলে উঠলো,
—– ” আরে এ দেখি খা’সা কচি মা’ল। আজকে কার মুখছিলাম। এ তো না চাইতেও লটারী লেগে গেল মাইরি।”
মাতালটার কথায় বাকি তিন জনও লোভাতুর দৃষ্টি বুলালো রোদেলার দিকে। রোদেলা এদেরকে নিজের দিকে পাগলা কুকুরের ন্যায় ছুটে আসতে দেখে নিজেও দূর্বল শরীর নিয়ে দৌড় শুরু করে দিল। রোদেলা দৌড়াতে দৌড়াতে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে লুকালো। মাতাল চারটাও রোদেলার পিছু ছুটতে ছুটতে সেখানে চলে এলো।কিন্তু হঠাৎ রোদেলাকে উধাও হয়ে যতে দেখে মাতল চারটা খুব রেগে গেল। একটা মাতাল গুন্ডা রোদেলাকে না পেয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালি ছুড়লো,
—- ” শা’লি কোথায় লুকিয় বসে আছিস?হারা’ম’জাদি আজকে তোকে হাতে পেলে একম হিংস্র হায়নার ন্যায় খুবলে খাব বলে রাখলাম। ”
রোদেলা গাছের আড়ালে বসে মাতাল খারাপ লোকের মুখে নিজেকে নিয়ে অশ্রাব গালি ছুঁড়তে দেখে তার কিশোরী অবুঝ মনটা মনটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হতে লাগলো। রোদেলা নিজের হাত চেপে কোন রকম নিজের কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো।তখনি বিপরীত পাশ থেকে রেললাইন হতে রেলগাড়ির চাকার তীব্র ঘর্ষণ আর হুইসেল প্রতিধনিত হলো।রেলগাড়ির তীব্র হলদেটে আলো অশানিশার চাদরে ভাটা টেনে দিতেই মাতাল গুলো গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবীকে দেখে ফেলল। লোক চারটার মুখে খেলে গেল নোংরা কুৎসিত হাসি। মাতাল চারটা চারদিক থেকে রোদেলার দিকে এগোতে লাগলো। রোদেলা মাতাল,খারাপ লোক গুলোকে নিজের দিকে এগোতে দেখে আবার জান প্রাণ হাতে নিয়ে ছুট লাগালো। জীর্ণ শীর্ণ শরীরে দৌড় ঝাঁপ করতে আর ভালো লাগছে না রোদেলার। অদৃষ্টের কথা চিন্তা করে ছোট মেয়েটার হাসি পেতে লাগলো। রোদেলা দেখলো চারদিক থেকে চারজনের মোট আটটা নোংরা হাত তার দিকে তেড়ে আসছে। নিজেকে বাঁচাতে রোদেলা গায়ের সবটুকু জোরে আরও দ্রুত ছুট লাগালো। কিন্তু ছোট শরীরে মেয়েটার অসারতা নেমে আসতেই, রোদেলার পা রেললাইনের ধারে থাকা পাথরে বেঁধে ধুপ করে উল্টে পরলো।মাতাল চারজন পিশাচ তা দেখে চৌদিক থেকে ঠোঁট চে’টে বিকৃত হাসতে হাসতে রোদেলার দিকে এবার কিছুটা ধীর পায়ে এগোতে লাগলো। রোদেলার নিজের শেষ পরিণতীর কথা ভেবে থমকালো। তখনি তীব্র বেগে হুইসেল বাজিয়ে ছুটে আসা ট্রেনের দিকে তার দৃষ্টি আপতিত হলো। রোদেলার ছোট মনটায় তখন রাজ্যের সাহস ভীর করলো। মনে মনে ঠিক করে নিল এই হায়’নাদের খা’বার হওয়ার চাইতে সে নিজের জীবন দিয়ে দিবে। তবুও এই কুলাঙ্গারদের কাছে নিজের ইজ্জত দিবে।
একটা মাতাল ঠোঁটে অদ্ভুত শব্দ করে বলল,
—-” আহহারে মা’*র শক্তি শেষ বুঝি? দৌড়া আরও দৌড়া।দেখি তোর শরী’রের কত পাওয়ার। ”
মাতালটা এই কথাটা বলে জিভ লকলক করতে করতে এগোতে লাগলো রোদেলার দিয়েকে। রোদেলার বুকের ওড়নায় মাতলটা টান দিতে নিবে ঠিক সেট মুহুর্তে রোদেলা এক মুঠ ছোট ছোট পাথর হাতে তুলে সর্বশক্তি দিয়ে ছুড়ে মারলো মাতাল পিশাচের মুখ বরাবর। তারপর চোখের পলকে উঠে বসে এক দৌড়ে চলে এলো একদম রেললাইনের সামনে। বাকি মাতল,খারাপ লোক তিনটা হাত বাড়িয়ে ছোঁ মেরে ধরলার চেষ্টা করেও নাগাল পেল না রোদেলার। রোদেলাকে চলন্ত ট্রেনের সামনে দাড়িয়ে পরতে দেখে মাতাল বদমাশ লোক গুলো একে অপরের দিকে তাকাতাকি করে স্থির হয়ে দাড়িয়ে পরলো। রোদেলার চোখে তখন আগুন ঝরছে যেন। সামনে থেকে ট্রেনের তীব্র হুইসেল ভেসে আসছে। তবে সে দিকে মেয়েটার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। সেই অগ্নিস্ফুর্লিঙ্গের মতো তাকিয়ে আছে মানুষ রূপি চার পিশাচের দিকে। রোদেলা এবার চোখ বুজে মাবা- বাবা আর
ভাই -বোনদের কথা স্মরণ করলো। তারপরই সাথে চোখ খুলে তাকালো আমন্ত্রিত মৃত্যুর দিকে। যা দামামা বাজিয়ে ছুটে আসছে পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরীর দিকে। অথচ কিশোরী ভয়, ডরকে উপেক্ষা করে কি সুন্দর দাড়িয়ে আছে তা গ্রহণ করতে।
এইতো আর কয়েক সেকেন্ড এরপরই কিশোরী মুক্তি পাবে এই নিকৃষ্ট সমাজের বেড়াজাল থেকে। নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে মায়ের কাছে। রোদেলা মলিন হেসে বলল,
—– ” মা আমি আসছি তোমার কাছে। তুমি হয়তো জানো না এই পৃথিবী মেয়েদের জন্য কতটা কুলষিত। যদি জানতে তবে তুমি আর ভাইয়া আমাকে একা করে হারিয়ে যেতে পারতে না। এই দেখো আমার আর কোনো অভিমান রইলো না। আমিও আসছি। হ্যাঁ মা,তোমার রুবাইদা ছোট সোনা মেয়ে আসছে তোমার কাছে। ”
ট্রেনটা আর মাত্র দুই হাত দূরে এর পরেই ছোট রোদ সোনা চলে যাবে মায়ের কোলে,এই তো আরেকটু,মেয়েটা মুক্তি পাবে সৎ মায়ের ভরৎসনা থেকে।রোদেলার কোমল কায়ায় ধাতব ট্রেনের ধাক্কা লাগবে ঠিক সেই মুহুর্তে একটা বলিষ্ঠ হাত রোদেলাকে শূন্যে তুলে নিয়ে নিজেও এক লাফে বিপদ সংকেত পাড় হয়ে ছিটকে পরলো রেললাইন থেকে কয়ে হাত দুরে।
রোদেলা পড়ে আছে বলিষ্ঠ পুরুষের বুকের উপর।রোদেলা ট্রেনটাকে অনেকটা দূরে চলে যেতে দেখে নিজের দিকে তড়াক করে তাকালো।রোদেলা তার নিচে পড়ে থাকা মানবের দিকে দৃষ্টি পাত না করে নিজের ঘাঢ় গলা, হাত,পায়ে হাত বুলিয়ে সব চেক করতে বলল,
—- ” একি আমি মরে গেলাম অথচ টের পেলাম না যে। নাকি খোদা আমাকে ছোট বলে কষ্ট কমিয়ে দিল। হায় খোদা! তাহলে এইটা কি আমার রুহু? তাহলে আমার দেহখানা কি রেলরাইনে পড়ে রইলো। ”
রোদেলা আর ভাবতে পারল না। আশেপাশে দৃষ্টি না বুলিয়েই কেঁদে কেটে ছোট কিশোরী নিজের শরীর দেখতে ছুটলো রেললাইনে। ওইদিকে বলিষ্ঠ গোছের সুদর্শন পুরুষটা এখনো হা হয়ে তাকিয়ে রইলো পঞ্চদশীর পানে। পঞ্চদর্শীর আবেগপ্রবণ কথাগুলো শুনে বলিষ্ট সুদর্শন অবয়বের ঠোঁটের কোণা বাঁকতে দেখা গেল যেন।
মাটিতে শুয়া থেকে থেকে উঠে বসলো মেজর.আহিয়ান অভ্র। আহিয়ান ভেবেছিল মেয়েটাকে তার পাগলামীর জন্য কয়েকটা শক্ত কথা শুনাবে তার আগেই কিশোরীর মুখে পাগল মার্কা প্রলাপ শুনে আহিয়ানের ক্ষানিক্ষণের জন্য মতিভ্রম ঘটেছিল যেন।আহিয়ানের বয়স তখন ৩০বছর।বলিষ্ঠ,প্রশস্ত কাঁধ আর উচ্চতার খাতিরে তাকে দেখতে অনেকটায় ভিনদেশীর মতো লাগে। আহিয়ান এবার উঠে দাড়িয়ে নিজের নিজের ইউনিফর্ম ঝাড়তে ঝাড়তে সামনে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকে নিল।
মাতাল,খারাপ লোক গুলো এতক্ষণ আড়াল থেকে উৎপেতে সব দেখছিল। রোদেলাকে আহিয়ান বাঁচিয়েছে,এতে যেন তাদের আবার লালা ঝরছে। এতক্ষণ আহিয়ানের জন্য রোদেলার কাছাকাছি ঘেঁষতে পারছিল না তারা। রোদেলা পাগলামী করে রেললাইনের উপর ছুটে যেতেই তারা আবার রোদেলাকে চৌদিক থেকে ঘিরে ধরছে।
আহিয়ান দৃশ্যটুকু দেখেই তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক এখানে ঘটা ঘটনা গুলো সম্পর্কে আন্দাজ করে ফেলল। মাতাল দলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটা রোদেলার হাত ধরতে নিলেই হঠাৎ তার বুকে ভারী বুট জুতোর একটা লাথি আঁচড়ে পরলো। লোকটা তাল সামলাতে না পেরে রোদেলার থেকে তিন হাত দূরে গিয়ে পরলো। তা দেখে রোদেলা তড়াক করে তাকালো আহিয়ানের দিকে। টানটান উত্তেজনার মুখে রোদেলা আর আহিয়ানের দূর্বোধ্য এক দৃষ্টি বিনিময় হলো। রোদেলা তার সবটুকু ঘাঢ় উঁচিয়ে তাকালো আহিয়ানের দিকে। আহিয়ানও পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটার দিকে চোখ নিচু করে তাকালো।ঠিক সেই মুহুর্তে আরেকটা হাত থাবা বসাতে নিচ্ছিল রোদেলার হাতে।আহিয়ান তা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করেই চোয়াল শক্ত করলো। কেন যেন লোকটার হাত বাড়ানোটা মোটেও পছন্দ হলো না তার। আহিয়ান এক থাকায় লোকটার কলারটা ধরে লোকটার নাকে মুখে এলোপাথাড়ি ইচ্ছেমতো ঘুষি দিতে লাগলো। আহিয়ানকে এভাবে উন্মাদের মতো লোকটাকে মারতে দেখে রোদেলা পিটপিট করে তাকালো আহিয়ানের দিকে। মাতাল বাকি তিনটা লোক তাদের এক সদস্যকে এমন বিশালদেহী মানুষের কাছে যাচ্ছে তাই ভাবে মার খেতে দেখে আর এগোতে সাহস পাচ্ছে না। আহিয়ান লোকটাকে মারতে মারতে নাক মুখ থেতলে তারপর ছাড়লেও মুঠো করে ধরলো লোকটার হাত। আহিয়ান লোকটার হাতের দিকে কেমন কটমট করে এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো। তারপর নিজের পাশবিকতা দেখিয়ে সবটুকু আক্রশ মিটিয়ে মড়মড় করে ভেঙে দিল লোকটার হাত। এটা দেখে বাকি তিনজন মাতাল গুন্ডা গুলো পালাতে নিলে আহিয়ান তাদের কেও একই ভাবে উত্তম মধ্যম দিয়ে মুহুতেই মাটিতে মিশিয়ে দিল। রোদেলা ছোট বাচ্চাদের মতো চোখ পিটপিট করে সবটা পরখ করে গেল কেবল। রোদেলার অতৃপ্ত মন ভালো করে তৃপ্তি পেল যেন। সত্যি কথা বলতে রোদেলার এই লোক গুলোকে ঠিক এই অবস্থায় করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তবে কোথা থেকে এই মহৎ মানুষটির আবির্ভাব ঘটলো তা রোদেলার জানা নেই হয়তো। তবে এই প্রথম রোদেলা নিজের মা, ভাই আর বাবা ছাড়া অন্যকাউকে নিজেকে প্রটেস্ট করতে দেখলো। কিশোরী মনটা মুহুর্তেই জগতের পাওয়া সব দুঃখ ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো আহিয়ানের পানে।
আহিয়ান নিজের মহৎ কর্ম সমাধান করে পিচ্চি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটা তার দিকে কেমন হা করে তাকিয়ে আছে। কান্নাকাটির কারণে কিশোরীর নাক মুখে যেন আলাদা মায়া লেপ্টে আছে। মেয়েটাকে দেখতে একদিম কিউট ছোট খাটো পুতুল মনে হচ্ছে। আহিয়ানের কিশোরীর চোখের গভীরতায় চোখ পরতেই আহিয়ান দ্রুত দৃষ্টির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলো। তারপর চিরচারিত নিজের গাম্ভীর্যে ফিরে এসে বিড়বিড় করলো,
—– ” এখানের জেনারেশনটা একটু বেশিই আপডেট। বাচ্চা একটা মেয়ে হয়ে আমাকে কেমন চোখ দিয়েই গিয়ে খাচ্ছে। ওই দিকে ওর মাথায় ব্রেনের বদলে গু ভরা। গিয়েছিল এই চুনোপুটির শরীরে আত্নহত্যা করতে।ফাজলামি যতসব। ”
আহিয়ান এবার কিছুটা বিরক্ত হয়ে ধমকে বলল,
—– ” এই মেয়ে চোখ নামাও। বড়দের দিকে এভাবে তাকাতে হয়না জানো না। ”
রোদেলা থমথম খেয়ে দৃষ্টি নামিয়ে লজ্জায় এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। ছোট মস্তিষ্কটা যেন হ্যাং মেরেছে তার। রোদেল স্থান,কাল,পাত্র ভুলে কোন ঘোরে ডুবেছিল তা যেন তার নিজেরও অজানা।রোদেলা নিজের গায়ের সাদা মলিন জীর্ণ শীর্ণ ওড়না খানা গায়ে সুন্দর করে মেলে দিয়ে মাথায় ঘোমটা টানলো। আহিয়ান আড় চোখে তাকিয়ে দেখলো পিচ্চির কারবার। আহিয়ান নিজের চোখকে যথা সাধ্য সংযত রেখে দৃষ্টি ঘোরালো অন্য দিকে। এই এলাকায় আজকে কারফিউ জারি করা।এখানে একটা বড় অপরাধীর গ্যাং কে ধরতেই আহিয়ানের টিম এখানে এসেছিল।আহিয়ানের টিমের লোকজন সতর্ক ভাবে এদিক ওদিক আগে থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরলে আহিয়ান নিজেও চুপিচুপি নিজের অবস্থানে উৎপেতে ছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা ছোট মানবীকে দুর্বার সাহস নিয়ে ট্রেনের সমানে দুই হাত প্রশারিত করে আহাজারি করতে দেখে আহিয়ান দ্রুত মেয়েটাকে বাঁচাতে এসেছিল।
–
আহিয়ান আড় চোখে ছোট মেয়েটাকে আবার দেখলো তারপর বলল,
—— ” একা একা এতো রাতে,কোন ভদ্র মেয়ে বাইরে বের হয় শুনি? ”
রোদেলার মস্তিষ্ক এবার ক্ষানিক সচল হলো বোধহয়। রোদেলা সভাব সুলভ অল্পতে ঘাবড়ে যাওয়ার মতোন আহিয়ানের ধমকে কেঁপে উঠলো। তারপর হুট করেই একদম আহিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে গভীরতায় ডুব দিতে দিতে বলল,
—— ” ভালো মেয়েরা বের হয় নাকি জানি না, তবে আমি খারপ মেয়ে নই মেজর সাহেব। কপালের লিখন ছিল বলেই হয়তো এমন ঘটলো। ”
আহিয়ান মেয়েটার মুখে মেজর সাহেব সম্মোধন শুনে কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর রোদেলার দৃষ্টি লক্ষ্য করে আহিয়ান নিজের কাঁধের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
—— ” বাহ বেশ ফাস্ট। ”
আহিয়ান তারপর গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বলল,
—— ” ট্রেন আছসে পিচ্চি। আমার হাতে বেশি সময় নেই,আসো আমার সাথে। ”
রোদেলা আহিয়ানের কথায় আশেপাশের তাকিয়ে দেখলো আরেকটা ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে স্টেশনের দিকে আসছে। আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখলো আহিয়ান দ্রুত সেদিকেই কদম ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। আহিয়ান ট্রেনে উঠেই পিছনে তাকিয়ে দেখলো রোদেলা উঠতে হিমশিম খাচ্ছে। আহিয়ানের বেচারি পিচ্চির জন্য মায়া হলো বোধহয়,আহিয়ান নিজের বলিষ্ঠ হাতখানা বাড়িয়ে দিল সেই পিচ্চি কিশোরীর দিকে। রোদেলা বোকা বোকা হেসে আহিয়ানের হাত ধরে ট্রেনে উঠলো। আহিয়ান রোদেলাকে পরখ করে ঠোঁট বাঁকালো। রোদেলার কিশোরী মন অবশ্য এত কিছু ভাবছে না। তার মন এখন এক অদ্ভুত মায়ার জগতে বিচরণে ব্যস্ত। আহিয়ান রোদেলার মাথাটায় নিজের তর্জণী আঙুল ঠেকিয়ে রোদেলাকে নিজের থেকে একটু দূরে সড়িয়ে দিল। রোদেলা লজ্জায় নিজের পায়ের দিকে দৃষ্টি তাক করলো।
ট্রেনে অনেক ভীর। লোকা সমাগম বেশি থাকায় আহিয়ান আর রোদেলা বসার জায়গা তো পেলই না। একটু যে শান্তি মতো দাড়াবে সে জায়গাটুকুও নেই।আহিয়ান কর্ণারে অল্প বিস্তর জায়গা দেখে রোদেলাকে সাবধানে সেখানে দাড় করিয়ে দিল। রোদেলা চোখ পিটপিট করে আহিয়ানকে দেখলো। আহিয়ান সেসবে পাত্তা দিল না। রোদেলার দুই পাশে আহিয়ান আচমকা দুই হাত তুলে রাখলো। ট্রেনের ধাতব আবরণে আহিয়ানের বলিষ্ট হাতদ্বয়ের সাদা পৃষ্ট গিয়ে ঠেকেছে। আহিয়ান আর রোদেলা এখন মুখোমুখি দাড়িয়ে আছে। ত্রিশ বছর বয়সী আহিয়ানের মুখের আদলে আবেগের ছিটে ফোটাও লক্ষ্য করা না গেলেও, কিশোরীর পেলব মুখশ্রিতে আবেগের ছিটে ফোটাকে ক্ষাণিক জোয়ার-ভাটা খেলতে দেখা গেল।
আহিয়ান পুতুল অবয়বের কিশোরী মেয়েটার দিকে একপলক তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। আহিয়ান অবুঝ কিশোরীকে নিজের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকাতে দেখে রাগ হলেও, সেটা আপাতত সহ্য করে নিচ্ছে। কারণ আহিয়ান জানে এই ট্রেন ভ্রমণ শেষ হলে এই মেয়ে তার টিকিটিও খুঁজে পাবে না।আহিয়ান মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
—— ” বেহায়া মেয়েছেলে। যতসব। ”
আহিয়ান বিরক্ত হয়ে চোখ সরিয়ে নিতেই পিছন থেকে ধাক্কা ধাক্কির কারণে একটা লোক আহিয়ানের পিঠে আঁচড়ে পরতেই আহিয়ান রোদেলার উপর গিয়ে পরলো। রোদেলা কোমল নারী কায়ায় আহিয়ানের শক্ত পুরুষালী স্পর্শে দ্রুত নিজেকে গুটিয়ে নিল। আহিয়ানও তাড়াতাড়ি করে রোদলার উপর থেকে সরে এসে দূরত্ব বাড়িয়ে দাড়ালো। আহিয়ান নিজের অবস্থানে ফিরে গিয়ে আড় চোখে পুতুল রূপি মেয়েটার দিকে একপলক তাকালো। কিন্তু মেয়েটিকে কেমন কাচুমুচু করে নিজেকে গুটিয়ে মাথা নুইয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আহিয়ানের ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। তারপর পিচ্চির লজ্জা পাওয়ার কারণ ধরতে পেরে আহিয়ানের যেন আরও বিরক্ত লাগলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো,
—– ” আন্ডা বাচ্চাদের মনেও কত ঢং দিলা মাবুদ। ”
ত্রিশ মিনিট পর ট্রেন তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে নামতেই রোদেলা কে আহিয়ান রোদেলাকে একটা রিক্সা ডেকে তাতে তুলে দিল। আহিয়ান রোদেলাকে কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিল। রোদেলার কিশোরী মনখানা আহিয়ানের চলে যাওয়ার কথা স্মরণ করে খচখচ করে উঠলো। রোদেলা স্বভাবতো ভীষণ শান্ত আর স্বল্পভাষী মেয়ে। তবুও মেয়েটা এই পুরুষের সান্নিধ্যে এসে নিজের স্বাভাব ভুলেই আহিয়ানের চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
—-” মেজর সাহেব আপনার সাথে আমার আবার দেখা হলে আপনি আমাকে কি বলে ডাকবেন?আপনি তো আমার নামটাও জানলেন না।না আমাকে সুযোগ দিলেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার। ”
আহিয়ান মেয়েটার কথায় থমকে দাড়িয়ে পরলো। তবে কোনো উত্তর না দিয়ে,আবার নিজের পায়ের জোড় বাড়িয়ে চোখের পলকে আহিয়ান উধাও হয়ে গেল। রোদেলার তখন কি হলো কে জানে?রোদেলার কিশোরী মনটা যেন অদৃশ্য এক ব্যথায় ছেয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল এটাই বুঝি মেজর সাহেবের সাথে তার শেষ দেখা। রোদেলা অবুঝের মতো কেঁদে ভাসাতে লাগলো রিকশায় বসেই।সেদিন আহিয়ানের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই পিচ্চি রোদেলার মনটা তার মেজর সাহেবের সুরে অনুরাগিনী হয়ে উঠেছিল। ছোট মৈয়েটার বুকে চেপে বসেছিল পাওয়া না পাওয়ার হাজারটা দন্ড।কিশোরী বয়সেই নিজের অজান্তেই মন দিয়ে বসেছিল নিজের থেকে দ্বিগুণ বয়সী এক পাষাণ পুরুষকে।
তারপর কিভাবে কিভাবে যেন দুই বছর পর আল্লাহ তায়ালা রোদেলর জীবনে আবার এই শক্ত মানবকে এনে দিলেন।এরপর আর পথিক সাহায্যকারী হিসাবে নয় একদম নিজের হালাল পুরুষ রূপে।
_______________
বর্তমান:
রোদেলা বাড়ির বাইরে পা রাখবে ভেবেও পা রাখতে পারেনি।রামিশার কটু কথা গুলো স্মরণ করে মেয়েটার কষ্ট লাগছে। তাই এতোক্ষণ বাড়ির বাগানের দিকে এসে একটা আম গাছের নিচে বসে কান্না কাটি করছিল।তখনি আর অবচেতন মন বিচরণ করেছিল পূর্বের মধুর এবং তিক্ততা মাখা স্মৃতি গুলোতে।
রোদেলা তার সাদা ওড়নায় চোখের পানি মুছলো। কিন্তু চোখের পানিটুকু মুছতে না মুছতেই চোখ দুইটা ছাপিয়ে আবার টুপটুপ করে পানি পড়তে লাগলো। রোদেলা সেগুলো আর মোছার চেষ্টা করলো না। বরং আগের তুলনায় বেশি হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—– ” আমি জানতাম মেজর সাহেব আপনি আমাকে মনে রাখবেন না। ঠিক তাই হয়েছে। একদিন যেই পিচ্চি মেয়ের প্রাণ বাঁচিয়ে, পিচ্চি মেয়েটার বুকে ভালোবাসার অঙ্কুর বপন করে দিয়ে এসেছিলেন,আপনি তাকে মনে রাখেন নি। আপনি ভুলে গিয়েছেন সেই পিচ্চির কথা। কিন্তু আমি কেন ভুলতে পারলাম না মেজর সাহেব? আমার মনটাকে নিজের সুরে অনুরাগিনী বানিয়ে,আপনি ঠিকই পাষাণ পুরুষ সেজে রইলেন। আপনি ভীষণ কঠিন। ”
রোদেলার চোখ দিয়ে টপটপ করে বড় বড় ফোটায় পানি গড়িয়ে পরতে লাগলো।রোদেলা কাঁদতে কাঁদতেই কাঁপা কন্ঠে গেয়ে উঠলো-
ওরা মনের গোপন চেনেনা,
ওরা হৃদয়ের রং জানেনা।
প্রজাপতি ডানা ছুঁলো, বিবাহ বাসরে
কেন সারারাত জেগে বাড়ি ফিরি ভোরে।
রোদেলা আম গাছে মাথা এলিয়ে দিয় উদাস কন্ঠে সুরটা আরও করুন করে গায়তে লাগলো,
তুমি চিরদিন ভীষণ কঠিন।
তোমার ঘর ভেসে যায়,
ওরা মুখ দেখে বুঝতে পারেনা।
ওরা এ মন কেমন বোঝেনা,
ওরা আসল কারন খোঁজেনা।
রোদেলার চোখে দুই বছর আগের আহিয়ানের চলে আসার দৃশ্য টুকু ভেসে উঠথেই। রমণী আবার গলায় সুর টেনে গায়লো,
তুমি চিরকাল স্বপ্নে মাতাল,
হেঁটে সারাজীবন ধরে,
ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে।
রোদেলা চোখে বিয়ের দিন আহিয়ানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটূকু ভেসে উঠলো। রমণী চোখ বুজতেই অশ্রু গুলো চোখের পাতা ছাপিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।রোদেলা ফাঁকা ঢোক গিলে,আবার গলায় সুর টেনে গাইতে শুরু করলো,
ওরা মনের গোপন চেনেনা,
ওরা হৃদয়ের রং জানেনা।
প্রজাপতি ডানা ছুঁলো, বিবাহ বাসরে
কেন সারারাত জেগে বাড়ি ফিরি ভোরে।
চলবে…..
( সবাই রেসপন্স করবেন। একদিনও আপনারা টার্গেট পূরন করেন না। ভিউ অনুযায়ী একশ ভাগের এক ভাগও যদি রিয়েক্ট আসতো, তাও তো মনটাকে বুঝ দিতে পারতাম।কিন্তু আপনাদের তো আবার রিয়েক্ট,কমেন্ট করতে লজ্জা লাগে, তাই চুপি পড়ে কেটে পরতে পারলেই বাঁচেন। 2 k টার্গেট দিয়ে রাখালাম। অনেক বড় পর্ব দিয়েছি। আজকে কম রেসপন্স দেখলে বহুত দুঃখ পাবো। পরে দুঃখের ঠেলায় গল্প আসতে দুই তিন দেরিও হতে পারে।)

