#অভিমাননামা
#md_shifu /৭ম পর্ব
গত এক সপ্তাহ ধরে সায়মা ছুটিতে ছিল। তাই এই সময়ের মধ্যে অফিসে নতুন কে যোগ দিয়েছে, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না।
গাড়ি থেকে ফাইল নিয়ে দ্রুত সিইওর রুমে গিয়ে ফাইলটা জমা দিল সে। বের হয়ে নিজের কক্ষের দিকে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল।
সকালে লিফটের সামনে যার সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল, সেই ছেলেটাই একটি ডেস্কে বসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে।
এক ঝলক তাকিয়েই সায়মা আবার নিজের পথে হাঁটল। তবে অদ্ভুতভাবে ছেলেটার মুখটা তার মাথা থেকে সরল না। নিজের নির্ধারিত কক্ষে গিয়ে চেয়ারে বসতেই কাঁচের দেয়াল দিয়ে ছেলেটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে একমনে কম্পিউটারে কাজ করছে, যেন চারপাশের কোনো কিছুর প্রতিই তার খেয়াল নেই।
সায়মার দৃষ্টি বারবার সেদিকেই চলে যাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত কৌতূহল সামলাতে না পেরে পাশের এক সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করল
” ওই যে নতুন ছেলেটা বসে আছে, ওর নাম কী?”
সহকর্মী একবার তাকিয়ে বলল
“ও? ওর নাম জাবেদ। প্রায় এক সপ্তাহ হলো অফিসে জয়েন করেছে।”
সায়মা ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল
” ও আচ্ছা।”
এর বেশি কিছু বলল না। কিন্তু মনে মনে নামটা কয়েকবার উচ্চারণ করল। জাবেদ। নামটার সঙ্গে মুখটাও যেন একসঙ্গে গেঁথে গেল তার মনে।
…………………………
এই যে, মিস্টার! শুনছেন?
সন্ধ্যা সাতটা।
অফিসের কাজ শেষ করে জাবেদ ভবন থেকে বের হলো। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রিকশার অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে একজনের ডাক ভেসে এলো।
” এই যে, মিস্টার! শুনছেন?”
জাবেদ পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল, একটি মেয়ে তার দিকেই তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নিজেকেই ডাকা হয়েছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল
” জি, আমাকে ডাকছিলেন?”
মেয়েটি ভ্রু নাচিয়ে হালকা হেসে বলল
“এখানে আপনি ছাড়া আর কেউ আছেন নাকি? তাহলে ধরে নিন, আপনাকেই ডাকছি।”
জাবেদ মেয়েটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেও চিনতে পারল না। তাই বলল
” দুঃখিত, মনে হয় আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। আপনি কি আমাকে চেনেন? নাকি কোনো দরকার ছিল?”
সায়মা মুচকি হেসে বলল
” দরকার ছাড়া কি কাউকে ডাকা যায় না? আর না চিনলে কি কথা বলা যায় না”
একটু থেমে আবার বলল
“মানুষ তো প্রথমে অপরিচিতই থাকে। তারপর পরিচয় হয়, কথা হয়, একসময় চেনাজানা হয়ে যায়। তাই না?”
সায়মার কথা শুনে জাবেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল
“তা ঠিকই বলেছেন। তবে আমি… মেয়েদের সঙ্গে একটু কম কথা বলি। ডোন্ট মাইন্ড।”
কথাটা বলেই সে আর দাঁড়াল না। ঠিক তখনই সামনে একটা রিকশা এল। কিন্তু রিকশায় না উঠে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল।
সায়মা অবাক হয়ে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত আগেও তার মুখে যে আত্মবিশ্বাসী হাসি ছিল, সেটা এখন বিস্ময়ে বদলে গেছে।
মনে মনে বলল
“বাহ! আমার মতো একটা মেয়ে নিজে থেকে কথা বলতে এসেছে, আর আপনি আমাকে এড়িয়ে চলে গেলেন?”
ঠোঁটের কোণে আবারও হাসি ফুটে উঠল তার।
“আপনি তো বেশ ইন্টারেস্টিং, মিস্টার জাবেদ।”
“দেখি, আর কতদিন আমাকে এড়িয়ে চলতে পারেন।”
…………………………
জাবেদ রিকশা থেকে নেমে বাড়ির ছোট গেটটা খুলল। সারাদিনের কাজের ক্লান্তি শরীরজুড়ে ভর করলেও সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল।
সামনেই দাঁড়িয়ে তায়েবা।
এক নিমিষেই যেন দিনের সব ক্লান্তি উড়ে গেল।
অজান্তেই মনে মনে বলে উঠল
” কি মায়াবী তোমার মুখ,
দেখলেই মনে জাগে সুখ।
আহা, কী যে করি,
কেমনে তোমায় আপন করি?”
জাবেদ এই সময়টায় বাসায় থাকে না বলেই তায়েবা প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার দিকে ছাদে যায়। আজ নামতে একটু দেরি হয়ে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে গিয়েই জাবেদের মুখোমুখি হলো সে।
জাবেদ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তায়েবা হালকা হেসে বলল
“জাবেদ ভাই, অফিস শেষ?”
জাবেদ যেন অন্য জগৎ থেকে ফিরে এলো।
” হুম।”
“সারাদিন কাজ করে এসেছেন। যান, ওপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নিন। আমি কাউকে দিয়ে নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
কথা শেষ করেই তায়েবা পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে যেতে চাইল।
ঠিক তখনই জাবেদ ডেকে উঠল
” তায়েবা…”
তায়েবা থেমে পেছন ফিরে তাকাতেই জাবেদ এক ধাপ এগিয়ে এলো। দুজনের মাঝের দূরত্বটা মুহূর্তেই কমে গেল। নিচু স্বরে সে বলল
” এমন যত্ন নিচ্ছ কেন, মেয়ে? আমি কি তোমার খুব প্রিয় কেউ?”
কথাটা শুনে তায়েবা যেন একেবারে স্থির হয়ে গেল।
জাবেদ এতটা কাছে দাঁড়িয়ে যে তার উষ্ণ নিঃশ্বাসও স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল সে।
লজ্জায় তায়েবার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে উঠল।
সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে যেন কোনো শব্দই বের হলো না। মনে হচ্ছিল, সব কথা কোথায় যেন আটকে গেছে। কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ নিজেকে সামলে নিল। কিছু না বলেই দ্রুত জাবেদকে পাশ কাটিয়ে বাকি সিঁড়িগুলো প্রায় দৌড়ে উঠে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
আর জাবেদ?
সে দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই।
তায়েবার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
…………………….
আজ চাঁদ আর তায়েবা পড়তে যায়নি। চাঁদের নাকি ভালো লাগতেছে না। তাই তায়েবাও যায়নি।একা একটা মেয়ে একটা প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলের কাছে পড়তে যাবে এটা খারাপ দেখায় তাই তায়েবা কেও যেতে মানা করে দেই। চাঁদ যাই নাই মূলত সকালের মন খারাপের জন্য। আংশিক অভিমান হয়েছে সাজেদর উপর। চাঁদ জানে এই অভিমান অহেতুক। এর কোনো মানে নেই। তবুও মনতো মানে না। মন কারণে অকারণে খারাপ হয়,অভিমান হয়। চাঁদের ইচ্ছে করে সাজেদের নামে এক গাধা অভিমাননামা পাঠাতে। তাতে সাজেদের কিছু যায় আসবে না তাও পাঠাতে ইচ্ছে করে। কিহ জানি একদিন একগাদা অভিমান লিখে হারিয়ে যাবে কোথাও। আজকাল খুব ভয় করে চাঁদের। সাজেদ কে হারানোর ভয়। সঙ্গা জাগে সাজেদের চাঁদ বিবি হতে পারবে কিনা। এসব ভাবনার মাঝে ডাক পড়ে ভাত খেতে যাওয়ার। ইচ্ছে না হওয়া স্বত্বে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসে।
চাঁদ ডাইনিং টেবিলে গিয়ে দেখে ডাইনিং টেবিলে শুধু সাইফ বসে আছে। মনে প্রশ্ন জাগে সাজেদ ভাই কি খেতে আসে নাই। অবচেতন মন একবার দেখতে চাই সাজেদ কে। কিছু মূহুর্ত পর মন কে বুঝ দিয়ে খাবার বেড়ে নেই।
সাইফ খেয়াল করছে কোনো কিছু নিয়ে চাঁদের মন খারাপ। জিজ্ঞেস করবে না করে করেও জিজ্ঞেস করে ফেলে
” কিরে বিবি মন খারাপ।কেউ কিছু বলেছে নাকি শরীর খারাপ।”
” আপনাকে না অনেকবার বলেছি বিবি বলবে না। কেমন জানি লাগে শুনতে।”
সাইফের কথায় চাঁদ এমন প্রতিক্রিয়া করলে কোহিনূর চেতে যায়। ঝাঁজালো সুরে বলে
” চাঁদ, বড় দের সাথে এইভাবে কথা বলতে হয় নাকি। তুকে আদর করে নাম টা ডাকে আর তুই মেজাজ দেখাচ্ছস কেনো?
মায়ের এমন ঝাঁজালো সুরে কথা শুনে চাঁদেরও মাথা গরম হয়ে যায়। কিছু বলতে গেলে সাইফের কথায় থেমে যায়।
” চাচি আম্মু চাঁদের হয়তো মন খারাপ তাই হয়তো এমন ভিহেব করে ফেলছে। তুমি কাজ করো আমি কিছু মনে করি নাই।”
সাইফের এমন নরম ব্যবহারে চাঁদের গিল্টি ফিল হলেও কোনো অনুসূচনা না করে ছোট করে জবাব দেই
” সাইফ ভাই, আপনি খেয়ে নিন৷ আমার কিছু হয় নাই। এমনি একটু মন খারাপ। আর কিছু না।” বলেই ভাত খেতে থাকে।
চাঁদের ভাত খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। ঠিক তখনই ডাইনিং রুমে ঢুকল তায়েবা। তার কিছুক্ষণ পরেই এসে টেবিলে বসল সাজেদ।
সাজেদকে দেখামাত্রই চাঁদের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মনটা অভিমানে ভার হয়ে ছিল, সেটাই যেন হঠাৎ হালকা হয়ে গেল। সাজেদকে একবার দেখার পর তার সব অভিমান, সব কষ্ট যেন কোথায় মিলিয়ে গেল।
“এমন কেন হয়?” মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।
“যার ওপর অভিমান করি, তাকেই দেখলেই সব অভিমান গলে যায় কেন?”
সাজেদ নিজের মতো চেয়ার টেনে বসে নাস্তা নিতে ব্যস্ত। সেই সুযোগে চাঁদ আড়চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকে দেখল। এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন কেউ বুঝতে না পারে।
তার মনে হলো, মানুষটাকে শুধু দেখেই যদি এতটা শান্তি পাওয়া যায়, তাহলে তাকে নিজের করে পাওয়ার অনুভূতিটা কেমন হবে?
অন্যদিকে তায়েবার অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো।
সন্ধ্যায় সিঁড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বারবার তার মনে পড়ছে। সাজেদের সামনে বসতেই অকারণে অস্বস্তি হতে লাগল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছে। লজ্জায় সে একবারও মাথা তুলে সাজেদের দিকে তাকাতে পারল না।
আর তায়েবার এই অস্বস্তিটা সাজেদের চোখ এড়াল না। মেয়েটার লাজুক মুখ দেখে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তবে পরক্ষণেই সে হাসিটা গিলে ফেলল।
এমনভাবে নিজের মুখটা স্বাভাবিক করে নিল, যেন কিছুই হয়নি।
চলবে…….
[ ভুল ত্রুটি হলে ধরাই দিয়েন। সামনে পোস্ট গেলে রেসপন্স করিয়েন। ধন্যবাদ ]

