অভিমাননামা #md_shifu / ৯ পর্ব

0
1

#অভিমাননামা
#md_shifu / ৯ পর্ব

আজ শুক্রবার। সাজেদের ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে। সপ্তাহের এই একটি দিনই যেন চাকরিজীবীদের জন্য ছোট্ট এক ঈদ। টানা ছয় দিনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর দায়িত্বের পর শুক্রবারটাই একমাত্র দিন, যেদিন শরীর-মন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়।

ঘুম ভাঙার পরও অনেকক্ষণ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করল সে। কোনো তাড়া নেই, অফিস নেই তাই অলসতাকেও আজ একটু প্রশ্রয় দিল। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সকালের আলোও আজ তাকে বিছানা ছাড়াতে পারছিল না।

শেষমেশ নিজেকে জোর করেই বিছানা ছাড়ল সাজেদ। ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল নাস্তা করার জন্য।

চাইলেই নাস্তা তার ঘরেই পাঠিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু সে ইচ্ছে করেই নিচে নামে। কারণ একটাই— নাস্তার টেবিলে হয়তো একবার তায়েবাকে দেখা যাবে।

ডাইনিং রুমের দরজার সামনে এসে হালকা টোকা দিতেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিল তায়েবা।

দরজা খোলার মুহূর্তেই যেন সময়টা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। টোকা দেওয়ার জন্য তোলা সাজেদের হাত মাঝ আকাশেই স্থির হয়ে রইল। চোখ দুটো আটকে গেল তায়েবার মুখে।
ঘুম থেকে সদ্য ওঠা এলোমেলো চুল, মুখে একফোঁটা সাজও নেই। তবুও কী অপূর্ব লাগছে মেয়েটাকে!
জাবেদ যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনটাও অকারণেই একটু দ্রুত হয়ে উঠল। মুগ্ধ দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়েই রইল। মনে মনে বলল,
“অগোছালো অবস্থাতেও কেউ এতটা সুন্দর হতে পারে!”
এই প্রথম তায়েবাকে এমন এলোমেলো, একদম স্বাভাবিক রূপে দেখলো সে। অথচ সেই অগোছালো রূপটাই যেন তার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়ে ধরা দিল।

অন্যদিকে তায়েবা ঘুম থেকে উঠেই, ফ্রেশ হওয়ার আগেই রুম থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। তার মনে হলো, নিশ্চয়ই আব্বু ফিরেছেন। প্রতি শুক্রবার ভোরে হাঁটতে বের হওয়া তার বাবার বহুদিনের পুরোনো অভ্যাস। তাই আর কিছু না ভেবেই দরজা খুলে দিল।

কিন্তু দরজা খুলতেই সে যেন থমকে গেল। মুহূর্তের জন্য শরীরটা যেন অবশ হয়ে গেল। কী করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সাজেদ। আর সাজেদ এমন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে যে, তায়েবার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। লজ্জায় মুহূর্তেই তার চোখ নিচু হয়ে গেল। মুখের দুপাশ ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে উঠল। মনে মনে নিজেকেই বকা দিল
“ইশ! যদি জানতাম দরজার ওপাশে সাজেদ ভাই দাঁড়িয়ে আছেন, তাহলে এই এলোমেলো চুলে, ফ্রেশ না হয়েই কখনো দরজা খুলতে আসতাম না!”
ঘুম থেকে সদ্য ওঠা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। মুখে পানির ছোঁয়াও লাগেনি। নিজেকে হঠাৎ করেই ভীষণ অগোছালো আর অপ্রস্তুত মনে হতে লাগল তার। মনে হচ্ছিল, লজ্জায় যেনো মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারলেই বাঁচে। সেই লজ্জায় আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।
চোখ তুলে আর একবারও সাজেদের দিকে তাকানোর সাহস হলো না তার। প্রায় দৌড়েই নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল।
………………………….

ডাইনিং টেবিলে এখন প্রায় সবাই বসে আছে। শুধু একজনের চেয়ারটাই খালি—চাঁদের বাবার।
গত কয়েক বছর ধরে তিনি বিদেশে আছেন। সেখানে তার একটি ব্যবসা আছে, সেটাই সামলাচ্ছেন। আগে বছরে দুই-তিনবার দেশে আসতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ব্যবসায় নানা জটিলতা চলায় আর দেশে ফেরা হয়ে ওঠেনি।
তাই পরিবারের সবাই যেন ধীরে ধীরে তার অনুপস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখেছে। তবুও ডাইনিং টেবিলের সেই খালি চেয়ারটা মাঝে মাঝে তার অভাবটা নীরবে মনে করিয়ে দেয়।
সকালের নাস্তার টেবিলে সবাই উপস্থিত। তবু কারও মুখে তেমন কোনো কথা নেই। চারপাশে পিনপতন নীরবতা।
শেষ পর্যন্ত সেই নীরবতা ভাঙল সাইফ।
হাতে থাকা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সাজেদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সাজেদ, আজ তো সবাই ফ্রি। চল না, সবাই মিলে কোথাও ঘুরে আসি।”

সাজেদকে প্রস্তাবটা দিতেই চাঁদের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
সেই হাসিটা অবশ্য সাইফের চোখ এড়াল না। আসলে এই হাসিটাই দেখার জন্যই তো এত আয়োজন। শুধু চাঁদকে একা ঘুরতে যাওয়ার কথা বললে সে কখনোই রাজি হতো না। তাছাড়া শুধু তাকে নিয়ে বের হলে দেখতেও ভালো লাগত না। তাই সবার আগে সাজেদকেই প্রস্তাবটা দিল।
আরেকটা কারণও আছে। সাজেদ এই বাড়িতে আসার পর থেকে এখনো কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। অফিসের ব্যস্ততা আর নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই সময় কেটে গেছে।

আর চাঁদ যে ঘুরতে ভীষণ ভালোবাসে, সেটা সাইফ খুব ভালো করেই জানে। আগে তায়েবা মাঝেমধ্যেই তাকে নিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে আসত। কিন্তু সাইফ ব্যবসায় যোগ দেওয়ার পর ব্যস্ততা এতটাই বেড়ে গেছে যে, অনেকদিন ধরেই আর কোথাও যাওয়া হয়নি।

নাস্তা করতে করতে সাজেদ একবার সাইফের দিকে তাকাল। তারপর আড়চোখে তাকাল তায়েবার দিকে। কয়েক সেকেন্ড যেন মনে মনে কিছু হিসাব কষল।
শেষমেশ শান্ত গলায় বলল,
“তা অবশ্যই যাওয়া যায়। তবে বিকেলে গেলে ভালো হয়। আজ তো জুমার দিন। সকালে বের হওয়া ঠিক হবে না।”
সাইফ হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“আমিও সেটাই ভাবছিলাম। বিকেলেই বের হব।”

এরপর তায়েবা আর চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে তোরা দুজন বিকেলের আগেই তৈরি হয়ে থাকিস।”

কথাটা শুনে চাঁদের ঠোঁটের কোণে আবারও মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল।

সেই হাসিটা দেখে সাইফের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো।

মনে মনে বলল,
“তোর এই হাসিটার জন্য আমি অনেক কিছুই করতে পারি, চাঁদ।”
চাঁদ আর তায়েবা দুজনেই একসঙ্গে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল
“ওকে!”

এরপরই দুজনে নিজেদের মধ্যেই গল্পে মেতে উঠল। পাশাপাশি বসে দুজনের কথার যেনো আর শেষই হচ্ছিল না। গল্পের বিষয়ও একটাই— বিকেলে কোথায় যাবে, কে কী পোশাক পরবে, কীভাবে সাজবে, কোন রঙটা বেশি মানাবে।

তাদের প্রাণচঞ্চল কথাবার্তা শুনে বড়রাও মুচকি হাসছিলেন। কেউ কিছু বললেন না। তাদের সেই নীরব হাসিই যেন বলে দিচ্ছিল, এই ছোট্ট ঘুরতে যাওয়ায় কারও কোনো আপত্তি নেই। বরং অনেক দিন পর বাড়ির সবার মুখে এমন উচ্ছ্বাস দেখে তারাও ভেতরে ভেতরে খুশি হয়েছেন।

……………………..

বিকেল চারটা।
সাজেদ আর সাইফ অনেক আগেই তৈরি হয়ে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। অপেক্ষা শুধু চাঁদ আর তায়েবার। পাঁচ মিনিট… দশ মিনিট…
অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। সাইফ বিরক্ত মুখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“মেয়েদের তৈরি হতে যে এত সময় লাগে, এটা আজও বুঝলাম না!”

সাজেদ হালকা হেসে কিছু বলল না। সেও অপেক্ষা করছে। আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দুজনেই ঠিক করল, এবার ভেতরে গিয়ে ডেকে আনবে।
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে পাশাপাশি বেরিয়ে এলো চাঁদ আর তায়েবা। দুজনকে একসঙ্গে দেখেই সাইফ আর সাজেদ কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল।
চাঁদ আজ হালকা আকাশি রঙের থ্রি-পিস পরে এসেছে। মুখে খুবই হালকা সাজ। আর সেই স্বাভাবিক সাজেই তাকে ভীষণ প্রাণবন্ত লাগছে। অন্যদিকে তায়েবা পরে এসেছে গাঢ় নীল রঙের একটি থ্রি-পিস। খোলা চুলগুলো বাতাসে আলতো দুলছে। মুখে একটুকরো শান্ত হাসি।

সাজেদের চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও তায়েবার ওপর আটকে গেল। আর সাইফের দৃষ্টি থেমে রইল চাঁদের মুখে। দুজনই মুহূর্তের মধ্যেই নিজেদের সামলে নিল। কারও চোখেই যেন তাদের মুগ্ধতা ধরা না পড়ে— এই সংকোচে সাজেদ দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল। সাইফও কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। ঘুরতে যাওয়ার আগে কারও অস্বস্তির কারণ হতে চাইল না সে।

বাড়িতে গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সবাই মিলে ঠিক করল আজ রিকশাতেই যাবে। পুরান ঢাকার রাস্তাগুলো রিকশায় ঘুরে দেখার আলাদা একটা আনন্দ আছে। দুটি রিকশা ডাকা হলো। একটিতে উঠল চাঁদ আর তায়েবা। অন্যটিতে সাজেদ আর সাইফ।

ধীরে ধীরে রিকশা দুটো এগিয়ে চলল তাদের গন্তব্যের লালবাগ কেল্লা দিকে। বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে নয় বলেই আজকের ভ্রমণের জন্য এই জায়গাটিই বেছে নেওয়া হয়েছে।

পুরান ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে, বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত লালবাগ কেল্লা বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা। কেল্লা আওরঙ্গবাদ নামেও পরিচিত এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১৬৭৮ সালে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম শাহের উদ্যোগে। পরে সুবাদার শায়েস্তা খাঁ নির্মাণকাজ এগিয়ে নিলেও নানা কারণে দুর্গটি আর কখনো সম্পূর্ণ করা হয়নি।

রিকশার চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে চারজনের মনেও যেন শুরু হলো নতুন এক বিকেলের গল্প।
………………………..

রিকশা থামল লালবাগ কেল্লা প্রবেশপথের সামনে। রিকশা থামার পর তারা দেখতে পেলো লালবাগ কেল্লার বিশাল লালচে প্রবেশদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য দর্শনার্থী। কেউ টিকিট কাটতে ব্যস্ত, আবার কেউ স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে ছবি তুলতে।সাইফ ভাড়া দেওয়ার পর দেখে তার কাজিন সাজেদ টিকিট কাটতে গেছে।

চাঁদ আর তায়েবা ভাবলো গেইটে দাড়িয়ে দু একটা ছবি তুললে ভালো হয়। তাই তায়েবা সাইফকে বলে,
” ভাইয়া, আমাদের দু একটা ছবি তুলে দে?” সাইফ একপলক চাঁদের মুখের দিকে তাকায়। তখনই চোখে পড়ে চাঁদ খুব উৎপল্ল মন নিয়ে তাকিয়ে আছে৷ চাঁদের চোখের উচ্ছ্বাস দেখে ‘না’ শব্দটা আর মুখে আনতে পারল না সাইফ। বলে,

” গিয়ে দাড়া, আমি তুলে দিচ্ছি।” দুজনেই খুশি মনে গেইটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, নানারকম পোজে। আর সাইফ কোনো বিরক্ত ছাড়াই ছবি তুলতে থাকে। চাঁদের হাসিমাখা মুখটা দেখেই অজান্তে সাইফের ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে ওঠে। মনে হয়, চাঁদের এই সামান্য আনন্দটাই যেন তার নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

সাইফ খুব ধৈর্যশীল ব্যাক্তি। প্রিয়শীর ক্ষেত্রে তো আরো বেশি। এই যে চাঁদ কত খুশি সামান্য ছবি তুলতে পেরে। এতেই যেনো সাইফের বিশাল প্রাপ্তি। চাঁদের এই হাসি সাইফের হৃদয়ের অন্তর্স্তলে যেনো এক ভালো লাগা চেয়ে যাচ্ছে।

সাজেদ টিকিট নিয়ে ফিরে আসতেই সবাই গেট পেরিয়ে কেল্লার ভেতরে প্রবেশ করল। কোলাহলময় পুরান ঢাকার মাঝেও লালবাগ কেল্লার ভেতরে পা রাখতেই যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব হলো। বাইরের ব্যস্ততা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। চারজনের চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ল বিস্ময় আর মুগ্ধতা। তারা ধীর পায়ে চারপাশ দেখতে দেখতে এগিয়ে চলল। দুপাশে পরিচর্যায় থাকা সবুজ ঘাসের কার্পেট, সারিবদ্ধ ফুলগাছ আর ছায়া ছড়ানো পুরোনো বৃক্ষ পুরো পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে। মাঝ বরাবর লাল ইট বিছানো প্রশস্ত পথটি সোজা চলে গেছে কেল্লার মূল অংশের দিকে। সেই পথ ধরেই হাঁটতে লাগল তারা। মাঝে মাঝেই চাঁদ আর তায়েবা থেমে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলছে, কখনো নিজেদের, কখনো আবার চারপাশের মনোরম দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছে। সাইফও ধৈর্য নিয়ে তাদের সেই মুহূর্তগুলো ধরে রাখছে। আরও কিছুদূর এগোতেই পথের দুই পাশে ছোট ছোট জলাধার আর ফোয়ারাগুলো চোখে পড়ল। যদিও সেদিন ফোয়ারাগুলো সচল ছিল না, তবু তাদের উপস্থিতি মুঘল উদ্যানের ঐতিহ্য যেন এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে। সেখানে দাঁড়িয়েও কয়েকটি ছবি তুলে নিল তারা। চারপাশে অসংখ্য দর্শনার্থীর পদচারণায় কেল্লা মুখর হয়ে উঠেছে। কেউ পরিবারের সঙ্গে ধীর পায়ে হাঁটছে, কেউ বন্ধুদের নিয়ে গল্পে মশগুল, আবার কেউ মোবাইল কিংবা ক্যামেরায় ইতিহাসের এই নিদর্শনকে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে ব্যস্ত। সাজেদদের দলও তার ব্যতিক্রম নয়।
হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে পৌঁছাল পরী বিবির সমাধির সামনে। সাদা মার্বেল ও কালচে পাথরের কারুকাজে নির্মিত সমাধিটি নীরবে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা দূরে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি তার সরল অথচ রাজকীয় স্থাপত্যে দৃষ্টি কাড়ে। আরেক পাশে দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মামখানার ভবন মুঘল শাসকদের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নীরব স্মৃতি বহন করে চলেছে। সবকিছুই সাজেদ গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছিল। তার চোখে যেন প্রতিটি ইট, প্রতিটি কারুকাজ নতুন এক ইতিহাসের দরজা খুলে দিচ্ছিল। দলের অন্যরা আগেও কয়েকবার এখানে এসেছে, তাই তাদের কাছে দৃশ্যগুলো পরিচিত। কিন্তু সাজেদের জন্য এ ছিল প্রথমবার। সেই কারণেই তার বিস্ময়, কৌতূহল আর মুগ্ধতা অন্য সবার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। লালবাগ কেল্লার প্রতিটি স্থাপনা সাজেদকে মুগ্ধ করে ঠিকই, তবে তার চেয়েও বেশি মুগ্ধ করে তায়েবার হাসিখুশি মুখ। ইতিহাসের সৌন্দর্যের চেয়েও যেন তায়েবার চোখের উচ্ছ্বাস আর ঠোঁটের হাসিটাই বারবার তার দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
সাজেদের সেই মুগ্ধ দৃষ্টি চাঁদেরও চোখ এড়ায় না। সাজেদকে এতটা আনন্দে দেখতে পেরে তার মনেও একরাশ ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ে।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় চাঁদ আর সাইফ একটু সামনে এগিয়ে যায়। সুযোগ পেয়ে সাজেদ ধীরে ধীরে তায়েবার পাশে এসে নিচু গলায় বলে,
“তোমাকে আজ অপূর্ব লাগছে।”
কথাটা শুনেই তায়েবার হাঁটতে থাকা পা যেন থেমে যায়। সে বিস্মিত চোখে একবার সাজেদের দিকে তাকায়। মুহূর্তের জন্য যেন ভাষাই হারিয়ে ফেলে। হাতের আঙুলগুলো অজান্তেই ওড়নার কোণা মুঠো করে ধরে। লাজে তার গাল দুটো ধীরে ধীরে রাঙা হয়ে ওঠে। হৃদস্পন্দন অকারণেই দ্রুত হয়ে যায়, যেন সে নিজেই নিজের হৃদয়ের শব্দ শুনতে পায়। কিছু বলার সাহস আর হয় না। শুধু ঠোঁটের কোণে লাজুক একটুখানি হাসি ফুটিয়ে দ্রুত পায়ে চাঁদ আর সাইফের দিকে এগিয়ে যায়।
সাজেদ স্থির হয়ে কয়েক মুহূর্ত তার চলে যাওয়া দেখতেই থাকে। তায়েবার সেই লাজুক হাসিটা যেন এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।

চলবে………
[ কেউ কপি করিয়েননা। ভুল ত্রুটি থাকলে ধরাই দিয়েন। পোস্ট সামনে গেলে রেসপন্স করিয়েন। ধন্যবাদ ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here