আযানকথন’ মেঘের মুলুকে চল

0
2

‘আযানকথন’
মেঘের মুলুকে চল
_________________________

আরমিন কে আমি প্রথমবার দেখি ওর বিয়েতে। যেটা অবশ্য পরে আমাদের বিয়ে হয়েছে। প্রথম দেখায় ভাললাগা এমন বিশেষ কোনো অনুভূতি ই ওর সাথে আমার হয় নি৷ বড় ভাইয়ের হবু বউয়ের সাথে সেসব হবার প্রশ্নও উঠে না৷ তবে স্ক্যান্ডাল টা লোকেমুখে হবার পর প্রথমবার আমি বিশেষ কোনো অনুভূতি নিয়ে আরমিন কে দেখেছিলাম একপলক। মেয়েটার গোলগাল আদুরে চেহারার বড় বড় চোখ দুটো জলে টইটম্বুর তখন! আমার কি যে হলো! মনে হলো মেয়েটার দুঃখে তার চেয়ে বেশি কাতর আমি। তবে সেই বিশেষ অনুভূতি অবশ্যই ভালবাসা না৷ তাহলে সেটাকে কি নাম দেয়া যায়? সহানুভূতি কিংবা করুণা? হয়ত সেটাই। সদ্য বিয়ে ভাঙা একটা মেয়ের প্রতি করুণা জন্মাবে, তার প্রতি সহানুভূতি আসবে এটাই ত স্বাভাবিক। সেটা বাদে আর কি!

আমাদের গল্পটা ফিল্ম টাইপের হলে আর আমি নায়কদের মতন কেউ হলে নিশ্চয় তাকে অমন অসম্মানের হাত থেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠতাম৷ তবে না আমাদের জীবন টা ফিল্ম আর না আমি নায়ক। আমি নিতান্তই কাটখোট্টা বদমেজাজি অন্তর্মুখী স্বভাবের একজন পুরুষমানুষ যার কাছে মানবীয় আবেগ তেমন প্রাধান্য পায় না৷ সেই ভাবনায় করুণা কিংবা সহানুভূতি হলেও আবেগের ততটা বাড়াবাড়ি ছিল না যে আমি যেচে পড়ে তাকে বিয়ে করতাম। আমাদের বিয়েটা হয়েছিল পরিস্থিতির শিকার হয়ে।

কিভাবে জানি খুউব অল্পবয়সে আমি ধরে ফেলেছি পৃথিবী টা খুউব নিষ্ঠুর জায়গা৷ এখানে ভালবাসার বিনিময়ে যৎসামান্য ভালবাসাও ফেরত পাওয়া যায় না৷ অফুরন্ত ভালবাসা বেসেও একেবারে খালি হাতে ফিরতে হয়। তারপর কাউকে ভুলেও ভাল না বাসার মনস্থির করতে হয়৷ এই নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে বেশ যাচ্ছিল আমার জীবন৷ আমার এমন নিয়মের বিপরীতে প্রথম বাধঁভাঙা প্রতিরোধ নিয়ে আসলো আরমিন, আমাকে তলিয়ে ফেলল তার নিঃসংকোচ নিখাদঁ ভালবাসার স্রোতে।

আব্বুর মান রাখতে আরমিন কে আমি বিয়ে করেছিলাম। সেদিন অবশ্য প্রতিবেশী আত্নীয়স্বজন আশপাশের মানুষজন সবাই বলছিল একটা সদ্য বিয়ে ভাঙা মেয়েকে মানহানি অপমানের হাত থেকে উদ্ধার করেছি আমি৷ বলতে গেলে জীবন বাঁচিয়েছি তার। এখন বুঝি আমি নই বরং আরমিন জীবন বাঁচিয়েছে আমার! সৃষ্টিকর্তা আমাকে অমন নিয়মমাফিক নির্জীব নিরানন্দের জীবন থেকে বেরিয়ে নিয়ে অফুরন্ত ভালোবাসা এবং আনন্দময় একটা জীবনের মুখ দেখাবেন বলেই আরমিন কে এনেছিলেন আমার ভাগ্যে। বিয়ের দিন টা ত ছুতো মাত্র। আরমিন কে সৃষ্টিকর্তা আমার নসীবে রাখবেন ঠিক করেছিলেন বলেই ত পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার মেয়েটা মনপ্রাণ উজাড় করে একেবারে অকারণে আমায় ভালবাসল!

আমি ছোট থেকে কিভাবে জানি বুঝে ফেলেছিলাম ভালবাসলে কষ্ট হয়৷ আম্মুকে ত কম ভালবাসতাম না আমি। অথচ সেটার বিনিময় বরাবরই উদাসীনতা অবহেলা অনাদর হয়ে আমার কাছে ফিরেছে। বড় হতে হতে কিভাবে জানি এই কষ্ট মনব্যথার বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতে নিজের একটা জগৎ বানিয়ে ফেললাম আমি। সেই জগতে থাকতে থাকতে কখন যে এমন একগুঁয়ে রুক্ষ আচরণের মানুষ হয়ে উঠলাম নিজেও টের পেলাম না৷ বন্ধুবান্ধবেরা হাসিঠাট্টার ছলে প্রায়ই বলত এমন মানুষদের সংসার টিকে না সহজে। মানুষ পারতপক্ষে কাছে ঘেঁষতে চায় না তাদের। অথচ আরমিনের এমন আগাগোড়া রুক্ষভাষী সারাক্ষণ চোটপাট করা মানুষটার বুকের কাছ ঘেঁষে না শুলে ঘুম আসে না! অদ্ভুত মেয়ে একটা। অবশ্য অদ্ভুত না হলে সারাক্ষণ চোটপাট করা একটা লোককে এমন ভালবাসবে কেন সে!

আগেই বলেছি আমার নসীব পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার মেয়েটাকে আমার কাছে এনেছে। তাই বোধহয় আমার মতন অধমকেও আরমিন নির্দ্বিধায় ভালবেসে ফেলল বিয়ের অল্প ক সপ্তাহেই। আরমিন প্রায়ই জানতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার নারী অনুরাগীদের কাউকে পছন্দ ছিল কিনা আমার৷ মাঝেমধ্যে সেটা নিয়ে সে রাগ করে খুউব৷ আমি মুখে মুখে হম্বিতম্বি দেখায় নিজের স্বভাবজাত গার্ম্ভীযের বশে। গা ছাড়া জবাব দিই৷ অথচ মনে মনে ভাবি, তাদের পছন্দ কি করে হতো আমার। তারা কেউ ত আর তুমি না। আমার আরমিন না৷ তুমি এসে আমার জীবন এতটা আনন্দে ভালবাসায় কানায় কানায় পূর্ণ করে দিবে বলেই হয়ত আমি ভালবাসাহীন বিতৃষ্ণার একটা জীবন কাটিয়েছি বহুদিন! তাদের কিভাবে পছন্দ করতাম বলো!

আরেকটা কাজও আরমিন প্রায়ই করে৷ আমাকে প্রশ্ন করে তাকে ভালবাসি কিনা৷ কিংবা ঠিক কখন থেকে তাকে ভালবেসেছি আমি। অথচ কখনো আমি এই প্রশ্ন গুলোর পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিতে পারি না৷ প্রতিবার মনে হয় কোনো কিছু বাদ পড়ে গেছে৷ মনে মনে প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে নিতেই দেখি কত কিছু বলা বাকি এখনো। অতঃপর শেষমেশ স্রেফ এটুকু বলতে পারি যে হ্যাঁ। ভালোবাসি। বিয়ের পর থেকে এমন এক দিনও নেই যেদিন আমি তাকে ভালো না বেসে থাকি নি।

অথচ সেই অনুধাবন আমার হয়েছিল অনেকটা পরে। মস্তিষ্ক যেন মানতেই চাচ্ছিল না বহুবছর ধরে মনের অকেজো একটা অনুভূতি এমন তরতরিয়ে জেগে উঠবে এরকম একজনের সান্নিধ্যে যার কোনোকিছুর সাথেই ত মিলে না আমার। আরমিন আর আমি ; দুজন দুজনের সম্পুর্ণ বিপরীত। আমি অন্তর্মুখী স্বভাবের মেপে মেপে কথা বলা মানুষ অথচ আরমিন চঞ্চলা পাখি একটা, মুখে সর্বক্ষণ কথার ফোয়ারা ছুটতে থাকে তার। গোছানো জিনিস এদিক থেকে ওদিক গেলে মেজাজ বিগড়ে যায় আমার আর আরমিন নিজেই বড্ড অগোছালো। তবুও কিভাবে জানি আমার মন জুড়ে গেলে মেয়েটার সাথে৷ বহু ইতিউতি করে এই কিভাবে জানির উত্তর পেলাম আমি। আরমিন নিজেই এতটা বিশেষ যে তাকে ভালবাসার জন্য বিশেষ কোনো কারণের প্রয়োজন ছিল না আমার। আরমিন আরমিন বলেই তাকে ভালোবেসেছি আমি। তার জায়গায় পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্র নম্র গোছানো মেয়েটি থাকলেও আমার মন অনায়াসে আরমিনকে ই বেছে নিতো!

মাঝেমধ্যে অনর্থক ঝগড়াঁঝাটিঁর সময় আরমিন অভিযোগ করে বসে৷ তার কোনোকিছুই নাকি পছন্দ না আমার। ঝগড়া সামাল দেয়ার পরিবর্তে তখন হতভম্ব হয়ে যাই আমি। রাগে মনমেজাজ বিগড়ে যায় আমার। মেয়েটাকে আমি মন দিয়ে বসে আছি অথচ মেয়েটা আমার মনের খবরের ই খোঁজ রাখে না৷ আমার মনের কথা টের পেতে এমন অপারগ সে! অহেতুক অভিমানও হয় আমার৷ আমি ত তার চেহারা দেখে মনের খবর টের পেয়ে যাই তাহলে সে কেন পারে না! মেয়েটা আদৌ কখনো জানবে তার সবকিছুই আমি পছন্দ করি, কোনোকিছুই যে আমার অপছন্দ নয়। তার রাগ ভালোবাসি আমি। অভিমান ভালোবাসি। নাটুকে কান্না ভালোবাসি। আগাগোড়া আরমিনকে আমি ভালোবাসি।

আমি সব সময় দেখে এসেছি মানুষ ভালোবাসার বিনিময়ে ভালবাসা ই প্রত্যাশা করে। আমি নিজেও তার ব্যতিক্রম নই। ভালবাসার বিনিময়ে ভালবাসা পাবো না এই শংকায় আমি একসময় মনস্থির করেছিলাম কাউকে ভালবাসব না আর৷ অথচ আমি আরমিন কে দেখলাম যে ভালোবাসা পাবে কি পাবেনা সেসবের ব্যাপারে কিচ্ছুটি না ভেবে একেবারে অহেতুক ভালোবাসল আমায়। কারণ কি? কারণ সে আমাকে ভালো না বেসে থাকতে পারে না তাই। আমাকে ছেড়ে থাকলে মন খারাপ হয় তার। আমাকে বাদে তার কিচ্ছু ভালো লাগে না আর। কি নিদারুণ সরল স্বীকারোক্তি ভালবাসার! মাঝেমধ্যে আমি ভাবি আরমিনের মতো এমন অনায়াসে ভালবাসার কথা বলতে আমি পারি না কেন।

কেন অবলীলায় বলে ফেলতে পারি না আরমিন কে ছাড়া আমারও কিচ্ছু ভালো লাগে না। বাসা ফেলে অফিসে কাজের পুরো সময়টা আমি বুকের মধ্যে একদলা মনখারাপ নিয়ে বসে থাকি৷ ইচ্ছে হয় কাজ ফেলে একছুটে বাসায় গিয়ে মেয়েটাকে দেখে আসতে। তারপর আফসোসও হয় বাস্তবে ম্যাজিক বলে কোনোকিছু না থাকায়৷ থাকলে বড্ড ভালো হতো। তাহলে জাদুবলে মেয়েটাকে বুকের ভেতরে নিয়ে ঘুরতাম আমি তখন৷ চার প্রকোষ্ঠের হৃদযন্ত্রটা বাদে আর কোথায় রাখতাম আমি তাকে। প্রাণকে ত মানুষ প্রাণের ভেতরেই রাখে!

আরমিন আর আমার অদ্ভুত বৈবাহিক জীবন স্বাভাবিক হলো আরওয়ার আগমনে। আমাদের মেয়ে ও৷ মেয়ের আসার পরেই আরমিন আমার ভাগের ঝগড়াঝাঁটি শুরু করল মেয়ের সাথে। দুদিন পরপরই মা মেয়ে নতুন নতুন কোনো ঝামেলা করে একে অপরের সাথে। তান্ডব চালায় ঘরজুড়ে। আর নালিশ জানাতে আসে আমার কাছে। আমি তেমন বিচলিত হয় না এসবে। দু দুটো বাঁদর পালতে হচ্ছে আমার এই আর কি! তবুও মাঝরাত্তিরে ঘুম ভেঙে যখন দেখি বিছানার অর্ধেকটা দখল করে একজন আরেকজনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে দুজন কিংবা দুজনের হাত পা বিচিত্র অঙ্গভঙ্গিতে ছড়ানো। সারাদিন কাটখোট্টা বেশে থাকা আমার চোখে জল আসে। ঘুমঘুম চোখেই আমি অপলক দেখতে থাকি তাদের। আর
অনুধাবন করি সৃষ্টিকর্তা সত্যিকার অর্থেই আমাকে দু হাত ভরে দিয়েছেন। এই জীবনে চাওয়ার মত আমার আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
বাস্তবের ব্যাডা মানুষদের উপর থাকা বিতৃষ্ণা থেকেই এরকমই এক মাঝরাতে আমি নোটপ্যাডে আযান ইয়াসীর ভুইঁয়া কে লিখতে শুরু করেছিলাম। যে বউ পিটায় না, বউ কে স্রেফ শয্যাসঙ্গীনী মনে করে না, বিবাহিত সম্পর্কের সীমারেখা জানে কিংবা পরকীয়াতে জড়ায় না৷ বউয়ের ইচ্ছে অনিচ্ছের দাম দেয়৷ ফেসবুকের আর দশটা গল্পের মতন আমি ওকে এমন বানাতে চাই নি যে কথায় কথায় বউয়ের গায়ে হাত তুলবে ফিজিক্যালি এবিউজ করবে কিন্তু মনে মনে বউ কে ভীষণ ভালবাসবে। কিংবা নিজের মেইল ইগো থেকে বউকে অপমানে জর্জরিত করে পরে অপরাধবোধ থেকে ভালবেসে ফেলবে। এরকম কিছুই আমি ওর ক্যারেক্টারে দিই নি৷ আমি আযান ইয়াসীর ভুইঁয়া কে একজন সুপুরুষ বানাতে চেয়েছি৷ যে দাম্পত্যের চারটা জরুরি শর্তের সবকটা পালন করেছে। যত্ন, বোঝাপড়া, সম্মান আর ভালবাসা চারটা পরীক্ষাতেই পাশ করেছে। তো যেটা বলতে চাচ্ছিলাম ফেসবুকের অলরেডি ফেমাস কোনো গল্প কিংবা গল্পের চরিত্রকে কপি করে আযানকে আমি লিখি নি৷ আযান ইয়াসীর ভুইঁয়া পুরোপুরি আমার ব্রেইনচাইল্ড। তাই পাঠকদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমার লেখা গল্পটার কিংবা আযানের ক্যারেক্টার টা আর কোনো গল্পে কপি হতে দেখলে প্লিজ আমাকে ইনবক্সে জানাবেন। আমি নিজে যেহেতু কপি করি না। কেউ আমার লেখা চরিত্রকে কপি করবে সেটাও আমি এলাউ করব না৷ আমি ফেসবুকে একেবারে হাতেগোনা তিন চারজনের গল্প পড়ি। ইদানিং তাদের লেখা পড়াও কমিয়ে দিচ্ছি এই ভয়ে যদি সাব কনশাস মাইন্ডে সেসব নিজের গল্পে টুকে দিই! তাই কোথাও কপি হলে আমি জানতে পারব সেই সম্ভাবনা কম৷ কিন্তু আপনারা ত অনেক গল্পটল্প পড়েন৷ তাই কপি হতে দেখলে অনুরোধ থাকবে আমাকে জানাবেন৷ জানাতে ইচ্ছে না হলে অন্তত যে কপি করছে তাকে লাইক কমেন্ট করে উৎসাহ দিবেন না৷ আর আমার গল্পেও কারো লেখার সাথে মিল পেলে অবশ্যই জানাবেন। আমি প্রয়োজনে রিচেক করে ক্ল্যারিফাই করব বিষয়টা। কারণ কারো লেখা কপি করে বাহবা কামাব এমন মানসিকতা আমার নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here