চোরাবালির_পিছুটানে (৩৭) #জেরিন_আক্তার

0
2

#চোরাবালির_পিছুটানে (৩৭)
#জেরিন_আক্তার

সাইমন সিফাতকে ফোন দিয়ে বলে রাদিফের কোনো খবর জানে নাকি। কিন্তু সিফাত জানায় রাদিফ তার সাথে আজকে কোনো কথাই বলেনি। এই কথা শুনতেই সাইমনের আরও বেশি চিন্তা হতে শুরু করলো। রাদিফ তো দেরি করার কথা না। তবুও রাত বারোটা বেজে আসছে এখনও কেনো আসছে না। ফোনটাও সাথে নিয়ে যায়নি যার জন্য কিছুই জানা যাচ্ছে না।

মিষ্টি সোফায় এক কোণে বসে কাঁদছে। মেইড তাকে শান্তনা দিচ্ছে। সাইমন সিফাতকে কল দিয়ে গাড়ি নিয়ে আসতে বলে। এরপরে মিষ্টির কাছে এসে বলে,

“তুমি উপরে চলে যাও। আমি সিফাতকে আসতে বলেছি। ও আসছে। এরপরে আমরা ওকে খুঁজতে যাবো।”

“ভাইয়া আমিও আপনাদের সাথে যাবো।”

“কি বলছো তুমি! তুমি সাথে যাবে কেনো? তুমি রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। আমরা খুঁজে আনবো। আর ও যদি কোনো বিপদে পড়ে তখন তোমাকে কোথায় রাখবো। আর যদি বিপদ নাও হয়ে থাকে তাহলেও রাদিফ বকবে তোমাকে নিয়ে গেলে।”

“কিন্তু ভাইয়া আমার কেমন একটা লাগছে। ওকে দেখা না পর্যন্ত কিছুই ভালো লাগছে না।”

“তুমি উত্তেজিত হইয়ো না। আমরা দেখছি।”

সাইমন মেইডকে ইশারা করে মিষ্টিকে উপরে নিয়ে যেতে বলে। মিষ্টি চলে যাওয়ার পরে সাইমন সিফাতকে কল দিতে দিতে চলে যায়।

এদিকে,,, অন্ধকার ধুলোবালি জমা একটা পরিত্যক্ত ঘরে রাদিফকে একটা চেয়ারে হাত-পা বেধে রাখা হয়েছে। রাদিফের মাথা ফেটে রক্ত পড়ছে, শরীরে ক্ষত চিহ্ন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক মারধর করা হয়েছে। রাদিফ নিভু নিভু চোখে তাকাচ্ছিলো। গলা শুকিয়ে আসছে বার বার। রাদিফ এদিক-সেদিক তাকিয়ে পানি খুঁজছে কিন্তু স্পষ্ট কিচ্ছু দেখতে পারছে না।

এর একটু পরে অন্ধকার ঘরের ভিতরে আলো জ্বলে উঠলো। এই সাথে সাথে ভিতরে ঢুকলো রায়ান। রাদিফ তখন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে রায়ান রাদিককে ফলো করতে থাকে। রাদিফ বুঝতে পেরে গাড়ি থামিয়ে নেমে যায়। রায়ান প্রথমে ভালো ভালো করে বলে। তারপরে সুযোগ বুঝে অন্য একটা ছেলে রাদিফকে পেছনে থেকে মাথায় বারি মেরে অজ্ঞান করে ফেলে। রাদিফ সজাগ হয়ে দেখতে পায় সে এখানে। এখানে থেকে বের হতে নিলে রাদিফকে পূর্বসংকেত ছাড়াই ইচ্ছেমতো মারধর করে। ঘটনা টা এতো তাড়াতাড়িই হয়েছিলো যে রাদিফ এর প্রতিবাদও করতে পারেনি। রাদিফকে মারধর করে রায়ান চলে গিয়েছিলো এরপরে এখন ফিরে এলো। রাদিফ রায়ানকে দেখে তীব্র রাগ নিয়ে নড়াচড়া করতে করতে বলে,

“এই কুত্তার বাচ্চা ছেড়ে দে আমায়। তোর সাহস হয় কি করে আমাকে এখানে আটকে রাখার?”

রায়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,

“কেনো তু্ই দিয়েছিস!”

“এখনও বলছি ছেড়ে দে, নাহলে তোর কি অবস্থা করবো তু্ই আন্দাজও করতে পারবি না।”

রায়ান জোরে হাসতে থাকে। এরপরে রাদিফের সামনে বসে বলে,

“তু্ই আগে ছাড়া পেয়ে তো দেখ! তোকে আমি ছাড়ছি না।”

রাদিফ দাঁত চেপে বলে,

“তু্ই বড্ড ভুল করছিস? কোনো কারণ ছাড়াই এগুলো করার কোনো মানে হয়না।”

রায়ান মাথা কাত করে বলে,

“কোনো কারণ ছাড়া বলছিস কেনো? তোকে অনেকবার বলেছি তোদের সাথে আমাকে কাজে নে। কিন্তু তোরা নিলি না। আর এখন শুনছি তোরা এসবে নেই। কি হলো বলতো?”

রাদিফ রাগে হির হির করছে। প্রচুর নড়াচড়া করছে কিন্তু বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়াতেই পারছে না। এদিকে যে বিপদে পড়ে আছে সেটা তো মিষ্টি বা সাইমন জানতেও পারছে না। নিশ্চই চিন্তা করছে। রাদিফই এখন কি করবে। কোনো উপায়ই পাচ্ছে না এখানে থেকে ছাড়া পাওয়ার। রায়ানও বেশ পাকা চালই চেলেছে, এতো সহজে ছেড়েও দিবে না।

রাদিফ চুপচাপ কথাগুলো ভাবছে। রায়ান রাদিফের দিকে তাকিয়ে বাকা হেসে বলে,

“কিরে বউয়ের জন্য চিন্তা করছিস নাকি? তোর বউকেউ আনবো নাকি?”

রাদিফ গর্জে উঠে বলে,

“তোর কলিজা বের করে ফেলবো আমার বউকে নিয়ে কথা বললে। শুধু একবার, একবার যদি এই শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়া পেলে হয়, দেখিস তোর কি অবস্থা করি।”

রায়ান হেসে বলে,

“ইশ, আমি ভয় পেয়েছি। আমি না ছেড়ে দিলে তু্ই ছাড়া পাবি না। থাক পড়ে এখানে।”

এই বলে রায়ান চলে যায়। রাদিফ রায়ানকে ফিরায় না। নিজে ভাবতে থাকে কি করতে হবে এখন। রাদিফের নিজেরই রাগ উঠছে, কি জন্যে যে আসতে গেলো তখন। আর ফোনটাও আনেনি। এই নিয়ে রাদিফের প্রচন্ড রাগ উঠে যাচ্ছে।

_______________

সাইমন আর সিফাত দুজনে চলে আসে একটা শপে। এখানেই মূলত মিষ্টির জন্য গিফট নেওয়ার কথা। কালকে রাদিফ সাইমনকে নিয়ে এসে এখানেই গিফটগুলো অর্ডার করে গিয়েছে। সাইমন আর সিফাত সেই শপে ঢুকলো। রাত বারোটা, শপটা বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে শপের লোকগুলো। সাইমন আর সিফাত তাদের কাছে গিয়ে রাদিফের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলো। কিন্তু তাতেও রাদিফের কোনো খোঁজ মিললো না। উনারা বলে রাদিফ নাকি গিফটগুলো নিতেই আসেনি। একথা শোনার পরে সাইমনেরও চিন্তার মাত্রা বেড়ে গেলো। রাদিফ গিফট আনতে আসেনি তাহলে গেলো কোথায়?

সাইমন আর সিফাত বেরিয়ে গেলো শপে থেকে এরপরে তাঁদের চেনাজানা বন্ধুদের কল দিলো রাদিফ তাদের সাথে নাকি। ওরা সবাই বললো ওদের সাথে নেই রাদিফ। সাইমন আর সিফাত কোনো ক্লুও খুঁজে পাচ্ছে না যে রাদিফ এখানে যেতে পারে। ক্লু ছাড়া এই জাপানে কোথায়ই বা খুজবে। দুজনে কোনো উপায় না পেয়ে এখানকার কাছের কোবানে যায়। পুলিশ প্রাথমিক তথ্য নিয়ে পরে কেইসাতসুশোতে অফিসিয়াল রিপোর্ট করতে বলে। ওরা দুজনে তাইই করে।

রাত দুইটা বাজে। মিষ্টি রাদিফের আসার অপেক্ষায় এখনও ড্রইং রুমে বসে আছে। সাথে মেইডও আছে। তখন বাড়িতে ঢুকে সাইমন আর সিফাত। ওদের দুজনকে দেখে মিষ্টি উঠে দাঁড়ায়। মনে করে রাদিফ হয়তো ওদের পেছনে আছে। কিন্তু রাদিফকে দেখতে না পেয়ে মিষ্টি সাইমনকে বলে,

“ভাইয়া রাদিফ আসেনি?”

সাইমন আর সিফাত দুজনেই এগিয়ে আসে। সাইমন বলে,

“না ভাবি, ও আসেনি। আমরা অনেক খুঁজেছি কিন্তু ওকে পায়নি কোথাও?”

মিষ্টি দু-পা পিছিয়ে যায়। দুচোখ বেয়ে অনবরত পানি পড়ছে। সাইমন শান্তনা দিতে বলে,

“ভাবি চিন্তা করো না। আমরা এখানকার ফোর্সকে জানিয়েছি। উনারা খুঁজছে। আর আমাদের বন্ধুরাও ওকে খুঁজছে। ওর খোঁজ পেলে সাথে সাথে জানাবে।”

সারারাত এভাবেই গেলো। সকাল হতেই সাইমন বেরিয়ে যায় রাদিফকে খুঁজতে। মিষ্টি নিজের রুমে বসে বসে রাদিফের জন্য কাদছে। কি থেকে কি হয়ে গেলো যার জন্য রাদিফকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। মিষ্টি কাঁদতে কাদতে বলে,,, আমার কোনো সারপ্রাইস লাগবে না তুমি প্লিজ ফিরে এসো। আমাকে সারপ্রাইস দিয়ে খুশি করতে নিজেই কোথায় চলে গেলে। নাকি কোনো বিপদই হলো! প্লিজ ফিরে এসো না। আল্লাহ তুমি ওকে যেখানেই রাখো ভালো রাখো। কোনো ক্ষতি করো না।

মিষ্টি বাড়িতে বিষয়টা জানাতে চায় কিন্তু সবাই বেশি চিন্তা করবে বলে জানায় না। যদি সবাই একসাথে থাকতো তাহলে জানালেও কিছু হতো না। আর এখন ওরা আলাদা একটা জায়গায় এসেছে। তাই রাদিফের খবরটা জানানো ঠিক হবে না।

বাংলাদেশ সময় তখন সকাল সাড়ে পাঁচটারও বেশি বাজে। রুমানা চৌধুরী ফজরের নামাজ পড়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। প্রতিদিন এমন করেন না। নামাজ পড়ে, বাগানে হাটাহাটি করে কিচেনে টুকটাক কাজ করেন। আর আজ কেনো যেনো তার কোনো ইচ্ছেই হচ্ছে না। রুবেল চৌধুরী তাকে এই সময়ে শুয়ে থাকতে দেখে বলেই ফেলেন,

“তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?”

“না!”

“তাহলে শুয়ে পড়লে যে? প্রতিদিন তো এমন করো না!”

“আমার কেনো যেনো ভালো লাগছে না কিছুই তাই শুয়ে পড়লাম।”

“ওহ। শরীর খারাপ লাগলে বলো!”

“না, শরীর ঠিকই আছে।”

এর কিছুক্ষন পরেই রুমানা চৌধুরী নিজেই বলে উঠেন,

“রাদিফ ফোন দিলে আমার কাছে দিও তো। আমার মনটা কেমন জানি করছে।”

রুবেল চৌধুরী হালকা হেসে বলেন,

“ও ছেলের জন্য চিন্তা করছো। কাছে নেইতো তাই চিন্তা হচ্ছে।”

___________________

সন্ধ্যার দিকে,, সাইমন বাড়ি ফিরে আসে। দুপুরে আবার বেরিয়েছিলো রাদিফের খোঁজে। কিন্তু পায়নি। ওর বন্ধুরাও পায়নি। সাইমন বাড়িতে ঢুকতেই মেইড জানায় মিষ্টিকে নাকি কিছুক্ষন ধরে দেখছে না। সাইমনের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। প্রথমে রাদিফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর এরপরে এখন মিষ্টি। কি হচ্ছে এসব!

এদিকে,, সারাদিন ধরে রাদিফ না খাওয়া। সন্ধ্যার দিকে প্রায় নাজেহাল অবস্থা তার। রায়ানও সারাদিনে আসেনি। দুটো ছেলে এসেছিলো। খাবার দিয়ে গিয়েছে। রাদিফ শুধু পানি ছাড়া অন্য কিছু খায়নি। রাদিফ এটা ভেবে পাচ্ছে না রায়ান সারাদিনে এলো না কেনো। রাতে তো কয়েকবারই এসেছিলো। রাদিফের ভাবনার মাঝে রায়ান রুমের দরজা খুলে ঢুকলো। রাদিফ একনজর তাকিয়ে যেই অন্যদিকে তাকাতে যাবে ঠিক তখন চোখে পড়ে মিষ্টিকে।

চলবে….

পরবর্তী পর্বে সব ক্লিয়ার হবে। আর নেক্সট পার্ট কালকে সন্ধ্যার পরে আসবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here