কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ২২.

0
392

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২২.

সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কোট পরিহিত তুল্যকে গাড়ি থেকে বেরোতে দেখে দুরে দাড়িয়ে কানের পিঠে চুল গুজলো আলো। নিজের দিকে তাকিয়ে সবুজাভ শাড়িটা পরখ করলো। কপালের টিপটা ছুঁয়ে দিয়ে আরো একবার ঠিকঠাক করলো। ভাইভার জন্য আজ মায়ের শাড়ি পরেছে আলো। আসার সময় বোন বলেছে, ওকে টিপে মানাবে। তাই টিপও পরেছে। আর যেহেতু এটুকো সাজগুজ করেছে, আলোর খুব ইচ্ছে হলো তুল্যকে এই সাজটুকো দেখাতে। ও জানে, ওর সীমা সীমিত। তুল্য আলফেজ, ওর সীমাবহিস্থ। তাই তার চাওনি বাদে, বাড়তি কোনো চাওয়া নেই ওর। ক্যাম্পাসে আসার পর থেকেই তুল্যকে খুজছে আলো। তুল্যকে আসতে দেখে চোখ ঝলমলো হয়ে ওঠে ওর। ভেতরটা অদ্ভুত খুশিতে পুলকিত হয়ে ওঠে। শাড়ির আঁচল দুহাতে একমুঠো করে, ও ঠায় দাড়িয়ে রয় তুল্যর চাওনি পাবার আশায়। তুল্য বুজোকে বের করলো। এতোটাসময় গাড়িতে থাকার পর ছাড় পেতেই ছুট লাগায় বুজো। সোজা এসে আলোর পা শুকতে থাকে। আলো মুচকি হেসে বুজোকে কোলে তুলে নেয়। আর বুজো নড়চড় করতে থাকে। তুল্য এগিয়ে এসে দাড়ালো আলোর সামনে। চোখের সানগ্লাসটা খুলে বললো,

– ও কোলে থাকবে না। ছেড়ে দাও।

আলোর উজ্জ্বল চোখ নিমীলিত হয়ে আসে। জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে, আস্তেকরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝায় ও। বুজো নেমে যায়। তুল্যও আর দাড়ালো না। চলে গেলো ওখান থেকে।
আলো তাচ্ছিল্যে হাসলো। নিজের অসম্ভব আশার ওপর, ওর নিজেরই করুণা হয়। নিজেকে সামলে, ধীরপায়ে পা বাড়ালো ডিপার্টমেন্টের দিকে। সেখানে কোটসুট পরিহিত ছেলেরা আর শাড়িপরা মেয়েরা ছবি তুলতে ব্যস্ত। মেয়েরা প্রায় সবাই শাড়ী পরে এসেছে। তাথৈ ব্যতিত। তার পরণে গাঢ় খয়েরী গোলাকার শর্ট কুর্তা, ধুতি। সবাই যেখানে রিলস, ভিতিও বানাতে ব্যস্ত, একপাশে একা দাড়িয়ে ফোন স্ক্রল করছে সে। সবার মাঝে বুজো তাথৈকেই যেনো আগে দেখতে পায়। ছুটে গিয়ে তাথৈয়ের পায়ের নিচে ঘুরঘুর করতে থাকে ও। পায়ে শিরশির অনুভূত হতেই তাথৈ চোখ বন্ধ করে নিলো। দম নিয়ে, নিজেকে সামলালো। চোখ মেলে তুল্যকে বললো,

– তুই কি চাস আমি ওর একটা ক্ষতি করে দেই?

– ডোন্ট ইউ ডেয়ার তাথৈ। বুজোর দায়িত্ব এখন আমি নিয়েছি। সো মাইন্ড ইট! তাছাড়া ও বেধে রাখার জিনিসও না যে আমি বেধে রাখবো।

এটুকো বলে তুল্যও বাকিসবের সাথে ছবি তুলতে চলে যায়। ভাইয়ের বেখেয়ালিপনায় বরাবরের মতো রাগ হয় তাথৈয়ের। চোখমুখ শক্ত করে বুজোকে কোলে তুলে নিয়ে হাটা লাগায় ও। তুল্য সে দৃশ্য দেখেও না দেখার ভান করে রইলো। ও জানে, তাথৈ আর যাই হোক, বুজোকে আঘাত করবে না।
তাথৈ বুজোকে নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে এসে সোজা চায়ের টংয়ে ঢুকলো। সেখানে সবাই যারযার মতো চা-আড্ডায় মত্ত্ব। আশপাশ তাকিয়ে, একটা বেঞ্চের ওপর কাচের কাপ ভর্তি ট্রে চোখে পরে তাথৈয়ের। কপাল শিথিল হয় ওর। কোলে থাকা বুজোকে ঠিক পাশটায় নামিয়ে দেয় ও। তারপর ইচ্ছে করে ট্রে টা নিচে ফেলে দিলো। ঝমঝমিয়ে আওয়াজ করে আটটা কাচের গ্লাস নিচে পরে যায়। দোকানসহ আশপাশের পুরো জায়গার ছেলেমেয়েরা চমকে তাকায় সেদিকে। দোকানী আহাজারি করে বলে উঠলো,

– আয়হায়রে! আমার সবগুলা কাপ ভাইঙ্গা দিলো এই কুত্তাডা! হায়হায় রে!

তাথৈ বুজোর দিকে তাকিয়ে বিশ্বজয়ের হাসি দিলো একটা। তারপর বুকে হাত গুজে দাড়ালো। বুজো ওরদিক চেয়ে চুপচাপ বসে। একদম ভদ্র, শান্ত বাচ্চার মতো। তবে ওর ভদ্রতায় যেনো তাথৈ সন্তুষ্ট হলো না। হাসি কমিয়ে, রাগ নিয়ে বুজোর দিকে আঙুলতাক করলো ও। উচুস্বরে দোকানীকে বললো,

– ওর নাম বুজো! আপনার কাপ ওই ভেঙেছে!

দোকানদার ইচ্ছামতো বকতে লাগলো বুজোকে৷ শুরুতে মজা পেলে, একটুপর আর ব্যাপারটা ভালো লাগছিলো না তাথৈয়ের৷ দোকানীকে থামাতে ও বললো,

– আ্ আচ্ছা হয়েছে! যেহেতু ওকে কিছু বলে লাভ নেই, আপনার কথা যা শুনানোর, তা ওর মালিককে শুনাবেন। ওর মালিক ভাইভা দিতে গেছে। ও এলেই ওকে কথা শুনাবেন ওকে?

– মালিকরে তো কথা শুনাইমু পরে! আগে তো এইডারে…

দোকানদার এবার বুজোর দিকে এগোতে যায়। তাথৈ তৎক্ষনাৎ ব্যাগ থেকে হাজারটাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিলো তারদিক। দোকানী থেমে গেলো। তাথৈ বললো,

– এটা আপনার কাপের টাকা। ওকে কিছু বলবেন না। যা বলার, ওকে নিতে আসলে ওর মালিককে বলবেন। বুঝেছেন?

দোকানী টাকা হাতে নিলো। জোরেজোরে ঘাড় ঝাকিয়ে বুঝালো, তাই হবে! তাথৈ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বেঞ্চে বসা বুজোর দিকে তাকালো। বাহাত হাটুতে রেখে কিছুটা ঝুকে দাড়ালো ও। বুজোর দিকে ডানহাতের আঙুলতাক করে বললো,

– স্টে এওয়ে ফ্রম মি। আন্ডারস্ট্যান্ড? এবার তো শুধু কাপ কেইসে ফাসিয়েছি, পরেরবার এরচেয়ে ভয়ানক কেইসে ফাসিয়ে দেবো বলে রাখলাম।

বুজো জবাব দিলোনা। ওভাবেই চুপটি করে বসে রইলো। ওর এমন সভ্যতায় তাথৈয়ের যেনো আরো রাগ হলো। হনহনিয়ে চলে গেলো ও ওখান থেকে।
পুরো ঘটনাটা চায়ের দোকানের কোনার চেয়ারটায় বসেবসে দেখে, হেসে দিলো তাশদীদ। কারো মাঝে কতোটা ছেলেমানুষি থাকলে এইভাবে পোষ্য কুকুরকে অবদি ফাঁসিয়ে দেয়? অথচ এই মেয়েই তার রাগে দুনিয়া ভস্ম করতে জানে। এগিয়ে এসে বুজোর সামনে দাড়ালো তাশদীদ। প্যান্টের পকেটে দুহাত গুজে দাড়িয়ে, তাথৈয়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,

– ভালোবাসা প্রকাশ করতে চায় না। এর কাছ থেকে ‘ভালোবাসে’ শোনার চেয়ে, ‘ভালোবাসে’ অনুভব করাটা বেশি ইন্টারেস্টিং হবে। রাইট বুজো?

বলাশেষে বুজোর দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলো তাশদীদ। বুজো কি বুঝলো, লেজ নেড়ে, আওয়াজ করে উৎফুল্লতা প্রকাশ করতে লাগলো অনবরত।

– শার্লি?

ভাইভা শেষে করিডোরে দাড়িয়ে ছিলো তাথৈ। সামনেরজনের মুখে অস্ফুটস্বরে শার্লির নাম উচ্চারণ শুনে, তার চাওনি অনুসরণ করে পেছন ফিরলো ও। তাতে যা দেখলো, একমুহূর্তের জন্য বাস্তবতাকেও ওর দিবাস্বপ্ন বলে মনে হলো যেনো। সাদা পারের মিষ্টিরঙা শাড়ি পরিহিত শার্লিকে চিনতে বাড়তি দু দন্ড সময় নিলো তাথৈ। যে মেয়েটা ঢোলাঢালা লম্বা শার্ট আর জিন্স পরে ক্যাম্পাসে আসে, তার পরনে সাদা ব্লাউজে কাধে ভাজেভাজে আটকে দেওয়া শাড়ীর আঁচল, ঘাড়ের কিছুটা নিচ অবদি কেটে রাখা চুলগুলো ছাড়া, বা হাতে কাঠের চুড়ি। সবমিলিয়ে অপরুপ দেখাচ্ছিলো শার্লিকে। শার্লি ভেতরের অস্বস্তিকে জোরালো হাসিতে আটকে দিয়ে করিডোর দিয়ে এগোলো। তাথৈয়ের চেহারায় বড়সর হাসির রেশ ফুটে উঠলো এবারে। শার্লি ওর কাছাকাছি আসলে আরো একবার ওকে আপাদমস্তক দেখে নিলো ও। খুশির সাথে বললো,

– কি মিষ্টি দেখাচ্ছে তোকে!

শার্লি হেসে নিজের দিকে তাকালো। কেনো যেনো, কখনো ওর ইচ্ছে করেনি, আরপাঁচটা মেয়েদের মতো সাজতে। বরং ছোটথেকেই মেয়েদের সাজসামগ্রী দেখলেই ওর বিরক্ত লাগতো। আর ছেলেদের মতো সোজাসাপ্টা চলাফেরা, কথাবার্তা ভালো লাগতো। অথচ আজ এই শাড়ি গায়ে জড়ানোর পর থেকেই অদ্ভুত এক আনন্দ হচ্ছে শার্লির। শরীরের চারপাশে থাকা পিনগুলোর জন্য এতোটুকোও অস্বস্তি হচ্ছে না। বরং এই শাড়ি-সাজের জন্য ওকে যখন কেউ ‘ভালো দেখাচ্ছে’ বলছে, ওর ভালোই লাগছে। শার্লি বললো,

– শাড়ি ক্যারি করা এতোটাও কঠিন না।

তাথৈ হেসে ওর হাতে হাত রাখলো। শার্লি আবারো বললো,

– জানিস তাথৈ? আমার ভাইভা ভালো গেছে আজ!

– আমি জানতাম তুই ভাল করবি। এবারের ভাইভা নিয়ে বেশ সিরিয়াস ছিলি তুই। বাইদাওয়ে, তুই শাড়ি পরবি, একবারো বলিস নি।

– আমি নিজেও শিওর ছিলাম না। ইভেন আমারতো পরার পরপরই খুলে ফেলার প্লান ছিলো। কিন্তু পরার পরে দেখলাম, ইটস ওকে, ক্যারি করতে পারছি, তাই আর খুলিনি। তখন আর তোকে বলিনি। একেবারে সামনাসামনি দেখাবো বলে।

– ভালো করেছিস। ভাইভায় কনফিডেন্ট হওয়া অনেক জরুরি। আর কনফিডেন্ট হতে গেলে গেটআপ অনেক ম্যাটার করে। এটা বল শাড়ি পরার আইডিয়া কোথায় পেলি তুই? এটা তোকে পরিয়ে দিয়েছে কে?

– ভাইভা কেমন দিলে শার্লি?

তাশদীদের আওয়াজ শুনে পাশে তাকায় তাথৈ। ঠোঁটে একটা হাসি ঝুলিয়ে শার্টের হাতা ভাজ দিতে দিতে ওদের পাশ কাটাচ্ছিলো তাশদীদ। তবে দাড়ালো না ও। শার্লি সালাম দিয়ে বললো,

– বেশ ভালো গেছে তাশদীদ ভাই! এন্ড থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনি…

– গুড। ওকে তোমরা কথা বলো, আমি আসছি। থার্ড ফ্লোরে আমার ক্লাস আছে। বাই।

তাশদীদ সময় নিলোনা৷ চলে গেলো। ও চোখের আড়াল হলে তাথৈ শার্লির দিকে ফিরলো। বললো,

– এনাকে থ্যাংকস দিচ্ছিলি কেনো?

– তুই জিজ্ঞেস করছিলি না, শাড়ী পরার আইডিয়া কার? আইডিয়াটা তাশদীদ ভাইয়ের ছিলো। একচুয়ালি আমার ভাইভা ভালো যাওয়ার সব ক্রেডিট তোর আর তাশদীদ ভাইয়ের। তুই তো টপিক বলে দিয়েছিলি। আর ভাইভা ম্যানার শেখার জন্য গতদিন প্রভা আপুর কাছে ক্যাম্পাসে এসেছিলাম আমি। কিন্তু মহিলা অত্যন্ত নিচু মানসিকতার। আমাকে হেল্প করতে নারাজ ছিলো। তখনই তাশদীদ ভাইয়ের সাথে দেখা। তাকে বললাম, সে সাজেস্ট করলো গেটআপ হিসেবে শাড়ী পরতে। কথাটা শোনার পর আমার অবস্থা কি ছিলো, তা কেবল আমিই জানি। হয়তো তাশদীদ ভাই বুঝেছিলেন ব্যাপারটা। তাই আমাকে তার বান্ধবীর সাথে কথা বলতে বলেছিলেন। তো ওই আপুর সাথে কথা বলতে তার হলে যাই আমি। গত রাতটা হলে তারকাছেই ছিলাম। আপু আমাকে পড়িয়েছেও, বুঝিয়েছেও, আর এইযে রেডিও করে দিয়েছে। শাড়ি, চুরি সবকিছু তারই। এন্ড ফাইনালী, আমার ভাইভা বেশ ভালো গেছে।

শার্লির কাছে তাশদীদের কথা শুনে অজান্তেই হাসি ফুটলো তাথৈয়ের ঠোঁটে। রাগের জন্য যে মস্তিষ্ক ওকে এক জিনিস দুবার ভাবার সুযোগ দেয়না, সেই মস্তিষ্ক খুবই অদ্ভুতভাবে ওর মনে মুগ্ধতা সৃষ্টির সুযোগ করে দিতে থাকে। আড়চোখে তিনতলার সিড়ির দিকে চেয়ে রইলো ও। শার্লি শাড়ির কুচিটা ধরে বললো,

– আচ্ছা তুই ভাইভা শেষ কর, আমি একটু ওই আপুর সাথে দেখা করে আসছি। পাশের বিল্ডিংয়েই।

কথা কানে যায় না তাথৈয়ের। ও সেভাবেই সিড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। শার্লিও ওকে খেয়াল না করে পা বাড়ায়।
তুল্য দেয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে। ওর ভাইভা শেষ। সাদা শার্টের সর্বওপরের দুটো বোতাম খোলা। টাইয়ের গিট বুকের কাছে ঝুলছে। বা হাতে ভাইভার জন্য পরে আসা কালো কোটটা ঝুলানো। বা পায়ের কালো সু এর সামনেরদিকে পা ঢোকালেও পুরোপুরি পরেনি। একহাতে কোক ধরে রেখে, আরেকহাতে মোবাইল ঘাটছে ও। বুজো পাশে গাড়ির ওপর চুপচাপ বসে আছে। ভাবখানা এমন, সে আত্মগ্লানিতে আছে। তার জন্য তুল্যকে দোকানীর অহেতুক ক্যাচক্যাচ শুনতে হয়েছে৷ কিন্তু তুল্যর সে নিয়ে মাথাব্যথা নেই। কারন ও জানে, বুজোকে নিয়ে তাথৈ বেরিয়েছিলো। আর কাপ ভাঙার মহৎ কাজটা তাথৈ ছাড়া আর কে করবে? জুতার আওয়াজ শুনে বেখেয়ালিভাবে ফোন থেকে একপলক সিড়িতে তাকালো তুল্য। আবারো ফোনে তাকাতেই ওর মনে হয়, দৃষ্টি সরিয়ে অনেকবড় ভুল করে ফেলেছে ও। তুল্য আবারো তাকালো সিড়ির দিকে। শাড়ী পরিহিত শার্লিকে সিড়ি দিয়ে নামতে দেখে, আস্তেধীরে দেয়াল থেকে সরে সোজা হয়ে দাড়িয়ে যায় ও।
তুল্যকে তাকাতে দেখেই শার্লির গতি কমে আসে। সিড়ির রেলিং শক্ত করে চেপে ধরে, একটা শুকনো ঢোক গিললো ও। এতোক্ষণ সবার চাওনি, প্রসংশা ওকে আনন্দ দিয়েছে। কিন্তু এ মুহুর্তে সামনে দৃঢ়ভাবে দাড়িয়ে থাকা তুল্যর নিস্পলক চাওনি ওকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। ওর মনে হলো, তুল্য কিছু বললেই ওর শরীর ছেড়ে দেবে। ওদিকে তুল্য যেনো পলক ফেলা ভুলে গেছে। দৃষ্টি সরিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে শার্লি। নিচে নেমে তুল্যকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলো ও। অকস্মাৎ তুল্য বলে উঠলো,

– শার্লি শোন?

হৃদৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার মতো শব্দজোড়া কর্নগোচর হতেই চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো শার্লি। তুল্য চুপচাপ ওর সামনে এসে দাড়ালো। টের পেলো, শার্লি স্থির নেই। শশব্যস্তর মতো এদিকওদিক দেখছে ও। তুল্য নিজের বা হাত উচু করে। সেখানে ঘড়িতে আটকে রাখা ছোট্ট কালো টিপটা হাতে নেয়। আলোর কোল থেকে নামার পর বুজোর লোমে টিপটা লেগে ছিলো। আর তুল্য সাতপাঁচ না ভেবেই সেটা ঘড়িতে আটকে রেখেছিলো। সেই টিপটাই যে এভাবে কাজে দেবে ওর, ও ভাবেনি। আলতোকরে শার্লির কপালে টিপটা পরিয়ে দিলো তুল্য। ওর স্পর্শ পেতেই বিস্ফোরিত চোখে তাকালো শার্লি। তুল্য বললো,

– এবার পার্ফেক্ট লাগছে।

দোতলায় ভাইভা দিয়ে আলো বেরিয়ে আসছিলো। বেরোনোর সময় কপালে হাত দিয়ে ও অনুভব করলো, ওর টিপটা নেই। ওখানেই পরেছে ভেবে কিঞ্চিৎ ঝুকে টিপটা ফ্লোরে খুজতে লাগলো ও। শান্ত ঠিক সে সময়েই ক্লাসের জন্য করিডোর দিয়ে এগোচ্ছিলো। আলোকে দেখে দাড়িয়ে যায় ও। হেসে বললো,

– আরেহ টপার জুনিয়র! ভাইভা কেমন গেলো?

ছেলেদের সাথে কথা বলে অভ্যস্ত না বলে আলো কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। জোরপূর্বক হেসে সালাম দিলো ও শান্তকে। ঘাড় নাড়িয়ে ‘জ্বী ভালো’ বলে টিপ খুজতে মনোযোগী হলো। শান্ত ভ্রু কুচকে বললো,

– কি সমস্যা আলো? কিছু খুজছো?

– আমার টিপ….

আনমনে এটুকো বলেই আলো থেমে গেলো। আরোবেশি অস্বস্তিতে পরে গেলো এবারে। একটা টিপ ও এইভাবে ফ্লোরে খুজছে, সিনিয়রকে এটা বলার চেয়ে অস্বস্তির আর কি হতে পারে? এবার এই লোক নির্ঘাত ওকে পচাবে। হলোও তাই। শান্ত শব্দ করে হেসে দিলো ওর কথা শুনে। হাসতে হাসতে বললো,

– তোমরা মেয়েরা পারোও। একটা টিপ এভাবে…

একুকোতেই শান্তও থেমে যায়। আলো মাথা নিচু করে ছিলো। শান্তর হাসি থামতে দেখে চোখ তুলে তাকায় ও। শান্ত একদৃষ্টিতে নিচতলায় তাকিয়ে আছে। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে আলোও এগিয়প এসে নিচে থাকায়। সেখানে তুল্য দাড়ানো, শার্লির কপাল স্পর্শ করে। মুহুর্তেই চোখ পানিতে ভরে ওঠে আলোর। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে ওর। শান্তও বোধহয় কোনো এক চাপা কষ্ট লুকিয়ে তাচ্ছিল্যে হাসলো। শার্লি-তুল্যর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো,

– কার কপালের টিপ, কার হয়ে যায়। হা?

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here