#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |৫|
#আফরিন_সুলতানা
–
মৌনির কাছে দপ করে সকাল হয়না। তার কাছে সকাল হয় আস্তে ধীরে। মনে হয় সূর্য্যি মামা খুব সময় নিয়ে ওঠেন। ঠিক যেভাবে শীতের কুয়াশায় মুড়িয়ে থাকা সূর্য আস্তে আস্তে ধীরে উঁকি দেয় মৌনির কাছে মনে হয় সারাবছর ঠিক ওমন ভাবেই সূর্য ওঠে। তার এরকমটা মনে হওয়ার কারণ সূর্য মামা ঘুম ওঠার বহুত আগেই সে ঘুম থেকে ওঠে। আর সূর্য মামা ওঠার আরো ঘন্টাখানেক পরে এ বাড়ির মানুষ জাগ্রত হয়৷ এই ৪ ঘন্টার মতো সময় মৌনির খুব মন খারাপ লাগে। যদিও ফজরের আজান হয়ে যায়। তখন মনে হয় পৃথিবীর সবথেকে একা মানুষটা বুঝি মৌনি।
তবুও অন্ধকারে কাজ করতে গিয়ে একটু গা ছমছম করে। গা ছমছমে ভাবটা ফজরের আজানের আগে বেশি করে। মৌনির ছোট বেলায় ভীষণ ভূতের ভ/য় করত, যথারিতি এখনো সে ভয়ের কিছুটা আছে। আগে ভূতের ভ/য়ে মায়ের আঁচলের নিচে মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকত কিন্তু এখন আর সে সুজোগটা নেই৷ এখন যতোই ভ/য় করুক না কেন তাকে সেই ফজরের আজানের আগে উঠে বাড়ির কাজ করা শুরু করে দিতে হয়। যেমন প্রথমেই সে সকালের জন্য রান্না বসিয়ে দেয়। রান্না করতে করতে আজান দিলে সে নামাজটা পড়ে নেয়৷ তারপর ঘর ঝাড়ি দিয়ে ঝড় মুছে নেয়। চিলেকোঠা ভর্তি কবুতরের টব। তাতে দুশটার মতো কবুতর। তাদের খেতে দিতে হয়, দেখভাল করতে হয়৷ সাতটার মধ্যে রান্না শেষ করে, সেগুলো হাড়ি/কড়াই থেকে গামলায় নামিয়ে হাড়ি/কড়া মাজতে হয়। এভাবেই সাড়ে সাতটার মধ্যে তাকে সকল কাজ সম্পন্ন করে টিউশানিতে ছুটতে হয়। সাড়ে সাতটায় তার প্রথম টিউশানিটা। সাড়ে সাতটার মধ্যে ও যেখানে টিউশানি করায় সেখানে পৌছে যেতে হবে মাস্ট বি। আটটার সময় যাকে টিউশানি করায় সে ক্লাস টুয়ের একটা বাচ্চা নাম আলিফ। আলিফের মা দেরি পছন্দ করের না। দেরিতে গেলে মৌনিকে বাকা চোখে দেখে দুটো বাকা কথা বলতে ছাড়েন না। এমনভাবে বলে যেন সে ঘোর কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। তাই মৌনি সেখানে সদা সময়ের ৫ মিনিট আগে গিয়ে পৌছাবে বলে ঠিক করে। তবে প্রতিদিন ঠিক সময় মতো সব কাজ সম্পন্ন করে সেখানে পৌঁছাতে পারলেও আজ হাতের পোড়ার জন্য পারেনি। সেজন্য কাজ সেরে আসতে আসতে একটু লেইট হয়েছে। মৌনি দুরুদুরু বুকে আলিফদের বাসার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। না জানি আজ আবার কি বলবে তাকে।
মৌনিকে সেখানে পৌছাতে সাতটা পপয়তাল্লিশ বেজে গেল। পনেরো মিনিট লেট হওয়াই তাকে কয়েকটা ত্যাড়া কথা তো শোনানো হলোই সাথে বলা হলো পনেরো মিনিট যেন বেশি করে পড়ায়৷ অগত্যা মৌনি তা-ই করতে হলো। তবে বিপত্তি বাধল পরের টিউশানিতে গিয়ে। ওখানে যেতে দেরি হওয়ায় ওখানেই বাড়তি লেইট হল। ফলস্বরূপ ভার্সিটিতে পৌছাতে তার আরো একটু লেইট হলো। তাদের বাড়ি থেকে আলিফদের বাড়ির দূরত্ব ২ কি.লো। আলিফদের বাড়ি থেকে টুকিদের বাড়ির দূরত্ব ১ কি.লো, আর সেখান থেকে ভার্সিটি আরো ৪ কি. লো। এই পুরোটা পথ মৌনি হেটে হেটে পাড়ি দিয়ে আর সকালের কাজ করে ক্লান্ত, অবসন্ন দেহটাকে যখন টেনেটুনে ক্লাস অব্দি নিয়ে এলো তখন দশটা পয়তাল্লিশ বাজে। আর ক্লাসের পনেরো মিনিট বাকি। এতো দেরিতে আসার পর স্যারের কাছে বড়সড় একটা ঝাড়ি শুনতে হলো। মৌনি নত শিরে সব শুনে আস্তে আস্তে ক্লাসে প্রবেশ করল। বাকি বেঞ্চ গুলো ফাঁকা না থাকায় একেবারে শেষ বেঞ্চে গিয়ে বসল। কারণ ওটাই ফাঁকা ছিল। তবে একেবারে পিছনের বেঞ্চটা ভাঙা হওয়ায় সেখানে কেউ বসত না সেটা মৌনির অজানা ছিল। মৌনি ভুলবশত সেই বেঞ্চে বসতেই ধুপ করে বিকট শব্দ তুলে ভাঙা বেঞ্চসহ ফ্লোরে পড়ে যায় সে। মূহুর্তেই ভরা ক্লাসরুমের আকর্ষণের মূল কারণ মৌনি। সবাই হো হো করে হেসে উঠল। এদিকে টাইলসের মেঝেতে তীব্র বেগে পড়ে কোমড়ে আঘাত লাগল বেজায়। অবসন্ন শরীরটা ব্যথায় মুড়িয়ে উঠল। স্যার ধমকে সবাইকে চুপ করতে বলেন। কাউকে গিয়ে একটা তুলতে বলেন। তবে কেউ নিজের জায়গা থেকে নড়ল না। উল্টে ঠোঁট চেপে হাসতে থাকে। স্যার সরু চোখে একবার সকলের দিকে তাকায়। মৌনি বেঞ্চ ভে/ঙে এমনভাবে পড়েছে যে একা একা ওঠাও সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজেই এগিয়ে যান মৌনির দিকে। মৌনি তখনো ওঠার চেষ্টা করছে। তখন কারো বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে সে তাকায়। হাতের মালিকের দিকে কিছুটা হকচকিয়ে যায় মৌনি। স্যার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মৌনিকে তাকাতে দেখে তিনি গম্ভীর কন্ঠে একবার বলে,
“ হাতটা ধরে উঠুন। ”
মৌনি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে ক্লাসের সবাই ঘাড় বাকিয়ে ড্যাব ড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে৷ মৌনি বিনীত স্বরে বলে,
“ আমি উঠতে পারবো স্যার। ”
“ সেটা তো এতোক্ষণ দেখতেই পেলাম। কথা না বাড়িয়ে হাতটা দিন। আমার ক্লাস শেষ হওয়ার পথে। ”
স্যারের কঠিন বাক্যে আর কিছু বলার সাহস পেল না মৌনি। ইতস্ততায় স্যারের হাতে হাত রাখতেই স্যার তাকে এক ঝটকায় তুলে নিল। মৌনি নত মুখে বলল, “ ধন্যবাদ স্যার। ”
তিনি ধন্যবাদের প্রতিউত্তর করলেন না। নিজের স্বভাবসুলভ গম্ভীর কন্ঠে বললেন, “ যে বেঞ্চ ভাঙা বলে সবাই স্কিপ করেছে সেটা আপনারও স্কিপ করা উচিত ছিল। হোয়াটএভার, পরেরবার থেকে খেয়াল রাখবেন। ”
তিনি এরপর নিজের ডেস্কে গিয়ে দাঁড়ান। সবাইকে একবার সরু চোখে পর্জবেক্ষণ করে বলেন,
“ তোমরা বড় হয়েছ কিন্তু মানুষ হতে পারোনি। ”
তাদের একটা সূক্ষ্ম খোচা দিয়ে ঘন্টা বাজার আগেই তিনি ক্লাস থেকে প্রস্থান করেন।
_____________
ক্যাম্পাসে একটা গাছের নিচে বসে আছে মৌনি। গাছটা একটা বেলি গাছ। গাছে থোকায় থোকায় সাদা ফুল ফুটে আছে। বেলির গন্ধে তার আশপাশটা মৌ মৌ করছে। মৌনি খুজে খুজে এই গাছটার নিচে এসে বসেছে। তার বেলি ফুল ভীষণ পছন্দের। তাদের গ্রামের বাড়ির পিছনে কবরস্থানে বেলি গাছ ছিল দুইটা। সেখান থেকে মৌনি ফুল নিয়ে মাথায় মালা গেথে মাথায়, হাতে, গলায় পড়ত। মৌনির আজও তেমন ইচ্ছে করছে। তবে সেটা সম্ভব নয়। প্রথমত ফুলগুলো অনেক উঁচুতে ফুটে আছে। মৌনির নাগালের বাইরে। নাগালের মধ্যে থেকেও লাভ নেই। কারণ গাছের সাথে লাগানো ছোট সাইনবোর্ডে গোটা গোটা করে লেখা ‘ ফুল ছেড়া নিষেধ ’। এতে করে মৌনির মনটাই খারাপ হয়ে যায়।
মৌনি মন খারাপ করে হাটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে। খিদেতে পেট চো চো করছে। মাথাটা কেমন ঘুরাচ্ছে, বোধহয় খিদে পেয়েছে সেজন্য। সেই সকাল সাতটারআ আগে রাতের বাসি ভাত গরম করে খেয়েছিল। মৌনি যখন খায় তখনো রান্না শেষ হয় না, সেজন্য রাতের বাসি ভাত গরম করে খেয়ে নেয়। রাতে আজ বেশি ভাত বেঁচে ছিল না। ওই অল্প কয়টা ভাত খেয়ে সকাল ৭ থেকে বারোটা অব্দি থাকা দুষ্কর। খিদেতে পেটের নারী চো চো করছে এখন। সেজন্য হয়তো মাথা ঘুরাচ্ছে । এদিকে তখন পড়ে গিয়ে কোমড়ে আঘাত লেগেছিল মনেহয়। কোমড়ের কাছটায় ব্যথায় টনটন করছে। মাথা-কোমড়ের ব্যথায় চোখ ক্রমশ বুজে আসছে। বাড়ি যেতে পারলে ভালো হতো, তবে এখনো একটা ক্লাস বাকি। সেটা শুরু হবে বারোটা থেকে। এখন বাজে সাড়ে এগারোটা। এখন যাওয়াও যাবে না। মৌনি বিষন্ন চিত্তে তাই বারোটা বাজার অপেক্ষা করছে।
তবে খিদেটা বোধহয় চক্রাবৃদ্ধি হারে ক্রমশই বাড়ছে। মৌনি যেখানে বসে আছে এখান থেকে ক্যান্টিনটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এখন ব্রেক টাইম বলে বেশিরভাগ ছেলেপুলের জায়গা সব ওই ক্যান্টিনে। আচ্ছা সে কি কিছু কিনে খাবে? তার কাছে কতো টাকা আছে?
মৌনি ব্যাগ হাতড়ে দেখল ব্যাগের মধ্যে ৫টাকার দুটো নোট পড়ে আছে। তার মানে ১০টাকা। ১০টাকায় তো খুব ভালো খাবার খেতে পারবে সে। মৌনি মনে মনে খুশি হয়ে ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ালো।
__
ক্যান্টিনের ঢুকে কিছুটা ইতস্তত হয়ে পড়ল মৌনি। ভার্সিটিতে আসার পর আজ প্রথম ক্যান্টিনে ঢুকল মৌনি। ঝ চকচকে ক্যান্টিনের পরিবেশ। সারিবদ্ধ চেয়ার টেবিল। সবাই বন্ধুদের সাথে বসে, খাওয়ার মাঝে আড্ডা দিচ্ছে। হাসাহাসি করছে। মৌনির না চাইতেও তার চোখ পড়ল টেবিলের খাবারগুলোর উপর। পিৎজা, বার্গার, পেস্ট্রি, দামী ক্লোড ড্রিংকসের মতো খাবার গুলোই সবাই খাচ্ছে। মৌনি চিন্তিত হয়ে পড়ল। এসব বড়লোকি খাবার কেনার মতো টাকা তার কাছে নেই। আচ্ছা এসব খাবার ছাড়া অন্য কমদামী খাবার এখানে আছে তো? এসব ভেবে মৌনি ক্যান্টিনের দরজার কাছে ইতস্তত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। একবার নিজের হাতের টাকাগুলোর দিকে আর একবার সবাই খেতে থাকা খাবারগুলোর দিকে তাকালো।
এভাবেই অল্পক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় কয়েকটা ছেলেমেয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। মৌনির অবসন্ন দেহ টাল সামলাতে না পেরে পরে যেতে নিচ্ছিল। তার আগেই দেয়াল ধরে সামলে নিল নিজেকে। তাদেরকে কিছু শক্ত কথা বলার জন্য মুখ তুলে চাইতেই দেখল ছেলেমেয়ে গুলো তাকে সব হই হুল্লোড় করতে করতে পাশাপাশি দুটো টেবিলে বসল। মূহুর্তেই দুটো টেবিল ভর্তি হয়ে গেল। তাদের হুল্লোড়ে বাকি সবার মাঝে হুল্লোড় কিছুটা কমে এলো। অজান্তেই মৌনির চোখ আটকাল মুখের সামনে ফোন ধরে হেসে হেসে কথা বলতে থাকা কালো রঙের চেক শার্ট পড়া ছেলেটির দিকে। একহাতে পাশের মেয়েটির বাহু জড়িয়ে রেখেছে। দুজনের মুখের ঠিক মাঝামাঝি ফোনটার অবস্থান। তারা ভিডিও কলে কথা বলছে বলে মনে হচ্ছে৷
মৌনির বুকটা কেপে উঠল। তাদের দেখে বুকের মধ্যে সূক্ষ্ম এক জ্বালার অনুভব হলো। মৌনি সরে আসতে চাইলেও যেন পারল না। নিজের জায়গাতেই থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। তারা ফোনে কথা বলা শেষ করল, খাবারের অর্ডার দিল , খাবার খাওয়ার সময় ছেলেটার মেয়েটার প্রতি ছোট ছোট কেয়ার গুলো মৌনির মনে অদ্ভুত অনূভুতির সৃষ্টি করল। এসব কিছুর স্বপ্ন তো এতোদিনে এই মানুষটাকে নিয়ে নিজের অজান্তেই দেখে ফেলেছিল। তাই হয়তো একটু মন পোড়াচ্ছে। এর বেশি আর কিছুই তো নয়। মৌনি তার জ্ব/লতে থাকা মনটাকে নিয়ে সপ্তপর্ণে সরে আসতে চাইল। তখনই দেখল সে মৌনির দিকে তাকিয়েছে। একটানা মৌনির দিকেই তাকিয়ে আছে। মৌনির দিকে নাকি অন্যকারো দিকে? মৌনি চেয়েও সেখান থেকে নড়তে পারল না।
“ এই যে আপা, ভাই আপনারে ডাকে। ”
কন্ঠস্বরটা কানে পৌছাতেই মৌনি দৃষ্টি ঘুরিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দশ বারো বছর বয়সী ছেলেটার দিকে তাকালো। মৌনির গলায় আটকে থাকা ব্যথাটুকুকে গিলে নেওয়ার প্রচেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল,
“ আমাকে বলছ? ”
“ তোমার সামনে দাঁড়ায় তোমার দিকে তাকিয়ে তোমায় ছাড়া কাকে বলব? তোমাকেই বলছি। ”
“ কে ডাকছে আমায়? ”
“ ভাই ডাকে? ”
“ কোন ভাই? ”
“ ওই যে, নিষাদ ভাই ডাকে। যাও জলদি আমার অনেক কাজ এখন। আমি যাই। ”
আঙুলের সাহায্যে নিষাদকে দেখিয়ে ঠিক যেমন ভাবে এসেছিল ওমন ভাবেই ছুটে চলে গেল সে।
মৌনি চমকে এবার নিষাদদের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল তারা সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। শুধু তারা নয়, ক্যান্টিনের সব ছেলেমেয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের পলকেই কি হলো যে সবাই এরকমভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মৌনি চূড়ান্ত বিস্ময় নিয়ে আবার নিষাদের দিকে তাকাতেই দেখল নিষাদ আঙুলের ইশারায় তাকে কাছে ডাকছে৷ একটু আগে তো ফিরেও তাকাচ্ছিল না আর এখন কাছে ডাকছে কি ব্যাপার!
“ এই মেয়ে! নিষাদ ভাই ডাকছে তোমার কানে যায় না! ”
মৌনির পাশে এসে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে ধমকে উঠল তাকে। মৌনি বোকার মতো শুধালো, “ হু? ”
“ বাংলা বোঝো না? নিষাদ ভাই ডাকছে তোমায়। চলো ওখানে। ”
ছেলেটা মৌনির হাত টেনে গটগট করে নিষাদের দিকে নিয়ে যেতে থাকল। নিষাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল মৌনিকে৷
মৌনি দেখল সবাই তার দিকে কেমন করে তাকিয়ে হাসছে। অদ্ভুত সে হাসি দেখে মৌনির ভ/য় লাগতে শুরু করল। নিষাদের দলের মধ্যে থেকে একটা ছেলে উঠে এলো মৌনির সামনে। মুখে চাপা হাসি নিয়ে মৌনির চতুর্দিক এক বার ঘুরে ওর সামনে দাঁড়িয়ে নাক মুখ ছিটকে বলল,
“ এসব কি পড়ে এসেছ? রংচটা জামাকাপড়, বাপ-দাদার আমলের থলে ব্যগ, সেটাও ছেড়া। তুমি ভার্সিটিতে পড়তে এসেছ নাকি ভিক্ষে করতে? ”
তার কথায় ফোড়ন কাটল অন্য আরেকটা ছেলে,
“ আরে মামা! কি যে বলিস, এখানে পড়তে আসতে যাবে কেন? ভিক্ষে করতেই এসেছে। ”
“ তবে ভিখারীর কথায় তেজ একটু বেশিই দোস্ত। আগেরদিন রুবাব বমি করছিল বলে ওকে একটু দেখতে বললাম, আমার সাথে সে কি রুড বিহেভ করল। আমাকে ঠেলে ফেলে চলে আসল। আবার বলে কিনা, রুবাবের বমি করা দেখলে ওর নাকি বমি পাবে, আরে ওর তো রুবাবের বমি খাওয়ারও যোগ্যতা
নেই। ”
যে মেয়েটা ওয়াশরুমে আগেরদিন নিষাদের গার্লফ্রেন্ডের সাথে ছিল সে বলল কথাগুলো। রুবাব বলল,
” বমি ব্যাপারটা স্কিপ কর সাবা। খাচ্ছি তো। ”
“ ওকে ওকে। বাট নিষাদ মেয়েটার একটা ব্যবস্থা করোতো। আই কান্ট টলারেট হার এনি মোর। ”
ইতিমধ্যে তাদের সরাসরি করা অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে এলো মৌনির। নিষাদ একটা গা ছাড়া ভাব নিয়ে একাগ্র চিত্তে খাবার খাচ্ছে। খেতে খেতে বলল,
“ তুমি ভুল জায়গায় চলে এসেছ মেয়ে। এটা ভার্সিটি, এখানে ভিক্ষা দেওয়া হয় না। ”
মৌনি কান্না চেপে শক্ত মুখে বলল,
“ আমি ভিক্ষে করতে আসেনি। আপনাদের মতো পড়তেই এসেছি। ”
“ ওহ সিরিয়াসলি! ভিখারীদের মতো পোষাক পড়ে ভিক্ষার থলে নিয়ে ড্যাবড্যাব করে আমাদের খাবারের দিকে চেয়ে আছো আর বলছ তুমি ভিক্ষা করতে আসোনি, এটা আমরা বিশ্বাস করবো? হোয়াট এ জোকস! ”
নিষাদের কন্ঠে স্পষ্ট কৌতুক। সে খাওয়া অফ করে এবার মৌনির দিকে তাকিয়ে আছে। তীব্র অপমানে মৌনির মুখে অন্ধকার নামে,
“ কি হলো কথা বলছো না কেন? শুনলাম তোমার কথায় নাকি ভীষণ তেজ৷ আমাদেরও একটু–
“ ডোন্ট জাজ এ পারসন বাই হিজ আউটার
এপ্যারেন্স ”
মৌনির কথা শেষ হতেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল পুরো ক্যান্টিন৷
“ এ ভাই! আজকাল দেখি ভিখারীরাও ইংরেজিতে ডায়লগ ছাড়ে। ”
“ আরে এরা হলো ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল
ভিখরী। ”
মৌনির ওই একটা কথায় একেক জন একেক মন্তব্য করে মজা উড়াতে লাগল। মৌনি সেই মূহুর্তে চরম ভাবে উপলব্ধি করল গরিবদের মুখে ইংরেজি মানায় না। সে কয়েকটা ভুল বাংলা বললেও বোধহয় এতোটা অপমানিত হতো না যতোটা অপমানিত হয়েছে একটা শুদ্ধ ইংরেজি বলে।
এতোগুলো মানুষের কথার পিষ্টে অপমানে জর্জরিত মৌনির কথা বলা দায়। লজ্জায়, ঘৃণায় মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা তার। ছলছল চোখে নিষাদের দিকে শুধু তাকিয়ে ছিল। তার মুখে সবার মতো অপমানের হাসি ছাড়া আর কিছুই ছিল না, অথচ মৌনির মনের অতি সূক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্ম কোনো স্থান থেকে ফরিয়াদ করছিল, “ আমি আপনার স্ত্রী। নিজের স্ত্রীকে এভাবে অপমানিত হতে দেবেন
না। ”
তবে মৌনির সে নীরব ফরিয়াদ নিষাদ বা খোদা কেউ-ই শোনেনি। নিষাদের দ্বারাই চূড়ান্ত অপমানিত হয়েছিল সে। যখন তাকে ভিখারী হিসেবে তাদের খাবারের উচ্ছিষ্ট টুকু খেতে দেওয়া হয়েছিল।
মৌনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া সেই উচ্ছিষ্ট খাবারের দিকে। সবাই ফোন বের করে তখন তার ভিডিও করছিল। উদ্দেশ্য একটা জম্পেশ ক্যাপশন দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড দেওয়া। মৌনি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল৷ তার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না৷ কাছের মানুষগুলোর প্রতিদিনের করা অপমানের থেকে বাইরের মানুষগুলোর করা এই অপমান তার উপর ভারী পড়ল। নিষাদের প্রতি ঘৃণায় গলা- বুক জ্ব/লে উঠল। তাই আগপিছ না ভেবে নিজের চূড়ান্ত ক্ষোভটুকু নিষাদের উপরেই মেটানোর প্রচেষ্টা করল।
তখন তার উত্তেজিত মস্তিষ্ক বিন্দুমাত্র ভাবার অবকাশ দিল না যে তখন কি অঘটন ঘটাতে যাচ্ছে সে৷ আর এই ঘটনা তার ভার্সিটির পরবর্তী দিনগুলোতে ঠিক কতোটা এফেক্ট ফেলতে পারে।
— চলবে.
[ নিষাদকে নিয়ে কি কনফিউজড? আগামী পর্বে ৫০% কনফিউশান দূর করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। ]

